আপনার মতামত         


        মাসীমা ঈশেন সংবাদ

        দীপ্তেন


(মাসীমা একজন ডাকসাইটে অধ্যাপক।বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা আর তাঁর বাজখাঁই গলার দাপট - এই দুই কারনেই উনি কলকেতার বিদ্বত সমাজে এক দারুন সম্ভ্রমের আসন ছিনিয়ে নিয়েছেন। তাবৎ কলা কুশলীরা কানে তুলো গুঁজে তাঁর দুয়ারে ধরনা দ্যান। গুরুচন্ডালীর সম্পাদক (অনরারী) ঈশেন ও মাসীমার কথোপকথন নীচে তুলে দেওয়া হলো।

পুরো ইন্টারভিউটি নেওয়া হয়েছে মাসীমার বসবার ঘরে।বিশাল পালঙ্কে মাসীমা বসে - হাতের কাছে গোলাপ দানি ও চীনাবাদামের ঠোঙা। মাসীমা বারবার গোলাপ শোঁকেন আর মুঠো ভর্তি চীনা বাদাম খান। খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লে তাঁর আর বাদামের খোলা ভাঙ্গার কথা মনে থাকে না। নিরাপদ দুরত্বে ঈশেন কাঁচুমাচু মুখে বসে আছে। ঘরে নানান আসবাব। দেওয়ালে ত্রিমুর্তির বিশাল ছবি - দেরিদা, নেরুদা আর টেনিদার। এ ছাড়া নানান ভঙ্গিমায় মাসীমার হরেক কিসিমের ছবি।)



ঈশেন : মাসীমা, আপনার কি ধারনা post modern বাংলা কবিতায় যেমন শব্দ বাহ্যরূপ নিয়েছে আত্মদর্শন,উপকথা, রূপকল্প ও আধ্যাত্মবাদের মধ্য দিয়ে । কিন্তু কবিতা কি পেরেছে পাঠক কে আরো গভীরতর আত্মবীক্ষনের মধ্যে প্রবেশ করাতে ?


মাশীমা : (চমকে উঠে) ওঁয়আ ?? খি্‌খ ?
(খেয়াল রাখুন মাসীমা চমকালে আপনার আমার মতন সর্বজনবোধ্য "অ্যাঁ" বলেন না।)


ঈশেন (আরো ঘাবড়িয়ে) না,মানে আমি কি যেন বলছিলাম। ইয়ে - মানে কবিতা পড়লে মানুষ কি আরো ঘেঁটে যায় না ফ্যা ফ্যা করে ?

মাসীমা : আর এলিয়েনেশন। এলিয়েনেশনের কথা কে বলবে ? আমার তো এলিয়েনেশনের উপর জবরদস্ত উত্তর তৈরী আছে।

ঈশেন : আজ্ঞে ওটা আমার পরের প্রশ্ন ছিলো।আত্মবীক্ষন, এলিয়েনেশন, পুরাবাস্তবের প্রচ্ছায়া, কবিতায় ভারতীয়ত্ব ....

মাসীমা : থামো তো। এবার শোনো বাছা।নেহেরুর সমাজতন্ত্র ভারতীয় আর্থনীতিকে যেমন একদিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো বিশ্বের প্রাঙ্গনে আবার তেমনি জর্জরিত করেছিলো আধিষ্ঠানিক .... উফ্‌ফ। এটা তো অন্য উত্তর। গুলিয়ে গেছে,সব গুলিয়ে গেছে।

(সজোরে গোলাপের ঘ্রাণ নিলেন,আর দু মুঠো চীনা বাদাম খেয়ে নিলেন)

এলিয়েনেশন তো -সোজা উত্তর। ঐ নেশন শুনেই আমি কি রকম এলিয়ে পড়েছিলাম । আসলে মানুষের চিত্ত এক বহু মাত্রিক ইয়ে - ঐ যেরকম ক্লাব স্যান্ডুইচ হয় আর কি? একগাদা লেটুস টমাটম ,তাপ্পর গিয়ে ডিম সেদ্ধ - এইসব না খেয়ে তবে গিয়ে চিকেনে পৌছবে। ও ভাবেই ভাবের পরতের পর পরত পার হয়ে পাঠকের মুখসুদ্ধি।

ঈশেন : মুখসুদ্ধি ?

মাসীমা : না। আত্মশুদ্ধি। অতো খাবারের কথা কইলে কি মাথার ঠিক থাকে ? তুমি বাছা একটু বুঝে শুনে লিখো। মাছি মারা কেরানী হয়ো না। একটু ধরতাই দাও দিকি।

ঈশেন : আপনি বলছিলেন বহুমাত্রিক বাস্তবতার একশো ভাগই হয়তো পাঠক পেলো না কিন্তু তার আন্তরিকতায় সে যদি পরশ পায় এক কলার পরশমনির তাহলেও তো কবি ও পাঠকের আত্মীয়তা পুর্ন হয়।

মাসীমা (পুলকিত হয়ে)" তাই বলেছিলাম ? সত্যি ? বা:। বা:। ভারী ভালো বলেছিলাম তো। তুমি মন দিয়ে টুকে রেখো কিন্তু।

ঈশেন : এইবার দ্বিতীয় প্রশ্ন । এই যে শব্দরূপ মহাকাশ - যেখানে ইথারে নানান অনুভুতির বৃন্দবাদন -কবিরা সেই মহাশুন্যে কি ভাবে বিচরণ করেন ও সেই মহাজাগতিক প্রপঞ্চকে অনুভুমির মাত্রায় আনেন।

মাসীমা : ও মা। এটাও জানো না। এটার উত্তর আমার কাজের মেয়ে ও দিতে পারে। তুমি বরং আরেকটা প্রশ্ন করো তো বাপু ?

ঈশেন : মানে কবিরা পদ্য লেখেন কি করে ? কেনই বা লেখেন ?

মাসীমা : দ্যাখো কবিতা লেখার প্রথম শর্ত হলো যে ভাষায় লিখছো সেই ভাষাটা জানতে হবে। তুমি হটেনটট ভাষা না জানলে - যতো ই তোমার পেটের মধ্যে পদ্য র র করুক না কেনো - হটেনটট ভাষায় পদ্য লিখতে পারতে না। ঠিক কিনা ?

আর দ্বিতীয় শর্ত হলো স্বাক্ষর হতে হবে। তুমি মুখে মুখে বললে আর লিপিকার যা ইচ্ছা তাই টুকে গেলো - বলি হ্যাপা কে সামলাবে ? আর চতুর্থ শর্ত হলো...

ঈশেন : মাসীমা, তৃতীয় শর্ত বাদ পড়ে গেলো যে।

মাসীমা : আ মোলো যা। তুমি কি আমায় নামতা সেখাবে নাকি ? আর কবিতা কেন লেখেন কবিরা ? এ আবার কি প্রশ্ন - কবিতা লিখলে কবি,জুতো সেলাই করলে মুচি,ডাকাতি করলে মন্ত্রী ... এ তো সবাই জানে ।

ঈশেন : না মাসীমা। আমি বলছিলাম আমাদের মধ্যে এক না বলা বেদনা আছে যা জাগরন ও সুপ্তির মধ্যে আমাদের শিহরিত করে, উদ্বেলিত করে,আমাদের আন্দোলিত করে .....

মাসীমা : কার্বোভেজ খেয়ে দেখো। উবগার পাবে।

ঈশেন : কিন্তু এটা বলুন মাসীমা। কবিতা কি কবির আত্নস্বীকৃতি ,এক নগ্ন নির্জন আত্মকথন না কি এটা এক সেতু বন্ধন যা দিয়ে কবি স্পর্শ করতে চাইছে তার পাঠককুলকে ?

মাসীমা : ও মা। ই কি ভীড় মিনি বাসে দুষ্টু লোক নাকি যে সারাক্ষন পাঠক পাঠিকাদের খিমচি দিয়ে স্পর্শ করতে চাইবে ? সেটা উচিত ও নয়। বরং ঐ নির্জন কি একটা বল্লে সেটাই ঠিক - তবে আবার তাকে নগ্ন করলে কেন ? সেবারে ভীড় বাসে কি কান্ড শোনো - আমার হাঁটু টা খুব চুল্কোচ্ছিলো তাই ভালো করে ঘ্যাঁশ করে আঁচড়ে দিয়িছি আর পাশের সীটের আধবয়সী ভাম বুড়োটার সে কি চিল্লানী। যতো বলি ভীড়ের মধ্যে ঠিক ঠাহর হয় নি - ভুল করে আপনের হাঁটুতেই খামচে দিয়িছি - তো শোনেই না। তা কবিদের ও আমি সেই কথাই কই - কাকে কি বলবে কে কি বুঝবে কে জানে ? তার থেকে নিজেই নিজের মনে ফিস ফিস করে কথা বলো - পাশের লোকের ঘুম ও ভাঙ্গবে না আর কেউ না বুঝে অট্টহাস্য ও করবে না।


ঈশান : আমরা কি বলতে পারি, মাসীমা, যে কবিতা আসলে এক মর্ষকামী ছন্দবদ্ধতা, না কি কবিতা আসলে কবির সেই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যা দিয়ে কবি সম্প্রচার করে অনুচ্চারিত মনোভাব ?

মাসীমা : জীবনমুখী না জীবন বিমুখী সেই প্রশ্নে আজকের কবিসমাজ ত্রিধাবিভক্ত, হ্যাঁ,বটেই তো, মোটেই না আর ইয়ে,জানি না তো এই তিন দল ই আজ, বঙ্গ সরস্বতীর পদ্মবনে বুকে হেঁটে বেড়াচ্ছে আর হিস হিস করে শব্দ করছে। কখনো কখনো দেখি কোনো কবি গোষ্ঠী ইয়াব্বড়ো নখ বার করে ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে অন্য কবিদের কে ভয় দেখাচ্ছে আর তারাও বিন্দুমাত্র প্রভোকিত নাহয়ে "হরি দিন যে গেলো সন্ধ্যা হলো " বলে আপন মনে গুন গুন করে গান গেয়ে চলেছে। কিন্তু দ্বন্দটা আবহমানের। কোনো ঋষি কবি ঋগ্বেদে উদাত্ত গলায় বলছে ভো ইন্দ্র,ও সুযযি, শুনছেন বরুন দেব ... আমার বউকে সুন্দরী করুন, পোষা গরুটার দুধ বেশী হোক, বড় ছেলেটার একটু পড়াশোনায় মন হোক... ভালো একটা গুরুকুলে ছোঁড়াটাকে ভর্তি করে দ্যাও বাবাসকল, আর অন্য কোনো মুনি কইছেন যে অক্ষর পুরুষ ভুমায় আনে স্বস্তি সে যেন দ্যাবাকে করে প্রশস্তি । তো ব্রহ্মের অতীত সেই অমৃতকে চাই। কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুতে মোর লোভ নাই। টা রা লা লা লা। ওম ক্লিং ক্লিং।

এশান : খি খি্‌হ । (খেয়াল করুন কি ভাবে নির্লজ্জের মতন নকল করছে মাসীমার অভিব্যক্তির স্টাইল)। কিন্তু মাসীমা ... আমার প্রশ্ন টা যে অন্যরকমের ছিলো।

মাসীমা : দ্যাখো বাপু, আমার উত্তর তো আর সব সময় তোমার প্রশ্নের উপর নির্ভর করেই হবে না। আমি যে কষ্ট করে জীবন মুখী সাবজেক্ট নিয়ে অ্যাতো ভালো উত্তর তৈরী করে রেখিছি কই ,তুমি তো উদিকেই পা বাড়াচ্ছো না। কেবল সব আজে বাজে মড়াখেগো প্রশ্ন। ঝট করে একটা ভালো দেখে প্রশ্ন করো তো বাপু জমিয়ে উত্তর দেই।

ঈশান : মাসীমা ,আমি প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন করবো ? মানে আপনি কি প্রতিষ্ঠান নিয়ে কোনো যুৎসই উত্তর ভেবে রেখেছেন? প্রতিষ্ঠান ?

মাসীমা :(চিন্তিত) কিসের প্রতিষ্ঠান - একটু খোলসা করে বলবে ?

ঈশান : ঐ এস্টাব্লিশমেন্ট আর কি ?

মাসীমা : ও: , এস্টাব্লিশমেন্ট তো । খুব ভালো উত্তর আমার জানা আছে - তার আগে বলতো বাপু তুমি কোন ম্যাগাজিন থেকে এয়েছো ?

ঈহান : মাসীমা আমি বাংলাবাজার পত্রিকার কবিতা সাংবাদিক।

মাসীমা : তাইলে আমায় একটু ঘুরিয়ে নাক দেখাতে হবে। তো শোনো। আমি সর্বদাই তরুন প্রজন্মের কবিদের বলি কবিতা লেখা এক তপস্যা - আর সব সাধু সন্ত অবধুত দরবেশদের মতন তোমাদেরো চাই অভীষ্ট এক পদ্য দেবতা। আর যদি প্রাণ মন ভরে নৈবিদ্দির থালা না সাজাও - বলি ঠাকুরের তাতে মন উঠবে ? অ্যাঁ ? বহু উপচারে বড় বড় কবিতা লিখে নামকরা সাহিত্য পত্রিকায় পাঠাও - পাঠাতেই থাকো। একই কবিতা দশ বার বারো বার পাঠাও। কবিতার সম্পাদকেরা কেউ কবিতা পড়ে না - তাই বার দশেক পাঠালে একবার ছাপা হয়ে যাবেই। এইটা হচ্ছে কবিতার দশমিক পদ্ধতি । এরপর দুটো অধ্যাপক ধরো একজন তোমায় খুব গাল দেবে আর আরেকজন থোড়া লিফ্‌ট দেবে। যতো বেশী অধ্যাপক তত তোমার উন্নতির চান্স বেশী। যদি পারো তো বিপক্ষ গোষ্ঠীর কোনো নরম মনের কবিকে অল্প করে কামড়ে দিতে পারো। জমবে ! আর ভালো কথা - কবজী ডুবিয়ে কিছু একটা নেশা কোরো - ভাং চরস নয়। ওলো ক্লিশে। মৌরলা মাছ ভাজা'র নেশা করতে পারো। সুস্বাদু ও পুষ্টিকর - তাছাড়া ও এক্কেবারে যাকে বলে অরিজিনাল। সব সময় হাতে এক ঠোঙা মাছ ভাজা নিয়ে ঘুরবে আর বিভিন্ন ইমোশনের সাথে সাযুজ্য রেখে বিকট ভাবে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে সশব্দে কচর মচর করে বা মিহি সুরে খুচ খুচ করে খাবে।

ঈশান : বা: । মাসীমা। আমি মুগ্ধ। এরকম মৌরলা মাছ ভাজার সাথে কবির স্বীকৃতি - এ কোনোদিন ও কেউ আগে ভাবে নি।

মাসীমা : বটুকের কবিতা মোটেই কেউ পাত্তা দিতো না। আমার কথা শুনে বটুক আলুকাবলির নেশা ধরবার পর তিন তিনটে সাহিত্য পুরষ্কার পেয়েছে। সব সময়ে বাঁ কাঁধে এক ঝোলা কবিতা আর অন্য কাঁধে এক ঝোলা আলুকাবলি নিয়ে ঘোরে। দুটো ই সমানে চলছে ধ্যার ধ্যারিয়ে।

ঈশান : আমি তাহলে উঠি মাসীমা। আমার কাব্য জগতের ক্ষেত্রে এক নতুন প্রভাত আজ থেকে শুরু হলো।

মাসীমা : অলবিদা। ফির মিলেঙ্গে। কোঁক্কোর কোঁ কোঁ।