আপনার মতামত         


"); plain_window.document.writeln(""); } এই লেখাটি বেশ কিছুদিন আগেই এসে গিয়েছিল সাইটে। পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো একে গুরুচন্ডালি ২ নামক খাঁচায় ভরে ফেলা হল। --সম্পাদক

মৃত্যুদন্ডাজ্ঞা:কেন যুক্তিসঙ্গত নয়
রিনিতা মজুমদার

হিংসাত্মক অপরাধ, এই মূহুর্তের অন্যতম গুরুতর সামাজিক সমস্যা। বহু লোকেই বিশ্বাস করেন, যে, দানবিক অপরাধে যারা দোষী, তাদের উপযুক্ত শাস্তি, মৃত্যু। তাঁদের যুক্তি হল, ক্রমবর্ধমান হিংসার মূলোৎপাটনের সর্বোত্তম পন্থা হল অপরাধীকে খতম করে দেওয়া। অনেকগুলি ইউরোপীয় দেশ মৃত্যুদন্ডকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং এশিয়ায় তা এখনও বহাল তবিয়তে বিরাজমান। অতএব, বিতর্কটি বিদ্যমান,এবং মৃত্যুদন্ড ঘিরে যে বিতর্ক, তা কখনই খুনি ও ধর্ষণকারীর শাস্তি হওয়া উচিত কিনা, সেই নিয়ে নয়, বরং কি শাস্তি হওয়া উচিত, এই নিয়ে। অতএব, বেছে নেওয়াটা ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট এবং পানিশমেন্ট হীনতার মধ্যে নয়, বরং মৃত্যুদন্ড এবং তার প্রাথমিক বিকল্প যাবজ্জীবন কারাদন্ডের মধ্যে। হিংসা, বিশেষ করে হত্যার পিছনে কি আছে বা কারণটি কি , এই প্রশ্নটি,শাস্তির ইস্যুতে অন্তত: দুটি কারণে প্রাসঙ্গিক। প্রথমত: শাস্তির একটি বিশেষ ধরণ সমাজকে অধিকতর হিংসা এবং খুনের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে কিনা, তা অন্তত: আংশিক ভাবে কি কারণে মানুষ হিংসাত্মক হয়ে উঠছে তার উপর নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত: কোনো অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তি শাস্তিযোগ্য কিনা তা শুধু সে কি করেছে তার উপরেই নির্ভর করেনা, তার আচরণের অন্তর্নিহিত কারণটি কি, তার উপরেও নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ: একজন উন্মাদ একজন স্বাভাবিক ব্যক্তির তুলনায় কম শাস্তি পাবে; একইভাবে কেউ যদি ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাবার পরে অপরাধে লিপ্ত হয়, সে অবশ্যই যে এসবের মধ্য দিয়ে যায়নি তার চেয়ে কম শাস্তিযোগ্য।

মৃত্যুদন্ডের সমর্থনে মোটামুটি দুই ধরণের যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। প্রথমটি রিট্রিবিউটিভ জাস্টিসের দিক থেকে, এবং দ্বিতীয়টি ইউটিলিটারিয়ান যুক্তি। রিট্রিবিউটিভ ন্যায়বিচারের যুক্তি দাবী করে, যে, শাস্তিকে হতে হবে অপরাধের ভয়াবহতার আনুপাতিক, যাতে করে এক ধরণের নৈতিক ভারসাম্য বজায় থাকে --- খুনের ভারসাম্য বজায় রাখবে মৃত্যু। এক্সোডাস দাবী করেন "জীবনের বদলে জীবন, চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত....... ' (এক্সোডাস ২১: ২৩-২৪)। অন্যদিকে ইউটিলিটারিয়ান যুক্তির সমর্থকরা বলেন, একজন খুনি আর কখনও হত্যা করবেনা, অপরাধটি আবার ঘটাবেনা, তার গ্যারান্টি দিতে পারে কেবলমাত্র একটি শাস্তিই, যার নাম মৃত্যুদন্ড; নচেৎ খুনি যে তার সহবন্দীকে হত্যা করবেনা, বা প্যারোলে ছাড়া পেয়ে একজন ভিজিটারকে খুন করবেনা, তার কোনো গ্যারান্টি কেউ দিতে পারেনা। ইউটিলিটারিয়ানরা আরও দাবী করতে পারেন,যে, মৃত্যুদন্ড যাবজ্জীবন কারাদন্ডের তুলনায় খুনের অনেক উন্নততর প্রতিষেধক, এবং এই কারণেই ন্যায়সঙ্গত। জনতা আইন মেনে চলে প্রাথমিক ভাবে শাস্তির ভয়ে,--- শাস্তির ভয়াবহতা যত বেশি তা তত বেশি ভীতি উৎপাদনে সক্ষম, অতএব অপরাধের প্রতিষেধক হিসাবে তত বেশি কার্যকর। মানুষ যদি জানে যে খুন করলে কারাগার নয়, মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে, তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই তার হত্যার প্রবণতা কমবে। ইউটিলিটারিয়ানরা আরও বলে থাকেন, যে মৃত্যুদন্ড তুলনায় সস্তাও বটে, ফলে কাউকে আজীবন কারাগারে রেখে দেবার পরিবর্তে মৃত্যুদন্ড দিলে করদাতাদের পয়সার অধিকতর সদ্ব্যবহার হয়।

আমি দেখাব,উপরিউক্ত দুই ধরণের যুক্তিই ত্রুটিপূর্ণ। প্রথমে রিট্রিবিউটিভ যুক্তি। যুক্তি নয়, মানবিক বোধ নয়, আলোকিত কোনো সুচেতনা নয়, এই যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে সুতীব্র প্রতিশোধস্পৃহা, ঘৃণা ও ভয়ের মতো আদিম কিছু প্যাশন ও আবেগের উপর। কোনো সন্দেহ নেই, যে ব্যক্তি মানুষের ক্ষেত্রে এই অনুভূতিসমূহ যথেষ্ট স্বাভাবিক হলেও , কোনো পাবলিক পলিসি এই ধরণের প্যাশন আবেগ এবং অনুভূতি দ্বারা নির্ধারিত হতে পারেনা। ঠিক এই প্যাশন থেকেই মানুষ একসময়ে ডাইনি বা অন্য কোনো সন্দেহে পুড়িয়ে মেরেছে মানুষকে, জীবন্ত মানুষকে হিংস্র পশুর মুখোমুখি ছেড়ে দিয়ে খাওয়ানো হয়েছে।

ইউটিলিটারিয়ান যুক্তিগুলি আরও বেশি ত্রুটিপূর্ণ। এই যুক্তির সারসংক্ষেপ হল, যে মৃত্যুদন্ড মূলত: একটি প্রতিষেধক, অতএব, "ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট' হিসাবে ব্যবহার্য। এই যুক্তি সঠিক নয়। প্রথমত: একজন হত্যাকারীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে জেলে ভরে রাখলে, তা যথেষ্ট পরিমানে সামাজিক নিরাপত্তা দেয়। যদি একজন হত্যাকারী যতদিন বাঁচবে, ততদিনই সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক প্রতিপন্ন হয়, তাহলে তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া যেতে পারে। প্যারোল নিষিদ্ধ করে, অথবা আটকে দিয়ে, একজন হত্যাকারীর আরো একবার হত্যার সম্ভাবনাকে চূড়ান্তভাবে কমিয়ে আনা যায়। তার চেয়েও বড় কথা হল, রিসার্চে দেখা গেছে, যে ব্যাপারটা মোটেই এরকম নয়, যে, যে আইনব্যবস্থায় ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট আছে, সেখানে খুনের হার ক্যাপিটাল পানিশমেন্টহীন আইনব্যবস্থার চেয়ে কম। যদিও, এরকম কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়না, যে, মৃত্যুদন্ড অন্য কোনো ধরণের শাস্তির চেয়ে প্রতিষেধক হিসাবে অধিকতর কার্যকর। হান্স জেসেল বলেছেন, “This then is the proper summary of the evidence on the deterrence effect of the death penalty; if there is one, it can only be minute, since not one of the many research approaches --- from the simplest to the most sophisticated --- was able to find it.” । রুথ পিটারসন এবং উইলিয়াম বেইলি বলেছেন, “We find no consistent evidence that the availability of capital punishment, the number of executions, the amount of television coverage they receive, ….. is associated significantly with rates for total and different types of felony murder. The findings are consistent with the vast majority of suicides of capital punishment…” । এছাড়াও, ব্রিটিশ সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যান্থনি স্টোর দাবী করেন, সমাজে যে সমস্ত ভয়াবহ অপরাধ হয়, তার জন্য সমাজের কেবলমাত্র একটি সামান্য সংখ্যক ব্যক্তিমানুষই দায়ী। স্টোর বলেন, সাধারণ কোনো ব্যক্তি মোটামুটি কোনো শাস্তির ভয়েই অপরাধ থেকে দূরে থাকে, কিন্তু কোনো শাস্তি, এমনকি মৃত্যুদন্ডের ভয়ও অ্যান্টিসোশালদের অপরাধ থেকে সহজে আটকাতে পারেনা। এদের অনেকেরই মূহুর্তের ইমপাল্‌স দমন করার ক্ষমতা অত্যন্ত কম; অনেকেরই আত্মসম্মান বোধ কম; অনেকেরই আছে সুতীব্র ক্ষোভ ও ক্রোধ, যা কোনো যৌন বা অন্য কোনো ধরণের নিগ্রহের ফল।

এখনও পর্যন্ত আলোচিত উপরিউক্ত যুক্তিপরম্পরা ছাড়াও, ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের একটি ধরণ হিসাবে মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে, আরও কিছু যুক্তি পেশ করা যায়। প্রথমত: এই শাস্তির জন্য ন্যায়বিচারের অব্যর্থতা সম্পর্কে নিশ্‌চিত হওয়া প্রয়োজন। অভিজ্ঞতা বলে, মানুষ যে অপরাধ করেনি, তার জন্যও দন্ডিত হয়। তদন্তকারীরা অযোগ্য হতে পারে, তদন্ত হতে পারে অক্ষম ও অনুপযুক্ত। সাক্ষীদের ঘুষ দিয়ে, ভয় দেখিয়ে, সাক্ষ্য ম্যানুফ্যাকচার করে অথবা চেপে দিয়ে, পুলিশ ও প্রসিকিউটার সুবিচার থেকে কাউকে বঞ্চিত করতে পারে;অভিযুক্তের সমর্থনে দাঁড়াতে পারে অনুপযুক্ত বা যথেষ্ট প্রস্তুতিহীন আইনজীবি;সাক্ষীরা ভুল করতে পারে। এর মধ্যে যে কোনো একটি কারণে যদি কারও মৃত্যুদন্ড কার্যকরি হয়ে যায়, তবে সেই ভুল আর সংশোধন করার উপায় নেই। মৃত্যু একটি চরম ও অন্তিম ঘটনা, যাকে উল্টে দেওয়া যায়না। তার চেয়েও বড় কথা হল,হত্যা সমাজকে পশুত্বে এবং মানুষকে অনুভুতিশুন্যতায় উত্তীর্ণ করে। রাষ্ট্র যখন হিংসার আশ্রয় নেয়, তখন, সে এই বার্তা পাঠায়, যে, হিংসাই হল সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ সমাধান। অত:পর, এটি স্ববিরোধী। তার চেয়েও বড় কথা হল, সাধারণভাবে জেলের স্ট্যাটিস্টিক্স ও মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত আসামীদের তালিকায় সামাজিক ও অর্থলৈতিক ভাবে নিচের তলার লোকজনের এক বিপুল সংখ্যাধিক্য দেখা যায়। আইনসিদ্ধ হত্যার এই সারিতে উচ্চশিক্ষিত উঁচুতলার লোকেদের চেয়ে নিম্নবিত্ত, দরিদ্র ও অশিক্ষিত লোকজনেরই আধিক্য দেখা যায়। এই সেই বৈষম্য, যা ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে অন্তর্নিহিত। এছাড়াও, ইউটিলিটারিয়ানদের করদাতাদের টাকা বাঁচানোর যুক্তিটিও এখানে খাটেনা; কারণ মৃত্যুদন্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি সুদীর্ঘ আবেদন নিবেদনের প্রক্রিয়া। অ্যাপিলের এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল। মৃত্যুদন্ডকে সস্তা বানাতে গেলে পুরো প্রক্রিয়াটাকেই অত্যন্ত মসৃণ ও দ্রুতগতির করে তুলতে হবে। সবশেষে, মানুষের পাল্টে যাবার সম্ভাবনা সবসময়েই বিদ্যমান। আজ যে সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক, কাল সে তা নাও থাকতে পারে। কারাদন্ড পুনর্বাসনের সম্ভাবনাটিকে খোলা রাখে, কিন্তু মৃত্যুদন্ড রাখেনা। এই ধরণের পরিবর্তন ইতিপূর্বে দেখা গেছে, যে পরিবর্তনের সুযোগ মৃত্যুদন্ড দেয়না, এবং এই সমস্ত যুক্তিপরম্পরা নিশ্‌চিতকরেই দেখিয়ে দেয়, যে মৃত্যুদন্ড ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের একটি ধরণ হিসাবে যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত নয়।

সূত্র:
1. Barclow, Emmette. (1994). Moral Philosophy: Theory and Issues. California: Wadsworth.
2. Patterson, Ruth. & Bailey, W. “Felony Murder and Capital Punishment.” (1991). Criminology.
3. Zeisel, Hans. “The Deterrent Effect of the Death Penalty: Fact and Faith.” (1982). The Death Penalty in America.