আপনার মতামত         


রাজকন্যার ডাইনিজীবন
অধীশা সরকার


--


রাতের চন্দ্রাহত জানালায় একফালি নরম কলজে রেখে এসেছি। জানালা বন্ধ করেছি ঠিকঠাক। এখন ভোরের অপেক্ষায় অ্যাশট্রে জ্বলছে নিভছে। জানলায় রেখে আসা কলজের টুকরোটায় আমার ইতিহাস কতখানি মিশে আছে, আর কতখানি তাতে এ শহরের স্বাদ- গন্ধ- রং, তা জানি না।

শুধু মনে পড়ে জেসিকা আমাকে বলেছিল- সাধারণ মেয়েরা ভাল থাকে, খারাপ থাকে। ডাইনিরা শুধু জেগে থাকে। চিরকাল। অনন্তকাল।।

তাদের জেগে থাকার আগুনে পুড়ে যায় এক একটা শহর, এক একটা সভ্যতা। ফিনিক্স পাখির মত তারাও পোড়ে সেই সঙ্গে। তাদের শরীরগুলো জ্বলতে জ্বলতে.... জ্বলতে- নিভতে- জ্বলতে- নিভতে .... এক একটা রূপকথার জন্ম দেয়। সে রূপকথায় রাজকন্যারা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সোনার কাঠি- রূপোর কাঠি সহ।

একসময় ভোর হলে.... রাস্তার আলোগুলো এক এক করে জ্বলে উঠতে শুরু করলে .. নিশাচর ডইনিরা লুকিয়ে পড়বে যে যার ধ্বংসস্তুপের আড়ালে।

একটা স্বাভাবিক দিনের স্বাভাবিক ব্যস্ততা, স্বাভাবিক সূর্যোদয় -সূর্যাস্তের মাঝখানে সেই ধ্বংসস্তুপগুলো কণা কণা ধুলো- বাষ্প হয়ে তোমাদেরই আশে পাশে ওড়ে। খালি চোখে ওদের দেখা যায় না। বৈজ্ঞানিকের মাইক্রোস্কোপে যদিও এরা মাঝে মাঝে ধরা পড়ে যায়, তখন চলে বিচার বিশ্লেষণ। গবেষণাগারের নীল আলোগুলো জ্বলে ওঠে। জোড়া জোড়া চোখের সার্চলাইট গমগমে উদ্বেগ নিয়ে ফলো করে অনু পরমানুর মধ্যে স্থিত ও ই ধ্বংসস্তুপগুলোর ব্যক্তিগত কথাকাহিনী। এসব থেকেই লেখা হয় সায়েন্স ফিকশন। এর থেকেই তৈরী হয় ওয়েপনস অব মাস ডেসট্রাকশন।

অথচ কত স্বপ্নালু সন্ধ্যের গহীন ভালবাসায় এই কণা কণা ইতিহাসগুলোর আনাগোনা।

প্রিন্সেপঘাটের দু'ধারে আলো- আঁধারি রাস্তায় কখনো কখনো যারা রূপকথা খোঁজে, ওদের শরীরে বসন্তরোগের জীবানু ছড়িয়ে দেয় ধ্বংসস্তুপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ডাইনিদের জাদুদন্ড। তাদের কখনো কেউ দেখেনি।

কারণ তাদের দেখতে নেই।

এমনই এক ডাইনির কলজের একফালি রাখা আছে ঐ জানলায়। চলে যাওয়া বসন্তের হাওয়া সেই কলজের টুকরোটায় ঠোঁট ছুঁইয়ে যায় বারবার।

চন্দ্রাহত জানলার ফ্রেমে জ্বলছে নিভছে কলজেটা। এক ডাইনির কলজে। এক ডাইনি, যে রাজকন্যা হওয়ার চেষ্টায় পাড়ি দিয়েছিল সাত সমুদ্দূর। তার অশ্রুপাতের তেরখানা নদীতে তখনো শুরু হয়নি বাঁধ দেওয়ার কাজ।

সে যে ডাইনি তা হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ায় তাকে কেটে ফেলতে হয়েছে তার কলজের এক টুকরো। সেই টুকরোটা, যেটায় লেগে আছে সোনার কাঠি- রূপোর কাঠির ছোঁয়াচ, রাজকন্যা জীবনের চিকন সব অলিগলি।

এবারের সাংবাদিক সম্মেলনে এই কলজের টুকরোটাকে নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। ডাইনির কলজে- কে জানে কত তার এথনিক ভ্যালু। হলঘরের মাঝখানে কাঁচের বাক্সে রাখা এই মাংসপিন্ডটাকে ঘিরে ঝলসে উঠছে হাজার হাজার ফ্ল্যাসলাইট।

উড়ে আসে প্রশ্ন-

ঠিক কখন কাটা হল? কি দিয়ে? কতটা রক্তক্ষরণ? ICU না General Ward? ডাক্তার কি বলে?
=====



--

এমন একটা ঘর যার আছে একটা বেশ বড় জানলা। জানলা দিয়ে গাছপালা চোখে পড়ে। রাস্তার ওপর নয়, গাড়ি ঘোড়ার আওয়াজ কম। অনেক খুঁজেপেতে ঠিক এমনই একটা ঘর যোগাড় করেছে জেসিকা। ভাড়া একটু বেশি। তার অল্প রোজগারে মাসের শেষে ভাড়াটা দিতে তার বেশ কষ্ট হয়।

তবু এই একচিলতে সুখ তার সারাদিনের সব গ্লানি শুষে নেয়। দক্ষিণমুখী জানলা। জানলার ধারে পিয়ানো। সুরেলা হাওয়ায় ভাসতে থাকা বিভোর মাঝরাত। তার শুধু এটুকু বিলাসিতা।

আজকাল তার ঘরে ফিরতে ভাল লাগে। বহুকাল সে ভুলে গেছিল 'ঘর' মানে কি। বহুকাল সে শুধু দিনের শেষে বিছানায় ফিরেছে।

তার বিছানায় একা চাঁদ বহুকাল স্তব্ধ।

ইদানিং জেসিকার বিছানায় থাকে আরেকজন। জেসিকার প্রেমিককে কখনো কখনো সে দূর থেকে লক্ষ করে- তার একা একা মাথা দোলানোর স্বভাবটাকে মনে হয় বড় বেশি আপন। 'ঘর' বলতে হয়তো এই মানুষটাকেই বোঝায়। অন্তত জেসিকা তাই বোঝে।

শহরে আজ পাওয়ারকাট। ১২ নম্বর সেন্ট টমাস ষ্ট্রিট-এর জানলায় মোমবাতির আবছা আভাস। কড়া নাড়তে জেসিকার বয়সী একটা মেয়ে দরজা খুলে দিল। তার পরনে কালো পোষাক।

ডাইনিদের সভাঘরে ঢোকার আগে জেসিকা জানত না এমন একটা নেশা-ধরানো গন্ধ তাকে বুঁদ করে ফেলবে। ধুপের গন্ধ। এই আলো - আঁধারি সাংকেতিক পৃথিবীতে মানানসই। কালো পোষাক পরা অতি সাধারণ কিছু ছেলেমেয়ে বসেছিল একটা মাঝারি মাপের ঘরে।জেসিকা ঘরে ঢুকতে তারা হাসল। জেসিকাও হাসল। ডাইনিদের তার একটুও অচেনা লাগছে না।

নরম হলুদ আলোয় কাঁপা কাঁপা ধূসর মুখগুলো। ঘরজুড়ে জ্বলছে ন'টা মোমবাতি। কোন শব্দ নেই। জনবহুল রাস্তার কোলাহলের স্বাভাবিক কোন কোলাহলের একটুও আভাস নেই এই ঘরটায়। যেন পৃথিবীর কোন এক অদ্ভুত নিরালা অংশে শূন্যতার পরতে লুকিয়ে থাকা কোন এক স্তরে অবস্তিত এই সভাঘর।

এক্সপেরিমেন্টাল মিউজিকের ছাত্রী জেসিকার এই প্রথম মনে হল, নৈ:শব্দ্যই আসলে ধ্বনির উৎস। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত এই নৈ:শব্দ্য।

বহুক্ষণ, যেন বহুযুগ, তারা জেসিকাকে দেখছিল। মুখে কেউ কোন শব্দ করেনি। একসময় একজন বলল- " আমি জন। আমরা এখানে আসি , একসঙ্গে বসি কিছুক্ষণ। আমরা একে অপরকে অনুভব করার চেষ্টা করি। আমাদের প্রত্যেকেরই একটা করে নিজস্ব চিহ্ন আছে, একটা করে সিম্বল। আমরা তার চারপাশে ঘুরপাক খাই। আমাদের মধ্যে অনেকে অদ্ভুত কিছু স্বপ্ন দেখে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ পশু পাখিদের কথা বুঝতে পারে। কেউ কেউ পাথর আর ক্রিস্টালের শরীর অনুভব করতে পারে।"

খানিকটা সময় নিয়ে, জেসিকার দিকে আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ... আরেকজন বলল- " এটা কোন ধর্মীয় সংগঠন নয়। আমাদের কোন আশ্বাস দেওয়ার নেই। কোন পথ বাতলে দিতে পারব না আমরা। শুধু মাঝে মাঝে আমাদের অনুভূতিগুলো আমরা ছড়িয়ে দিতে চাই একে অন্যের মধ্যে। তাই আমরা এখানে আসি।"

ঘরের এক কোণায় বসেছিল বাদামী চুলের এক এশীয় মেয়ে। সে বলল- " আমি সমীরা। আমি একজন ডাইনি, আমার জীবনে যা ঘটে তা আমি বাস্তব অর্থে নিই না। আমি বিশ্বাস করি প্রত্যেকটা ঘটনার একটা সাংকেতিক অর্থ আছে। আমি তাই আমার চারপাশে সর্বক্ষণ সংকেত খুঁজে বেড়াই। জীবন একটা বি- শা- ল বড় জিগ-স পাজল। এক একটা ঘটনা এক একটা সংকেত। সংকেতগুলোকে এক একটা টুকরো হিসেবে বসিয়ে দিতে থাকো ঠিক ঠিক জায়গায়। একদিন তুমি এই সমস্ত টুকরো একত্রিত করে একটা বৃহত্তর সংকেত খুঁজে পাবে।"

"আমি শুধু একটা অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই"- খানিকটা বিভ্রান্ত জেসিকা অবশেষে বলে ওঠে।

"আমাদের কেন বলতে চাও?" - প্রশ্ন করে জন।

জেসিকা জানে না সে কেন ইয়েলো পেজেস থেকে খুঁজে বার করেছে নর্থ ইংলন্ডের প্রেস্টন শহরে ডাইনিদের সভঘরের ঠিকানা। কেন সে আজ বিকেলে এখানে এসেছে, জখন তার যাবার কথা কল সেন্টারে তার চাকরিতে।

যথাসম্ভব সৎভাবে, যেন স্বগোক্তি, জেসিকা বলে চলে- আমি জানি না আমি যা বলতে চাই তা কেন বলতে চাই ... জানি না কাকে বলতে চাই.... শুধু বলতে চাই ... কারণ ক'দিন থেকেই মনে হচ্ছে বলাটা খুব জরুরি। আমার চুল, তোমরা দেখতেই পাচ্ছ, সোনালি রঙের। আমার বয়ফ্রেন্ডের চুলও সোনালি। গত কয়েকদিন দিন ধরে রোজ রাতে শুতে যাওয়ার সময় আমার বিছানায় একটা করে লম্বা, কালো চুল পাচ্ছি আমি। এই চুল কার? এই চুল যার, বিশ্বাস কর, তাকে আমি স্বপ্নে দেখেছি। গডেস আফ্রোদিতে। আমি দেখেছি সে আমার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে। তার মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই। চোখদুটো স্থির। চোখদুটোয় মহাকাশের চাইতেও বিপুল গভীরতা। সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে আর আমি আমার সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাই। সে তাকিয়ে থাকে, আর তার ঘন, কালো, লম্বা চুল আমার মুখের ওপর উড়ে উড়ে এসে পড়ে। আমার ঘরে, আমার এই নতুন ঘরটাতে, আমার বিছানায় আমার বয়ফ্রেন্ড আর আমার সঙ্গে থাকে আফ্রোদিতে।"

জেসিকা আর কি বলবে ভেবে পায় না। ওরা সবাই এখনো তাকিয়ে আছে। একবার তার মনে হয় সে ভুল জায়গায় এসেছে। জোরে জোরে নি:শ্বস নেয় সে।

ওদের মধ্যে একজন, তীক্ষ্ণ চোখের একটা মেয়ে, এতক্ষণ সে কোন কথা বলেনি, এবার হঠাৎ বলে ওঠে-

"প্রত্যেকটা ঘটনাই এক একটা সংকেত। ঘটনা ঘটে, আর আমরা খুঁজে নিই সংকেতগুলো। তোমার গল্পটা শুনে যেকোন বুদ্ধিমান মানুষ বলবে তোমার বয়ফ্রেন্ড এমন কারো সঙ্গে শুচ্ছে যার চুল লম্বা আর কাও। তোমাকে দেখে তো বুদ্ধিমান বলে মনে হয়। এই সহজ কথাটা তোমার মাথায় এলো না কেন? "

"ওরা সবাই তাই বলছে!" - জেসিকা এবার মরিয়া হয়ে বলে ওঠে -" কিন্তু আমি আমার প্রেমিককে চিনি... বিশ্বাস কর... সে কখনো এরকম করবে না... আমি জানি... আর তাছাড়া আমি ওকে দেখেছি... আফ্রোদিতে... ওকে আমি রোজই দেখি! "

জেসিকার শেষের কথাগুলো প্রায় অর্তনাদ হয়ে ওঠে। ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেছে আবার।

এখন আর এই নৈ:শব্দে কোন সঙ্গীত নেই। ফুলে ফেঁপে উঠে এই নৈ:শব্দ হয়ে গেছে একটা পর্বতপ্রমাণ ঢেউ। যে কোন মুহুর্তে আছড়ে পড়বে। জেসিকার মনে পড়ল ১১ই সেপ্টেম্বর। সে তখন স্কুলে। সবাই হলঘরে এসে জড়ো হয়েছিল। টেলিভিশন স্ক্রীনে সে দেখেছিল জমজ টাওয়ারের ভেঙে পড়া আর তার কুন্ডলী পাকানো কালো ধোঁয়া। কোন নতুন ফিল্ম দেখানো হচ্ছে, ভেবেছিল জেসিকা। সে চুইংগাম চিবোতে চিবোতে আগ্রহ নিয়ে দেখছিল।

এবার সে ভয় পেল। সে পালাতে চাইল - "আমি কি চলে যাব?"

তার প্রশ্নের উত্তরে কেউ চোখ তুলে তাকাল না আর। সবাই এখন তাকিয়ে আছে ঘরের মাঝখানে রাখা ন'টা মোমবাতির দিকে।

কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে, থেমে থেমে বলল জন - "তুমি যদি চলে যেতে চাও , অবশ্যই যেতে পার। যদি এখানে বসে থাকতে চাও, থাকতে পার। আমরা তোমাকে কিছুই বলে দিতে পারব না তোমার সংকেত তোমাকে নিজেই খুঁজে নিতে হবে।"

এরপর জেসিকা চলে যেতেই চেয়েছিল। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তার মনে হয়েছিল ঐ স্বাভাবিক পৃথিবীটার জনবহুল কোলাহলে সে অনেক বেশি আস্বস্ত বোধ করবে। খানিক রাত হয়েছে। তার বয়ফ্রেন্ডকে ফোনে ডেকে নিয়ে সে চলে যেতে পারে কোন নাইটক্লাবে। মদ্যপান করা দরকার। তার ক্লান্ত লাগছে।

তবু কে জানে কেন সে বসে পড়ল। ধূপের গন্ধে সে খানিক আচ্ছন্ন হয়ে আছে। অন্য সবার মতই সেও চোখ রাখল একটা মোমবাতির দিকে।

তারপর থেকে বহুদিন ওরা ওখানেই বসেছিল। উড়ে যাওয়া রাত ওদের দিকে ফিরেও তাকায়নি।
======




-


কিছু রাত অপার্থিব। মাঝে মাঝে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে বাইরের বারান্দায় চোখ চলে যায়। বারান্দার ওপাশে এক অন্য পৃথিবী। .... মায়াময় জ্যোৎস্নায় আচ্ছন্ন .... মৃত দিনগুলির শব সাদা চাদরের আড়াল থেকে এক এক করে আবার জীবন্ত হয়ে উঠছে।

ওরা .. যারা ছেড়ে গিয়েছিল প্রত্যেকে কিছু না কিছু নরম অজুহাতে .... ওরা ফিরে এসেছে সত্যি কথাটা বলবে বলে।

দমদম এয়ারপোর্ট-এর রানওয়ে জুড়ে ছেঁড়া ছেঁড়া জ্যোৎস্নায় রাতের গল্পগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে নেশাতুর হাওয়ায়।

আজ রাতে জ্যোৎস্নায় ডুবে থাকা চাঁদ হয়ে গেল মোবাইলের স্ক্রিন। এক এক করে ফুটে উঠল সেই সমস্ত নম্বরগুলো যার কিছু আছে স্মৃতিতে, কিছু বিস্মৃত।

প্রত্যেকেরই হাতে ছিল একটা করে কাঁচের জুতো। তারা সবাই অন্তত একবার আমার দিকে এগিয়ে দিয়েছে সেটা। পা রেখেছি কখনো। কখনো রাখিনি। কাঁচের স্বচ্ছ নীল রং আমার পায়ে অনেকগুলো ক্ষত রেখে গেছে। যে যার সিন্ডারেলার কাছে ফিরে যেতে চায়। আমি কি তাদের দোষ দেব?

আমার চতুর্দিক ভারী পর্দা দিয়ে ঘেরা। এই ঘেরাটোপে আমি নিজের মুখোমুখি। নেপথ্যে শুধু এক আয়না। ... সেই চিরন্তন অব্যর্থ আয়না। সেই আয়নায় ইশ্বর তার গাঢ় মসৃণ স্বরে স্বরচিত গদ্য পাঠ করেন।

"রাজকন্যা, তুমিই সবচেয়ে সুন্দরী।"

রাজকন্যা, তুমিই সবচেয়ে সুখী।"

রাজকন্যা, তোমার চেয়েও সুন্দরী কেউ আছে।"

রাজকন্যা, তোমার চেয়েও সুখী কেউ আছে।"

আমার বিছানা জুড়ে পিঁপড়েরা হাঁটে সারারাত। আমার শিরাগুলোয় পিঁপড়েদের বসবাস। চামড়ার নিচে সারাক্ষন অনুভব করি তাদের হাঁটাচলা।

রাত বাড়লে বিছানাটা বড় হতে থাকে। দু'পাশে ছড়িয়ে যায় কয়েকশো মাইল। সেই সুবিশাল বিছানায় নেমে আসে চাঁদ। আমার শরীর থেকে রোজ শুষে নেয় সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত যন্ত্রণা।

একা বিছানায় হঠাৎ উঠে বসি অচেনা প্রান্তরে। নেপথ্যে আয়না বলে যায় - রাজকন্যা ... রাজকন্যা ... রাজকন্যা ... "

অথচ নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি হাত পায়ের শিরাগুলো কঠিন হয়ে আছে। চোখের নিচে গভীর খাদ।

দু'হাতে আয়নাটাকে চুরমার করি।

তবু আমার আয়নাময় ঘর।

আজ আমি শহরের চিত্রপটে নিজেকে দেখলাম একটা তুলির আঁচড় হয়ে যেতে। যেন এই চন্দ্রাহত রাতের বিছানায় আমি আর আমার চিহ্নিত বৃত্তগুলো একের পর এক মিলে মিশে কোন সুড়ঙ্গপথ তৈরি করবে যার শেষে আছে কয়ামৎ।

রাতশেষে পুরো শহরটাই আমার বিছানা .... নন্দন, পার্ক স্ট্রিট, Forum, Crossword, আমার এপাশ - ওপাশ। আমার অপেক্ষা। ধূসর দিগন্তের রেসকোর্স আমার শূণ্য চোখ। তাকিয়ে যাবার ইতিহাসে আছে একটা বন্ধ দরজা। হাতলের ফাঁকে সারা সপ্তাহের কাগজ রেখে গেছে কাগজওয়ালা। তালায় ধুলোর আস্তরণ। লেটারবক্সে টেলিফোন বিল, আমার চিঠি। সে ফেরেনি।

ছবির দৃশ্যে নায়িকা তার গতিবিধির মানে জানে না। জানে পরিচালক। shot- টা চলছে। দীর্ঘ shot শেষ হচ্ছে না। নায়িকার দিশেহারা চাউনি বুঝে নিতে চাইছে next shot। কেউ 'cut' বলছে না। shot টা চলছে ..... চলছে .....

অপেক্ষা করছে শহর। জ্বলে নিভে অপেক্ষা করছে ভোরের নিওন আলো।
======



-

সুজাতার মনিটরের স্ক্রিনসেভারে একটা পেন্টাগ্রাম আছে। তার দৃঢ় এবং ভারী চেহারা, আত্মবিশ্বাসী গলা আর ধূর্ত চোখ নিয়ে সে একজন সফল বস।

কর্পোরেট সেক্টরের চাকরি মানে নিয়মিত সংঘর্ষ। সুজাতা কঠিন মেয়ে। সে তার জীবনে তিনখানা সম্পর্ক হারিয়েছে। একজনকে হারিয়েছে তার অন্যের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কারণে। তার পরেরজনকে হারিয়েছে তার নিজের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কারণে। সর্বশেষজনকে হারাতে হয়েছে মৃত্যুতে। ইতিমধ্যে তার একমাত্র ছেলে বড় হয়েছে। সে এখন ক্লাস ফোরে পড়ে।

ডাইনি হিসেবে বেশ নাম ডাক হয়েছে তার। ইন্টারনেটে ডাইনিদের একটা Forum চালায় সে।
একদিন সুজাতার ইন্টারভিউ নিতে আসে নামি টেলিভিশন চ্যানেলের এক সাংবাদিক।

সাংবাদিক : আপনি একটা নতুন ধর্মের প্রবর্তন ঘটাচ্ছেন ইন্টারনেটের মাধ্যমে। এ বিষয়ে কিছু বলুন।

সুজাতা :Witch Craft কোন ধর্ম নয়। একটা বিশ্বাস মাত্র। কোন দেব দেবী নির্ভর নয় এই বিশ্বাস। অথবা কোন rules and regulations নেই এর মধ্যে। ডাইনিদের কিছু পার্সোনাল বিশ্বাস থাকে। গভীর বিশ্বাস। এই বিশ্বাস চিহ্ন নির্ভর। একজন ডাইনির সম্বল প্রাকৃতিক শক্তি। প্রকৃতির প্রত্যেকটা অণু পরমাণুতে এক ধরনের শক্তি আছে। সেই প্রকৃতির সন্তান আমরা, এই শক্তির কিছুটা আমরাও বহন করি। ডাইনিরা নিজের ভেতরের এই প্রাকৃতিক শক্তির উৎস খোঁজে বৃহত্তর প্রকৃতিতে। অন্তরের শক্তির সঙ্গে বৃহত্তর প্রাকৃতিক শক্তির যোগাযোগ ঘটাতে চায়। আর সেটা ঘটানো সম্ভব একটা সিম্বলের মাধ্যমে। যেমন ধরুন পেন্টাগ্রাম। পাঁচটা বিন্দুকে ঘিরে আছে একটা গোলক। এই পাঁচটা বিন্দু হল পাঁচটা Natural Element। আগুন, জল, মাটি, হাওয়া আর সূর্য।

সাংবাদিক: আচ্ছা, এই তুকতাক, ঝাড়ফুঁক, এসব আপনার কুসংস্কার মনে হয় না?

সুজাতা:Spell casting এক ধরণের সাধনা। Depend করে কে কিভাবে দেখছে। অন্ধবিশ্বাস থেকে কুসংস্কার আসে। একজন সত্যিকারের ডাইনি জানে সে কি করছে। সে অন্ধ নয়।

সাংবাদিক: এত নিশ্চিত হচ্ছেন কিভাবে? আপনার ইন্টারনেট কমিউনিটি খুব পপুলার হয়ে উঠছে। যারাই এখানে আসছে প্রত্যেকেই কি আপনার মত ভাবে?

সুজাতা: একসময় ইউরোপে ডাইনিদের পুড়িয়ে মারা হত। এদেশে এই কিছুদিন অগেও ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মারা হয়েছে অনেককে। এখন Witch craft একটা Fashion statement। রাজপুত্রেরা এখন আর রাজকন্যা চায় না। তারা ডাইনির খোঁজ করে। Dark, Brooding Lady। আমার ভালই লাগে।

সাংবাদিক: আপনি কি সত্যিই নিজেকে ডাইনি মনে করেন?

সুজাতা: মনে করার কিছু নেই। যে ডাইনি, সে জানে সে ডাইনি।

ইন্টারভিউ শেষ হলে সুজাতা এক গ্লাস ঠান্ডা জল খায়। না:, অস্বস্তিটা যাচ্ছে না। সে অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে। প্রত্যেকে একই কথা বলেছে। তার নার্ভের সমস্যা। ইনসোমনিয়া। ঘুমের ওষুধ খেলে ঠিক হয়ে যাবে। এরা কেউ কিছু জানে ন!

সে জানে। সে রাতদিন অনুভব করছে। সে দেখেছে। তার চামড়ার তলায় সার বেঁধে চলেছে রাশি রাশি পিঁপড়ে। তারা সারাক্ষন ঘোরাফেরা করে তার মগজে, চোখের পাতায়, স্তনে, যোনিতে, পায়ের নখের ফাঁকে, ঠোঁটের ভাঁজে!
======


-

আয়নার স্বর স্তব্ধ হয়ে গেলে পড়ে থাকে এক বুক সংশয়। পাহাড়ী রাস্তার কোন হঠাৎ বাঁকে চেনা মুখ ধন্দে ফেলে দেয়।

যাকে সবচেয়ে বেশি চিনি তাকে কতটুকু চিনি?

পথশিশুদের স্বপ্নে দেখা অমিতাভ বচ্চন, পুলিশ আর একথালা ভাত ... সব একাকার হয়ে গিয়ে - "নয়ে ভারত কি নয়ে রফতার...'

গতির শরীরে বেমানান এই ডাইনিজীবন...... চেনা কাঁচের জুতোগুলোর সাইজ বদলে গেছে।

পড়ে আছে শূন্যতার সীমারেখায় উইকেন্ড। পড়ে আছে এক আকাশ বৃষ্টি নিয়ে মেঘলা জুলাই মাস। পড়ে আছে জন্মের অনুভূতি। গর্ভের গহ্বরে যে অন্ধকার তকে অস্বীকার করি না।

সেই অন্ধকারের উৎসে রূপকথারা তাদের সাংকেতিক অর্থে যুক্তিহীন। সেই অন্ধকারে নেই কোন প্রশ্নোত্তর। আলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধকার নয়, আলোকে অতিক্রম করে সেই অন্ধকার শুধুমাত্র আমার জন্যে অপেক্ষায় আছে।

ব্ল্যাকহোলের মুখোমুখি এই আমি এখনো অন্ধকারকে ভয় করি। এখনও।

যদিও বিজ্ঞান আশ্বস্ত করেছে - আর কোন ভয় নেই। শিগগিরই মঙ্গলগ্রহের জমিতে ফেলা হবে পিকনিকের তাঁবু।
======