আপনার মতামত         


          ডাকিনীতন্ত্র

          ইন্দ্রনীল ঘোষদস্তিদার



এমনটা যে রোজই হবে তার কোন মানে নেই।
কিন্তু আজ সকালে ঝকঝকে রোদ। বার্নলে শহরটা, যেমন হয়, অগোছালো আর গড়িমসি,ঘুম থেকে ওঠেই দেরীতে। কারো কোনো তাড়া তো নেই।
উত্তরদিকে পেন্ডল হিল মাথা নিচু করে দেখছে। বড়সড় বাচ্চার মত, আধপাগলা জেমস যেমন, কিছু একটা দেখলো তো দাঁড়িয়ে গেল অমনি, ঠোঁটের কোণ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে তো পড়ছেই।
রোদ এসে ধুয়ে যাচ্ছে ছককাটা সবুজ মিডো। সাদা-কালো ফুটকিগুলো চরে বেড়ানো গরু আর ভেড়ার পাল।
আলসেমো করে সাড়ে দশটায় ঘুম থেকে উঠে খেয়াল হল গতরাতের পাউরুটির টুকরো-টাকরা গুলো নি:শেষ। হুইটফ্লেক্সের প্যাকেটটা মেঝেয় গড়াগড়ি খাচ্ছে, ঠিক যেখানে আজ্ঞাচক্রের কালির দাগ শুকিয়ে প্রসঙ্গহীন, বুঝভুম্বুল। অগত্যা আইসল্যান্ড।
বেরোতে গিয়ে খেয়াল হল। হ্যা, হালকা লাগছে। ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে দেখি। উঠে যাই নির্ভুল, মাটি ছাড়িয়ে । এই তো, পারছি।
এই দেড়মাস যে কি জ্বরের ঘোরে কেটেছে! নেশা ধরিয়ে দিয়ে কেটে পরা ডেমডাইক বুড়ীকে অগণিত শাপ-শাপান্ত করেছি।
উড়ে গিয়ে বসি টাউনসেন্টারের গির্জের চুড়োতে। ডিউকবার ছাড়িয়ে, থমসন পার্কের ওপরে একপাক ভো-চক্কর মেরে। পায়ের তলা দিয়ে সরে যায় পাকিস্তানী ঘেটো,বেশ্যাখানা, বুলেভার্ড, নশো বছরের পুরনো কবরস্তান।
লোকজন আড়মোড়া ভেঙ্গে চলছে। লাইব্রেরীর সামনে বাচ্চাদের গটরা, খালে একটি অলস নৌকো ও রাজহাঁস। বার্চগাছে শীতের ছোপ পরতে এখনো ঢের দেরী।
গিয়ে দেখি বাথসেবা এই সক্কালবেলায় বসে বসে ঠ্যাং দোলাচ্ছে।পেটটা ঠেলে উঠেছে সামনে, ৮ মাস চলছে বাথসেবার। আমায় দেখে একগাল হাসলো।
হাসলে ওকে কুচ্ছিত দেখায়, অনেকবার বলেছি।সামনের দুটো দাঁত ভাঙ্গা, সেই যেবার গণ আদালত বসল, আর ম্যাজিস্ট্রেটের তোয়াক্কা না করেই চাষীরা হাটুরে কিল মেরে ভেঙ্গে দিল। নাকও তুবড়ে দিয়েছিল।
"ওদের দোষ কি বল',-বাথসেবা গলায় অচেনা ভাঁজ এনে বলেছিল।" হাল-বলদ চাষীর ছেলে-মেয়ের থেকেও প্রিয়।
তোরা শহুরে ছেলেরা এসব বুঝবি না' ।

-----------

এখন ভাবতে গেলে অবাক লাগে। এ তো কোনো করমচা গাছে মাকড়সার রুপোলী জাল নয় , শিশির পড়ে ঝকমক করছে, যে ছুঁলাম, আর জড়িয়ে পরেছি।
প্রথম দেখা তো ডেমডাইক বুড়ীর সঙ্গে। কর্নারশপ থেকে বেড়িয়ে বাড়ির দিকে হাঁটছি, হনহনিয়ে ছুটে এসে অচেনা বুড়ীমানুষ ধাক্কা মারল। বার্নলের গরীব মানুষ যেমন হয়,ফ্রকটাতে চিমটি কাটলেও ময়লা উঠে আসবে।
প্যান্টের ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছি, বুড়ী কি বলে ক্ষমা চাইবে ভেবে পায় না। ওদিকে ওর দুধের বোতলও মেঝেয় পরে গড়াগড়ি,দুধটুধ সব একাকার, চপ্পল ছিটকে পাশেই ডাঁই করে রাখা সব্জির বাক্সের ঠিক মধ্যিখানে। তুর্কী দোকানদার রাগী রাগী রাগী মুখ করে কুড়িয়ে এনে দিল, কিন্তু বিড়বিড়ও করল অনেকক্ষণ ধরে।
তখনই খেয়াল করলাম।ঐ যে চপ্পল ছাড়া পা! দুপায়ের পাতা, যাতে কোন আঙ্গুল নেই, বস্তুত: পায়ের পাতাজোড়াই তো নেই।
কুঁকড়োনো-কোঁচকানো , সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাটবিবর্জিত ক্ষয়াটে দুটো মানুষী পা এসে শেষ হয়েছে নিখুঁত খাঁজওয়ালা ছাগলের খুড়ে।
বিষম খাবো কি খাবো না মনস্থির করতে না পেরে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলাম বৃদ্ধা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।চোখভর্তি বিজবিজে হাসি।
তখন তো উপায় থাকে না কোন, সম্মোহিত লোহাচুড় যেন ফিজিক্স ল্যাবে, যেন নিশিডাক, মাঝরাতের মেল ট্রেন যেভাবে ডেকে নেয় নির্বাচিতকে, পোকারা ঝাঁপায় মাকড়সার রুপোলী জালে, শিশির পড়ে ঝকমকে। গিয়ে বসি থমসন পার্কের কাঠের বেঞ্চিতে।
"কিন্তু মাসী' , লোভী কাঠবেড়ালীটাকে একটা আধখাওয়া বাদাম ছুঁড়ে দিয়ে আমি বলি, "তবে যে লোকজন বলে রাজা জেমসের বিয়ের দিন তোরাই ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট করে ঝড়বৃষ্টি নামিয়েছিলি! এত বৃষ্টি যে জেমসের বিদিশি বৌ আর জাহাজে করে এসে পৌঁছোতেই পারল না!'
বুড়ী ফোকলা দাঁতে হাসে। এ তো সেই বিবিসিতে দেখানো বাঁকাচোরা ডাইনী নই, কিউরিওশপের ঝাঁটাবিলাসী জার্মান সিলভারের পেন্ডলউইচও নয়।
ঠাকুমার কথা মনে পরে যায়, আমি ঠাকুর বলে ডাকতাম।মাসী বলি বটে, বুড়ী নেহাতই চাইল বলে, বয়স তো ওর কম নয়। আমার ঠাকুমারই বয়সী, অন্তত: চেহারায় যদ্দুর যা ছাপ পরেছে।
নইলে দিনক্ষণের হিসেব করতে গেলে তো চিত্তির। বুড়ী নিজেও আর মনে রাখতে পারে না। একবার বলে আড়াইশো, আবার পরক্ষণেই বলে ,"না না, তা কি করে হবে, জন্মালামই তো যেবার গো-মড়কে গ্রীনহেড খামার উচ্ছন্নে গেসল।'
সে হিসেব ধরলে অন্তত: চারশো।
সময়।
সময়ের জলে হাত রেখে ল্যাঙ্কাশায়ারের ডাইনীরা ,ডেমডাইক আর চ্যাটক্স,এলিজাবেথ আর বাথসেবা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। ঐ সরু খাঁড়ি, যা প্রাণরজ্জুর মত ধরে থাকে ল্যাঙ্কাশায়ার-ইয়র্কশায়ারকে, তার তীর ধরে ধরে আমাদের বেঁচে থাকার মৃদুমন্দ হাওয়া উস্কোখুস্কো করে যায় ঐ শনের নুটি কেশজাল।ঠান্ডা ভেজা পেয়ে ফার্ন লতিয়ে উঠেছে, সুড়সুড়িয়ে চলেছে একলা গার্ডেন স্নেল, যারা কচকচ করে বাগানের ফুল-পাতা খাবে, রাক্ষুসে খিদে।

ওরা জল ছুঁলে শীতলতা আসে, জমে যায় খাঁড়ি আর সফট আইসে পড়ে একহার্টের সরু নৌকো ডুবে যায় মাতৃহীন , ছটফটে প্রাণভোমরা জমাট বরফের চাঙ্গরের নীচে, ও একহার্ট, বেলা যে যায়....

---------------

ভোরের হিমেল হাওয়ায় হি হি কাঁপতে থাকি আবছা হয়ে আসা আকাশের নীচে। লাল-সাদা ফুলকাটা চাদরটা মাথায় জড়িয়ে সুজাতা দাঁড়িয়ে আছে, যেন নতুন বৌ। নিউজলপাইগুড়ি শহরে ট্রেন এসে ঢেলে দিয়ে গেছে তাদের- নাও, এবার চড়ে খাওগে। মধুচন্দ্রিমা পোয়াতে এসেছ, নতুন নও জানি, না হয় ৮ মাসের বিয়েই হল, তবু তো মধুচন্দ্রিমা।
ট্রেন আপনমনে বলে।
নাও, এবার পাহাড় ভাঙ্গো, আর শুঁয়োপোকাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে প্রজাপতি করে দাও। আর যত ঝর্না আছে শুকিয়ে ওঠা , তারা সবাই কালিঝোরা হোক, ভোরের প্রথম ফার্ন শিশির পাক।
পাহাড়ী কুকুরগুলোর ঝোলা কান, লোমে ভরা গা, ভুকভুক করে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে রাত্তিরের হিম বাতাস কেটে যে পথ দিয়ে যায়-সুজন তাদের খুব দেখতে পায়। রাস্তার মাঝখানে কিসের জানি তারের খোঁচা বেরিয়ে থাকে, পড়ে থাকে ভাঙ্গা দেশী মদের বোতল, আধখাওয়া আপেল, ডিমের টুকরি। আর পাঁচিলের গায়ে সিনেমার অবোধ পোস্টার, তাদেরো দেখে সুজন, ঝোলা টবের ঘুমচোখ অর্কিড দেখে। কুয়াশাগোলা অন্ধকারে একটি-দুটি আলো টিমটিম দেখে এ পাহাড়ে সে পাহাড়ে। আকাশ ভরা তারা। হাওয়া শন শন।
এই তো ভালো হল-সুজন ভাবে।আকাশে এখনো শুকতারার চোখের কোণ ঘুমের জলে ভেজা, বাসি চাঁদ এখনো রাতপাহারায় ঢুলছে। এই তো কালো পর্দা, ফ্লোরা ইস্কুলের টানা বারান্দা, ইঁটের বারান্দার একদিক ঢাকা পড়েছে যে পর্দাতে, কেননা কালো নইলে ম্যাজিক হয় না-মিস বলেছিলেন, না পাশের ছেলেটা?
কালো পর্দার সামনে কালো ম্যাজিশিয়ান, ও ম্যাজিশিয়ান, তোমার কালো টুপি, টুপির মধ্য থেকে বের করে আনছো তো আনছৈ লাল-নীল-হলদে-সবুজ রুমাল , অথচ রুমালেরা তো ছিল না কোত্থাও এই সোয়াস্তিতে থাকার মহাবিশ্বে।কোথায় কোন কালো গহ্বরের খবর পেয়ে গেলে হে যাদুবাজ, কালো ডান-আমি ও সুজাতা ভাবি অর্থাৎ সুজন ও আমার বউ-যে বেঁচে থাকার শহর কলকাতায় , বড় মানুষের , ঘেয়ো ভিখিরির , গ্যারেজের মিস্তিরির , কলওলা আর মিউনিসিপ্যালিটির জলের লাইন ঠিক করা মানুষের, ছেঁড়া কান পথকুকুরের কলকাতা শহরে এই সব হারিয়ে যাওয়া রঙ্গিন রুমাল নিয়ে আসছো-যাচ্ছো, ফিরি করছো ট্রেনে-বাসে।

এই কৃষ্ণগহ্বর, তার আটকুঠুরির কি সুলুকসন্ধান জানো হে ওঝা, যে ছু বলতেই খুলে যায় আগল, আর গলগলিয়ে বেরিয়ে আসে পুরনো চাবিওলা, শীতের সন্ধ্যের ভাপ-ওঠা হাতে গরম আটার রুটি, ডিহি সুতানুটি ও তার হাফ-আখড়াই, ম্যামথ শিকারের ঘাম আর তাজা রক্ত,গোঙ্গানী, প্রথম শীৎকার, হিমযুগ.....
তাই ভালো হল, ভাবি, এই কালো ভেঙ্গে পাহাড় দেখবো, ভোরের পাহাড়। আর তখনই হুস করে স্টেশনের ঘেরাটোপ শেষ হয়ে যায়, আমরা বেরিয়ে পড়ি খোলা আকাশের নীচে, আমি আর সুজাতা, মধুচন্দ্রিমায় আসা ৮ মাসের পুরনো বর-বৌ। আর আমাদের জন্য ঐ কাকভোরেও হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অচেনা ড্রাইভার, ঐ শীতে। ম্যাজিকের এই শুরু, ভাবি আমি। ও কি রাজবংশী, সুজন ভাবে। ওর অমন হাল্কা মঙ্গোলয়েড ছোঁয়া মুখের গড়ন, ভাঙ্গা চোয়াল, লম্বা পেটানো শরীর, খানিক তোবড়ানো বাঙ্গলাভাষা-ওকে তুমি কোথায় রাখবে বলো তো।
আর এই ভাবনার মেঘ-কুয়াশা ভেঙ্গে গড়িয়ে মহানন্দা অভয়ারণ্য -সেবক রোড পেরিয়ে কার্শিয়াংয়ের লাল তুম্বো গাল স্কুলের ছেলেমেয়ের পাল ছাড়িয়ে জিপ যখন ঘুম ইস্টিশন ছোঁয় ছোঁয়, ছেলেমেয়েদুটো ঘুমিয়ে কাদা। ট্রেনে ঘুম হয় না কি, ধ্যাৎ! সুজাতা বলেছিল। আর এই বলা-কথার স্বত:সিদ্ধতাকে প্রমাণ করতেই যেন না ঘুমিয়ে কাটাল, সুজনকেও ঘুমোতে দিল না একফোঁটা।তার ফল পেলে কি না হাতে-নাতে , বলো।
সূর্য উঠল,রোদে ভেসে গেল পাহাড়, ভোরের প্রথম পাহাড়ী হাওয়ায় কানের লতি বরফকুচি,তোমরা টেরই পেলে না। এই নাকি হানিমুন করতে আসা!
লেপচাজগতে ফোন-টোন সব আছে,বলেছিল মঙ্গোলয়েড ড্রাইভার । পয়সা-কড়ি বুঝে নিয়ে সরু চড়াই পেরিয়ে সে যখন সুখিয়াপোখরির রাস্তা ধরল, তখন হতভম্ব দম্পতিকে মিষ্টি হেসে কেয়ারটেকার যদি জানায়-আপনাদের আসার খবর, কই, পাইনি তো-তখন আকাশভর্তি দোমড়ানো কালো মেঘ যদি সব ল্যান্ডস্কেপ ঢেকে দেয়-দোষ হয় কিছু?
এই যে ল্যান্ডস্কেপ, যার মধ্যে ঢুকে আছে রডোডেনড্রন আর ম্যাগনোলিয়ায় ছাওয়া আস্ত একটা ছোট্ট কেঠো বনবাংলো আর পাইন-সিলভার ফ্লার সমেত জানা-অজানা গাছপালার পরতে পরতে ওঠানামা পাহাড়ের ঢেউ, মায় দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা-তাকে অত সহজে কুয়াশায় মিলিয়ে যেতে দেবে , সুজাতা তেমন মেয়েই নয়। তাই আধঘন্টা পরেই তোমরা ঢুকে পড়েছো ওয়াল টু ওয়াল কার্পেট বিছানো , ফায়ারপ্লেসের ওম-লাগা একতলার একনম্বর ঘরে, যার নামটি, আহা, ম্যাগনোলিয়া।
ম্যাগনোলিয়ারা দুরকমের। সাদা, হালকা, গন্ধওলা আর গন্ধহীন, গোলাপী। পাপড়ি ঝরে পড়ে থাকে তাদের, মোমের মত, বনতল ফুলে ফুলে ঢাকা। আর অজস্র রকমের লাল রং নিয়ে , যেন লাল শাল বিকোতে বসেছে কাশ্মীরি শালওলা, এমন সব রডোডেনড্রন।তাদেরো ফুল ঝরছে তো ঝরছেই।পাপিয়া ডেকে ডেকে মাথা খারাপ করে দেয়,লম্বা লেজ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ভীমরাজ এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে উড়ে যায়, পাহাড়ী ময়নার মত ঝগড়াটী প্রাণী আর দুটি দেখেছে কিনা ভেবে উঠতে পারে না সুজন। আর এসবের মধ্যে মেঘ এসে অনবরত ভিজে হাতে মুছে যায় ওয়াশের ছবি, সময় তবু দাঁড়িয়ে থাকে ক্যাসাবিয়াঙ্কার মত শুন্য ডেকে, সব ঘড়ি কি এখানে গলে পড়ে গেছে? সুজাতা ভাবে।
হ্যা, ঘড়িরা দালির কুয়াশায় ছুমন্তর, এখানে ফোন নেই কোন, পাহাড়চূড়া এমন কেউ নেই যাকে হাসিল করে যীশু সেনগুপ্তের গলায় সুজন বলবে-সিগন্যাল আসছে ! সিগন্যাল। অর্থাৎ ভুল বলে গেছে মঙ্গোলয়েড ড্রাইভার , জেনেবুঝেই হয়তো, এই প্রান্তর ও বিজন জনপদ, যদি এই শব্দবন্ধের মানে হয় কোনো-এরা এই পৃথিবীর কেউ নয়, কোত্থাও নয়। এদের থেকে বেরোয় না কেউ, বেরোয় না কিছু, আলোকরশ্মিটুকুও না। ড্রাইভার ও তার গাড়িখানি বস্তুত: এক অলীক কল্পনা, লেখক যাকে সৃষ্টি করবার বিড়ম্বনায় ফিরিয়ে দিতে চায় এন. জে. পি স্টেশনের বাইরের গাড়ির স্ট্যান্ডে এবং নির্বোধ আত্মতৃপ্তিতে ভাবে মঙ্গোলয়েড গাড়িচালক এতক্ষণে পাই-পয়সা বুঝিয়ে দিচ্ছে অসীম বসু গাড়ীর মালিককে, দুটো হাফ চা, অসীমদা বললো।
তাহলে ঘন হওয়া যাক , জ্যোতি:পুঞ্জের মত, মিলতে চাওয়া দুই নীহারিকার শরীরী সখ্যের মত, মহাবিশ্বে কত অজস্র বিগ ব্যাং ঘটে যায়, সময়ের সৃষ্টি হয় ও অবসান, তারাদের শ্বেত বামন ও লোহিত দানব দশা-কে কার খবর রাখে, সখা, এই তো শরীর জ্বলে যায়, আমি সুজনকে বলি, আর মহাজাগতিক ধূলিরাশি কিম্বা গ্যাসের দলার মত একে-অন্যতে প্রবেশ করি-আমি অর্থাৎ সুজাতা, সুজনে।
আর রাত্রি টুপটুপ করে ঝরে পড়ে। জানালা দিয়ে দেখি দূরের দার্জিলিং পাহাড় আলোয় ঝলমলিয়ে উঠেছে। জানালার বাইরে একলা পাইন শীতে কাঁপতে কাঁপতে আগলে রাখে অন্ধকারের কাঞ্চনজঙ্ঘা। জানালায় ঘন হয়ে জমে আমাদের নি:শ্বাস-প্রশ্বাসের আতপ্ত জলকণা।ছাদের কোণে বসে থাকা মথের পাখা গাঢ় হয় অন্ধকারে, ফায়ারপ্লেসে লাফিয়ে ওঠে কাঠকুটো।
তখন, ঠিক তখনই জানালার বাইরে ওর সাদা , ফ্যাকাশে মুখ দেখতে পাই। জানালার কাচে চেপে ধরা নাকের ডগায় , ঠোঁটের খাঁজে বিন্দু বিন্দু অথির জল। আমাদের তপ্ত শরীরখেলায়, ঘরের আরামে সুজাতাকে ফেলে রেখে, ফিরে আসবার আদৌ কোন প্রতিশ্রুতি না দিয়ে উঠে পড়ি, সুজন টের-ও পায় না। আর অবলীলায় জানালার কাচ ভেদ করে, হেমা গুরুংয়ের বরফঠান্ডা হাত ধরে হাওয়ার মত হু হু করে ভেসে চলি-দুই সখী, সহচরী। অন্ধকারে আমরা একে অন্যকে দেখাই আমাদের মার খেয়ে ফুলে ওঠা দাগড়া দাগড়া পিঠ, চোখের কালশিটে, ভাঙ্গা ডানা, ছেঁড়া পালক, উনুনে ছুঁড়ে ফেলা ৮০০ মিটার দৌড়ের রাজ্য অ্যাথলেটিক্সের সার্টিফিকেট।

---------------




হে অন্ধকারের ধাত্রী ছায়াশরীরী, বেঁচে থাকার ঈশ্বর যে তুমি মৃত্যুতে অধিষ্ঠিত, তোমায় প্রিয় করি। মোচন করো ঐ তোমার অর্গল, খোলো দ্বার, যে দ্বার দিয়ে প্রত্যেক নশ্বরের গতায়ত অবশ্যম্ভাবী। আমাদের প্রিয়জনেরা যারা ঐ দুয়ার পার হয়ে তোমাতে শায়িত, তারা ফিরে আসুক আজ এই দীপালোকে, আনন্দিত হোক আত্মীয়মিলনে-একটি, শুধু একটি ধরিত্রীরাতের জন্য; আর আমরা যারা ভীত, অবনত, যখন সময় আসবে, আহা, সময়, সে তো আসবেই, যেন তোমার আঁধারে, হে প্রিয় জননী শান্তিময়ী, স্নেহদাত্রী, মিলিত হই উল্লসিত, নির্ভয়।
কেননা আমরা জানি ঐ শান্তি ও বিশ্রামে, প্রিয়সঙ্গলাভে আমরা আবার জেগে উঠবো অন্যতর জীবনে, আরো সবল বাহু নিয়ে, সতেজতর মস্তিষ্ক নিয়ে, হে কল্যাণময় পিত:.....

মোমের আলো কাঁপতে থাকে। আমাদের ফিসফিসানি, জড়ানো গলায় মন্ত্রপাঠ ঐ নাদান আলোকশিখাটিকে ঘিরতে থাকে পাকে পাকে, ও কি ভয় পেয়েছে? যেন বেঁধে রাখা ছাগলছানা, মা-হারা, দূরে-অন্ধকারে বাঘের গায়ের গন্ধ পেয়ে কাঁদছে আর্দ্র, চঞ্চল, কেউ তো ছাড়ানোর নেই।
আর আমরা, নয় ডাইনী মিলে ঘিরে বসে থাকি আজ্ঞাচক্র, প্রার্থনাচক্র,সূর্য ও ঋতুচক্র। আগুনে ছুঁড়ে মারি ফুলদল, রাজহাঁসের পালক, ভেড়ার চোখ, নষ্ট শিশুভ্রূণ। আমাদের মন্ত্রশব্দ রাত্রিশব্দ পাক খেয়ে উঠতে থাকে উপরে, আরো উপরে, মহাশুন্যে, মহাব্যোমে, গ্যালাক্সির পর গ্যালাক্সি ছাড়িয়ে অন্যতর বিশ্বে,ওরাঁও বাজনার ছন্দে, যে পাখী ছিল না কোথাও তার গহীন পালকের মুকুটশোভিত প্রার্থনাগীতি, সাবাথতান, যাহাতে জন্মমানুষ ও মৃত্যুমানুষ দুই শিশু খেলা করে সাগরবেলায়, বানায় কাসল, বানায় ভিখিরি রোদ্দুর ও ঘোড়ার নাল।
যেন ঢেউ এসে মুছে দেয় তারে।

--------------



এই গল্পের কোনো শুরু নেই, এর মধ্যে কোনো ঘড়ি কিম্বা যন্ত্রগণক নেই।
শুধু পাথর, পাথর, রাশি রাশি মুন্ডহীন কঙ্কাল পাথর আর তার জিরকোনিয়ামের হৃদপিন্ড।
পাথর, কেননা তাই ছুঁড়ে মারা হবে ইতিহাসের ডাইনীদের। পোড়ানো হবে ডাইনীখোলস, নখ,দাঁত ও নাড়িভুঁড়ি। ডাইনীদের কবর দিতে নেই , কেননা কবরের শেষ মাটিটুকু ছুঁড়ে মানুষজন যখন ঘরে ফিরে যায়, আর যখন রাত নামে, ঘুমের মধ্যে বাচ্চারা যখন কেঁদে ওঠে, গোয়ালের গরুর বাঁট থেকে দুধ খেয়ে যায় গোপন সাপেরা, তখন, ঠিক তখনই, রাতের প্রথম পেঁচার ডাকের সঙ্গে কবরের মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে কঙ্কালসার দুটি হাত ও ঐ হাতে ভর দিয়ে উঠে আসে মুন্ডহীন কবন্ধ ডাকিনীতন্ত্র।
একবগ্গা চাষাড়ে পৃথিবী যাকে আপদ গেছে-ভেবে ঘুমোতে গেল যে যার চেনা নারীর সঙ্গে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে চাষীর খামারে গো-মড়ক লাগিয়ে ,পালে পালে মুরগী ও ভেড়া শুকিয়ে মেরে, ছোট বাচ্চাদের ঘাড়ে ফিট পড়বার পেত্নী লেলিয়ে , গর্ভিণী মেয়ের গর্ভস্রাব ঘটিয়ে তোরা শুধুই সুখে-শান্তিতে থাকবি, বাথসেবা? রাত্তির হলে কান পাতা যাবে না তোদের চিল-চিৎকারে আর খিলখিল হাসিতে, জানালার ফোকড় দিয়ে ছোট্ট ছেলে ভয়ে হিম হয়ে গিয়ে দেখবে, পূর্ণিমার চাঁদের গা বেয়ে উড়ে যাচ্ছে একরাশ কালো কালো বাদুড়ের মত ঝাঁটাবাহন মনিষ্যি-দুনিয়াদারিতে এতই দখল কালো যাদুর?
সেটা হয় না বলেই রাজাকে দিয়ে আমরা লিখিয়ে নিই যাদুবিরোধী বই। ট্রেনে ট্রেনে ঘুরতে থাকে সহজ সেঁকো বিষ আর নিওন আলোয় ভরে ওঠে মাঠ-ঘাট,মহানগর। আমরা আগুন আবিষ্কার করি , পাথর ঘষে চাকা বানাই, স্টিম ইঞ্জিন চালাই। পূর্বদেশে যাই আমরাই, নীল সমুদ্র আর সাদা ফেনার দোহাই দিয়ে । বন কেটে , পাহাড় কেটে হাসিল করি সোয়াস্তি। আগুন জ্বালাই, তিমিরবিনাশী খান্ডবদাহী লেলিহজিহ্ব অগ্নি।

তাই পুড়ে গেলাম-ফোকলা হেসে বলে ডেমডাইক বুড়ী।

----------

একাডেমির গেট দিয়ে ঢুকে পাথরের ফোয়ারার বাঁয়ে মোড় নিয়ে খানিকটা গেলেই একটা অনেককালের কাঠগোলাপ গাছ পড়ে, মনে আছে?
আর তার তলায় সেই কাঠের বেঞ্চিটা, যেখানে শুভাঙ্গর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হল!
এখানটায় একটু বসতে পারি?
হ্যা, বসুন না, বসুন, বলতে বলতে এলিয়ে পরা শান্তিনিকেতনী ব্যাগটা কেঠো বেঞ্চির ওপর থেকে যে সরিয়ে নিচ্ছে, তারই নাম শুভাঙ্গ।
তখনো নাকের তলায় গতরাতের শুকনো রক্তের দাগ মোছা হয় নি। থ্যাঁৎলানো ঠোঁট, মাথার মাঝখানটায় ফুলে ওঠা নীল ঢিপি,উস্কোখুস্কো চুল।শিরায় শিরায় বার্বিচ্যুরেটের বেগুনী ধারা বয়ে গেলে পরে বোধহীন, চেতনহীন জলের অনেক নীচে ডুবে যাওয়া যায়। আর ডুবতে ডুবতে ঝিনুক, বালি, স্কুইড যা পাই ছুঁয়ে যাই, সুজন, ভাবুন তো, আস্ত একখানা প্রবাল দ্বীপ আবিস্কার করার আনন্দ!
চেয়ার-টেবিল-আলমারি-শক্ত মেঝেতে ঠোক্কর লাগে ভাঙ্গা জাহাজসম,ঐ জলতলে। আর নাক বেয়ে গড়িয়ে পরে রক্ত,থেঁতলে যায় ঠোঁট, ফুলে ওঠে মাথার মাঝখানটা।
পরদিন সকাল গড়িয়ে দুপুর নামলে তবে মানুষজন খুঁজে পাবে আপনাকে।
এইভাবে শুভাঙ্গর সঙ্গে প্রথম আলাপ। সার্থক আত্মহত্যা সেরে উঠে আসার পরে একাডেমির কাঠের বেঞ্চিতে বসে আছে যে মৃত মানুষ। একটু আগেই বৃষ্টি থেমে গেছে বলে বেঞ্চিটা তখনো ভেজা। মাটি থেকে ভাপ উঠছে, আর ভেজা গন্ধ।
আর বুড়ো কাঠচাঁপা গাছ থেকে টুপটাপ ঝরে পরছে হলদে-সাদা বৃষ্টিভেজা ফুলেরা। বৃষ্টিতে যাদের গন্ধরেণু ধুয়ে যাওয়ার পরেও থেকে যায় কিছু একলা হওয়া।
অথচ এর আগে তো কতবার একসঙ্গে আমরা কলকাতার রাস্তাঘাটে হেঁটেছি, বাদাম খেয়েছি আর তর্ক করেছি।ওর আবাসনের তিনতলা ফ্ল্যাটে গিয়ে থেকেও তো গেলাম কত রাত্তির। রান্না করে খাওয়াল শুভাঙ্গ, ছোট্টো টেপরেকর্ডারে দেবব্রত বিশ্বাস শোনাল। গহরজান শুনবেন? বলে ঝিকমিকে গলায় মাংসমাখা হাত নিয়ে উঠে এসে কোত্থেকে এক থুথুড়ে রেকর্ড বের করে চাপিয়ে দিল ওর আকবরী প্লেয়ারে।যেখান থেকে হলুদ হয়ে আসা তুলট কাগজ হেন, কিঞ্চিত সানুনাসিক ভানুমতী গলা ভেসে আসছে-ফাঁকি দিয়ে প্রাণের পাখী উড়ে গেল আর এলো না।এতাবৎ মেঝেয় পড়ে থাকা নিÖপ্রাণ রজ্জুরাশিতে তখন প্রাণ জাগছে, শিরশিরে কাঁপুনি জাগছে যেন শীতশেষের ঘুমভাঙ্গা সাপ , খোলস বদলেচ্ছু সরীসৃপ যেন। বলো সখী কোতা যাবো-র অসংস্কৃত উচ্চারণ আর তারপরেই কোতা গেলে পাখী পাবো-র আর্তি , যা একইসঙ্গে হাস্য ও করুণ রসের উদ্রেককারী, যেন সেই চূড়ান্ত কাতান, যাহাতে ধর ও মুন্ড আলাদা হয়ে যায়। নিহত প্রাণীদেহটি শেষবারের মত থরথরিয়ে কাঁপে। রজ্জুখানি উঠে দাঁড়িয়েছে অবলম্বনহীন, টানটান।
এই আখ্যান এমত পারম্পর্যহীনতায়, সময়ের ক্রমকে ছিন্ন করে গড়াতে গড়াতে পাঠকের বিশ্বাসের মাঠ পেরিয়ে এতক্ষণে আশ্রয় পেয়েছে পাশের জঙ্গলে-ভাটফুল, আকন্দ আর ফণিমনসায় আকীর্ণ।যে জঙ্গল থেকে অই হারানো বলটি আর খুঁজে পাওয়ার আশা কম, অসম্ভব বললেও চলে।
কিন্তু স্বপ্নে তো এমন ঘটনা নিয়ম করেই ঘটেই , ঘটতেই থাকে। আমরা প্রশ্নও তুলি না, সন্দেহ করিনা। সুতরাং একাডেমিতে আরো একটি দিনের কথা বলতে বাধা কোথায়, আমার ও শুভাঙ্গর দিন, যখনো, হিসেবমত আমাদের আলাপ হয়নি, কেননা আলাপ তো হতে হবে শেষোক্ত ব্যক্তির আত্মহত্যা ঘটে গেলে পরে।
সেদিনও এমন ঘটনা ঘটতে পারে ভেবে আমি দৌড়ে যাই শুভাঙ্গর ফ্ল্যাটে । এবং কোল্যাপসিবল গেট পাক্কা কুড়ি মিনিট ধাক্কানোর পরেও(শুভাঙ্গর কলিং বেল নেই) কোন উত্তর নেই দেখে আমি যখন লোকজন ডাকার তোড়জোড় করছি, দরজা আধো খুলে যায়। কোটরে বসা চোখ নিয়ে শুভাঙ্গ বলে-ভেতরে আসুন, সুজন।
অনিবার্যতাকে যদ্দুর বিলম্বিত করা যায়, যদি এর মধ্যে রোমিলাদি এসে পৌঁছয়, এই ভেবে আমি ওকে নিয়ে একাডেমিতে আসি। এবং আর কিছু ভেবে না পেয়ে আমারা নন্দনে ঢুকে একটি অখাদ্য হতকুচ্ছিত বাংলা সিনেমা হজম করে বসি। ভালো হতে চাওয়া লাফাঙ্গা নায়ক , নকশালবন্ধু নায়কটি যখন পুলিশের গুলি খেয়ে মরে যাচ্ছে, আর তার বেলুন-ওড়ানো ছেলেবেলা ফিরে আসছে চোখের সামনে, আমি কঠিন গলায় শুভাঙ্গকে জিগ্গেস করি-গার্ডেনাল খেতে গেলেন কেন?
অফিসের ডেস্ক, সিঁড়ি ভাঙ্গার অঙ্ক, টকে যাওয়া দাম্পত্য , ছেলেবেলা আর স্বপ্নে পাওয়া সিরাজ সাঁইয়ের মুখ-এইসব মিলিয়ে-মিশিয়ে ওর মাথার ভেতরে কঠিন জট পাকিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু লক্ষ্য করুন ছেলেবেলা শব্দটি। পরপর দুটি বাক্যে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে ও কি একথাই বোঝাতে চাইছে না যে এই শব্দখেলায় তারও কিছু বলবার আছে?
ছেলেবেলা বলতেই শুভাঙ্গর মনে পড়ে যেদিকে দুচোখ যায় মাঠ, শুধু মাঠের মধ্য দিয়ে ওদের সাঁওতাল প্রজার সঙ্গে মেঠো ইঁদুর ধরতে যাওয়া।রাত হলে চমৎকার আগুন করে ঝলসে খাওয়া হয় ইঁদুরদের , তাতে শুভাঙ্গর উপস্থিতি নেই কোন, কিন্তু হেমন্তের এমন এক রাতে এমনই এক মাঠের মাঝখানে একলা দোতলা বাড়িতে ও থাকবে আরো বছর পঁচিশ বাদে। মেঠো রাস্তা দিয়ে লন্ঠন দুলিয়ে ছায়াটাকে টানতে টানতে কেয়ারটেকার এসে দরজা খুলে দেয়। নিকষ অন্ধকার ও আকাশভরা তারার মাঝখানে হঠাৎ একলা লাগলে অচেনা ফুলের গন্ধ হাওয়ায় ভেসে আসে এক ঝলক। দূরে সিংহের গর্জন শোনা যায়।
স্বপ্ন নয়, কেননা সেই রাতে গঞ্জের মাঠে সার্কাসপার্টির শোয়ে কোলকুঁজো, বেঁটে ক্লাউন, ফুর্তিবাজ শিম্পাঞ্জি ও স্বল্পবসনা জিমন্যাস্টদের সঙ্গে একটি রুগ্ন কিন্তু নিশ্চিত সিংহকেও দেখতে পেয়ে গাঁ-মফ:স্বলের দর্শকরা চরম আমোদিত হয়েছিল।

------------

এভাবে বেশীদূর আর চালানো যাবে না এই লেখা।
কেননা বাথসেবা নেই হাতের কাছে। লেখাটা ছিল এক যুগ্ম প্রকল্প, আমার আর বাথসেবার। ও খুঁজে খুঁজে আনত শব্দ, দাঁড়ি আর কমা, কাঠকুটো, শুকনো পাতা আর জমা করত মেঝেতে। আর আমি, অস্থির, সময় নেই বলে ঐ শব্দস্তূপে হাত ডুবিয়ে যা উঠে আসত তাই ছুঁড়ে মারতাম ক্যানভাসে। কোনোটা গিয়ে পড়তো ফ্রেমের মাঝখানে,কোনটা উড়ে যেতো , ঝরে যেত, আমরা খেয়াল করতাম নাকি? এইভাবে যদি হয়ে ওঠে কিছু না-হওয়া-ভাবতাম।
কিন্তু এখন তো বাথসেবা নেই।ওর ব্যথা উঠেছে।
আমাদের পুইয়ে পাওয়া,ক্ষয়ে আসা ডাইনীগোষ্ঠীতে বহু, বহু যুগ বাদে নতুন শিশু জন্মাবে।
তাই সবাই খুব ব্যস্ত। টেলিভিশন ক্যামেরা,মাইক্রোফোন, খাতা হাতে ,পেন হাতে , টেপরেকর্ডার হাতে সাংবাদিক, ডিজিট্যাল ক্যামেরা হাতে সাংবাদিক। ফ্ল্যাশবাল্বেরা, ক্যামকর্ডাররা, রিফ্লেক্টররা। কাচের ঘরের মানুষেরা, ভাতঘুমের গিন্নি আর পানওলা, ঠেলাওলা, রকের ছেলেরা। গানের ক্লাশের মেয়েরা।
কড়া আলোর নীচে ডাইনী মায়ের উদোম পেটের তালে তালে ওঠা-পড়া, যন্ত্রণা-গোঙ্গানি-মিউকাস-রক্ত-মিউকাস-গর্ভফুল আর শিশুর প্রথম কান্না, নীল হয়ে ওঠা শিরা, সমবেত ডাকিনী সঙ্গীতের রিচ্যুয়াল, নবজাতকের দীক্ষাস্নান চেটেপুটে খাবে কোটি কোটি চোখ।
বুড়ো বয়সে প্রেমপত্র, অ্যা, বলে কে যেন হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নেয় চিঠির তোড়া আর তারপর হাতে হাতে ঘুরতে থাকে ঘুরতেই থাকে, ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে ভুল বানান কেটে দেন প্রভাতবাবু, লেখেন-আবেগ বর্জনীয়, ক্লাশশুদ্ধ ছেলে হেসে ওঠে, বাজারশুদ্ধ, এই তুই নাকি লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লিখিস-বলে, আর ঘাইহরিণীও বলে, হিসেবের খাতা গানে ভরে ওঠে তা-ও, আর চেনা অচেনা মানুষজন পাথর বলে, আগুন আর গজাল বলে, আর ধাতুর আঙ্গুলে অন্ত্র থেকে , অক্ষিকোটর থেকে, হৃদয়ের গভীররজনী থেকে খুঁটে নেয় শেষতম অন্ধকারবিন্দু।
বাথসেবা কাঁদে। চীৎকার করে গালি দেয়, শাপশাপান্ত করে যন্ত্রনায়।

ঝরঝরে দিকুভাষায় সরাসরি দূরদর্শন সম্প্রচার চলতে থাকে অবিরাম।

............ কেননা এমনটা যে রোজই হবে তার কোনো মানে নেই।