আপনার মতামত         


শুরু হয়ে গেছে স্ট্রিপটিজ, আমাদের রাতের উৎসব
সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়

এই লেখার পুরো রচনাশৈলীটাই উৎপল কুমার বসু ও হুতোম প্যাঁচার নক্সা থেকে ঝেড়ে দেওয়া -- লেখক।


ফিরে এসে দেখি আমার থার্মোডিনামিক্স, মেশিন ডিজাইন আর ফ্লুইড মেকানিক্স বই তিনখানা বেচুরা বেচে দিয়েছে। দরজা খুলে রেখে যাওয়াই আমার ভুল হয়েছিল। তিন তলায় বেচুর ঘরে গিয়ে দেখি বই বেচার পয়সায় জমিয়ে মেহফিল বসেছে। যেতেই সবাই হই হই করে ওঠে এসো এসো এসো। বেচু বলে থার্মোডিনামিক্স বইটা বেঁচে গেছে, নিয়ে যাবি? আমাদের এই তিনতলা হোস্টেলে সবকটা ছেলে জাতে মাতাল হলেও তালে আল্লারাখা, সুপার অব্দি। মাথা গরম করলে ফাঁকতালে মালটাও ফসকে যেতে পারে, তাই ওদের সঙ্গেই বসে যাই। ওরা আমাকে বিয়ার আর বাংলার নাড়িভুঁড়ি পচানো ককটেল বানিয়ে দেয়, তিঅ গ্লাস পরপর খেয়ে প্রাণের আরাম হয়, আত্মায় শান্তির প্রলেপ পড়ে। এমন সময় সুপার আসেন -- শুনেছ, অনিকেতকে পাওয়া যাচ্ছেনা, হিয়া বলল সেমিস্টারেও বসছেনা। ও স্যার আন্তর্জাতিক চোরাচালানচক্রের সঙ্গে যুক্ত -- বেচু বলে -- গতবার শীতে নেপাল থেকে ইউরেনিয়াম এনেছিল পকেটে করে, আমাদের ভদ্‌কা খাইয়েছিল। জেলে টেলে খোঁজ করতে পারেন। চোরাচালান? সন্ত্রাসবাদ? আমেরিকা বিরোধী বিক্ষোভ? আলফা কে এল ও? -- সুপার খেঁকিয়ে ওঠেন -- ঐসব পলিটিক্স এখানে চলবেনা বলে দিলাম। আমাদের হোস্টেল হবে নির্জন এক উপত্যকা, সেখানে সকাল বিকেল লাল নীল টুপি পরে খেলতে আসবে স্কুল ছেড়ে আসা বালকেরা, আর আমার হাতে থাকবে হ্যামলিন বাঁশি। স্যারের দু:খ আমরা বুঝি। বাড়ির দরজা খুললেই, ভিতরে হাতাহীনা স্থূলকায়া খেঁকি বুলডগ, সুপার তাই ডিপার্টমেন্টের সহকর্মিনী হিয়ার দিকে হাত বাড়িয়েছেন, যে দিকে ধনধান্য পুষ্পভরা হৃদয় থৈ থৈ উষ্ণ ও আর্দ্র ভূমধ্যসাগরীয় বেলাভূমি,যেদিকে টপলেস বিচ লাইট হাউস গ্লোব ও নিউ এম্পায়ার, মিনিস্কার্টে শ্যারন স্টোন ও সাদা শরীরে কালো স্ট্র্যাপের কনট্রাস্ট.... হিয়ার পশ্‌চাদ্দেশ বর্তুলাকার ও সে পাছা দুলিয়ে হাঁটে।

কাগজে অ্যাড দিলে হয়না? দ্বিতীয় পাতায় নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণায়? অনিকেত তুমি যেখানেই থাকো পত্রপাঠ হোস্টেলে চলে এস। তোমার ফিজিক্যাল লোকেশন নিয়ে আমরা ইনডিসিশানে ভুগছি। ইতি তোমার সহপাঠী কোয়ার্কবৃন্দ। --কিন্তু অ্যাডে তো ছবি লাগবে -- বেচু বলে। --কেন? ছবির কি সমস্যা? গত শীতেই শাশ্বত তুলল যে এক রিল?-- সেই কথাই তো বলছি স্যার --বেচু বলে -- শাশ্বত তো ছবি তুলেছিল ঠিকই, কিন্তু বেচুর পকেটে তো ইউরেনিয়াম ছিল, রেডিয়েশানে সব নেগেটিভ নষ্ট হয়ে গেছে। --একটাও কি বাঁচেনি? বাঁচাতে পারেনি শাশ্বত? ধনা যায় শাশ্বতর খোঁজে। ফিরে এসে জিভ কেটে বলে শাশ্বতর ঘরে সাথী এসেছে স্যার। বলে দেয়েছে ন্যাশানাল এমার্জেন্সি ছাড়া কেউ যেন ডিসটার্ব না করে।

কিন্তু ইউরেনিয়াম কি পকেটে করে এনে বাজারে বেচে দেওয়া যায়? মাল খেয়েছি বলে কি পাপোষকে বালিশ বলবে নাকি? -- আলবৎ যায় -- বেচু বলে -- মাল খেয়েছিস বলেই তো বলছি, গতবার ভদ্‌কা তুই খাসনি? -- ভদ্‌কা খেয়েছি বেশ করেছি, তুই আমার বই বেচে দিলি কেন? আমাদের তুখোড় ঝগড়া লেগে যায়। ফয়সালা চাইইই--, বেচু বলে, নইলে মাল খাওয়া বন্ধ। বোতল রিফান্ড করে বই নিয়ে আসব। বিভিন্ন সমাধানসূত্র খোঁজার চেষ্টা করা হয়। ধনা বলে টস করি স্যার? ডুয়েলের প্রস্তাবও আসে। কিন্তু শ্রেষ্ঠ ফন্দিটা সুপারের মাথা থেকেই আসে। এতগুলো ছেলেকে কি এমনি চরিয়ে খাচ্ছেন? ঐ জন্যেই তো উনি না থাকলে চোখে অন্ধকার দেখি আমরা। সুপার প্রস্তাব করেন, ক্যাম্পফায়ার করা হোক। এসো হৃদয়ের সব মালিন্য আমরা আগুনে সমর্পণ করি। সবাই হই হই করে ওঠে। অবশিষ্ট থার্মোডিনামিক্স বইটার সব পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলা হয়। পাশের বিভিন্ন ঘর থেকে আরও কিছু খাতা ও বই চলে আসে। ধনা তার ডেবোনিয়ারের প্রবাদপ্রতিম সংগ্রহ উজাড় করে দেয়। তুমি কি দেবে বেচু? হায় বেচুর নিজের বলতে আর কিছুই নেই, সমস্ত বই ই কবেই বেচা হয়ে গেছে। কিন্তু এই বাজারে রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ হিট করে যান, ক্লাসিক সাহিত্যগুলি চিরকালই আমাদের নব নব দ্যোতনায় উদ্ভাসিত করে। বেচু শ্রেষ্ঠদানের ভঙ্গীতে পাজামাটা খুলে দিয়ে জাঙ্গিয়া পরে বসে। শাশ্বতর গার্লফ্রেন্ড সাথী ঘরের সামনে এসে কি করছিসরে তোরা? বলেই চোখ বন্ধ করে। সে বেচারি দীর্ঘস্থায়ী রমণসুখ শেষ করে শাশ্বতর ঘর থেকে বেরিয়ে একটু খেজুর করতে আসছিল। তার চোখ থেকে অর্গ্যাজমের তৃপ্তি ঝরে যায়।

আমরা সব আলো নিভিয়ে দিই। সমস্ত বই ও একটি পাজামা বারান্দায় জড়ো করা হয়। সাথী চোখ বুজে আমার কানে কানে বলে, কিন্তু সব বই জ্বালিয়ে দিলে তোরা প্রিপ্‌রেশান নিবি কিকরে? ওভারহিয়ার করে বেচু খ্যাঁক করে ওঠে -- একি সেমিস্টার না একাডেমি পুরস্কার যে প্রিপারেশান লাগবে? তার চোখদুটো কুকুরের চোখের মতো জ্বলে,গলার আওয়াজ ক্রমশ: মেঘগর্জনের মতো হয়ে ওঠে। তাতে আমাদের হোস্টেল বাড়ি কাঁপতে থাকে। পাশের রাধাচূড়া গাছ থেকে কিছু ফুল ঝরে পড়ে। কালো আকাশে একটি ধূমকেতু ও একঝাঁক সাদা বক দেখা যায়, তারা দূরের টাওয়ার ক্লকের উপর দিয়ে,লর্ডস ওভাল গ্রেভ ইয়ার্ড পার করে একঝাঁক পথভোলা ইউ এফ ওর মতো আমাদের হস্টেলের দিকে এগিয়ে আসে। সাথী ভয় পেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি ও ফাঁকতালে তাকে বুকে স্থান দিই, সান্ত্বনা দেবার জন্যে একটা চুমু ও খেয়ে নিই। মুখ তুলে দেখি জনৈক জ্যোতির্ময় পুরুষ আমাদের মধ্যে উপস্থিত। তাঁর মাথার পিছনে দিব্য আলোকচাক্‌তি,পরণে ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি ও নীল জিন্‌স, হাতে টাইটান কোয়ার্জ, সর্বাঙ্গ দিয়ে ফুটে বেরোচ্ছে ফসফরাসের মতো এক অপার্থিব জ্যোতি। উনি বকের পিঠে চড়ে এসেছেন। সাথী আমার কানে কানে বলে, হু দা হেল ইজ হি? আমি ওর পাছায় হাত দিই। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের মতো ভরাট গলায় দিব্যকান্তি পুরুষ বলেন আমি কল্কি অবতার। তোমাদের এই সমবেত ত্যাগ আমাকে মোহিত করেছে বৎস। বল কি বর প্রত্যাশা কর। -- বীরের প্রতি বীরের যে ব্যবহার মহারাজ, সুপার বলেন। উনি কমপ্লিটলি ঘেঁটে গেছেন, স্পষ্ট বোঝা যায়। ডায়ালগ ভুলে না গেলে এখানে বলার কথা ছিল, যে সম্পদ আমাকে অমরত্ব দেবেনা তাহা লইয়া কি করিব প্রভু? আমি/আমরা অমরত্বের পিয়াসী। সাথী হাসছে দেখে সাহস করে এবার ওর বুকে হাত দিই।

--নাআআআআআআআআআআ --বেচু বলে, তার গলায় ক্রুদ্ধ অ্যালসেশিয়ানের গর্‌র্‌র্‌র্‌। বানানো সংলাপ সে আর বলবেনা, বোঝা যায়। অমৃত নয়, -- বেচু বলে -- শুধু একটা প্রশ্নের সমাধান চাই। -কি সে প্রশ্ন? দিব্যকান্তি জ্যোতির্ময়ের ভ্রূ কুঞ্চিত হয়, -- থার্মোডিনামিক্স সংক্রান্ত? না সেমিস্টারের কোয়েশ্‌চেন পেপার? একাডেমি পুরস্কার পেতে চাও নাকি? জবাবে বেচু ঘাড় দুলিয়ে সেই প্রশ্নটি ই করে বসে, যা শুধু তার পক্ষেই করা সম্ভব -- ইউরেনিয়াম কি খোলা বাজারে বেচা যায়? দিব্যকান্তির ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে যায় -- শুধু এই টুকু? আর কিছু না? আজ, এতদিন পরেও সেই অবাক বিস্ময়ের হাসি চোখে ভাসে, যদিও অস্বীকার করি কিকরে ঐ মোক্ষম মূহুর্তে এ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন জীবনের কাছে আমাদের করার ছিলনা। -- বেচতে চাইলে কি বেচা যায়না বেচু? শুধু বেচতে জানতে হয়---, জ্যোতির্ময় বলেন, কই তোমাদের ক্যাম্পফায়ার শুরু হবেনা?

স্তূপীকৃত দাহ্যবস্তুতে অতএব অগ্নিসংযোগ করা হয়। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন। পুরুষের পরিত্যক্ত পাজামায় মুখ রেখে নির্বিবাদে পুড়ে যায় ডেবোনিয়ার-নগ্নিকারা, আমরা সবাই তাদের ঘিরে গোল হয়ে বসি। পুড়তে থাকে থার্মোডিনামিক্স,মসৃণ ত্বক ও সভ্যতার ইতিবৃত্ত। আদিম গুহামানবের মত নগ্ন বেচু সবার গ্লাসে গ্লাসে বিয়ার আর বাংলা ঢেলে দেয়। আমি আর সাথী একই গ্লাস থেকে গিলে নিতে থাকি তরল আগুণ, ব্যবধানরহিত আমাদের গা দিয়ে একই সাথে তা ক্রমশ: মিশে যেতে থাকে যৌথ শিরা ও ধমনীতে। সাথী জিভ দিয়ে আমার জিভ টেনে নেয়, শরীর দিয়ে আমার শরীর শুষে নেয়। আমরা ক্রমশ: মিলে মিশে যেতে থাকি। শরীর থেকে শীতের পাতার মতো ঝরে যায় পোশাক, শুরু হয়ে যায় ক্যাম্পফায়ার, আমাদের রাতের উৎসব।