আপনার মতামত         


রাজাকার হয়ে ওঠার গল্প বা ঠাকুর বাড়ির কিস্‌সা
সামরান হুদা


ভেরন গোটা পান্যা গোটা
ভাই ভাইয়ে যুক্তি করইন
ঠাউর বাড়িত যাই
তেল দেওরে স্যান করি
ভাত দেওরে খাই
শীতল পাটি বিছাই দেও
বৌয়েরে নাচাই। ( প্রচলিত ছড়া, চট্টগ্রাম)



গ্রামের নাম ছোট দেওয়ান পাড়া বললে কেউ চিনবে না, "ঠাউর বাড়িত যামু' বললে সাত মাইল দূরের ঐ মহকুমা শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যে কেউ তোমাকে নরাইল থানার ছোট দেওয়ান পাড়া গ্রামের ঐ ঠাকুর বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা বাৎলে দেবে, হাতে সময় থাকলে পৌঁছেও দেবে। এমনই তাঁদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি। সেই গ্রামের নাম ছোট দেওয়ান পাড়া আর সেই ঠাকুর বাড়ির ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফারের কথা বলতে গেলে অনেক কথাই চলে আসে সে সব কিস্‌সা কিন্তু গল্পকথা নয়। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত নরাইল থানার মোটামুটি সর্বেসর্বা বলা চলে তাঁকে। গাফ্‌ফার ঠাকুর সাহেব নিজে কিছু করেন না। কিছু বলতে চাকরী-বাকরি, ব্যবসা -বাণিজ্য বোঝাতে চাইছি। তাঁর ছোটভাই ঠাকুর আব্দুল সাত্তার কলিকাতায় থাকেন, ব্যবসা করেন। ছ'মাস-বছরদিনে একবার বাড়ি যান, লোহার ট্রাঙ্কে করে টাকা বেঁধে নিয়ে যান, বড় ভাইয়ের হাতে তুলে দেন। কাজেই গাফ্‌ফার ঠাকুর সাহেবের চাকরী কিংবা কাজ কম্মো করার দরকার পড়ে না। তবে কাজ তিনি করেন না তা নয়। করেন, অনেক রকমের কাজ করেন, তার মধ্যে প্রধান কাজ যেটা তিনি করেন, তা হল রাজনীতি। গাফ্‌ফার ঠাকুর একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক। মুসলিম লিগ করেন। বেশ কয়েকবার পার্লামেন্টের নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু নির্বাচিত হননি। স্রোতের মত টাকা খরচ সার হয়েছে। এলাকার তিনি চেয়ারম্যান। নিজের এলাকার জন্যে যথেষ্ট কাজও করেন। নরাইল অন্নদা হাই স্কুলের তিনি সেক্রেটারি। এই অঞ্চলে একটা কলেজের খুব দরকার, শুধু নরাইল নয় আশে পাশের গ্রামেরও ছেলেগুলো তো চলে যায় ম্যাট্রিক পাশ করে শহরের কলেজে কিন্তু গ্রামের বেশির ভাগ মেয়েরই পড়া আর এগোয় না দূরের ঐ কলেজে যেতে হবে বলে। একটা কলেজ এখানে তৈরি করার চেষ্টায় আছেন তিনি কিন্তু ভোটে জিতে আসতে পারলে সুবিধে হয় তাই আপাতত কলেজ তৈরি করার চিন্তাটা চিন্তা ভাবনার স্তরেই আছে।

গ্রামে এবং আশে পাশের অঞ্চলেও তার বেশ নাম ডাক আছে। শুধু যে প্রচুর টাকা খরচ করে ইলেকশন করেন আর হারেন তা নয়, মানুষটি উপকারী। যে কোন সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে পড়তে পারলে কিছু না কিছু একটা ব্যবস্থা তিনি করেই দেন। বড় বড় লোকেদের সাথে ওঠা-বসা। তাঁর বাড়িতে বেড়াতে আসেননি, নেমন্তন্ন খেয়ে যাননি এমন নেতা পূর্ব পাকিস্তানে কমই আছেন। প্রায় দিনেই বার বাড়িতে বিচার সভা বসে। এখানে, এই নরাইলে পঞ্চায়েত বলে কিছু নেই। তিনিই পঞ্চায়েত, তিনিই বিচারক আবার তিনিই রক্ষকও বটে। অন্ধ ভিখারিনীটি তাই তাঁরই ভাইপোর নামে ধর্ষণের অভিযোগ তুলতে পারে তাঁর বৈকালিক বিচারসভায়। কার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না টাকার জন্যে, গাফ্‌ফার ঠাকুরের কাছে চলে গেলেই বিয়ের টাকার বন্দোবস্ত হয়ে যায়। ঘরের চাল উড়ে গেছে ঝড়ে, ভরসা গাফ্‌ফার ঠাকুর। মুনিষ-কামলা-কামিন মিলিয়ে প্রতি বেলায় ১০০মানুষের পাত পড়ে তাঁর বাড়িতে।

ভেতর বাড়ির গিন্নি তাঁর সৎমা। তার সৎমা রাহেলা বিবি এখন এই সংসারের কর্ত্রী। তিনি যখন বিয়ে হয়ে এবাড়িতে আসেন তখন তার স্বামী ছাড়া এবাড়িতে আর ছিল দুটি মা মরা ছেলে। আব্দুল গাফ্‌ফার ওরফে মন্নু আর আব্দুল সাত্তার ওরফে হান্নু। ছেলেদের মায়ের আদরে যতটা কাছে টেনেছেন তার চাইতে বেশি তাদের তিনি শাসন করেছে, নিয়মানুবর্তীতা শিখিয়েছেন। আর "রাহেলা বিবি' যে এই সংসারের মালকিন সেটা তাদের মগজে গেঁথে দিতে পেরেছিলেন তিনি। এবাড়িতে আসার পরে তার তিনটি সন্তান হওয়ার পরে স্বামীটি উপরে চলে যান। দুই মা মরা ছেলের সাথে যোগ হল আরো তিনটি বাপমরা শিশু। গাফ্‌ফার ঠাকুর আর সাত্তার ঠাকুর এই তিনটি শিশুকে কখনও সৎ ভাই বোন বলে ভাবেননি। রাজনীতির পাঠ গাফ্‌ফার ঠাকুর তাঁর এই সৎমাটির কাছ থেকেই পেয়েছিলেন বলে জানি।


হান্নুর জন্ম দিতে গিয়ে তাদের মা মারা যান। বাড়িতে কোন মহিলা সদস্য না থাকায় দুধের শিশু হান্নু স্থান পায় দূর সম্পর্কের এক ফুপুর কোলে। সদ্য মা হওয়া সেই ফুপু নিজের দুধ দেন হান্নুকে। এক নারীর দুধ খেয়ে একইসাথে বাড়ে দুটি শিশু। গাফ্‌ফার তখন বছর চারেকের শিশু। এভাবে বেশিদিন চলে না। আত্মীয় বন্ধুর পরামর্শে দ্বিতীয় বিবাহ করেন মালেক ঠাকুর। শিশু সাত্তার ফিরে আসে নিজের বাড়িতে, স্থান পায় নতুন মায়ের কোলে। বছর দুয়েকের হান্নু তখন হেঁটে দৌড়ে বেড়ায়। রাহেলাবিবি ঠাকুরবাড়িতে বৌ হয়ে এসে বাড়ির অবস্থা বুঝে নিতে দেরী করেননি। মাতৃস্নেহে দুটি শিশুকেই কাছে টেনে নেন তিনি। মাতৃহীন শিশু দুটি মা পেয়ে রাহেলাবিবিকে আঁকড়ে ধরে প্রাণপণে। মান্নু আর হান্নু দুজনেই শান্ত প্রকৃতির ছিল। শিশুসুলভ দৌরাত্ব, চঞ্চলতা তাদের মধ্যে ছিল না কাজেই রাহেলাবিবির কোন সমস্যাই হয়নি এই ছেলে দুটিকে পোষ মানাতে। ছেলেবেলা থেকেই মায়ের আদেশ নিষেধ ভীষণভাবে মেনে চলেন দুই ভাই। মায়ের আদেশ-উপদেশ তাঁদের জন্যে কোরান হাদীসের বাণীর চেয়ে কোন অংশেই কম নয়।


ছেলে দুটিই ততদিনে বড় হয়েছে, শিশু নেই আর। রাহেলা বিবি এবারে আরেকটি বিয়ে করলেন আর স্বামীটিকে নিয়ে এলেন এই ঠাকুরবাড়িতে। বড় দুই ছেলেকে বোঝালেন, তিনি যদি শ্বশুরবাড়ি চলে যান তো এ'সংসারের কি হবে? বাপমরা ঐ ছোট তিনটি শিশুরই বা কি হবে? সব মিলিয়ে এই পাঁচজনের ভালর জন্যেই তাঁর শ্বশুরঘরে যাওয়া চলবে না কাজেই তাঁর স্বামীই ঠাকুরবাড়িতে এসে থাকবেন। ঠাকুরদের জমিজমাও ছিল বেশ কিছু, সেগুলো শুধু কাজের লোক দিয়ে তো দেখাশোনা হয় না! আর মন্নু অর হান্নু যদি জমিজমা সংসার দেখতে শুরু করে তো পড়াশোনা কে করবে? নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে না! মন্নু আর হান্নু এমনিতেই প্রবল মা ভক্ত সন্তান , তাদের কোন বক্তব্যই ছিল না মায়ের এই দ্বিতীয় বিবাহে তদুপরি সংসারের ভাল-মন্দের মাপকঠিতো মা বুঝিয়েই দিয়েছেন!

তারপর শোনো,রাহেলা বিবি জন্ম দিলেন আরেকটি কন্যাসন্তানের। তার স্বামী বেশিদিন ঠাকুরবাড়িতে থাকতে চাইলেন না, তিনি রাহেলা বিবি ও তাঁর কন্যাসন্তানকে নিয়ে যেতে চাইলেন তাঁর নিজের বাড়িতে কিন্তু রাহেলা বিবি গেলেন না। স্বামীকে জানিয়ে দিলেন, তিনি ইচ্ছে করলে তালাক দিয়ে চলে যেতে পারেন, তাঁর পক্ষে ঠাকুরবাড়ি ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। স্বামী তালাক দিয়ে চলে গেলেন। সন্তানসংখ্যা এখন পাঁচের জায়গায় ছয়। পড়াশোনা বেশিদিন চালাতে পারলেন না মন্নু, হান্নু। জমির আয় দিয়ে তো সংসার চলে না। ক্ষেতে তাঁদের ধান, পাট, সর্ষে, গম, তিল, ধনে, লংকা, মরশুমি আনাজ, রকমারী ডাল সবই হয়। এত হয় যে গোটা বছর খাওয়ার পরেও এ বছরেরটা আর বছরেও থেকে যায়। কিন্তু কিনতে হত কাপড় জামা, রোগের ওষুধ, চিনি, কেরোসিন। রাহেলা বিবির সংসারে ছেলে-মেয়ে ছ'টিই তো শুধু নয় আছে আরও জনা পাঁচ সাত লোক। মুনিষ, রান্নার লোক, বাচ্চা দেখার লোক , মাষ্টার। সব মিলিয়ে ১৪-১৫ জনের সংসার। রাহেলা বিবির নিজের আছে আফিমের নেশা। খাওয়া পরায় টান না পড়লেও আফিমের যোগানে টান প্রায়শই পড়তে লাগল। তো আফিমের টানে সংসারেও টান পড়তে শুরু করল এক সময়। সংসারে টানাটানি শুরু হতে গাফ্‌ফার আর সাত্তার বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় গেলেন রুটি রুজির সন্ধানে। তখন, সেই ১৯২৬সনে কলকাতাতেই যেত লোকে। তো হান্নু আর মন্নুও এলো। কি কান্ড বল দেখি? শুনেছিলেন কলকাতায় একবার এসে পড়তে পারলেই হল! খিদিরপুর জাহাজঘাটায় গিয়ে ক'দিন ঘোরাঘুরি করে দুজনেই অবশ্য চাকরি পেয়ে গেলেন জাহাজে। খালাসীর কাজ। রাহেলা বিবির এক আত্মীয় এঁদের নিয়ে এসেছিলেন কলকাতায়। আর তারপর ঐ জাহাজঘাটার রাস্তাও তিনিই দেখিয়েছিলেন। দুই ভাইকে জাহাজে চড়িয়ে দিয়ে সেই আত্মীয়টি ফিরে গেলেন দেশে।

কয়েক বছর জাহাজের চাকরি করলেন দুই ভাই । ফাঁকে ফাঁকে দেশেও গিয়েছেন বার দুই। মা বুঝিয়েছেন, সোনার ছেলে তাঁর! পাড়া প্রতিবেশীদের ডেকে ডেকে দেখিয়েছেন সেই সোনার ছেলেদের! ততদিনে বাড়িতে সদস্যসংখ্যা আরও বেড়েছে। না রাহেলা বিবি আর বিয়ে করেননি। তার পুষ্যিসংখ্যা বেড়েছে। যে লোকটি বছরবান্ধা মুনিষের কাজ করে তার বউ বাচ্চাকে ঠাকুরবাড়ির লাগোয়া জমিতে ঘর তুলে তাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন রাহেলাবিবি। নইলে মাসে মাসে মুনিষটি বাড়ি চলে যায় যে, বউ-বাচ্চাকে দেখতে! তেমনি আরেক সদস্য হল তার ঠিকে কাজের ঝিটি। তারও বাড়ি বেশ দূরে বলে আসতে যেতেই দিন কাবার করে দেয় সে, অগত্যা তাকেও একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে হয়েছে! সেবার ছুটিতে দেশে গিয়ে গাফ্‌ফার ঠাকুর আর ফিরলেন না। রাহেলাবিবি ঘোষণা করলেন, এবার বিয়ে শাদী করে মন্নু দেশেই থিতু হোক, মেয়েরা বড় হচ্ছে তাদেরও একজন গার্জেন দরকার, জমিজমাও সব ছারে খারে যাচ্ছে ঠিকভাবে দেখাশোনার অভাবে, যদিও মুনিষ আছে, কিন্তু সে ব্যাটা নাকি চোর! নিজের আখের গোছাচ্ছে এবাড়িতে বসে। কাজেই মন্নুর আর কলকাতা যাওয়া চলবে না। হান্নু যাক, পরেরবার যখন হান্নু আসবে তারও বিয়ের ব্যবস্থা হবে, এখন গিয়ে সে টাকা রোজগার করুক দেখি।

সাত্তার ঠাকুর কলকাতায় ফিরে আর জাহাজের চাকরিতে ফিরে গেলেন না। চাঁদনি চকে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে তাতে ব্যবসা শুরু করলেন। হার্ডওয়্যারের দোকান, বেশ ভালই চলতে লাগল তাঁর ব্যবসা। দেশ থেকে নানা সময়ে নানা রকমের মানুষজন আসে, কেউ আত্মীয়, কেউ বা পরিচিত আবার কেউ কেউ চেনাশুনো ও নয়, খোঁজ নিয়ে চলে এসেছে কেউ কাজের খোঁজে, কেউ বা এমনিতেই ক'দিনের জন্যে বেড়াতে এসেছে, বাড়ির খবর নিয়ে, তিনি জানতে পারেন বড়ভাই বিয়ে শাদী করেননি, সংসারের দেখাশোনা করেন আর গ্রামের মাতব্বরী করে বেড়ান। সাত্তার শোনেন, চিন্তিত হন ভাইয়ের জন্যে কিন্তু এখান থেকে তিনি কিছুই করতে পারবেন না জেনেই চুপ করেই থাকেন। নতুন ব্যবসা, ছেড়ে যাওয়ার উপায় নেই কোথাও, তিনি মন দিয়ে ব্যবসা করেন। কেটে যায় কয়েক বছর। চাঁদনিচকের এক ভাড়া দোকান ঘর থেকে সাত্তারের এখন তিন দোকান। বোঝো কিস্মৎ!

কলুটোলার এক ঘুপচি গলিতে মস্‌জিদ বাড়ি লেনে সাত্তার এক দোতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতেন চাঁদনীতে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা জমে ওঠার পর থেকে। দোতলা বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ইচ্ছে সাত্তারের ছিল না, তাঁরা দু ভাইই তো থাকবেন, তার জন্যে দোতলা বাড়ির কী দরকার! গাফ্‌ফার বোঝালেন, " এখন না হয় তারা দু'ভাইই আছেন কিন্তু তাই বলে কী বরাবর তাই থাকবেন? তাঁদের সংসার হবে না? আর দেশে থেকে আম্মাও তো বেড়াতে আসবেন মাঝে মাঝে। তখন কি আবার বাড়ি ভাড়া নেওয়া হবে? সুবিধেমত পাওয়া গেছে, ভাড়াও কম। আর অতবড় খোলা ছাদ, গরমকালে দিব্যি হাওয়া খাওয়া যাবে ছাদে গিয়ে! আর তাছাড়া বাড়ির পাশে একই দেওয়ালের ওধারে মস্‌জিদ, পাঁচবেলা আজান শোনা আর ঘর থেকে স্রেফ দু'পা ফেলে গিয়ে নামাজ পড়ার এই সুবিধে আর কোথায় পাওয়া যাবে? ' সাত্তার বাড়ি ভাড়া নিলেন। পাঁচবেলা নামাজ নিয়মিত পড়েন সাত্তার, যদিও সপ্তাহের ছ'দিনই সকাল থেকে রাত অব্দি দোকানেই থাকেন তিনি আর দিনের বেলা নামাজ পড়বারও ফুরসত পান না কিন্তু রাতে দোকান থেকে ফেরার পর সারাদিনের নামাজ একবারে পড়ে তবে বাড়ি ঢোকেন। সেই বাড়ির দোতলাটা সব সময়েই এমনকি রাতেও বন্ধ থাকে, একতলাতেই বসত ছিল দুই ভাইয়ের। ছ'মাসে বছরে একবার রাহেলা কলকাতা যেতেন। গেলে মাসখানেক থাকতেন আর হাওড়া ব্রীজ, গড়ের মাঠ, রেসের ময়দান আর সিনেমা দেখে বেড়াতেন মন্নুকে সঙ্গে করে। দেশে ফেরার আগে ফর্দ মিলিয়ে মিলিয়ে বাজার করতেন, যে ফর্দ তিনি কলকাতা আসার আগে বাড়িতে বসেই বানিয়েছিলেন। সেই ফর্দে ধনেখালী শাড়ি থেকে নিয়ে থাকত দুলালের তালমিছরি অব্দি। নিউমার্কেট, জানবাজার ঘুরে ঘুরে বাজার করতেন রাহেলা আর মন্নু।

ইতিমধ্যে রাহেলাবিবি একবার কলকাতা এলেন গাফ্‌ফারকে সঙ্গে করে। তাঁর শরীর নাকি ভালো যাচ্ছে না কাজেই এখন তিনি কিছুদিন কলকাতায় থাকবেন। সাত্তার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইলে রাহেলা গেলেন না, বললেন এমনি শরীর খারাপ হয়েছে কিছুদিনের মধ্যেই ঠিকও হয়ে যাবে। গাফ্‌ফার এই বিষয়ে কিছুই না বলে মৌনতা বজায় রাখলেন, সকালে উঠে ভাইয়ের সাথে দোকানে চলে যান রাতে ফেরেন। কিছুদিনের মধ্যেই সাত্তার রোগ বুঝলেন রাহেলার কিন্তু তাঁর কিছুই করার ছিল না, এই বিষয়ে তাই চুপ করে থাকা ছাড়া গত্যন্তরও ছিল না। বড়ভাইকে ভক্তি করতেন পিতার মত কিন্তু এবারে ক্ষোভ চেপে রাখতে পারলেন না। জানতে চাইলেন, "এসব কী ভাই?' গাফ্‌ফার এবারেও চুপ থাকলেন এবিষয়ে তবে ভাইকে বললেন, "মান সন্মান বাঁচানো এখন তোর হাতে ভাই! ' বছরখানেক পরে রাহেলা দেশে ফিরে গেলেন একটি ছ মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে, গাফ্‌ফার আগেই ফিরে গিয়েছিল। ইতিমধ্যেই দেশের লোকে জানতে পেরেছিল, গাফ্‌ফার একটি শিশুপুত্র দত্তক নিয়েছেন এক আশ্রম থেকে তবে শিশুটি রুগ্ন ও দুর্বল। তাই রাহেলা কিছুদিন কলকাতাতেই থাকবেন এখন, শিশুটি একটু শক্ত হলে তবে দেশে নিয়ে আসবেন।

তারপর বলি শোন, আরো দিন কেটে যায়, মাঝেমাঝেই দেশ থেকে রাহেলা বিবি লোক পাঠান, হান্নুর দোকানে কাজ করার জন্যে। সাত্তার তাদের থাকার ব্যবস্থা করেন নিজের সাথেই, দোকানে তাদের কাজ দেন। একবার ছোটভাই মোমিন এলো, সেও নাকি দোকানে কাজ করবে ভাইয়ের সাথে। মা পঠিয়ে দিয়েছেন মোমিনকে হাতে একখানা চিঠি লিখে দিয়ে হান্নুর নামে। চিঠি পড়ে সাত্তার জানতে পারলেন, মোমিন কলেজে যাওয়া বন্ধ করে প্রচুর দোস্ত ইয়ার জুটিয়েছে আর জুয়ার নেশায় মেতে উঠেছে। মা লিখেছেন, মোমিনকে যেন হান্নু নিজের কাছেই রাখে, দোকানের কাজকর্ম শেখায়, সাথে নিজের ভাই থাকলে হান্নুর নিজেরও খানিকটা পরিশ্রম লাঘব হবে! চিঠিতে দোয়া দিয়েছেন রাহেলা আর বরাবরের মত পত্রের নিচে জিনিসের ফর্দ লিখেছেন, দেশে পরবর্তী যেই যাবে, উল্লেখিত জিনিসপত্রাদি যেন অতি অবশ্য নিয়ে যায়। বিশেষ করে লেখা থাকত আফিমের গুলির কথা, অতি অবশ্য যেন আফিম পাঠায় হান্নু। সাত্তার আফিম কিনে আনতেন আর সাথে কিনতেন শুকনো খেজুর। শুকনো খেজুরের একপাশ চিরে তার থেকে বিচি বের করে ফেলে দিয়ে তার ভেতরে ভরে দিতেন আফিমের গুলি, দেখতে যা একেবারে খেজুরেরই বিচি! রবিবার ধরে বসতেন সাত্তার এই খেজুর আর আফিম নিয়ে, সেদিন সারাদিন বসে বসে চলত এই খেজুরের পেটে আফিম ঢোকানো। সাত্তার মায়ের চিঠি তুলে রাখেন চামড়ার বাক্সে, মায়ের অন্যান্য চিঠির সঙ্গে। চামড়ার এক ছোট্ট বাক্স যা দেখতে একদম স্যুটকেসের মত কিন্তু স্যুটকেস নয়, যার দু'ধারে স্যুটকেসেরই মত দুটো তালা আর মাঝে একটি ছোট্ট চামড়ার হাতল। হান্নান একসময় কিনেছিলেন টাকা পয়সা রাখবেন বলে কিন্তু একসময় এটি হয়ে ওঠে চিঠির বাক্স। মা'য়ের চিঠি রাখেন ওতে সাত্তার ।


মোমিনকে মা পাঠিয়ে তো দিয়েছেন, কলকাতায় থেকে হান্নুর সাথে কাজ করবে, টাকাও রোজগার হবে আর হান্নুরও সাহায্য হবে দোকানে নিজের লোক থাকাতে। কিন্তু মোমিন কলকাতায় এসে হান্নুর নয় সাহায্য
করলেন নিজের। পড়াশোনা করা থেকে বেঁচে গিয়ে মোমিন আছে এখন মহা ফুর্তিতে। বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে, সাত্তার ততক্ষন রেঁধে বেড়ে খেয়ে দেয়ে দোকানে চলে গেছেন, মোমিনের খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে। মোমিন ধীরে সুস্থে উঠ স্নান খাওয়া শেষে দুপুর গড়িয়ে দোকানে গিয়ে পোঁছুয়। দোকানে গিয়ে এর সাথে আড্ডা ওর সথে মস্করা করে বিকেল অব্দি কাটিয়ে কাঁচু মুখ করে ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, কিছু টাকা লাগবে, সিনেমা দেখতে যাবে! আনারকলি, পাঞ্জাব মেইল, আদমি, কিসমত। এক একটা সিনেমা মোমিন দেখে দশ-বারো বার করে, যে সিনেমাটা বেশি ভাল লাগে সেটি সে কতবার দেখে নিজেও বলতে পারবে না। দু'দিন চারদিন ছেড়ে ছেড়ে হাজির হয় হলে, একই সিনেমা দেখতে। দেখে আসা সিনেমার গান মোমিনের গলায় লেগে থাকত প্রায় সারাদিনই, এমনকি দোকানে বসেও মোমিন গান গাইত। হাস্যে লাস্যে দেবিকা রানি, নাসিম বানুরা সারাক্ষণ মোমিনের চোখের সামনে নেচে গেয়ে বেড়াত। অচ্ছ্যুৎ কন্যা দেবিকা রানির দু:খে কাতর মোমিনের মুখে ভাত রুচত না দিনের পর দিন।

প্রথম প্রথম সাত্তার চেষ্টা করেছেন, মোমিন যেন কাজে মন দেয়, দোকানের কিছু দায়িত্ব অন্তত যেন নিজের কাঁধে নেয়, তাহলে দোকানের মালপত্র আনতে সাত্তার একটু বাইরে যেতে পারেন। কিন্তু অনেক বলে বলেও কোন লাভ হয় না। দু একদিন মোমিন চেষ্টা করে, তাড়াতাড়ি দোকানে আসার, দেরী করে দোকান থেকে যাওয়ার। কিন্তু সে ঐ দু'এক দিন তারপর আবার যে কে সেই। সাত্তার হাল ছেড়ে দিয়েছেন, এখন আর কিছুই বলেন না। মোমিন মহা আনন্দে সিনেমা দেখে বেড়ায় । শুধু এই সিনেমাতে ক্ষান্ত থাকলেও হত, মোমিন রেসের মাঠে যাওয়াও শুরু করে। ঘোড়দৌড় দেখে মোমিন মগ্ন হয়ে। তবে সুখের কথা রেসের মাঠে মোমিন শুধুই দৌড় দেখে ঘোড়ার। শনিবার মোমিন ঘুম থেকে উঠে পড়ত খুব সকালে, স্নান টান করে, পরিস্কার ধুতি পাঞ্জাবী পরে দুপুর হওয়ার আগেই মোমিন বেরিয়ে পড়ত বাড়ি থেকে, ঠিকানা রেসকোর্স। সন্ধেয় দৌড় শেষ হলে নিউমার্কেটের পেছন থেকে শিক কাবাব আর পরোটা খেয়ে ঢুকে পড়ত সিনেমা হলে, বহুবার দেখা কোন এক সিনেমা আবারও দেখতে। মাঝরাত পার করে যখন বাড়ি ফিরত সাত্তার তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। ঢাকা দেওয়া খাবার মোমিন কোনদিন খায় কোনদিন খায় না, চুপটি করে শুয়ে পড়ে ভাইয়ের পাশটিতে গিয়ে, চোখে সদ্য দেখে আসা সিনেমার কোন দৃশ্য নিয়ে।



-২-


পোইরর পারত বার্গ্যা ডুয়া
ধূঁয়াই ধূঁয়াই জ্বলে
বাপর বড়িথুন কন্যা যাইতে
ফোঁকাই ফোঁকাই কান্দে।
কান্দরে মা বাপ ন ভাঙ্গ হিয়া
তোমার ঘরত জন্মিয়াছি পরবসী হৈয়া।
মারে কৈয়ো রে ভাই দি পাঠাইত ধাঁই
পালিয়া পুষিয়া লইত তাহারার জামাই।
বাপেরে কৈয়ো রে ভাই দি পাঠাইত গাই
ক্ষীর লবনী খাই যৌবন হৈত তাহারার জামাই। (ছড়া, চট্টগ্রাম)


ঢাকার কাছে বুড়িগঙ্গার তীরে নারায়ণগঞ্জে এক রক্ষণশীল মৌলভিবাড়িতে সাত্তারের বিয়ে ঠিক হয়। এক আত্মীয়ের মারফত বিয়ে প্রস্তাব আসে গাফ্‌ফারের কাছে, গাফ্‌ফার যান মৌলভিবাড়িতে মেয়ে দেখতে, মেয়ের বাবার সাথে কথা বলতে। মৌলানা আব্দুল গফুর নারায়ণগঞ্জের সরকারী ম্যারেজ রেজিস্টার। মৌলভিবাড়ির অন্য অনেকের মত টাইটেল পাশ করলেও মাদ্রাসায় পড়াতে না ঢুকে গফুর সাহেব সরকারি চাকরীতে যোগ দেন। তারই একমাত্র মেয়ে জাহাঁ আরা, যার জন্যে এই বিয়ের প্রস্তাব। মেয়ে দেখার জন্যে, বিয়ের কথা পাকা করার জন্যে গাফ্‌ফার একদিন গিয়ে হাজির হন মৌলভি আব্দুল গফুর সাহেবের বাড়িতে। বেলা গড়িয়ে যায় মৌলভি বাড়িতে পৌঁছুতে। চারিদিকে তাকিয়ে গাফ্‌ফার দেখেন, মৌলভিবাড়িতে প্রাচুর্য না থাকলেও অভাব নেই। বড় বড় আটচালা টিনের ঘর এ'ভিটেয় ও'ভিটেয়। যে ঘরটিতে গফুর সাহেব গাফ্‌ফারকে নিয়ে বসালেন সেই ঘরের মাঝখানে কারুকাজ করা কাঠের পার্টিশন। পার্টিশনের একধারে একটি দরজা যাতে ঝুলছে বিভিন্ন রঙের সুতোয় বোনা পর্দা। পুরনো দিনের ভারী কাঠের খাটের মাথার দিকে রাখা আলমারী আর একটি বড় সিন্দুক। মেঝেতে ছোট লাল রঙের গালিচা পেতে খেতে দিলেন গফুর সাহেব। পর্দার ওপাশ থেকে মৃদুস্বরে একটা আওয়াজ আসতে উঠে পর্দার ওপাশে যান গফুর সাহেব আর একে একে নিয়ে আসেন জলের জাগ,থালা, গেলাস, ভাতের গামলা, মাংসের বাটি। নিজে হাতে ভাত বেড়ে গাফ্‌ফারকে খাওয়ান গফুর সাহেব।

খাওয়া দাওয়া সেরে মৌলভি সাহেব বসেন গাফ্‌ফার সাহেবের সঙ্গে। গফুর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন গাফ্‌ফারকে, পান-তামাক কিছু চলবে কি? গাফ্‌ফার, পান খান না তবে তামাকে অরুচি নেই জানতে পেরে আবারও পর্দার ওপাশে চলে যান গফুর সাহেব। ফিরে আসেন ছিলিমে তামাক সেজে আর খাটের ওপাশ থেকে সামনে টেনে আনেন পিতলের হুকো। জলের জাগ থেকে জল ঢেলে হুকো ভর্তি করে ছিলিমটি বসান হুকোর মাথায় আর তারপর গড়গড়াটি এগিয়ে দেন গাফ্‌ফারের দিকে। মাঝে মাঝেই গড়ড়ার নল হাতবদল হয়। কথা বলতে শুরু করেন এরপর ,বলেন, মেয়ে তো আমার নাবালিকা, বিয়ে দিলেও স্বামীর সংসার করতে পারবে না এখন। গাফ্‌ফার জানান, এখুনি শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে না বৌকে, মেয়ে বড় হোক, তখন যাবে। আরও জানান, হান্নু কলকাতায় একা থাকে, মা বড় চিন্তায় থাকেন, বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চান। গফুর সাহেব রাজী। ধর্মীয় এক মাসলাহও (নিয়ম) বলেন, মেয়ে যেহেতু নাবালিকা সেইহেতু বিয়ে হবে বাপের 'এজীন'এ (মেয়ের তরফে বিয়ে কবুল করবেন মেয়ের বাবা)। ধর্মে নাকি সেরকমই বিধান আছে। গাফ্‌ফার ধর্ম নিয়ে বেশি মাথা ঘামান না, ধর্মের নিয়ম কানুনও খুব একটা জানেন না। গফুর সাহেবের কথায় রাজী হয়ে বললেন, একবার আপনার মেয়েকে দেখতে চাই মৌলভি সাহেব। "জাহাঁ আরা' বলে উচ্চস্বরে হাঁক দিলেন গফুর সাহেব। রোগা ডিগডিগে চেহারার একটি মেয়ে পর্দার ওপাশ থেকে বেরিয়ে এসে "জী আব্বু' বলে দাঁড়াল সামনে। গাফ্‌ফার দেখলেন, বাচ্চা মেয়েটি দেখতে ভারী মিষ্টি। টকটকে ফর্সা, সালোয়ার কুর্তা পরা মেয়েটির গলায় ছোট্ট এক ওড়নি, পিঠের পরে লম্বা এক বিনুনী। খানিকটা অবাক আর খানিকটা লজ্জিত দৃষ্টিতে ছোট্ট মেয়েটি তাকিয়ে আছে বাড়িতে আসা অতিথির দিকে । গাফ্‌ফার কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি পড়াশোনা করো? রিনরিনে, মিষ্টি আওয়াজে উত্তর এল, স্কুলে যাই, বাংলা স্কুলে, পাঁচ ক্লাশে পড়ি আর বাড়িতে কোরান হেফজ ( মুখস্ত) করি আম্মুর কাছে। চমৎকৃত গাফ্‌ফার জানতে চান, তুমি কোরান হেফজ করো,কতটুকু হয়েছে? "উনিশ পারা' জাহাঁ আরা জবাব দেয়।

গফুর সাহেব জানান, মেয়েকে তিনি পালকীতে পাঠাবেন আর জামাইকে আনতে ঘোড়া যাবে তাঁর বাড়ি থেকে, সেই ঘোড়াতেই আবার জামাই ফিরেও যাবে। গাফ্‌ফার বলেন, বর্ষাকাল, ঘোড়া এতদূর যাবে কী করে আর পাল্কীই বা কী করে যাবে এতদূরে! আমরা পান্সীতে আসব মৌলভি সাহেব, আপনি কষ্ট করবেন না! গফুর সাহেব বলেন, আমাদের আরবী ঘোড়া আছে ঠাকুর সাহেব, আপনার হয়ত চোখে পড়েনি, সামনের উঠোনেই আছে ঘোড়া, বেশি সময় লাগবে না যেতে আসতে। আর এই বর্ষায় তো আমি বিয়ে দেবোও না, আপনি শীতকালের তৈয়ারী করুন আর পাল্কী নিয়েও ভাববেন না, আমাদের নদীর পারের দেশ, বড় বড় নৌকা আছে এখানে, জাহাঁ আরা বাড়ি থেকে নৌকো অব্দি পাল্কীতে যাবে আর তারপর পাল্কীসমেত নৌকোয় উঠবে! আপনদের ঘাটে গিয়ে পাল্কী নামবে নৌকো থেকে, আর মেয়ের সাথে আমি নিজেও যাবো কাজেই আপনি চিন্তা করবেন না! পথে চোর ডাকাতের ভয় আছে আর এতদূরের পথ ঘোড়ায় চড়ে যাওয়াটা নিরাপদ হবে কী একটু বিবেচনা করতে বললেন গাফ্‌ফার। খানিক চিন্তা করে গফুর সাহেব বললেব, তাহলে পান্সীতেই আসুক বরযাত্রী, নদীর ঘাট থেকেই নাহয় ঘোড়ায় চড়বে জামাই! এ মন্দের ভালো হলো ভেবে গাফ্‌ফার নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন!

দেশ থেকে চিঠি আসে, মা ডেকে পাঠিয়েছেন, তাঁর বিয়ে। দেশে যান সাত্তার । মা'কে সাত্তার বলেন, আগে ভাইয়ের বিয়ে হোক, পরে তিনি বিয়ে করবেন। ভাই জানান, তিনি বিয়ে করবেন না, ভাল সম্মন্ধ, মেয়েটিও দেখতে ভারি সুলক্ষণা , হান্নু বিয়ে করে ফেলুক। মেয়েটির বয়েস সবে এগারো শুনে তিরিশ বছরের হান্নান থমকায়, মৃদু আপত্তি জানান, টিকবে না জানা সত্বেও। আপত্তি টেকে না, বিয়ের ব্যবস্থা শুরু হয়ে যায়।

দেখতে দেখতে শীতকালও এসে গেল। গাফ্‌ফার ঠাকুর কলকাতা গেলেন বিয়ের বাজার করতে। রাহেলার এতে মত ছিল না, ঐটুকু তো পুচকে মেয়ে আর তাছাড়া এখন তো সে শ্বশুরবাড়ি থাকবেও না কাজেই অত ঘটা করে বাজার করার কী আছে, সে "কইন্যা যুবত' হয়ে যখন সংসার করতে আসবে তখন নাহয় দেখা যবে! গাফ্‌ফার শোনেন কিন্তু কিছু বলেন না, শুধু বলেন, না। দরকার আছে। দু'ভাই মিলে বড়বাজারের বড় বেনারসির আড়ত থেকে সোনার জরিদার লাল বেনারসি কেনেন। কলেজস্ট্রিটের বাজার ঘুরে ঘুরে কেনেন চওড়া পাড়ের তাঁতের শাড়ি। নানা রঙের। হান্নুর বড় পছন্দ মন্দিরের নক্‌শা করা পাড়ওয়ালা শাড়ি, ঈদের আগে হান্নু যখনই মা'য়ের জন্যে শাড়ি কিনতে যেত সে শুধু মন্দিরপাড় শাড়ি খুঁজত দোকানে গিয়ে। গাফ্‌ফারের সেকথা মাথায় ছিল, তিনি ঐ ছোট্ট মেয়েটির মুখ মনে করে কেনেন মন্দিরের নক্‌শা করা দক্ষিনী সিল্ক শাড়ি। হান্নু লজ্জা পায় মন্দিরপাড় শাড়ি কেনা দেখে। বৌবাজারের চেনা সোনার দোকানে একদিন সকালে গিয়ে হাজির হন গাফ্‌ফার, জাহাঁ আরার জন্যে গয়না গড়াতে। স্বর্ণকারকে গিয়ে বলেন, "সেই সেবারে রাণী যখন ভারতে এলেন তাঁর হাতে সরু সরু চুড়ি ছিল ক'গাছা, সেই ডিজাইনের চুড়ি বানিয়ে দাও এক ডজন! ' স্বর্ণকারের আক্কেল গুড়ুম। সে বলে, " ঠাকুর সাহেব, সে চুড়ি তো আমি দেখিনি, কি করে বানাবো? ' গাফ্‌ফার মুখে বলে বোঝানোর চেষ্টা করেন, কাগজে এঁকে দেখানোর চেষ্টা করেন কিন্তু কিছুতেই সেই জিনিস ফুটে ওঠে না। অবশেষে ফিনফিনে সাদা কাপড়ে মুড়ে রাখা বিলিতি ডিজাইনের বই বের করে দেখায় স্বর্ণকার। বহুক্ষণ বসে বসে যখন একটা ডিজাইন খানিকটা পছন্দ করে তার অর্ডার করে গাফ্‌ফার দোকান থেকে বেরুলেন তখন বেলা ফুরিয়ে সন্ধে নেমেছে।

বিয়েবাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন হান্নুর সেই ফুপু, যিনি নিজের সন্তানের ভাগের দুধ দিয়েছিলেন সাত্তারকে। কনেবৌ এসেই আবার বাপের বাড়ি ফিরে যাবে সেটা রাহেলাবিবির খুব একটা পছন্দ নয় বলে তিনি বেশ চুপচাপই আছেন। বিয়েবাড়িতে তাই খুব একটা শোরগোল নেই। কনেবৌএর গয়না আর জামা কাপড় দেখার পর রাহেলাবিবির গম্ভীর মুখ চোখ এড়ায়নি গাফ্‌ফারের। ভেতরবাড়ির কাজকর্মে প্রায় নীরব থাকা গাফ্‌ফার এখন তাই আরও বেশি নীরব। বরযাত্রী যাওয়ার পান্সী ভাড়া হয়ে এসেছে তিনখানা। বড় পান্সীতে সাত্তার যাবে সাথে আর যে যায়। বাদবাকি দুটো পান্সীতে বরযাত্রীরা সব যাবে। একদিনের রাস্তা, সেইমত আগের দিন সকাল সকাল "বদর বদর' বলে পান্সী ছাড়বে নরাইল থেকে একটু দূরে নদীর ঘাট থেকে। সাথে একদিনের খাওয়া দাওয়ার আয়োজন।


ও বলতে ভুলে গেছি, সাত্তারের গায়ে হলুদ দেবার কথা বলেন ফুপু কিন্তু সাত্তার রাজি হন না গায়ে হলুদ মাখতে। যেদিন গায়ে হলুদ দেওয়ার কথা সেদিন বিকেলে লাঠি খেলার আয়োজন করেন জামাইয়েরা, খেলার কথা বলতে মৃদু আপত্তি করেছিলেন গাফ্‌ফার বাড়িতে খুব হই চই হবে বলে কিন্তু সে আপত্তি টেকে না। জামাইয়েরা যুক্তি দেখায়, সেই কবে কোন জমানায় বড় ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন তারপর থেকে এবাড়ি থেকে আর কোন ছেলে জামাই সাজেনি। গাফ্‌ফার তো বিয়েতেই রাজি হচ্ছেন না কাজেই সাত্তারের বিয়েতে হোক না একটু হই চই! সকাল থেকে উঠোন ঝাঁট পাট দিয়ে ধার ধরে লম্বা বেঞ্চি পেতে দিয়েছে কাজের লোকেরা। বড়দালানে লাইন দিয়ে রাখা আছে সব চেয়ার, যেখানে গাফ্‌ফার, সাত্তার আর জামাইয়েরা বসে খেলা দেখবেন। বারান্দার আরেকধারে পর্দা টানিয়ে দেওয়া হয়েছে, মেয়েরা যেখান থেকে খেলা দেখবে। দুপুর দুপুর সক্কলে তাড়াহুড়ো করে খাওয়া দাওয়া সেরে সব যে যার যায়গা নিয়ে বসে দাঁড়িয়ে পড়েছে উঠোনে। লাঠি খেলোয়াড়েরাও এসে পৌঁছেছে। অল্পবয়েসী দশজন লোক, কারোরই বয়েস তিরিশের বেশি নয়, প্রত্যেকের হাতে মাঝারি আকারের বাঁশের পাঁকানো লাঠি। সর্ষের তেল খাইয়ে খাইয়ে লাঠিগুলোকে চকচকে করা হয়েছে, একটা কালচে রং ধরেছে লাঠিগুলো। কোন কোন লাঠিতে আবার সরু সরু লাইন টানা, লাল, নীল রং দিয়ে। কোন লাইন আকা-বাঁকা তো কোন লাইন চুড়ির মত। কারো লাঠিতে আবার কোন রঙই নেই, তেল খাওয়ানো কালচে লাঠি। লাঠিয়ালদের পরনের লুঙ্গি হাঁটুর উপরে আর কোমর পেঁচিয়ে লুঙ্গির উপরে বাঁধা লাল গামছা, মাথায় লাল কাপড়ের ফেট্টি । সাথে এসেছে একদল ঢুলী। বৈঠকখানার ধার ধরে ঢুলী দাঁড়িয়ে ঢোলে বাড়ি দেওয়ার আগে বারান্দার দিকে তাকিয়ে গাফ্‌ফারের উদ্দেশ্যে বললো, ঠাকুর সাব, সেলামী আগে, নইলে "ঢুল' জমত না! গাফ্‌ফার পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একগোছা টাকা বের করে এগিয়ে গেলেন ঢুলী'র দিকে। ঢুলী আভূমি নত হয়ে সেলাম দিল আর ঢোলে দিল বাড়ি।


দশজন লাঠি খেলোয়াড় দু দলে ভাগ হয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। ঢোলে প্রথম বাড়িটি পড়ার সাথেই হা রে রে রে করে তেড়ে গেল একে অন্যের দিকে। লাঠিতে লাঠিতে ঠোকাঠোকি চলতে শুরু করল উদ্দাম ঢোলের সাথে । কখনও তারা গোল হয়ে নাচে ঢোলের সাথে , মাঝে মাঝেই হালকা বাড়ি দেয় একে অন্যের লাঠিতে আবার কখনো রণহুঙ্কার দিয়ে তেড়ে যায় একে অন্যের দিকে। উঠোনের দর্শকেরাও হুঙ্কার দেয় সাথে। মাঝে মাঝেই নাচের ছন্দে ঢুলীরা চলে আসে খেলোয়াড়দের মাঝে আর তারপরে একসাথে নাচে ঢুলী আর লাঠিয়াল। লাঠিয়ালদের শরীর বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরে এই শীতকালেও। অবিশ্রান্ত চলে ঢোল। ঘন্টা দেড়েক খেলার পরে খানিকটা বিরতি। থামে ঢুলী, জল খায় খেলোয়াড়েরা। তাদের জন্যে নাশতার ব্যবস্থা আছে কিন্তু সে তারা খাবে খেলা শেষ হলে। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পরে আবার শুরু হয় খেলা, চলে অন্ধকার হওয়া অব্দি। উঠোনে দর্শকদের জন্যে পেতে রাখা বেঞ্চে এখন আর কেউ বসে নেই, সকলেই বেঞ্চের উপরে উঠে দাঁড়িয়েছে আর বেঞ্চের উপরে দাঁড়িয়েই শরীর দোলাচ্ছে ঢোলের তালের তালে। এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকেরা ঢুকে পড়ছে লাঠিয়ালদের মাঝে আর তারাও নাচছে। জোড়ায় জোড়ায় হাতের তালি, ঢোলের বাজনা আর লাঠির ঠোকাঠুকিতে রক্ত গরম হয় সকলের। নাচ বাড়ে, উদ্দাম নৃত্য। পর্দার আড়াল থেকে বাড়ির মেয়েরা সব বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে খোলা বারান্দায়, হাততালির সঙ্গে দোলে তাদেরও শরীর। এ খেলায় কোন হারজিত নেই। এ শুধুই খেলার জন্যে খেলা। আনন্দের জন্যে খেলা। এই লাঠিখেলা এই নাচ আর এই বাজনা সবাইকে ভুলিয়ে দেয় যে এরা লাঠিয়াল। এই খেলোয়াড়েরাই গ্রামের জোতদার, জমিদারকে ভাড়া দেয় নিজেদের শক্তি আর লাঠি। লাঠির জোরে এরা দখল করে অন্যের জমি, কেটে নেয় কৃষকের পাকা ফসল, দখল করে জেগে ওঠা চর। খেলার এই লাঠির বাড়িতে এরা কতলোকের মাথা ভেঙেছে সে হিসেব এদের খেলা দেখে কেউ অন্তত করে না। হাসির ফোয়ারায় বাজনার শব্দে নাচের গমকে ভেসে যায় ঠাকুর বাড়ির মানুষ। উড়ে যায় উদাসী সব হাওয়া। শাড়ি আর গয়নার কথা ভুলে গিয়ে বিয়ের আনন্দে মাতেন রাহেলাও।


বরযাত্রীদের নিয়ে পান্সী পৌঁছয় নারায়ণগঞ্জের ঘাটে। সেখানে সকাল থেকেই অপেক্ষায় মৌলভিবাড়ির লোকজন। জরির মালায় সাজানো এক তেজী ঘোড়াও রয়েছে তাদের সাথে। সাত্তার সেই ঘোড়ায় চাপতে চাইছিলেন না কিছুতেই, তার সমস্যা বুঝতে পেরে গফুর সাহেব বলেন, "ডরাইয়েন না ঠাকুর, ঘোড়ার লাগাম থাকব সহিসের হাতে!' তবুও ভয়ে ভয়েই সাত্তার ঘোড়ায় চড়েন। অচেনা লোক তুলতে ঘোড়া একটু গাই গুঁই করছিল কিন্তু গফুর সাহেবের দাবড়ানি খেয়ে শান্ত ঘোড়া পিঠে চাপতে দিল হান্নানকে। মৌলভি বাড়িতে তাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা ছিল। পৌঁছুতেই গফুর সাহেব বললেন, কাল বেরিয়েছেন আপনারা গোসল টোসল করে একটু আরাম করেন। বিয়েবাড়িতে লোক বড় কম নয় তবে কোথাও কোন হই চই নেই। বরযাত্রীদের বসানো হয়েছে বারবাড়িতে। পাকা মেঝে আর ইটের হাফ দেওয়ালের উপর টিনের বেড়া আর টিনেরই চাল। অতবড় ঘরের চালকে ধরে রাখতে মাঝে মাঝেই উঠে গেছে কাঠের খুঁটি। ঘরে আসবাব বলতে কিছু চেয়ার আর বেঞ্চ যা এখন একধারে সরিয়ে রেখে গোটা মেঝে জুড়ে পাতা হয়েছে সতরঞ্চি যার একদিকে তোষক পেতে রঙীন নকশীকাঁথা বিছিয়ে বরের বসার বন্দোবস্ত। কাছাকাছি এরকম আরও তিনখানি তোষক পাতা কিন্তু সেগুলোতে রঙীন চাদর পাতা, ফুলছাপ চাদর। যাতে বরযাত্রীদের বসার ব্যবস্থা।

পাকা চুল, দাড়িওয়ালা এক প্রায় বৃদ্ধ মানুষ এগিয়ে এসে সালাম দিলেন বরযাত্রীদের, গফুর সাহেব পরিচয় দিলেন, "আব্বা'। গাফ্‌ফার আর সাত্তার দুজনেই এগিয়ে গিয়ে হাত মেলালেন, কোলাকুলি করলেন। শেরওয়ানি আর পাজামা পরা সাত্তারকে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদর করে বৃদ্ধ মানুষটি হাত ধরে নিয়ে গিয়ে বসালেন নকশীকাঁথা পাতা বিছানায়, বললেন, বাবা, "গরীবের বাড়িতে এসেছো, মটিতে বসতে অসুবিধে হচ্ছে তোমাদের।' গাফ্‌ফার বললেন, কোন অসুবিধে হচ্ছে না দাদাজী, আমরা কি বড়লোক নাকি? বরযাত্রীদের জন্যে ততক্ষনে এসে গিয়েছে নাশতা আর শরবত। গোলাপজল দেওয়া দুধের শরবত, আর বড় বড় কাসার থালায় রকমারী পিঠে। নক্‌শাকাটা নানা রকমের চালের পিঠে, তেলে ভেজে নিয়ে যেগুলোকে চিনির ঘন রসে ডোবানো হয়েছে। সাত্তারের সামনে রাখা থালায় বিরাট এক গোল ফুল পিঠেয় সাত্তার নিজের নাম দেখতে পেলেন। তেমনি গাফ্‌ফারকে দেওয়া থালায় পিঠেতে গাফ্‌ফারের নাম। বিভিন্ন রকমের চালের পাপড়, যাদের গায়ে ছড়ানো চিনির দানা। কোনটা আকারে আর দেখতে ঠিক কাঁঠাল পাতার মত তো কোনটা দেখতে ঠিক যেন ছোট্ট গোল রুটি। এক থালায় লাল, নীল, সবুজ ঝিলিমিলি পাপড়। সরু সরু দেখতে অনেকটা যেন ঝুরিভাজা, মুখে দিলেই নিমেষে মিলিয়ে যায়। দানা দানা চিনি ছড়ানো সেই থালাভর্তি ঝিলিমিলি পাপড়ে। গফুর সাহেব জানালেন নাশতা হয়ে গেলে বিয়ে পড়ানো হবে। আর বিয়ে পড়াবেন তারই বাবা মৌলানা আব্দুল কাদের।

দু'পা মুড়ে বাবু হয়ে বসা সাত্তারের সামনে বসে আছেন কাদের সাহেব, গফুর সাহেব। গাফ্‌ফার বসে আছেন সাত্তারের পাশে। বরযাত্রীরা ও মৌলভি বাড়ির লোকজন বাসে আছে গোটা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কাদের সাহেব বললেন, আমার নাতনী নাবালিকাহেতু তার তরফ থেকে বিয়ে কবুল করবে তার পিতা আব্দুল গফুর। গফুর সাহেবের দিকে তাকিয়ে এরপর বললেন, "আল্লাহ পাকের আশেষ মেহেরবানিতে নরাইল নিবাসী মরহুম মু. ঠাকুর আব্দুল মালেকের মধ্যম পুত্র ঠাকুর আব্দুল সাত্তারের বিয়ের প্রস্তাব নারায়ণগঞ্জ নিবাসী মু.আব্দুল গফুরের একমাত্র কন্যা জাহাঁ আরার জন্যে। একশত এক টাকা দেনমোহরে এই বিয়ের প্রস্তাব আমি তোমার সামনে রাখিলাম। নাবালিকা কন্যার পিতা হিসেবে এই বিয়ে কবুল করবার দায়িত্ব তোমার। তুমি আমাদের বলো, তুমি কী কবুল করিতেছ তোমার মেয়ে জাহাঁ আরার তরফ থেকে? যদি কবুল কর তবে তিনবার বল বিসমিল্লাহ।' আব্দুল গফুর বললেন" আমার নাবালিকা কন্যার তরফ থেকে আমি এই বিয়ে কবুল করিলাম, বিসমিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, বিসমিল্লাহ।' ঘরে বসে থাকা সকলের দিকে তাকিয়ে কাদের সাহেব জানতে চাইলেন," আপনারা সকলে কী শুনিয়াছেন?' সকলেই জবাব দিলেন, "হ্যাঁ, শুনিয়াছি।' আব্দুল কাদের সাহেব বলেন "আলহামদুলিল্লাহ ( সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ'র)।' ঘরের সকলেই একসাথে বললেন "আলহামদুলিল্লাহ'। মৌলভি আব্দুল কাদের সাহেব এবার ঘুরে তাকালেন আব্দুল সাত্তারের দিকে, বললেন,"নারায়ণগঞ্জ নিবাসী মৌলভি মু.আব্দুল গফুরের একমাত্র কন্যা জাহাঁ আরার বিবাহের প্রস্তাব আপনার কাছে রাখিলাম, একশত এক টাকা দেনমোহরে, আপনি কি কবুল করিতেছেন? যদি কবুল করেন তবে তিনবার বলুন "বিসমিল্লাহ', জোরে বলিবেন যাতে সকলেই শুনিতে পায়। নতমুখে সংকুচিত সাত্তার বলিলেন, "বিসমিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, বিসমিল্লাহ'।কাদের সাহেব আবার বলিলেন, "আলহামদুলিল্লাহ'। উপস্থিত সবাই আবার সমস্বরে বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ।' আব্দুল কাদের ঘোষণা করলেন,"বিবাহ সম্পন্ন হইল, আজ হতে জাহাঁ আরার সকল দায়িত্ব আপনার, তার ভাল মন্দ, তার খাওয়া পরা, সুখ শান্তি, মৃত্যু পর্যন্ত তার সকল দায়িত্ব আপনার। প্রার্থনা করি সর্ব শক্তিমান আল্লাহতায়ালা যেন আপনাকে সমস্ত দায়িত্ব পালনের তৌফিক (ক্ষমতা) দান করেন।' মৌলভি আব্দুল কাদের প্রার্থনার জন্যে দু' হাত তুললেন, নব বিবাহিত দম্পতির জন্যে প্রার্থনা করলেন, নিয়ম মাফিক ঘরের আর সকলেও সেই প্রার্থনায় যোগ দিল। গফুর সাহেব তার সরকারী খাতাখানি এগিয়ে দিয়ে সাত্তারকে বলেন,"সই করুন জামাই বাবাজী।' সাত্তার দেখিলেন সেখানে বিয়ের সমস্ত বর্ণনা লিখে রেখেছেন গফুর সাহেব। তিনি নিজের নাম লিখে তারিখ দিলেন নিচে, ২০শে ডিসেম্বর, ১৯৩৮। গফুর সাহেব নিজেও সই করলেন আর খাতাখানি এগিয়ে দিলেন গাফ্‌ফার সাহেবের দিকে, সাক্ষী'র স্বাক্ষরের জন্যে। ততক্ষণে বৃদ্ধ মৌলভি আব্দুল কাদের ভিতর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছেন এক ঠোঙা শুকনো খেজুর, বিয়ের খেজুর। নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের পরে মিষ্টিমুখ করার জন্যে এই খেজুর নিয়ে এসেছিলেন গাফ্‌ফার সাহেব, বিয়ের বাজার ও অন্যান্য মিষ্টির সাথে। প্রথম দুটি খেজুর তিনি দিলেন নতুন জামাই সাত্তারের হাতে, তারপর গাফ্‌ফারকে ও একে একে আর সবাইকে। ধীরপায়ে আবার এগিয়ে গেলেন ভিতরবাড়ির দিকে, সেখানে সবাইকে বিয়ের খেজুর দেবেন বলে।


- ৩-




আরে ও পবন কাহের নাও, নাওরে
শূন্য ভরে উড়্যা দিয়া যাও
পবন কাহের নাও খানিরে সূবণ্যের গুড়া
দমের হাওয়ায় বাদামি দিয়া
শূন্যে দিও উড়ারে... ( নৌকা বাইচের গান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া)




মেয়েটি ছিল নাবালিকা, বোধহয় বিয়ের দ্বিতীয় দিনেই বাপের বড়ি ফিরে যায় পূর্বশর্ত অনুযায়ী। চার বছর এখন সে বাপের বাড়িতেই থাকবে, যুবতী হলে তবেই সে শ্বশুরবাড়ি আসবে। বুঝতে পরছ তো সব? হ্যাঁ আর যা বলছিলাম, সাত্তার বাড়ি এসে দেখতে পান, তার ভাই গ্রামের একজন মোটামুটি নেতাগোছের হয়ে গেছেন। শুধু এই গ্রামেরই নয়, আশে পাশের গ্রাম থেকেও মানুষ তাঁকে ডেকে নিয়ে যায় বিচার করতে। যেকোন সমস্যাতেই মানুষ আসে তাঁর কাছে, আর তিনিও যদ্দূর সম্ভব মানুষকে সাহায্য করেন।


সাত্তার ফিরে আসেন কলকাতা। বৌ তো বাপের বড়িতে, কী না? ওদিকে বুঝতেই পারছো,গাফ্‌ফার ঠাকুর ততদিনে এক পরিচিত নাম। গ্রাম, মহকূমা ছাড়িয়ে তিনি পা রেখেছেন রাজনীতির বড় মাঠে। পার্লামেন্টের ইলেকশনে দাঁড়াবেন তিনি। প্রায় রোজই ঢাকায় যান। কখনও সেদিনেই ফিরে আসেন কখনও বা একদিন থেকে আসেন। টিকিট পেয়েছেন মুসলিম লীগ থেকে। প্রায়ই নরাইলের এই ঠাকুরবাড়িতে পদার্পন করেন কোন না কোন নেতা। নেতা আসেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকেও। ঠাকুরবাড়ি ধন্য হয়েছে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের পায়ের ধুলোয়। পার্লামেন্ট আর বুঝি বেশি দূরে নয়! তো স্বপ্নে বিভোর এখন গাফ্‌ফার ঠাকুর। অন্দরমহলে রাহেলা বিবির প্রতাপ দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে ঠিক ততখানিই যতখানি গাফ্‌ফার ঠাকুরের বেড়েছে বাহিরমহলে। রাহেলাবিবি তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। শ্বশুরবাড়ির সংসারের কাজ করতে পারবে না বলে কোন মেয়েকেই তিনি শ্বশুরবাড়ি পাঠাননি। ঘরজামাই নিয়ে এসেছেন। ভেতরবাড়ির উঠোনকে মাঝে রেখে চার ভিটেতে চারখানি বাড়ি বানিয়েছেন ছোট করে, মেয়েদের জন্যে। তিনখানি বাড়ি তিন মেয়ের আর একটি তাদের সকলের বৈঠকখানা। গাফ্‌ফার ঠাকুর অন্দরমহলের কোন ব্যপারেই নাক গলান না, সেখানে মা যা বলেন, তাই হয়, তিনি শুধু লোহার সেফ থেকে খুলে টাকা বের করেন, এ সেই সেফ যা তিনি আর হান্নু দুজনে জাহাজ কোম্পানিতে চাকরি করার সময় কিনেছিলেন। । তাঁকে আর সমস্যার কথা বলে কষ্ট দেন না রাহেলা বিবি, লোক ডেকে কাজ কম্মো ও রাহেলাবিবি নিজেই করান।


বিয়ের পরে বালিকা জাহাঁ আরা বাপের বাড়িতেই থাকে। আগের মতই স্কুলে যায়, মায়ের কাছে কোরান হেফজ করে। তবে আগের মত সালোয়ার কুর্তা সে এখন আর পরে না। স্কুলে যাওয়ার সময়টুকু ছাড়া সে শাড়ি পরে। রকমারি তাঁতের শাড়ি, শাড়ির সাথে রং মিলিয়ে হাতভর্তি কাঁচের চুড়ি, "কলিকাতার' কাঁচের চুড়ি। বিয়ের সময়ে সে মাঝারি আকারের এক চামড়ার বাক্সভর্তি রেশমি চুড়ি পেয়েছিল, যেগুলো কলকাতা থেকে আনা। সরু সরু একরঙা সব চুড়ি, কী চকচকে মসৃণ দেখতে! লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, ফিকে-গাঢ় গোলাপি কী রং নেই সেখানে! এই চুড়ি তার খুব পছন্দ। প্রায় প্রতিদিনই সে বসে চুড়ির বাক্স নিয়ে, হাতের চুড়ি খুলে বাক্সে রাখে আর বাক্স থেকে পছন্দমত কোন রং বেছে নেয় সেদিনের মত। দাদি প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন, ঠাকুরবাড়ির কথা, জামাইয়ের কথা, কেমন দেখতে ঠাকুরবাড়ি, জামাই কেমন "ব্যাভার' করল তার সাথে, শাশুড়ি কেমন? জাহাঁ আরা একই উত্তর বারে বারে দেয় দাদি আর আরো সব আত্মীয়াদের। "বিশাল বড় ঠাকুরবাড়ি, দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। বাড়ির গেটে বড় বড় দুই সিংহ বসে আছে! সব ইটের বাড়ি, শাশুড়ি আম্মায় বেশি কথা কন না, খালি দ্যাখেন! গোল গোল চোখ কইরা!' জামাইয়ের কথা বলতে গেলেই লজ্জায় লাল হয় জাহাঁ আরা, বেশি খোঁচালে তবু বলে, অনেক রাতে "তাইনে' ঘরে এসেছিলেন, জাহাঁ আরার ঘোমটা সরিয়ে মুখ দেখে বলেছেন, ঘুম পাইসে? ঘুমাও!


ঠাকুরদের পুরনো বসতবাড়ির পাশের খালি ভিটেতে এখন উঠেছে এক দোতলা বাড়ি। একতলার একপাশের দুটি ঘরে সাত্তারের স্ত্রী থাকে তাঁর ছেলে মেয়ে নিয়ে আর ওপাশের এক কামরায় মোমিনের বৌ। রাহেলার বিবেচনার দোষ কেউ দিতে পারবে না, হোক না সৎ ছেলে কিন্তু রোজগেরে বলে কথা! সাত্তারের স্ত্রী জাহাঁ আরা তাই পেয়েছে বারান্দার ছোট কুঠুরি সহ দু কামরা, যেখানে মোমিন তার পেটের সন্তান হয়েও থাকে বৌ বাচ্চা নিয়ে এক কামরায়। হ্যাঁ। বারন্দার উপর দু'দিকের দুই কুঠুরির একটা মোমিনের। দোতলায় থাকেন গাফ্‌ফার, পায়খানা বাথরুম সহ বড় একখানা ঘর, পাশে খোলা ছাদ। বাড়ির পুরনো দালানে রাহেলা থাকেন গাফ্‌ফারের পালিত পুত্র বেলালউদ্দিনকে নিয়ে। পুরনো এই দালানটি আকারে ও আয়তনে উত্তরের ভিটের দালানের মতই। শুধু এই দালানের বারান্দার একদিকে এক ছোট কুঠুরি।


চার বছর জাহাঁ আরার বিয়ে হয়েছে। এই চার বছরে জাহাঁ আরার জীবনে পরিবর্তন এসেছে অনেক। পরিবর্তন এসেছে শরীরে, মনে। বালিকা জাহাঁ আরা এখন কিশোরী। এখন আর সে স্কুলে যায় না, যে স্কুলটিতে জাহাঁ আরা পড়ত সেটি জুনিয়র স্কুল, সেখানে জাহাঁ আরার পড়া শেষ। হাইস্কুলে যেতে হলে যেতে হবে অনেকটা দূরে, আর সেই স্কুলে ছেলে-মেয়েরা একসাথে পড়ে। দূরত্ব যদিও বা অতিক্রম করা যায় কিন্তু ঐ একসাথে একই ক্লাশে ছেলেতে মেয়েতে বসে পড়াশোনা করাটা মুসলমান বাড়ির মেয়ের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এই এলাকার বেশির ভাগ মেয়েদের মত তাই জাহাঁ আরার স্কুলজীবনেরও এখানেই ইতি। বাড়িতে থেকে হেফজ হয়ে যাওয়া কোরান সে নিয়ম করে রোজ পড়ে, যেন ভুলে না যায়, নকশী কাঁথা ফোড় দেয় মায়ের সাথে, কখনো সে নিজেই কাঁথার এক কোণে একটা ফুল তোলে, লতা পাতায় সাজিয়ে দেয় সেই ফুলকে, নিচে ছোট্ট করে লাল সুতোয় নিজের নাম লেখে, "জাহাঁ আরা।' তার বড় সাধ হয় সুঁইয়ের ফোঁড়ে সাত্তারের নাম কাঁথার জমিনে লিখে দিতে কিন্তু লজ্জায় পারে না!

এর মাঝে সাত্তার দু বার ঘুরে গেছেন শ্বশুরবাড়ি, বিয়ের দু'বছর পরে একবার আর এই সেদিন একবার। দু'বারেই নিয়ে এসেছেন চামড়ার স্যুটকেস ভর্তি শাড়ি, জামা, চুড়ি। দু'দিন করে থেকে গেছেন সাত্তার নারায়ণগঞ্জে। ইতিমধ্যে দাদি জাহাঁ আরাকে পাঠ দিয়েছেন নারী-পুরুষের সম্পর্কের। কেন বিয়ে হয়, কেন শ্বশুরবাড়ি যেতে হয়, নিজেদের বাড়িতেই কেন সারাজীবন সে থেকে যেতে পারবে না এইসব প্রশ্ন করে সে দাদিকে, রাতে ঘুমোতে গিয়ে। দাদি কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয় কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয় না তবে প্রায় প্রতিদিনই এই কথাগুলো বলে, "স্বামীই নারীর ইহ-পরকালের মালিক, স্বামীকে সর্বাঙ্গ দিতে হয়, যখন তখন। নারীর ইচ্ছা অনিচ্ছা বলে কিছু থাকতে নেই। নারীর শরীর তার নিজের নয়, স্বামীর ইচ্ছায় নারীকে উঠতে-বসতে-খেতে-শুতে হয়। উটের পিঠে যদি স্বামীর সঙ্গমেচ্ছা হয় তবে সেখানেই নারীকে স্বামীর ইচ্ছা পূরণ করতে হয়, ধর্মগ্রন্থে সেরকমই হুকুম আছে নারীর প্রতি।' জাহাঁ আরা মনে মনে নিশ্চিন্ত হয়, ভাগ্যিস এদেশে উট নেই!

সাত্তারকে জাহাঁ আরার অপছন্দ নয় বরং মানুষটাকে ভালই লাগে তার। যদিও বয়সে "তাইনে' অনেক বড়! প্রথম প্রথম তো সাত্তারকে জাহাঁ আরার "কাকা-মামা' কিছু একটা বলে ভুল হত। দাদিকে সে'কথা বলে যথেষ্ট বকুনিও খেয়েছে জাহাঁ আরা। দাদি এ'কথা শুনে প্রথমে তো আঁতকেই উঠেছিল, তারপর দু'হাতে নিজের কান ধরে, গালে হাত দিয়ে "তওবা' ( আর কখনও না করার অঙ্গীকার) করে বলেছে, আর যেন কখনও জাহাঁ আরা এমন না বলে, না ভাবে। এরকম বললে, ভাবলেও নাকি স্বামী-স্ত্রী'র সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়! মনে মনে জাহাঁ আরাও নিজের কান মুলে দেয়, গালে হাত দিয়ে তওবা করে! বিয়ের সময় সেই নরাইলে আর তারপরে এখানে দু'বার এসেছে সাত্তার, কখনই তার সাথে কোন রকম জোর-জবরদস্তি করেনি বরং আদরে সোহাগে রাত কখন ভোর হয়ে যায় টের পায় না জাহাঁ আরা। সারা রাত গল্প করে দুজনে। সাত্তার শোনায় কলকাতার গল্প, জাহাঁ আরা শোনায় তাদের এই গঞ্জের গল্প। নদীর গল্প। নৌকোর গল্প। সাত্তার হাত বুলায় জাহাঁ আরার শরীরে, যেখানে সেখানে। জাহাঁ আরা'র ভয় ভয় করত প্রথমে কিন্তু স্বামীকে নিষেধ করতে নেই বলে সে নিষেধ করেনি তবে এখন আর ভয় করে না। ভাল লাগে। রুমকুপে রোমকুপে কেমন যেন কাঁপন লাগে, চোখ মুদে আসে।

আর এভাবেই জাহাঁ আরা ভালোবেসে ফেলে মানুষটাকে। ওঁর গায়ের ঘামের গন্ধকে, ঐ চওড়া বুকটাকে, সারা শরীরে জঙ্গল হয়ে থাকা বড় বড় লোমকে। অপেক্ষা করে জাহাঁ আরা কবে আবার "তাইন' আসবে কলকাতা থেকে। এবারে সে শ্বশুরবাড়ি যাবে। সাত্তার বলে গেছে, পরেরবার সে তাকে নিতে আসবে। আর সেই সময়ও হয়ে এলো। চুপি চুপি দিন গোনে জাহাঁ আরা। বাড়িতে শুরু হয় পিঠে তৈরি, বড় বড় মাটির হাড়িতে সব ফুলপিঠে বানিয়ে রেখেছে আম্মা, যেগুলো জাহাঁ আরার সাথে যাবে। আম্মা যখন তখন জাহাঁ আরাকে উপদেশ দেয়, ওখানে গিয়ে এটা কোরো না, ওটা কোরো না! ক্ষিদে পেলেই খেতে বসে যেও না, শাশুড়ি যখন খেতে দেবে তখনই খাবে! সংসার বিষয়ক জ্ঞান দেয় আম্মা আর বারেবারেই চোখ মোছে আঁচলে। জাহাঁ আরা এবার গেলে যে ছ'মাসের আগে আর বাপের বাড়ি আসবে না!

বুঝলে তো লোকে জানে যে, গাফ্‌ফার ঠাকুর বিয়ে করেননি কিন্তু কলিকাতার কোন এক অনাথ আশ্রম থেকে দত্তক নিয়েছেন একটি ছেলে, সেই ছেলেই বেলালউদ্দিন ঠাকুর ওরফে বিলু মিঞা। গ্রামের লোকে অবশ্য কুকথা বলে। বলে, "দত্তক ফত্তক কিসসু না, ঐ বিলু হইল গিয়া রাহেলা আর গাফ্‌ফারের নাজায়েয পোলা! কলিকাতা গিয়ে দত্তক নেওনের কিসসা না কইলে এই পাপ হজম হইব ক্যামনে?! ' তা লোকে তো কত কথাই বলে, আর যারা রাজনীতি করে, তাদের তো পায়ে পায়ে শত্রু! এই বাড়ির লোকে তাই এই শত্রুদের কথায় কান দেয় না। তিন মেয়ে আর তাদের জামাই, তাদের ছেলে-মেয়ে, হান্নুর বউ আর তার ছেলে-মেয়ে, বিলুর বৌ আর তার ছেলে-মেয়ে আর সাথে সব কাজের লোক, মুনিষ আর তাদের বৌ পোলাপান। ঠাকুরবাড়িতে প্রতিবেলায় পাত পড়ে একশ লোকের। মোমিনের বৌ বরাবরই একটু রুগ্ন, কোন না কোন অসুখ লেগেই আছে বারো মাস। রান্নাঘরের দিকে তাই খুব একটা যান না অসুস্থ শরীরের জন্যে আর গেলেও জাহাঁ আরা তাকে খুব একটা কাজ করতে দেন না কাজেই রান্নাঘরের প্রধান দায়িত্ব হান্নুর বৌ আর বিলুর বৌএর। অন্ধকার থাকতে উঠে তারা রান্নাঘরে ঢোকে আর রাত গভীর হলে ফুরসত পায় তারা নিজের নিজের ঘরে ঢোকার। এর মাঝে বিলুর বৌ আবার বিশেষ স্নেহপ্রাপ্ত রাহেলাবিবির কাজেই সবচাইতে বড় ভারটা টানেন সাত্তার ঠাকুরের স্ত্রী। তার ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা, দেখাশোনা করেন গাফ্‌ফার ঠাকুর আর রাহেলাবিবি। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী বলে কথা। কিন্তু এই দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েও গাফ্‌ফার সাহেব যে ঠিকঠাক সেই দায়িত্ব পালন করছেন না তা তিনি নিজেও মাঝে মাঝে অনুভব করেন, অন্দরমহলের সমস্ত ব্যপারে তিনি অনেকখানিই নির্ভর করেন সৎমা রাহেলাবিবির উপরে। রাজনীতি করে তিনি সময়ই বা কতটুকু পান বাড়ির এইসব ছোটখাট ব্যপারে নজর দেওয়ার জন্যে। হান্নুর মেজ ছেলেটার নামে মাঝে মাঝেই কিছু কথা তাঁর কানে আসে, ছেলেটাকে ডেকে তিনি বেশ কয়েকবার ধমকেও দিয়েছেন কিন্তু তাতে কাজ কতটা হয়েছে সে বিষয়ে তিনি নিজেই সন্দিহান। এ নিয়ে রাহেলাবিবির সাথে তাঁর বেশ কয়েকবার কথাও হয়েছে, রাহেলাবিবি বলেন, "পুলাপান মানুষ, এট্টু বাঁদরামী করে, বড় হইলে ঠিক হইয়া যাইব!' কিন্তু ১৪ বছরের ছেলের নামে যেসব কথা কানে আসে তাঁর, সেগুলোকে ঠিক বাঁদরামী বলে উড়িয়ে দিতে পারেন না গাফ্‌ফার সাহেব।

গাফ্‌ফার সাহেব যখন দুপুরে খেয়ে একটু গড়াতে ভেতরবাড়ি আসেন তখন রাহেলাবিবি আফিম নিয়ে ঝিমোন। কথাবার্তা যা হয় তা রাতে খাওয়ার সময়। রাহেলাবিবি তখন শরীফ মেজাজে বসে গাফ্‌ফার সাহেবের কাছে সারাদিনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেন। গাফ্‌ফার সাহেবের কাছে জেনে নেন বাইরের খবর। সামনে তো ভোট আসছে, মন্নু কি এবারেও ভোটে দাঁড়াবে? আর নয় ইলেকশন নাই করল মন্নু। অনেক তো হল। সব কাজ তো সবাই পারে না। আর এই দেশের লোকের জন্যে ভেবেই বা কি করবে মন্নু? দেশের মানুষ তো সব হারামজাদা! এই যে এতকিছু করে মন্নু এদের জন্যে, তা সেগুলো কি হারামখোরেরা মনে রাখে ভোটের সময়? নিজের ভোটটা তো সবাই গিয়ে ঐ "দেওয়ানের পো'কে দিয়ে আসে! তো বিপদে পড়লে এই ঠাকুরবাড়িতেই কেন সব ছুটে আসে? আবার যত রাজ্যের আকথা কুকথা সব বলে তাঁর আর মন্নুর নামে! আর মন্নু কিনা সেই সব নেমকহারাম লোকেদের জন্যেই ভেবে মরে, বিপদে ছুটে যায়,নিজের পকেটের পয়সা সব খরচ করে হারামীগো চিকিৎসা করায়, মাইয়ার বিয়ার খরচ দ্যায়, ঘরের চালের টিন কিন্যা দ্যায়! গাফ্‌ফার সাহেব শোনেন, কিছু কানে ঢোকে কিছু ঢোকে না। যা ঢোকে তা নিয়েও যে খুব একটা ভাবেন তা নয়। রাহেলাবিবি সেকথা জানেন। মন্নু যে তার কথায় খুব একটা আমল দেয় না তা তিনিও জানেন কিন্তু কী আর করা যাবে! বুড়ো হয়েছেন তো!


রাহেলাবিবির কানে এসেছে খামারবাড়িতে মন্নু একটা " মাইয়ামানুষ' রাখসে। মন্নুকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, মাইয়ামনুষ রাখেননি , ঐ মহিলাকে নাকি তিনি বিয়ে করেছেন। কান মাথা ঝা ঝা করে রহেলাবিবির। বিয়ে! হুহ। একটা কামিন মেয়েছেলে, সারাজীবন ঠাকুরদের জমিতে কাজ করেছে, এখন এই আধবুড়ো বয়েসে ঠাকুর সাহেবের সেবাযত্ন করে তার মন জয় করে কবুল পড়িয়ে নিয়েছে! সে না কি ঠাকুর সাহেবের বিবি! মন্নু এনিয়ে বেশি কথা বলে না। বর্ষার সময় প্রতিবছরই নৌকোয় চেপে মন্নু চলে যায় বিলের মাঝের ঐ খামারবাড়িতে। ধান ওঠার সময় তখন। একবার গেলে বেশ কয়েকদিন করে সেখানে থেকে আসেন তিনি। মন্নুর না গেলেও চলে, কিন্তু যাবে না কেন? ঐ মাগী আছে না ওখানে? শুধু ফসল ওঠা কিংবা রোয়া নয় এখন তো মন্নু ফাঁক পেলেই খামারবাড়ি চলে যায়, আর একবার গেল তো বেশ কয়েকদিনের জন্যে লাপাত্তা! ঐ খামারবাড়িতে যে রাহেলাবিবি নিজেও যাননি তা নয়, তখন হামিদার স্বামী ছিল, মাগ-ভাতার দুজনে মিলে ঠাকুরদের বিলের জমির দেখাশোনা করতো। ঠাকুরবাড়ির কেউ ঐ খামারবাড়িতে গেলে রাজকীয় আপ্যায়ন করত স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে। দুটো ছেলেও আছে হামিদা আর হাসান আলির। এই ঠাকুরবাড়িতে এমন কেউ নেই যে একবার অন্তত ঐ খামারবাড়িতে বেড়াতে যায়নি, ওখানে থেকে আসেনি,বুঝলে? পোষা সেই ডিমপাড়া মুর্গীর কোর্মা আর ক্ষেতের কালোজিরা চালের পোলাও খায়নি এমনটা দেখাও তো! হামিদার রান্নার হাত যে ভাল তা রাহেলাবিবিও স্বীকার করেন, নইলে ঐ ভাতারখাগী মাগী মন্নুকে ভোলালো কি করে! গাফ্‌ফার সাহেব মাঝে মাঝেই ওখানে যান বলে ঐ বিলের মাঝে দুই কামরার পাকা বাড়ি করেছে, সাথে গোসলখানা-পায়খানা। উঠোনের ওপাশেই হামিদার টিনের ঘর, কিন্তু যখন থেকে হামিদাকে "কবুল' করেছেন গাফ্‌ফার সাহেব, হামিদা পাকাপাকিভাবে উঠে এসেছে এই সখের দালানে! হমিদার ছেলে- বৌ থাকে এখন ঐ টিনের ঘরে!


গাফ্‌ফার সাহেবের পাখি শিকারের সঙ্গী ছিল হাসান আলি। দোনলা বন্দুকটাও এমনি সময়ে থাকত হাসন আলির জিম্মাতেই। শীতের শুরুতে আর শীত শেষ হওয়ার সময় গাফ্‌ফার সাহেব চলে আসতেন এই খামারবাড়িতে। প্রায় প্রতিরাতেই হাওরে যেতেন পাখিশিকারে। নৌকায় থাকত হাসান আলি আর তার ছেলে। গুলি খেয়ে পাখি কোথায় পড়বে সেই হিসেব আগেই কষে নিত হাসান আলি, সেইমত আগে সেখানে গিয়ে কোমর কিংবা বুকজলে দাঁড়িয়ে থাকত। গুলি খেয়ে ঝুপ করে জলে পড়া পাখির ছটফটানি শেষ হওয়ার আগেই পৌঁছে যেত হাসান আলি পাখির কাছে, কি পড়ল সেটা দিখে নিয়ে হাঁক দিত, বালিহাস পড়ল ঠাকুর সাব! নৌকো এগিয়ে যেত হাসন আলির দিকে, পাখি আর হাসন আলিকে তুলে নেওয়ার জন্য। নৌকার পেটে জমত গুলিবিদ্ধ পাখির পাহাড়। হাসন আলি নৌকোয় উঠে তুলে নিত ধানকাটার কাটারিখানা,এগিয়ে আসত মাঝিও, পাখির পায়ের দিকটা ধরত মাঝি। একহাতে পাখির মাথা ধরে রেখে অন্য হাতে পাখি জবাই করত হাসন আলি, বিসমিল্লাহে আল্লাহু-আকবার! হালাল হল পাখি। কানি বক থেকে নিয়ে ধনেশ সবই থাকত নৌকার পাটাতনে। মাঝরাতে নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পাখি শিকার শেষে খামারে ফিরতে দুপুর পেরিয়ে যেত। হামিদা রান্না সেরে অপেক্ষা করত তাদের ফেরার। গাফ্‌ফার সাহেব ফিরেই গোসল করতেন আগে থেকে তুলে রাখা টিপকলের জলে, তারপর খেয়ে নিয়ে সোজা তার রেলিং দেওয়া খাটে। ক্লান্ত শরীর বিছানায় গিয়েই ঘুমে ঢলে পড়ত, বিছানায় বসে তখন তার গা হাত টিপে দিচ্ছে হামিদার ছেলে দেওয়ান আলি। হামিদা তখন পাখি পরিষ্কারে ব্যস্ত সাথে আরও দু একজনকে নিয়ে, সন্ধ্যে হওয়ার অগেই সমস্ত পাখি বাজারের থলেতে ভরে হাসানালি পৌঁছে দিতে যাবে ঠাকুরবাড়িতে। ঠাকুরসাহেব যদি এখন দু-চারদিন এখানে থেকে যান তবে সে কিছু পাখি রাখবে ঠাকুর সাহেবের জন্যে নইলে সব পাখিই সে পাঠিয়ে দেবে, বড়বিবি যাতে কোন কথা না বলতে পারেন তাকে কিংবা তার স্বামীকে! ভালো ব্যবস্থা।


প্রায় প্রতিবছরই ক্লাসে ফেল করে সাত্তারের ছেলে, স্কুলের হেডমাষ্টার বাড়িতে সেকথা জানালে রাহেলাবিবি সাত্তারের স্ত্রীকে দোষারোপ করেন। ছেলে মেয়ে মানুষ করতে না পারলে জন্ম কেন দেওয়া সেই প্রশ্নও তোলেন। জাহাঁ আরা একদিন বিকেলের নাশতা ভাশুরের সামনে রেখে পর্দার আড়ালে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, তাঁর কিছু কথা আছে। কি কথা জানতে চান গাফ্‌ফার ঠাকুর। জাহাঁ আরা জানান, এতবড় সংসারের রান্নার দায়িত্ব তিনি আর নিতে পারবেন না, তিনি সকলের সাথে যৌথ রান্নাঘরে নিজের রান্না আর রাঁধতেও চান না। তার আলাদা রান্না ঘর চাই আর জমিজমার ভাগও যেন বুঝিয়ে দেওয়া হয়। খানিক চুপ থেকে গাফ্‌ফার জানতে চান,কেনো এই সিদ্ধান্ত? তখন আর কি করবে, নিজের সমস্যার কথা জানান জাহাঁ আরা। বলেন , ভোর রাত থেকে শুরু করে আবার রাত গভীর হওয়া অব্দি তিনি রান্নাঘরেই থাকেন, গোটা সংসারের তিনবেলার খাওয়া, নাশতা-পানি, সকল দায়িত্ব তার। এতে করে তিনি নিজের ছেলে-মেয়ের প্রতি একটুও দৃষ্টি দিতে পারেন না। তারা কি খেল, কি পরল, স্কুলে গেল কি না। পড়াশোনা করছে কি না তিনি কিছুই জানেন না। বছরের শেষে প্রতিবার তার ছেলে স্কুলে ফেল করে। মেজ ছেলে একটা ষন্ডা হয়ে উঠেছে এখনই, ছেলে যদি ষন্ডাও হয় তবুও তার গতি আছে কিন্তু একমাত্র মেয়ে যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তিনি কী করবেন? স্বামীকেই বা কী জবাব দেবেন? তিনি তো কলকাতায় বসে শুধু টাকাই রোজগার করছেন সকলের জন্যে!

এই কথোপকথনের মাঝে রাহেলাবিবি এসে দাঁড়ালেন আর রক্তচক্ষু মেলে তাকালেন জাহাঁ আরার দিকে। যা বলার ছিল তা বলে জাহাঁ আরা তখন অপেক্ষা করছেন ভাশুর কি বলেন শোনার জন্যে। গাফ্‌ফার ঠাকুর তখন জাহাঁ আরাকে বললেন, তুমি এখন যাও, আমি একটু ভেবে দেখি। তারপর উঠে চলে গেলেন বৈকালিক জমায়েত যেখানে বসে সেদিকে। সেখানে তখন বেশ কিছু লোক অপেক্ষা করছে নিজেদের নানা সমস্যা নিয়ে, পাড়ার কিছু বয়স্ক লোকও আছেন, যারা দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে এসেছেন, প্রায় রোজই আসেন এই সময়ে। আজ গাফ্‌ফার সাহেবের মন বসল না এই বিচারসভা কিংবা জমায়েতে। পূর্ব আর পশ্চিম মিলে পাকিস্তান পাকিস্তানই থেকে যাবে না আবার ভাগাভাগি হবে সেই আলোচনায় গাফ্‌ফারের মন বসে না, এসব নিয়ে কোন আলোচনা-তর্কে অংশ নিতে তাঁর ইচ্ছে হল না। তিনি ভাবছিলেন হান্নুর কথা, তাঁর ছোট ভাইটির কথা। কাওকে কোন কিছু না বলেই তিনি উঠে চলে গেলেন সামনের খালপাড়ের দিকে। কোন ভাবনা মাথায় এলে কিংবা মন খারাপ হলে এখানেই আসেন তিনি। ছোট ভাইয়ের কথা আজ তাঁর খুব মনে পড়ছে। দুই ভাই একসাথে কলকাতা যাওয়ার কথা, জাহাজে চাকরি নেওয়ার কথা। এক বিছানায় এক বালিশে দু ভাইয়ের শুয়ে গল্প করার কথা। তিনি রাঁধতে পারেন না বলে বরাবর দুই ভাইয়ের রান্না হান্নু একাই রাঁধত। ভাতে কাঁকর পেলে তাঁর খাওয়া হয় না বলে রোজ হান্নু অত রাতে বসে চাল বাছত তারপরে ভাত চাপাত কয়লার উনুনে। চোখ জলে ভরে এল তাঁর।

অনেক রাতে বাড়ি ফিরে জাহাঁ আরাকে ডেকে পাঠালেন, ডাকলেন ছেলে বিলু আর সৎমা রাহেলাবিবিকেও। সৎমাকে বললেন, কাল থেকে হান্নুর বৌ বাচ্চা "জুদা' খাবে, তাঁকে যেন প্রয়োজনীয় হাড়ি বাসন দিয়ে দেওয়া হয়, দু বস্তা চাল আপাতত দেওয়া হোক, সাথে ডাল, মশলাপাতি সব। আপাতত বড় রান্নাঘরেই আগে পিছে করে রেঁধে নেবে জাহাঁ আরা, কিছুদিনের মধ্যেই তাকে আলাদা রান্নাঘর তুলে দেওয়া হবে। যে মাষ্টার বাড়িতে থেকে পড়ায় তাকে যদি জাহাঁ আরার ঠিক মনে না হয় তবে স্কুলের হেডমাষ্টারকে তিনি বলে দেবেন, সে যেন বাড়ি এসে ছেলেদের পড়িয়ে যায়, জাহাঁ আরা যদি চান তাহলে ছেলেদের কলকাতায়ও পাঠিয়ে দিতে পারেন তিনি হান্নুর কাছে। রাহেলাবিবি একটিও কথা না বলে শুধু শুনে গেলেন, প্রশ্ন তুলল বিলু, সে বলল, আব্বা, আপনি তো "জুদা' খাওয়র ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন, চাল,ডাল দিয়ে দিচ্ছেন এখন, জমি-জমার কি হবে? সেগুলো কিভাবে ভাগ হবে? গাফ্‌ফার সাহেব বললেন, সে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, তোমার ব্যবস্থাও আমি করে দেব। রাহেলাবিবি জিজ্ঞেস করলেন তোমার বোনেরা? তারা কি করবে? গাফ্‌ফার সাহেব তাদের ব্যপারেও ভেবে রেখেছেন, বললেন, তারা চাইলে তারাও "জুদা' হয়ে যাক, আর না চাইলে আপনার রান্নাঘরে তারা যেমন খাচ্ছিল তেমনি খাবে। জাহাঁ আরাকে আবার জিজ্ঞেস করলেন আর কিছু বলার আছে তোমার? জাহাঁ আরা জনালেন, না। আর কিছু বলার নেই আপাতত।

অন্দরমহলের এই ভাগ বাটোয়ারা করে খনিকটা স্বস্তি বোধ করলেন গাফ্‌ফার সাহেব। জাহাঁ আরার কথা মনে পড়ল তাঁর। এগারো বছরের এই মেয়েটির সাথে হান্নুর যখন বিয়ে হয় তখন সে শ্বশুরবাড়ি, শাশুড়ি ভাশুর কিছুই বুঝতো না। রাহেলাবিবি শিখিয়ে দিয়েছিলেন ভাশুরকে যেন সে 'বড়সাব' বলে ডাকে, জাহাঁ আরা আজও তাকে বড়সাব বলেই ডাকে। জাহাঁ আরা যখন ষোল বছরের কিশোরী তখন পাল্কী চেপে আবার সে আসে শ্বশুরবাড়ি, দ্বিতীয়বারের মত। এবার সে এসেছে সংসার করতে। বাপের একমাত্র মেয়ে জাহাঁ আর তখনও জানে না কি করে শাড়ি পরতে হয়, কি করে সংসার করতে হয়, জানে না যে ভাশুরের সামনে পর্দা করতে হয়। রাহেলাবিবি তাঁকে কঠোরহাতে সেসব শিক্ষা দিয়েছেন, কখনও খুব কঠোর মনে হত তাঁর রাহেলাবিবিকে, কিন্তু ভেতরবাড়ির কথায় নাক গলানো স্বভাব নয় বলে কখনই কোন কথা বলেননি। কিন্তু এই মেয়েটির প্রতি একটা স্নেহ বরাবর তিনি অনুভব করেন। হান্নু থাকে কলকাতায়, ভাইপো - ভাইঝির কখন কি দরকার, অসুখে বিসুখে, আপদে বিপদে মেয়েটি বরাবর তাঁর কাছেই আসে, পর্দার অন্তরাল থেকে মৃদু গলায় সমস্যা জানায় তারপর নীরবেই চলে যায়। এই নিয়ে রাহেলবিবি যে জাহাঁ আরাকে খোটা দেন সেটাও গাফ্‌ফার সাহেব জানেন, অনেকবার নিজের কানেই শুনেছেন, কিন্তু সৎমাকে কিছু বলা নিরর্থক জেনে কিছুই বলেননি, যা করা দরকার সেটুকু করে দিয়েছেন সময়মত। জাহাঁ আরা সম্পর্কে একটা শ্রদ্ধাবোধও আছে গাফ্‌ফার সাহেবের। এই মেয়েটি কখনও কোন পারিবারিক কোঁদলে থাকে না। পাড়া প্রতিবেশীর সাথে বসে কুট কচালী করে না, কোন বিষয়েই আগ বাড়িয়ে নিজের মত প্রকাশ করে না এমনকি নিজের অধিকারও খাটায় না, বিলুর বৌ, মোমিনের বৌ যা হরবখতই করে! কোন সমস্যা হলে দরজার ওপাশে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সেটা জানায় আর কে জানে কেন বাড়িতে শাশুড়ি থাকা সত্বেও জাহাঁ আরা নিজের সমস্যা বা প্রয়োজন তাঁকেই জানায়। মাথা থেকে চিন্তা বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেন গাফ্‌ফার সাহেব, সামনে নির্বাচন, কী হবে না হবে সে কথা ভাবতে চেষ্টা করেন আর একসময় ঐ অন্দরমহলের কথা ভুলেও যান।





- ৪ -


আমার একা যেতে ভয় করে
চলরে গুরু, দুজন যাই পারে
মায়ার খেলা ছাড়রে মন,
বেলা যায় তোর বহিয়া ।।
চৌষট্টি বছরে পড়ি
বেলা আছে দন্ড চারি
বেলা শেষে বসবে নবি
আসবে ঘাটে বসে আয়
মায়ার খেলা ছাড়রে মন
বেলা যায় তোর বহিয়া ।। ( সারি গান, দিনাজপুর, বাংলাদেশ)




এই দ্যাখো কয়েকদিন ধরেই টিপটিপ টিপটিপ সারাদিন ঝরে চলেছে বৃষ্টি, অবিরাম অবিশ্রান্ত। মাঝে মাঝেই গতি বেড়ে গিয়ে অবিরাম বর্ষণ তারপর আবার টিপটিপ। এই তো আজ সাতদিন এই চলছে। রেডিওতে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলেছে আরও দু'দিন চলবে এরকম। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া গভীর নিম্নচাপ থমকে আছে চট্টগ্রামের উপর, চট্টগ্রামে প্রচন্ড ঝড়ও হয়ে গেছে কিন্তু নিম্নচাপ কাটেনি যার ফলে সারাদেশ জুড়েই চলছে এই বর্ষণ। এই সাতদিনে বৃষ্টি যে একেবারেই থামেনি তা নয়। মাঝে মাঝেই একটুখানি সময়ের জন্যে থেমেছে, মনে হয়েছে এই বুঝি থামল, আর বোধ হয় বৃষ্টি হবে না কিন্তু আকাশের দিকে তাকালে আর সে ভরসা থাকেনি। সেখনে থমথম করছে ঘন কালো মেঘ, যে কোন সময় আবার উপুড় করে ঢালবে বৃষ্টি। মাজন আলির পূর্বাভাস, "দ্যাশ ভাইস্যা যাইব এইবার, পিছনের শুক্‌না খাল তো নদী হইয়া খাড়াইসে। হুম হুম আওয়াজ শুনা যায় দূরের থেইকাই। পানি বাড়তেসে ঘন্টায় ঘন্টায়। আষাঢ় মাস এখনও শ্যাষ হয় নাই, পুরা "বর্ষাত' ( বর্ষাকাল) পইড়া রইসে সামনে। কি যে হইব আল্লায়ই জানে! '

মাথায় টোকা গায়ে একট বড় পলিথিন চাদরের মত জড়িয়ে উঠোনের জলকাদা পেরিয়ে মাজন আলি এসে হাজির হয়। বারান্দায় উঠে পা বাড়িয়ে বৃষ্টির ধারাতেই ধুয়ে নেয় পায়ের জলকাদা। রবারের চটি বারান্দাতেই রেখে এসে দাঁড়ায় ঘরের ভেতর। দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন রাবেয়া বেগম শোয়া থেকে উঠে বসেন মাজন আলির সাড়া পেয়ে, কি রে মাজন, পানির কি অবস্থা? উৎকন্ঠিত রাবেয়া খাতুনের প্রশ্ন মাজন আলিকে। মাজন আলি তার বছর বান্ধা মুনিষ। খানিক আগেই রাবেয়া খাতুন নিজে ছাতা মাথায় বাড়ির পেছনের খালপাড় থেকে ঘুরে এসেছেন হাঁটুর ব্যাথা আর জল-কাঁদাকে উপেক্ষা করে। নদী হয়ে যাওয়া খালের ঘোলা জলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বেশ কিছুক্ষণ। বৃষ্টির গতি বাড়তে ফিরে এসেছেন। মাজন আলির কথা শুনে তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভরা খাল আর খালের ওপাশের প্রায় ডুবে যাওয়া ফসলের মাঠ। যেখানে আধপাকা ধানের ভার নিয়ে এখনও কোনমতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ধানগাছেরা, আর একটা সপ্তাহ গেলেই মুনিষদের কাঁধে চেপে যে ফসল ঘরে উঠত। জল যদি আরও বাড়ে তবে ডুবে যাবে মাঠভর্তি এই ফসল। দূরে ডিষ্ট্রিক্ট বোর্ডের পাকা সড়ক আর তার ওপাশে বড় দেওয়ান পাড়ার ঘর বাড়ি, গাছপালা আবছা চোখে পড়ে।


ভাবিসাব, বাজারে যাওন লাগবনি? জানতে চায় মাজন। জাহাঁ আরা উত্তর দেন, এই "গাদলা'র (বৃষ্টি-বাদল) মাঝে বাজারে গিয়া আর কি পাবি। শোল এর শুটকি আছে মনে হয় ঘরে আর ডাল রাঁধলেই হইয়া যাইব। তুই একটু শফির বৌরে ডাক দে দেখি, ফিরিজে কিসু আছে কিনা একটু দেখুক আইয়া! বাজারে আনাজ-পাতি খুব একটা পাওয়া যায় না বলে এইরকম বৃষ্টির দিনে জাহাঁ আরা বরাবরই রাঁধেন একটা শুটকির মাখা মাখা তরকারি। কখনো আলু দেন কখনো দেন না। গোটা গোটা রসুন ছাড়িয়ে প্রায় শুটকির সমপরিমাণে রসুন দিয়ে ঝাল ঝাল একটা তরকারি। সাথে চেরা কাঁচা লংকা আর বেশি করে পেঁয়াজ দিয়ে মাখা মাখা মুশুরির ডাল। আজকেও সেই রকমই ইচ্ছে কিন্তু শুটকি কী আছে? ঠিক মনে করতে পারেন না । একটু মাছ না হইলে তো আবার তোর ও খাওন হয় না, বাজারে বোধ হয় একবার পাডানই লাগব (পাঠাতেই হবে)! নিজের মনেই কথা বলেন জাহাঁ আরা। "দুই'ডা রাজহাঁসের আন্ডা ভাজি কইরা লইলেও চলে অবশ্য!' ততক্ষণে মাজন ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে পাশের ঘরের দরজায় টোকা দেয় সাথে আওয়াজও, "ও শফিচাচি, ভাবিসাবে ডাকে আপনেরে।'


জাহাঁ আরার একপাল রাজহাঁস আছে। "আম্মা'র পোষা রাজহাঁসের একজোড়া ডিম তিনি বাপের বাড়ির থেকে নিয়ে এসেছিলেন বছর দুই আগে। বাতিল হয়ে যাওয়া বিশালাকারের লোহার কড়াইয়ে বালি আর তার উপরে খড় দিয়ে সেই দুটো ডিম তার সাথে কয়েকটি মুর্গীর ডিম দিয়ে পোষা একটি মুর্গী বসিয়ে দিয়েছিলেন বাচ্চা ফোটানোর জন্যে। বাপের বাড়ি থেকে বয়ে আনা ডিম ফুটে রাজহাঁসের ছানা বেরুবে কিনা সেই নিয়ে খুব চিন্তায়ও ছিলেন যদ্দিন না ডিম ফুটে ছানা বেরিয়েছে। মুর্গীর ডিমগুলো থেকে আগেই ছানা বেরিয়ে যায়, হাঁসের ডিমগুলো থেকে যায় যেমন কে তেমন। জাহেদী, জেসমিন সকলেই বলেছিল, চাচি, "হাসের আন্ডা ফুটতে তো সময় লাগে বেশি, একমাসের মতন আর মুর্গীর ছানা বাইর হয় তিন সপ্তায়, মুর্গী যদি হাঁসের আন্ডা ফ্যালাইয়া নিজের বাইচ্চা লইয়া বাইর হইয়া যায় তইলে আপনের রাজা হাঁস তো গেল!' এই চিন্তা যে জাহাঁ আরারও ছিল না তা নয়, কিন্তু তবু তিনি আশা করেছিলেন, যদি ডিম ফুটে রাজহাঁস বেরোয়! আর একদিন সত্যিই রাজহাঁসের ছানা বেরুলো সেই দুটি ডিম ফুটে! ছোট ছোট রোমের বলের মত মুর্গীর ছানার আগেই বেরিয়ে গিয়েছিল কিন্তু মুর্গী তবু না ফোটা ডিম দুটো ফেলে ওঠেনি। ছানারা লাফিয়ে লাফিয়ে কড়াইয়ে উঠত আর নামত, মাঝে মাঝেই রাহেলা এসে ওদের আবার মায়ের কাছে তুলে দিয়ে যেতেন। কড়াইয়ের সামনে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন চালের মিহি খুদ। ছানারা যেন খুটে খুটে খেতে পারে!

মাস পেরিয়ে সেই ডিম ফুটে যেদিন ছানা বেরোয়, গর্বিত মুর্গী গর্‌র্‌র্‌র গর্‌র্‌র্‌র করে ছানাদের নিয়ে চরতে বেরোয় কড়াই ছেড়ে ঘরের বারান্দায়, বারান্দা ছেড়ে বাড়ির উঠোনে। ছানাদুটির গায়ে রোম বলতে কিছু ছিল না, কাগজের মত স্বচ্ছ পাতলা চামড়া দিয়ে মোড়া ছোট্ট দুটি প্রাণী। মাজনকে দিয়ে কেঁচো তুলিয়ে আনেন জাহাঁ আরা, আনেন ছোট্ট ছোট্ট শামুক। খোল ভেঙে শামুকের ভেতরকার শাস হাতে করে খাওয়ান ছানা দুটিকে।ধানের মিহি কুড়ো মাখেন ভাতের মাড় দিয়ে, ওতে দেন কেঁচো, খোল ভাঙা শামুক, অল্প ভাত। ছানারা বেড়ে উঠল খুব তাড়াতাড়ি, গায়ে পালক দেখা দিল, শুভ্র-সাদা পালক। কোয়াক কোয়াক ডাক শুনে তৃপ্তিতে ভরে যায় জাহাঁ আরার মন, প্রর্থনা করেন, "ইয়া আল্লহ, একটা যেন মাদী হয়!' আর সত্যি সত্যিই একটা ছানা ছিল মাদী। কিছুদিনের মধ্যেই জোড়া রাজহাঁসের কোয়াক কোয়াক ডাকে কান ঝালাপালা বাড়ির লোকের। জাহাঁ আরা সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখেন ওদের, মাঝে মাঝে ওদের ছেড়ে দেন, পুকুর পারে নিয়ে গিয়ে। ওরা পুকুর আলো করে জলে সাঁতরে বেড়ায়। পুকুরে যাকেই দেখেন তাকেই বলে আসেন জাহাঁ আরা, হাঁসেদের যেন একটু দেখে রাখে!

সেই একজোড়া হাঁস থেকে একপাল হাঁস এখন জাহাঁ আরার। ভেতরের বারান্দা দিয়ে দেড়তলায় ওঠার সিঁড়ির নিচে গ্রীলের গেট লাগিয়েছেন জাহাঁ আরা, রাজহাঁসেদের জন্যে। সন্ধেয় হাঁসেরা সিড়ির তলায়, ওদের ঘরে ঢুকে গেলে গ্রীলের দরজায় নিজের হাতে তালা দেন জাহাঁ আরা। ছোট দেওয়ান পাড়ায় অনেকের বাড়িতেই এখন রাজহাঁস ঘুরে বেড়ায়। দুটো করে ডিম চেয়ে নিয়ে গিয়েছিল তারাও বাচ্চা ফোটাবে বলে। সকলের না হোক কারো কারো ডিম ফুটেছে, সযত্নে লালিত ছানারা রূপসী রাজাহংস হয়ে রাজার মতই গলা উঁচিয়ে ঘুরে বেড়ায় বাড়ির উঠোনে, পুকুরের জলে।


শফির বৌ সম্পর্কে জাহাঁ আরার দেওরপোর বৌ। একা বাড়িতে থাকেন বলে জাহাঁ আরার দেখা শোনার কাজটা অনেকটাই এই শফির বৌ-ই করে। জাহাঁ আরার টাকা পয়সার হিসেব, তার ফ্রিজে মাছ আছে কিনা, তেল নুন মশলা ফুরোলো কিনা, বাতের ওষুধ আর কটা আছে এসব খবরই থাকে শফির বৌএর কাছে । শফির বৌএর নিজেরও একটা নাম আছে, জেসমিন কিন্তু এই নামে তাকে এবাড়িতে অন্তত কেউ ডাকে না। হ্যাঁ, শফি বেঁচে থাকতে তাকে জেসমিন বলেই ডাকত। জেসি, জেসু ও বলত। কিন্তু সেসব যেন বিগত জন্মের কথা। শফি মারা গেছে সেও দশ বছর হয়ে গেল। নিজের ঘরে বৃদ্ধা শাশুড়ি, তিনটি ছেলে মেয়ে আর পাশের ঘরের এই জেঠশাশুড়ির দেখা শোনা করেই দিন কাটে জেসমিনের। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝেই এসে উঁকি দেয় জেসমিন, ও চাচিআম্মা, কি করেন গো বলে। জাহাঁ আরা প্রয়ই অসুস্থ থাকেন, উচ্চ রক্তচাপ, অসুস্থ হৃদযন্ত্র আর বাতের ব্যাথায় প্রায় সময়েই অচল থাকেন তিনি। ছেলে বৌরা সব বিদেশে, একমাত্র মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে, কাজের লোকদের নিয়ে একলাই থাকেন জাহাঁ আরা। যদিও শরিকি বাড়িতে লোকের অভাব নেই, এঘর ওঘর থেকে প্রায় সকলেই দিনে একবার দু'বার করে তাঁর খোঁজ নিয়ে যায় কিন্তু একজন বৃদ্ধ মানুষের দেখাশোনা করা বলতে যা বোঝা সেটা করে এই জেসমিন।

জাহাঁ আরা দিনের বেশিরভাগ সময় ইবাদত করে কাটান। নামাজ, কোরান শরীফ পাঠ, তসবীহদানায় আল্লাহর একশত নামের কয়েক হাজার বার করে জপ, রাসুলের নামে রকমারী দরুদ পাঠ আর পাঁচবেলার ফরজ ( যা অবশ্য করনীয়) নামাজ ছেড়ে আরও কয়েক রকমের নফল ( যা অবশ্য করনীয় নয়) নামাজের পরে সময় খুব একটা থাকে না জাহাঁ আরার হাতে। রান্নাঘরে খুব একটা যান না জাহাঁ আরা, রান্নার কাজ তার পুটলিই করে তিনি শুধু রান্নাঘরের সামনের বারান্দায় বসে দেখিয়ে দেন, কোন তরকারীতে কতটা মশলা পড়বে, কিভাবে রান্না হবে। এই রান্নার সময়টা তিনি বারান্দায় বসে থাকেন মোড়া নিয়ে, হাতে কখনও থাকে ছোট কোরান শরীফখানি কখনও বা তসবীহ দানার মালাটি। ভাল মন্দ কিছু রান্না হলে শফির বৌ এসে রেঁধে দিয়ে যায় কিন্তু সেটা খুব কম সময়েই ঘটে। মোটামুটি সব রান্নাই জাহাঁ আরা পুটলিকে দিয়ে করিয়ে নেন আর মেয়েটা শিখেও গেছে এখন শুধু বাইরের কেউ এলে তিনি শফির বৌকে রান্নাঘরে ঢুকতে দেন। যদিও শফির বৌ প্রতিদিনই সকালবেলায় এসে জিজ্ঞেস করে যায়, ও চাচিআম্মা, কিছু করন লাগবনি গো! জাহাঁ আরা জবাব দেব, নারে মাইয়া, কিসু করন লাগব না, তুই তোর নিজের কাম শ্যাষ কর!

এই সময়টায় জাহাঁ আরার কাছে এসে বসে জাহেদার মা ওরফে জাহেদী। লোকমুখে কখন যে যে সে "জাহেদার মা' থেকে "জাহেদী' হয়ে গেছে নিজেও জানে না। বাড়ির পেছনদিকে এই ঠাকুরবাড়ির সীমানা যেখানে শেষ হয়েছে জাহেদীর বাড়ির সীমানা সেখান থেকে শুরু। বাপের বাড়িতেই বাস করে জাহেদী। একমাত্র মেয়ে হওয়ার সুবাদে এই বাড়ির মালিক হয়েছে সে, পুকুর, বাগান, বাঁশঝাড় নিয়ে সেই বাড়ি আয়তনে ঠাকুরবাড়ির চাইতেও বড়। বাড়ির একেবারে মাঝামাঝি ছোট ছোট দু'খানি খড়ের ঘর যার একটিতে বাস করে জাহেদী আর তার স্বামী শুকুর মিঞা অন্যটিতে তার ছেলে আর ছেলের বৌ। বাড়িতে খানিকটা করে জমি ভাগ ভাগ করে নিয়ে সেখানে নানা রকমের সব্জি ফলায় জাহেদী। বেগুন, ঝিঙে, উচ্ছে। খড়ের চালে বিছিয়ে থাকে কুমড়োর লকলকে ডগারা। ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে সরু সরু বেত বানিয়ে ছোট ছোট চৌখোপ ঘর কাটা এক মাচা বানায় শুকুর আলি, বুকসমান উঁচু বাঁশেরই খুঁটিতে বানানো মাচা নারকোলের দড়ি দিয়ে বেঁধে দেয় সে পুঁই, লাউ, কুমড়োর গাছের জন্যে। শীতকালে মাচায় মাচায় জাহেদী তুলে দেয় শিম, লাউ। পুঁই মাচায় খলখল করে হেসে খেলে বড় হয় লাল সবুজ পুঁইশাকেরা। সকাল থেকে জাহেদী গোটা বাড়িটায় চক্কর দিয়ে তুলে আনে কিছু আনাজ, মাচায় তুলে দেয় বেড়ে গিয়ে ঝুলে পড়া ডগাগুলোকে, বাঁশঝাড়ের তলা ঝাঁট দিয়ে ঝাঁকা ভরে বাঁশপাতা এনে দেয় সে তার ছেলের বৌকে। সব যোগাড় যন্তর করে দিয়ে সে বেরোয় পাড়া বেড়াতে। সমবয়েসী জাহেদার মা অনেকটাই যেন বন্ধুর মত জাহাঁ আরার। সুখ দু:খের কথা বলেন, পাড়া পড়শীর খোঁজ নেন। জাহেদী বসে কবিরাজী ওষুধের লেপ লাগিয়ে দেয় জাহাঁ আরার হাটুতে।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত জাহাঁ আরার রান্নাঘর ছিল বাড়ির শেষমাথায়। টিনের বেড়া টিনের চালের রান্নাঘরে মাটির উনুনে কাঠের আগুনে রান্না হত সেখানে। সেই রান্নাঘরে পৌঁছুতে জাহঁ আরাকে শরিকি বাড়ির দুটো ঘর ডিঙিয়ে যেতে হত। এমনি দিনে কোন অসুবিধে হত না, ঝামেলাটা হত বর্ষাকালে। এই বাংলাদেশে বর্ষাটা একবার শুরু হলে তো আর থামার নাম নেয় না! টানা দশদিন বারো দিন ধরে চলল তো চলল! এদিককার ঘরে তালাচাবি দিয়ে ছাতা মাথায় জাহাঁ আরা যেতেন রান্নাঘরে, সকালের নাশতা বানিয়ে সেখানেই বসে খেয়ে নিতেন আর খাইয়ে দিতেন মাজন, পুটলি আর ঠিকে কাজের লোকেদের। শরীরটায় জুত না পেলে মাজন আলিকে বলতেন, মাজনরে, জাহেদীরে একটা ডাক দে না বা'জান। ডাক পাওয়া মাত্রই ছুটে আসত জাহেদার মা, এভাবে তো ডেকে পাঠায় না বড়বিবি, শরীরটা কি খারাপ! এই রকম সব সময়ে শফির বৌকে ডাকেন না জাহাঁ আরা, নিজের সংসারেও তো যথেষ্টই কাজ আছে জেসমিনের আর তাঁর জা, শফির মা'ও যে খুব একটা পছন্দ যে করেন না জেঠিশাশুড়ির সঙ্গে বৌএর এই ভাব সেটা জাহাঁ আরা খুব ভালই জানেন। কাজেই পারতপক্ষে জেসমিনকে ডাকাডাকি করেন না তিনি। জাহেদীকেই ডেকে পাঠান। জাহেদী এসে চা নাশতা করে দেওয়া থেকে শুরু করে রান্না অব্দি করে দিয়ে যেত। কিন্তু এখন আর সেই প্রয়োজন পড়ে না। পাইপলাইনের গ্যাস এসে গেছে বাড়িতে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্যাসফিল্ডের গ্যাস পাইপলাইন দিয়ে পৌঁছে গেছে গ্রাম গ্রামে, ঘরে ঘরে। সেই গ্যাস এসেছে ঠাকুরবাড়িতে, জাহাঁ আরার ঘরেও। এককালীন মোটা টাকা সরকারের ঘরে জমা দিয়ে জাহাঁ আরার মেজ ছেলে বড় রাস্তা থেকে গ্যাসলাইন বাড়িতে এনে মায়ের রান্নাঘর অব্দি পৌঁছে দিয়ে গেছে। ঠাকুরবাড়ির অন্যেরা এখনও পর্যন্ত ঠিক করে উঠতে পারেনি গ্যাসে রান্না করবে কিনা, আর খরচও তো আছে পাইপলাইন বসাতে। তাদের তো আর রাজাকারের জুয়োর পয়সা নেই! বারান্দার এই ছোট কুঠুরিটাতে গ্যাস বসিয়ে কুঠুরিটাকেই রান্নাঘর বানিয়ে নিয়েছেন জাহাঁ আরা। ওদিককার ঐ টিনের রান্নাঘর এখন পাকা দেওয়াল-ছাদের গুদামঘর। ভেতরে ধানের গোলা, সর্ষে, গমের ড্রাম। যেগুলো আগে গাদাগাদি করে বারবাড়ির ঐ বড় গুদামঘরে থাকত।

এই ঠাকুরবাড়ির চার ভিটের চারখানি পাকা দালানে জাহাঁ আরার অধিকারে আছে সাকুল্যে দুখানি ঘর। উত্তরের ভিটের এই দেড়তলা দালানের একতলার তিনখানি ঘরের দুখানি তাঁর আর তৃতীয় ঘরখানি ছোট শরিক অর্থাৎ মোমিন ঠাকুরের। যাতে বাস করে মোমিনের বিধবা স্ত্রী ও বিধবা পুত্রবধু জেসমিন ছেলে মেয়ে সহ। বারান্দার এমাথা ওমাথায় দুখানি কুঠুরি, একটি জাহাঁ আরা'র অন্যটি জেসমিনদের। জাহাঁ আরার কুঠুরিতে এককালে তার ছোট ছেলে থাকত পরে সেটি গুদামে রূপান্তরিত হয় আর বর্তমানে রান্নাঘর। জেসমিনদের কুঠুরিতে জেসমিনের দুই মেয়ে থাকে একটি সিঙ্গল খাটে। দরজার বাঁদিকে জেসমিনের ছোট ফ্রিজটি আর তারপরে যেটুকু জায়গা বেঁচে আছে তাতে জেসমিন বেতের ছোট মাদুর পেতে নামাজের জায়গা করে রেখেছে, ওখানে জেসমিন নামাজ পড়ে। মেয়ে দুটি রাতে শোবার সময়টুকু বাদ দিলে ঐ কুঠুরিতে বিশেষ ঢোকে না। জেসমিনের বড় মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে ছোটটি ক্লাস সেভেনে। ওরা নিজেরাই নিজেদের মত করে বড় হচ্ছে, পড়াশোনা করছে। জেসমিন খুব একটা নজর দিতে পারে না ওদের দিকে। জেসমিনের ছেলেটি ছোট, সবে ক্লাস টু। ছেলের জন্মের কিছুদিন পরেই একদিন হঠাৎ ওর স্বামী মারা যায়। জেসমিনের স্বামী শফিক ঠাকুর এক সময় সৌদি আরবে থাকত। কোন এক কন্সট্রাকশন কোম্পানিতে কামিনদের কাজ তদারকির কাজ করত সে। বছরে দু'মাস করে ছুটি, সেই ছুটিতে দেশে আসত শফিক। মাসে মাসে টাকা পাঠাত দেশে, বৌ এর নামে আড়াই হাজার মায়ের নামে পাঁচশ। তিন ভাইয়ের মাঝে শফিক মেজ। বড় আর ছোটও সৌদি আরবেই থাকে আর মোটামুটি একই ধরনের কাজ করে তিন ভাইয়েতেই। বছরে দু মাস করে ছুটি পায় সকলেই, সেই ছুটিতে দেশে আসে তারা।

ঠাকুরবাড়ির পাশেই জমি কিনে পাশাপাশি বাড়ি তুলে যার যার সংসারে থিতু শফিকের বড় আর ছোট ভাই। শফিকের মা রাবেয়া খাতুন স্বামীর ভিটেতেই থাকবেন বলে থেকে গেছেন মেজ ছেলের সাথেই। বড় আর ছোট ছেলে বাপের সম্পত্তিতে তাদের ভাগের হিসেব বুঝে নিয়েছে শফিকের কাছ থেকে। দেশে ফিরে থিতু হবে বলে শফিক একট করাতকল আর চালকল দেয় নরাইল থেকে অদূরে কালিকাপুর গ্রামে, সেখানে তার শ্বশুরবাড়ি। বিদেশে থাকাকালীন শ্যালকেরা দেখাশোনা করবে এই চাল আর করাতকলের এই আশাতেই ওখানে ব্যবসা শুরু করা। এছাড়া ঐ কালিকাপুরেই বি ডি আর এর স্থায়ী ক্যাম্প, তাদের কালোনি। সেখানে প্রাইমারি স্কুল থেকে এখন হাই স্কুল হয়েছে, কলেজ হয়েছে। রাস্তা ঘাট ভাল, বড়সড় স্থায়ী বাজার হয়েছে, ব্যবসার জন্যে আদর্শ স্থান। দূরদর্শী ছিল শফিক। বিদেশে থাকতে থাকতেই এই সব ভেবে চিন্তে নিয়ে সেই অনুযায়ী কাজও করেছিল। যে দু'মাস দেশে এসে থাকত, সারাদিনই পড়ে থাকত ঐ কলিকাপুরে। শফিকের শ্যালক বিশ্বস্ত ছিল, শফিকের অবর্তমানেও তর ব্যবসা মন্দ চলত না। সপ্তায় সপ্তায় জেসমিন গিয়ে টাকা পয়সা বুঝে নিয়ে আসত ভাইয়ের কাছ থেকে। শফিক মারা যাওয়ার পর এই চাল আর করাতকলের আয়ই একমাত্র সম্বল জেসমিনদের অন্ন সংস্থানের। এখনও সপ্তায় সপ্তায় বাপের বাড়ি যায় জেসমিন, হিসেবপত্র বুঝে টাকা নিয়ে আসে ভাইয়ের কাছ থেকে। শফিকের বড় আর ছোট ভাই মাঝে মাঝেই মাকে এসে বলে, এবার তুমি চল এখান থেকে, আমাদের সাথে থাকবে। কিন্তু রাবেয়া খাতুন যেতে চান না, বলেন, তোদের তো সব আছে, এই এতিম বাচ্চাগুলো আর বৌটা কার কাছে থাকবে আমি এখান থেকে চলে গেলে। জেসমিনের সাথে মাঝে মাঝেই খটমট লাগে রাবেয়া খাতুনের। রাগ করে কখনও বড় তো কখনও ছোট ছেলের বাড়ি গিয়ে বসে থাকেন তিনি কিন্তু জেসমিন গিয়ে যখন চুপটি করে সামনে দাঁড়ায় তখন আবার সব ভুলে চলেও আসেন।

খানিকটা ধানজমি আছে জেসমিনের। খানিকটা আছে তার শাশুড়ি রাবেয়া খাতুনের। স্বামীর জমিজমা তিন ছেলের মাঝে ভাগ করে দিয়ে তাঁর নিজের ভাগের অংশের জমি তিনি নিজের অধিকারেই রেখেছেন। সেই জমির ফসল কিন্তু ওঠে জেসমিনের ঘরে। এই নিয়ে রাবেয়া খাতুনের বড় ছেলে মাঝে মাঝেই আপত্তি করে, মায়ের সম্পত্তিতে তারও ভাগ আছে একথা জানায় সে। রাবেয়া খাতুন বলেন, আমি মরে গেলে ভাগ নিতে আসিস, এখন যা! এইসব সময়ে জেসমিন চুপ করে থাকে। শফিক কিছু ধানজমি কিনেছিল যার ফসলে মোটামুটি বছর চলে যায় জেসমিনের। চালকল আর করাতকল মিলিয়ে যা পায় তাতে ছেলে মেয়ের পড়াশোনা, ডাক্তার বদ্যি আর মাছ মাংস কোনমতে হয়েই যায়। জামা কাপড় জেসমিনকে কিনতেই হয় না, বাপের বাড়ি থেকে আসে আর ওঘরের চার ছেলেরা যখন বিদেশ থেকে ফেরে তখন জেসমিনের বাচ্চাদের জন্যে জামা কাপড় নিয়ে আসে। তাদের অবর্তমানে মায়ের প্রতি জেসমিন যে দায়িত্ব পালন করে এ যেন তারই খানিকটা প্রতিদান। প্রথম প্রথম জেসমিন আপত্তি করত এখন আর করে না। জেসমিনের কোন বাধা মুনিষ নেই, ওঘরের চাচির মুনিষ মাজনই তার জমির দেখা শোনা করে। ফসল লাগানোর সময় আর কাটার সময় আলগা মুনিষ নেয় মাজন রোজের মুনিষ হিসেবে। উঠোনে ফেলে ধান মাড়াইও তারাই করে দিয়ে যায়। লোক লাগিয়ে জেসমিন কিছু ধান সেদ্ধ করে আর কিছু আতপ রাখে, পিঠে পুলির জন্যে। জেসমিন নিজেই ধান সেদ্ধ করে চারমুখো উনুনে, হাড়ি ঢালা আর বসানোর জন্যে শুধু একটা ঠিক লোক নেয়। বারান্দায় স্তুপিকৃত ধান থেকে খলইয়ে ( এক ধরনের বাঁশের টুকরি) করে কাজের বৌটি ধান এনে ঢেলে দেয় আগে থেকে মেপে জল দিয়ে রাখা হাড়িতে। মাটির বড় ঢাকনা দিয়ে ধানের হাড়ির মুখ ঢেকে দেয় জেসমিন আর চুলোর পারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতের লম্বা কাঠিটি দিয়ে চুলোয় তুষ ছেটায়। নেড়ে দেয় বড় লাকড়িটি। মাঝে মাঝেই ঢাকনা সরিয়ে দেখে দুপর দিকের ধানে ভাপ এলো কিনা। ভাপ উপর পর্যন্ত এসে গেলে সে আওয়াজ দেয় কাজের বৌটিকে। বৌ হাড়ি নামায়, ধান ঢালে খলইয়ে, গরম ভাপ ওড়া ধান দিয়ে সোজা চলে যায় ছাদে, খলই উপুড় করে ধান ঢেলে দেয় ছাদে ছড়িয়ে ছড়িয়ে তারপর আবর এসে মেপে হাড়িতে জল দেয়, ধান দেয়। তিনমুখো উনুনের গনগনে আঁচে লাল হয় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা জেসমিনের শ্যামলা মুখ।

পাকা ভিটে আর হাফ দেওয়ালের উপর টিনের বেড়া আর টিনের চালের এই রান্নাঘর শফিক বানিয়েছিল মারা যাওয়ার কিছুদিন আগেই। রান্নাঘরের পাশের এক টুকরো উঠোন পাকা করে একপাশে গোসলখানা, পায়খানা আর কলঘর। জেসমিনকে সেই থেকে আর বারোয়ারি পায়খানায় যেতে হয় না। জেসমিনের রান্নাঘর পেরিয়ে গিয়ে জাহাঁ আরার রান্নাঘর, এখন যেটা গুদামঘর। তার ওপাশে পশ্চিমের উঠোনের দু ধারে এবাড়ির দুই ঘরজামাইদের একজন ইসমাইল মির্জার ঘর। এবাড়ির বড় মেয়ে রাজিয়া বেগমের স্বামী ইসমাইল মির্জা। পাঁচ ছেলের মা রাজিয়া ষষ্ঠ ছেলের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। সাথে যায় ছেলেটিও। ইসমাইল মির্জাকে রাহেলা বিবি ফিরে যেতে দেননি নিজের বাড়িতে, ছেলেদের দোহাই দিয়ে জামাইকে এবাড়িতেই রেখে দেন তিনি। জামাইয়ের আবার বিয়েও দিতে চেয়েছিলেন রাহেলা কিন্তু ইসমাইল মির্জা রাজী হননি। ছেলেরা বড় হয়েছে, বড় ছেলের বিয়ে দিয়ে বৌ এনেছেন, সেই সংসার চালায়। ইসমাইল মির্জার ছেলেরা মামার বাড়িতে থাকার অপবাদ ঘোচাতে অন্যত্র উঠে যায় বাড়ি কিনে, সাথে যান ইসমাইল মির্জাও। ঠাকুর বাড়ির পেছনদিককার উঠোনের এই টিনের ঘরে থেকে যায় শুধু তার বড় ছেলে ও বৌ। ততদিনে গত হয়েছেন রাহেলা, বড় ঠাকুর গাফ্‌ফার, ছোট ঠাকুর মোমিন। বেঁচে শুধু মেজ ঠাকুর সাত্তার। তিনি বড় ভাগ্নেকে এবাড়ি ছেড়ে যেতে দেননি। ঘর নেই, থাকার অসুবিধে এই অজুহাতে অন্যরা উঠে গেলেও ইসমাইল মির্জার বড় ছেলে- বৌ থেকে যায় ঠাকুর বাড়িতেই।

ইসমাইল মির্জার এক বিশেষ স্থান ছিল ঠাকুর বাড়িতে। ইসমাইল মির্জা মানুষটি ছিলেন হাসি-খুশি। সারাক্ষণ নিজেও হাসতেন আর অন্যদেরও হাসাতেন নানা রকমের ঠাট্টা-তামাশা করে। বিপত্নীক ইসমাইল মির্জা নিজের একাকীত্ব দূর করার জন্যে বেছে নেন জুয়োকে। সন্ধের পরেই বসতেন জুয়ো খেলতে, তার জুয়ো খেলায় বাজীর টাকার উর্ধসীমা ছিল পাঁচ টাকা। নিম্নসীমাও পাঁচটাকা। ভেতরবাড়িতেই খাটের উপর বসে জুয়ো খেলতেন ইসমাইল মির্জা। পার্টিশনের ওপাশের রান্নাঘর থেকে চায়ের যোগান দিত তার ছেলের বৌ। মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে দু'হাতে চায়ের ট্রে নিয়ে শ্বশুরের সামনে এসে দাঁড়াত ইসমাইল মির্জার ছেলের বৌ, শ্বশুর আর তার জুয়ো খেলার সাথীদের জন্যে ট্রে'তে আছে চা আর নাশতা। তাঁর জুয়োর সাথীদের কোন বয়েসসীমা ছিল না। পয়সা হাতে নিয়ে যেই খেলতে আসত তার সাথেই খেলতেন, সে পাশের বাড়ির সমবয়েসী কেউ হোক বা ঠাকুরবাড়িরই কোন বাচ্চা ছেলে হোক। কার সাথে খেলছেন তার বয়েস দেখতেন না ইসমাইল মির্জা। জুয়োয় ইসমাইল মির্জার ভাগ্য ছিল খুবই খারাপ, হরবখতই হারতেন। কদাচিৎ জিততেনও না তা নয়। তবে বাজীর টাকার ব্যপারে মির্জা ছিলেন খুব কঠোর। যেদিন জিততেন সেদিনও ঐ পাঁচ টাকাতেই খেলা শেষ করে দিতেন সাথী খেলোয়াড়ের অনিচ্ছা সত্বেও। বলতেন, "যাও যাও, আর খেলতাম না!'

মির্জার খানিকটা জনপ্রিয়তা ছিল তার সত্যভাষণের জন্যে। মানুষটি সত্যবাদী ছিলেন, সত্য কথাটা কারো মুখের উপর বলে দিতে ভয় পেতেন না, সে শাশুড়ি রাহেলা বিবিই হন বা সবাই যাকে রীতিমত সমীহ করে চলে সেই বড় শালা গাফ্‌ফারই হন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর শাশুড়ি যখন তাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে বলেন, তখন মুখের উপর বলে দেন, "ঠাকুরবাড়িতে থাকি ঠিকই তয় আমি জাতে ঠাকুর না। দুইডা-চাইরডা বিয়া আমাগো খান্দানে কেউ করে না!' শাশুড়ি আর উচ্চবাচ্য করেননি। পারতপক্ষে কেউ তাঁকে ঘাটাতে চাইত না, জুয়োর নেশা থাকা সত্বেও লোকে তাকে সমীহই করত। কিছুদিন হল ইসমাইল মির্জাও এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরপারে গেছেন দূরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। পশ্চিমের এই উঠোনের বাসিন্দা বলতে এখন শুধু ইসমাইল মির্জার বড় ছেলে হারিস ও তার পরিবার। এই উঠোনের একেবারে শেষমাথায় এবাড়ির পায়খানা, গোসলখানা। কিছুদিন আগে পর্যন্ত জাহাঁ আরাও এই পায়খানা -গোসলখানা ব্যবহার করতেন। এখন তার ছোট ছেলে তার ঘরের কোণে উঠোনের উপরেই বানিয়ে দিয়েছে বাথরুম।

ঠাকুরবাড়িতে যা দু-একটা গাছ দেখতে পাওয়া যায় তা পশ্চিমের উঠোনে। হারিসদের ঘরের সামনে বারন্দার ঠিক নিচেই দুটো ঝাঁকড়া কুলগাছ, ঠিক যেন বাড়ির গেট। একটু দূরে একটা নারকেল গাছ, আর বারোয়ারি পায়খানার আশে পাশে বেশ কিছু মাচা, যাতে হারিসের বৌএর লাউ শিম কুমড়োর গাছ। ওদের ঘরের ঠিক উল্টোদিকে এবাড়ির গোয়াল, যতে একসময় থাকত দুধেল গাই, হালের বলদ। এখন সেই গোয়ালের একধারে রান্না করে এবাড়ির দ্বিতীয় জামাই এ টি এম শামসুজ্জামানের তৃতীয় পক্ষের বৌ সেলিমা, গোয়ালের অন্যধারে ডাই করে রাখা শুকনো কাঠ, যা দিয়ে সেলিমা রান্না করে, ধান সেদ্ধ করে। সেলিমা বৃদ্ধ শামসুজ্জামানের কিশোরী জায়া। শামসুজ্জামানের দ্বিতীয় পক্ষ এবাড়ির ছোট মেয়ে সিতারা বিবির শেষ সময়ের সেবিকা। অসুস্থ সিতারার বিবি ওরফে সেতুর দেখা শোনা করার জন্যে পাশের গ্রামের এই মেয়েটিকে রাখা হয়েছিল। সেতু চলে যান কিন্তু সেলিমা থেকে যায়। বৃদ্ধ শামসুজ্জামানের দেখা শোনা করারও তো কেউ চাই! ছেলে তো বৌ নিয়ে থাকে শহরে, সেখানে একদিনের অতিথি হওয়া যায় কিন্তু সেখানে গিয়ে বাস করা যায় না। উচ্চপদস্থ সরকারী চাকুরে ছেলে নুরুজ্জামান বাপের এই বিয়ে মেনে নিয়েছে, মাসে মাসে যেমন সংসার খরচ দিত বাবা-মা'কে, এখনও তেমনই দেয়। প্রতি মাসে একবার করে বাবাকে দেখে যায়, শুধু বছরে দু'বার ছুটি কাটাতে ছেলে বৌ নিয়ে আসাটা বন্ধ করেছে। নিজে যেমন আসত তেমনই আসে। এই শামসুজ্জামানের প্রথম পক্ষটি ছিলেন এবাড়িরই মেজ মেয়ে। তিনি বিয়ের কিছুদিন পরেই নি:সন্তান অবস্থায় মারা যান। শামসুজ্জামান তখনও এবাড়িতে ঘরজামাই হিসেবে থাকতে শুরু করেননি, নরসিংদীতে, নিজের বাড়িতেই থাকতেন, শ্বশুরবাড়িতে মাঝে মাঝে আসতেন যেতেন। নিজের বাড়িতেও তাঁর অবস্থা ভাল, নরসিংদীর বাজারে নিজের দোকান, প্রচুর জমি-জায়গা। সচ্ছল সম্পন্ন পরিবার।

এহেন শামসুজ্জামানের প্রেমে পড়ে তার বিবাহিতা শ্যালিকা। মেয়েকে সাথে নিয়ে স্বামীর সংসার ছেড়ে গ্যাট হয়ে বাপের বাড়িতে এসে বসে সিতারা বিবি ওরফে সেতু, মায়ের কাছে বায়না ধরে, স্বামীর ঘর করবে না সে! রাহেলা চেষ্টা করেন মেয়েকে বোঝানোর কিন্তু মেয়ে বুঝতে নারাজ। অগত্যা মায়ের হুকুম যায় মেজ ছেলে হান্নানের কাছে, সিতারা স্বামীর ঘর করতে চায় না, ব্যবস্থা কর! ব্যবস্থা হয়। পাকাপাকি ফিরে আসে সিতারা আর কিছুদিনের মধ্যেই ঘরনী হয় দুলাভাই ( জামাইবাবু) শামসুজ্জামানের। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই জন্ম নেয় একটি কন্যা সন্তান। প্রথম স্বামী এসে হাজির হয় কন্যার পিতৃত্বের দাবী নিয়ে, এদিকে শামসুজ্জামান ঘোষণা করেন এটি তাঁর কন্যা বলে! একে একে জন্ম নেয় আরও দুই ছেলে, এক মেয়ের। শামসুজ্জামান মাঝে মাঝে যেতেন নিজের বাড়ি, জমি-জমা সম্পত্তির হিসেব নিকেশ করতে। চেষ্টা করেছিলেন সিতারাকে নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে কিন্তু সিতারা একদিনের তরেও শ্বশুরবাড়ি যেতে রাজী হননি কখনও। সেই সিতারা মারা যাওয়ায় তার শূণ্যস্থান পূর্ণ করে সেলিমা।

শামসুজ্জামান থাকেন উঠোনের পূর্ব দিকের ঘরটিতে। এই ঘরের চালটি টিনের, দু কামরার ঘর। একটা ঘরে শামসুজ্জামান থাকেন দ্বিতীয়টি খালিই পড়ে থাকে, ছেলে-মেয়ে কেউ এলে থাকে। শামসুজ্জামানের একটি বৈঠকখানাও আছে, দক্ষিনের ভিটেতে যে টানা লম্বা টিনের ঘর তার অর্ধেক শামসুজ্জামানের বৈঠক বাকি অর্ধেক ছোট ঠাকুর অর্থাৎ মোমিন ঠাকুরের, যা এখন জেসমিনের ভাগে পড়েছে শাশুড়ি সঙ্গে থাকার সুবাদে। শামসুজ্জামানের ছোট ছেলে-বৌ বাড়ি এলে থাকে এই বৈঠকখানায়, বাদবাকি সময়ে তালাবন্ধ থাকে এই বৈঠক। এই ছেলেটি গান গায়। গান বাজনা তার সখই শুধু নয় পেশাও। কামরুজ্জামান একজন পেশাদার তবলাবাদক। রেডিও বাংলাদেশের ঢাকা কেন্দ্রে চাকুরী করে সে। বৌ সাবিনা আর দুই মেয়েকে নিয়ে ঢাকাতেই থাকে। মাঝে মধ্যে সে একদিন হঠাৎ করে উদয় হয় বাড়িতে। দু-তিনদিন থাকে। রাতদিন তবলা বাজায়, কখনও বা হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে মাঝরাতে গাইতে বসে রাগসঙ্গীত। সারাদিন তার কাছে বাড়ির কুচোদের ভিড় থাকে, ছোটদের সে তবলা বাজাতে শেখায়, সা রে গা মা দিয়ে হাতে খড়ি দেয় গানের। সারি দিয়ে বসে গান শেখে বাড়ির এমনকি আশে পাশের কচি কাঁচারাও। দু তিনদিন থাকে কামরুজ্জামান বাড়িতে তারপর আবার হঠাৎ করেই চলে যায়।

উঠোনের পশ্চিমের ভিটের বড় উঁচু দালানটি বড় ঠাকুর গাফ্‌ফারের। এখন এই দালানের বাসিন্দা তার পালিত পুত্র বেলাল বা বিলু। আট ছেলে দুই মেয়ের বাবা বেলালউদ্দিন ঠাকুর জীবনে কোনদিন কোন কাজ করেনি। শত বিঘের উপর জমি, বেশ কয়েকটি পুকুর আর বাপের রেখে যাওয়া এই শরিকি বাড়ি। ফসল যা আসত তা চার ভাগের তিনভাগ বিক্রী করে দিয়েও যা থাকত তা দিয়ে বারো মাসের খোরাকি ফেলে ছড়িয়ে হত। দরকার পড়লেই গোলা থেকেই ধান বের কর আর বিক্রী করে দাও! দক্ষিণের ভিটেতে যে লম্বা টানা টিনের ঘরটি আছে তার ঠিক লাগোয়া এদের একতলা পাকা বৈঠকখানা। ছাদের কার্নিশে সিমেন্টের কারুকাজ, জাফরি কাটা বড় বড় ঘুলঘুলি, ঘরের ভিতরে সিলিংএ লাল নীল হলুদ রংএর সিমেন্টের কারুকাজ, যা দেখতে অনেকটা আল্পনার মত, সেগুলো কলকাতার কারিগরের হাতের কাজ। শুধু এই কাজটুকু করার জন্যে তাদের কলকাতা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ঠিক একই রকমের কারুকাজ আছে বড় ঠকুরের দালানের গোটা সিলিং জুড়ে, দেওয়াল জুড়ে, দেড়তলার উপরের ঐ খাসকামরায়, যেখানে গাফ্‌ফার থাকতেন। এই পাকা বৈঠকে বসতেন বড় ঠাকুর। তার বৈকালিক আসর, তাঁর আড্ডা, তাঁর রাজনীতি, তাঁর বিচারসভা সব এই বৈঠকে বসে হত। ভারি ভারি কালো কাঠের হাতলওয়ালা সব চেয়ার, যেখানে এসে নেতারা বসতেন। লম্বা কতগুলো বেঞ্চ, এমনিতে যা একধারে সরানো থাকে, লোক এলে সেগুলো টেনে এনে বসতে দেওয়া হত কোন বিচারসভা যখন বসত।



- ৫ -

মুষ্ঠি মুষ্ঠি তুলি মুই কলমির শাক
দুনো হাতে মোর পরজাপতির পাখ
সে কি আইলো সই?

অ্যাবলায় (এখন) আসিবে মোর নাগর
দিয়া যাবে মোরে নাকের বেশর
সে কি আইলো সই?

অ্যাবলায় আসিবে মোর নাগর
দিয়া যাবে মোরে কোমরেরও বিছা
ও কি আইলো সই?
সে কি আইলো সই? ( মেছনী খেলা নাচের গান, জলপাইগুড়ি)




এশিয়ান হাইওয়ে ছেড়ে এক ছোট্ট পাকা সড়ক বাঁদিক ধরে খনিক এগিয়েই দু'দিকে দুই হাত ছড়িয়েছে। একটা হাত চলে যায় সোজা নরাইল গ্রামের ভেতর অন্য হাতটি নরাইল বাজার পেরিয়ে অটো ষ্ট্যান্ড পেরিয়ে এগোয় উত্তরে। দু পাশে বিস্তৃত ফসলের মাঠ, সবুজে সবুজ। ছোট্ট পাকা সড়ক ধরে এগোলে প্রথমেই পড়ে কালিকাপুর। এই সড়ক তারপরেও আরও খানিকটা এগিয়ে গিয়ে শেষ হয়েছে এক ছোট্ট নদীতে। সেখানে রাস্তার শেষ কিন্তু তারপরেও আছে লোকালয়, জনপদ। এই নদীর ওপারে যারা যাবেন তাদের পারাপারের ব্যবস্থা নৌকায়। কিছু নৌকাও এখান থেকে যাত্রী তুলে নিয়ে নদীপথ ধরে এগিয়ে চলে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, পৌঁছে দেয় যাত্রীদের তাদের গন্তব্যে। কিছু নৌকাও আছে শুধু এই নদীটুকু পারাপারের জন্যে। ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে কিছু সাইকেল রিকশা, কখনও বা একখানি অটো। কোন এককালে ইট বিছানো হয়েছিলো পাকা রাস্তা হবে বলে। ভাঙা চোরা কিছু ইট পড়ে আছে এখন সেদিনের সাক্ষী হয়ে। আমরা তো আর অতদূর যাব না, থামব কালিকাপুরে।

কালিকাপুরে যখন থেকে বিডিআরের ক্যাম্প হয়েছে তখন থেকে পুরো গ্রামেরই ভোল পাল্টে গেছে। গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে বাধানো ফলক, বিডিআর ক্যাম্প। রাস্তার দুপাশে যেন হঠাৎ করেই গজিয়ে উঠেছে এক ছোট্ট টাউন। ডানদিকে তৈরি হয়েছে এক কলোনী। হলুদ রঙের তিনতলা সব বাড়ি, বিডিআর এর কোয়ার্টার। প্রতি বছরই রং করা হয় বলে বাড়িগুলো সব সময়েই ঝকঝক করছে। প্রতিটা বাড়ির সামনেই রঙবাহারী ফুলের বাগান। ছোট্ট সরু এক রাস্তা এগিয়েছে বাড়িগুলোর সামনে দিয়ে, রকমারি ফুলে ফুটে থাকে বারোমাস সেই রাস্তার ধারের গাছগুলোতেও। কলোনী পেরিয়ে গেলে চোখে পড়ে বড় বড় বেশ কয়েকটি বাড়ি, যার সামনে রাস্তার পাশে বোর্ডে বড় বড় করে লেখা আছে, প্রবেশ নিষেধ। আপাদমস্তক ইউনিফর্ম পরা রক্ষী থাকে সর্বদাই সেখানে। বিডিআরের এই ক্যাম্প, কোয়ার্টার গ্রামের একধারে তৈরি হয়নি, গোটা গ্রাম জুড়েই ছড়িয়ে আছে তারা। খানিক দূরেই ঝকঝকে কলেজবাড়ি। তার ওপাশে তেমনি ঝকঝকে পাকা স্কুলবাড়ি। ছেলেদের মেয়েদের আলাদা স্কুল।

বিডিআরের কলোনী আর তাদের ক্যাম্পের ঠিক মাঝখানটিতে জেসমিনদের বাড়ি। পাকা সড়কের বাঁদিকে রাস্তার ঠিক ধারেই জেসমিনদের বাড়ির সীমানা নির্দিষ্ট করা শোলার (পাটখড়ির) বেড়া। বেশ কয়েকটি টিনের ঘর আর একখানি পাকা বাড়ি রাস্তা থেকেই চোখে পড়ে। জেসমিনের বাপের বাড়ি সম্পন্ন চাষী পরিবার। দু'তরফে মিলিয়ে জেসমিনরা এগার ভাই বোন। বড় এবং ছোট দু তরফই বর্তমান আর দু'জনে মিলে মিশে বেশ সুখের সংসার। জেসমিনের দুই মায়ের মধ্যে যে ঝগড়া ঝাটি হয় না তা নয় তবে সেই ঝগড়া বা ঝগড়ার রেশ কখনই ভেতর বাড়ি ছাড়িয়ে বার বাড়ি অব্দি পৌঁছায়নি। বাড়ির পুরুষদের তাই এসব নিয়ে মাথা ঘামাতেও হয়নি। এক হেঁশেলে রান্না হয় বরাবর। দু গিন্নিতে মিলে মিশেই করেন সংসারের যাবতীয় কাজ। একজন আঁতুড়ে গেলে আরেকজন সংসার সামলান। না। এসব নিয়ম কাওকে তৈরি করে দিতে হয়নি, নিজেদের সুবিধার্থে আপনা থেকেই তৈরি হয়ে গেছে অলিখিত কিছু নিয়ম। জেসমিন বড় তরফের ছোট মেয়ে। দু ভাই দু বোনের মধ্যে জেসমিন ছোট। ছোটমাকে জেসমিন জন্মের পর থেকেই দেখে এসেছে, ছোট আম্মা বলে ডাকতে শিখেছে সেই জ্ঞান হওয়া অব্দি। কখনোই তাঁকে সৎমা বলে মনে হয়নি জেসমিনের। সৎবোন শরীফা জেসমিনের প্রায় সমবয়েসী, মাস ছয়েকের মাত্র ছোট। দুই বোনেতে বেশ ভাব, অনেকটা সখীর মত। একসাথে স্কুলে যাওয়া, একই ক্লাশে পড়া, এক ঘরে থাকা।

এবাড়ির ছেলে-মেয়েরা এই পুরুষেই প্রথম স্কুলের মুখ দেখে। বিডিআরের কল্যাণে কালিকাপুরে কলেজ তৈরি হয় আর জেসমিনদের ভাই-বোনেরা বড় অনায়াসেই স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে ঢুকে পড়ে। জেসমিনের বাবা এই সেদিনও নিজেই লাঙল চালিয়ে হাল চাষ করতেন। বাঁশের খুঁটে থালা দিয়ে ঢাকা দেওয়া ছোট অ্যালুমিনিয়ামের গামলায় ভাত ও তরকারী গামছায় বেধে নিয়ে মাঠে চলে যেতেন সারাদিনের জন্যে। দরকারমত মুনিষ নিতেন তবে তারাও বাইরের কেউ নয়, নিজেরই ভাই ভাতিজা ( ভাইপো)। নিজেরে ছেলেরা স্কুলে যায় তবে সময় পেলেই তারাও বাপের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ক্ষেতের কাজ করে। পৈত্রিক সুত্রে প্রাপ্ত জমি জিরেত ছাড়াও কিছু জমি নিজেও কিনেছেন সলিমুল্লাহ। ফসল যা হয় তাতে একটানা দু'বছর চলে যাওয়ার কথা। বছরকার মত রেখে দিয়ে বাদবাকি বেচে দিয়ে সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটান সলিমুল্লাহ। বড় ছেলে এখন আবার মাছের কারবার শুরু করেছে। নিজেদের গ্রাম ছাড়িয়েও অন্যান্য গ্রামের পুকুর লীজ নেয়, বড় জাতের মাছের পোনার চাষ করে। ডিম থেকে রেনু ফোটায়, সেই রেনু খানিকটা বড় হয়ে মাছের আকার নেওয়ামাত্রই বেচে দেয় আন্যান্য কারবারিদের। নগদ রোজগার এতে বড় কম হয় না। সচ্ছল সলিমুল্লাহর সংসারে প্রাচুর্য আসে।

শফি এবাড়িতে প্রথম আসে মাছের খোঁজে। বরকউল্লাহ'র পুকুরের চারা মাছ কিনে নিজের পুকুরে ছাড়বে বলে একদিন জেসমিনদের বাড়িতে এসে হাজির হয় ঠাকুরবাড়ির ছোটকর্তা মোমিন ঠাকুরের মেজছেলে শফি। স্কুলের শেষক্লাসে পড়ুয়া জেসমিন তখন স্কুলে যাবে বলে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিল। শফি তাকেই জিজ্ঞেস করে বরকতউল্লাহর কথা। মেয়েদের স্কুলে পড়া অজ পাড়াগাঁ কালিকাপুরের কিশোরী জেসমিন অভ্যস্ত নয় পরপুরুষের সাথে কথা বলায়। অপরিচিত পুরুষের সাথে কথা বলতে গিয়ে অকারণেই লজ্জা পায় জেসমিন। মাথা নিচু করে যতটা সম্ভব নিচুস্বরে বড় ভাইয়ের খোঁজ দিয়ে একরকম পালিয়েই যায় জেসমিন শফির সামনে থেকে। শফি তাকিয়ে থাকে জেসমিনের দিকে, যতক্ষণ জেসমিনকে দেখা যায়। বোঝল্যা? বরকতউল্লাহকে শফি পেয়ে যায় বাড়িতেই। মাছও কেনা হয়। কিন্তু জেসমিনদের বাড়িতে শফির যাওয়া আসার শেষ হয় না। সেই ছিল শুরু। এর পর থেকে কারণে অকারণে, সময়ে অসময়ে শফি বারে বারেই গিয়ে হাজির হয়েছে জেসমিনদের বাড়ি। শফির এই আসা যাওয়ার কারণ বুঝতে কারোরই অসুবিধে হয়নি কারোরই, ঠাকুরবাড়ির ছেলে হিসেবে বরাবর সমাদরই পেয়েছে বাড়ির সকলের কাছ থেকে। দু'বারে ইন্টার পাশ শফি বড় সহজেই জেসমিনের প্রাইভেট টিউটর নিযুক্ত হয়ে ভেতরবাড়িতে একেবারে জেসমিনের ঘরে গিয়ে হাজির হয়।

জেসমিনেরও অপছন্দ ছিল না শফি। পড়ার বইয়ের মধ্যে শফির গুজে দেওয়া চিঠি শিহরন জাগায় কিশোরী জেসমিনের দেহ মনে। ছোট বোন শরীফার সাথে আলোচনা করে জেসমিন শফি আর তার চিঠি নিয়ে। শরীফা মারফত খবর পৌঁছয় দুই মায়ের কাছে অত:পর সলিমুল্লাহর কাছে। সলিমুল্লাহ পরামর্শ দেয় বড় গিন্নিকে, আসা যাওয়ায় বাধা দিও না কিন্তু নজরে রেখো, যেন মস্তানি করে বেরিয়ে না যায় ঠাকুরগো এই পোলা! বরকতউল্লাহ কিজ্ঞেস করে শফিকে, "কি মিঞা, মতলবডা কি তোমার?' বলে, তারা জাতে গৃহস্থ ( চাষী) কিন্তু গরীব নয়। আল্লাহর দয়ায় টাকা পয়সা কিছু তাদেরও আছে আর সমাজে মান সন্মানও আছে সেই সুবাদে। শফি হইতে পারে ঠাকুর বাড়ির ছাওয়াল কিন্তু তাদের মান সন্মান নিয়ে খেলা করার চিন্তা যদি মাথায় থেকে থাকে তবে তা যেন এখুনি মাথা থেকে বের করে দেয়। শফি নিজের বিয়ের প্রস্তাব দেয় বরকতউল্লাহকে। গৃহস্থ ঘরের মেয়েকে বিয়ে করতে চায় শুনলে বাড়িতে যে অশান্তির ঝড় বইবে সে সম্পর্কে শফি ভাল করেই অবগত আছে তাই চায় আগে বিয়েটা করে পরে জানাতে কিন্তু সব কথা ভাঙে না বরকতউল্লাহ'র কাছে, বলে, "বড় ভাইয়ের এখনও বিয়ে হয়নি এর মাঝে আমি বিয়ে করতে চাই শুনলে বাড়ি থেকে আপত্তি করব কাজেই আপনারা যদি অমত না করেন তবে আমি বিয়া কইরা তারপরে বাড়িতে জানামু!' বরকতউল্লাহ ভাল মন্দ কিছুই বলে না শফিকে, পরে জানাবে বলে তখনকার মত বিদায় দেয় শফিকে আর বিদায় দেওয়ার আগে বলে দেয়, "এখন আর তোমার পড়াইতে আসা লাগব না জেসু'রে, বা'জানে কি কয় শুনি আগে।'

বিয়ে হয়ে যায় জেসমিন আর শফির। প্রথমে একটু আপত্তি করেছিলেন সলিমুল্লাহ কিন্তু দুই বিবি আর বড় ছেলের মত ছিল বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পক্ষে। এমন প্রস্তাব পরে আর পাওয়া যাবে না বলে তাদের অভিমত। শফি যদিও কোন চাকরী করে না কিন্তু ঠাকুরবাড়ির ছেলের যে চাকরী না করলেও চলে তা সলিমুল্লাহ'র অজানা নয়। পাড়ার দু-চারজন প্রতিবেশী আর ঘনিষ্ট কিছু আত্মীয়ের উপস্থিতিতে অনাড়ম্বর পরিবেশে জেসমিন কনে সাজে সেজে ওঠে আর কবুল করে শফিকে। নিকটস্থ শহর থেকে কিনে আনা সস্তার লাল শাড়ি আর মায়ের গায়ের গয়নায় সজ্জিত জেসমিন নিজেকে রাজেন্দ্রানী বলে মনে করে। বিয়েতে শফির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিল শফির কয়েকজন বন্ধু। বিয়ে হয়ে যায়, বাসরও হয়। বাড়িতে খবর যায় শফি বন্ধুর বিয়েতে দূরে কোথাও গেছে, ফিরতে ফিরতে দু'দিন। গোটা ব্যাপারটিতেই সলিমুল্লাহ'র সায় ছিল না খুব একটা। এভাবে মেয়ের বিয়ে দেওয়া, মেয়ের এখনই শ্বশুরবাড়ি না যাওয়া সবকিছুই কেমন যেন অস্বস্তিকর বলে মনে হতে থাকে তার কিন্তু "সকলের যখন মত তখন আমি আর কি বলব, আল্লাহ মালিক' এই ভেবে শেষ অব্দি চুপ থাকেন তিনি।

এর পরের ঘটনাপ্রবাহে কারোরই কোন হাত ছিল না। কানাঘুষো হতে হতে শফির বিয়ের খবর ঠাকুরবাড়িতে পৌঁছেই যায়। জেরায় জেরায় শফি স্বীকারও করে বিয়ের কথা। মোমিনগিন্নি গুম মেরে থাকেন দু'দিন। অবশেষে সকলের পরামর্শে কালিকাপুরের গৃহস্থদের ঐ মেয়েকে মেনে নেওয়ারই সিদ্ধ্বান্ত নিয়ে একদিন বিনা নোটিশে গিয়ে হাজির হন সলিমুল্লাহ'র বাড়ি। রাবেয়া খাতুন দেখেন, মেয়েটি বড় কালো! লজ্জায় সংকোচে আধোবদন জেসমিনকে প্রথম দেখায় অপছন্দই করলেন রাবেয়া। তাঁর থমথমে মুখ দেখে সেকথা বুঝতে কারোরই বাকি রইল না। বড় বাড়ির ছোটগিন্নি সলিমুল্লাহকে বললেন, "আমার বড় ছেলের তো এখনও বিয়ে হয়নি আর বড়কে রেখে মেজর বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছেও আমাদের ছিল না কিন্তু বিয়ে যখন হয়েই গেছে বৌকে তো আর বাপের বাড়ি ফেলে রাখতে পারি না। সেটা আপনার জন্যেও সন্মানজনক না। এমনিতেই তো পোলার মা-বাপ আত্মীয়-স্বজন ছাড়া খালি পোলারে দেইখ্যা মাইয়া বিয়া দিসেন। আপনি মেয়ে বিদাইয়ের ব্যবস্থা করেন!' চুপ করে সলিমুল্লাহ শোনেন ঠাকুরবাড়ির ছোটগিন্নির কথা। নিজের মুখে কথা যোগায় না তার। কিছু বলার মুখ তো সত্যিই নেই! তবুও সলিমুল্লাহ জানতে চান, "দেনা পাওনা? আপনেগো কোন দাবী দাওয়া কি আছে?' "আপনার মেয়েকে যা দেওয়ার দেবেন সে নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই,' বলেন রাবেয়া। বৌ তুলে আনার দিন ক্ষণ ঠিক করে রাবেয়া ফিরে আসেন। চোখে তখনও ঘুরে বেড়ায় কালোপানা মেয়েটি।

রাবেয়া খাতুনের ঘরের লাগোয়া ছোট কুঠুরিতে জেসমিন এসে ওঠে। শাশুড়ির দেওয়া লাল বেনারসি আর গয়নায় ঝলমল করে জেসমিনের শ্যামলা মুখ। হাতে মেহেদীর নক্‌শা পায়ে আলতা পরা জেসমিন ছোট ছোট পা ফেলে ঢোকে ঠাকুরবাড়িতে। গেটের মুখে এগিয়ে যান জাহাঁ আরা, বলেন, "নতুন বৌ পায়ে হেঁটে ঢুকছে প্রথমবার? ও শফির মা, তুমি কি নিয়ম নীতি সব ভুইল্যা গেলা? জাহেদী ও জাহেদী তুইই বা অমন চুপ কইরা খাড়াইয়া রইছস কিয়ের লাগি? বৌরে কোলে তোল!' বরাবরের নিয়ম মত এগিয়ে যায় জাহেদী আর দু হাতের মধ্যে তুলে নেয় গুটিসুটি নতুন বৌকে। অন্যান্য সব বৌদের মত জেসমিনও জাহেদীর কোলে চেপেই প্রবেশ করে ঠাকুরবাড়িতে। উত্তরভিটের দালানের সামনে এনে বৌকে নামিয়ে দেয় কোল থেকে, বৌএর কানে কানে বলে," চুপ কইরা খাড়াও এইখানে, বহুত ক্যাচাল আছে বড় বাড়ির মাইনষের!' কুলোয় করে ধান দুব্বো নিয়ে আসেন রাবেয়া। বড় থালায় অল্প জল ঢেলে জেসমিনের পায়ের সামনে রাখেন জাহাঁ আরা। খানিকটা ধান দুব্বো বৌএর মাথয় ছিটিয়ে দেন রাবেয়া আর বাদবাকি ঢেলে দেন সামনে রাখা থালায়। জাহেদী নিয়ে এসেছে চিনির কৌটো, একথালা চিনি সে বৌয়ের গায়ে মাথায় ছড়িয়ে দিয়ে বলে, "চিনির মতন মিডা হইয়াই থাইকো বৌ তুমি আমাগো লগে।' জাহাঁ আরা বলেন, "হইসে তো আর কতক্ষণ বৌ খাড়াইয়া থাকবো? শফির মা বৌ তোলো!'


শাশুড়ির কথামত ডান পা আগে থালায় রাখে জেসমিন তারপরে বাঁ পা। ধানদুব্বো আর জলভর্তি থালা থেকে জেসমিন পা রাখে দালানের সিঁড়িতে। দুই শাশুড়ি দু হাত ধরে বৌকে নিয়ে যান ঘরের দিকে। বৌ তোলা দেখতে আসা আশে পাশের মেয়ে বৌদের জাহাঁ আরা বলেন, তোমরা সব একটু পরে এসে বৌ দেখে যেও, এখন বৌ একটু জিরোক। পেছন পেছন শফিও ঢোকে ঘরে। পারিবারিক ঘিয়ে রঙের শেরওয়ানি, সাটিনের পাজামা আর মাথায় কারুকাজ করা পাগড়িতে সুপুরুষ শফিকে দেখতে লাগে ঠিক যেন কোন এক রাজপুত্র। মেঝের উপর পাটি পেতে তাতে রাবেয়া বিছিয়েছেন লাল মখমলের চাদর, যার উপর জেসমিন এখন বসে আছে লম্বা ঘোমটায় মুখ ঢেকে। জাহাঁ আরার হুকুমে শফি গিয়ে বসে জেসমিনের পাশে। বৌ দেখতে আসা মেয়ে বৌ আর বাচ্চা কাচ্চায় তখন ঘর ভর্তি। রাবেয়া এসে বৌএর মুখের ঘোমটা সরিয়ে দেন। চিবুক ধরে মুখ তুলে ধরেন। চোখ বন্ধ করে রাখে জেসমিন। আগে থেকে তৈরি করে রাখা দুধের শরবত খাইয়ে দেন ছেলে-বৌকে আর তারপরে হুকুম করেন, "ঐ তোমার চাচি শাশুড়ি, কদমবুচি কর।' জাহাঁ আরা একশ এক টাকা গুজে দেন জেসমিনের হাতে, মুখ দেখাই। একে একে বাড়ির সকল বড়দের কদমবুচি করে জেসমিন। সকলেই মুখ দেখাই দেয়। নতুন বৌ সালাম করে জাহেদীকেও। আঁচলের খুট থেকে মলিন একখানি দশ টাকার নোট বের করে বৌএর মুখ দেখাই দেয় জাহেদী।





- ৬ -

আমার খেইল মারিলি,
কুল বনে গাড়িলি,
শিয়ালে খায় শকুনে খায়
গন্ধে গন্ধে পরাণ যায়।
এ ডাকে মারুম না
ফির‌্যা ডাকে ছাড়ুম না।
দেও মনি কেমুন খেলা,
দশ বারোডা মইর‌্যা ফালা। ( বৌ-বসান্তি খেলা, ঢাকা)




"জন্ম হউক যথা তথা কর্ম হউক ভাল' । লাল নীল সবুজ সুতোর কারুকাজে বড় বড় হরফে লেখা শব্দগুলো। বাধানো সূচীশিল্পটি কে কবে দেওয়ালে টাঙিয়েছিল বিলু তা জানে না তবে কেন টাঙিয়েছিল আর তারই ঘরে কেন এই কথাগুলো টাঙানোর দরকার পড়েছিল সেটি বিলু জ্ঞানবয়েস থেকেই জানে। "বেজন্মা' "জারজ' "জন্মের ঠিক নাই' শব্দগুলো বিলু সেই ছেলেবেলা থেকেই শুনে অভ্যস্ত। যখন বুঝত না তখন সে ঝগড়া করত যারা বলছে তাদের সাথে। মারামারিও করত। কিন্তু রোগা দেহে সে মারামারিতে কখনও জিততে পারত না। মার খেয়ে মুখ চোখ ফুলিয়ে বাড়ি ফিরত আর তাদের ঐ রেলিং দেওয়া খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদত। "মাই' এসে প্রথম প্রথম জানতে চাইত কি হয়েছে, কে মেরেছে। পরে আর জানতেও চাইত না, শুধু বলত, কেন তুই ঝগড়া করিস বাপ! সত্যিই তো! কেন বিলু ঝগড়া করে মারামারি করে ঐ শব্দগুলো শুনে? একসময় বিলু নিজে থেকেই বুঝে যায়, তাকে সারাজীবন এই কথাগুলো শুনে যেতে হবে, সইতে হবে, এই শব্দগুলোকে নিয়েই তাকে বাঁচতে হবে, ঘরে টাঙানো ঐ "বাঁধানী'র মত ঐ শব্দগুলো ও তার জীবনের অঙ্গ। তখন থেকে বিলু আর ঝগড়া করে না কারও সাথে, মারামারিও করে না। স্কুলে গিয়ে লাষ্ট বেঞ্চে একা বসে, সবার শেষে ক্লাশে ঢোকে আর ছুটি হলে সবার আগে বেরিয়ে আসে। বিলুর কোন বন্ধু নেই। ছেলের দল যে তার সাথে কথা বলে না বা খেলে না তা নয়। কথাও বলে আর খেলেও। কিন্তু খেলতে গিয়ে সবাই তাকে ইচ্ছে করে হারিয়ে দেয় আর প্রতিবাদ করলেই ঐ শব্দগুলো তাকে শুনতে হয়। বিলু তাই খেলতে যায় না, কারো সাথে কথা বলে না।

ক্লাশ সেভেনে ওঠার পর বিলু একদিন বাড়িতে ঘোষণা করে, সে আর স্কুলে যাবে না। পড়ালেখা করবে না। আফিমের নেশায় ঝিম মেরে পড়ে থাকা প্রায় বৃদ্ধা মা প্রথমে খেয়াল করেন না। কিন্তু পরপর কয়েকদিন বিলুকে স্কুলে যেতে না দেখে একদিন জিজ্ঞেস করেন, "কি হইসে বাপজান, স্কুলে যাও না ক্যান?' বিলু চুপ করে থাকে। রাহেলা খাতুন বারে বারে জিজ্ঞেস করেও কোন জবাব না পেয়ে চিন্তিত মুখে উঠে যান। খবর যায় দোতলায়, গাফ্‌ফার ঠাকুরের কাছে। তিনি এসে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ছেলেকে জিজ্ঞেস করেন, কি হয়েছে? স্কুলে কেন যাও না? ক'দিন ধরেই ভেতরে জমতে থাকা রাগ, ক্ষোভ একসাথে বেরিয়ে আসে বিলুর। প্রচন্ড জোরে চেঁচিয়ে ওঠে, "কেন স্কুলে যাই না, যাব না তুমি জান না? সৎমায়ের লগে ঘুমাইয়া আমারে পয়দা করস, হেইডা কি তুমি ভুইল্যা গেসগা? তুমি ভুললেও মাইনষে ভুলে নাই, আর আমারেও হেরায় ভুলতে দিব না! জারজ, বেজন্মা হেরায় আমারে কয় আর কইব। আমি যামু না আর ইশকুলে, তুমি কি করবা কর গিয়া।' বলেই আবার উপুড় হয়ে শোয় আর কাঁদতে থাকে বুক নিংড়ানো কান্না। গাফ্‌ফার কিছুক্ষণ বসে থাকেন ছেলের পাশে, মুর্তির মত স্থির হয়ে। ওঘরে রাহেলাও তেমনি বসে, চুপ আর স্থির। উঠোনে ধানের কাজ করতে থাকা কাজের বৌ ঝি'রা এগিয়ে এসেছিল চীৎকার শুনে কিন্তু ঠাকুর সাহেবকে বসে থাকতে দেখে কারোরই সাহস হয় না দাঁড়িয়ে তামাশা দেখার, সবাই ফিরে যায় যে যার জায়গায়।

পরেরটা শুন,রাহেলা আগেও সংসার, ছেলে-মেয়ে নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না আর এখন বিলুর স্কুল ছেড়ে বাড়িতে বসার পর থেকে একেবারেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছেন সবকিছুর থেকে। মেয়েরা সব উঠোনের এপাশে ওপাশে তাদের জামাইদের নিয়ে থিতু। তাদের সংসার তারাই সামলায়। শেষ বয়েসের সন্তান বিলুকে নিয়েই যা একটু চিন্তা ভাবনা ছিল, এখন আর তাও নেই। বুঝে গিয়েছেন যে তাঁর হাতে আর কিছুই নেই, কিছুই করার নেই তাঁর আর। মনে মনে তাই খোদার পায়েই সঁপে দিয়েছেন বিলুকে, জন্ম দেওয়ার পরে মানুষ করার যে দায় তাঁর ছিল, এভাবেই তিনি তা সারতে চেয়েছেন। বৌগুলো ভালো, মুখে কিছু বলে না। শাশুড়ি বলে যথেষ্টই মান্যি গন্যি করে, জিজ্ঞেস না করে উনুনে হাঁড়িও চাপায় না। এটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চান রাহেলা খাতুন। এককালের জাঁদরেল ঠাকুরাইন এখন আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন সর্বক্ষন। ভুলে যেতে চান সবকিছু।

স্কুল ছাড়ার পর কিছুদিন বিলু বাড়িতেই থাকত, কোথাও বেরুতো না। কিন্তু বিছানায় শুয়ে শুয়ে আর ক'দিন কাটে! বিলু ঘর থেকে বেরিয়ে বার বাড়িতে গেল। ভেতর বাড়ির বিছানা ছেড়ে বার বাড়ির বিছানা নিল, যেখানে ঠাকুরবাড়িরই আরও ছেলে পিলেরা এসে আড্ডা দিতে শুরু করল বিলুর সাথে। বয়েসে এরা সবাই বিলুর থেকে ছোট আর সকলেরই পড়াশোনা আছে, স্কুল আছে। সারাদিন ওরা থাকতে পারে না, স্কুলের পরে যেটুকু সময় পায় সেটুকুই। আর ছুটির দিনে। বিলু একলা বসে তাস খেলে, পুকুরে গিয়ে স্নান করে, আবার এসে তাস খেলে। তিন পাতার খেলা। একটা সময়ে দেখা যায় বিলুর বেশ কিছু সঙ্গী জুটেছে। তাস খেলার সঙ্গী। বাংলা ঘরের বিছানায় শুয়ে বসে বিলু আড্ডা দেয়, তাস খেলে। চার আনা আট আনার জুয়ো খেলাও শুরু হয়। সাহেব বিবি গোলামেরা নানা রঙে রং ছড়ায় বিলুর জীবনে। আড্ডা আকারে বাড়ে, বয়েসে বড়রাও এসে যোগ দেয় বিলুর তাসের আখড়ায়। দোতলা থেকে নেমে এসে মাঝে মাঝেই গাফ্‌ফার দেখে যান এই আড্ডা, কিছু বলেন না, কখনও খানিক দাঁড়িয়ে দেখেন কখনও বা শুধু দেখেই চলে যান। গাফ্‌ফারের সাড়া পেলে বিলুর সাথীদের হাত থেকে তাস পড়ে যায়, পয়সার হিসেবে ভুল হয়, খেলা থেমে যায়। বাপের সামনেই বিলু হাঁক দেয়, কি হইল? খেল!

মাথায় বেশ লম্বা হয়েছে বিলু। আঠেরো বছরের বিলু গায়ে গতরে রোগা-দুবলা হলেও মাথায় ছ'ফুট ছাড়িয়েছে বাপ-চাচার মতই। যদিও গায়ের রং ঠাকুরদের মত ফর্সা নয়। রোগা, কালো, ঢ্যাঙা Ïবিলুর সম্পর্কে লোকে বলে "হারামের পয়দা, বদসুরৎ তো হইবই!' এসব কথা গাফ্‌ফার সাহেবের কানে আসে না তা নয়, আসে। তিনি শোনেন আর মুখ বুজে থাকেন। বিলুর রং আর স্বাস্থ্য নিয়ে গাফ্‌ফার মাথা ঘামান না বরং বিলুর এই কালো রং আর রোগা চেহারা দেখে খানিকটা হলেও স্বস্তি পান, বিলুকে দেখে কেউ অন্তত তাকে ঠাকুরদের বংশধর বলতে পারবে না! কিন্তু এই স্বস্তি খুব বেশিক্ষণ থাকে না, খানিক পরেই আবার মাথায় আসে, বেজন্মা, হারামের পয়দা শব্দগুলো। বিলুর আচমকা পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে শুয়ে বসে কাল কাটানো, জুয়োর আড্ডা আর বেয়াড়াপনা রাতের ঘুম কেড়ে নেয় ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফারের । এভাবে চলতে দিলে উচ্ছন্নে যাবে ছেলে। রাহেলার সাথে কোন পরামর্শ করা বৃথা, রাহেলার এখন দিন রাতের হুঁশও নেই। জাহাঁ আরাকে ডেকে পাঠান একদিন, দরজার ওপাশে পর্দার আড়ালে জাহাঁ আরার উপস্থিতি বুঝতে পেরে বলেন, বিলুরে লইয়া কি করি কও তো! মৃদু স্বরে পর্দার ওপাশ থেকে জবাব আসে, বড়ছাব, বিয়া করাই দেন, সংসার হইলে মতি ফিরব। গাফ্‌ফারের মনে ধরে প্রস্তাব, বলেন, দেখি চিন্তা ভাবনা কইরা, হান্নুরেও জিগাই। চিন্তা ভাবনা করে বিলুর বিয়ে দেওয়াই সাব্যস্ত করেন গাফ্‌ফার, চিঠি লেখেন ছোট ভাইকে। এক মাস পরে চিঠির উত্তর আসে, তিনি যা ভাল মনে করেন, তাই যেন করেন। ডাক পড়ে ঘটকের, নির্দেশ পায় ঘটক, মেয়ে যেন অবশ্যই সুন্দরী হয়, আর কাছে পিঠে মেয়ের খোঁজ না করাই ভাল, দূরদেশে যেন ঘটক মেয়ের খোঁজ লাগায়। হাত কচলে ঘটক জিজ্ঞেস করে, বড়সাব, বংশপরিচয় কি দিমু? খানিক চুপ থেকে গাফ্‌ফার বলেন, আমার পালিত সন্তান!

এ এক মজার খেলা। সদ্য কৈশোর পেরুনো বিলু সারাদিনমান বুঁদ এই খেলায়। বিলুর খেলার স্থান বদলেছে, খেলার সাথীও বদলেছে। নতুন সাথী পেয়েছে বিলু। জারিনা। বিলুর খেলার নতুন সাথী। অসামান্য রূপসী জারিনা বৌ হয়ে ঠাকুরবাড়িতে এসেছে এই ক'দিন হল। পশ্চিমের দালানের ভেতরের ঘরে জারিনা থাকে। এঘরে আগে থাকতেন রাহেলা, এখন তিনি সামনের ঘরে চলে গেছেন। রেলিং দেওয়া কারুকাজ করা কালো কাঠের খাটেরও জায়গা বদল হয়েছে, সামনের ঘর থেকে এই খাটও এসেছে বিলুর সাথে সাথে। ঘরের লাগোয়া নতুন স্নানঘরে তৈরি হয়েছে নতুন বৌএর জন্যে। পাশাপাশি দুটো ছোট ছোট ঘরের একটিতে এক কোনায় বসেছে এক টিপকল, এটি স্নানঘর। পাশেরটি পায়খানা। নতুন বৌ জারিনা নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে মাঝে মাঝেই পাশের ঘরে আসে, যে ঘরে থাকেন দাদিশাশুড়ি, রাহেলা। হ্যাঁ। জারিনা জানে এই তার দাদিশাশুড়ি, যাকে তার স্বামী "মাই' বলে ডাকে। মাতৃহীন বিলুকে ইনিই মানুষ করেছেন। জারিনা মাঝে মাঝে এসে কথা বলার চেষ্টা করে "মাই'এর সাথে কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই কথা বলার মতন অবস্থায় থাকেন না। রাঙা তাঁতের শাড়ি আটপৌরে করে পরা, ছোট করে টানা ঘোমটা, দুই হাত ভর্তি পাঁচমিশেলী রঙীন কাঁচের চুড়িতে, কোমরে বিছে আর নুপুর পরা পায়ে রুমঝুম রুমঝুম শব্দ তুলে জারিনা গিয়ে দাঁড়ায় বারান্দায়, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে ঠাকুবাড়ির ঘরগুলোকে, মানুষগুলোকে। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, বিলু এসে পেছন থেকে আঁচল ধরে টানে। চকিতে এদিকে ওদিক তাকিয়ে দেখে জারিনা,কেউ দেখে ফেলল নাতো!

বছর ঘুরতেই জারিনার কোলে ছেলে আসে। বিলু এখন আর বারবাড়িতে তাস খেলতে যায় না। ছেলে হওয়ার আগের কিছুদিন জারিনার বেশ শরীর খারাপ যাচ্ছিল। বিছানতেই শুয়ে থাকত প্রায় সারাদিন। বিলু নিজের নাওয়া খাওয়া ভুলে বৌএর শিয়রে বসে থেকেছে, হাতে করে খাইয়ে দিয়েছে ওষুধ,পথ্য। বৌএর এই সেবা করা নিয়ে আড়ালে লোকজন বেশ হাসি-মশকরা করে সেটা বিলু বুঝতে পারে কিন্তু পরোয়া করে না। বিলুর ছেলের জন্মের কিছুদিন পরেই অসুস্থ হয়ে পড়েন রাহেলা। তবে গাফ্‌ফার নিশ্চিন্ত হয়েছেন বিলুর বিয়ে দিয়ে, ভেতরবাড়ি নিয়ে এখন আর খুব একটা মাথা ঘামান না। মন দিয়েছেন আবার রাজনীতিতে। বারবাড়িতে লোকজনের আনাগোনা বেড়েছে, প্রতিদিনই বিকেলে জমায়েত বসে। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। ভোট, পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তান, শেখ মুজিব আর মুসলিম লিগের আলোচনায় আবার মগ্ন হন ঠাকুর আব্দুল গাফ্‌ফার ।



(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)