আপনার মতামত         


সাবধান! ট্যাংক আসছে ! (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ট্যাংকের ইতিহাস)
দীপ্তেন

ট্যাংকের শৈশব কেটেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে । একটা ট্যাংক বনাম ট্যাংক লড়াই ও হয়েছিলো কামব্রাইতে- কিন্তু সেটা নেহাৎ ই অ্যাকাডেমিক। যুদ্ধ নয়, যুদ্ধের মহড়া। আর নাৎসি বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমন করে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের অফিসিয়াল খাতা খুলল ১৯৩৯ সালে। এই অন্তর্বর্তী একুশ বছরে ট্যাংক নিয়ে কিছুটা চিন্তা ভাবনা হয়েছিলো।


ট্যাংকের কর্মটা কি ?
-------------------
জার্মানীতে গুডেরিয়ান লিখলেন আখটুঙ্গ প্যান্‌জার আর ব্রিটেইনে লিডেলহার্টও তাঁর ভবিষ্যতের ট্যাংক যুদ্ধের থিসিস লিখলেন। বিশেষত: ব্রিটেইনে ট্যাংক নিয়ে কিছুটা ভাবনা চিন্তা শুরু হয়েছিলো। ফ্রান্সে, এক তরুন দ্য গলও লিখলেন মোবাইল যুদ্ধের বিবরণ (Vers l`Armee de Metier) । এঁরা সকলেই আগামী দিনের যুদ্ধ যে হবে ট্যাংক নির্ভর সেই নিয়ে বই লিখছেন। এঁদের উল্টো মেরুতে তখনকার দিনের তাবৎ জাঁদরেল জেনারেলেরা যাঁরা বিশ্বাস করতেন দুর্গ প্রাকারের দিন শেষ হয় নি।
ফরাসি জেনারেল Chauvineau লিখলেন একটি বই। তার ইংরাজী নাম is an invasion still possible? । এর মুখবন্ধ আবার লিখেছিলেন মার্শাল পেঁত্যা। লেখক বলছিলেন ট্যাংক আর এরোপ্লেন যতই কেনো উন্নত হোক না কেন লড়াই হবে ইনফ্যাϾট্রর সাথে ইনফ্যাϾট্রর। তাই ফ্রান্সে চাই চীনের দেওয়ালের মতন সুদীর্ঘ দুর্গ প্রাচীর।

মোটামুটি একমত সকলেই। যুদ্ধ হবে পদাতিক সেনাদের মধ্যেই। হ্যাঁ, ট্যাংকের ও প্রয়োজন আছে। তবে সেটা নেহাৎই সাপোর্টিভ রোল। যেমন ট্রেঞ্চ ডিঙিয়ে পার হওয়া। পদাতিক সেনাদের সহায়ক, তাই স্পিড হওয়া চাই কম। ঘন্টায় ছয় মাইলই যথেষ্ট। আর বিপক্ষের ট্যাংকের সাথে লড়াই করবে কে ? কেন ? ট্যাংক বিধ্বংসী কামান রয়েছে। ট্যাংক বনাম ট্যাংকের যুদ্ধকে উড়িয়ে দিলেন এই সব স্ট্র্যাটেজিস্টেরা।

১৯৩৯ - ১৯৪০
---------------
তাই দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হলো তখন ট্যাংকের সংখ্যাও কম। খুব হাল্কা (ছয় সাত টন মাত্র) ওজন, সঙ্গে হয় একটি মেশিনগান বা একটি ছোটো কামান। অস্ত্র বলতে এই। গায়ের লোহার চাদর বড় জোর রাইফেলের গুলি আটকাতে পরে। নাম ছিলো ইনফ্যাϾট্র ট্যাংক। পদাতিক সেনানীর সাথে গুড়গুড়িয়ে চলবে।

নাৎসি বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমন করলে তাদের সাথে ছিলো প্যানজার ওয়ান। দুজন ভিতরে বসতেন,চালক ও গোলন্দাজ। অস্ত্র বলতে দুটি হেভি মেশিনগান । এই খেলনাগাড়ি অবশ্য বেশী দিন টেঁকে নি। প্যানজার টু - যাতে আছে একটি ছোটো কামান আর ওজনেও একটু ভারী, ততক্ষনে হাজির হয়েছে। এই ১৯৪০ সালেই এসে যাবে আরো উন্নততর বিকল্প, প্যানজার থ্রি। বাইশ টন ওজন, রাশান যুদ্ধে ১৯৪২ পর্য্যন্ত এই ট্যাংকটি ই ছিলো নাৎসি সেনার প্রধান ব্যাটল ট্যাংক।

ট্যাংকের প্রথম দাপট দেখা দিল ১৯৪০'র মাঝামাঝি, যখন মাত্র ছয় দিনের যুদ্ধেই মহা শক্তিশালী ফ্রান্স হেরে গেলো জার্মানীর দুই ট্যাংক বিশারদের বিদ্যুত গতির কাছে। গুডেরিয়ান আর রোমেল, বিশেষত: গুডেরিয়ান সেই যুদ্ধের হিরো। মিউস নদী পার হয়ে দ্রুত তার সাঁজোয়া বাহিনী ছুটে চলল - তার উর্দ্ধস্তন সেনানায়কের নির্দেশ অমান্য করেই, এমন কি ঐ দ্রুত গতিতে শংকিত হয়েছিলেন হিটলর স্বয়ং। তিনিও গুডেরিয়ানকে বলেছিলেন "যারা ধীরে চলো"। কর্ণপাত করেননি গুডেরিয়ান। গড়ে চল্লিশ মাইল স্পীডে তিনি ছুটে চল্লেন তার সাঁজোয়া বাহিনী নিয়ে। জার্মান পদাতিক সেনারা অনেক পিছিয়ে ।

ফরাসি প্রধানমন্ত্রী রেনো ১৫ই মের সকাল বেলায় ফোন করলেন চার্চিলকে , " আমরা পরাজিত, আমরা যুদ্ধে হেরে গেছি '। বিশ্বাসই করতে চান নি চার্চিল। ম্যাজিক ছিলো দুটো । এক, স্টুকা ডাইভ বোম্বারের ট্যকটিকাল ব্যবহার আর দুই,ট্যাংক বাহিনীর দুর্দান্ত মোবাইল লড়াই। মানসিক ভাবে তখনো প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের দুর্গ নির্ভর "ডিফেনসিভ' যুদ্ধনীতিতে বিশ্বাসী ফরসী সেনারা এক বারের জন্যেও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারলো না।
ট্যাংকের রনকৌশল আর নতুন design নিয়ে চিন্তা তখন শুরু হয়ে গেছে।

১৯৪১
-------
১৯৪১ সনের মাঝামঝি জার্মনী সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমন করলো। সে এক ইলাহী ব্যাপার। হিটলার বললেন " সমস্ত দুনিয়া রুদ্ধ্বশ্বাসে আমাদের দেখছে'। ঐতিহাসিক এ জে পি টেইলর বল্লেন " coming of the world war '। এবারে সত্যি বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হল। শুরু হল যেন সুনামির বন্যা। তাসের প্রাসাদের মতন ভেঙে পড়ছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা। বছর শেষ হবার আগেই মস্কোর কাছাকাছি পৌছে গেলো নাৎসি বাহিনী।

তবু ঐ একতরফা লড়াইতে ছন্দপতন একটাই। সেটি জার্মান প্যনজার থ্রি বনাম রাশান টি ৩৪'র ট্যাংকের তুলনা। রাশিয়ান ট্যাংক টি ৩৪ যে বিশ্ব যুদ্ধের সেরা ট্যাংক সে নিয়ে আদৌ কোনো মতবিরোধ নেই। জার্মান সেনারাও প্রথম মোকাবিলায় টি ৩৪'র মুখোমুখি হয়েই বিপদ ঘন্টি বাজিয়ে দিলেন। তাদের প্যানজার থ্রি আদৌ টি ৩৪'র সমকক্ষ নয়।

বাইশ টনের প্যানজার থ্রিতে ছিলো ৩৭মিমি কামান আর দুটো মেশিন গান। বেশ সাদামাটা ডিজাইন। আর টি ৩৪ ছিলো ২৬ টন ওজনের। ৭৬ মিমির কামান আর ভারী মেশিনগান । ১৯৩৯ সালে কিছুটা ব্রিটিশ ক্রিস্টি কোম্পানীর নকশা নিয়ে টি ৩৪ ট্যাংক তৈরী হয়েছিলো । জার্মান আক্রমনের প্রথম দিকে রাশিয়া খুব কমই টি ৩৪ ব্যবহার করেছিলো। কেন না ওটা ছিলো সোভিয়েত রাশিয়ার টপ সিক্রেট , ট্রাম্প কার্ড। কিন্তু ঐ অল্প সংখ্যক টি ৩৪'র মোকাবিলা করতে গিয়ে নাৎসী বাহিনী নাস্তানাবুদ। তারা হেড কোয়ার্টারে খবর দিলেন শিগগিরি টি ৩৪'র মতন ট্যাংক বানিয়ে দাও আমাদের ।

গুডেরিয়ান তার " প্যানজার লীডার ' বইতে লিখলেন ... " টি ৩৪'র মুখোমুখি হয়ে আমরা বুঝতে পারলাম দ্রুত সুনিশ্চিত বিজয় আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় " । টি ৩৪ ছিলো ট্যাংকের ডিজাইনে অন্তত: পাঁচ কদম এগিয়ে। প্রথমত: অন্যান্য সমসাময়িক ট্যাংকের বাক্স টাইপের চেহারার বদলে টি ৩৪'র টারেট ছিল ঢালু। তাই বিপক্ষের গোলা অনেক সময়েই ঠিকরে যেতো । ছিল খুব দ্রুত গতির (৫০ মাইলের উপর) আর তার কামান ছিলো সব থেকে দুর পাল্লার। ট্যাংকের লোহার চাকা ছিল খুব চওড়া, তাই স্নো বা কাদায় কম অসুবিধেয় পড়ত। ইঞ্জিন ছিলো ডিজেলের। তাই পেট্রল ট্যাংকের মতন অতো ইনফ্লেমেবল ছিল না। আর মেশিন হিসেবে ছিল খুব নির্ভরযোগ্য। শক্তপোক্ত। শুধু ডিজাইন নয়, টি ৩৪'র ম্যানুফ্যকচারিং প্রসেস ছিলো অতি আধুনিক। তাই স্তালিন যখন ট্যাংক ফ্যাকটরী গুলিকে সাইবেরিয়া ও অন্যান্য প্রত্যন্ত প্রদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন , সেখানে খুব অল্প সময়েই জোরদার একশোভাগ প্রডাকশন শুরু করা গিয়েছিল।

এই বছরেরই ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর আফ্রিকায় পৌছে গেলেন ট্যাংক যুদ্ধের জাদুগর রোমেল। সে সময়কার বৃটিশ রণকৌশলকে সম্পুর্ন উপেক্ষা করে রোমেল চালু করলেন তাঁর দ্রুত গতির লড়াই - ট্যাংক যার প্রধান হাতিয়ার।

স্মৃতিচারনায় রোমেল একাধিকবার উল্লেখ করেছেন যে ব্রিটিশ ট্যাংকের obsolete design and technology । তখন প্রধান ব্রিটীশ ট্যাংক ছিলো মাটিলডা। নিতান্ত থপথপে আর বেশ ভারী। ছোটো সাইজের কামান।ব্রিটিশ থিওরী ছিলো যে মাটিলডার পুরু লোহার চাদর কোনো জার্মন ট্যাংক ভেদ করতে পারবে না।

জার্মানির হাতে ছিলো অতি চমৎকার বিমান বিধ্বংসী ৮৮মিমি কামান। রোমেল সেই কামানগুলিকে আকাশমুখী না করে ট্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করলেন আর মাটিলডার কবরখানায় মরুবিজয়ের কেতন রোমেলের হাতেই রইল। ব্রিটিশদের হাতেও ছিল তাদের চমৎকার ৩.৭ ইঞ্চি ব্যাসের বিমান বিধ্বংসী কামান। কিন্তু তারা কখনই সেগুলিকে ট্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন নি। চোখের সামনে জলজ্যান্ত উদাহরন থাকতেও এরকম চিন্তা শক্তির দৈন্য ছিলো নিতান্ত ট্র্যাজিক। বছরের শেষের দিকে ব্রিটিশ বহিনী ক্রুসেডার নামের দ্রুত গতির (৪০ মাইল ঘন্টায়) ট্যাংক নামালো কিন্তু সেই ট্যাংকের কামান এতই কমজোরী ছিলো যে খুব সুবিধে হলো না।

১৯৪১ সালে আফ্রিকায় রোমেলের একটানা বিজয় অভিযান। অবহেলে যুদ্ধ জিতছেন তিনি। " এই বিজয় ,আমাদের উন্নততর ট্যাংকের জন্যই সম্ভব হয়েছিল' স্বীকার করলেন রোমেল। প্যানজার থ্রি আর ফোর মডেলের কাছে দাঁড়াতে পারে নি ব্রিটীশ মাটিলডা ও ক্রুসেডার ট্যাংক।

১৯৪২
------
প্রায় বছর খানেক মরুভুমিতে লড়াই করে প্রায় কিংবদন্তীর নায়ক হয়ে উঠেছেন রোমেল। তিনি বুঝেছিলেন মরুভুমিতে লুকিয়ে থাকা, অ্যামবুশ করা, ঘাঁটি গেড়ে প্রতিরক্ষা করা - এইসব ট্যাকটিক্স অচল। শত্রুদলকে ঘিরে ফেলাও অসম্ভব কেননা যে কোনো ফাঁক ফোকর দিয়েই বেষ্টনী ভেদ করে বেরিয়ে আসা যাবে। চাই দ্রুত চলমান যুদ্ধ। চাই দ্রুতগামী ট্যাংক।

আদর্শ ট্যাংক হওয়া উচিৎ কেমন ? রোমেল বলেন " manoeuvrability ' - সেটাই প্রথম শর্ত। আর চাই দ্রুত গতি আর দুর পাল্লার কামান । খামোখাই পুরু লোহার চাদরের আস্তরন পরিয়ে ট্যাংককে শ্লথগতি করে লাভ নেই। সেটা হয়তো শহর দখলের যুদ্ধে প্রয়োজন। কিন্তু দিগন্ত বিস্তৃত মরুভুমিতে কামানের পাল্লার উপর জোর দেওয়া উচিত।

উত্তর আফ্রিকায় বৃটিশ বাহিনীর ট্যাংকের সংখ্যা ছিল রোমেলের থেকে তিনগুণ বেশী। আসলে ছিল পাঁচগুণ বেশী - কেননা রোমেলের যে সব ইতালিয়ান ট্যাংক ছিলো সেগুলিকে ট্যাংক না বলাই ভালো। কিন্তু বৃটীশ ট্যাংকগুলি আধুনিক হলেও মরুযুদ্ধের উপযুক্ত ছিল না। তবুও এল এলামিনের যুদ্ধে শেষ পর্য্যন্ত রোমেল পর্যুদস্ত হলেন। তার প্রধান কারন বৃটিশ বিমান বাহিনী। সারা আকাশ দাপিয়ে বেড়া চ্ছে বৃটিশ বিমান । বিনা বাধায় । যেমন স্টুকা ডাইভ বম্বার ব্যবহার করে তিন বছর আগে নাৎসি বাহিনী পোল্যান্ড দখল করে নিয়েছিল। এবার পাশার দান উল্টে গেল। একটানা কার্পেট বম্বিংএ রোমেলের ট্যাংক বাহিনী চুরমার হয়ে গেল। নৌ যুদ্ধেও বেসামাল জার্মানী কোনো রসদই যোগান দিতে পারলো না রোমেলকে। গোলা বারুদ নেই এমন কি চলমান যুদ্ধের রাজপুত্র রোমেলের কাছে পেট্রলও ছিল না। অগত্যা তাঁকে পিছু হঠতে হল।এল এলামিনের যুদ্ধে ১৪৪০ ব্রিটীশ ট্যাংকের বিরুদ্ধে রোমেলের হাতে ছিল মাত্র ২৬০ টি জার্মন ট্যাংক। একবছর আগে এই রকম সংখ্যার বিরুদ্ধে রোমেল জিতেছিলেন - সেই ম্যাজিক আরো একবার রিপিট করা আর সম্ভব হল না। কিন্তু ট্যাংকের ভুমিকা তখন আরো স্পষ্ট হয়ে গেছে। স্থল যুদ্ধে, এলাকা দখলের লড়াইতে, শহর দখলের লড়াইতে ট্যাংকের কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্ব যুদ্ধে আমেরিকা তখন সামিল। তাদের শেরম্যান ট্যাংক তৈরী হচ্ছে হু হু করে। কেমন ছিলো শেরম্যান ট্যাংক ? It was a winner by number । এটাই শেষ কথা। বেশ উঁচু ট্যাংক, প্রায় এগারো ফিট (তুলনায় টি ৩৪ মত্র আট ফিট উঁচু )। অর্থাৎ বেশ দুর থেকেই শত্রুপক্ষ দেখতে পায় শেরমানের আগমন । কামানের জোর বা বর্মের আত্নরক্ষার ক্ষমতা বা গতির ক্ষিপ্রতা - কোনোটাই পাতে দেওয়ার মতন নয়। শুধু গুণের মধ্যে রয়েছে ইনজিনের নির্ভরযোগ্যতা আর আমেরিকার মাস প্রোডাকশনের তুরুপের তাস। যে কোনো রণাঙ্গনেই অগুন্তি শেরম্যান । যুদ্ধের শেষ বছরে পশ্চিম ফ্রন্টে হাজার দুয়েক জার্মান ট্যাংকের মোকাবেলায় প্রস্তুত ছিল প্রয় তিরিশ হাজার শেরম্যান ট্যাংক। এই ঝাঁকের সাথে লড়াই করে জেতা অসম্ভব।

৩৯ থেকে ৪৫ - এই ছয় বছরে জার্মানী আর গ্রেট ব্রিটেইন , দুই দেশই কম বেশী পঁচিশ হাজার ট্যাংক বানিয়েছিলো - আর লেট এনট্রান্ট আমেরিকা শেষ চার বছরেই বানিয়েছিলো অষ্টআশি হাজার ট্যাংক ! শেরম্যানের আরো গুণ - জার্মান ভারী ট্যাংকের তুলনায় অর্ধেক তেল খায়। শেরম্যানের ট্র্যাক একবারো বদল না করেই দিব্যি ১৫০০ মাইল পর্য্যন্ত যাওয়া যেতো, তুলনীয় জার্মান টাইগার ,মাত্র ৫০০ মাইল যেতে পারতো। জার্মান ভারী ট্যাংকের টারেট (বা কামান)লক্ষ্যস্থলের দিকে ঘোরাতে সময় লাগতো অনেকটা - কিন্তু শেরম্যানের সেটা হতো ঝটপট।

ততদিনে রাশান ফ্রন্টে জার্মান অগ্রগতি কেমন থমকে গেছে। ক্রেমলিনের সোনার মুকুট অধরাই থেকে গেলো। স্তালিনগ্রাদকে চুর্ন করে দিলেও মচকাতে পারলো না নাৎসী জার্মানি। যেমন পারলো না অভুক্ত লেনিনগ্রাডকে নিজেদের কবজায় আনতে। বছরের শেষে সাইবেরিয়া থেকে নতুন সোভিয়েত ফৌজ হাজির জার্মানদের মোকাবেলায়, সঙ্গে তাদের ব্র্যান্ড নিউ টি ৩৪ ট্যাংক। ততদিনে ট্যাংক নিয়ে নানান ভাবনা চলেছে দুই পক্ষেই। হিটলারের জন্মমাসে (এপ্রিল) টি ৩৪'র সমকক্ষ দুটি ট্যাংকের মডেল দেখানো হল। একটি তৈরী করেছে ডেইমলার বেনজ কোম্পানী - রাশান টি ৩৪'র হুবহু নকল। একেবারে কার্বন কপি। আরেকটি তৈরী করেছেন MAN কোম্পানী, সেখানেও টি ৩৪ কে অনুসরন করা হয়েছে কিন্তু অনুকরন নয়। প্রথমটি মডেল হিসাবে উৎকৃষ্টতর ছিলো কিন্তু সেটি যে নেহাৎই নকলনবিশি। হিটলারের প্রাণে সইল না। সাব হিউম্যন স্লাভেদের থেকে শেষে টেকনলজি চুরি ! আর্য্যজাতির এ কি অধ:পতন। তাই MAN কোম্পানীই বরাত পেলেন। পরের বছর রাশান ফ্রন্টে হাজির হলো প্যান্থার। অনেকের মতে শ্রেষ্ঠ জার্মান ট্যাংক।

এমন ভাবে রুদ্ধশ্বাসে শেষ হল ১৯৪২। লেনিনগ্রাড, স্তালিনগ্রাড, মস্কো। "খেলা' জমল পরের বছরে।

১৯৪৩
--------
সেই ১৯৪১ সালে রাশান সুপারস্টার টি ৩৪'এর সাথে প্রথম সাক্ষাতকারের পর থেকেই হিটলারের মাথায় নতুন ট্যাংকের চিন্তা। তাছাড়া অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে হিটলার বরাবরই নতুন টেকনলজি ও "ম্যাজিক ওয়েপন'এ বিশ্বাসটা একটু বেশীই করতেন। সেই মতন একাধিক নতুন ট্যাংকের ব্লু প্রিন্ট এপ্রুভ হয়ে গেছিল ৪২ সালেই। ১৯৪৩'এ এলো তিন তিনটি নতুন ট্যাংক। মিডিয়াম ট্যাংক প্যান্থার, প্রায় কিংবদন্তীর নায়ক , হেভী ট্যাংক টাইগার এবং ট্যাংক ডেস্ট্রয়ার ফার্দিনান্দ।

ট্যাংক ডেস্ট্রয়ার একটি নতুন কনসেপ্ট। এটি একটি চলমান ট্যাংক বিধ্বংসী কামান। ট্যাংকের মতনই লৌহ বর্মে আবৃত ও ট্র্যাকের উপর চলে। ট্যাংকের সাথে তফাৎ এই যে এগুলিতে কামানকে ঘোরানো যায় না। অর্থাৎ বাঁ দিকে শত্রু আসলে পুরো গাড়িটাকেই বাঁ দিকে ঘুরে গোলা চালাতে হবে। ট্যাংকের মতন জোরে চলতেও পারে না। ট্রেঞ্চ পার হওয়া বা খাড়া চড়াইতেও অতো পারদর্শী নয়। ৭০ টনের লৌহদানব ফার্দিনান্ডকে গোলা মেরে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ছিলো না টি ৩৪'র। এই নতুন ট্যাংক ডেস্ট্রয়ারের জন্য অপেক্ষা করেই হিটলার কার্স্কে জার্মান আক্রমন দু মাস পিছিয়ে দিয়েছিলেন।

প্যানথার অনেকের মতে সবসেরা জার্মান ট্যাংক ছিল। কিন্তু প্যানথার ভালো করে জাঁকিয়ে বসতে না বসতেই এসে গেছিল টাইগার এবং যুদ্ধ শেষ হবার আগে টাইগারের বদলে আরো বড়, আরো ভারী কিং টাইগার। টাইগার ছিলো তার সময়ের একেবারে অপ্রতিরোদ্ধ ট্যাংক। তার কামানের থেকে জোরদার কামান সে সময়কার কোনো ট্যাংকেরই ছিলো না আর টাইগারের সামনের লোহার পাত এতো পুরু ছিলো যে সামনা সামনি গোলা মেরে টাইগারকে প্রায় থামানই যেতো না। পাশ থেকে বা পিছন থেকে আক্রমন করেই শুধু টাইগারকে হারানো যেতো।

বছরে মাঝামাঝি রাশিয়ায় ক্রাস্কে হলো যুদ্ধের বৃহত্তম ট্যাংক লড়াই। এই যুদ্ধের কথাতেই হিটলার বলেছিলেন (অনুবাদে) " it turns my stomch to think about it '। সবাই বুঝেছিলেন এই যুদ্ধের ফলাফলের উপরই বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল অনেকটা নির্ভর করছে।

দুই পক্ষের প্রায় সাত হাজার ট্যাংক ও ট্যাংক ডেস্ট্রয়ার মুখোমুখি। প্রায় একসপ্তাহ ধরে এই লড়াই চলেছিলো। সামনের সারিতে টাইগার ট্যাংক আর ফার্ডিনান্দ ট্যাংক ডেস্ট্রয়ারের ঝাঁক সাজিয়ে যুদ্ধ শুরু হলো। পিছনের সারিতে প্যানথার আর তারো পিছনে আর সব হাল্কা ও মিডিয়াম ট্যাংক। যেন পুরা ভারতের গরুড় ব্যুহ। প্রথমেই যুথবদ্ধ হাতীর লাইন। তার পিছনে রথ , তারো পিছনে অশ্বারোহী ও পদতিকেরা। জার্মান ট্যাকটিক ছিল টি ৩৪'কে অনেক দুর থেকেই (১৫০০ মিটার) গোলামেরে উড়িয়ে দেবে তাদের চলমান লোহার দুর্গ টাইগার ও ফার্ডিনান্দ। টি ৩৪'র পাল্লার কাছেই আসবে না জার্মান প্যানজার বাহিনী।

এই যুদ্ধের সব থেকে বড় মুখোমুখি সংঘাত হয়েছিলো প্রোখোরোভকা ( prokhorovka ) গ্রামে। দুই পক্ষেই প্রায় নশো ট্যাংক নিয়ে লড়াই করেছিলো। ঐ সংকুল যুদ্ধে টাইগারের দুর পাল্লার কামানের relative advantage কাজে লাগে নি । ভোরের আলো ফুটবার আগেই লড়াই শুরু হয়েছিলো। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রনাঙ্গনে ভিসিবিলিটি খুব স্বচ্ছ ছিলো না। সেই সুযোগে টি ৩৪ ট্যাংকেরা হৈ হৈ করে জার্মান ট্যংকের খুব কাছাকাছি এসে গেল। অতো কাছাকাছি থাকলে দুই ট্যাংকের প্রতিরক্ষা ও বর্মভেদী ক্ষমতায় আর কোনো ফারাক থাকে না। ফার্ডিনান্দ ট্যাকের কোনো মেশিনগান ছিল না। রাশান ইনফ্যা¾ট্রী তাই ফার্দিনান্দের কাছে দৌড়ে গিয়ে তার ইনজিনের এয়ার ইন্টেকের ফুটোতে ইন্সেন্ডিয়ারী গ্রেনেড ফেলে দিত। তাছাড়া যখন জার্মানী ৮৮ মিমির কামান তাদের ট্যাংক ও ট্যাংক ডেস্ট্রয়ারে বসানো নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে তখন রাশিয়ান প্রযুক্তিবিদেরা ১২২ মিমি এবং ১৫২ মিমির কামান বসিয়ে দিয়েছেন - এবং সেটাও টি ৩৪'র কাঠামো উপর । ফলে তার ওজন ও খুব বাড়ে নি। ট্যাংকের প্রযুক্তিতে রাশানরা জার্মানদের তুলনায় প্রথম থেকে শেষ পর্য্যন্তই এগিয়ে ছিলো।

এই লড়াই নিয়ে এখনো প্রচুর তর্ক হয়। কথিত আছে টাইগার ট্যাংক গুলি গড়ে তিনটি করে রাশান ট্যাংক ধ্বংস করেছিল। সেই যুদ্ধের একটি বিবরন: " পুরো রনাঙ্গন পুড়ে কালো হয়ে গেছিলো, আর তার মাঝে জ্বলন্ত ট্যাংক গুলি দাউ দাউ করে মশালের মতন জ্বলছিলো। ... একটি টি ৩৪ ট্যাংকে আগুন লেগে গেছিলো আর তার আহত কম্যান্ডারকে ট্যাংকের বাইরে এনে মাটীতে শুইয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সেই মুহুর্তে একটি টাইগার ট্যাংককে দেখা গেলো ধেয়ে আসতে। সেই আহত কম্যান্ডার নিকোলিএভ তখনই তার ধিকি ধিকি জ্বলন্ত ও প্রায় ধ্বস্ত টি ৩৪ ট্যাংকে উঠে ছুটে চললেন সেই টাইগারের দিকে। ফুল স্পীডে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা মারলেন টাইগার ট্যাংকটিকে। দুই ট্যাংকের মুখোমুখী আঘাতে প্রচন্ড বিস্ফোরনে কেঁপে উঠলো রনাঙ্গন । দুটি ট্যাংকই আগুনে জ্বলে খাক হয়ে গেলো।'

বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির সার্বিক হার ঐ প্রথম। কোনো ভাবেই আর রাশিয়ার শীত বা নিজেদের রসদের অভাবকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো গেলো না। তদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও, দুই পক্ষের অস্ত্র ও জনবল সমান থাকা সত্ত্বেও তাদের এই পরাজয় ছিলো সম্পুর্ন পরাজয়। শুধু যুদ্ধেই নয় - প্রযুক্তিতেও তারা পরাজিত হলো। এর পর থেকে, বার্লিনের পতন না হওয়া পর্য্যন্ত নাৎসী বাহিনী শুধুই পিছু হঠবে , লাল ফৌজের বিরুদ্ধে তারা আর কখনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। ততদিনে উত্তর আফ্রিকা থেকে সরে গেছে অক্ষশক্তি। যুদ্ধের আগুন সেখানে আর জ্বলছে না।

১৯৪৪
--------
আমেরিকা আর বৃটেইন , রাশিয়ায় ল্যন্ডলীস প্রোগ্রামে কিছু শেরম্যান আর ক্রুসেডার ট্যাংক পাঠিয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েত নেতাদের সেই সব ট্যাংক একেবারেই পছন্দ হয় নি, বিশেষত: ক্রুসেডারকে। তারা ট্যাংকের বদলে চাইলেন ট্রাক ও জিপ। আড়াই টনের স্টুডেবেকার লরি তাই রাশিয়ান যুদ্ধের বড় হাতিয়ার ছিল।

১৯৪৪ সালের ৬ জুন মিত্রপক্ষের ইনভেশন ফোর্স ফ্রান্সে পা রাখল আর তার তিন সপ্তাহ পরেই রাশিয়ায় শুরু হল সামার ক্যামপেইন। সতেরো লক্ষ রাশান সৈন্য প্রায় আড়াই হাজার ট্যাংক আর দেড় হাজার অ্যাসাল্ট গান নিয়ে বেলোরাশিয়ান ফ্রন্টে নাৎসি বাহিনীকে আক্রমন করলো। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই নাৎসী বাহিনীর মাজা ভেঙে গেলো আর একমাসের মধ্যেই সেই লড়াই শেষ হলো নাৎসি বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে। এই যুদ্ধেই জার্মানি ব্যবহার করেছিলো তাদের সর্বাধুনিক কিং টাইগার ট্যাংক। এই ট্যাংকের কামান ছিলো দারুন শক্তিশালী । অনেক দুর থেকেই শত্রুর ট্যাংক ধ্বংস করতে পারতো। কিন্তু মেশিন হিসাবে এই ট্যাংকে অনেক গন্ডগোল ছিল। ব্রেকডাইন হতো অহরহ। এবং এই ট্যাংকের প্রডাকশন প্রসেস এতই জটিল ছিল যে খুব কমই তৈরী করা যেতো। কিন্তু তবুও জার্মান ট্যাংক ডিজাইনারেরা যেমন ভেবেছিলেন এরকম অভেদ্য অপরাজেয় ট্যাংক হয়ে ওঠে নি কিং টাইগার।

রাশানরা তাদের টি ৩৪ ট্যাংক নিয়ে এতো ই সন্তুষ্ট ছিলো যে নতুন ট্যাংক তৈরী করার কথা বিশেষ ভাবে নি। শেষ পর্য্যন্ত কিং টাইগারের সমকক্ষ একটি ভারী ট্যাংক আই এস টু তারা নামালেন এই বছরের শেষের দিকে। ভিস্টুলার যুদ্ধে এই আই এস টু আর কিং টাইগারের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ফলাফল ছিলো সন্মানজনক ড্র।

তুলনায় পশ্চিম ফ্রন্টে টাইগার ট্যাংক প্রায় হিস্টিরিয়ায় ফেলে দিয়েছিলো বৃটিশ আর আমেরিকান সেনাবাহিনীকে। শেরম্যান দিয়ে ঐ দুই জার্মান ট্যাংকের মোকাবেলা সম্ভব ছিলো না । মিত্র পক্ষ তাই ট্যাংক ধ্বংসের মূল হাতিয়ার হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন তাদের টাইফুন আর থান্ডারবোল্ট ফাইটার বিমানকে। তাদের নামই হয়ে গেছিলো ট্যাংক বাস্টার । যুদ্ধের পরে সমীক্ষা করে দেখা গেছে যে বিদ্ধ্বস্ত জার্মান ট্যাংকের একটা বড় অংশ বিমান আক্রমনেই ঘায়েল হয়েছে।

এর আগে মিলিটারী থিওরী ছিলো ফাইটার প্লেনকে flying artillery হিসাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কিন্তু নরম্যান্ডিতে লড়াইটা হত খুব কাছাকাছি। দূর থেকে কামান দাগিয়ে লড়াই করবার মতন ভৌগোলিক অঞ্চলও সেটি ছিল না। তো সলিউশনটা কি ? উত্তর দিলেন মেজর জেনারেল কুএসেডা। তিনি ওমার ব্র্যাডলিকে বোঝালেন ফ্রন্টে যেমন পদাতিক সেনারা রেডিও মারফৎ নিশানা পাঠায় তাদের পিছনে থাকা হেভি আরটিলারিকে তেমন করে ফাইটার প্লেনদের ও কেন খবর পাঠানো যাবে না ? " this man Quesada is a jewel ' ব্র্যাডলী বললেন। এবং তখন থেকেই CAS AbÑ¡v close air support চালু হলো। এর আগে ট্যাংকে রেডিওর চল ছিল না। এবারে সেটা চালু হল। আক্রান্ত হলেই ট্যাংকেরা বিমানবাহিনীকে খবর দিতো এবং দ্রুত উড়ে এসে তারা রকেট, কামান বা ৫০০ পাউন্ডের বোমা ফেলে জার্মান কামান বা ট্যাংক চুর্ন করে দিতেন। এই ট্যাকটিক প্রচন্ড সফল হয়েছিলো। নর্ম্যান্ডির যুদ্ধে প্রায় ১৫০০ ট্যাংক কবুল করেছিলো নাৎসি বাহিনী। যুদ্ধ শেষে মাত্র ৬৭টি ট্যাংক পালাতে পেরেছিল।

প্রদীপ নিভবার আগে শেষবারের মতন যেমন একবার দপ করে জ্বলে ওঠে তেমনই হিটলার তার শেষ সম্বলটুকু নিয়ে এই বছরে শেষে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মিত্রপক্ষের উপর। হতভম্ব মিত্রশক্তি চিন্তাও করতে পারে নি যে পরাজয়ের থেকে হ্যান্ডশেকিং দুরত্বে দাঁড়িয়ে এতোগুলি নতুন বিমান ট্যাংক কামান নিয়ে জার্মানী তাদের আক্রমন করতে পারবে। প্রথম দিকটায় নাৎসি বাহিনী প্রচুর সাফল্যও অর্জন করেছিল। এই যুদ্ধে একেবারে শেষের দিকে একেবারে নতুন আমেরিকান ট্যাংক পের্শিং খুব লড়াই করেছিলো। জার্মানি পরপর তিনটে নতুন ট্যাংক ( প্যান্থার,টাইগার আর কিং টাইগার) যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসলে ব্রিটেন আমেরিকা - দুদেশের উপরেই চাপ ছিলো নতুন ভারী ট্যাংক দিয়ে সমান সমানে লড়াই করবার। সেই মতন আমেরিকা আনলো নতুন ভারী ট্যাংক পের্শিং। দু একটা যা ছোটোখাটো লড়াই হয়েছিলো তাতে কিন্তু পের্শিং জার্মান কিং টাইগারের সাথে ভালই পাল্লা দিয়েছিলো। কিন্তু লড়াই তখন একেবারে শেষের দিকে। হিটলারের "লাস্ট গামবিট' তাই নিরুত্তাপেই শেষ হল।

১৯৪৫
-------
ইওরোপে যুদ্ধ প্রায় শেষ। একটাই বড়ো লড়াই - খোদ বার্লিন দখলের লড়াই। সেখানে ট্যাংকের যুদ্ধ বিশেষ হয় নি ।

পশ্চিম ফ্রন্টে রাইন নদী পার হবার তুমুল আয়োজন করেছেন মন্টেগমারি। সে এক এলাহী ব্যবস্থা। কিন্তু তিনি ও পারে যাবার আগেই প্রায় হাই তুলতে তুলতে প্যাটন রেমেগেনের সেতু পার হয়ে গেছেন। ফাঁকা মাঠে গোল দেবার এমন বৃথা আস্ফালন মাঠেই মারা গেলো। তবু সে যুদ্ধে মন্টেগোমারি হাজির করলেন নতুন বৃটিশ হেভি ট্যাংক কমেট। এসে গেছে জার্মান টাইগারের যোগ্য বৃটিশ উত্তর ! সবাই খুব খুশি। এবংও উদগ্রীব। কেমন লড়াই করে এই কমেট ট্যাংক। কিন্তু সে আর হলো কই। বাধা দেবার জন্য জার্মান বাহিনীতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না। তাই কমেট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অপরীক্ষিতই থেকে গেলো। তবে বার্লিনের পতনের পর মিত্র শক্তি যখন ভিকট্রি প্যারেডের আয়োজন করেছিলেন তাতে কমেট ট্যাংকই হাজির ছিলো। কমেট ট্যাংকের ঐ টুকুই যা অবদান। জাপানের আত্মসমর্পণ করতে আরো দুই মাস। ট্যাংকের লড়াই খুব কিছু হয় নি। তবে নতুন পের্শিং ট্যাংক ওকিনাওয়া দ্বীপের লড়াইতে ব্যবহৃত হয়েছিল।

বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই ট্যাংককে আক্রমনের প্রধান হাতিয়ার করে দুর্গ নির্ভর অচল রণকৌশলের দিন শেষ হয়েছিলো। যুদ্ধ যখন শেষ হচ্ছে তখন শুধু ট্যাংকই নয়, closed support বিমান বাহিনীর সংযোগে এই মোবাইল লড়াই আরো দ্রুত গতির হয়ে উঠেছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা ভাবতে গিয়ে আমরা অনেক রোমান্টিক কথা ভাবি। বীরত্বের কথা ভাবি। সেসব কথা মিথ্যে নয়। কিন্তু শুধু বীরত্ব বা পৌরুষ দিয়ে বোধহয় নাৎসি বাহিনীর উপর মিত্রপক্ষের জয় নির্ধারিত হয়নি। যুদ্ধের প্রথমাংশে জার্মানির জয়ের পিছনে বিরাট ভূমিকা ছিল প্রযুক্তির এবং উদ্ভাবনী শক্তির। পরবর্তীতে রাশার কাছে যে তারা হারল সে শুধু আদর্শের কাছে পরাজয় নয়, উন্নত টেকনোলজির কাছে পরাজয়। নীরস টেকনোলজি, মোটা চামড়ার ট্যাঙ্ক, বিশ্বযুদ্ধের জয়পরাজয়কে অনেকাংশে নির্ধারণ করেছিল, যে ইতিহাস সাধারণের কাছে উপেক্ষিতই থেকে গেছে।