আপনার মতামত         


          ডাবলিন

          বিক্রম পাকড়াশী


ডাবলিন নিয়ে কি লিখবো কি লিখবো? যেখানে বসে লিখছি তার পাশের বাড়িতে বসে আরনেস্ট ওয়াল্টন খবর পেলেন যে উনি নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন- এই কথা লিখবো? ডক্টর ওয়াল্টন, আপনি নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন ডক্টর ওয়াল্টন, আপনি শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা - আপনি নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। সে বহুদিন আগের গপ্পো- এখন শুধু চেয়ারটা পড়ে আছে। হ্যামিলটনের চেয়ার পড়ে আছে- ঠিক যেভাবে নিউটনের, ম্যাক্সওয়েলের চেয়ার পড়ে আছে রানীর কেমব্রিজে। তবে ওয়াল্টনের ভূত নাকি গভীর রাতে চুপচাপ খোঁজ নিতে আসে, কে কেমন কাজ করছে। যাবার আগে সামনের রাগবি গ্রাউন্ডে একবার এসে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। বিন্দু বিন্দু সীগাল সারা মাঠ জুড়ে নি:শব্দে ডানা মেলে ধরে প্রজাপতির মতো। হলুদ আলোর নীচে ঝিম ধরা ঠান্ডায় খেলা শুরু হয়।

না:। এভাবে হবে না। আমি কি খালি ইয়েটস আর বেকেটের ভূতই নাবিয়ে যাবো মাঠের ওপারে? তার চেয়ে চলো ক্রিকেট পিচের পাশে মালখানায় চট করে একটা পাইন্ট নামিয়ে লিফীর ধার ধরে ঘুরে আসি। ক্রিকেট পিচের আশেপাশে ঘোরাফেরা করা মানে ইংল্যান্ড-মানে মালিক পক্ষ-মানে প্রোটেস্ট্যান্ট। বছর ত্রিশেক আগেও এ যায়গাটা একঘরে ছিল। পড়তে চাইলে ক্যাথলিক পাদ্রীর অনুমতি নিতে হত-ফাদার আমি কি ক্রিকেট পিচআলা কালেজে যেতে পারি? সেই যে ও দেশের মহারানীর আদেশে ডাবলিন শহরের কাছে পূত পবিত্র গড়ে তোলা . . .আর তাদের এক এক পিস ফেলোসকল-বেশী খাবে না,বেশী ঘুমোবে না, বিয়ে করবে না। ভোরে উঠে কঠিন পাথরের দেয়ালের ভেতরে লংরুমের লাইব্রেরিতে পড়াশুনা করবে। অ্যান্ড দে উইল প্র্যাকটিস সেলিবেসি-হা:, মে বি অন ইচ আদার।

লিফী নদী বটে। নালাও বটে। ওর ওপর দিয়ে আমি শুধু শেষ বাস আর শেষ ট্রেন হু হু করে ছুটে যেতে দেখি যারা নদী পেরিয়ে সমুদ্রের কিনার অবধি চলে যায়। পচা জলঝাঁঝির গন্ধ বৃষ্টির ছাঁটের সঙ্গে আছড়ে আছড়ে পড়ে নেশা ছুটিয়ে দেয়। যতবার লিফী পেরিয়েছি দেখেছি ব্রিজের নীচে গলা ইস্পাত থিরথিরথিরথির করে কাঁপছে আর দূরে দাঁড় করানো ভাইকিং জাহাজটা টুকরো টুকরো হয়ে পাড়ের দিকে ভেসে আসছে। ভাইকিংদের মুকুটে শিং লাগানো, নদীর পাড়ে টুকরো টুক®রো জাহাজ ভিড়িয়েই মারতে মারতে তাড়িয়ে দিচ্ছে ডাবলিনের মানুষজনকে।

দিনে চারটে করে ঋতু বদলে মাঝরাতে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ট্যক্সি আমাকে বাড়ি নিয়ে চলেছে কারন আমি আমার বাড়ির সবথেকে কাছের পাবটার নাম মনে করে বাতলাতে পেরেছি সময়মতো। লিফীর রেলিংএ মাথা দিয়ে একটা মেয়ে বমি করল-তালিয়াঁ তালিয়াঁ। পাশের দুটো ছেলে ওর পেছনে থাপ্পড় লাগালো প্রবল উৎসাহে। তারপর রাস্তার মাঝখানে বিশাল স্পায়ারটার ধাতব উচ্চতার দিকে তাকিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। আমার নিজের পেটে সবকিছু গুলিয়ে আসছে। আর রাখতে পারছি না-ট্যাক্সির ভেতরে বেরোলে ফাইন হয়ে যাবে। আআহ-বেরোতে দেবো না কিছুতেই। মাথার ওপরে খালি পুলিশের হেলিকপ্টার ভটভট করে টহল দিচ্ছে। দু পাশে বাতাস কেটে বাকি সব ট্যাক্সি আমাকে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে ট্র্যাফিক লাইট থেকে লাইটে। ক্রোক পার্কের দিকে বাঁক নিলাম।

আর দশ মিনিট। নিয়মনিষেধলাগামছাড়া ফুটবল, আর হকি। ক্রোক পার্কে ইংরেজ পুলিশ ট্যাঙ্ক থেকে গুলি করছে দর্শক আর খেলোয়াড়দের- সবকটা লোক আইআরএ র চর। এক্ষুনি গুলি না করলে এক দুপুরে ওরা বারোটা আফিসারকে সাবাড় করে দেবে। পর পর দুটো লাল কার্ড দেখলো কাউন্টি ডাবলিনের ডিফেন্ডাররা। ফাউল। আর জেতা যাবে না। সাতশ বছর ধরে তোমার জমি নেই, তুমি নিজের ভাষায় কথা বললে কাঁটাআলা ক্রস ঝুলিয়ে দেবে তোমার গলায়। লিফীর ধার ধরে চুষতে চষতে দেখবে মোহনার কাছে জাহাজকে জাহাজ-কফিন শিপস-খেয়ে না খেয়ে মরে যাচ্ছে-দেশ ছেড়ে নতুন দেশে ভেসে যাচ্ছে- বাতাসে খাবার আর টাকা সীগালের মতো উড়ে বেড়ায় যেখানে-আমেরিকা। যেখানে উপকূল ঘেঁষে আলো পাব, আরো পাব, নিগার আর আইরিশদের ঢোকা বারণ আছে সেখানে। দুর্ভিক্ষের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে না, দুর্ভিক্ষের খাল দিয়ে জল যায় না-ওগুলো কেবলমাত্র খাবারের বিনিময়ে তৈরি। রোগগ্রস্ত, বেআইনি আনপড় চোরে জেল ভরে যাচ্ছে। ছ জনার ঘরে পঁচিশটা জন্তু, কালকে সকালেই জাহাজে করে ভাসবে-দক্ষিণ গোলার্ধে বিশাল একটা মহাদেশ খুঁজে পেয়ে গেছে ওরা।

আর চাপ নিও না। থাক। আমরা এখনো লিফীর ধারেই আছি। একটা বাদামী চামড়ার লোককে দেখে দুটো লোক পাকি পাকি বলে চিৎকার করে উঠলো। আজ তিন দিন হল যে কোনো একটা মেয়ের সাথে শোবো বলে রাতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ভীষন,ভীষন মাতাল অবস্থায় দুজন দুজনকে নিশ্চই পেয়ে যাবো এক রাতের জন্য। ডাবলিন তো আর বেলফাস্ট না- যেখানে রাতের আসরে আমার চামড়ার বাদামী রঙ রাত বাড়ার সাথে গাঢ় থেকে গাঢ় হয়ে এসেছে। কেউ শোয়নি আমার সাথে, আর আমি ওই কয়লার মতো চামড়ার মেয়েটাকে ছুঁয়েও দেখিনি।

খুব ভারী ভারী কতগুলো ব্যাগে সপ্তাহের কেনাকাটা করে পাঁচজন ভারতীয় হেঁটে চলেছে। এই পাঁচজন আমার পেছনে গোপনে গোপনে সারা দুনিয়া ধাওয়া করে। আমার দিকে অদ্ভুত চোখ করে তাকায়, নিজেদের কেনাকাটার ব্যাগের ভারে নুইয়ে পড়তে পড়তে অর্থপূর্ণ হাসি বিনিমময় করে আর জটলা বেঁধে ইতস্তত: ঘোরে। ওদের জামা থেকে মশলার গন্ধ পাই, সারা পৃথিবী এই পাঁচটা লোক আমার ল্যাজে ল্যাজে ঘুরতে থাকে। চলো, লেটস গো ফর আ কাপল অফ পাইন্টস। লোকগুলো মাঝরাতের কুয়াশার মধ্যে বোকার মতো মিলিয়ে যেতে থাকে।

আর একটা। আর একটা গলা দিয়ে নামিয়েই বাড়ি। পল, রোলি আর ল্যারি একই সাথে উঠবে-জাস্ট ওয়ান বিফোর আই হিট দা রোড। পাশের টেবিলের বুড়ো অনেক্ষণ ধরে তাক করছে আমার সাথে কথা বলে বোর করবে বলে। ওর পয়সায় আমাকে এক পাত্তর কিনে খাওয়াবার জন্য পীড়াপীড়ি করবে। আমি পাকিস্তানি কিনা জানাতে চাইবে, "না' শুনে যৎপরোনাস্তি দু:খ প্রকাশ করবে আমাকে না বুঝে আঘাত করার জন্য, মুসলিম নই শুনে ভারী উৎফুল্ল হবে আর বলবে মুসলিমরাও খুব ভালো মানুষ, নাস্তিক শুনে হাসি হাসি মুখে এটাই তো যুগের হাওয়া বলেই জিগ্গেশ করবে কলকাতার রাস্তায় গরু চলে কি না, হিন্দুরা গরু পুজো করে কি না, ঈশ ভারতে কত লোক, অহো সু¤নামিতে কি কাণ্ডই না ঘটলো গো, তোমার বাড়ির লোক ভালো আছে তো, তোমার ইংরিজিখান তো দারুন চোস্ত - এরকম চলতেই থাকবে। অথচ আজকে তার কিছুই হল না। বুড়ো টেবিলে আসতেই আমি স্খলিত গলায় বললাম "কি দাদুউউউউউউউউউ!' বুড়ো একগাল হেসে জিগালো "আপনি কি মইদ্যপান করেন?' শালা! হুঁ, আই ডু এনজয় মাই পাইন্ট, এস্পেশালি বিষ্টি পড়লে, মানে রোজ।

রাতের সমস্ত ট্যাক্সি বারবার বাড়ির দিকে ফিরে যেতে চায় ভিখিরি আর ড্রাগখোরদের মধ্যে দিয়ে। পূর্ব ইউরোপের যাযাবর মহিলারা সস্তার ম্যাগাজিন বেচে ঘুরে বেড়ায়। ওদের সবাইকে একইরকম দেখতে। আমার পেছনে যে পাঁচটা টিকটিকি ঘোরে, তাদের চেয়েও একরকম দেখতে। একইরকম বোকা। এদের সবাইকে পুলিশ নিয়ম করে একইরকমভাবে হেনস্থা করে। বুকের ওপর পরিচয়পত্র - এদের কি দেশ টেশ নেই? হাত ধরে টানাটানি করে পয়সা চাই বলে, আলটপকা রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ে - কদাচিৎ গ্র্যাফটন স্ট্রীটে বাজনা বাজায়। সমস্ত রকম ছিঁচকেমি! মোটা মোটা মহিলা, গোল জিওগ্রাফিহীন মুখ, চাষাড়ে গলা। আর কতগুলো স্থূল অকালপক্ক অল্পবয়েসি ছেলে। দুটো ভীষণ মিষ্টি দেখতে বাচ্চা যারা এত নোংরা যে বাসে উঠলে লোকে সরে সরে যায়। এরা সবসময় বাসের পেছনের দিকে বসে, সামনেটা খালি থাকলেও- আর ছোটোলোকদের মতো অসম্ভব জোরে জোরে গল্প করে। গাঁইয়া ভূত কতগুলো।

ভূতের অভাব দুটো দ্বীপেই নেই। ওয়েলসে অবধি পাহাড়ে চড়তে গিয়ে মাঝপথে একখানা বিরাট ড্র্যাগন দেখেছিলাম। এরকম দুটো ড্র্যাগন ছিলো পাহাড়টায় - আমি খালি একটা দেখেছিলাম। কিন্তু একটাই মাত্র রাস্তা আছে যাতে হামেশাই অলৌকিক দেখা যায়। সারা দিনরাত। শনিবার করে ক্লিওপ্যাটরা আর নেপোলিয়ান সে রাস্তার দু ধারে দাঁড়ায়। একজনের গায়ে আলো ফেললে অন্যজনের ছায়া পড়ে। পেরু থেকে আসা এক জুটি সারা রাস্তা নেচে বেড়ায়। একটা স্প্যানিশ লোক অ্যাকর্ডিয়ান বাজিয়ে গান করে। একটু দেরী করে পাখা হাতে একটা জাপানী পরী উড়তে থাকে। তিনটে ছেলে তাদের জনÈদিনের কেকটা মাটিতে নামিয়ে সারা রাত গল্প করে। তার পাশের ম্যানহোল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে ব্যাঙ্কের ধোপদুরস্ত অফিসারবাবু। বাঁ দিকের ভদ্রলোকের এত ভীড়ে কাজে যেতে দেরী হয়ে যায়। উনি তাঁর পোষা এমুর পিঠে চড়ে গ্র্যাফটন স্ট্রীট পেরিয়ে যান। মোড়ের মাথায় একটা খরগোশ বিরাট একটা ভালুককে জাপ্টে ধরে। দু জনের উচ্চতা একদম সমান।

গর্ভবতী মায়েদের কাপড়ের দোকানে ঝাঁপ পড়ে গেছে। পাশের গলি থেকে বুটজুতো আর গুলির শব্দ-আবার আবার। গভীর রাতের সসেজোয়ালা প্রহর গুনে দেদার দাম বাড়িয়ে চলেছে। টাউন হল দখল হতে হতে হল না। ডি ভ্যালেরাকে জেলে পুরে দিলো। মাইকেল কলিন্স, জেমস কনলি, পিয়ার্স, হিউস্টন-সবাইকে মেরে ফেললো গুলি করে, চেয়ারে বেঁধে। ডি ভ্যালেরা চেঁচিয়ে উঠলেন- ডোন্ট শুট-আমি আমেরিকান, আমি আমেরিকান, লেট মি লিভ। বন্দুকের ঘোড়া আর টেপা গেল না। প্লেটের ওপর দুটো সসেজ, একটা ডিম, মাশরুম, বেকন, সাদা কালো পুডিং। ভ্যালেরা রাষ্টÌপ্রধান হয়ে গেলেন। কালো কফির চুমুক, রুটি মাখন- গিনেসের গ্লাসে গ্লাসে ধাক্কা লেগে তোলপাড় হয়ে গেল। গিনেস ইজ গুড।

বিউলিজের কফির দোকান লাভ করতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেল- দুশো বছরের পালিশ করা পুরনো আসবাব একবার ঝকঝক করে উঠলো। আইরিশ কফি আর ক্রীম গড়াতে লাগলো গ্লাসের ধার ঘেঁষে-চীয়ার্স। এত শব্দ শুনে লাভ নেই। গোদোর প্রতীক্ষায় বলে একটা নাটক ফ্লপ করেছিলো আমেরিকায়। এখন তার কথা কানাঘুষোয় চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কে শিখবে দেশের ভাষা? কে অভিনয় করবে ন্যাশনাল থিয়েটারে? ইয়েটস জনে জনে ডাকছেন- শুক্রবার অ্যাবি থিয়েটার হাততালিতে ভরিয়ে দাও এসে। আজ শুক্রবার। ভাঙাচোরা থিয়েটারের সামনে ৩১ নম্বর, ৩২ নম্বর বাসের গুমটি। সবাই বাসের জন্য দাঁড়িয়ে। আর দুটো মাস-আবার অ্যাবি থিয়েটার খুলবে। দু মাস আর- ডাবলিনে ফের ট্রাম চালু হবে। বব গেল্ডফ গিটার নিয়ে প্রেস রিপোরটারদের ডেকে বলে উঠলেন ডাবলিন হ্যাজ নো কালচার। ডাবলিন তার নিজের সাইজ জানে না। আমিও জানি না। লিফীর ওপারে একটার পর একটা বহুতল বাড়ি গড়ে উঠছে। ডাবলিন নিজের চেয়েও বড়, নিজের থেকেও দামী। কেবল রাতগুলো ফিকে হচ্ছে, কেবল রাতগুলো গাঢ় হচ্ছে, মশলার গন্ধের মধ্যে মিশে যাচ্ছে বাজার করে ফেরা পাঁচজন ভারতীয়।