আপনার মতামত         


      স্ত্রী ভুমিকা বর্জিত একাঙ্ক নাটিকা: গুরুচন্ডালির একদফা


      দীপ্তেন


(স্থান : গুরুচন্ডালির সম্পাদক ঈশেনের ঘর। চারিদিকে বই'র বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি। পুরোনো খবরের কাগজ। টাইম টেবিল। নানান হ্যান্ডবিল। পায়ের কাছে একটা ছেয়ে রংএর বিড়াল খুব মুহ্যমান মুখ করে প্রবল নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। একটা কম্পিটারের সামনে বসে ঈশেন তারস্বরে নানান অস্তিত্ববাদী আওয়াজ করে যাচ্ছে। "উ: আ: আ হা।' আর কম্পিউটার থেকেও কেন কি জানি একটা একটানা ক্যাঁ ক্যাঁ আওয়াজ বেরোচ্ছে। পাশেই চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি। দেওয়ালে একটা আত্মভোলা টিকটিকি। ঈশেনের পরনে হাঁটু পর্যন্ত ঝোলা পাঞ্জবী আর ঢোলা পাজামা। নাকের উপর গোল্লামার্কা চশমা কিমিতিবাদী সংকটে খালি ঝুলে পড়ছে।

মামুর প্রবেশ। পরনে নীল বারমুডা ও লাল রঙের বাঘ মার্কা টি শার্ট। মুখে দুই গাল ভর্তি সে কি অমায়িক হাসি - কাবুলি বেড়ালেও লজ্জা পাবে। )

মামু: তো ঈশেন,এই গরু চন্ডালি নামটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।

ঈশেন: মামু,ইয়ার্কি কোরো না। একে গুরুজন তায় বয়সে বড়, তাই খিস্তি করলাম না। নামটা গুরু চন্ডালি। গুরু, - গুরু চন্ডালি।

মামু: আহা,চটিস ক্যান। গরু চন্ডালি নামটাই বা খারাপ কিসে? বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মাথা আর মায়াবতীর ন্যাজ - এই দুয়ে মিলে একটা সর্ব বর্ণ সমন্বয়। কেমন একটা রামধনু রামধনু ভাব। তা তোরা কি নিয়ে লিখিস রে ?

ঈশেন: খুব গুরুপাক, এনজাইম না খেয়ে পড়লে গায়ের লোম সব পড়ে যাবে,এই যেমন পোস্ট মডার্ন,পোস্ট কলোনিয়াল,পোস্ট মিস ইউনিভার্স ২২০৪,... ফুকো,লাকায় মাখামাখি একেবারে, মানে,ঐ বিনির্মিতি,ইয়ে,খুব একটা,মানে কিনা যাচ্ছেতাই রকমের,বুঝলে তো ?

মামু: একেবারে পরিষ্কার। সার্ফে কাচা। তা এখানে লেখে কারা ?

ঈশেন: ঝন্টুদা লেখেন। তিনি আবার ছদ্মনামে নিজের লেখাকে বেধড়ক গালি দিয়ে সমালোচনা করে পরের সংখ্যায় আরেক নামে সেই সমালোচককে ধুয়ে দেন। ওনার গালাগালি নিয়ে লেখাপড়া বিস্তর।

মামু: তো গন্ডগোল হয়ে যায় না ?

ঈশেন: হয় তো, আকচারই হয়। তো ঝন্টুদা বলেন পাঠকের সাথে মনোমালিন্যের সূত্র ধরেই তার আত্ম সমীক্ষন। ন্যাজ আর গোবরের যে মেলবন্ধন -সেই হেত্বাভাসেই তার কারুকলার বিচ্ছিতি।

মামু: বিচ্ছিতি ? তুই ঠিক জানিস ?

ঈশেন: হ্যাঁ। ঝন্টুদা বিচ্ছিতিই তো বলেন।

মামু: তা তোরা কবিতা ছাপাস না ? কবিতা ?

ঈশেন: কি বলছো মামু। কবিতা ছাড়া সাহিত্য পত্রিকা হয় নাকি ? এই সংখ্যাতেই তো রয়েছে অর্জুন পাঁচকড়ি চক্রবর্তী দস্তিদারের লেখা। উনি বাবা আর মা দুজনের পদবী আর মাসী আর পিসের দেওয়া দুটো নাম একই সাথে ব্যবহার করেন। বোঝো। খুব শক্তিশালী মাউস।

মামু: হ্যাঁরে - আমার মাছের বাজার কবিতাটা ছাপাবিনা ? সেই যে "ঝুলি থেকে বেড়োলো ম্যাও / তোমরা কেন যে এতো চেঁচাও' ?

ঈশেন: উফ্‌ফ্‌ফ্‌ফ। তুমি কিস্‌সু বোঝো না। অমন পদ্য নয়। অর্জুন পাঁচকড়ির প্যাঙ্গোলিন নিয়ে কবিতাটা পড়ে দেখো,সজারুর মনোবেদনা নিয়ে যা লিখেছেন। শোনো।
"রোমাঞ্চিত হলে পরে সজারুরও গায়ে কাঁটা দেয়? বোঝো তবে -প্রেমে ও রমনে - কেনো এতো স্থিতধী সজারু'। ঈস। চোখে একেবারে জল এসে যায়।

মামু: জিভেও জল আসে রে ঈশেন। সেবার মধুপুরে লঙ্কাবাটা দিয়ে লাল লাল ঝাল ঝাল সজারুর মাংস যা খেয়েছিলাম, উল্‌প্‌স।

ঈশেন: থামো তো মামু। আরো শোনো - "সারা গায়ে কাঁটা কিন্তু সোয়েটার বুনিতে শেখেনি, হা হতভাগিনি ইকি ইভোলিউশন মহতের' । এখানে ঈশ্বরকেও একহাত নিয়েছে - খেয়াল করেছো ?

মামু: কিন্তু প্যাঙ্গোলিন কই?

ঈশেন: ঐ। ঐ। ঐ খানেই তো কবির সততা আর বিনির্মিতির ধামাকা। ঐ কবিতায় নাম ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাবে না প্যাঙ্গোলিনকে। রবিদার ভাষায় ওরে পাগোল,ওরে ঠাকুর্দা, প্যাঙ্গোলিন যে রয়েছে লুকিয়ে আমার মনের গহীন কোণে। যখন আকাশের বীনায় বেজে ওঠে মেঘমল্লার - আর বাদলের গুরু গুরু মাদলের সাথে ঝংকার তোলে শ্রাবনের বারিধারা - তখন হায় পথবাসী হায় গৃহহারা হায়া ছাতাছাড়া - সবাই ভিজে একশা। তখন ঐ জলভরা ম্যান্ডোলিনের সাথে ও পাই না সেই প্যাঙ্গোলিনকে।

মামু: চিন্তায় ফেললিরে ঈশেন। তাইলে? আমাকে একটা সাবজেক্ট দেনা।

ঈশেন: জিবুতি। জিবুতি নিয়ে লেখো না কেনো মামু। জিবুতি?

মামু: ইয়ে। চিনি নাতো,ছোকরা কে?

ঈশেন: কি মুশকিল। ছোকরা কেন হবে? আফ্রিকার একটা দেশ। যদ্দুর জানি জিবুতি নিয়ে কেউ কবিতা লেখে নি। ওয়েস্টার্ন সোমালিয়া নিয়েও নয়।

মামু: না:। জিবুতি চলবে না। রেবতী ছাড়া মিল পাবো না। আর ওয়েস্টার্ন সোমালিয়া -দিল তো চুরা লিয়া - কি রকম জানি,ঠিক ভাল্লাগছে না। তার চে,বরং একটা প্রবন্ধ লিখি। আজকাল তো কত নতুন নতুন রক্ত হিম করা সাবজেক্ট বেড়িয়েছে , সেদিন পড়লাম একজন পণপ্রথার সমর্থনে দারুন নারীবাদী ইস্তাহার লিখেছে। অমন বাবাবিরোধী লেখা বহুদিন পড়ি নি। উ:।

ঈশেন: নরবলির সমর্থনে কিছু লেখো না? নাহলে মুর্গীর ইতিহাস? সেই আদিকাল থেকে শুরু করে কি ভাবে মানব সভ্যতা আবর্তিত হচ্ছে মহাকালের সাইক্লোট্রনে, আওয়াজ হচ্ছে কড়র কড়র,মড়র মড়র, আর সেই চিরন্তন শীৎকারের প্রেক্ষাপটে প্রোজ্জ্বল মানুষ ও মুর্গীর উৎকলা?

মামু: উৎপলা ? গান গায় ?

ঈশেন: উৎকলা। পলা নয়। কলা। মামু। মানেটা ঠিক জানি না। কিন্তু এইরকম করে শুরু করলে মনে হচ্ছে পাব্লিক খাবে। মসল্লা ভাবনার ঋদ্ধ এক বৌদ্ধিক দলিল।

মামু: আইডিয়াটা,ঈশেন,বেশ ভালো ই। রামরাজ্য ও রামপাখী - এক অন্তহীন সীজন টিকিট। কিন্তু অমন করে আরম্ভ করে তাপ্পর আমি কি লিখবো? তাছাড়া মুর্গীকে অতো প্রশ্রয় দিলে ময়ুরবাদীরা দুখখু পাবেন। জানিস তো আমার নরম মন। ভালো কথা - এই সব পড়বে কে?

ঈশেন: আমরা বিবাহিত ছাড়া লেখক নেই না। বিবাহিত হলে বাপের বাড়ী শ্বশুরবাড়ী -দু পক্ষকেই আমরা পাঠক হিসাবে পাই। গতবারের লেখিকা ছিলেন চিতল বাইসন। বিখ্যাত পশুপ্রেমিক নিতাইদার মেয়ে। তার নিজের ও শ্বশুরবাড়ী দুটো ই বিরাট জয়েন্ট ফ্যামিলি। তাছাড়া এক মামাশ্বশুরের split personality । এক ই লেখা সাতবার পড়েন। আরেক জ্যেঠুর মাথার ব্যামো - কিচ্ছুটি মনে রাখতে পারেন না। উনি ও উনিশ কুড়ি বার একই লেখা পড়েন। একেবারে সোনার খনি। তা চিতলদি এবার লিখেছেন প্রতীচ্যের পাবলিক টয়লেটের দেওয়ালের কারুশিল্প নিয়ে।


মামু: তা চিতল নিশ্চয়ই অনেক দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ান।কি বলে,প্রতীচ্যের পাবলিক টয়লেট নিয়ে এতো পড়াশুনা - শ্রদ্ধা হয়।

ঈশেন: আরে দুর,থাকে তো ভবানীপুরে। বেলেঘাটা আর পুর্ব পুটিয়ারীর পাবলিক ইয়ে নিয়ে লিখেছে।

মামু: তাইলে? তাইলে ঈশেন। আমি ই বা কিসে কম যাই ? খেয়াল রাখিস,"ভগবানের হাত" ফুটবল ক্লাবের অনারারী সেক্রেটারী আমি। ফুটবল আর এক্কাদোক্কা টীম নিয়ে প্রায় একুশ জন ওরে সবুজ ওরে আমার কাঁচা মেম্বার। বেশীর ভাগই বাপে খেদানো কিন্তু তাও দশ জন গার্জেন তো হবেই। তো আমার হাতেও ষন্ডা গুন্ডা তিরিশ জন জলজ্যান্ত পাঠক।

ঈশেন: সত্যি। সম্পাদকের আত্মপীড়নের বেদনা কেউ উ বোঝে না। কেউ উ না। ও হো হো হো হো। একদিকে পন্যকরনের সিডাকশন আর অন্যদিকে কৃষ্টির অবুঝপনা। কেউ কি বুঝতে চেষ্টা করে সম্পাদকের অনিকামত: প্রতিষ্ঠান?

মামু: অনি ..... কি বললি ?'

ঈশেন: ছোড়ো ইয়ার। মামু। তুমি বরং তোমার ঐ "মাছের বাজার হলো সারা যাবো যাদবপুর' কবিতাটা দিও। চন্ডালীও তো কিছু চাই।

মামু: ছি ছি । আমার পদ্যকে চন্ডালী বল্লি। তাহোক, সেটা কিছু গুরু ব্যাপার নয়।

(ঈশেনের ফুঁপাইয়া ক্রন্দন। মাঝে মাঝে নাক টানা। মামুর বত্রিশ কপাটি দন্ত প্রদর্শন। বাংলাবাজার হাসি। সমবেত শোক সংগীতের মধ্য দিয়া যবনিকা পতন।)