আপনার মতামত         


          বাংলা বয়েজ স্কুল

          বিক্রম পাকড়াশী



আমরা কোনদিন সার্কলের থিওরেম প্রমাণ করি নি, মানে করতে পারি নি। বৃত্তের উপপাদ্য প্রমাণ করতে করতে কেটে গেছে আমাদের ইস্কুল বয়স। এটা আমাদের দোষ। অনেকটা বাংলা ব্যাকরণ বইতে দোষবাচক বিশেষণের উদাহরনে যেমন লেখা থাকত 'ছেলেটি রোগা- এটি তার দোষ', সেইরকম দোষ। আমরা ভৌতবিজ্ঞান পড়েছি, ভ্রামক পড়েছি, উদস্থৈতিক কূট পড়েছি - সাইন্স কুইজে রেটর্ট কে বকযন্ত্র বলে প্রবল খোরাক হয়েছি। আমরা চাঁদা দিয়ে প্রবৃদ্ধ কোণ মেপেছি, কল দিয়ে পেন্সিলের ডগা ছুঁচলো করেছি, লালবাড়ির দিক থেকে দৌড়ে এসে পপিন স্ক্রীচের আধ হাত বাইরে পা ফেলে পাঁজর টিপ করে বল করেছি। আম্পায়ার নো ডাকার সাহস দেখাতে পারে নি। এতদসত্ত্বেও আমাদের যথাকথঞ্চিদরূপে ছাত্রজীবন নির্বাহ সম্ভবপর হয়েছে।

হয়েছে যে, তার একটা বড় কারণ কার্মেল কনভেন্ট। কার্মেল ছিলো রাস্তার ঠিক ওই পারে - একেবারে আমেরিকার মতো। নাইনের ছেলেরা ওখানে বছরে একবার ঢুকতে পেতো সরস্বতী পুজোর নেমন্ত্ব করতে যেতে। আমরা তিনজন একবার কার্মেলে ঢুকে ঘেঁটে গেছিলাম। আমরা ঢুকছি, আর মেয়েরা লাইন করে বেরোচ্ছে - সে যে কতরকমের মেয়ে, ও:! মন্ত্রমুগ্ধ ভুষির মতন বেশ খানিক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকার পরে কেউ প্রিন্সিপালের ঘরটা দেখিয়ে দিয়েছিলো। ওদের প্রিন্সিপাল ছিলেন অ্যান ইমেল্ডা। আÉ¡নিমাল দা-র সামনে কনফি নিয়ে দু লাইন ইংরিজি বলতে পারার ধক রাখলে আমাদের হেডু 'সান্ডে-মান্ডে' সেই ধুরন্ধর ছাত্রদের যেতে দিতেন।

হেডুকে হেডু বলে ডাকায় টিসি পাবার প্রবল ব্যাথা ছিলো। একবার ক্লাশ টেন মাধ্যমিকে রেজাল্ট খারাপ করায় আমরা নাইনের ছেলেরা বেত খেয়েছিলাম। তবে পচা উত্তম করায় চাপ ছিলো না। পচা উত্তম ইস্কুলের আশেপাশেই কোথাও থাকতো। একেবারে উত্তমকুমারের মতো চেহারা ছিলো, কিন্তু সত্যি সত্যি তো আর উত্তমকুমার নয় - তাই ওকে রোডে করে যেতে দেখা গেলেই পচা উত্তম করা হতো ( সেই আগেকার দিনের সিনেমায় যেমন গুরু-গুরু ধ্বনি উঠতো সেইরকম)। পচা একবার হেডুকে নালিশ করেছিলো ছেলেরা নাকি ওকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি দেয়। আরেকবার আওয়াজ দেওয়া হয়েছিলো বাইনবাবুকে। বাইনবাবু স্পোর্টসের প্রোগামের রিহার্সাল করাতে যাচ্ছেন মাঠ দিয়ে, বাইরে রোদ গনগন করছে, আর ওনার মাথায় ছাতা ধরেছে একটা সিক্সের খোকা! আমরা সেই দেখে জানলা দিয়ে সে যায় সে যায় শি গোস শি গোস করেছিলাম। মাঝমাঠে ছাতার হাতবদল হয়েছিলো। ওই একই দিনে আমরা সোমনাথদাদের ব্যাচকে স্মরণ করেছিলাম। ওরা ওদের জমানায় বেঞ্চিগুলো দোতলার বারান্দা দিয়ে মাঠে ফেলে দিয়েছিলো। আমরা মহাজনের পথেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু কার যেন বেশ মনে পড়ে গেল যে পায়ের ঠিক নিচেই টিচার্সরুম। তখন বেঞ্চিগুলো তুলে দমাদ্দম মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলা হলো।

মেয়েদের ইস্কুলে একবারই পুরোপুরি স্যাডিস্টিক আনন্দ পেয়েছিলাম। যোধপুর গার্লসে নেমন্ত®Äর জন্য গেছি। তার আগের বছর আমাদের কোন ছেলে নাকি ওদের কোন মেয়েকে কি বলেছে, ফলস্বরূপ আমাদের ছেলেদের তারপর আর ঢুকতে দেওয়া হয় নি। এইটে আমাদের ইগোতে গদাম করে লেগেছিলো। আমাদের মনে মনে দাবি ছিলো যে ওদের হেডমিসকে সেই দুর্ব্বÉবহারের নিমিত্ত লিখিতভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। তা সে যাই হোক, দারোয়ান এদিক-ওদিক কোথাও নেই দেখে আমরা ওদের সামনের গেটটা এক লাথি মেরে খুললাম। বিশাল আওয়াজ হল, কিন্তু কেউ এল না। বিষÄ মনে মাঠ দিয়ে যাচ্ছি, দেখি থরে থরে মেয়ে মাঠের মধ্যে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমরাও ওদের দেখছি, ওরাও আমাদের দেখছে। এই ঘটনার পর ওদের প্রেস্টিজে এক পরত চিরকালীন গ্যামাক্সিন লেগে আছে।

তবে মেয়েদের ইস্কুল থেকে যখন আমাদের টেরিটরিতে আসতো (সাধারনত: একজন!) তখন যা তা হতো। যে সব ক্লাশে স্যার থাকত তাদের গুড়ে বালি, কিন্তু ফাঁকা ক্লাশগুলো দূর থেকে দেখেই মেয়ে আসছে মেয়ে আসছে মেয়ে আসছে মেয়ে আসছে বলে চতুর্দিক থেকে পঙ্গপালের মতো বারান্দায় জড়ো হতাম। মেয়েটা সিঁড়ি বেয়ে উঠছে, আমরা পেছোচ্ছি। মেয়েটা একতলায় - ছেলেরা প্রায় ক্লাশে সিঁধিয়ে উঁকি মারছে। মেয়ে বারান্দায় - ময়দান ক্লিয়ার। এই সময়ে কোনো বীরপুঙ্গব যদি মেয়েটির দিকে এগিয়ে যায় আর তাকে হেডুর ঘর দেখাবার বদলে বাথরুমের রাস্তা বাতলে দেয় তাহলে পুরো জমে ক্ষীর। এক দিনের বাদশা সে।



মেয়েদের ব্যাপারে, জগৎ এবং জীবনের ব্যাপারে, বটতলা রহস্যে আমাদের অসীম কৌতূহল। ওপরের ক্লাশ একবার মিস ক্যালকাটা বলে ছবির বই নিয়ে ধরা পড়লো। যারা যারা বই এনেছে এবং/বা ধার নিয়েছে এবং/বা পড়েছে সবার নাকি টিসি হবে। পুরো চরম উত্তেজনা, ফুটবল মাথায় উঠেছে। সেদিন ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়েছিলো। উপরিউক্ত সমস্ত দোষে দোষী ছাত্রদের উঠে দাঁড়াতে বলায় একজন বাদে সবাই দাঁড়ায় - টিসি দিলে মাধ্যমিক দেবে কারা? খালি সংবিধানের ক্লাশে উজ্জ্বলবাবু এসে দেশের অবস্থা নিয়ে দু:খ প্রকাশ করে আমাদের বার বার সাবধান করে দিলেন যে সু¤নাগরিক হিসাবে ছাত্রদের কখনই পাবলিশারের নামহীন কোনো বই কেনা উচিৎ নয় - ধরা পড়লে তাড়িয়ে দেওয়া হবে, তখন নিজে কেন বাবা মা এসে পায়ে পড়লেও লাভ হবে না।

ছেলেদের দোষ স্বীকার করানোর সেরা প¿Û¡ ছিলো সৎসাহস দেখাতে বলা। একবার মিঠাই সেটা দেখাতে গিয়ে বিপদে পড়ে। টিফিনের পরে বাংলা ক্লাশ, আমরা সু¤রেশবাবুর টেবিলে মিঠাই এর খাবার থেকে চিঁড়ের পোলাও, বাদাম আর ডিমের ঝুরো দিয়ে উত্তরাধুনিক ভাস্কর্য করে রাখলাম। উনি এলেন, দেখলেন, আর গম্ভীর গলায় বললেন 'বিক্রম - এগুলো বাইরে ফেলে এস'। বুঝলাম আজ মজা আছে। সু¤রেশবাবুর হাতের কবজি ছিলো ভালুকের থাবার মতো। কয়েক হপ্তা আগে গবা পেছনে বসে গুটখা খেতে গিয়ে ধরা পরায় উনি ' দে না আমাকে আমিও খাই ' বলে গবাকে সেই থাবার স্যাম্পেল দেখিয়েছিলেন। গবার গায়ে হাত তোলার সাহস সকলের ছিলো না। নরেন্দÊপুরে পড়াকালীন সে সিক-রুমের পাখা হাত দিয়ে বেঁকিয়ে পদ্মফুল করে দিয়েছিলো। সু¤রেশবাবু আরম্ভ করলেন ' শিক্ষকের টেবিলে ভুক্তাবশেষ! কেন, তোমাদের বাবা (৩ সেকেন্ড চুপ) নাই, মা (ঐ) নাই, দাদা কাকা (ঐ) নাই। এই ডিম তাদের মাথায় ..........। সৎসাহস থাকে উঠে দাঁড়াক।' এই অবধি বলার পর মিঠাই ওঠার চেষ্টা করতে লাগলো (ওর বাবা আমাদের ইস্কুলে পড়াতেন - এটা তখন ইজ্জতের ব্যাপার) আর আমরা ওর প্যান্ট চেপে ধরে রাখার চেষ্টা করতে লাগলাম। সু¤রেশবাবু এগিয়ে চললেন, ' কে সেই পুরুষপুঙ্গব? উঠে দাঁড়াক সে (মিঠাইকে চেপে ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠছে), তাকে আমি সিঁড়ে দু টুকরো না করি তো কিসের শিক্ষক আমি? ' এরপর মিঠাই নিজে থেকেই বসে পড়ে। সু¤রেশবাবুকে ছায়াপিণ্ড দেয়নি উত্তর।

গদ্দারি আমরা বরদাস্ত করতাম না। তাই নালিশ ব্যাপারটা কম ছিলো। উপরের তলায় বন্ধ লাইব্রেরির ঘরের সামনে গদ্দারদের ব্যাবস্থা হত। একটু আগেই হয়তো ইঁট ছোঁড়াছুঁড়ি হয়েছে, দুজনের নাক দিয়ে হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে - চুপচাপ গিয়ে নারায়নবাবুকে দুজনে বলেছে 'স্যার একটু ফাস্ট এড নেবো'? মনিটর বলে কিছু জীব থাকতো, কিন্তু তারা ছাত্রদের রক্ষাকর্তা। ইউনিফর্ম নিয়েও কড়াকড়ির বালাই ছিলো না কারন ফাস্ট প্রিয়ডের আগেই ফুটবল খেলে আমরা আধা -কাদা থাকতাম। সেগুলো শুকিয়ে চড়চড় করে উঠলে টের পাওয়া যেত যে বেল পড়ার দশ মিনিট বাকি আছে।

একটু উঁচু ক্লাশে ক্রিকেট পিচ দখলের লড়াইটা জোলো হয়ে গেলো। তখন জনতার চোখে অনেক স্বপ্ন। একদিকে বিজ্ঞানী হবার হাতছানি, অন্যদিকে উর্মিলা, টুকরো টাকরা মহিলাঘটিত ব্যাথা, দফা ৩০২ - এক কথায় জটিল জীবন এবং ততোধিক জালিম দুনিয়া। ভলিবল পিচে গোল হয়ে বসে বাংলাচটি পড়া হতো, রসময় গুপ্তের লেখা খেলার পুতুল, ডাকাত ছেলে, শিহরন, গুড চান্স, প্রথম সে দিন .....। হেডু ওপর থেকে দেখে ভাবতো ফিজিক্স এর আলোচনা চলছে- সাধে ছেলেগুলো এত ভালো নম্বর নিয়ে আসে। এই একই সময় আমরা একটা অসফল এক্সপেরিমেন্ট করি, কিন্তু সফল হলে আজকের চিকিৎসাজগত আর আজকের মতো থাকতো না। আমরা ফুল-মানুষ প্রায় বানিয়ে ফেলেছিলাম। চটি পড়াকালীন এই আইডিয়া এক বেচারার মাথায় আসে। সে বাড়ি যায় এবং নিজের সাথে বাগানের একটি Ù»£ ফুলের পরাগসংযোগের চেষ্টা করে। নিষেকের পরের কদিন ওর ওপরে আমাদের অনেক আশা ছিলো। কারণ ফুল থেকে ফল হবে এবং তার থেকে একটা জ্যান্ত মুখ বেরিয়ে বাবা বাবা বলে ডাক দেবে এইরকম একটা আইডিয়া ছিলো। তখন টিভিতে হাম দো হামারে দো ক্যামপেনের আÉ¡ডে ছেঁড়া ছাতা আলা একটা লোকের পেছনে বাবা বাবা করে একগাদা আন্ডা বাচ্চা গুড়গুড়ি দৌড় লাগাতো আর লোকটা হতাশ হয়ে বলতো 'এবারে আমার কি হবে?'। সেই কথা ভেবেই সেই মনের কল্পনায় 'উবাচ ফুল-মানুষ'। কিন্তু আমাদের সব আশায় জল ঢেলে হতভাগা দু দিন বাদে মুখ চুন করে বললো ' সালা ফুলটা মরে গেল! '। সমস্ত দোষ ওর ঘাড়ে চাপিয়ে তারপরেও ওকে বলা হল আরো দিন দুই ফুলটাকে ওয়াচে রাখতে। বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না।

নিচু ক্লাশের সাথে উঁচু কাÓশের বাওয়াল হলে সাধারনত: দু ভাবে নি×পত্তি হতো। মারপিট করে আথবা ক্রিকেট/ফুটবল ম্যাচ খেলে। ফুটবলের ক্ষেত্রে নিয়ম ছিলো যে রেফারি থাকবে না আর ক্রিকেটের ক্ষেত্রে গার্ড পরা চলবে না। এরকম একটা ক্রিকেট ম্যাচে আমি একবার ওয়ান ডাউন নেবেছিলাম। ওপেনার পয়লা বলেই শিনে খেয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে বেরিয়ে গেলো। আমি তাড়ু খেলি, ব্যাটে লাগলে হয়তো কিছু রান হলেও হতে পারে। আমার প্রথম বলটা মাথা টিপ করে এলো। বসে পড়ে মাথা বাঁচালাম। পরের বলটা গুড লেংথে পড়ে যা তা যায়গায় লাফিয়ে উঠলো, বাঁচাতে গিয়ে আঙুলে খেলাম। কেমন অবশ মতো হয়ে গেলো। পরেরটা ব্যাটে লাগলো, যতক্ষণে আমি ওদিকে পোঁছেছি লং অনের ফিল্ডার পেরিয়ে চার চারটে রান। ওদিকে আমার ব্যাটের হ্যান্ডেল গড়িয়ে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে। আমিও রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে নারায়ণবাবুর ঘরে চলে গেলাম- 'স্যার একটু ডেটল হবে?' ' হুঁ, দেখবি যেন কেউ সেরকম খারাপ বল না করে '।

ক্লাশের মতো ক্লাশ ছিলো বিমলবাবুর ক্লাশ, কারণ পড়াশুনা হত না। আমরা সমবেতভাবে চিৎকার করতাম। চিৎকারের রকমটা যে সে ধরণের ছিলো না কারণ বিমলবাবু কোন ঘরে পড়াচ্ছেন সেটা সে ঘরের চিৎকার থেকে বোঝা যেত। উনি ক্লাশে ঢুকলেই সকলে মিলে হুুঁউউউউউউউউউ করে মুখ বন্ধ রেখে মৌমাছির মতো শব্দ করতাম। তখন কেউ বলতো স্যার মৌমাছি ঢুকেছে, কেউ পেছন থেকে মিঁয়াও - হালুম - ঘেউ সহযোগে জঙ্গলের পরিবেশ তৈরিতে ব্যস্ত থাকতাম, সিটি পড়ত, টেবিল বাজত (না বাজিয়ে উপায় আছে? টেবিল বাজিয়েই না শ্রীকান্তদা এত বড় গায়ক হল - আমাদের অবশ্য এক যাত্রায় পৃথক ফল!) আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসাবে মোগলি আর টেলস পিন চলত। বিমলবাবু প্রথমে করিস না করিস না বলে শেষে ক্ষেপে উঠে ' কানের গোড়ায় লাথি মারবো ' বলে হতাশ হয়ে চেয়ারে বসে পড়তেন। কখনো স্কেল নিয়ে বেঞ্চির ওপর দিয়ে ছাত্রদের ধাওয়া করতেন, সারা ঘর ময় সেই চু কিৎ কিৎ চলত। কখনো কাউকে বের করে দিলে সে আবার অন্য দরজা দিয়ে টুকি দিয়ে যেত। বিমলবাবু আবার দৌড়োতেন। স্পেশাল এফেক্ট হিসাবে চিৎকারের সাথে আমরা মাঝে মাঝে দরজা জানলা বন্ধ করে ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার করে দিতাম- তাতে শব্দ বেড়ে যেত। জানলা খুললে ওনাকে চেয়ারের ওপর এলানো অবÙথায় পাওয়া যেত, খুব ইচ্ছে করলে কেউ কেউ ঐ সময়ে ওনার জামার হাতা ধরে ঝোলার চেষ্টা করতো।

বিমলবাবু একবার তুহিনের উদ্দেশ্যে লাথি চালিয়েছিলেন। স্পষ্ট দেখা গেলো যে হিন্দি সিনেমার মতো ওনার পাম্পশু পড়া পাখানা তুহিনের পেটের চার ইঞ্চি সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেলো, কিন্তু তুহিন ' স্যার আমাকে মেরে ফেললেন বলে ' শুয়ে কাতরাতে লাগলো, তারপর চুপ হয়ে গেলো। উনি খুব ঘাবড়ে গিয়ে বললেন ' দেখরে, অর কি হলো। ওঠরে তুই, আর মারবো না। জল নিয়ে আয়।' আমরা বললাম 'ও বোধ হয় মরে গেছে স্যার'। 'মরে নাই মরে নাই, জল আন। কারুরে বলিস না কিন্তু কিছু'। পরের ঘন্টায় ইংরিজির ক্লশে সবাই উঠে দাঁড়ালোম, তুহিন উঠলো না। জ্ঞানোতোষবাবু বললেন ' শিক্ষককে সম্মান দিতে উঠে দাঁড়ানোর প্রায়োজন আছে'। আমরা বললাম ' তুহিন পারবে না স্যার, বিমলবাবু তুহিনকে লাথি মেরেছেন'। বিকেলের মধ্যে ঘটনাটা ইস্কুলে রাষ্টÊ হলো, এবং তুহিন এখন ঠিক আছি বলে ফুটবল খেলতে বেরিয়ে গেলো।

বিমলবাবুর ক্লাশে আমরা একবার কাঁকড়া ছেড়েছিলাম। একটা জ্যান্ত কাঁকড়া কিনে আনা হয়েছিলো। উনি আসা মাত্র নাম ডাকার খাতাটা গুপি করে দেওয়া হলো। উনি এদিক ওদিক করছেন ' খাতা দে রে বাবা' বলে, ততক্ষণে ওনার টেবিলে খোলা ইতিহাস বইয়ের ওপর নূর জাহানের মুখে সেটিকে ছাড়া হলো। পেছন ফিরতে ফিরতে দরজা জানলা বন্ধ হয়ে গেলো। বিমলবাবু একগাল হেসে ' ক্যাংড়া দিয়ে আমায় ভয় দেখাতে পারবে না ' বলে সেটার একটা পা ধরে তুলে ছাত্রদের দিকে ছুঁড়ৈ দিলেন। আমাদের ছক ব্যাকফায়ার করলো এবং পুরো প্যান্ডিমোনিয়াম সৃষ্টি হলো। অ¾ধকারের মধ্যে কাঁকড়ার ছিÄভিÄ দেহাং্‌শ উড়ে বেড়াতে লাগলো। টিফিনের আগে জানা গেলো যে আমাদের সেকশানকে এক হপ্তার জন্য সাসপেন্ড করা হবে। আমরা ছুটি ছুটি বলে লাফাতে লাফাতে মাঠে বেরোলাম। বিকেল নাগাদ আবার ঘোষণা এলো যে এটা আমাদের প্রথম মেজর অফেন্স বলে দয়াপূর্বক ক্ষমা করা হচ্ছে। মনটা ভেঙে গেলো।

সেই দিনের মতো আরেকবার চিল্লানো গেছিলো যেদিন বিমলবাবু আর্যসমাজে নারীর স্থান পড়ানো শুরু করেছিলেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেই স্থান নির্ণয়ের দায়িত্ত্ব আমরা নিয়েছিলাম এবং ভারতীয় নারীর অবস্থান বিষয়ে বহু কিছুর অবতারণা করেছিলাম। পরের ঘন্টায় অরূপবাবু জীবনবিজ্ঞান পড়াতে এসে বললেন আমি আর হেডস্যার একটু আগেই দরজার ওপার থেকে আর্যসমাজে নারীর স্থান নিয়ে তোদের বক্তব্য শুনলাম। আমরা বলেছিলাম স্যার আমরা উপক্ষার - প্রত্যেকেই কমবেশি বিষাক্ত। একবার শুভ্রেন্দুবাবুর ইংরিজি ক্লাশটেস্ট চলছে, ট্যামা জিগেশ করলো 'স্যার ছক করবো? '। উনি ভাবলেন ছোকরা টেবিল এঁকে তাতে গ্রামার কষবে, বললেন 'হ্যাঁ ', সেও বই খুলে ডেস্কের মধ্যে যা নামানোর নামিয়ে দিলো।
উনি ভাবলেন ছোকরা টেবিল এঁকে তাতে গ্রামার কষবে, বললেন 'হ্যাঁ ', সেও বই খুলে ডেস্কের মধ্যে মাল নামিয়ে দিলো।এর থেকে এককাঠি ওপরে গেছিলো চোমো কিন্তু চিরকাল মেনটেন করতো যে সেটা নাকি না বুঝে করেছিলো। তাতে কি? পেনিসিলিন কি বাই আÉ¡ক্সিডেন্ট আবিষ্কার হয় নি? হেডুর ক্লাশে তখন আমাদের ভোকাবুলারি বৃদ্ধির জন্য বোর্ডে স্ক্র্যাবল খেলা হতো গ্রুপ ভাগ করে। তা সেদিন চোমোর গ্রুপে এসেছে DEE , আমরা ভাবছি একটা R মেরে হরিণ বানিয়ে দেবে, খেল খতম। তা চোমো লিখলো W! কেউ আর শব্দটা খতম করতে পারে না, ইস্তক হেডু অবধি হাল ছেড়ে বললো ' তুমি ঠিক জানো এরকম শব্দ আছে?'। চোমো বলে হ্যাঁ। শব্দটা ANA দিয়ে শেষ হয়েছিলো এবং ফলস্বরূপ ওকে পত্রপাঠ বের করে দেওয়া হয়। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ওকে টিসির ভয় দেখানো হয়নি সেবার।

বিমলবাবুকে নিয়ে সেরা ঘটনা হয়েছিলো আমাদের আগের বছর। উনি ছেলেদের দিকে খুব রাগ হলে ডাস্টার ছুঁড়তেন। কদাচিৎ সেগুলো ঠিকঠাক টিপে থাকতো, অনেক সময়েই জানলা গলে মাঠে বেরিয়ে যেত। তা উনি এরকম ছুঁ®ড়েছেন, আর সে ছেলে সেটা ক্যাচ লুফে ওনাকে পাল্টা ক্যাচ দিয়েছে। বিমলবাবু ক্রোধে অন্ধ হয়ে ফিরতি ক্যাচ লুফেই সামনের সারিতে কার একটা আঙুল লক্ষ্য করে ডাস্টার ঠুকে দিতে গেছেন। সেও তক্কে তক্কে ছিলো, ঠিক সময়ে সাট করে হাত সরিয়ে নিয়েছে। বিমলবাবু নিজেই নিজের গাঁটে ডাস্টারশুদ্ধ বেঞ্চের ওপর ঠুকে গেছেন আর আঙুলে হেয়ারলাইন ক্র্যাক ধরে গেছে। সে কি অবস্থা - শেষে ছাত্র শিক্ষক ধরাধরি করে ইইডিএফ এ নিয়ে যাওয়া হয়, ওনার পকেট থেকে পয়সা বের করে পেমেন্ট করা হয়, ওনার আঙুলে কদিন ব্যান্ডেজ জড়ানো থাকে এবং উনি ডাস্টার ছোঁড়া প্রায় বন্ধ করে দেন।

বিমলবাবুর আঙুল ভাঙার গল্পটা বলার সাথে একটা ক্যাথার্টিক এফেক্ট হয়। মনে হয় যেন এইটে ছিলো সব্বার সেরা, এরপরের খোরাকগুলো জোলো। অথচ এসব গল্প কেবলমাত্র শুরু হলো। বাংলা বয়েজ স্কুলের গল্প তো কোনোদিন ফুরোয় না। সরস্বতী পুজোর সময় এলাকার ছেলেপিলের সাথে সেই ঝামেলা হলো, ওরা ভেতরে ঢুকে তুহিনকে শাসিয়ে গেলো, রাতে গনিবাবুর স্কুটারে করে তুহিন চুপচাপ পালাচ্ছে, পরদিন সব ভাব, সবাই প্যান্ডেলে, আর আমরা পান্তুয়া পাহারা দেবার নাম করে ব¾ধ ঘরে একটার পর একটা খতম করছি।


লালবাড়ির মধ্যে ভূত ছিলো সেটা বলেছি কি? ভূত ছাড়াও ওখানে তেওয়ারিদা থাকতো। সবসময় একটা গাছের ডাল হাতে স্কুলের বাইরে বসে ছেলেদের ঢুকতে বেরোতে দিতো, কাউকে কোনোদিন মারতে পারলো না, সেই গাছের ডালটা সাঁ সাঁ করে বিমলবাবুর বুটের মতো চার ইঞ্চি দূর দিয়েই চিরকাল চলে গেলো। তেওয়ারিদা মরার পরেও পেনশান পেলো না। ওখানে প্রহÓ¡দদা ঢুকে পড়লো। রাজেনদা (রবিন সিং) এলো, পান্ডেদা গেটের সামনে পাহারা দিতে শুরু করলো আর যোধপুর বাজারে সু¤র করে হনুমান চালিশা চালিয়ে গেলো।

আমাদের মধ্যে থেকে ছেলেপিলেরা এদিক ওদিক ছিটকোতে লাগলাম। টিউকলের হাতল এসে জয়দীপের বুকে লাগলো, জয়দীপ ফিরলো না। আই কিউ মাপার প্রশ্নপত্র ইংরিজিতে লিখে নিয়ে এলো কিছু লোক। ভাষায় কিচ্ছু আসবে যাবে না। পেছন থেকে খোঁচা খেলাম 'বিক্রম, টুইচ মানে কি?' আমিও চিন্তায় ছিলাম, বললাম ' ওটা বোধ হয় টোয়াইস, দুই এর সাথে কি একটা সম্পর্ক আছে, কিন্তু মানেটা জানিনা।' ওরা আমাদের আই কিউ মেপে চলে গেলো। আমরা ফর্ম ফিলাপ করলাম - নেম: বিক্রম পাকড়াশী সেক্স: দিনে দু বার।

ংরিজি পরীক্ষায় টুকতে গিয়ে শুভম ধরা পড়লো। খুব ভয় পেলো, তারপর নিজেকে মেরে ফেললো। আসলে ও পরীক্ষার ভয়ে মরেনি। আরো তো কতজনে কতবার ধরা পড়েছি ভয় পেয়েছি, কই এমন তো কেউ করিনি? ও কি ফুরিয়ে গেছিলো? যাই হোক, ততদিনে আমরা আমাদের কম কম আই কিউ এর নম্বর পেয়ে গেলাম। সে বছর রেকর্ড নাম্বার দেওয়াল পত্রিকা বেরোলো - স্ফুলিঙ্গ। পত্রিকা তার নাম সার্থক করেছিলো দুম করে জ্বলে উঠে দপ করে নিভে গিয়ে।

আমরা ইস্কুল ছাড়ার আগে বেড়াতে গেলাম চন্দননগর, বাÉ¡ন্ডেল। গাড়ির পেছনে ধোয়াঁ উঠছে, খালি সামনের দিকে এসে ওসব করা বারণ। উর্মিলার গানের সাথে অভীক জামা খুলে হেলেনের ঝা না না না নাচ দেখাচ্ছে। নিলয়বাবুকে, উত্তমবাবুকে জোর করে টেনে এনে নাচানো হলো। ইমামবাড়ায় মাংস-ভাত। বাসের দায়িত্ত্বে,, ঘোরার দায়িত্ত্বে ভুষোর বাবা। আমরা ফিরে এসে ভালো করে যাবার আগেই ভুষো নিজেকে মেরে ফেললো, কিন্তু একবারও আগে থেকে কিছু জানালো না।

আমরা এভাবেই ছড়িয়ে গেলাম, ফুরিয়ে গেলাম, এগিয়ে-পিছিয়ে গেলাম। একটা বিশাল আকাশ তৈরি হয়েছিলো, অসম্ভব স্পীডে সেগুলো জ্বলন্ত উল্কাখন্ডের মতো আকাশে দাগ দিতে দিতে মিলিয়ে গেলো, টুইচ মানে যে কি সেটা ভালো করে জানার আগে আকাশটাও আর রইলো না। শেলী মিস ক্লাশ থ্রীতে প্রচণ্ড মারতেন। ওনার স্বামী মারা গেলে একদিন এসে আমাদের সবাইকে একটা একটা করে জিনিস বিলিয়ে দিয়েছিলেন। ' এই ইস্কুলের চার দেওয়ালের মধ্যে তোরা যতদিন থাকবি তোদের কোনো পাপ হবে না।' আমরা হ্যা হ্যা করে হাসলাম। শেলী মিস নাম ধরে ধরে ডাকলেন, ' এই যে ছো– আংটিটা তোকে দিলাম, এটা আমাকে আমার স্বামী দিয়েছিলেন বিয়ের পরে। এই শঙ্খটা আমরা যখন পুরী বেড়াতে গেছিলাম তখন কুড়িয়ে পেয়েছিলাম ......' কিচ্ছু বুঝতে পারিনি আমরা। এইসব গল্পগুলোই আসলে সত্যি। খালি ঐ যেখানটাতে আমরা ছিটকে গেলাম ওটা নেই, ওটা ছিলো না কখনো। আমরা একটা খুব গভীর ঘুমের মধ্যে পড়ে আছি। এখখুনি একটা ছক করবো, ঘুম ভেঙে যাবে। আমরা সবাই এক মুহূর্তের মধ্যে টুইচ শব্দের মানে জেনে যাবো।


( ইন্দÊনীল দাশগুপ্ত ঘসড়ে লেখা ইস্কুলের গপ্পে সব নাম ধাম গুলিয়ে দিলাম ইচ্ছে করে। যাতে পরে যদি কেউ জিগেশ করে আমি সাদাকে লাল বলেছি কি না তাহলে যেন বলতে পারি 'কই না তো!')