আপনার মতামত         


লেখাটির শৈশববস্থা কেটেছে গুরুচন্ডালি একে। গুরুচন্ডালি দুই এ এসে এর আকার পাঁচগুণ হয়েছে। লেখকের দাবী অনুযায়ী এখনও এর বাড়ার সম্ভাবনা আছে। --সম্পাদক

নেট, এক অতিকথা
সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়

১ অতিকথা

পরীক্ষার খাতা হলে এই লেখা এই ভাবে শুরু করতে হত, যে বর্তমান যুগকে বলে তথ্যবিপ্লবের যুগ। কিন্তু এটা পরীক্ষার খাতা নয়, আর ইন্টারনেটও শুধুমাত্র তথ্যের বন্যা নয়। বিশেষ করে আমরা যারা নব্বইয়ের দশকের আগে একটু আধটু রাজনীতি/লেখালিখি/চিন্তাভাবনা করতাম, সোভিয়েত ব্লকের পতন, খোলা অর্থনীতি কেব্‌ল টিভি উইন্ডোজ নাইন্টিফাইভ পেরিয়ে ইন্টারনেট পর্যন্ত যাত্রা শেষে যারা উত্তর আধুনিকতার বিভিন্ন খোঁয়াড়ে আশ্রয় নিয়েছি, তাদের কাছে, ইন্টারনেট উত্তর আধুনিক দুনিয়ার বিজ্ঞাপনের এক আকর্ষণীয় মডেল সুন্দরী। অন্যান্য যেকোনো মডেলের মতই এই তন্বীও হাগেন-মোতেন না,শুধু শরীরের খাঁজের আড়ালে থাকা এমন এক অঞ্চলের স্বপ্ন দেখান, যেখানে হায়ারার্কির সমাধি হয়েছে। আপনি আমি এই গ্লোবাল দুনিয়ার লোকাল সন্তান,এক দশক ব্যাপী এই সুতীব্র রোলার কোস্টার জার্নি পার করে এসে আমাদের সমস্ত ঘেঁটে গেছে,বুদ্ধিহীন কবন্ধদের নিরবিচ্ছিন্ন মার্কসবাদ সর্বশক্তিমান কারণ ইহা সত্য গোছের পেশীআস্ফালনে আমরা ক্লান্ত এবং আমাদের মূলত: কোনো অ্যাজেন্ডা নেই, ইন্টারনেট সুন্দরীর আমরাই হলাম এই মূহুর্তের টার্গেট মার্কেট সেগমেন্ট। চিন্তাজগতের মৌলবাদ আপনার অসহ্য লাগে, ইন্টারনেট আপনাকে প্লুরালিটির স্বপ্ন দেখাবে। যেকোনো আলোচনায়ই ব্যক্তি আপনাকে পিঠ পেতে নিতে হয় স্ট্যাম্প, হয় আপনি মোহনবাগান নয়তো সিপিএম, নিদেনপক্ষে ডিভোর্সি কিংবা কামুক, ইন্টারনেট আপনাকে অ্যাননিমাস হবার আশা দেখাবে। এ যেন নটা পনেরোর বনগাঁ লোকাল, আপনি আমার পা মাড়ালেন কেন দাদা -- পা কি কেউ জেনে বুঝে মাড়ায় ভাই -- একটা দশ পয়সা তিনটে চার আনা -- অতো অসুবিধে হলে প্রাইভেটে চলে যান --চারটে ডায়মন্ড -- হাত থাকতে মুখে কেন -- এই বহুস্বরের মাঝে আপনি ও ফেঁড়ে সিপিএমকে গালাগালি দিয়ে নেমে গেলেন, এর পরে অফিসে গিয়ে আপনি কো অর্ডিনেশন কমিটি করেন কিনা কেউ দেখতে যাচ্ছেনা। আপনার বাপ ঘটি বলে আপনিও মোহনবাগান,এই যৌক্তিক শৃঙ্খলার কারাগার থেকে ইন্টারনেট আপনাকে মুক্তি দিতে এসেছে। ইচ্ছা হলে আমেরিকার ইরাক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একখানা জ্বালাময়ী মেসেজ পোস্ট করে, তারপরেই এইচ ওয়ান বি ভিসার কোটা কমিয়ে দেবেননা স্যার বলে গণ পিটিশানে সই করতে পারেন, কেউ আপনাকে ক্যাঁক করে ধরবেনা। ব্যক্তি হিসাবে আপনি কিছুটা বিপ্লবী খানিকটা ক্রিকেট-বিশেষজ্ঞ, অর্ধেক বামপন্থী ও বাকি অর্ধেক গ্রহরত্নে বিশ্বাসী, আপনার গোটা সত্ত্বাকে সর্বক্ষণ বোতলবন্দী করে প্রগতিশীল স্ট্যাম্প মেরে জনসমক্ষে আনতে হয় যাতে লোকে খারাপ না ভাবে, আপনি ইস্কুল-কলেজের দিদিমনি হলে লুকিয়ে মদ খেতে হয়, ভদ্রলোক হলে ট্রামে বাসে ভিড়ের আড়াল নিয়ে ব্রা হীন বলাৎকারের সুতীব্র আকাঙ্খাকে প্রকাশ করতে হয়, ইন্টারনেট আপনাকে এই বিড়ম্বনার হাত থেকে মুক্তি দেবে। যাবতীয় তথাকথিত পরস্পরবিরোধিতা, দেখবেন, কি চমৎকারভাবে সিমলেসলি একে অপরের সঙ্গে সহাবস্থানে রত, যেন গণতন্ত্র, গণসংগ্রাম ও গণরিয়া একই মঞ্চে পাশাপাশি তিনটি আসন আলো করে বসে আছে, এবং সভাপতির ভাষণের সময়, একে অপরের সঙ্গে স্মিতহাস্যে বাক্যবিনিময়ও করে চলেছে। ফলে, মতাদর্শগত সংগ্রাম বলতে এতদিন যা বুঝতেন, যৌক্তিক শৃঙ্খলার সাথে সাথে তাও বেমালুম হাওয়া হয়ে গেছে, কারণ, এই জমায়েৎ কোনো শৌখিন বিতর্কসভা নয়, যেখানে প্রথমে আপনি বললেন পক্ষে, তারপর আমি বললাম বিপক্ষে এবং সঞ্চালক শেষমেষ সিন্থেসিস করে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। এ কোনো ঐক্যতান নয়,বরং এক ক্যাকোফনি,মঞ্চ ও দর্শকাসনের হায়ারার্কিকে যা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। এখানে সকল শ্রোতাই বক্তা এবং সকল বক্তাই শ্রোতা,কারো মাথার পিছনে নেই কোনো অপার্থিব জ্যোতির্বলয়। এখানে সবাই গুরুত্বপূর্ণ, অর্থাৎ কেউ ই তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে সব মতাদর্শই মতামত, কেউ ই কারো চেয়ে উন্নততর নয়। এখানে কোনো শ্রদ্ধাভাজন অমুকদা নেই, যাকে দেখলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে হয়, এখানে আমরা সবাই সমান। সোজা বাংলায় এ এক সাম্যের স্বপ্ন।

তো সুধীজন, বলার কথা এই, যে সাম্যের স্বপ্ন আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। সেই ফরাসি বিপ্লবের আমল থেকে কোনো না কোনো পশ্‌চিমী বড়দা এই স্বপ্ন আমাদের দেখিয়ে আসছেন, কিন্তু গুংগা নামক সেই লক্ষ্যটি, হায়, আজও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেল। ডেমোক্র্যাসিই বলুন আর সাম্যবাদ বা ক্রিশ্‌চিয়ানিটি,সব ব্যাটারাই, লক্ষ্য করে দেখবেন, বলে এসো বাছা তোমরা আমার সমান হও , অর্থাৎ কিনা, তোমরা ঠিক সমান নও, তোমাদের সমানত্বে উত্তীর্ণ করার মহান দয়িত্ব আমি পালন করলাম বলে আমাকে সশ্রদ্ধ চিত্তে আজীবন স্মরণ করিও। ছিলে হিদেন, এখন আমার কল্যাণে পরম পিতার সন্ধান পেয়ে ভাই হয়েছ, তবে ভুলিওনা আমার বাক্য অমান্য করলে এখনও তোমার অনন্ত নরক অনিবার্য। এ যেন বাড়ির কাজের লোককে আদব কায়দা শিখিয়ে আমার সমান করে তোলা-- আমি তার চেয়ে উন্নততর বলেই না তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে আমার সমান করে তুলতে পারি। পশ্‌চিমী দাদারা চিরকালই এই খেলাটা খেলে আসছেন। যেখানেই পেরেছেন প্রথমে কামান বন্দুক তরোয়াল দিয়ে ঝেঁটিয়ে সাফ করেছেন রেড ইন্ডিয়ান বা মাওরি জাতীয় যাবতীয় আবর্জনা আগাছা জঞ্জাল, বাকি যেকটা বেঁচেছে তাদের দেওয়া হয়েছে পোষ মানার অব্যর্থ ট্রেনিং। আর ট্রেনিংএর পালা সাঙ্গ হলে তৃতীয় বিশ্ব নামক এক অভয়ারণ্যে তাদের অবাধে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যার পোশাকি নাম স্বাধীনতা। এখানে আপনি আমি ততটাই মুক্ত, যতোটা সবুজদ্বীপের জারোয়ারা। ওদের মতই আমাদের দেখতেও প্রথম বিশ্বের ট্যুরিস্ট আসে, আমাদের সভ্য শিক্ষিত উন্নততর করে তুলতে এইড পাঠায় পশ্‌চিমীরা, কোনো কোনো সেবাব্রতী আমাদের মুক্তির আলো দেখাতে জীবন পাত করে সন্ত উপাধি পান, এবং সর্বোপরি, আমরা প্রতিটি মূহুর্তেই আন্ডার ক্লোজ ওয়াচ। ফলে ওদের সাম্য আর আপনার সাম্য এক নয়। ওরা যা বলবে তাই হল বানী, আর আপনাকে সেই বাণী মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উগরে দিয়ে নিজেকে ওদের সমান প্রমাণ করতে হবে। ওরা মতাদর্শের যেকটা খোপ বানিয়ে রেখেছে, তার কোনো একটাতে আপনাকে ঢুকতেই হবে, নচেৎ পরীক্ষায় ফেল, লোকলজ্জায় মুখ দেখাতে পারবেননা,গলায় দড়ি দিতে হবে। শহীদ হবার সুযোগটাও পাবেননা, আপনাকে স্রেফ ইগনোর করা হবে। আপনার সামনে ডান্ডা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাম্য, সমান আপনাকে হতেই হবে, নচেৎ পাবলিক গণধোলাই দেবে, পুলিশ পেঁদিয়ে বাপের নাম খগেন করে দেবে,বিস্মৃতির আড়ালে কোনো এক লাশকাটা ঘরে পড়ে থাকবে আপনার ছিন্নবিচ্ছিন্ন মানবশরীর। এই সাম্যে একদল ডিকটেট করবে এবং আপনি শুধু রিসিভিং এন্ডে বসে শুনবেন। এই সাম্য মূলত: একটি মিথ, আদতে একটি ভাঁওতা, যা অন্য সকল দাদার মত ইন্টারনেটও নতুন মোড়কে পরিবেশন করে থাকে। কেন্দ্রহীন যৌক্তিক শৃঙ্খলাহীন মুক্ত বাচনের ক্যাকোফনি আসলে একটি মার্কেটিং গিমিক, একটি সূক্ষতর পাওয়ার গেম। ইন্টারনেট আপনাকে এখনও পর্যন্ত কিছু ফ্রি বা সহজলভ্য স্পেস দেয় ঠিকই যেখানে আপনি যা প্রাণে চায় তাই এক্সপ্রেস করতে পারেন, কিন্তু সেটাও এই ভাঁওতারই অঙ্গ। কেন? খুব সহজ একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক আপনি নিজের একখানা সাইট বানিয়ে ফেলেছেন, এবার লোককে জানাবেন কি করে? নেট নিজেকে কেন্দ্রহীন বলে দাবী করে কারণ এর জন্য পয়সা খরচ করে অ্যাড-ট্যাড দিয়ে ঝিনচ্যাক করে শুরু করার কোনো দরকার নেই আপনার ভেঞ্চার,জাস্ট গুগল নামক সার্চ ইঞ্জিনটি আপনার সাইটটির সন্ধান দিলেই মার্কেটিংএর কাজ শেষ। আর প্রাচীন অরণ্যপ্রবাদ, যে গুগলে সবই পাওয়া যায়। সমস্ত সার্চ ইন্‌জিনের মধ্যে গুগলের অ্যালগরিদ্‌মই সবচেয়ে গণতান্ত্রিক এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই। গুগলের কাছে আপনার আনাড়ি সাইটটির যা মর্যাদা, আইটি জগতের একচেটিয়া অধীশ্বর মাইক্রোসফ্‌টের সাইটটির ও তাই। গুগলে পয়সা দিয়ে নাম রেজিস্টার করা যায়না, গুগল স্বয়ংক্রিয় ভাবেই নেট থেকে খুঁজে বার করে সাইট একটি বিশেষ অ্যালগরিদ্‌ম ব্যবহার করে, যাকে ওরা বলে ক্রলিং। ক্রলিং নিলে ডিটেলে জানতে হলে গুগলের সাইটে যেতে পারেন, কিন্তু মোদ্দা পদ্ধতিটা হল এই, যে গুগল সারা নেটে তাদের জানা থাকা সমস্ত পেজ পিরিয়ডিকালি খুঁজে দেখে, নতুন কোনো কনটেন্ট সেখানে যোগ করা হল কিনা। নতুন কোনো কনটেন্ট বলতে প্লেন টেক্সট এবং লিঙ্ক, দুই ই বোঝায়। এইভাবে সারা নেট খুঁজে যদি এমন কোনো সাইটের লিঙ্ক পাওয়া যায়, যা এখনো পর্যন্ত গুগলের লিস্টিতে নেই, তবে গুগল সেই নতুন সাইটটির ঠিকানা নিজের ডেটাবেসে ভরে নেয়। পরের বার থেকে সার্চ রেজাল্টে এই নতুন সাইটটি ও দেখা যাবে। আর সার্চ রেজাল্ট পেজে নতুন সাইটটির র‌্যাঙ্ক নির্ভর করবে কতগুলো পেজে আপনার সাইটের লিঙ্ক গুগল খুঁজে পেয়েছে, তার উপরে। অর্থাৎ ,যতো বেশি সাইট আপনার সাইটকে রেফার করবে, আপনার সাইটটি ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।

এই পদ্ধতিটি বেশ গণতান্ত্রিক হলেও, খেলাটা এখানেই। প্রথমত: যেকোনো সার্চ রেজাল্টেই গুরুত্বের বা হায়ারার্কির ধারণাটা এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছেনা। সকলেই জানেন, যে সার্চ রেজাল্টে র‌্যাঙ্কের ব্যাপারটা কি প্রচন্ড জরুরি। গুগল-সার্চের প্রথম তিনটি লিঙ্ক যে গুরুত্ব দাবী করে, বাকিরা তার থেকে অনেক পিছিয়ে থাকে। আর সার্চ রেজাল্টের প্রথম পাতায় যে সাইট জায়গা পায়না, তার থাকা না থাকা সমান। দ্বিতীয়ত: এর চেয়েও বড় ব্যাপারটা হল এখানে র‌্যাঙ্কিংএর পুরো ব্যাপারটাই আপনার হাতের একেবারে বাইরে। অর্থাৎ আপনার সাইট প্রকৃতপক্ষেই নেটে আছে না নেই, থাকলেও তার গুরুত্ব কতোটা, সেটা পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে, অন্যরা আপনাকে কতোটা রেকগনাইজ করল, তার উপরে। আর অন্যের রেকগনিশনের অর্থই হল,আপনাকে আগে প্রমাণ করতে হবে আপনি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং রেকগনিশানের যোগ্য। ফলে আমি আপনার পরীক্ষা নেব এবং আপনাকে সেই পরীক্ষায় পাশ করতে হবে, যদিও আপনি আমি সবাই সমান। এবং গুগলের এই র‌্যাঙ্কিং এটিপি র‌্যাঙ্কিংএর মতই মাসে মাসে পাল্টায়, ফলে এই পরীক্ষা আপনাকে দিয়েই চলতে হবে আজীবন। এই পরীক্ষা আপনি এড়িয়ে যেতে পারেন, সেই স্বাধীনতা আপনার আছে,কিন্তু তাহলে, আপনার উচ্চারণ নদীর ধারে জলের পাড়ে গাছের কাছে ফিসফিসিয়ে বলা কিছু অনুচ্চারিত কথার মতই উপেক্ষিত থেকে যাবে,আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে আপনার প্রবেশাধিকার থাকবেনা, রাস্তার ধারের ভিখিরির মত,উড়ালপুলের নিচে বসে থাকা পাগলের মত আপনাকে উপেক্ষা করে আমরা আমাদের দৈনন্দিন নেটচারণে ঢুকে যাব। আমরা সক্কলেই অ্যাননিমাস, কিন্তু যারা পরীক্ষায় পাশ করেছি, তাদের একটা স্ট্যাটাস সিম্বল থাকবে,আর আপনাকে কেউ পুঁছবেনা, আমরা সভ্য ও উচ্চশিক্ষিত আর আপনি ক্লাস ফোর ফেল, যদিও ভোটবাক্সে দুজনেই একটা করে ব্যালট দিই।

ফলে, যে কথা বলছিলাম, ইন্টারনেটে আপনি আর মাইক্রোসফ্‌ট একই মর্যাদা পাবেননা, পেতে পারেন না। কেন্দ্রহীন যৌক্তিক শৃঙ্খলাহীন মুক্ত বাচনের অঙ্গীকার আসলে একটি মার্কেটিং গিমিক, একটি সূক্ষতর পাওয়ার গেম। এই পাওয়ার গেমের চরিত্রটা ঠিক কি, আসুন এবার একটু খতিয়ে দেখা যাক পরবর্তী অনুচ্ছেদগুলিতে।



২ লালু ও আম্বানি -- একটি নিকৃষ্ট চুটকি এবং নেট সাম্য

দৃশ্য এক --- লালুপ্রসাদ ও তার ছেলে ভুলুপ্রসাদ
লালু: তোমার জন্য পাত্রী দেখেছি বাবা।
ভুলু: কিন্তু আমি তো এখন বিয়ে করবনা বাবা।
লালু:কিন্তু মেয়ে যে আম্বানির।
ভুলু: আম্বানির মেয়ে? তাহলে আমি রাজি বাবা।

দৃশ্য দুই --- লালুপ্রসাদ ও আম্বানি
লালু: আপনার মেয়ে জামবনির জন্যে ভালো পাত্র ছিল।
আম্বানি: কিন্তু এখনও তো মেয়ের বিয়ে দেবার কথা ভাবিনি।
লালু: এ সুযোগ কি বারে বারে আসবে দাদা? ছেলে যে রিজার্ভ ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান।
আম্বানি: বলেন কি? রিজার্ভ ব্যাংক? আমি রাজি।

দৃশ্য তিন --- লালুপ্রসাদ ও রিজার্ভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান
লালু: আপনার কোম্পানির জন্য ভালো ভাইস চেয়ারম্যান ছিল।
চেয়ারম্যান: সেতো ভালো কথা, কিন্তু আমার এখন কোনো ভাইস চেয়ারম্যান দরকার নেই।
লালু: আগে ভালো করে শুনে নিন, নইলে পরে পস্তাবেন। ছেলেটি আম্বানির হবু জামাই।
চেয়ারম্যান: আগে বলবেন তো, কাল থেকেই জয়েন করতে বলুন।

অত:পর দৃশ্য চার --- ভুলুপ্রসাদ ও জামবনির বিবাহ। লালুপ্রসাদ আম্বানি ও রিজার্ভব্যাংক এখন এখন এক বৃহত্তর পরিবারে সহাবস্থান করে।

এই নিম্নমানের জোকটির জন্য দু:খিত। কিন্তু এই সদ্য গড়ে ওঠা বৃহত্তর পরিবারটির কম্পোজিশনটা একবার খুঁটিয়ে দেখে নেওয়া যাক। লক্ষ্য করুন, পরস্পরের রেকগনিশন পাবার জন্য এই কল্পিত পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যই নিজেকে নতুন করে ডিফাইন করেছে। লালুর ছেলে ভুলু এখনও ভুলুই, কিন্তু সেটা তার খোলস মাত্র,এই খোলসের নিচে বেমালুম পাল্টে গেছে তার পরিচয়,সে এখন আম্বানির জামাই ও রিজার্ভ ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান। আবার রিজার্ভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান এখনও চেয়ারম্যানই, কিন্তু এখন সে আম্বানির জামাই এর বস। আর আম্বানি এখন রিজার্ভ ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের শ্বশুর। লক্ষ্যণীয় যেটা, যে এই প্রত্যেকটি ডেফিনিশনই গড়ে উঠেছে অন্যের রেকগনিশনের জন্য। অন্যের রেকগনিশন এখানে ভীষণ রকম গুরুত্বপূর্ণ, ফলে খোলসের আড়ালে প্রতিটি চরিত্রই আমূল পাল্টে যাচ্ছে, নিজেকে ছেঁটে নিচ্ছে, অন্যের পৃথিবীর মাপে। ছিল ভালবাসা, হয়ে যাচ্ছে আর্চিস গ্যালারি, যে যেমন বোঝে আর কি। ফলে এই পরিবারে কোনো সদস্যই আর নিজের মতো করে একা একা নেই, থাকতে পারেনা। প্রত্যেকেই প্রতিটি মূহুর্তে পরস্পরের দ্বারা এবং ফলত: নিজের দ্বারাও নির্ধারিত এবং সংজ্ঞায়িত হয়ে চলেছে। এই সংজ্ঞাসমূহের সমগ্রতার বাইরে আর কোনো বাস্তবতা নেই, এদের কারোরই আর নিজের কোনো একাকী একান্ত ব্যক্তিগত কোনো অস্তিত্ব স্বীকৃত নয়,কারণ কমিউনিটিহীন মানুষ কোনো মানুষ নয়, রেকগনিশন ব্যতীত বেঁচে থাকা কোনো বেঁচে থাকা নয়। কমিউনিকেশনই একমাত্র বাস্তব, তার বাইরে যা কিছু, তার ঠিকানা গার্বেজ বক্স যার পিঠে লেখা থাকে ইউজ মি।

এই বিশেষ ধরণের অস্তিত্বকে আমরা বলতে পারি রিকার্সিভ অস্তিত্ব। রিকার্শন একটি বিশুদ্ধ কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজ নির্মান, যা একটি বিশেষ প্রকারের ডেফিনিশনকে সূচিত করে। এ এমন এক ধরণের সংজ্ঞা,যা নিজেই নিজেকে ইনক্লুড করে। অর্থাৎ জীবনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আপনি যদি বলেন, জীবন্ত বস্তুর ধর্মই হল জীবন,তাহলে সেটি একটি রিকার্সিভ ডেফিনিশন,কারণ এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে, যে জীবন্ত বস্তুর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আপনি বলবেন, যার জীবন আছে সেই জীবন্ত। অর্থাৎ জীবনের এই সংজ্ঞায় আপনি জীবনের সংজ্ঞাকেই ইনক্লুড করেছেন, এবং এটি একটি রিকার্সিভ সংজ্ঞা। গাণিতিক ভাবে এই ধরণের সংজ্ঞাকে বলা হয় আইডেন্টিটি এবং যুক্তিবিজ্ঞানে এরা অসিদ্ধ বাক্য। ফলে রিকার্সিভ সংজ্ঞা একটি অ্যাবসার্ডিটি, যদিও কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজ এই ষাঁড়ের গোবরকে চমৎকারভাবে ব্যবহার করে,কারণ কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজের কাছে প্রতিটি সংজ্ঞাই ঘটমান বর্তমান, মৃত অতীত নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ আলাদা প্যারাডাইম, যা সংজ্ঞার মধ্যে সংজ্ঞায়িত হবার সময়ের মাত্রাটিকে আমদানি করে। সে এক ভিন্নতর আলোচনা, কিন্তু এখানে একটা জিনিস বলে নেওয়া খুবই প্রয়োজন, যে, এই সময় নামক মাত্রাটির অন্তর্ভুক্তি একে অন্যকে নির্ধারিত করার চিরাচরিত ধারণাটিতে একটি র‌্যাডিক্যাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কিরকম? খুবই বাজে ধরণের সরলীকৃত একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। একটি শিশু, তার জন্মের সময় থেকে মায়ের দ্বারা নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে শিশুর আচার আচরণ, বেড়ে ওঠার ধরণ, সবই তার মাকেও প্রভাবিত করে। কিন্তু এটা কোনো রিকার্সিভ অস্তিত্ব নয়। এখানে শিশু এবং মা কেউ কাউকে নির্ধারিত বা সংজ্ঞায়িত করছেনা। এরা দুজনেই পরস্পরের অস্তিত্ব নিরপেক্ষ ভাবে সংজ্ঞায়িত এবং তার পরে একে অপরকে প্রভাবিত করছে মাত্র। এবার আপনি সময়ের মাত্রাটিকেও আপনার এই উদাহরণে একটি চল রাশি বা ভ্যারিয়েব্‌ল হিসাবে নিয়ে নিন। উল্টে দিন কালের একমুখী গতিকে। ধরা যাক এই শিশুটিকে এনে দেওয়া হয়েছে একটি টাইম মেশিন, যা দিয়ে সে কালস্রোতের উজানে সশরীরে ভ্রমণ করতে সক্ষম। এবং, ধরা যাক সেই টাইম মেশিনে চড়ে ছেলেটি চলে এসেছে তার দিদিমার যৌবনকালের পৃথিবীতে এবং দিদিমার সঙ্গে শুরু করেছে প্রেম। এবার, লক্ষ্য করুন, দিদিমার সঙ্গে প্রেম করে, ছেলেটি নির্ধারণ করছে তার মায়ের জন্মকে, এবং ফলত: নিজেকেও। অন্যদিকে, ছেলেটির মা ছেলেটির জন্ম দিয়েছে বলেই না সে কালস্রোতে সে অবাধে ভ্রমণ করতে পারছে। অত:পর, মাও নির্ধারণ করছে ছেলের জন্মকে, ফলত:নিজেকেও। এ এক অ্যাবসার্ড পরিস্থিতি, যেখানে সময়ও একটি ভ্যারিয়েব্‌ল হিসাবে সিস্টেমে ঢুকে পড়েছে, জন্মের আগে থেকেই ক্যাটিগরিগুলি একে অপরকে নির্ধারিত করতে শুরু করেছে। ফলে রিকার্সিভ সংজ্ঞা কখনই সম্পূর্ণ নয়, বরং এক অ্যাবসার্ডিটি, একটি অসম্ভাব্যতা, যেখানে কোনো সংজ্ঞাই পসিটিভ নয়, প্রত্যেকেই একে অপরকে নির্ধারিত করতে করতে নিজের জন্য তৈরী করছে এবং করে চলেছে ধোঁয়াশায় ঢাকা, সদা অসম্পূর্ণ এক অঞ্চল, যার পায়ের নিচে দাঁড়ানোর কোনো শক্ত জমি নেই।

তো, বলার কথা এই, যে, ইন্টারনেটেরও একটি সিস্টেম হিসাবে এরকমই হবার কথা,অন্তত: নেটের উত্তর আধুনিক যে মুখ, তাতে এইরকম বিজ্ঞাপনই সাঁটা আছে। নেট এক গ্লোবাল ভিলেজ, এক কমিউনিটি, এক বৃহত্তর পরিবার। এখানেও প্রতিটি সাইটই অন্যের দ্বারা নির্ধারিত। অন্য কোনো সাইটে যদি আপনার সাইটের কোনো রেফারেন্স বা লিঙ্ক না থাকে, তাহলে আপনার সাইটটিকে নেটে কেউই কোনোদিন খুঁজে পাবেনা, তার থাকা না থাকা সমান। আর রেফারেন্স বা লিঙ্কের প্রথম শর্ত হল রেকগনিশন। আমি নামক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আপনাকে তখনই রেকগনাইজ করব, যখন আপনি আমার চেনা কোনো আম্বানির জামাই। এবং এই কথা প্রতিটি সাইট সম্পর্কেই খাটে। কোনো সাইটই এখানে একলা একলা টিকে থাকতে পারেনা, লালুর পরিবারের মতই এখানেও স্বীকৃতিই অস্তিত্বের প্রথম শর্ত। ফলে স্বীকৃতির প্রয়োজনে এখানে সকলেই পিছনে ফেলে আসবে তার নিজের নিজের পরিচয়কে,আমার জন্যে আপনি এবং আপনার জন্য আমি দুমড়ে মুচড়ে নেব আমাদের পরিচয়কে আমার এবং আপনার পৃথিবীর মাপে, জাপানি অটোমোবাইল কোম্পানি খাঁটি আমেরিকান কারের কথা ইংরেজিতে লিখবে তাদের সাইটে, ম্যাকডোনাল্ডস মার্কেট ধরার জন্য বাংলায় পিঠে পুলির সাইট বানাবে, বাঙালি মেয়েরা টপলেস হয়ে এফ টিভি ডট কমে নিজেদের ছবি আপলোড করবে, জর্জ বুশ বয়োজ্যেষ্ঠ জ্যোতি বসুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছেন এমন ছবি ছাপবে এম এস এন, এক কথায় সব ঘেঁটে ঘুঁটে দেমা লুটে পুটে খাই হয়ে যাবে মুক্ত নেট পৃথিবী। রিকার্সিভ সংজ্ঞা সবসময়ই অসম্পূর্ণ অস্থির ধোঁয়াশাময় এবং নেগেটিভ এক অস্তিত্ব, যেখানে সংজ্ঞা এক সদাপরিবর্তনশীল ঘটমান বর্তমান। ফলে প্রতিটি নেট এনটিটিই ক্রমাগত খুঁজে চলবে নিজের পায়ের তলার মাটি, যা কেবলমাত্র অন্য এনটিটি গুলির সাপেক্ষেই ডিফাইন করা যায়, এবং অন্যের ক্যাটাগরিগুলি দিয়ে রিডিফাইন করে চলবে নিজেকে। এ এক অনন্ত প্রক্রিয়া, যার শেষে আমি আপনি হব এবং আপনি আমি, পূর্ব পশ্‌চিম হবে, অন্ধরা চক্ষুষ্মান,অজস্র অস্তিত্ব একই কমিউনিটির যৌথ রান্নাঘরে মশলাপাতি শেয়ার করতে করতে নতুন নতুন রন্ধনপ্রণালীতে পৌঁছে যাবে। সোজা কথায়, আপনি বাংলা পড়েন বাংলা লেখেন, আপনার কাছে এম এস এন হবে বঙ্গজীবনের অপরিহার্য অঙ্গ, আপনি যদি বাংলা ব্যান্ডের মুখপাত্র হন, ইয়াহু আপনার সামনে এনে দেবে সমস্ত মেনস্ট্রিম ও প্যারালাল বাংলা ব্যান্ডের লিরিক, আদ্যন্ত রবীন্দ্রভক্তদের জন্য কপিরাইটমুক্ত রবি রচনাবলী বিনামূল্যে দেবে এওএল। আর আপনি চোখ থেকে রে ব্যান খুলে কোকের ক্যানে চুমুক দিয়ে মনিটারে চোখ রেখে পড়তে থাকবেন রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা--

৩ রিকার্শনের আড়ালে

এই গাব্দা এবং আদ্যন্ত বোরিং লেখাটির এই অব্দি যদি কেউ এসে পৌঁছন, তাহলে তাঁর ঠোঁটের কোনে এইবার একটা বিরূপ হাসি দেখতে পাচ্ছি, যার মূল কথা হল ঢপের কথা এবার থামাও গুরু,এ ও এল দেবে রবীন্দ্ররচনাবলী? ইয়ার্কি হচ্ছে? যদি অবশ্য আদৌ কোনো পাঠক থেকে থাকে এর। বিশ্বাস করুন, কেউ পড়বে এই ভরসায় এই লেখা, অন্তত ব্যক্তিগতভাবে আমি লিখছিনা, যদিও, লক্ষ্য করবেন, এখানে নেটের বড়দাদের দ্বারা নির্দিষ্ট এক ফরম্যাট আমি মেনে চলেছি গোড়া থেকেই। কেউ পড়ুক বা না পড়ুক তথাকথিত &হয়ষঢ়;আমার অস্তিত্ব নিরপেক্ষ এই ফরম্যাটকে' আমাকে মেনে চলতে হয়, এই প্রকরণ নির্ধারিত করে দেয় আমার লেখার ধরণকে যে প্রকরণের উপর আমার কোনো হাত নেই। এই ভাবে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতির বহি:প্রকাশ হয়, স্নায়ু ও মস্তিষ্কের কিছু ভৌত রাসায়নিক প্রক্রিয়া থেকে তার উত্তরণ হয় এক্সপ্রেশন ও কমিউনিকেশনে, এবং রেকগনিশনের জন্য সে প্রস্তুত হয়। এই পদ্ধতি ব্যতীত কোনো এক্সপ্রেশন নেই, এমনকি নিজের কাছ থেকেও অনুভুতির কোনো স্বীকৃতি নেই। আরও লক্ষ্যনীয়, যে, এই লেখায়, একটি বিশুদ্ধ কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজ নির্মানকে আমি ঠেলে গুঁজে সোশাল সাইন্সের খাঁচায় ঢোকাতে চাইছি। যদি কোনো রিয়েল লাইফ প্রোগ্রামার সত্যি সত্যিই এই লেখা পড়েন (ভগবান না করুন), তাহলে তিনি এইখানে আমাকে ক্যাঁক করে ধরবেন, যে, বাছা, রিকার্শন নিয়ে ভুল কিছু বলছনা ঠিকই, কিন্তু এড়িয়ে যাচ্ছ অজস্র গুরুত্বপূর্ণ ডিটেল, খুঁটিনাটি,ম্যাথমেটিক্স, যা বাদ দিলে রিকার্শন নামক খোলসটি থাকে ঠিকই, কিন্তু তার ভিতরে যা পড়ে থাকে তা আর কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজের রিকার্শন নয়। তো, আমার মোটিভটা কি? ব্যক্তিগত জীবনে আমি একজন টেকনিকাল লোক,পেশাগত ভাবে সফ্‌টওয়্যার বানাই। লিনাক্স নিয়ে একটা ছোটো লেখা লিখলে, বা ব্যবহারিক কাজে ব্যবহৃত কয়েকটা ছোটোখাটো প্রোগ্রাম লিখে দিলে লোকে বেশ খুশি হয়। নেটে ভাসমান বেশ কিছু বিজনেস সাইটের নির্মানে আমার কিছু অবদান আছে। নিজের ওয়েব পেজে কিকরে বাংলা লেখা যায়, সার্চ ইঞ্জিন কিভাবে কাজ করে, প্লাটফর্ম ইন্ডিপেন্ডেন্স ব্যাপারটা নেটে কিভাবে সম্ভব, এই নিয়েও অনেকেই আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে থাকেন। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর পরেও আমি নেহাৎই একজন টেকনিশিয়ান, টেকনিকাল ডোমেনের বাইরে যেই নেটের আর্থ সামাজিক সাংসকৃতিক প্রসঙ্গে যাবেন, সেখানে আমি অনধিকারি,অস্পৃশ্য। সেই সমস্ত ডোমেনে বিরাজ করবেন সোশাল সাইন্সের গুরুরা, তাঁরাই নির্ধারণ করবেন আলোচনার ক্যাটাগরি সমূহ, ডিক্‌টেট করবেন টার্ম। তাঁরা পরিচয়ে হবেন অধ্যাপক,যাঁদের নামের পাশে থাকবে ড:, মাথার পিছনে জ্যোতির্বলয়। একাধিপত্যের এক বিশেষ প্রথম শ্রেণীর কামরায় তাঁরা বিরাজ করেন,কথা বলেন এক ভিন্নতর অ্যাকাডেমিক ভাষায়, তাঁদের একাধিপত্যের ঐ অঞ্চলে আমি আমার দেহাতি ভাষা ও নোংরা ধূলিমলিন ক্যাটিগরিবান্ডিল নিয়ে উপস্থিত হলে পরের স্টেশনেই কন্ডাকটার গার্ড আমাকে তৃতীয়শ্রেণীর জেনারাল কম্পার্টমেন্টে পাঠিয়ে দেবে। সেখান থেকে বাতানুকুল প্রথম শ্রেণীর ঐ কনফারেন্স রুমে আমার বাকতাল্লা পৌঁছবেনা, যেখানে আমার অজান্তেই লেখা হচ্ছে আমার ইতিহাস ও ভূগোল। আর তৃতীয় শ্রেণীর থার্ড ক্লাস সহযাত্রীদের ভারি বয়েই গেছে এইসব হাবিজাবি গ্রিক সংলাপে কান দিতে। ফলে শেষমেষ স্বীকৃতি নয়, আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে উপেক্ষার এক দীর্ঘ ইতিবৃত্ত, প্রেমিকা আমাকে পাগলামো বন্ধ করে কেরিয়ারে মন দিতে বলবে, বন্ধুবান্ধবরা এড়িয়ে চলবে, পাড়াপ্রতিবেশিরা এমনকি পরচর্চার যোগ্যও মনে করবেনা, আমাকে জাস্ট ভুলে যাওয়া হবে। তো, এই অবস্থায়, যদি আমি আমার কথাগুলো বলতে চাই, কমিউনিকেট করতে চাই, আমাকে সত্যি সত্যিই ঐ পন্ডিতদের ভাষা শিখতে হবে, প্রমাণ দিতে হবে, যে, টেকনিশিয়ান হলে কি হবে, আমি ও কিছু কিছু ইংরেজি বই পড়েছি, বোঝাতে হবে, যে আমি ওনাদের অ্যাকাডেমিক ভাষা কিছুটা হলেও বুঝি,এবং আমার ক্যাটিগরিগুলিকে ওনাদের মাপে কেটে ছেঁটে নিতে হবে। ওনারা যখন সারপ্লাস মিনিং বা ওভারডিটারমিনেশন জাতীয় ক্যাটিগরিগুলি উচ্চারণ করবেন, তখন তারা বেদবাক্য, আমার পৃথিবীর কোনো কিছুই সেগুলিকে প্রভাবিত করতে অক্ষম, বরং আমাকে প্রাণের দায়ে শিখে নিতে হবে সেগুলির যথাযথ ব্যবহার, যাতে কেউ মূর্খ না ভাবে। অন্যদিকে, আমি যখ্‌ন বলব রিকার্শন, তখন, বুঝতে না পারলে ওনারা নাক বাঁকিয়ে বলবেন ড্যাম এবং মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে চলে যাবেন, এবং এবারও আমাকে প্রাণের দায়ে ওনাদের বোধগম্য মাপে কেটেছেঁটে নিয়ে ওনাদের প্লেটে ওনাদের ভাষায় সাজিয়ে গুছিয়ে পরিবেশন করতে হবে রিকার্শনকে। ফলে, দেখুন, রিকার্শন, এই পদ্ধতিতে নামের আড়ালে বদলে নিচ্ছে তার খোল নলচে, কিন্তু ওনাদের ক্যাটিগরিগুলি বদলচ্ছেনা --- কমিউনিকেশন কি সহজ জিনিস? এর নাম দ্বিমুখী সংলাপ, যা অন্যের দিক থেকে ফ্রি কমিউনিকেশন, এবং আপনার দিক থেকে নি:শর্ত সাবমিশন।

ঠিক এই একই কারণে ইয়াহু আপনাকে বাংলা গানের লিরিক সরবরাহ করেনা, এওএল রবীন্দ্ররচনাবলী প্রকাশ করেনা। ওদের চন্দ্রবিন্দু বা সুমন চট্টোপাধ্যায়ের নাম না জানলেও চলে, আর আপনি ডিলান বা পিঙ্ক ফ্লয়েডের গান না শুনলে নেহাৎই আকাট মূর্খ। বার্গম্যান গোটা জীবনে একটুও জীবনানন্দ পড়েননি, তাতে কিছু যায় আসেনা, কিন্তু আপনি যদি বার্গম্যান না দেখে থাকেন, তবে সভ্য সমাজে বসবাসের অযোগ্য। ম্যাকডোনাল্ডস পিঠে পুলির সাইট বানায়না, বরং ম্যাক চিকেন বার্গার খেতে আপনি লাফিয়ে লাফিয়ে যান। জর্জ বুশ জ্যোতি বাবুকে প্রণাম করেননা, বরং জ্যোতি বাবু ই বিদেশে গেলে ধুতি পাঞ্জাবি ছেড়ে কোট প্যান্ট পরেন। কেউ যদি বলেন, সেতো ঠান্ডার দেশ বলে,সেটা নেহাৎই বাজে কথা, কই বুশ সাহেব তো গরমের দেশে এসে খালি গায়ে লুঙ্গী পরে ঘোরেননা, বরং আমাদের সেল্‌সের ছেলেদের দেখুন, ঘামতে ঘামতে টাই আর গলাবন্ধ কোট পরে ভিড় মিনিবাসে করে চলেছে।

অত:পর, নেট বিষয়ে আমাদের সাধের রিকার্শনের থিয়োরি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এখানে মাইক্রোসফ্‌ট এবং আপনি একে অপরকে ডিফাইন করছেননা, বরং মাইক্রোসফ্‌ট ইতিমধ্যেই ডিফাইন্‌ড হয়ে আছে, আপনার রেকগনিশনের কোনো প্রয়োজন তার আর নেই। আর আপনি, নিজেকে ডিফাইন করার তাগিদে জোড় হস্ত হয়ে আজকে সকল দিতে হবে বলে তার দুয়ারে বসে আছেন। যদি আপনাকে দয়া করে সে রেকগনাইজ করে, তবে আপনার অস্তিত্ব স্বীকৃত হবে, সাইটের সার্চ র‌্যাঙ্কিং নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে, নেট দুনিয়ায় কলার উঁচিয়ে ঘুরতে পারবেন। সর্বত্রই এরকমই ঘটে। এমনকি আমাদের সাধের ঐ অখাদ্য জোকটার দিকে তাকান। দেখবেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের জায়গায় বিশ্ব ব্যাঙ্ক বসিয়ে দিলে গল্পের পুরো কাঠামো টাই একেবারে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। যদি আরও গভীরভাবে দেখতে চান, দেখবেন, গল্পের আসল মজাটাই লুকিয়ে আছে অনার্য লালু কিভাবে কায়দা করে তার ছেলেকে জাতে তুলল, সেই বৃত্তান্তে। এক, এখানে গল্পের আগেই এটা স্বীকৃত যে লালু অনার্য ও আম্বানি এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এলিট। দুই, ভুলুপ্রসাদকে নিজের পরিচয় সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলতে হয়,নিজেকে ডিফাইন করতে হয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ও আম্বানি নামক ক্যাটিগরি গুলি দিয়ে, কিন্তু আম্বানি কখনই নিজের পরিচয়ের ডেফিনিশনে ভুলুকে ব্যবহায় করেনা। আম্বানি ও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সম্মানিত এলিট অস্তিত্ব,আর ভুলুকে পূর্বপরিচয় মুছে ফেলে জাতে উঠতে হয়। আম্বানি ও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক একে অপরের দ্বারা নির্ধারিত, কিন্তু ভুলুর দ্বারা নয়, যদিও ভুলু সম্পূর্ণ রূপে নির্ধারিত হয় ওদের দুজনের দ্বারা। রিকার্শনের দৃষ্টিভঙ্গীতে যদি দেখেন তাহলে ব্যাপারটা এই দুইটি দলের জন্য দুরকম। ভুলু বেচারা নিজেকে সম্পূর্ণরূপে রিকার্শনের হাতে ছেড়ে দেয়, নিজেকে পুরোপুরি অন্যের দ্বারা সংজ্ঞায়িত হতে দেয়, এই প্রত্যাশায়, যে অন্যেরাও নিজেকে তার দ্বারা সংজ্ঞায়িত করছে। কিন্তু অন্যদলের জন্য ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা, তারা এই রিকার্শনের প্রক্রিয়াকে মাঝখানেই ভেঙে দেয়। ফলে ভুলু যা দেখে, বা তাকে যা দেখানো হয়, তা একটি বিশুদ্ধ টুপি, রিকার্শন তার জন্য বাস্তব, অন্যের জন্য নয়। একে এক কথায় আমরা বলতে পারি অসম্পূর্ণ রিকার্শন। অসম্পূর্ণ রিকার্শন এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে, একে অপরকে ডিফাইন করার অনন্ত পদ্ধতি মাঝ রাস্তাতেই কোথাও থেমে যায়, বা থামিয়ে দেওয়া হয়। প্রক্রিয়ার এই অসম্পূর্ণতা তৈরী করে একটি ভ্যালু সিস্টেম, যেখানে, কিছু ক্যাটাগরি অন্যদের থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, কিছু ক্যাটিগরি নিজের অস্তিত্বের জন্য অন্যদের উপর কম নির্ভরশীল,কিছু ক্যাটিগরি অন্যদের কাছে টেক্‌ন ফর গ্রান্টেড, কিছু ক্যাটিগরি অন্যদের জন্য পজিটিভ মিনিং জেনারেট করে যার উপর লাগানো হয় সিস্টেম প্রদত্ত একটি ন্যাচারলিটির ছাপ্পা। ঠিক এইরকম একটি ভ্যালু সিস্টেম সাম্যবাদী নেটের জন্যেও প্রযোজ্য।


৩ জুতো ও জারোয়া -- এক প্রাচীন অরণ্য প্রবাদ এবং অসম্পূর্ণ রিকার্শন

কথিত আছে,জুতো প্রস্তুতকারক এক বহুজাতিক কোম্পানির সি ই ও একদা এক মার্কেট রিসার্চ সংস্থাকে এক জারোয়া দ্বীপে মার্কেট সার্ভে করতে পাঠান। তারা ফিরে এসে রিপোর্ট দেয়, যে, ঐ দ্বীপে কোনো মার্কেট পোটেনশিয়ালই নেই, কারণ, কেউ ই জুতো ব্যবহার করেনা। এতে সন্তুষ্ট না হয়ে, সি ই ও দ্বিতীয় আর এক সংস্থাকে দিয়ে আবার সার্ভে করান। এই দ্বিতীয় সংস্থা ফিরে এসে রিপোর্ট দেয়, যে, ঐ দ্বীপে মার্কেট পোটেনশিয়াল অসীম, কারণ ওখানে এখনও কারও কোনো জুতো নেই। এই দ্বিতীয় রিপোর্টটি গৃহীত হয়।

তো, এই গল্পের মরালটা কি? যদি পলিটিকালি দেখেন, তাহলে, প্রথম রিসার্চ সংস্থা বোকার মতো জানায়, যে, বহুজাতিক জুতো কোম্পানি ও জারোয়ারা দুই ভিন্নতর ভ্যালু সিস্টেমে বিলং করে, যাদের মধ্যে কালচারাল এক্সচেঞ্জ সম্ভব নয়। জুতো কি জারোয়ারা জানেইনা, জুতো কোম্পানির সঙ্গে তাদের কিসের ডিলিং? কিন্তু দ্বিতীয় সংস্থাটি জানায়, যে, বস তোমার আধিপত্যের উন্মুক্ত উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত। এসো এবং এক্সপ্লোর কর। ধরা যাক, জারোয়া কমিউনিটি সত্যি ই সংখ্যার বিচারে বেশ বড়, এবং জুতো কোম্পানিটি সত্যি ই সেখানে বিজনেস করতে এল। মেরে ধরে তো আর জুতো কেনানো যাবেনা, ফলে, প্রাথমিক ভাবে আধুনিকতম প্রযুক্তি সঙ্গে নিয়ে এল তাদের মার্কেটিং টিম। এই টিমের কাজ হবে, জুতোর উপকারিতা বোঝানো। কাজটা সহজ নয়, বেটা মূর্খরা জুতো জিনিসটা তাদের পক্ষে কি ভীষণ জরুরি, সেটাই বোঝেনা, কিন্তু কঠিন কাজের জন্যই মার্কেটিং টিম, যাদের মূল মন্ত্রই হল, মানুষকে নিজের প্রকৃত স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা -- মানুষকে শ্রেণী সচেতন করে করে তোলা মার্কসবাদীদেরই একচেটিয়া নয়। তো, সচেতন করে তোলা কাজটা সহজ নয়, এর জন্য ঐ জংলি জানোয়ারদের হাইজিন শেখাতে হবে, হাঁটতে চলতে কেটে গেলে টিটেনাস হলে কি ক্ষতি হতে পারে, সেসব বোঝানোর জন্য চিকিৎসা শাস্ত্র বোঝাতে হবে, চিন্তাভাবনায় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী আনতে হবে। বিজ্ঞান শিক্ষা দিতে হবে সব ব্যাটাকে, যাতে ওরা জুতো জিনিসটা কি বুঝতে পারে, কারণ ওদের ভোকাবুলারিটিতে হাইজিন, টিটেনাস, জুতো এসবের কোনো অস্তিত্বই নেই। ওদের ভাষায় হয়তো জুতোর নিকটতম প্রতিশব্দ, ধরা যাক খড়ম, যা আসলে রাত্রে শোবার সময় পা ঢাকা দেবার একখন্ড কাপড়, যাকে দুরন্ত কল্পনার সাহায্যেও কখনও জুতো ভাবা সম্ভব নয়। ফলে মার্কেটিং টিম জারোয়াদের জঙ্গলে একা আসেনা, নিয়ে আসে বিজ্ঞান, যুক্তি ও ডিরোজিও কে। কিন্তু তার সঙ্গে আর একটা ব্যাপারও তাদের মাথায় রাখতে হয়, যে, বিজ্ঞান শিক্ষা খুবই ভালো জিনিস, এতে করে জংলিদের আত্মার উন্নতি হয় ঠিকই, কিন্তু এর পরেও বাজেট বলে তো একটা ব্যাপার আছে। মার্কেটিং টিমের মূল কাজ জুতো বেচা, তার জন্য পুরো জনগোষ্ঠীকে বিজ্ঞান শেখাতে হলে তো ব্যবসা লাটে উঠবে। ফলে তাদের নিতে হয় দ্বিতীয় আর এক কস্ট এফেকটিভ পদ্ধতি। তারা খুঁজে নেয় একদল ইন্টেলিজেন্ট মানুষকে, যারা ঐ জংলিদের প্রতিনিধিস্থানীয়, শুধু তাদেরকেই দেওয়া হয় বিজ্ঞান নামক ঐ জ্ঞানবৃক্ষের ফল, শিক্ষান্তে সেই সমস্ত মানুষরা হয়ে ওঠেন এলিট, যারা বিজ্ঞানও জানেন, জংলিদের রীতিনীতিও জানেন, যারা ইংরিজিও জানেন, বাংলাতেও পন্ডিত, জুতো কোম্পানি ও জারোয়া, উভয়ের কাছেই যাঁরা অ্যাকসেপ্টেড। নেজেদের শিক্ষা শেষ করে, তাঁরা জংলিদের বিজ্ঞান শেখাতে শুরু করেন, অবশ্যই তাদের নিজস্ব ভাষায়। হাইজিন ব্যাপারটা অশিক্ষিত, মূর্খ, দরিদ্র, চন্ডাল ভারতবাসী বুঝবেনা বলে, তাদের বোঝনো শুরু হয়, পা ঢাকা দিলে যে ভালো হয়, সেতো তোমার রিচুয়ালেই আছে, রাত্রে যে পা ঢাকা দিয়ে শো ও সেতো তোমার মঙ্গলের জন্যেই। তোমার জন্যে আমরা নিয়ে এসেছি এক নতুন খড়ম, যা আরও মজবুত, কাপড়ের বদলে চামড়ায় তৈরী, যা পরে রাতে শুতে হয়না, দিনে চলাফেরা করতে হয়, যা ঢাকতে হয়না, বেঁধে নিতে হয়। একটু অন্যরকম বটে, কিন্তু এতো তোমার সেই পুরনো খড়মই। এ যেন সেই কলমের গল্প, যেখানে কথক বলছে, জানিস?আমার এই পেনটা আসলে আমার ঠাকুর্দার অরিজিনাল পেন। সামান্য কিছু সারাতে টারাতে হয়েছে মাঝখানে বটে, কিন্তু একেবারে খাঁটি ব্রিটিশ পিরিয়ডের মাল। মাঝে একবার নিবটা খারাপ হয়েছিল বলে পাল্টে নিয়েছি, বডিটা হাত থেকে পড়ে দুবছর আগে ভেঙে গেছিল বলে অন্য বডি বানাতে হয়েছে, আর ঢাকনিটা অবশ্য নিজের নয়, হারিয়ে গেছিল বলে অন্য একটা পেন থেকে খুলে লাগিয়েছি, কিন্তু হলে কি হবে, মালটা একেবারে খাঁটি। তো, বেচারি জারোয়ারা, এলিটদের সম্মান করে, তাদের মত হতে চায়, বুঝে যায় যে খড়ম মানে আগের খড়মই রইল, খালি খোলনলচেটা একটু পাল্টে গেল, এই মাত্র। ব্যস, মার্কেটিং টিমের কেল্লা ফতে, তারা প্রোডাকশন ম্যানেজারকে অর্ডার দিয়ে দিল, দুলাখ জোড়া জুতো পাঠান, খালি লেবেল পাল্টে জুতোর জায়গায় লিখে দেবেন, নিউ ইমপ্রুভ্‌ড খড়ম উইথ এক্সট্রা কেয়ার। এবার নিজের ভাষার অভিধান প্রণেতাদের ও খবর দিয়ে দেয় মার্কেটিং টিম, বস, একটা নতুন শব্দ পেয়েছি, একটু টুকে রাখ তো, শব্দটা হল, খড়ম, যার মানে জারোয়াদের জুতো।

তো,মরালের কথা হচ্ছিল। প্রথম মার্কেট রিসার্চ কোম্পানি একটু বেশি ক্লাসিকাল টাইপ, তারা ভুল কিছু বলেনি, যে জারোয়া ও জুতো কোম্পানি, তাদের মধ্যে কোনো কমিউনিকেশন সম্ভব নয়। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ভ্যালু সিস্টেম একে অপরের সঙ্গে কমিউনিকেট না করতে পারলে, তারা একে অপরকে ডিফাইন করবে কিকরে? কিন্তু বেচারিরা জানতনা, যে দুটো ভ্যালু সিস্টেমের মুখোমুখি হওয়া তো শুধু বিশুদ্ধ কালচারাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম নয়, এখানে কালচারাল এক্সচেঞ্জের প্রক্রিয়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক পাওয়ার গেম। ফলে, দুটি বা একাধিক ভ্যালু সিস্টেম নিয়ে গড়ে ওঠে যে বৃহত্তর সিস্টেম, তা আদতে রিকার্সিভ নয়। এই বৃহত্তর সিস্টেম গড়ে ওঠার আগেই, সেখানে ঠিক হয়ে যায় গুরুত্বের হায়ারার্কি, একদল সমস্ত হারিয়ে এবং আরেকদল কিছুই না হারিয়ে যোগ দেয় সেই পরিবারে। একদলের কাছে এটা ফ্রি কমিউনিকেশন, অন্যদলের কাছে অজ্ঞাত সাবমিশন। লক্ষ্য করুন, যে, জুতোর গল্পে কোম্পানিটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হয়ে গেলে, গল্পটা আমাদের ইতিহাসের সারসংক্ষেপ হয়ে যায়। আমাদের ঠাকুদ্দার ঠাকুদ্দারা জাতি বলতে বুঝতেন বামুন না কায়েত নাকি ম্লেচ্ছ। বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির যৌথ পাশ্‌চাত্য মগজধোলাইয়ের পরে সেটা হয়ে গেল ন্যাশানালিটি, এক জাতি এক প্রাণ। তাঁরা ধর্ম বলতে বুঝতেন কিছু আচার বিচার,তা হয়ে গেল রিলিজিয়ন, বেশ শক্ত পোক্ত কাঠামোয় গাঁথা, যা পাশ্‌চাত্যের ক্রিশ্‌চিয়ানিটির সংগঠনের কথা মনে করিয়ে দেয়। ব্যাপারটা ভালো না খারাপ, সে কথা হচ্ছেনা, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায়, আমাদের বলতে যা যা দ্যোতক ছিল,তারা অবিকল রয়ে গেল,কিন্তু তাদের সিগনিফায়েড গুলি খোলনলচে পাল্টে আমূল বদলে গেল। একবার এই প্রক্রিয়াটা সুসম্পন্ন হলে, তারপর আর এক্সচেঞ্জে কোনো বাধা থাকেনা,এখন তূলনামূলক আলোচনা হতে পারে তোমার ও আমার জাতিগত বৈশিষ্ট নিয়ে, ধর্মের তফাৎ নিয়ে, এমনকি এই নতুন সিস্টেম আশ্‌চর্যজনকভাবে রিকার্সিভ ও। কিন্তু এখানে এন্টি পেতে গেলে দুজনের জন্য শর্তটা দুরকম। ওনারা এখানে ঢুকতে পারেন বাই ডিফল্ট, জন্মগত অধিকারে, কিন্তু আপনাকে আমাকে একটা পরীক্ষা দিয়ে ঢুকতে হবে, যা দেখবে, আমি ওনাদের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী শিক্ষিত কিনা। এই স্ট্যান্ডার্ড, সিস্টেমে স্বত:সিদ্ধের মতো আসবে, এর উপর লাগানো হবে বৈজ্ঞানিক নামক এক ন্যচারালিটির ছাপ্পা, এবং সিস্টেমটি এমনভাবেই নির্মিত হবে, যাতে এই ন্যাচারাল স্ট্যান্ডার্ডটি থেকে যায় সকল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। এই নবগঠিত সিস্টেমের মধ্যে আমি আপনি ও সে, সবাই সবাইকে ডিফাইন করে চলব রিকার্সিভলি, কিন্তু সিস্টেমটি ই এমনভাবে নির্মিত হবে, যে, তাতে আমাকে আপনাকে ঢুকতে গেলে আগে তার মত হতে হবে। এই বিশেষ ধরণের রিকার্শনকে আমরা বলছি অসম্পূর্ণ রিকার্শন। এই অসম্পূর্ণ রিকার্শনের ব্যাপারটা অন্যরকম করেও বলা যায়, যে এখানে রিকার্শন হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু একে অপরকে ডিফাইন করার প্রক্রিয়া অনন্তকাল ধরে চলছেনা, মাঝরাস্তাতেই তা কোথাও থেমে যাচ্ছে। ফলে উৎপন্ন হচ্ছে মিনিং, তৈরী হচ্ছে ভ্যালু, যা সিস্টেমের মধ্যে তৈরি করছে এক হায়ারার্কি, যে হায়ারার্কি একদল ক্যাটিগরিকে অন্যদলের চেয়ে উচ্চস্থানে বসায়।

ন্যাশানালিটি গড়ে ওঠা, ব্রিটিশ পিরিয়ড, এইসব শুনে যারা ভাবছেন, এইসব অতি পুরাকালের মামলা, তাঁদের সবিনয়ে জানাই, এই কেচ্ছা আজও একই ভাবে চলেছে। নিত্যনতুন গ্লোবাল ভিলেজ তৈরি হয়ে চলেছে বিভিন্ন ফর্মে, যথা ইন্টারনেট, কালচারাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম, বিদেশি ডিগ্রি পাওয়ার জন্যে জি আর ইর সুবন্দোবস্ত। এবং সেই সব সিস্টেমে ঢোকার জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন স্ট্যান্ডার্ড। যেহেতু আমাদের মূল আলোচ্য ইন্টারনেট, তাই, ইন্টারনেটের ব্যাপারটাই দেখা যাক। ইন্টারনেট বললেই প্রথম যে ছবিটা মাথায় আসে, তা হল কম্পিউটার, যা মূলত: মাইক্রোসফ্‌ট উইন্ডোজের কোনো একটি ভারসানে চলছে, আর ই লেখা একটা ব্রাউজার, যার নাম মাইক্রোসফ্‌ট ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার। ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ইন্টারনেটের অঘোষিত আইকন, এবং এইচ টি এম এল নেটের ঘোষিত মার্ক আপ। তো লক্ষ্য করুন, এই পুরো সেট আপটা ইন্টারনেটের সঙ্গে স্বত:সিদ্ধের মতো মাথায় চলে আসে, যাকে আমরা একটু আগেই বলেছি সিস্টেম নির্দিষ্ট একটি স্ট্যান্ডার্ড। কেন মাইক্রোসফ্‌ট ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ব্যবহার করতে হবে, কেন এইচ টি এম এল ই হবে স্ট্যান্ডার্ড, এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার কোনো অধিকার আপনার আমার নেই, যেন ওগুলি একেকটি শাশ্বত সত্য, যা স্বয়ং ঈশ্বরের মুখ থেকে বেরিয়েছে। প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করে দেখুন, নেটের টেক গুরুরা এমন দাবড়ানি দেবে, যে পালাবার জায়গা পাবেননা, অশিক্ষিত মূর্খ মনে হবে নিজেকে, কান মাথা অপমানে ঝাঁ ঝাঁ করবে। একথা কিন্তু সত্য নয়, যে এইচ টি এম এল ছাড়া আর কিছু নেটের স্ট্যান্ডার্ড মার্ক আপ হতে পারতনা, আর টিএফ হতে পারত, পিডি এফ হতে পারত, অন্য কোনো স্ট্যান্ডার্ডও আসতেই পারত। আর এইচ টি এম এল কোনো সুনির্দিষ্ট বাঁধাধরা স্থির ও অচঞ্চল ধ্রূব সত্য নয়, বরং এর বিবর্তনের ইতিহাস যদি দেখেন তাহলে ঠিক তার উল্টোটাই। এই স্ট্যান্ডার্ড ক্রমশ: পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে, এবং সেই স্ট্যান্ডার্ডের দখল নিয়ে যা হয়ে গেল বিগত দেড় দশকে, তা পুরোনো আমেরিকার গ্যাং ওয়রকেও নি:সন্দেহে দশ গোল দেবে। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ব্রাউজার আনে নেটস্কেপ, যা এইচ টি এম এল সাপোর্ট করত। এরপরে বাজারে আসে আই ই, যা বাজার ধরার জন্য উইন্ডোজের সঙ্গে ফ্রি দেওয়া শুরু হয়। নেটস্কেপ ও এর আগে বা পরে ফ্রি করে দেয় নেভিগটরকে। তার পর মার্কেট ডিভিশন ক্রমশ:সমান সমান হলে, এইচ টি এম এল স্ট্যান্ডার্ডটি দখলে রাখার জন্য এরা দুজনেই যা খুশি করতে থাকে। নেটস্কেপ বাজারে আনে জাভা স্ক্রিপ্ট এবং মাইক্রোসফ্‌ট ভিবি স্ক্রিপ্ট, নেট দুনিয়া মোটামুটি ভাবে দ্বিখন্ডিত হয়ে যাবার উপক্রম হয়, কারণ প্রত্যেকেই নিজের নিজের স্ক্রিপ্টকে প্রমোট করছিল। শেষে মাইক্রোসফ্‌ট জাভা স্ক্রিপ্টকেও সাপোর্ট করতে শুরু করে, ফলে জাভা স্ক্রিপ্টই হয়ে ওঠে ডি এইচ টি এম এল এর একমাত্র স্ট্যান্ডার্ড, যা সকল ব্রাউজারই সাপোর্ট করে। এই ছিল সেই মাস্টারস্ট্রোক, যা নেটস্কেপকে মার্কেট থেকে আউট করে দেয়। এতো গেল শুধু ডি এইচ টি এম এল, এইচ টি এম এল এর অজস্র ট্যাগের উৎপত্তিও এই একই ভাবে।এই বর্ণনা হয়তো কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে গেল তাড়াহুড়োর কারণে, কিন্তু যাঁরা মাল্টি ব্রাউজার মাল্টি ভার্সান সাপোর্ট করার জন্য এইচ টি এম এল বা ডি এইচ টি এম এল লেখার চেষ্টা করেন, তাঁরা জানেন, কি ভয়াবহ পার্থক্য বিভিন্ন ব্রাউজারে। এইচ টি এম এল নামক স্ট্যান্ডার্ডটি মোটেই কোনো জিনিয়াস সায়েন্টিস্টের ল্যাবরেটারি প্রসূত কোনো বৈজ্ঞানিক শাশ্বত সত্য নয়,কোনো জ্ঞানতাপসের চিন্তাশীল সৃষ্টি নয়, বরং পুরো এফোর্টটাই আমাদের জুতো কোম্পানির মতো মার্কেট ড্রিভন। জাভা স্ক্রিপ্ট যে এখন মোটামুটি স্টেব্‌ল একটা স্ট্যান্ডার্ড, তার কারণও মার্কেট ধরার লড়াই। এরপর জাভা নিয়ে যে কেচ্ছাটা হল মাইক্রোসফ্‌ট বনাম সান, সে লড়াই তো আদালত অব্দি গড়িয়েছিল, লড়াইটি এখনও অসমাপ্ত। এইসব ঝগড়া, মারদাঙ্গা নোংরামির কথা বলতে গেলে একখানা আস্ত বই হয়ে যাবে, কিন্তু বলার কথা এই, যে ওনাদের কাছে পুরোটাই মার্কেট ড্রিভ্‌ন হলেও, ঐ স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে ওনারা কামড়াকামড়ি করে একে অপরের রক্তারক্তি করে দিলেও, একটা ব্যাপারে সব পক্ষই একমত, যে আমাদের কাছে যখন আসবে সেই স্ট্যান্ডার্ড, তখন সেটা বেদবাক্য হয়েই আসবে। আমাদের কাছে ওটা ন্যাচারাল,বিজ্ঞান, ধ্রুবসত্য, খুব বেশি হলে আমরা স্ট্যান্ডার্ডটা শিখে নিতে পারি, কিন্তু প্রশ্নচিন্‌হ বা মতামত? অসম্ভব। এখানে ওনারা জুতো কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার, আর আমরা জংলি,ওনাদের স্বার্থে ঐ স্ট্যান্ডার্ড শিখে আমাদের শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। অত:পর আমাদের যথাযথ শিক্ষার জন্য ওনারা নিয়োগ করবেন সেই সমস্ত এলিট নেটগুরুদের, যাঁরা ব্যাপারটা ভালো করে শিখে নিয়েছেন। সেই দেশীয় এলিটরা আমাদের শেখাবেন নেটভাষার ব্যাকরণ, যেন এই ভাষাও একটি ন্যাচারাল ভাষা, আমরাও নতমস্তকে বসে শিখে নেব কিকরে আমাদের এক্সপ্রেশনকে ভেঙেচুরে নিয়ে প্রভুদের মনোমত করে নেব। এরপর আমাদের পৃথিবী আবর্তিত হবে ঐ স্ট্যান্ডার্ড ঘিরে, শিখে নেব কি লিখব এবং কেন লিখব। আমাদের ভালোবাসা হবে আর্চিজ গ্যালারি,পাঠ হয়ে উঠবে উত্তরাধুনিক, লেখালিখি হয়ে উঠবে ম্যাজিকাল। আর শিক্ষার এই প্রবল তোড়ে চাপা পড়ে যাবে এই বাস্তব যে ঐ তথাকথিত ভাষা নেহাৎই একটি মার্কেট দখল করার কৌশল।


৪ অত:কিম

তো,এই পরিস্থিতিতে, আমাদের অল্টারনেটিভ স্ট্র্যাটেজির রূপরেখাটা তাহলে কি হবে বা হতে পারে? এই দশকব্যাপী ঘূর্ণিপাকের শেষে আমাদের আর কোনো অভিমুখ নেই, কোনো সুনির্দিষ্ট ধ্রুবতারা নেই, সে অর্থে কোনো অ্যাজেন্ডা ও নেই। জলে ও জঙ্গলে আমাদের আর কোনো বাবা লোকনাথ নেই, কোনো দাড়িওয়ালা প্রফেট নেই যিনি জানিয়ে দেবেন শ্রেণীহীন সমাজই মানবমুক্তির একমাত্র পথ, আর আমরাও সব ভুলে ঝান্ডা বাগিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ব। বস্তুত এতক্ষণ আমরা বলে যাদের রেফার করছি, সেই আমরা কোনো সংঘবদ্ধ অস্তিত্বই নয়, কোনো যুথবদ্ধ ভলভক্স কলোনী নয়, যাদের ওঠা ও পড়া, বাঁচা ও মরা একই সাথে। ফলে একটা জিনিস খুবই পরিষ্কার, যে এই তথাকথিত স্ট্র্যাটেজিও কোনো পবিত্র বেদবাক্য বা শুদ্ধ স্তোত্রপাঠ জাতীয় ব্যাপার হতে পারেনা, যাত্রাশেষে যা এক পরিপূর্ণ ও পরম সত্যের সন্ধান দেবে। এই স্ট্র্যাটেজির সমগ্রতাকে, যদি একে স্ট্র্যাটেজিই বলা হয়, ক্যাপিটাল বা গীতা জাতীয় কোনো পবিত্র বিশালাকার দুর্বোধ্য ধর্মগ্রন্থে এঁটে ফেলা যাবেনা,নেটবিশ্বের আনাচে কানাচে টুকরো টাকরা হয়ে পড়ে থাকবে এর ভার্চুয়াল শরীর, যাদের মধ্যে হাইপারলিঙ্ক স্নায়ুসংযোগ থাকতেও পারে আবার নাও পারে।

তো, এ হল স্ট্র্যাটেজির সেই রূপরেখা, চরিত্রে যা মূলত: নেগেটিভ। অর্থাৎ এটা কি নয়, তার কিয়দংশ জানা গেল, আর বাকি সবই অন্ধকার। সেই অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে প্রবেশ করার জন্য অন্তত:একটা মৌলিক প্রশ্ন, এই জায়গায় দুম করে উঠে আসে, যে হঠাৎ একখানা অল্টারনেটিভ স্ট্র্যাটেজির দরকার হয়ে পড়ল কেন? দিব্যি খাচ্ছি দাচ্ছি তাঁত বুনে, ইয়াহু মেসেঞ্জার আর রিডিফ মেলে ইংরেজি হরফে বাংলা টাইপ করে করে চালিয়ে দিচ্ছি, সেই দেকার্ত কোঁৎ থেকে শুরু করে ফুকো দেরিদা অব্দি সবার ফুটনোট লিখে লিখেই তো এতদিন দিব্যি চালিয়ে দিলাম, হঠাৎ ইন্টারনেটে এসে খামোখা একখানা স্ট্র্যাটেজি লড়াতে যাব কেন? বিশেষ করে, গুরু, সাম্য টাম্য যদি সবই অলীক হয়, তবে এই স্ট্র্যাটেজি ই বা কি আহামরি মোক্ষ প্রসব করতে চলেছে?

সত্যি কথা বলতে কি যৌক্তিক বিচারে কোনো স্ট্র্যাটেজিরই কোনো প্রয়োজন নেই। এটি মূলত: একটি মরাল স্ট্যান্ড। আর কে না জানে যে নৈতিক অবস্থানগুলি যুক্তির বিচারে শেষ পর্যন্ত অ্যাবসার্ড। এখানে আমরা নামক যে অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে, সেটিও কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নয়। এই আমরা একটি নির্মান, যাতে শুধুমাত্র সেইসব লোকজনই ইনক্লুডেড যারা ভাবেন, যে একটা অল্টারনেটিভ স্ট্র্যাটেজি প্রয়োজন। ফলে আপনি যদি এই লেখা পড়েন এবং এই আমরার অংশবিশেষ হন, তাহলে আপনাকে অল্টারনেটিভ স্ট্র্যাটেজির প্রয়োজনীয়তাটা নতুন করে বোঝানোর কিছু নেই। আর যদি আপনি এই আমরার পার্ট না হন, তবে আমাদের কোনো দায় পড়েনি যে ওটা বাড়ি বয়ে গিয়ে আপনাকে বুঝিয়ে আসব। ঠাট্টা নয়, আজ অবধি মানবভাষার যাবতীয় নির্মান, যে কোনো মরাল স্ট্যান্ডই এই পদ্ধতিতে তৈরি। এই দেখুননা এতক্ষণ ধরে পাওয়ার গেম পাওয়ার গেম করে চিল্লাচ্ছি। তো, এই পাওয়ার বা ক্ষমতাটা কি জিনিস আপনি জানেন? সেই হব্‌স থেকে শুরু করে ফুকো পর্যন্ত পাওয়ার কি এবং কি নয়, কি করে এবং কি করতে পারেনা, এই নিয়ে লাখ লাখ পেপার বেরিয়েছে, কেউ ই নিশ্‌চিত নন পাওয়ার গেছোদাদাটি ঠিক কি,তিনি কোথায় থাকেন এবং কিভাবে এই নিয়ে লাঠালাঠি মারামারির কোনো শেষ নেই, কিন্তু, ঐ আলোচনায় আপনাকে ঢুকতে হলে, প্রথমেই মেনে নিতে হবে, যে পাওয়ার নামক একটি বস্তু সত্যি ই বিরাজমান, যা আমি আপনি সকলের গতিবিধি প্রত্যেকটি মূহুর্তে নিয়ন্ত্রণ করছে। আপনি, হরিদাস পাল, যদি দাবী করে বসেন, পাওয়ার ফাওয়ার আবার কি ওসব আমি মানিনা, কারো দায় পড়েনি আপনাকে এসে বাবা বাছা বলে বোঝাতে বসবে। আপনি মানুন বা না মানুন পাওয়ার আছে,কারণ, পাওয়ার আছে। মানব ভাষার প্রতিটি ক্যাটিগরি ই একে অপরকে রিকার্সিভলি নির্মান করতে করতে কোনো এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ায়, জলের পার্টিক্‌ল গুলো যেমন র‌্যান্ডম মোশানে একে অপরকে ঢুসো মারতে মারতে কোনো এক বিশেষ তাপমাত্রায় হঠাৎই বিভিন্ন আকৃতির বরফের চাঙড় হয়ে যায়; যাকে আমরা অসম্পূর্ণ রিকার্শন বলছি। ঠিক কি আকৃতির হবে একটি হিমশৈল, কোন ক্যাটিগরি কোন অবস্থানে এসে কখন থমকে দাঁড়াবে আর কখন আবার সেখান থেকে পিছলে যাবে, তার পিছনে যে আছে তাকে ক্ষমতা বলতে পারেন, নৈতিক অবস্থান বলতে পারেন, যা খুশি বলতে পারেন, কিন্তু ঐ অবস্থান একটি অলীক অবস্থান। ফলে পাওয়ার আছে, কারণ পাওয়ার আছে, আমরা আছি, কারণ আমরা আছি, এবং সঙ্গে আছে আমাদের অল্টারনেটিভ স্ট্র্যাটেজি। আলোচনাই করুন বা তর্কবিতর্ক, আপনাকে যুক্তিবিস্তার শুরু করতে হবে, মূলত: আমাদের স্ট্র্যাটেজি নামক এই অলীক অবস্থানকে স্বীকার করে। কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজের ভাষায়, এই আমরা এক লজিকাল এনটিটি, ফিজিক্যালি যাদের আর ট্র্যাক করা সম্ভব নয়। এই আমরা উনিশশো আশি নব্বই এর দশকে লেখালিখি/ চিন্তাভাবনা/রাজনীতি করত, বিরানব্বই এর সুমন চট্টোপাধ্যায় এদের নাড়িয়ে দিয়েছিলেন,সোভিয়েত রাশিয়ার পতনে এরা বিচলিত হয়েছিল, বাবরি মসজিদের ভেঙে পড়া এদের কাছে একটি শক, এবং লেখার শুরুতেই বলা হয়েছে, দেড় দশকের রোলার কোস্টার জার্নির শেষে এখন এরা ইন্টারনেট ও উত্তরাধুনিক দুনিয়ার বিভিন্ন অলিন্দে বিরাজ করছে। ফিজিকালি এরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, যদিও নেটের কারণে পৃথিবী এখন আরও অনেকটাই ছোটো,অনেকেরই নিজেদের মধ্যে আজও যোগাযোগ রয়ে গেছে, কিন্তু তবুও, কোনো মতাদর্শগত শৃঙ্খল বা শৃঙ্খলা দিয়ে এদের আর একসূত্রে বেঁধে ফেলা যাবেনা। নব্বইয়ে এরা পরিবর্তনের কথা ভাবতো, সাম্যের কথা ভাবতো,কেউ কেউ হয়তো লড়াইয়ের কথাও ভাবতো, কিন্তু আজ, এই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে সেই সাম্য অলীক,আর লড়াইটাই হাওয়া হয়ে গেছে শত্রুর অভাবে। এই গ্লোবালইজ্‌ড দুনিয়ায় পক্ষ নেওয়াটাই যে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আউটসোর্সিংএর ইস্যুটাই ধরুন, আউটসোর্সিংএর ফলে হাজারে হাজারে আমেরিকানের চাকরি যাচ্ছে, পুরোনো দিনের সাদাকালো চশমায় দেখলে, কোম্পানি গুলো জাস্ট মুনাফার লোভে শ্রমজীবি মানুষের চাকরি খেয়ে নিচ্ছে,এবং যেকোনো সচেতন মানুষেরই এর বিপক্ষে দাঁড়ানো উচিত। কিন্তু আবার এই সমস্ত জবগুলো যাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বে, এতোদিন যাদের টাকা আর সম্পদ লুটে প্রথম বিশ্বের এত রমরমা, সেই রক্তঋণের কিছু অংশ আবার এই সুবাদে শোধও হচ্ছে, কিছু টাকা যাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বে,উত্তর ঔপনিবেশিক যুগে তাতে কি আপনার আমার উল্লসিত হবার কথা নয়? বিশেষ করে আমরা যারা এতদিন ধরে বলে এসেছি, মুক্ত বাজারে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, যদি লেবার মার্কেটটাও ফ্রি হয়, তাদের তো এর বিপক্ষে যাবার কোনো জায়গাই নেই। আবার উল্টো দিকে, আউটসোর্সিং এর ফলে যে বহুজাতিক জায়েন্টগুলো ভারতে হায়ারিংএর বন্যা বইয়ে দিচ্ছে, তাদের এমপ্লয়িরা কিন্তু মূলত: ঠিকা শ্রমিক, এই কোম্পানিগুলো যেকোনো দিন যেকোনো কারণে যাকে খুশি ছাঁটাই করতে পারে এবং করে থাকে এবং এদের বেশিরভাগই কোনো লেবার লয়ের ধার ধারেনা, আটের জায়গায় দশ বারো ষোল ঘন্টা কাজ করিয়ে নেয়, আমেরিকায় যা করতে হলে এদের প্যান্টুল খুলে নেওয়া হত। ভারতবর্ষে তাতো হয়ইনা, বরং সকলকেই এক্সিকিউটিভ আখ্যা দিয়ে বলে দেওয়া হয় হোয়াইট কলার লেবারদের আবার কাজের বাঁধা সময় হয় নাকি, যেন আমেরিকায় হোয়াইট কলার লেবাররা সোনা মুখ করে আটের বদলে দশ বারো ঘন্টা করে স্বেচ্ছাশ্রম দেয়। ফলে লেবার হায়ার করার ব্যাপারে এরা ফ্রি মার্কেটে বিশ্বাসী, যতদিন দরকার রাখব তারপর ফুটিয়ে দেব -- এই আমেরিকান নীতিতে বিশ্বাসী, কিন্তু কাজ করানোর ব্যাপারে এই মার্কিনী প্রফেশানালিজ্‌ম হঠাৎই হাওয়া হয়ে গিয়ে, কোম্পানি, সেতো তোমার মন্দির, তোমাকে রুটি দেয়, তার জন্যে তো তোমাকে প্রাণপাত করতে হবেই --এই একান্ত ভারতীয়ত্বে বিশ্বাসী। এখানে এখনও কোনো মাইকেল মূর নেই, যিনি এই অনাচারকে প্যাকেজবন্দী করে প্রচারের মেইনস্ট্রীমে নিয়ে আসবেন, কিন্তু শ্রমের জগতে এই আউটসোর্সিং যে বিপজ্জনক ট্রেন্ডের জন্ম দিচ্ছে, একজন সচেতন মানুষ হিসাবে তার বিরুদ্ধাচরণ তো আপনাকে করতেই হবে। এতো গেল একটা সমস্যা, যে কোনো গ্লোবালাইজ্‌ড ইস্যুতেই আর পক্ষ নেওয়া যাচ্ছেনা। কিন্তু যেখানে পক্ষ নেওয়া যাচ্ছে, যেমন ধরুন আমেরিকার ইরাক আক্রমণ, সেখানেও কিস্যু করার নেই। নাইন ইলেভেনের পর কিছু মাথামোটা আমেরিকান বাদামি আদমীদের ঠেঙিয়েছিল, সেই মূর্খামির পুনরাবৃত্তি করে তো আপনি আর আমেরিকান দেখলেই ঠেঙাতে যাবেননা, কারণ আপনি জানেন, যে মার্কিনীদের একটা অংশও এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে। আপনি বড়োজোর যেটা করতে পারেন, নেটে জ্বালাময়ী মেসেজ পোস্ট করতে পারেন, তাও কোনো আমেরিকান ক্যাপিটালিস্ট নির্মিত সাইটে, যথা এম এস এন বা ইয়াহু, ব্যস কম্ম খতম পয়সা হজম। কিছু হল আর ইউ এস আই এস এ ঢিল মেরে বিপ্লব করে এলাম, সেই দিন আর নেই।

ফলে এই লড়াই এক অলীক লড়াই, ছায়ার সঙ্গে কুস্তি। এই আমরাও, আগেই দেখেছি এক অলীক নির্মান। কিন্তু অলীক মানেই যে অবাস্তব, তা তো নয়। এই অলীকত্ব আসলে এক ডিসকার্সিভ অলীকত্ব,ক্ষমতাবান এলিটদের এই পাওয়ার ডিসকোর্সে আমরা অলীক, আমাদের লড়াই অ্যাবসার্ড, কিন্তু এর বাইরে, বাস্তবতায় আমি আপনি ছিলাম, আছি, থাকব। গণতন্ত্র ও সাম্যের মসৃণ নিটোল ডিসকোর্সের ভিতরে/বাইরে মূর্তিমান অস্বস্তি হয়ে আমরা চুলকানির মতো মাঝে মাঝেই ফুটে বেরব। পাওয়ার ডিসকোর্স আমাদের তার বাইরে বের করে দিতে পারে, কিন্তু সেই পাওয়ার গেমই আমরা খেলব যা মূলত: গেরিলা ওয়ারফেয়ার। আমরা অলীক, ফলে এই আক্রমণের উৎসকে লোকেট করা অসম্ভব। যেখানেই অসাম্য, যেখানেই ক্ষমতা তার দাঁত নখ নিয়ে উপস্থিত,যদি একে ক্ষমতাই বলা হয়, সেখানেই গেরিলা যুদ্ধ, এই অলীক রেসিস্ট্যান্স।