আপনার মতামত         


প্রতিটি ইহুদিরই নাকি একটি নিজস্ব ইজরায়েল আছে, প্রতিটি ভারতীয়ের যেমন আছে একটি নিজস্ব পাকিস্তান। সেভাবেই, প্রতিটি প্রজন্মেরই একেকটি নিজস্ব সত্তর দশক আছে। নিজের সত্তর নিয়ে লিখছেন তীর্থঙ্কর দাশগুপ্ত।


           আমার সত্তর, সত্তরের রূপকথা

          তীর্থঙ্কর দাশগুপ্ত


আমি রক্তঝরা সত্তর দেখিনি। বোমা ফাটার বজ্রনির্ঘোষ শুনিনি। পিস্তলের ধমক শুনিনি। ঝলসে ওঠা ভোজালি দেখিনি। বন্দুকের নলের মুখে একটা প্রজন্মের স্বপ্নকে গুঁঁড়িয়ে যেতে দেখিনি। সত্তর দশকের শেষ পাঁচ-ছয় বছর আমার একান্ত নিজের সত্তর, আমার শৈশবের সত্তর, যে সত্তরে আছে নিরুপদ্রব ছোট্ট শান্ত মফ:স্বল শহরে সুন্দর বাঁধানো গঙ্গার ঘাটে বাবা-মা'র মাঝে বসে নৌকা দেখা, শীতের দুপুরে বাবার হাত ধরে মেরীর মাঠে দেশবন্ধু-জুপিটারের ক্রিকেট ম্যাচ, রাস্তা দিয়ে হেঁকে যাওয়া "মিনিবয়' আইসক্রীমের গাড়ী, দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী, এইচ এম ভি'র শারদ অর্ঘ্য, শ্রাবন্তী মজুমদারের গলায় বিবিধভারতীতে অজস্র জিঙ্গল।

"এসে গেছে দিগ্বিজয়ী ডেনড্রাইট
ভাঙতে সে জানে না, জানে শুধু জুড়তে
একবার জুড়ে গেলে খুলবে না কিছুতেই
ভাঙুক না খেলার পুতুল, কাঠের তৈরী ফার্নিচার, কিংবা প্লাস্টিক
ভাঙা সংসার ছাড়া সবই আর জুড়ে দেবে দিগ্বিজয়ী ডেনড্রাইট'।

আমার সত্তরে আছে রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদের মৃত্যুতে স্কুল ছুটি ও কোর্টের মাথায় অর্ধনমিত জাতীয় পতাকা, আছে আনন্দবাজারের ফ্রন্টপেজে ছবি দেখে মোরারজী দেশাই ও জ্যোতি বসুকে চেনা। সন্ত্রাসের, হানাহানির, বেয়নেটের, হাজার চুরাশির মায়ের চোখের জলে ভেজা সেই সত্তর কি আদৌ ছিল? সেকি শুধুই দীপ্তেনের রূপকথা ? যা পি সি সরকারের ইন্দ্রজালে বেমালুম গায়েব হয়ে গেল সত্তরের শেষভাগে? আমার দেখা সত্তরে? নাকি তারুণ্যের খান খান হয়ে যাওয়া সেই স্বপ্নকে দিগ্বিজয়ী ডেনড্রাইট আঠা দিয়ে জোড়াতাড়া দিয়ে তাকে নতুন প্রজন্মের পাতে ঢেলে দেওয়া হল?

লুঙ্গি পরে বাজারে যাওয়া ছা-পোষা স্কুলমাস্টারের ছেলে ভর্তি হয়েছে কনভেন্ট স্কুলে। নতুন প্রজন্মকে চালাকচতুর ঝকমকে বানাবার পোক্ত ভিত। বাড়ী ফিরে বাবা-মা'কে বন্ধুদের নামগুলো বলি, "চ্যামেন চেকার, টনি ম্যান'। সবাই খুব খুশি, একেবারে খাস সাহেবি ইশকুল বলে কথা! পরে জানা গেল কেরালাইট মিসের উচ্চারণ আর আমার চার বছরের অনভ্যস্ত কানের শ্রবণশক্তি মিলেমিশে তন্ময়কে বানিয়েছে টনি ম্যান, হিমাংশু শেখরকে চ্যামেন চেকার। আবছা আবছা মনে পড়ে সেন্ট জোসেফ্‌স্‌ কনভেন্টের চার্চের মিষ্টি ঘন্টাধ্বনি, খুব বুড়ো হয়ে যাওয়া এক সাহেব পিয়ানো বাজিয়ে গান শেখাচ্ছেন "দা হেভেন্‌স্‌ আর ব্লু প্রোক্লেইমিং টু ইউ দা গ্লোরি অফ গড দা ক্রিয়েটর'। এখনও মনে আছে ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় সদ্য রিলিজ হওয়া শোলে দেখে এসে দেবনিক আর রাজীবের সে কি উত্তেজনা! একজন জয় আর একজন বীরু সেজে পেটাবার জন্য একটা যুতসই গব্বর সিং খুঁজছিল। রাজীব আবার 'এ' সেকশনের ডাঁটিয়াল মিঠু মুখার্জীকে দেখিয়ে বলেছিল "শি ইজ মাই বাসন্তী'।

সেন্ট জোসেফ্‌স্‌-এ ক্লাস ফোর থেকে ছেলেদের আর প্রবেশাধিকার নেই। তাই চলে এসেছি অন্য স্কুলে, এটাও ইংরাজী মাধ্যম বলে লোকে জানে - তফাৎ একটাই, স্যার আর দিদিমণিরা দিশী সাহেব-মেম, ক্লাসে পড়িয়ে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন "ডু ইউ ক্লিয়ার?' রাজ্যে এবং দেশে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। মোরারজী সবে হয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। একদিন স্কুলে ঢুকতেই রঞ্জন, শম্ভু, প্রদীপদের একটা বিরাট দলের সামনাসামনি "তুই কংগ্রেস না জনতা পার্টি?' কংগ্রেস নামটাই বেশি ভালো লাগত, যেই না বলেছি "কংগ্রেস', অমনি টারজানের মত "হো-ও-ও-' চিৎকার - "আয় আমাদের সঙ্গে'। নতুন "পার্টি-পার্টি' খেলায় সামিল হয়ে আট বছর বয়সী কংগ্রেসীদের সঙ্গে হাতে আঁকা তেরঙ্গা পতাকা নিয়ে ঘুরছি, সামনে তপন। এবার আমি দলীয় মুখপাত্র হয়ে যেই না জিজ্ঞেস করেছি "কংগ্রেস না জনতা পার্টি?', অমনি তপন কঠিন মুখে বলেছিল, "আমি নকশাল'। নকশাল! এই নামটাও বেশ লাগল, ভাবছি দল বদলে নকশাল হব কিনা, এমন সময় তপনের পাড়ার ছেলে সবজান্তা প্রসেনজিৎ আমাকে চুপি চুপি বলল "কাউকে বলিস না, তপনের কাকা নকশাল করত, পুলিশ নাকি মেরে ফেলেছিল - মার কাছে শুনেছি'। আট বছর বয়সে আমার অভিধানে একটা নতুন শব্দের প্রবেশ ঘটল। নকশাল! তাদের পুলিশ মারে? মারত? কেন? তারা কি ডাকাত?

উনিশশো সাতাত্তরের জুন বা জুলাই মাস। কানুকাকুদের বাড়ীর ছোট্ট বসবার ঘরখানায় সাদা-কালো টেলিভিস্টা টিভি'র সামনে প্রবল ভীড়। মিহির বসুর দুরন্ত শট বিশ্বজিৎ দাসের হাত এড়িয়ে মোহনবাগানের জালে আছড়ে পড়তেই ঘর ফেটে পড়ল ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের চিৎকারে। পিন্টু চৌধুরীর ফ্রিকিক মোহনবাগানের কফিনে পেরেক পুঁতে দেবার পর এক কোণে ম্লানমুখে বসে থাকা কেতোকাকুকে ঘিরে দীপুকাকু আর রামুকাকুর সে কি নৃত্য! আট বছর বয়সে আমার দেখা প্রথম ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ।

দীপুকাকু একটা পা টেনে চলত, দুষ্টু লোকেরা নাকি খুব মেরে পা-টা ভেঙে দিয়েছিল। রামুকাকু একবার বাড়ীর সামনে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে ছিল, দেখেছিলাম পেটে একটা বিশ্রী দেখতে বিরাট কাটার দাগ। বাবাকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম অনেকদিন আগে ডাকাতরা নাকি ছুরি মেরেছিল। আমার হাতে তখন একটাকা দামের চকচকে টিনের পিস্তলে ভরা ক্যাপের রীল - ওসব ছুরিওয়ালা ডাকাত-ফাকাত - ফু:! অনেক পরে জেনেছি দীপুকাকুর পা ভেঙ্গে দেওয়া "দুষ্টু লোকগুলো' ছিল একাত্তরের পুলিশ। রামুকাকুর পেটে ছুরি মারা ডাকাতের পরিচয়ও আর অজানা নেই।

আমাদের বাড়ীর একটা ছোট্ট আট-বাই-আট ঘরে থাকতেন আমার মেজোকাকা, আমরা বলতাম লালকাকা। এল আই সি-র এজেন্ট ছিলেন, তবে কাজের ব্যাপারে ঘোরাঘুরি খুব কমই করতে দেখেছি তাঁকে। রোজগার ছিল সামান্যই। দিনের বেশিরভাগ সময়ই কাকা কাটাতেন ঐ ছোট্ট ঘরে, স্রেফ বই বা আনন্দবাজার পড়ে আর রেডিওতে খেলার ধারাবিবরণী শুনে। একখানা কালো ব্যাগে অফিসের কাগজপত্র, কয়েকটা বই, গোটা দুয়েক করে শার্ট-প্যান্ট আর একখানা বহু পুরোনো সাইকেল ছাড়া ব্যক্তিগত জিনিস বলতে প্রায় কিছুই ছিল না।

অসম্ভব ভীতু প্রকৃতির মানুষ ছিলেন লালকাকা। ঠান্ডা লেগে যাবার ভয়ে প্রবল গ্রীষ্মে জানলা বন্ধ করে ফ্যান না চালিয়ে শুয়ে থাকতেন, শীতকালে কুয়াশা দেখলে ছাতা মাথায় দিয়ে বেরোতেন, পাশের বাড়ীর পোষা কুকুর এলসাকে দেখলে মুখ হয়ে যেত ছাইয়ের মত সাদা। শুধু ফুটবল খেলার ধারাবিবরণী শুনতে শুনতে ইস্টবেঙ্গলের ফরোয়ার্ডরা গোল মিস করলে তাঁকে "শূয়ার' বলে চেঁচিয়ে উঠতে শুনেছি।

একবার আমাদের বাড়ীতে চোর এসেছিল। ঠাকুমা সময়মত টের পেয়ে হাঁক দিয়ে ওঠাতে চোর বিশেষ কিছু না নিয়েই পগার পার। প্রবল হৈ চে, সবাই উঠে পড়েছে, পাড়ার কিছু লোকও জড় হয়ে গেছে। সকলেরই ধারণা চোর সিঁড়ি বেয়ে উঠে চিলেকোঠার ঘরে লুকিয়ে আছে। লালকাকা আর ফুলকাকা খুবই বীরত্বব্যঞ্জক ভঙ্গীতে আমার ক্রিকেট খেলার দুটো স্টাম্প হাতে সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আস্ফালন করছেন। ফুলকাকা যেই মিহি গলায় যথাসম্ভব হুংকার দিয়ে বলেছেন "এই কে আছো ওপরে, এক্ষুনি নেমে এসো', অমনি লালকাকা ততোধিক জোরে চেঁচিয়ে বললেন "খবর্দার নামবে না। যেখানে আছো, সেখানেই থাকো!'

আর একবার মাঝরাতে ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা কাগজের শব্দ শুনে "ঘরে বাঁদর ঢুকেছে' বলে ভয়ানক চেঁচামেচি করে সবার আত্মারাম খাঁচাছাড়া করে দিয়েছিলেন লালকাকা। আসলে আমাদের পাশের বাড়ীর লালটুরা শখ করে একটা ছোট বাঁদর পুষেছিল। সেটা ওদের বাড়ীর বারান্দায় বাঁধা থাকত আর কিচিরমিচির করত। বাঁদরটা অতর্কিতে একদিন আমাদের ঘরে হানা দিয়ে পারে, লালকাকার মনে তিল তিল করে পুঞ্জীভূত সেই ভীতির ম্যানিফেস্টেশন ছিল ঐ নিশুতিরাতের আর্তনাদ।

উনসত্তর সালে এই লালকাকাই নাকি ঝোলায় রেডবুক নিয়ে মেদিনীপুর-বীরভূম-বর্ধমানের গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। ফিরতেন কোনোদিন গভীর রাতে, দুটি ভাত খেয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই আবার উধাও হয়ে যেতেন। একবার মা'র হাতে পার্টির ম্যানিফেস্টো সমেত নিষিদ্ধ কাগজপত্রের একটা প্যাকেট তুলে দিয়ে বলেছিলেন "আমায় ওরা ধরলে এলো পুড়িয়ে ফেলো'।

বাবাকে থানায় নিয়ে গিয়ে ওসি মিষ্টি হেসে বলেছিলেন "সবে বাবা হয়েছেন আপনি, স্ত্রী-পুত্রের নিরাপত্তার কথা ভেবে ভাইটিকে একটু সামলান না মশাই!' ইতিমধ্যে ডাকযোগে লালকাকার নামে সরকারী চাকরীর নিয়োগপত্র এসে পৌঁছেছে। দাদু, বাবা ও জ্যেঠুর সামনেই সেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার ছিঁড়ে ফেলেছিলেন কাকা, "দেশের কাজে জীবন উৎসর্গ করছি, বিনিময়ে তোমরা কি আমায় দুমুঠো খেতে দিতে পারবে না?'

লালকাকা শেষপর্যন্ত পুলিশের হাতে ধরা পড়েননি। নিজেকে অনেক গুটিয়েও নিয়েছিলেন। খুব সম্ভবত: স্কুলের হেডমাস্টার "শ্রেণীশত্রু' জ্যাঠামশাইয়ের "মুন্ডু চাই' পোস্টার দেখে দাদু অসুস্থ হয়ে পড়ার পর। চাকরিও আর পাননি। কলেজজীবনের বন্ধুরা যখন সকলেই সুখে চাকরিবাকরি ও সংসার করছে, তখন কাকা সেই এক চিলতে ঘরে খালি গায়ে সবুজ লুঙ্গি পরে বসে সারাদিন একা একা কি ভাবতেন কে জানে!

উনিশশো আট্টাত্তরে পূজোর ঠিক আগে ভয়ানক বন্যা হল পশ্চিমবঙ্গে। হাজার হাজার মানুষ বানভাসি হল। আমরা অবশ্য নাগরিক জীবনের নিশ্চিন্ত নিরাপত্তায় থেকে সে ভয়াবহতার ছবি দেখলাম খবরের কাগজে। পূজোয় শ্রাবন্তী মজুমদার ভূপিন্দর সিং-এর সঙ্গে টেলিফোনিক প্রেমের ওপর একটা ডুয়েট গান গাইলেন। মান্না দে গাইলেন "সে আমার ছোট বোন'। আমার এক দাদু গানের প্রথম লাইনকে ভুলক্রমে "সে আমার ছোট বৌ' শুনে বাঙালীর সাংস্কৃতিক ও সার্বিক অধ:পতন নিয়ে খুব বিচলিত হয়ে পড়লেন। শীত পড়তে না পড়তেই আলভিন কালীচরণ ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে ভারতে এলেন ছটি টেস্টম্যাচ খেলতে।

তখন শীতের ছুটি থাকত পাক্কা দেড় মাস। দুপুরবেলায় বারান্দায় রোদে বসে কমলালেবু খেতে খেতে রেডিওতে ইডেন টেস্টের ধারাবিবরণী শুনছি। বিশেষজ্ঞ কার্তিক বসু ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক সম্পর্কে বললেন "ও শালাকে না হঠালে ভারতের কোন আশা নেই'। বিষেণ সিং বেদীর স্লিপে দাঁড়িয়ে ক্যাচ মিস করা প্রসঙ্গে বলেছিলেন "ওটা আর বোলার নেই - রোলার হয়ে গেছে, ভুঁড়ির ওপর বলটা এসে পড়ল আর ধরতে পারল না!' পরদিন কাগজে হৈ হৈ। প্রতিবেদনের হেডিং " খেলোয়াড়দের সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ভাষ্যকারের অবমাননাকর মন্তব্য'। কার্তিক বসু এর পর আর ধারাবিবরণী দেবার সুযোগ পাননি। তখনও বাড়ীতে টিভি আসেনি, শেষদিনের রোমাঞ্চকর খেলা কানুকাকুদের বাড়ীতেই দেখেছিলাম - কারসন ঘাউড়ির অনবদ্য বোলিং সত্ত্বেও শেষ উইকেটটা কিছুতেই নেওয়া গেল না, ভারতের মুঠো থেকে ফসকে গেল নিশ্চিত জয়।

ব্যান্ডেল বা বর্ধমান লোকালে চেপে কলকাতায় যেতাম মাঝেমধ্যে। একটা জানলার ধার পেলে অনিচ্ছা সত্তেও ভাইকেই বসতে দিতে হত। দুটো পেলে তো আর কথাই নেই। শ্রীরামপুর স্টেশনের ডাউন প্ল্যাটফর্মে একটা মহুয়া গাছ ছিল। সেই গাছটা দেখেই কবি অরুণ চক্রবর্তী লিখেছিলেন "হাই দ্যাখো গ, তু ইখানে কেনে / অ তুই লালপাহাড়ীর দ্যাশে যা / রাঙামাটির দ্যাশে যা / হেথাক তুকে মানিছে নাই গ / ইক্কেবারে মানাইছে নাই গ।'

একমুখ দাড়ি ছিল অরুণ চক্রবর্তীর। বেঁটেখাটো, মোটাসোটা, হাসিখুশি - ঠিক যেন সান্টা ক্লস। বাঁকুড়ার এক অখ্যাত পল্লীগীতি গায়ক সুভাষ চক্রবর্তীর গাওয়া "লালপাহাড়ীর দ্যাশে যা'র রেকর্ড বেরোলো ইনরেকো থেকে, উন-আশির পূজোয়। খুব জনপ্রিয় হয়েছিল রেকর্ডটি। ততদিনে সেই মহুয়া গাছটা প্ল্যাটফর্মে আর নেই। ট্রেনের জানলা দিয়ে তাকালে স্টেশনের দেওয়ালে মুগুর ছাপ অজন্তা হাওয়াইয়ের বিজ্ঞাপনের পাশেই আসন্ন লোকসভা নির্বাচন উপলক্ষে "সত্তরের সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী অমুক পার্টিকে একটি ভোটও দেবেন না' গোছের প্রচার চোখে পড়ত। সত্তরের সন্ত্রাস তখন ভোটের দেয়াল লিখন।

এসবের মধ্যেই কেমন করে জানি সত্তরের দশক থেকে ঢুকে গেলাম আশিতে। বাড়ীর ছাতে টিভি'র অ্যান্টেনা বসল। রোজ সন্ধ্যা সাড়ে ছ'টা থেকে সাড়ে ন'টা - তিনঘন্টার নন-স্টপ বিনোদন। মঙ্গলবার চিচিং ফাঁক, বৃহস্পতিবার হরে কর কমবা, শুক্রবার স্পোর্টস স্পেশ্যাল, শনি-রবি হিন্দী-বাংলা ছায়াছবি।

তবে আকাশবাণীর প্রতাপকে তখনও ক্ষুণ্ন করতে পারেনি দূরদর্শনের সেই তিনঘন্টাব্যপী বিনোদন। বিবিধভারতীতে সকাল সাড়ে ছটায় বাংলা গানের অনুষ্ঠান বর্ণালী। সাড়ে সাতটায় হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ভিত্তিক হিন্দী ছায়াছবির গান নিয়ে জবরদস্ত অনুষ্ঠান "সঙ্গীত সরিতা' শুনে নানা রাগের চলন শেখা যেত। জানা যেত কিভাবে ভূপালী রাগের শুদ্ধ গান্ধারের জায়গায় কোমল লাগালেই তার প্রোফাইল সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে শিবরঞ্জনী হয়ে যায়। শনিবারের ঝিম ধরা দুপুরে আবার শ্রাবন্তী মজুমদার, "মাথার ঘন চুল যখন মরুভূমি হয়ে যায়'। নারায়ণ দেবনাথ ইতিমধ্যে নন্টে-ফন্টে-কেল্টুকে দিয়ে তৈরী করিয়েছেন "টাকের দুশমন'। কলকাতা ক-এ রবিবার দুপুরে আধুনিক গানের অনুরোধের আসর, হারানো দিনের গান, শুক্রবার রাতের নাটক। বিকেলে ফুটবলের ধারাবিবরণী "পোসান্তো ব্যানার্জী শট নিলো, বল গোলের বাইরে চলে গেলেন' কিংবা উদাস হয়ে স্মৃতিচারণ করতে করতে হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলেন অজয় বসু, "এসব বলতে বলতে বোধহয় গোল হয়ে গেল - কে গোল করলেন সুকুমার?' ওদিকে পাল্লা দিয়ে চৈতালী দাশপ্ত'র ঘোষণা - "এই শ্‌শ্‌ষনিবারের বাংলা ছায়াছবি শ্‌শ্‌ষপ্তপদী'। ছোটপর্দায় বেশ কয়েকবার উত্তম-সুচিত্রাকে মালাবদল করতে দেখার পরেই জানলাম আমাদের স্কুলের অলকেশ স্যার আর পলি মিস পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হতে চলেছেন।

ক্লাস এইটে উঠেছি। হাফ প্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট। একটু একটু গোঁফের রেখা ওঠা ইন্দ্রজিৎ-রূপক-অভিষেকরা ডেস্কের তলায় লুকিয়ে আনন্দলোক আরও কি কি সব মেয়েদের ছবিওয়ালা বই পড়তে শুরু করেছে; দেখতে চাইলে তাড়িয়ে দিত "গুড বয়দের এসব দেখতে নেই' বলে। অনুভব করতাম, কি একটা গূঢ় রহস্যের চাবিকাঠি যেন ওদের হাতে এসে গেছে, সেই গুহ্য তত্ত্বের প্রহেলিকামূলক অভিব্যক্তিলোর মর্মার্থ আমি অনুধাবন করতে পারছি না। ইন্দ্রজিৎ একদিন দুই হাতের আঙুলের সাহায্যে নাচের মুদ্রার মত একটা কিছু দেখাচ্ছিল, আর বাকিরা উল্লাসে ফেটে পড়ছিল। বুঝিয়ে দেবার জন্য অনেক অনুনয়-বিনয় করার পর সন্দীপ বলেছিল, "তুই কি পাবলিক মাইরি! এটাও বুঝিস না! আরে, অলকেশ স্যার আর পলি মিস, বুঝলি না!' না বুঝেই খুব হেসেছিলাম সেদিন। আনস্মার্ট প্রতিপন্ন হবার ভয়ে। বেশ কিছুদিন পর্যন্ত একটা ধারণা ছিল ইন্দ্রজিতের দেখানো ঐ মুদ্রাগুলো বিয়ের অনুষ্ঠানের অঙ্গ।

এভাবে কাউকে বোঝানো যায় না। আবার বোঝাতে হয়ও না। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই একদিন ঠোঁটের ওপর দেখা দেয় কচি রোমের রেখা, পাড়ার যে কেয়া-জয়াদের সঙ্গে এতদিন খুনসুটি ও খেলাধূলো তাদের সামনে বেরোতে গেলে দু-তিনবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা ঠিক করে নিতে ইচ্ছা করে, আনন্দলোকের পাতায় সত্যম্‌-শিবম্‌-সুন্দরম ছবিতে ঝর্ণায় স্নানরতা জীনাত আমনের স্টিল ছবি দেখলে শরীরে দ্রিমি দ্রিমি মাদল বেজে ওঠে, রক্তে পাগলা ঘোড়ারা দাপাদাপি করতে থাকে।

সেই বয়:সন্ধিতে আবার সত্তর। সমরেশ মজুমদারের কালপুরুষ। তখন ক্লাস টেনে পড়ি। দেশে ধারাবাহিকভাবে বেরোতে শুরু করল "কালপুরুষ'। পাশের বাড়ীর ভাস্বতীদি একদিন কথাপ্রসঙ্গে বলল "উত্তরাধিকার আর কালবেলা পড়েছ? ঐ দুটো উপন্যাস না পড়ে থাকলে কালপুরুষটা ঠিক জমবে না'।

পড়ে ফেললাম দুটোই। প্রায় এক নি:শ্বাসে। তখন বাস্তবিকই রাস্তা দিয়ে দলবেঁধে নীল-সাদা শাড়ী পরা স্কুলের মেয়েদের চলে যেতে দেখলে শব্দহীন সাইরেন বেজে ওঠে বুকের মধ্যে। সেই রোম্যান্টিকতার বাগিচায় ঢুকে পড়ল অনিমেষ, তার রম্ভা-ঊর্বশী-নীলা এবং অবশ্যই মাধবীলতাকে নিয়ে। সেই সময় পর্যন্ত রাজনীতিতে আগ্রহ অতি সামান্য, খবরের কাগজে খেলার পাতা ছাড়া আর কিছুই তেমন মন দিয়ে পড়ি না। সুহাস-বিমানদের সাথে অনিমেষের রাজনৈতিক আলোচনার বিবরণগুলো ভারী নীরস লাগত, পাতাগুলো না পড়েই উল্টে দিতাম; ফলে একটি সাধারণ উত্তরবঙ্গের ছেলের কংগ্রেস থেকে বাম এবং বাম থেকে নকশাল হয়ে ওঠার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটা কিছুটা অধরাই থেকে গেছিল। তবে কালবেলা উপন্যাসের শেষপর্বে অনিমেষ ও তার সঙ্গীসাথীদের ওপর পাশবিক পুলিশী অত্যাচারের বিবরণ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি; রোম্যান্স ও ভায়োলেন্সই তো চিত্রনাট্যে দর্শক টানার প্রধান উপাদান!

আমাদের পাড়ায় একেবারে মোড়ের মাথার বাড়ীতে থাকতেন স্পন্দনকাকু। বাবাকে দেখলেই বাঁজখাই গলায় "মাস্টারমশাই কেমন আছেন' বলে এমন হেঁকে উঠতেন যে আঁৎকে উঠতে হত। মার্কসবাদী ফরোয়ার্ড ব্লক নেতা ও ষাটের দশকের কুখ্যাত "হিট-ম্যান' শ্যাম বাঁড়ুয্যের ভাবশিষ্য এবং ডানহাত ছিলেন স্পন্দনকাকু। বাবার কাছে শুনেছি, সেই বুক কাঁপানো সত্তরে প্রকাশ্যে "মেশিন' উঁচিয়ে ঘুরে বেড়ানো স্পন্দনকাকু পুরো অঞ্চলে মূর্তিমান ত্রাস ছিলেন। আমরাও ভয়ঙ্কর ভয় পেতাম তাঁকে। একদিন দু-একজন বন্ধুর অনুকরণে লুকিয়ে মা'র পাউডার পাফ মুখে আলতো করে বুলিয়ে বাড়ী থেকে সাইকেল নিয়ে চরতে বেরোচ্ছি, মোড়ের মাথায় একেবারে সাক্ষাৎ বাঘের মুখে! একবার আমার পানে তাকিয়ে স্পন্দনকাকু সেই রক্ত-জল করা গলায় বললেন, "মুখে বড্ড বেশি পাউডার হয়ে গেছে - খুব বিশ্রী দেখাচ্ছে - অল্প বয়সে এঁচোড়ে পাকা হয়ে গেলে যেমন দেখায় ঠিক তেমনি দেখাচ্ছে - এদিকে এসো!' পাঞ্জাবীর পকেট থেকে রুমাল বার করে আমার মুখের "প্রসাধন' ঘষে তুলে দিয়ে প্রচন্ড ধমক দিয়ে বললেন "এবার যাও - এরকম আর যেন না দেখি!' মুখে পাউডারের স্পর্শ জীবনে সেই প্রথম ও শেষ - মনে হয়েছিল বড় বাঁচা বেঁচে গেলাম আজ।

সত্তরের শেষ ও আশির দশকের গোড়ার দিকে বিধায়ক শ্যাম বাঁড়ুয্যেকে প্রায়ই দেখতাম লোকলস্কর নিয়ে সাদা অ্যাম্বাসাডরে চড়ে স্পন্দনকাকুর বাড়ী আসতে। প্রকাশ্যে সি পি এমের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা এই বিধায়কের সাথে সি পি এম শীর্ষনেতাদের দহরম মহরম নিয়ে পার্টির মধ্যেই নাকি বিস্তর গন্ডগোল ছিল। বাবা-কাকা ও আরও অনেকের মুখে পরবর্তীকালে শুনেছি, সেই সত্তরে শ্যামের প্রচ্ছন্ন মদতে নাকি একঝাঁক ভুইঁফোড় নকশাল গজিয়ে উঠেছিল আমাদের আপাতনিরীহ মফ:স্বল শহরে। সেই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সি পি এমের ছেলেদের ঝাড়ে বংশে উৎখাত করতেই নাকি সেই রক্তবীজদের জন্ম দেওয়া হয়েছিল।

আমাদের বাড়ীতে একটা চিলেকোঠার ঘর ছিল; গুচ্ছের পুরোনো বই ও পত্রপত্রিকায় ঠাসা ছিল সেই ঘরের তাকগুলো। সেই ধূলোমাখা পুরোনো বইয়ের গন্ধ রোজ একবার বুক ভ'রে টানতে না পারলে আমার ঘুমই হত না। বইয়ের পাহাড় থেকে একটা পুরোনো ছেঁড়াখোঁড়া পূজাবার্ষিকী দেশ বা আনন্দবাজারে শীর্ষেন্দুর "নীলু হাজরার হত্যারহস্য' উপন্যাস পড়েছিলাম। সত্তর সম্পর্কে জানার তাগিদটা নতুন করে চাগিয়ে দিয়েছিল সেই উপন্যাসটা, মনে হয়েছিল সঠিক ইতিহাস না জানলে যেন চরিত্রলো ঠিকভাবে ধরা দিচ্ছে না। একটা মারাত্মক বিবরণ বার বার পড়ে কন্ঠস্থ হয়ে গেছিল 'কসবায় পিলু নামে একটি নকশাল ছেলেকে খুন করেছিল নব। সিগারেট ধরিয়ে গল্প করতে করতে আচমকাই কোমর থেকে দোধার ছোরা টেনে এনে পিলুর তলপেটটা ফাঁক করে দিয়েছিল। মাটিতে পড়ে পিলু যখন বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠল, তখন হকিবুটসুদ্ধ পা-টা তার মুখে চেপে ধরে সিগারেটে মৃদু মৃদু টান দিচ্ছিল নব। তারপর হিসেব করে খুব কাছ থেকে ছোরা চালিয়ে পিলুর হৃৎপিন্ডটা ফেঁড়ে দিয়ে যখন বাড়ীর পথ ধরল নব, তখনও তার ঠোঁটে জ্বলছে পিলুর দেওয়া সিগারেট।'

খতমের রাজনীতির এমন আঁখো-দেখা-হাল, এই খুনকা বদলা খুনের জলজ্যান্ত বিবরণ গোগ্রাসে গিলেছি তখন। আমাদের ম্যাদামারা ধমনীতে এরা উত্তেজনা যুগিয়েছে। জটায়ূর ভাষায় "হট কচুরীর' মত বিক্রি হয়েছে অনেক গল্প-উপন্যাস-চলচ্চিত্র ...

সুনীলের পূর্ব পশ্চিম, মহাশ্বেতার হাজার চুরাশির মা, জয়া মিত্র'র হন্যমান। পিলুর হৃৎপিন্ড ফুঁড়ে দেওয়া নব হাটি, ব্রতী-সমুকে পিটিয়ে মেরে ফেলা বা লালটুর নাড়ীর পাক খুলে শরীরে জড়িয়ে দেওয়া রক্তপিপাসু ঘাতকের দল মিলে মিশে এক হয়ে গেছে রামুকাকুর পেটে ছুরি চালানো সেই "ডাকাত'দের সাথে। সমুর মায়ের সেই বুকফাটা আর্তনাদ "মাইরা ফালাইল গো দিদি' কানে নতুন করে বেজেছে যখন শুনেছি

তুষার সাগরে আগুন জ্বলে না
পাথর প্রতিমা স্বপ্ন দেখে না
জননী গো এসো ঝর্ণার জলে তুমি আমি কথা বলি
হিমালয় হয়ে ভোরের আকাশে জ্বলি
জননী গো আরও কাঁদো তুমি শত শহীদের মা
হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী কান্নার স্রোতে তোলপাড় হোক না ...

ওদিকে লালকাকা ক্রমশ: প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে বার্দ্ধক্যের দিকে এগিয়েছেন। তাঁর ভয় আরও বেড়েছে। শ্রাবন্তী মজুমদার লন্ডনের এক সাহেবের ঘরণী হয়ে সুখে ঘরকন্না করেছেন। বোকাবাক্সের ছবি সাদাকালো থেকে রঙীন হয়েছে। লোকে মারাদোনা-প্লাতিনির খেলা দেখে বিকাশ-কৃশানুদের ছ্যা-ছ্যা করেছে। আমি ক্রমশ: বড় হয়েছি, আরও বড়। ইশকুল ছড়িয়ে, কলেজের সীমারেখা টপকে, ছোট্ট শান্ত মফ:স্বল শহরের গঙ্গার ঘাটের মায়া ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে গেছি।

আর দেয়ালে-দেয়ালে বছর বছর লেখা হয়েছে সত্তরের কথা। দিস্তে দিস্তে গল্প, উপন্যাস, ধারাবাহিক। সিনেমা হয়েছে, হয়েছে আলোচনাচক্র। সুমন চট্টোপাধ্যায় গান বেঁধেছেন "প্রথম দেখা তরুণ লাশ চলছে ভেসে ভেসে / দিনবদল করতে গিয়ে শহীদ হল শেষে'। রূপকথায় ছেয়ে গেছে চতুর্দিক। সত্তরের রূপকথা। বিক্রি হয়েছে, হচ্ছে হৈ হৈ করে। সংস্কৃতির বাজারে, চলচ্চিত্র উৎসবে, ভোটের জনসভায়। আমাদের নেতিয়ে পড়া প্রজন্ম সেগুলি দেখে, পড়ে, শুনে অপার আনন্দ পেয়েছে।

রূপকথা দীর্ঘজীবি হোক।