আপনার মতামত         


সুমন মান্না





উটকো

সকালেই চিতা জ্বলে গেলে পাঁউরুটি পেয়ে যায় চা
ভরাপেটে খানিক বিরতি তারপর ফের খুঁটে খা।
বেঁচে থাক মড়ার দালালি রোদজ্বলা পোড়াকাঠ চোপা।
লাশপার্টি পছন্দ হলে করে ফেলি চটপট রফা।
নামধামে কিবা এসে যায় বদলাই প্রায়ই তড়িঘড়ি

ছায়াটাই সঙ্গী আমার ওটা পেতে রাতে শুয়ে পড়ি।

কাজ শুধু টপকিয়ে দেওয়া লাইনের অদল বদল
মূল্য দিলে লাশ পাবে ঝটপট আগুনের কোল।
দিয়ে থুয়ে সামান্যই থাকে, সবই যায় এই পোড়া পেটে
পরিধেয়ও হয় বৈকী, লাশ যদি এ সাইজে জোটে।

গতকাল একজোড়া হল - মৃতদেহ আমারই বয়সী
এ কদিন তাই ঘুরি ফিরি ওরই নামে - "রবি পাকড়াশী"।





সেদিন মৌলালীতে

বিকেলের মৌলালী পথে সমুদ্রস্নান স্থাবর জঙ্গম
অনতিদুর জেলেবস্তি, টাইমকলে নগরপত্তন
পোড়া ডিজেলের ঘ্রাণ লোনাজলে তিমি রোদ মেখে
কাগজকুড়ুনি মেয়ে থেমে যায় হঠাৎ এ সমুদ্র দেখে।
ছেঁড়া ফ্রক টলোমলো পা এসে বসে চৌরাস্তাতে
বেলা শেষ ভেঙচিয়ে দিয়ে ছোটোহাতে ভাঙা আয়নাতে
সুতীব্র চাহনি তার, সারেঙের বুকে জমে হিম
"হুঁশিয়ার!" ডাক দিয়ে ওঠে, -"আজকের সমুদ্র আদিম!"
সিগন্যালে জট পড়ে গেছে বাতিঘর গদাইলস্করী
ঝড় এসে কিনে নেবে সব অপেক্ষায় আদার ব্যাপারী।






উগ্রপন্থী

আণবিক অতৃপ্তি এক বসে রাতে ফাঁকা বাসস্টপে
বেড়ালের শিকে ছিঁড়ে গেলে তার ময়ুরকন্ঠী হাতে-
রাখা অঙ্গারের তূণ, আর পথভুল বিপন্ন কৈশোর
উপত্যকা থেকে তাকে সাইকেল নিয়ে ডাকে ভোর।
বাজারের কলামুলো বেচে দিন আনা আর তাকে খাওয়া
পরদিন আসার আগেই (জানি) সেও দেবে চটপট হাওয়া।
তবু কৃষ্টি চলেছে শাসন পতাকা বেদম উড্ডীন
হাওয়া যদি ঝড় হয়ে যায় আকাঙ্খা উঁচানো সঙীন।
থাকে সরগরম চক, স্কুল ছুটি দু'বেলা কার্ফিউ।
মৌচাকে ঢিল মেরে টেরে ডার্বিটা জিতে নিল ফেউ।
লাগিয়েছি বাজী বুনোঝোপে, কথা কম কাঁটা বেশি তার
মেরে দেবো সপরিবার - সম্বৎসর পুরী হরিদ্বার।





এ কার সাথে একা

বাকি যারা ছিল সব অস্থিচর্মসার
সুমারি হয়না আজ বহুকাল তাই
শৈশবে পাখি মেরে ভয় পাওয়া সাপ
ফণা তুলে ভিজে যেত, সন্ধ্যা ততক্ষণ
হেঁটে গেছে আকাশের দক্ষিণ-পশ্চিমে-
কেরোসিন জীবনরস রাতে বৃষ্টিতে
ডিভিসিতে জল ছাড়ে। মৃৎপাত্র জ্বরে
কাবু হলে জড়িবুটি- অব্যর্থ মহিমা।

চোখে পড়ে, তবু দেখা হয়ে ওঠে নাকো
পেয়ারাগাছের সাথী প্রতি খড়কুটো
উষ্ণ খেলার মাঠ- জিতে লবেঞ্চুষ
না হক বিলের জলে শ্যাওলার মতো
যারা পড়ে থাকে- হিসেবের কড়িকাঠে
ঝুলে থাকে। একা জাগি এক সাধ্যাতীত।





কিছু কিছু

কিছু পথ একা একা হাঁটে
কিছু পথ ছোটে দিনভর
কিছু পথ কিছুদুর গিয়ে
ফিরে আসে পিছু পিছু তোর।

কিছুক্ষণ আগে এসেছিল
কিছুক্ষণ এসে ফিরে যায়
কিছুক্ষণ কেটে যেতে যেতে
সারাক্ষণ তোকেই ভাবায়।

কিছু কথা বাকী ছিল কাল
কিছু কথা বেশি হল আজ?
কিছু কথা শেতপাথরের
খেলাছলে হাতে আঁকা তাজ।





ঐতিহ্য

নাম ছিল সুর্য বিদায়
ঘড়িতে লাগানো ছিটকিনি
সওদায় নগদ ব্যপারী
আলো বেছে রোদ্দুর কিনি।

তার মাঝে পথ খুঁজে নিল
পোড়োবাড়ি সাবেক কিশোরী
ভুখা পেটে উপমার ভীড়
শরিকের ছায়াও সকড়ি।

ভিজে চুলে অবাধ লুন্ঠন-
গন্ডদেশ, মহিমা প্রচীন
অলিন্দের যে স্বাদুগন্ধে
হৃৎপিন্ড মুন্ডবিহীন।

অনাদায়ে ভিটে মাটি চাঁটি
বিদ্রোহে পথে খোসা ফেলি
আজীবন রাজার ভিখিরি
উপরোধে ঢেঁকি গিলে চলি।





কথায়-সুরে

কথায় ফেলল বিকেল আলো, সুর ছায়া হয়ে জন্মালো।
স্টেশন দু' এক কদম হাঁটে, নিজের ধানজমি চৌকাঠে-
পাশের পুকুর সাজলো চুলে সোজসাপটা শালুক ফুলে।
কথা পেরোয় এসব দেখে, সুরটা তার পিছনেই থাকে-
সে যে খুবই অভিমানী, যেন বিলেতফেরৎ রাণী


তাঁর পোষাক সূক্ষ্ম অতি, তাতে মিনে করা সুখ্যাতি

যখন চাইল সে চোখ তুলে, মহল ঝাড়বাতিটাই জ্বালে
দুরে মালগাড়ি যায় চলে, ওরা একটু কথাই বলে।
রাখছে স্বপ্নেতে এক-পা, অমনি শিউরে উঠছে গা।
তখন ভীষণ খুশি এলে - স্টেশন পোড় খাওয়া দেওয়ালে-
অনেক ভাঙাচোড়ার দাগ, তাতে সময় অস্তরাগ,
কথায় তাপ্পি দিয়েই গেছে, সে যে আপিস টাইমে বাঁচে।
সেসব ভাঙছে এক এক করে, বৃষ্টি আসল নিয়ে সুরে।
ভিজে কথার পাঁচিল দেখি সুরে উঠছে হয়ে পাখি-

তার পায়ের নীচে মাটি তখন সরছে গুটিগুটি।

তবে উড়ছে সে যে নিজে, তার আবার দু-চোখ ভিজে-
এতে গভীর বর্ষা হয়, প্রচুর গাছপালা জন্মায়
আসে নদী আর এক সেতু, ওদের দেখাও সেই যেহেতু-
ফলে মেঘও আসল নেমে, পাহাড় হয়েই গেল থেমে।
রঙীন একখানা জলছবি - ওদের একমুঠো পৃথিবী।
যখন রাত্রি লম্ফ জ্বালে - দু'জন শুধুই গেয়ে চলে।





কবি শঙ্খ ঘোষ মহাশয় প্রবাদপ্রতিমেষু,

জংশনে ট্রেন থামলো যখন মাটির ভাঁড়ে চা
মিষ্টি বেশি তাও সে রোদের গয়নাভর্তি গা,
মনে ধুকপুকুনি -

মনের ধুকপুকুনি বাড়াই আমি নতুন যে কারবার
এই স্টেশনে বেচবো "ধানের হেয়ার রিমুভার"।
- দেখুন বিজ্ঞাপনে -

দেখুন বিজ্ঞাপনে, জলও জানেন ওপর দিকে গড়ায়
হোঁচোট খেলে "আউচ" বলে আজকালকার ছোঁড়ায়
এ তো আজব জিনিস-

এটা আজব জিনিস করবে ফিনিশ অবাঞ্ছিত চুল
মসৃণ ধান সুস্থ জোয়ান একটুও নেই ভুল।
-তাতে কী আর হল-

তাতে কী আর হল, বললে হল খরচাখানা দেখুন
জানেন চিনে আজকাল খায় হাইব্রীড এক উকুন?
শুনুন বিশ্বায়নে-

আপনি বিশ্বায়নে, ঘরের কোণে? হস্তীমুর্খ নকি?
চকচকে ধান - পাহাড় প্রমাণ, কি বললেন ফাঁকি?
এসব টেকনোলজি

এসব টেকনোলজি করছে রাজই এই দুনিয়া জুড়ে
কিছু পাগল ঘরের আগল দিচ্ছে যে পাশ ফিরে।
শিশি বাইশ টাকা-

মাত্র বাইশ টাকা হচ্ছে ফাঁকা সিগ্রেট, পান, চা
এক শিশিতে এক বিঘে ধান, ভীষণ সস্তা, না?
ভালো রিটার্ন পাবেন

ভালো রিটার্ন পাবেন সবাই খাবেন আমি তখন কোথায়
ছুটে বেড়াই সবার কাছে আপনাদেরই সেবায়
জানেন, পাহরুখ শান

জানেন, পাহরুখ শান, এই ধানই খান তাই এতো ফিটফাট
অম্বল বাত হাঁপানির ধাত সবই হয় চিৎপাত।
এটা এমন গুণের

এটা এমন গুণের, তাও সে ওদের দয়ার শরীর তাই
দিচ্ছে মাত্র বাইশ টাকায়, প্রায় সেটা মাগনাই-
বলি কার কটা চাই?
বলি লাগবে নাকি?
আরে শুঁকে ই দেখুন
আরে ধরেই দেখুন
বলি.....





বনের মোষ

দহনের কিছু আগে আবিষ্ট পরহিতব্রত
আঠা দিয়ে সাঁটা জায়গাটা দেখায় সে দগদগে ক্ষত
তার চেয়ে রোদে সেঁকে নিয়ে সময়ের তীব্র আরকে
লেবুর আচারের মত ইতিহাস বইয়ের মোড়কে
তবু ভাবি, বেলা থাকতেই জল শুষে নেবে যতক্ষণ
ভিজে মাটি ধুলো কাদা ঘাঁটি চারাপোনা চাষ অনুক্ষণ।
খেতে টেতে দিয়ে এসে বসি বেচা কেনা জীবন সমতা
বড় হলে কেনে ব্যবসায়ী, বাজরের সীমিত জনতা।
মাঝে সাজে দেখা টেখা হলে এটা সেটা লোকে বলে যায়
হাতে লেখা পোষ্টারটাতে তক্ষুণি আঠা লেগে যায়।





কাগজ নৌকা ভীড়

সসাগরা নারকেলসারি পঞ্জিকাতে
আছে মাসপয়লা সুসময় সর্বাঙ্গে।
লেখচিত্র নিয়ে টিকিট কাটতে গিয়ে
রেস্ত নিয়ে হেস্তনেস্ত। মাথাপিছু চিঠি
পাবে দেড়খানা - আপাতত: টিউকলে
যারা চোদ্দপুরুষের উত্তরাধিকারে
পাওয়া লাইনের জায়গাটুকু নিয়ে
হেজে গেছে বসন্তপঞ্চমীর রাতে।

দুরে চাঁদ ডুবে গেলে বড় একা একা
তেতলার বারান্দা - কাগজ নৌকা ভীড়।





ওদের কথা

আদতে নি:সঙ্গ কোলাহল, ফুটপাথে চাটাই বিছিয়ে
পৌষের বিকেলের আলো ঘোলাজলে দিয়েছে মিশিয়ে
আর কিছু ছেঁড়া পোষ্টার, একপাটি বেওয়ারিশ চটি

লাথ খেয়ে চৌমাথা ঘুরে তার পাশে জমে হাঁটি হাঁটি।

থিতিয়েছে এরা কয়জনা, কিছু লোক স্রেফ উবে গেছে
মন্থনে ধুতি পাঞ্জাবী সরটুকু হয়ে ফুটে আছে

চকচকে জিলেটিয় চোপা এভাবেই চিরকাল ধুয়ে

রোদ্দুর কমে গেলে দেয় - পতাকায় আগুন উসকিয়ে।