আপনার মতামত         


কবিতাগুচ্ছ
সুমন রহমান

                ছোটখালার যাওয়া
                -----------------

ছোটখালার মনে নেই, ওকে আমি পালিয়ে যেতে বলেছিলাম
বলেছিলাম, এসো, লুকিয়ে থাকি শূন্য ফুলদানির
অন্তহীন রহস্যের ভেতর
কিংবা মরণশীল দুটো মাছরাঙার সাথে জীবন বদলে নিয়ে
হাওড়ের মধ্যে ডাকাতের মত তাড়া করি ঘুর্ণায়মান প্রপেলারকে


এ-কথা শুনে ওর সূঁচ- ধরা হাত গেল থেমে। ওর চোখ
হয়ে উঠল মেঘাচ্ছন্ন দিনের জোড়াপুকুরের মত সন্ত্রস্ত
সূচিকর্ম ওর প্রিয়। মাছরাঙাদের সমাজে সেলাইয়ের প্রচলন নেই জেনে
কী হাসি তার!
যেন আমার প্রস্তাব বাতিল হয়ে গেছে সুপারি গাছদের বিশেষ বর্ধিত সভায়


ওর ব্যস্ততা ছিল। ভিনদেশী এক রাজকুমারের ঘুমের জন্য
বালিশের ওয়াড়গুলোকে কথা বলতে শেখানোর কাজ, তাই সারাদিন
নিজ আঙুলের সৌন্দর্যে নিজেই সে মুগ্ধ হয়ে থাকত
আমার কথা শুনত কি শুনত না - বৃষ্টি ধরে এলে
আমি শূন্য ফুলদানির ভেতর একা ঘুমিয়ে পড়তাম
ঘুমিয়ে ভাবতাম
প্রপেলার-পাখার অন্তহীন হিমেল নৈ:সঙ্গের কথা


সেই রাজকুমারের ওপর আমার ছিল অসামান্য ক্রোধ
তাই তাকে খুঁজে বেড়াতাম সত্যিকারের টিনের তলোয়ার নিয়ে
ধ্বসিয়ে দিতাম যাবতীয় উইয়ের ঢিবির, তার ঘোড়াটিকে
ধাওয়া করবার জন্য
ভাব রাখতাম দ্রুতগামী বাছুরদের সাথে


একদিন আমার আয়ত্বে এল রূপকের ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা
অনুনয় করে বললাম, খালা, চল বোয়ালমারির বিলে
নিশুতি রাতে তুমি জেলেডিঙি হয়ে ঘুরে বেড়াবে, আর আমি
হ্যাজাক-হারিকেন
কিংবা চলো দূরে, যেখানে তুমি এক বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, আমি এক
উলুঝুলু কাকতাড়ুয়া
নয় আরো দূরে, তুমি পোড়োবাড়ি আর আমি টিনের সেপাই!


সূঁচের কাজ শেষ হলে ছোটখালার জন্য পালকি এল
এল অঘোর শ্রাবণ, আমার চোখ পোড়োবাড়ির জানালা
আমি কাকতাড়ুয়া, আমি টিনের সেপাই, আমি হ্যাজাক- হারিকেন
বর্ষণসিক্ত বাঁধে উঠে অনেকক্ষণ হাত নাড়লাম
ছোটখালার চলে যাওয়া তবু ফুরাল না, চলে যাচ্ছে সে
নিসর্গের সেলাই খুলে হারিয়ে যাওয়া জেলেডিঙির মত।

=============================

                সবুজ বানর
                -----------

কেন যে ভাবতাম দূর অরণ্যের কথা, জানেন বিধাতা
জোড়া-বনস্পতি বৃষ্টিবিদ্যুতের উপহাসে সেখানে চোখামাথা
খোড়লভর্তি ওদের সবুজ বানর - ঝিমাতে ঝিমাতে দেখছিল
আমাকে - কেন যে আমাকেই দেখছিল? জানেন বিধাতা?


দমকা হাওয়া এল একদিন। পরিত্যক্ত গুদামঘরের
ছত্রিশ বছরের জং ধরা দরজা ভেঙে বেরিয়ে এসে সে কী
আক্রোশ তার! দোকানগুলোর শাটার নামল ঝপাৎ ঝপাৎ
একেবারে নিরাশ্রয় হল চারশ চল্লিশ ভোল্টের সব লাইটপোষ্ট


আর কোত্থেকে ওরা - অসংখ্য সবুজ বানর,
বোধ করি চায়ের ষ্টলের নিভন্ত চুল্লি থেকে - বেরুল
দলে দলে। আমার পানাভর্তি পুকুরের কথা ভেবে খুব
হাসি পেল - কেন যে ভাবতে গেলাম ওসব - আর হাওয়া এল


শিলাবৃষ্টি সহ! গত দশকের স্থাপত্য টুকরা টুকরা হয়ে
ছড়িয়ে পড়ছিল আগামী শতকের খরার উপরে-
এই প্রলয়ের জন্য কাকে দায়ী করে স্বস্তি পাই বলো
বসুন্ধরা - দ্বিতীয় বরফ যুগ আমাকে খামোখাই মাংসাশী বানাল!


কেন যে ভাবি নাই পরবর্তী বসন্তের কথা, শোকগ্রস্থ সে
ন্যাড়া ডালগুলো তার কুড়ি মেলছে সাধ্যমত - এদিক ওদিক
মাইল-মাইল বরফে ও জলে ঝিকিয়ে উঠছে রোদ, নূহ নবী
শুকাতে দিয়েছে নৌকা, ক্লোনড পশুপাখি, হাইব্রিড ধান ও বারুদ!

==============================

                অমরতার চেয়ে সত্য
                -------------------

তোমার অন্তর্ধান সকাল দশটার যাদুকরী রোদের ভেতর
অতএব মেনে নিই এই বিরহ মাত্র কয়েক ঘন্টার


এটুকু সময়ের মধ্যে ঘুরে আসতে হবে অনেকগুলো উপদ্বীপ
অনেকগুলো পাহাড়ি খাড়ির তলদেশের মাটির নমুনা পাঠে
জেনে নিতে হবে কেন মহাদেশগুলো পরস্পরের কাছে ক্রমশই
অসহনীয় হয়ে উঠছে
জানতে হবে ঝাউয়ের একটিমাত্র প্রজাতিই কেন ক্রন্দনশীল!

এসব প্রশ্নের তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের অনেক নিচে, ফলত
বাতাসমাত্রই শৈত্যপ্রবাহ, আমরা নৈকট্য বোধ করতাম।
অর্থাৎ আমার মহিষের চামড়া -টানানো- আকাশের নিচে
তোমার চকিত লাবণ্য! আমাকে জানতে হত যা কিছু ঘটেছে
এবং যা কিছু ঘটেনি, তাই আমি জানতাম কার্যকারণ হচ্ছে
যাবতীয় অভিজ্ঞতার প্রধান মুদ্রাদোষ। তবু যখন :


দেশান্তরী তুতসীদের দেখে তোমার কান্না পেত, আমি আশ্বাস দিতে গিয়ে
বলেছিলাম, দশ হাজার বছর আগে মহাসমুদ্রে ভেসে-বেড়ানো এক ছন্নছাড়া
মহাদেশের নাম আফ্রিকা।


বিচ্ছিন্নতাবাদ তোমার পছন্দ নয়, কিন্তু চাঁদের বিচ্ছেদ কি তোমাকে
উপহার দেয়নি একটি অতলান্তিক সমুদ্র!


তাছাড়া অনেকবার বলেছি, তালব্য-শ' লিখতে গিয়ে তুমি কতটা যত্নশীল,
এ থেকে বোঝা যায় তোমার যৌবন ঠিক কতখানি ফুটেছে!


আমি ভয় পাই সেসব কথা যা তোমাকে বলা হয়নি, এরা আমাকে দিয়েছে
অনিদ্রা আর আনন্দ, খুব সপ্রতিভ কোন আড্ডার মর্মমূলে এরা থেকে গেছে
পিত্তথলির পাথরের মত নীরব ও বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে...

যেমন ধরা যাক, ভেড়াদের আমি ভালবাসি তাদের পর্যটকসুলভ পেশাদারি
নির্লিপ্তির জন্যে, এবং জেনেছি হস্তিছানার জলক্রীড়া নিজ-প্রতিবিম্ব-দর্শনে
অনীহা ছাড়া আর কিছু নয়।


এসব বিষয়ে নিশ্চিত হতে গেছি। সেখানে দেখেছি
গোলকধাঁধা তৈরি করেছে তোমার চক্ষুজোড়া
আহ্লাদী হয়ে উঠেছে তোমার স্তনবৃন্ত
তোমার কুন্তলরাশি ঝপাৎ বৃষ্টিপাতের মত
আমাকে লুকিয়ে ফেলেছে
যাবতীয় চিন্তাশীলতার কাছ থেকে


ভাবলাম, আমি বোধ হয় সূর্যকলসের ফাঁদে-পড়া দার্শনিক পতঙ্গমাত্র
জানা নেই ভুবনচিলের পা কেন খুঁজে ফেরে গগনশিরীষ শাখা
মফস্বলী কাকের কেন এই এলুমিনিয়ামের এন্টেনা


অনিবার্য এবং অবোধ্য, স্বাভাবিক কিন্তু গাণিতিক নয়


বরং জরুরি বেলা একটায় তোমার ফিরে আসা
মিনিট - স্থায়ী পুনর্মিলন, সমগ্র জীবনের
যৌথতার চেয়ে সত্য
অমরতার চেয়ে সত্য অমরতার দিকে যাওয়া