আপনার মতামত         


      তসলিমা নাসরিন, এবং আরো কিছু কথা

      ঈশান শর্মন


১।

তসলিমা নাসরিনের নাম প্রথম শুনি নির্বাচিত কলাম বইটির সুবাদে। কানে আসে বইটি চূড়ান্ত র‌্যাডিক্যাল এবং সারা বাংলাদেশে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কি এমন নতুন কথা লিখেছেন ঐ মহিলা, জানার আগ্রহে প্রায় দ্রুতপঠনের তৎপরতায় শেষ করে ফেলি নির্বাচিত কলাম, এবং, বলতে দ্বিধা নেই, বেশ হতাশই হই। গোটা বইটিতে এমন একটিও নতুন ধারণা খুঁজে পাইনি, যা ইতিপূর্বে বিভিন্ন নারীবাদী আখ্যানে বহুচর্চিত নয়। অবশ্য এরকমই হবার কথা, কারণ লেখাগুলি সংবাদপত্রে কলাম হিসাবে প্রকাশিত। আর সংবাদপত্রের কলামের কাছ থেকে অ্যাকাডেমিক তাত্ত্বিকতা প্রত্যাশা করা ঠিকও না। যতোদূর মনে করতে পারি, লেখাগুলির ভাষাও ছিল মেদহীন, মুচমুচে ও টানটান, সংবাদপত্রে যেমন হয়ে থাকে। সবমিলিয়ে বইটি তেমন দাগ কাটেনি, একটি মন্দ নয় বই হিসেবেই তাকে মনে রাখি। সঙ্গে শুধু একটি খটকা থেকে যায়, এই বই নিয়ে বাংলাদেশ এতো উত্তাল কেন?

বোধহয় সেই বছরই ই দেবেশ রায়ের একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয় শারদীয় আজকালে। জনৈকা মহিলা সাংবাদিক, বিহারের একটি গণধর্ষণের ঘটনার অনুসন্ধান করে ট্রেনে কলকাতা ফিরছেন। ঐ ট্রেনের কামরায়, আলোকিত, নিরাপদ আরামদায়ক এক আশ্রয়ে মহিলার মনে হয়, যে নারী মাত্রেই ধর্ষণযোগ্য। ফ্যাশানদুরস্ত শোভন পোশাকের নিচে মেয়েটি অনুভব করে, যে তারও একটি নারীশরীর আছে, যা ধর্ষণযোগ্য। কারণ, বিহার বা বাংলা নয়, নিরক্ষর বা উচ্চশিক্ষিত নয়,নারী মাত্রেই ধর্ষণযোগ্য। দেবেশ রায়ের ভয়াবহ ডিটেল ঠিক যেভাবে এই অনুভূতিতে পৌঁছে দেয়, তাতে কেঁপে উঠি, কেঁপে না উঠে উপায় থাকেনা। ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার এক বোধ বেশ কয়েকদিন ঘিরে থাকে, পিছু ছাড়েনা। নিজেকেই বারবার প্রশ্ন করি, এই লেখাটিকে ঘিরে কোথাও কোনো তাপউত্তাপ নেই, অথচ নির্বাচিত কলাম কেন বিতর্কিত? ক্রমশ: দিন কেটে যায়, দৈনন্দিন প্রাত্যহিকতায় তসলিমাকেও ভুলে যাবারই কথা, কিন্তু কোথায় যেন ঐ প্রশ্নচিন্‌হ মূর্তিমান অস্বস্তির মতো জেগে থাকে....

এরপর দিন গড়ায়। অন্তত পশ্‌চিমবঙ্গে নির্বাচিত কলাম নিয়ে উত্তেজনা থিতিয়ে যায়। বাংলাদেশের খবর, আমরা, এপারে একটু কমই রেখে থাকি। ফলে বাংলাদেশে বিতর্কের সীমানা ছাড়িয়ে তসলিমাবিরোধীতা ক্রমশ আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে কিনা আমাদের জানা হয়না। জানলেও তা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাতাম কিনা সন্দেহ। কারণ কোনো মতের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারের স্বাধীনতার নামই তো গণতন্ত্র। গণতান্ত্রিক মুখোশের আড়ালে সেই আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে উঠে তসলিমার মুন্ডু চাই দাবীতে রূপান্তরিত হতে পারে,এরকম কখনও ভাবি ই নি। এর পরে তসলিমা ভারতবর্ষে আবার শিরোনামে আসেন বাবরি মসজিদের পতনের পর। কোনো যাদুমন্ত্রবলে এদেশে হটকেকের মতো বিক্রি হতে থাকে লজ্জা। বইয়ের দোকান থেকে ফুটপাথ, সেখান থেকে ট্রেনে ফেরিওয়ালারা পর্যন্ত ফেরি করতে শুরু করে দেয় বইটি। মফ:স্বলের যেসমস্ত বইয়ের দোকানে পাঠ্যপুস্তক ছাড়া আর কিছু দেখা যায়নি কখনও, সেখানেও শোভা পেতে থাকে লজ্জার হার্ডকভার। কোনো বই নিয়ে, সত্যি বলতে কি এতো উন্মাদনা চোখে পড়েনি কখনও। নির্বাচিত কলাম নিয়ে বিতর্কের কথা শুনেছিলাম, এবার লজ্জা নিয়ে বিতর্ক নিজের চোখে দেখলাম। আগেরটি মতো এই বইটি ও পড়ে ফেলতে হয় সেই কারণেই, এবং কি আশ্‌চর্য এবারও আগেরবারের মতই হতাশ হই। হতাশ হই এই কারণে, যে বইটি পড়ে মনে হয় অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে লেখা একটি প্রচারমূলক উপন্যাস। আমি নিজে দাঙ্গা দেখিনি, দাঙ্গার ভয়াবহতা আমার কল্পনারও অতীত। কোথাও দাঙ্গা হয়েছে শুনলে একটি পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করে কর্তব্য সমাপন করি। এই বইটি আমাকে এমন কোনো অন্তর্দৃষ্টি দেয়না, যা পড়ে শিউরে উঠতে হয়, যেমন শিউরে উঠতে হয় মান্টোর লেখা পড়ে। সত্যি কথা বলতে কি, নির্বাচিত কলামে লেখিকার নিজের কন্ঠস্বরের আভাস কোনো কোনো জায়গায় শোনা গিয়েছিল বলে মনে হয়, কিন্তু এই বইটিতে মনে হয়, লেখিকা নিজেকে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী অফিসিয়াল ডিসকোর্সেই বন্দী করে ফেলেছেন, সেখান থেকে আর তাঁর মুক্তির আশা নেই। বইটি ঘিরে যে বিতর্ক গড়ে উঠছিল, তার নিচু মানও আমাকে হতাশ করে। বামপন্থী বুদ্ধিজীবিরা সমালোচনা করছিলেন এই বলে, যে, দাঙ্গার চরিত্র বড়ো বেশি একপেশে করে দেখানো হয়েছে বইটিতে। কোনো আশার আলো, কোনো প্রগতিশীল ইঙ্গিত, কোনো সূক্ষ্ম মানবতার বাণী দিয়ে কেন শেষ হলনা উপন্যাসটি, এই তাঁদের অভিযোগ। এইসব অভিযোগের সঙ্গে একমত হতে পারিনা। গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে একটি রূপালী বিদ্যুৎরেখা বানিয়ে তুলে একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে উপন্যাস লিখতেই হবে, এই দাবী নিয়ে যে আমার চারপাশের মানুষরা বিতর্কে প্রবৃত্ত হতে পারেন, তা চিন্তার অতীত ছিল। এঁরা কি পড়েননি মান্টোর জগৎ কাঁপানো দাঙ্গা নিয়ে লেখা সেই গল্পটি, যেখানে বারংবার ধর্ষিতা হতে হতে প্রায় অচেতন একটি মেয়েকে সম্ভবত একটি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তার প্রিয় পুরুষরা ঘিরে ধরে তাকে। পুরুষ কন্ঠের শব্দে প্রায় অচেতন সেই মেয়েটি, সেখানে, নিজের অজান্তেই উন্মোচিত করে দেয় নিজের যৌনাঙ্গ; দাঙ্গা ও ধর্ষণ একাকার হয়ে গেছে তার অবচেতনায়, পুরুষ কন্ঠ তার কাছে শুধু একটি বিশেষ বিষয়েরই প্রতীক এখন। হয়তো পড়েনই নি,মান্টোর নাম শুনে দুবেলা শুধু জয়ধ্বনি দিয়ে গেছেন চাকলাগামী বাবা লোকনাথের ভক্তকুলের মতো। এই উপলব্ধি, বলাবাহুল্য খুব আনন্দদায়ক নয়।

মজার কথা এই, যে এবারও সেই শারদীয় আজকালেই দেবেশ রায় লেখেন আরেকটি ভয়াবহ উপন্যাস, একটি দাঙ্গার অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন, এবং যথারীতি তা তসলিমা নিয়ে বিবদমান বুদ্ধিজীবিকূলের নজর এড়িয়ে যায়। পরে, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লেখেন একটি ছোটোগল্প, দাঙ্গার সঙ্গে আপাত: সম্পর্করহিত হয়েও যা সেই কটি দিনের দলিল হয়ে থেকে যায়। পরে ত্রিদিব সেনগুপ্তের একটি উপন্যাসও হাতে আসে, যা দাঙ্গার অনুষঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই সবকটি লেখা, এবং আরও ছোটোবড়ো পত্রিকায় প্রকাশিত অজস্র নানাবিধ রচনা বুদ্ধিজীবি ও সাধারণ মানুষের নজর এড়িয়ে যায়,যদিও, এদের কেউ ই ঐ নির্দিষ্ট ফরম্যাট মেনে কোনো অফিসিয়াল দাঙ্গাবিরোধী লেখা লেখেননি। সেই পুরোনো প্রশ্নটি এবারেও মাথা চাড়া দেয়,এই লেখাগুলি যথেষ্ট র‌্যাডিক্যাল হয়েও কোনো বিতর্ক আমন্ত্রণ করেনা, কিন্তু তসলিমা কেন বিতর্কিত? তাহলে কি বুদ্ধিজীবিরা যাদের এই বাংলার শ্রেষ্ঠ মননশীল লেখক আখ্যা দিয়েছেন, তাঁদের লেখাও পড়েননা? নাকি তাঁদের আসলে যতোটা বিদগ্‌ধ ভাবা হয়, তার অনেকটাই ভান, জটিল ন্যারেটিভ বা ন্যারেটিভহীনতা তাঁদের আয়ত্তের বাইরে? পুরোনো অস্বস্তিকর সেই উপলব্ধি আবার মাথাচাড়া দেয়। অত্যন্ত সরলীকরণ হয়ে যাচ্ছে এই সমীকরণ, নিজেকেই বোঝাই। প্রশ্ন তবু পিছু ছাড়েনা। তাহলে কি আক্রমনের লক্ষ্য স্থির করার অন্য কোনো সমীকরণ আছে, যা আমার জানার সীমারেখার বাইরে? গূঢ় কোনো জটিল প্রক্রিয়া কি অন্তরাল থেকে নির্দিষ্ট করে দেয় কোন লেখাটি বিতর্কিত আর কোনটি নয়? এই প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে নন্দন পত্রিকায় প্রকাশিত ত্রিদিব সেনগুপ্ত রচিত একটি উপন্যাসের কথাও মনে আসে, যাকে ঘিরে অশ্লীলতার অভিযোগ দানা বেঁধেছিল। আশ্‌চর্যজনকভাবে, সেই লেখাতে কোনো প্রকট যৌনতাই আমি খুঁজে পাইনি। যেটুকু ছিল, তা বাজারের চালু বইগুলির তুলনায় নগণ্য বলে উপেক্ষাই করা যেতে পারে। তফাৎটা শুধু এখানে ছিল, যে ঐ উপন্যাসটিতে বর্ণিত যৌনতার উপাখ্যান আশ্‌চর্যজনকভাবে সেরিব্রাল, এবং তা একটি নারীর যৌনতা, প্রথাসিদ্ধ পুরুষযৌনতা নয়। নারীর যৌনভাবনা বলেই কি ঐ বিতর্ক? অথবা ভাষাভঙ্গীটি অপ্রচলিত বলে? তাও নয়, কারণ ঐ একই সময়ে সুবিমল মিশ্র বাংলা গদ্যকে ভেঙ্গে চলেছেন যৌনতার ধাক্কায়, ভাষার কালাপাহাড়ি আঘাতে, তাঁর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ তো এতো প্রকটভাবে ওঠেনি কখনও? বিপনন কৌশল? তাও নয়, কারণ এর কোনো নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক কৌশল থাকলে সব প্রকাশকই তা প্রয়োগ করতেন নিশ্‌চয়ই। আমি ভাবতেই থাকি, তবে কি সেই সমীকরণ, যে কারণে কিছু কিছু লেখা আক্রান্ত হয়, আর বাকিরা আপাত: দৃষ্টিতে তার চেয়েও বিপজ্জনক হয়ে নিরাপদ থেকে যায়? কি সেই কারণ, যাতে কেউ কেউ বিতর্কিত, কিন্তু বাকিরা নন? ভাবতেই থাকি, শেষমেষ কিন্তু হাতে থেকে যায় শুধু পেনসিল.... প্রশ্নটা খুব সহজ নয়, আর উত্তরও বাতাসে ভেসে যায়না।




প্রায় এই সময়ে, বা এর একটু আগেই হবে, ব্যক্তিগতভাবে একটি দু:খজনক ঘটনার সাক্ষী হতে হয় আমাকে। কলকাতা থেকে সামান্য দূরে, আমাদের লোকালয়ে, পুলিশের হাতে একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। একটি যুবতী মেয়ে, কোনো কারণে থানায় ছিল এক রাতে, এবং কয়েকজন আইনরক্ষক তাকে ধর্ষণ করে। পরদিন সকালে এই ঘটনা জানাজানি হলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয় এলাকা জুড়ে। বিরোধী দলনেতারা দলবল জুটিয়ে থানা অবরোধ করেন। প্রচন্ড গোলমাল হয়, পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে একজনের মৃত্যু হয়, এবং কয়েকজন আহত। সরকারি তদন্ত শুরু হয়, এবং সম্ভবত: কয়েকজন পুলিশের শাস্তি ও হয়। সমস্ত এলাকাজুড়ে স্বভাবত:ই প্রচন্ড উত্তেজনা। যাঁরা সেদিন সকালে উঠে অফিস চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের বাদ দিয়ে পাড়ার প্রায় সবাই ই ঐ গুলিচালনার সাক্ষী, এমনকি মেয়েরাও। পাড়ার একটি ছেলে আহতও হয়, অবশ্য আঘাত গুরুতর নয়। কয়েকদিন পরে উত্তেজনা একটু থিতিয়ে এলেও আলোচনা চালু থাকে পাড়ার মোড়ে, মেয়েদের বৈকালিক গল্পের আসরে। এই রকমই এক আসরে কান পেতে একদিন শুনতে পাই ধর্ষিতা মেয়েটির চরিত্র নিয়ে কানাকানি। মহিলা আন্দোলনের কয়েকজন স্থানীয় নেত্রী, যাঁরা ধর্ষণকারীদের শাস্তির দাবীতে মুখর ছিলেন সেদিন, গুলি চালনার সময়েও ঘটনাস্থলে ছিলেন সাহসে ভর করে, তাঁদের কয়েকজনও উপস্থিত সেই আসরে। সেখানে কাটাছেঁড়া হচ্ছিল মেয়েটির চরিত্রের সমস্ত অংশ নিয়ে, আলো জ্বেলে চিনে নেওয়া হচ্ছিল তার আচরণের সকল অলিগলি, তার ছেলেঘটিত কাহিনীসমগ্র গোপন রহস্যগল্পের মতো পৌঁছে যাচ্ছিল এক কান থেকে আর এক কানে। প্রশ্ন একটিই,এতো তো মেয়ে আছে এলাকায়। তাদের অনেকেই দেরি করে ফেরে, সবাই যে খুব নিরীহ শান্তশিষ্ট তা তো নয়, অনেকেই ছেলেচরানো বলে নাম কিনেছে, কারো কারো পোশাক আশাকও বেশ উত্তেজক, কিন্তু এদের সবাইকে বাদ দিয়ে ঐ মেয়েটির সঙ্গেই এই ঘটনা ঘটল কেন? কারণ ছাড়া কোনো কার্য হয়না। নিশ্‌চয়ই ছিল কোনো ইন্ধন, নিশ্‌চয়ই মেয়েটির স্বভাবচরিত্র ঠিক ছিলনা,বা নিশ্‌চয়ই এমন কোনো সমীকরণ ছিল, এমন কোনো গূঢ় বিচ্যুতি ছিল যা ঐ ঘটনা ঘটিয়েছে। কেউ ই জানেননা ঠিক কি ছিল সেই বিচ্যুতি যে কারণে ঐ মেয়েটি ই আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কেউ জানেননা বলেই তো গবেষণা, কারণ, কারণ ছাড়া কোনো কার্য হয়না।

এই ঘটনার সূত্রেই আমি প্রথম জানতে পারি, ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্তের পক্ষের আইনজীবিরা সর্বপ্রথম আক্রমণ করেন অভিযোগকারিণীর চরিত্রের উপর। এও সেই একই প্রক্রিয়া, যেখানে খুঁজে বার করার চেষ্টা হয় সেই প্রশ্নটির উত্তর, যে, কেন এতো মেয়ে থাকতে তোমার উপরেই নেমে এল আক্রমণ। আক্রান্তকে প্রশ্ন করা হয়, কেন তুমি আক্রান্ত? অবশ্য শুধু মেয়েরাই বা কেন, যেকোনো আক্রান্তের ক্ষেত্রেই কি ঠিক এইরকমই ঘটেনা? শোনা কথা, সমাজবিরোধীদের হাতে মার খেয়ে মাথা ফাটিয়ে থানায় যাবার পর প্রশ্ন করেছেন তদন্তকারী অফিসার, ওরা তো এমনিতে কিছু বলেনা, তোমাকে মারল কেন? ইরাক দখল করে নেবার পর সাদ্দাম হুসেনকেও ঠিক এই প্রশ্নই কি করা হচ্ছেনা, যে, কই আর কোনো দেশকে তো আক্রমণ করেনি আমেরিকা, তোমাকে কেন?

আক্রান্ত মেয়েটি এরপর সরকারী ভাবে ঐ প্রশ্নের প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকে পড়ে। তাকে অভিযুক্তের উকিল প্রশ্ন করেন, কেন তুমি? জনমত, সংবাদপত্র জানতে চায়, কেন তুমি? বিচারক জানতে চান কেন তুমি ই? কেন অন্য কেউ নয়? ধর্ষণকারীদের শাস্তির দাবীতে যাঁরা আন্দোলন করছিলেন, তাঁদের খুশী করে অভিযুক্ত পুলিশদের শাস্তি হয়। কিন্তু শুধু এটুকু বললে অর্ধসত্য বলা হয়। কেন তুমি? এই প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটি কোনো সন্তোষজনক উত্তর বোধহয় দিতে পারেনি, তাই তাকেও পাঠানো হয় আর এক কারাগারে, যার পোশাকী নাম হোম। সেখানে বোধহয় তার শেখার কথা ঠিক কিরকম আচরণবিধি মেনে চললে এজীবনে তাকে আর ধর্ষণের স্বীকার হতে হবেনা। যতোদূর জানি, মেয়েটি আর্থসামাজিক ভাবে একটু নিচের তলার দূরন্ত প্রকৃতির একটি মেয়ে ছিল। হোম থেকে এরপর সে পালায় একদিন, সংবাদপত্রের দ্বিতীয় পাতায় ছোটো করে সে খবর ছাপা হয়। তারপর আবার ধরা পড়ে, ঐ হোমেই তাকে নিয়ে আসা হয়, এবং কয়েক বছর পর কোনো অজ্ঞাত কারণে সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে। জীবনযাপনের যথার্থ আচরণবিধি এ জীবনে তার আর শেখা হয়নি।

এই ঘটনার পরই আমি সচকিত হয়ে ভাবতে শুরু করি,তসলিমার ক্ষেত্রেও আমি নিজেই কি ভাবিনি, যে তসলিমাকে নিয়ে কেন এতো আক্রমণ, বিতর্কিত হবার এতো লক্ষ লক্ষ উপাদান পড়ে থাকতে? এই সেদিনও এক বাংলাদেশি "প্রগতিশীল' ভদ্রলোকের সঙ্গে এনিয়ে একচোট কথা কাটাকাটি ই হয়ে গেল। তিনি বারবার আমাকে বলছিলেন, বাংলাদেশে তসলিমার চেয়েও র‌্যাডিক্যাল বহু লেখা লেখা হচ্ছে, যাঁরা লিখছেন তাঁদের তো আর দেশ ছাড়তে হয়নি। লক্ষ্য করি, আক্রান্তকেই আবার প্রশ্ন করা হচ্ছে, বলো ওরা কেন তোমাকে আক্রমণ করল? তোমার চেয়েও সাহসী লোক আছেন, তোমার চেয়েও র‌্যাডিক্যাল লেখা লিখছেন বহু মানুষ, তোমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি পলিটিক্যাল লোকজন আছেন দেশে, নারীবাদী ও কম নেই,তাদের ছেড়ে কেন তোমার উপরেই আক্রমণ? ভদ্রলোক পন্ডিত মানুষ, তাঁকে আমি বোঝাতে পারিনি যে কেন তুমি আক্রান্ত এই প্রশ্ন আক্রান্তকে করা যায়না, সেও ঐ একই কারণটি খুঁজে চলেছে। ভদ্রলোককে বোঝাতে পারিনি, কিন্তু আমি নিজে অনুভব করি, এই সেই প্রক্রিয়া, যখন একদিন সকালে জোসেফ কে হঠাৎই অভিযুক্ত হয়ে যায় আইনের চোখে। তারপর থেকে জোসেফ কে-র সম্পূর্ণ যাত্রাই হয়ে দাঁড়ায় সেই অদৃশ্য অপরাধকে খুঁজে বার করার প্রক্রিয়া, যারে শেষ পর্যন্ত সে অসফল হয়, এবং ঘনিয়ে আসে শেষ পরিণতি। অনুভব করি, এই সেই প্রক্রিয়া,যাতে একদিন সকালে উঠে হঠাৎই এক মানুষ দেখতে পায়, সে এক বৃহদাকার পোকায় রূপান্তরিত হয়েছে। তার অফিসের বস প্রশ্ন করেন, তুমি পোকা হয়ে গেলে কিকরে? প্রিয়জনেরা জানতে চায়, কই আর কারো জীবনে তো এমনটা ঘটেনি? তুমি কেন? আর সেই পোকা নিজেকেই প্রশ্ন করে চলে অবিরত, কি সেই পাপ, যার ফলশ্রুতিতে এই কীটজন্ম, এই অবাঞ্ছিত দ্বিজত্ব? কি সেই কার্যকারণ, যাতে অন্য কেউ নয়, সে এবং একমাত্র সে ই অভিশপ্ত? কি সেই অপরাধ? সেই না জানা অপরাধের বোঝা বইতে বইতে একদিন সে পালকের মতো হাল্কা এক মৃতদেহে পরিণত হলে প্রিয়জনেরা তাকে বিড়াল পার করে এই বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি লাভ করেন। যদি হিংসার মাপকাঠিতেই একে মাপা হয়, তবে, যে প্রক্রিয়া একজন মানুষকে কীট বানিয়ে তোলে, তার চেয়ে যে প্রক্রিয়া ঐ কীটকে মৃতদেহে পরিণত করে, তা অনেক অনেক বেশি হিংস্র।




তসলিমাকে চাক্ষুষ দেখি এর বেশ কিছুদিন পরে, কলকাতায় একটি বইয়ের প্রকাশানুষ্ঠানে। বইটি সম্ভবত আমার মেয়েবেলা। কফি হাউস থেকে বেরিয়ে কলেজ স্ট্রীটের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে পূর্বপরিকল্পনাহীনভাবে হঠাৎই অনুষ্ঠানটিতে পৌঁছে যাই। তখনই সম্ভবত তসলিমা দেশছাড়া, মাথার উপর ফতোয়া জারিও হয়ে গেছে। যতদূর মনে করতে পারি, চূড়ান্ত নিরাপত্তার আয়োজন ছিল সভাটিকে ঘিরে। বইটি প্রকাশ করেছিলেন এমন একটি প্রকাশনা যাঁদের কট্টর বামপন্থী বলে প্রসিদ্ধি আছে এপার বাংলায়। শুনেছি তসলিমা নাসরিনের বই প্রকাশ করছেন বলে প্রকাশনাটিকে যথেষ্ট সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছিল। কারণ, বামপন্থী বুদ্ধিজীবিরা তখনও লজ্জার লেখিকা তসলিমাকে নিয়ে তাঁদের পুরোনো অবস্থানে অটল। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যমুখীনতা তথা মার্কেটিং গিমিকের অভিযোগ। সেই সভায় ঐ প্রকাশনার তরফে বক্তব্য রাখতেও উঠেছিলেন এমন একজন বুদ্ধিজীবি, কট্টর গাঢ় লাল বামপন্থী হিসাবেই যাঁর পরিচিতি। তিনি দু একটি বাক্য বলার পরেই বুঝতে পারি,আসলে এইসব সমালোচনার জবাবই দিচ্ছেন তিনি। ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক,কোনো একটি সংস্থার একটি অনুষ্ঠানে অবশ্যই সেই সংস্থার প্রতিনিধি নিজের সমর্থনে এবং সমলোচকদের বিপক্ষেই কথা বলবেন, এর মধ্যে অস্বাভাবিকতা কিছুই নেই। কিন্তু বক্তব্য মধ্যপথে গড়ানোর পর সত্যি ই অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করি, যখন দেখি ভদ্রলোক প্রাণপনে তসলিমাকে তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক মতের শরীক প্রমাণ করার চেষ্টা শুরু করেছেন। ব্যাপারটা হাস্যকরও লাগে যখন দেখি তসলিমার একটি বই, সম্ভবত: নির্বাচিত কলাম থেকে একটি উদ্ধৃতি পাঠ করে তিনি সিদ্ধান্ত টানেন, তসলিমা এখানে মাটির কথা বলেছেন, আমরাও তো এই মাটিরই কথা বলে থাকি। উদ্ধৃতিটি হয়তো যথাযথ হলনা। স্মৃতি থেকে বলছি, ওটা মাটি না হয়ে ভাতও হতে পারে। কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে, এই কথা শুনে পাশে বসে থাকা বন্ধু আমাকে ফিসফিসিয়ে বলে, মার্কস ও তো ঈশ্বর শব্দটি লিখেছেন কোনো কোনো জায়গায়, সেখান থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে না ধর্মপ্রচার শুরু হয় এবার।

তসলিমা ডান না বাম আমার জানা নেই, সম্ভবত বাম ঘেঁষাই হবেন। কিন্তু তাঁর রচনার কোনো অংশে, কখনও কোনোভাবেই অফিসিয়াল বামপন্থার চিন্‌হমাত্র পাইনি। সেটা ভালো না খারাপ, বা বামপন্থী ঘরাণা বলে যা প্রচলিত, তা কতটা যুক্তিযুক্ত তা ভিন্ন আলোচনার বিষয়, কিন্তু লেখক হিসাবে তসলিমাকে কোনোভাবেই কি প্রথাগত বামপন্থী ঘরাণার অন্তর্ভুক্ত করা যায়? তবে কেন এই অসদাচারণ? প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়, যখন আমার মেয়েবেলা বইটি হাতে আসে। বইটি পড়ে মুগ্‌ধ হয়ে যাই। এই প্রথম তসলিমার লেখনীতে দেখি গাঢ় অনুভবের ছাপ, ভাষায় দেখি অর্জিত নিজস্বতা। ঘৃণা, ভালোবাসা, নিমগ্নতা মেশানো সে এক অনন্যসাধারণ উচ্চারণ, যা একই সাথে কাছ ও দূর থেকে দেখে বাস্তবতাকে। এই মুগ্‌ধতার সঙ্গেই আবার ফিরে আসে সেই প্রশ্ন। প্রকাশক হিসাবে আমার আগেই নিশ্‌চই ঐ বই পড়ার সুযোগ হয়েছিল বক্তা ভদ্রলোকের। এই বই পড়েও তিনি কিভাবে নিজের রাজনৈতিক মতবাদের শরীক করে নিতে চাইলেন তসলিমাকে? সত্যিই কোথাও এতটুকু মিল আছে এই বইয়ের প্রকাশভঙ্গীর সঙ্গে ঐ ভদ্রলোকের গাঢ় লাল রাজনৈতিক বিশ্বাসের?
ধাঁধা আরও বেড়ে যায়, যখন দেখি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সমালোচনা করেছেন এই বইয়ের। ভাষার সমালোচনা করতেই পারতেন তিনি, সন্দীপনের চেয়ে ভালো বাংলা কেই বা লিখতে পারে এ পৃথিবীতে। কিন্তু স্তম্ভিত হয়ে দেখি, সন্দীপন, ভাষা নয়, সমালোচনা করছেন এই বইয়ের কনটেন্টের, থুতু উপর দিকে ছুঁড়লে নিজেই গায়েই পড়ে, এইরকম কোনো একটি বাক্যে। যে লেখক বলে থাকেন নিজের রক্ত ও মাংস ব্যতীত কিছুই তিনি লেখেননা, কারণ তিনি বানিয়ে লিখতে পারেননা, তাঁর মুখে এই সমালোচনায় আমি স্তম্ভিতর চেয়েও বেশি কিছু হই, যা ভাষাতীত। নিজের জীবন, পাশে থাকা বন্ধুবান্ধব, প্রিয়জন, পিতা মাতা স্ত্রী কন্যা কাকেই বা সন্দীপন রেহাই দিয়েছেন নিজের লেখনীর সুতীব্র আঘাত থেকে? সেই লেখক কিভাবে এই কথা বলেন? কোন জায়গা থেকে? নৈতিকতার কোনো বিচিত্র বোধ থেকে? তাও কি সম্ভব? নিজেকে আবারও করতে হয় সেই প্রশ্নটি, কেউ কাউকে আক্রমণ করবেন, আর অন্য কেউ সমর্থন করবেন, এর পিছনে কি অন্যতর কোনো কারণ আছে, যা আমার বোধের অগম্য? কোন যাদুমন্ত্রবলে একটি বামপন্থী প্রায়রাজনৈতিক প্রকাশনা ছাপে তসলিমার বই, আর সন্দীপন তাকে আক্রমণ করেন নৈতিক এক অবস্থান থেকে? রাজনৈতিক বিশ্বাস নয়, ভাষাচেতনা নয়, জীবনবোধ নয়, নৈতিকতা নয়, আক্রমণ ও সমর্থনের প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে কোন সে গাঢ়তর বোধ? যুক্তি নয়, আবেগ নয়, একি কোনো জান্তব তাড়না, কোনো বিশ্বাস? কি সেই বিশ্বাস?




বিশ্বাস সংক্রান্ত এই প্রশ্ন অবশ্য নতুন কিছু না। এই তো সেদিন কার্গিল নিয়ে সীমান্ত সংঘর্ষের সময়ের ঘটনা। একদল রাজনৈতিক কর্মী যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি স্ট্রীট মিটিং করছিলেন শিয়ালদা স্টেশনের কাছে। সেই সভায় আমি নিজে ছিলামনা, পুরোটাই শোনা ঘটনা। শিয়ালদা স্টেশনের ঠিক সামনে এরকম কতো অজস্র মিটিং হতে দেখেছি, কেউ কান ও দেয়না, ট্রেন ধরার ব্যস্ততায় ফিরেও তাকায়না। কিন্তু ঐ বিশেষ মিটিংটির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার ঘটেছিল। যুদ্ধের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখতে শুনে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়ল জনতা। অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে পুলিশ চলে এল সভার বক্তা আর আয়োজকদের গ্রেপ্তার করতে। তাদের আদালতে তোলা হল দেশদ্রোহিতার অপরাধে। বিচারক জামিন দিতে অস্বীকার করলেন। কিছু যুদ্ধবিরোধী তরুণ তরুণী হঠাৎই দেশদ্রোহী হয়ে গেল।

এরপর অবশ্য বামফ্রন্ট সরকারের হস্তক্ষেপে সকলকেই মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু ঠিক কি সেই বিশ্বাস যাতে রাতারাতি ঐ কয়েকটি ছেলেমেয়ে উপস্থিত সকল মানুষ, পুলিশ, বিচারক, এমনকি গোটা একটি দেশের শত্রু হয়ে উঠলেন? যুদ্ধবিরোধী কথা তো সকলেই বলে থাকেন। এমনকি নিতান্ত অরাজনৈতিক মানুষেরাও পাকিস্তান ভ্রমণ করে এসে শান্তির সময়ে বিবৃতি দেন, দুদেশের মানুষরা নাকি যুদ্ধ চাননা, শুধু কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ জিইয়ে রাখতে চায় শত্রুতাকে। শুধু এইটুকুই নয়, অনেকেই এর চেয়ে আরও বিপজ্জনক কথাও বলে থাকেন। সুবিমল মিশ্র সেই কবেই লিখেছিলেন, ভারতবর্ষ নামক কোনো কিছুর অস্তিত্ব আমার কাছে নেই, তাও বিশ্বাস করতে হয়, নইলে পুলিশ পেটাবে বাপের নাম খগেন করে দেবে। আরও লিখেছিলেন, হাতের সব আঙুলে বড় বড় আংটি পরতে হয়, নইলে বাড়িতে গৃহযুদ্ধ বেধে যাবে। ভারতবর্ষ আর আঙুলে গ্রহরত্ন পরা তাঁর কাছে একই রকম অন্ধত্ব। অনেকেই সুবিমল মিশ্রকে লেখক নামের অযোগ্য মনে করে, কিন্তু দেশদ্রোহী তো কাউকে বলতে শুনিনি?

আসলে বিশ্বাস, কোনো বিশ্বাসই প্রতিপক্ষহীন ভাবে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। দেশ নামক বিশ্বাসের কথাই ভাবুন। দেশকে তো মানচিত্র ছাড়া চোখে দেখা যায়না। আর ম্যাপেও যা দেখা যায় তা থেকে দেশ নামক একটা বস্তুর ধারণা করা অসম্ভব। দেশ বলতে আমরা বুঝি চারদিকে যা দেখি। রাস্তা ঘাট, লোকজন,রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকার, আইন আদালত ট্রাম বাস পুলিশ প্রশাসন। সেই দেখা দিয়ে খুব ভাসাভাসা একটা ধারণা ছাড়া অন্য কিছু সম্ভব নয়। এবং সেই ধারণাও খুব একটা গৌরবজ্জ্বল কিছু না। দেশের নেতারা চোর, যুদ্ধ জিইয়ে রাখা হয় যাতে অস্ত্র কেনাবেচায় কাটমানি নেতাদের হাতে আসে, নচেৎ দুদেশের সাধারণ মানুষ যুদ্ধ চায়না, এইসব কথা প্রতিটি শিক্ষিত মানুষই কোনো না কোনো সময়ে বলেছেন। কিন্তু এ সেই অতি প্রাচীন ঐতিহ্য, যে, যেই যুদ্ধ বাধে,দেশ নামক বোধটি সকলের সামনেই পরিষ্কার হয়ে যায়। কারণ, চোখের সামনে দেখা যায় শত্রুকে। বোঝা যায়, দেশ এমন এক অস্তিত্ব, যা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সদা অতন্দ্র। যা শত্রুর বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে আমাদের জীবনে শান্তি আনছে। এই শত্রুকে চোখে দেখা যায়না,কারণ কোনো মানুষ নয় শত্রু একটি দেশ,অনুভব করা যায়না কারণ যুদ্ধ চলে বহুদূরে। এই শত্রু এক প্রতীক। দেশ নামক বিশ্বাস, শত্রুরাষ্ট্র নামক এই প্রতীকটি দ্বারা সংজ্ঞায়িত।

বহু বছর আগে, জীবনানন্দের একটি বিখ্যাত কবিতার তিনটি ব্যাখ্যা পড়েছিলাম তিনজন পরবর্তী প্রজন্মের কবির রচনায়। সম্ভবত: একটি পত্রিকারই তিনটি সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ঐ তিনটি লেখা। বলাবাহুল্য, ঐ কবিতার বাক্‌প্রতিমা ও প্রতীকগুলির আড়ালে যা লুকিয়ে আছে, তার ব্যাখ্যায় তিনজন ঐকমত্য হননি। একজন লিখেছিলেন, উদ্দাম প্রেতশরীরের নৃত্যভঙ্গীমার আভাস পেয়েছেন। দ্বিতীয়জন লেখেন সম্পূর্ণ ভিন্নতর একটি অনুভূতির কথা, যার সঙ্গে প্রেতশরীর বা নৃত্যভঙ্গীমার কোনো সম্পর্কই নেই। বস্তুত: তিন কবি কবিতার প্রতীকগুলির ব্যাখ্যায় তিনটি ভিন্ন মেরুতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এতে দোষের কিছু নেই, কারণ, প্রতীক মাত্রেই বিভিন্ন ভাবে অনুভূত হয় বিভিন্ন মানুষের কাছে। প্রতিটি প্রতীকেরই অসংখ্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে।

দেশ নামক বিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য শত্রু নামক প্রতীকটির প্রয়োজন। প্রতীকই যখন, এই শত্রুরও অসংখ্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকে। দূরে, বহুদূরে আছে যে শত্রু, যাকে চোখে দেখা যায়না, সেতো প্রতীকই। তাকে যেমন ভাবে খুশি ব্যাখ্যা করা যায়। যখন যুদ্ধ থাকেনা, বা যখন যুদ্ধ চলে সুদূর সীমান্তে, তখন, এই প্রতীক তেমন উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারেনা বিশ্বাসের শরীরে। বহুদূরে, সীমান্তে, যে সীমান্তে কখনও যাইনি, সেখানে একদল ইউনিফর্ম পরিহিত লোক আরেকদল ইউনিফর্ম পরিহিত মানুষের সঙ্গে হাতাহাতি লড়াই, মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত, এই সুদূর বাস্তব, তার দূরত্বের কারণেই কিছুটা ফিকে হয়ে যায়। ফলে বিশ্বাসকে চাঙ্গা রাখতে প্রতিনিয়তই চাই নতুনতর শত্রু। যে শত্রু হলেও অনেক বেশি কাছের, যাকে হাত বাড়ালেই হাতের কাছে পাওয়া যাবে আঘাত করার জন্য, প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস জিইয়ে রাখার জন্য দরকার একজন ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষ।

এই স্থানীয় শত্রু বা প্রতিপক্ষ খুঁজে নেবার পদ্ধতিও একান্ত ভাবেই স্থানীয়। শত্রু নামক প্রতীকটি স্থানীয়ভাবে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, এই স্থানীয় শত্রু ঠিক তাই। যেমন, ভারতবর্ষের শত্রু পাকিস্তান। পাকিস্তান একটি অতি দূরবর্তী প্রতীক। তার স্থানীয় রূপায়ন হল স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠী, বা সেই রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলি যারা যুদ্ধের বিরুদ্ধে। এই ভাবে যে শত্রুকে খুঁজে নেওয়া হয়, সে কি বলে, বা করে, বিশ্বাসী মানুষরা তা জানার প্রয়োজন অনুভব করেননা। শুধু দূরবর্তী প্রতীকটি সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট চিন্‌হ মিলিয়ে দেখে নেওয়া হয়। যদি চিন্‌হগুলি মিলে যায় তবে শত্রু। যদি না মেলে তবে মিত্র। যেকোনো বিশ্বাসের পক্ষেই কিছু স্থানীয় শত্রু খুঁজে বার করা একান্ত প্রয়োজন, যার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম করে বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা এবং জোর বজায় রাখা যায়। আর শত্রু হিসাবে চিন্‌হিত হলেন যে মানুষ বা মানুষটি, গৌণ হয়ে যায় তাঁর বক্তব্য। জেগে থাকে শুধু মিলে যাওয়া চিন্‌হগুলি।
শিয়ালদা স্টেশনের ঐ রাজনৈতিক কর্মীরা ঠিক কি বলছিলেন, বা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ঠিক তাঁদের বক্তব্য কেউ শুনে দেখেনি, শোনার প্রয়োজন বোধ করেনি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চলছিল যুদ্ধ, বহুদূরে, কার্গিলে। সেই প্রতিপক্ষের একটি নিকটতর প্রতিরূপ প্রয়োজন ছিল। শুধু চিন্‌হগুলি মিলিয়ে নেওয়া হয়েছিল সে কারণে। তুমি দেশের যুদ্ধপ্রচেষ্টাকে সমর্থন করো? করোনা। অতএব, তুমি শত্রুর সঙ্গে একই সারিতে দাঁড়িয়ে আছ। তুমি ও শত্রু, গণশত্রু। যুদ্ধের বিরুদ্ধে বলছিলে তুমি, তার মানেই তুমি শত্রুর পক্ষে। তোমার বক্তব্যকে আমরা আমাদের মতো করে অনুদিত করে নেব, কারণ, বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে মিত্রের পাশাপাশি আমাদের একজন শত্রুও চাই, যার বিরুদ্ধে আক্রমন শানিয়ে আমাদের বিশ্বাসকে শাণিত রাখব।




আন্দাজ করতে পারি, তসলিমার ক্ষেত্রেও এইরকমই ঘটেছিল। তোমার চারটে বিয়ে, অর্থাৎ স্বেচ্ছাচারিণী, ব্যভিচারিণী। নারীবাদী লেখা লেখ, ফলে সোনায় সোহাগা। পুরুষ দেখলেই মুন্ডু চিবিয়ে খাও। বিছানায় নিয়ে গিয়ে রক্ত চুষে নাও। লিঙ্গ ছিঁড়ে নিতে চাও। ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে লেখ, দাঙ্গার বিরুদ্ধে লেখ, অর্থাৎ ইসলামবিরোধী। এবং এই সবকিছুই কিঞ্চিৎ অপরিপক্কভাবে লেখা। তসলিমা যে খুব উঁচুমানের তাত্ত্বিক একথা তাঁর পরম মিত্রও বলবেনা। এই তো সেদিন, সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে তাঁর একটি সাম্প্রতিক রচনা পড়লাম, লেখাটি শুরু হয়েছে সেকুলার শব্দটির সঠিক অর্থ একটি অভিধান থেকে উদ্ধৃত করে। শব্দের বা বর্গের সঠিক অর্থ অভিধান থেকে অনুসন্ধান করার পদ্ধতি তো কোনো কন্টেম্পোরারি তাত্ত্বিক অনুসরণ করবেননা কখনও। এইভাবে লেখার ফলে দুটো জিনিস হয়েছে। এক, তাঁর লেখা তাঁর শত্রুদের কাছেও সহজবোধ্য। সলমন রুশদিকে ইসলামের শত্রু হিসাবে চিন্‌হিত করা খুবই কঠিন, কারণ তাঁর রচনা এক ধরণের দীক্ষিত পাঠক ছাড়া কেউ ই চট করে বুঝবেননা। কিন্তু তসলিমার ক্ষেত্রে এই সমস্যা নেই। বাংলা অক্ষরজ্ঞান থাকলেই তসলিমার লেখা থেকে ইসলামবিরোধী চিন্‌হগুলি খুঁজে নেওয়া খুব সহজ। দুই,নারীবাদী বা অন্য সমস্ত অ্যাকাডেমিক মহলে তসলিমা অনালোচিত, তাঁর কোনো সাপোর্ট গ্রুপ গড়ে ওঠেনি। একই ভাবে কোনো সাপোর্ট গ্রুপ গড়ে ওঠেনি বামপন্থী মহলেও, যাঁরা এই উপমহাদেশে প্রগতিশীলতার ধ্বজাধারী বলে গণ্য হন।

ফলে তসলিমা খুব সহজ টার্গেট। দেবেশ রায় বা সুবিমল মিশ্রের লেখা থেকে ধর্মবিরোধীতার জনপ্রিয় চিন্‌হগুলিকে খুঁজে নেওয়া খুব কঠিন। খুঁজে পেলেও, আরও কঠিন তাকে সরল করে ব্যাখ্যা করা। তাছাড়া এঁদের পিছনে খুব শক্তিশালী একেকটি ইন্টেলেকচুয়াল ব্যাকিং ও আছে, যেমন আছে এডওয়ার্ড সাঈদ বা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের। শেষোক্ত দুজনের ক্ষেত্রে অবশ্য এই ব্যাকিং অনেক ব্যাপকতর। কিন্তু তসলিমার এর কোনোটাই নেই। তাঁর রচনা একটু বেশি ই সহজবোধ্য,এই ভুবনায়িত যুগে একটু গ্রাম্যই বলা যায়,যে কারণে তাঁর বই লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রী হয়। এবং এই কারণেই তিনি বুদ্ধিজীবিকুলে অনাহুত, একা। ক্ষমতার অলিন্দে তসলিমা চিরকালই একলা অসহায় গ্রাম থেকে আসা এক মেয়ে। ইসলামের ধ্বজাধারীদের একজন শত্রু দরকার ছিল, যাকে বিধর্মী আখ্যা দিয়ে, যার বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ শুরু করা যায়। তসলিমার লেখা ও যাপনে সেই কল্পিত শত্রুর সবকটি চিন্‌হই বিদ্যমান। এবং তাঁর কোনো সাপোর্ট গ্রুপ নেই। এই উপমহাদেশে, হায়, আজও গ্রুপহীন, দলহীন ভাবে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। বাংলাদেশে শুরু হচ্ছিল ধর্মের নাম নিয়ে এক রাজনৈতিক লড়াই। তাদের দরকার ছিল এক শত্রুর। তসলিমা তাদের সেই কাল্পনিক শত্রু। এই শত্রুকে যত বড়ো, যত বেশি শক্তিশালী দেখানো যাবে, যত লার্জার দ্যান লাইফ হয়ে উঠবে তার ছায়াশরীর, ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে ধর্মযুদ্ধ। মিডিয়া তাঁর বই ছেপেছে, সেই বই লাখে লাখে বিক্রী হয়েছে লেখার গুণের কারণে নয়, ধর্মযুদ্ধের শত্রুকে খুব বড়ো করে দেখানোর দরকার ছিল, এই কারণেই। ঠিক এই কারণেই মাইকেল মুরের ফারেনহাইট নাইন ইলেভেন হই হই করে চলে আমেরিকায়।ঠিক এই কারণেই ভারতবর্ষে একদা মন্ডল কমিশানের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন যত গতি পেয়েছে, ততই পায়ের নিচে মাটি পেয়েছে মন্ডল রাজনীতি। এ এক অপূর্ব খেলা। দেবেশ রায়ের গল্পের নসু, জেল ভেঙ্গে পালাবার ঠিক আগের মূহুর্তে অনুভব করে, জেল ভাঙার এই অ্যাকশন এক ব্যর্থ অ্যাকশন হতে চলেছে। কিন্তু কি ই বা করার থাকতে পারে তার, যদি দিনের পর দিন, সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় একটি মই রেখে দেওয়া হয় পাঁচিলের গায়ে? ফলে নসুকে অ্যাকশানে নেতৃত্ব দিতেই হয়, যে অ্যাকশান তার নয়। পুলিশেরই বা কি করার থাকতে পারে, যদি একদল রাজনৈতিক বন্দী জেল ভেঙ্গে পালাতে চায়? কি করার থাকতে পারে, গুলি চালানো ছাড়া? ফলে অ্যাকশানের সঙ্গেই আসে রিঅ্যাকশান। কেউ হয়ত সত্যি ই এসকেপ করে, বা কেউই পারেনা, কিন্তু পুলিশ গুলি চালায়, পড়ে থাকে কিছু লাশ। বিপ্লবীদের সংঘবদ্ধ থাকতে, বিশ্বাসে অটুট থাকতে দরকার শত্রুর বিরুদ্ধে অ্যাকশন। আর পুলিশের রিঅ্যাকশনের জন্য প্রয়োজন বিপ্লবীদের অ্যাকশন। পুলিশ ও বিপ্লবী, কারই বা অন্য কিছু করার থাকতে পারে, আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণ করা ছাড়া?

এই লেখা শুরু করেছিলাম, কেন তসলিমা এই প্রশ্ন দিয়ে। ধর্মযোদ্ধাদের একজন শত্রুর প্রয়োজন ছিল, যে একলা,যাকে চট করে জনশত্রু বানিয়ে তোলা যায়, যে সহজে বধ্য কিন্তু যাকে অসীম শক্তিশালী বলে প্রচার করা যায়। অসীম শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ই তো আনতে পারে বিশ্বাসের শরীরে নতুন রক্তের প্রবাহ। অন্যদিকে তসলিমারই বা কি করার ছিল? তাঁকে তো নিজের কথা বলতেই হত। তাঁকে শত্রু হতেই হত। এই অ্যাকশন তাঁর নয় জেনেও, পাশে কেউ নেই জেনেও তাঁকে এর মধ্যে নামতেই হত। ধর্মযোদ্ধাদের একজন বিধর্মীর প্রয়োজন ছিল, তুমুল ক্রুসেডের পর, যার লাশ মাটিতে গড়াবে। তসলিমাকে শারীরিক ভাবে খতম করা হয়নি, কারণ তিনি প্রচারের আলোয়। শিয়ালদা স্টেশনের ঐ রাজনৈতিক কর্মীরা মুক্তি পেয়েছিলেন, কারণ তাঁরা প্রচার পেয়েছিলেন। আমাদের লোকালয়ের সেই মেয়েটিকে ধর্ষিত হবার অপরাধে হোমে পাঠানো হয়েছিল, তসলিমা আছেন ইউরোপে। ইউরোপ হোম নামধারী কারাগারের চেয়ে ভালো জায়গা নি:সন্দেহে। প্রচারের আলো সকলের উপর থাকেনা, আমাদের লোকালয়ের ধর্ষিত সেই মেয়েটির উপর ছিলনা। তাকে ধর্ষিত হবার অপরাধে হোমে পাঠানো হয়েছিল। নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়ে, একটু অবাধ্য হতে চেয়ে, একটু দুষ্টু মেয়ে হতে গিয়ে সে হঠাৎই একটি বৃহদাকার কীটে রূপান্তরিত হয়েছিল। মানবী নামের অযোগ্য এই লোকলজ্জাটিকে লুকিয়ে ফেলা ফেলা হয়েছিল হোম নামক সেই কয়েদখানায়, যেখান থেকে জীবদ্দশায় কেউ বেরোয়না। তাকেও লাশ হয়েই বেরোতে হয়েছিল,বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছিল তার পালকের মতো সেই মৃত্যু। আসুন, প্রচারের আলোর আড়ালে থেকে যাওয়া এরকম অজস্র কীটের কথা মনে করে, এই উপলক্ষ্যে অন্তত দু এক ফোঁটা চোখের জল ফেলি।