আপনার মতামত         


          ঋতুচক্র


প্রথমে অযোধ্যা তার পরে লন্ডন এবং সব শেষে বান্দোয়ানে উপর্যুপরি বোমাবিস্ফোরণে যারা বিস্মিত হয়েছেন, যাঁরা শখের গোয়েন্দাগিরি করে এই উপর্যুপরি বিস্ফোরণের কার্যকারণ সন্ধানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে জানানো যাইতেছে, যে এগুলি মূলত: প্রাকৃতিক ঘটনা। এবং প্রতিটি প্রাকৃতিক ঘটনারই কিছু বিধিদত্ত সময় থাকে। শীতকালে শীত পড়ে বর্ষাকালে বৃষ্টি। ভাদ্রমাসে কুকুররা পথে নামে, আর স্বরস্বতীপুজোয় ইশকুলের ছোঁড়া-ছুঁড়িরা। একমাত্র পূজাবার্ষিকী প্রসবের সময়েই কবি গর্ভযন্ত্রণায় ছটফট করেন, অন্যান্য সময়ে নিয়ম করে থলে হাতে বাজারে গিয়ে বেগুনের দরদাম করে থাকেন। সুধীজন জেনে খুশি হবেন যে এগুলি নিছকই প্রকৃতির নিয়ম।

কূটকচা৯র গভীরতম অন্তর্তদন্তে প্রকাশ, প্রাকৃতিক ভাবে এখন চলছে বোমের সিজন। বোম প্লাস উন্নয়ন প্লাস দারিদ্র প্লাস আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। প্রতিটি প্রাকৃতিক ঋতু থেকেই শিক্ষণীয় কিছু থাকে। এই মরশুমটি থেকে আমরা হঠাৎ করে জানতে পারি, যে ভারতবর্ষের গ্রামগুলি খুবই অনুন্নত, সেখানে কাজ নেই, খাবার নেই, এমনকি পরিস্রুত পানীয় জলও নেই। এমনিতে আমাদের শহরের রাস্তায় কোনো ভিখিরি নেই, ট্রেনে-বাসে গান গেয়ে কখনও পয়সা চায়না কোনো ছিরকুটে চেহারার অন্ধ দম্পতি। কখনও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার কোনো শ্রমিককে দুর্গন্ধ ঘেমো জামা পরে ভিড় বাসে লজেন্স বেচতে দেখা যায়না। চায়ের দোকানে কোনোদিন আমাদের চা দিয়ে যায়না তেরো বছরের কিশোর, রাস্তার পাশের ফুটপাথে থাকেনা কোনো পলিথিন সংসার। তাই এই মরশুমেই আমরা জেনে নিই সেই সব অজানা খবর। এই মরশুমটি গভীর আত্মদর্শনের কাল। এই ঋতুতেই খবরের কাগজের বিবরণ পড়ে আমরা বুঝতে পারি যে দেশে দারিদ্রের বড্ডো বেশি প্রকোপ। আর উন্নয়ন? সেতো হয়ইনি। আরও জানতে পারি, যে এই দারিদ্র, এই অনুন্নয়নকে সমানে কাজে লাগিয়ে চলেছে কিছু বিভেদকামী শক্তি। এই ঋতু তাই এনে দেয় সেই বিভেদকামী শক্তির বিরুদ্ধে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠার সুযোগ। গভীর আত্মবীক্ষণের মধ্যে দিয়ে অন্তরের শক্তিতে বলীয়ান হবার সুযোগ, যাতে করে ঐ বোমাকে, ঐ দারিদ্রকে উপেক্ষা করে আবার যথাপূর্বং হয়ে যাওয়া যায়।

এর ঠিক আগের ঋত্‌ুটিই ছিল বীররসের ঋতু। শিল্পীর স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার মরশুম। নন্দনে বন্ধ হয়ে গেল জোসি যোসেফের ফিল্ম,সিগারেট নিষিদ্ধ হল পর্দায়। সে বড় সুখের সময় নয়, হালুম শব্দে গর্জে উঠেছিল বাঙালী বিবেক। সেই মরশুমে আমরা হঠাৎ করে জানতে পেরেছিলাম যে শাসকের কাছে স্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই। এমনিতে অবশ্য আমাদের সেন্সর বোর্ড এক দেবস্থান। বোর্ডে শুধুমাত্র ফিল্ম-বোদ্ধারাই গ্লাসনস্তের খোলা হাওয়া সেবন করে সিনেমা নিয়ে উচ্চমার্গের আলোচনা করে থাকেন ,সেখানে ফিল্মের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন কিছু মাথামোটা লোককে সিনেমার গুণাগুণ বিচারের মহৎ দায়িত্ব একদম দেওয়া হয়না।সেখানে কোনো ধান্দাবাজি নেই, ল্যাং মারামারি নেই, সেখানে বড়োকর্তারা ছোটো ফিলিমমেকারদের স্নেহ করেন, ছোটো ফিলিমওয়ালারা বড়োদের প্রণাম করে আর সমবয়সীরা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে। সেখানে সদা-সর্বদা সকল প্রকার বিগ-বাজেট আইটেম নৃত্যই ঝপাঝপ কাঁচিতে কাটা পড়ে যায় বলে প্রোডিউসারদের মাথায় হাত পড়ে , আর ছোটো ফিলিমওয়ালাদের "ব্লাউজের ফাঁকে ক্লিভেজ দেখা গেল কেন' বলে কক্ষনো ধমকানো হয়না। এই মহৎ স্বর্গ থেকে আমরা পতিত হয়েছিলাম সেই মরশুমে। সে মরশুম ছিল তাই প্রতিবাদে গর্জে ওঠার মরশুম, বীররসের যাত্রাপালার স্টেজ-রিহার্সালের অনুকূল সময়। গোটা ঋতু জুড়ে আমরা তাই প্রতিবাদের ব্যকরণ আওড়েছি, যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছি। যুদ্ধ অবশ্য করতে হয়নি, তার আগেই ঋতু শেষ হয়ে গেল যে।

কূটকচা৯র সূক্ষ্ম অন্তর্তদন্তে দেখা যাচ্ছে, শিল্পীর স্বাধীনতার ঠিক আগের ঋতুটিই যাদবপুর ঋতু নামে ইতিহাসে সুপ্রসিদ্ধ। ঐ মরশুমে অনশনরত ছাত্রছাত্রীদের উদুম লাঠিপেটা করে পুলিশ, তাই ঋতুটিকে পুলিশী নিপীড়ন ঋতুও বলে থাকেন অনেকে। ঐ ঋতুতেই শান্তশিষ্ট নিরীহ গোবেচারা পুলিশ হঠাৎই পাগলা ষণ্ডের মতো ক্ষেপে ওঠে। এমনিতে পুলিশ সারা বচ্ছর ফুটবল খেলে, রাস্তায় ট্রাক-ড্রাইভারদের সঙ্গে আপনি আজ্ঞে করে কথা বলে, বাড়িতে মাওয়ের বইপত্তর আছে বলে কাউকে তুলে নিয়ে যায়না, লক-আপে থার্ড ডিগ্রী তো একেবারেই দেয়না। তারা দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করে, ঘুষ একেবারেই খায়না, মন্ত্রী-সান্ত্রীদের কথায় ওঠাবসা না করে নির্ভীক ভাবে নিজেদের কর্তব্য পালন করে চলে। শুধু এই যাদবপুর ঋতুতেই যে তাদের ভোল পাল্টে তারা মিস্টার হাইড হয়ে যায়, সে দোষ পুলিশের নয়, এই মরশুমের। বসন্তে যেমন প্রেম জাগে, বর্ষায় জাগে রবীন্দ্রগান, রাত্তির যেমন গাঁদি লাগা ভিড় জমে নাইট ক্লাবে, সেইরকমই যদু-ঋতুতেই ক্ষেপে ওঠে পুলিশ।

এইভাবে জগতের বুকে প্রকৃতির আপন খেয়ালে বয়ে চলে ঋতুরঙ্গ। কাগজ খুললেই দেখতে পাবেন কেবলমাত্র গণপিটুনির সিজনেই গণপিটুনি ঘটে, ধর্ষণের সময় ধর্ষণ। দেখবেন লক-আপে শ্লীলতাহানিরও একটা নির্দিষ্ট মরশুম আছে। গোটা বিশ্ব জুড়েই প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালে, কখনও আবু ঘ্রাইব ঋতু, কখনও সাদ্দাম। আর আমরা, যে মানবশিশুরা একাকী এই বিশ্বপ্রকৃতির বুকে বিস্ময়ে ভ্রমণ করে চলি, তাদের পবিত্র কর্তব্য হল এই ঋতুরঙ্গের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। যখন যে ঋতু আসবে সেইরূপ পোষাকই পরিধান করবেন, নচেৎ লোকে পাগল বলবে। আবু ঘ্রাইব ঋতুতে পরবেন ঘৃণার পোশাক, লন্ডন ঋতুতে শোক, আর ক্রিকেটকালে আনন্দ। যাদবপুর ঋতুতে গণপিটুনির খোঁজ নিতে যাবেননা,লন্ডন ঋতুতে আবার ইরাকের সেই বুড়ো লোকটার কি হল জানতে চাইবেননা। জানতে ইচ্ছে হলেও ইচ্ছা দমন করবেন, এ সবই প্রকৃতির নিয়ম।