বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

চিকিৎসক রোগী সংঘর্ষের উৎস সন্ধানে - শেষ পর্ব

ডা. সিদ্ধার্থ গুপ্ত

«আগের পর্ব

তৃতীয় পর্ব : রাষ্ট্র এবং কর্পোরেট

চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগী এবং রাষ্ট্র ছাড়াও আর এক পক্ষের উপস্থিতি, যা যত দিন যাচ্ছে ক্রমশ প্রবলতর হয়ে উঠছে, তা হল বেসরকারি চিকিৎসা পরিষেবা। একে তিনটি ভাগে ভাগ করা চলে। একটি ক্ষুদ্র অংশ হল দাতব্য, স্বল্পমূল্যের বা বিনামূল্যের পরিষেবা, যাতে যুক্ত আছে নানা ধরনের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও (অসরকারি সংস্থা)। এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি এবং আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নিজস্ব হাসপাতাল, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে তাদের কর্মচারীদের ও তাদের পরিবারবর্গকে নিঃশুল্ক চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে থাকে। যেমন, ভারতীয় রেলওয়ে, বিভিন্ন পোর্ট ট্রাস্ট, কোল ইন্ডিয়া, স্টিল অথরিটি প্রভৃতি। বেসরকারি সংস্থার মধ্যে টাটা, রিলায়েন্স প্রভৃতিদের কর্মচারী চিকিৎসা পরিষেবা খুবই উন্নত। আগে উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিতে নিজস্ব স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চিকিৎসকের মারফত স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানের এক সুসংবদ্ধ ব্যবস্থা ছিল, যা এখন ভেঙে পড়েছে। নতুন তৈরি হওয়া পরিষেবা ভিত্তিক শিল্পগুলিতে (যেমন, তথ্যপ্রযুক্তি) নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য মালিকপক্ষ নিজস্ব কোন স্বাস্থ্য পরিষেবা গড়ে তোলেননি। তারা কর্মচারীদের জন্য হয় সরাসরি আর না হয় বিমার মাধ্যমে কর্পোরেট হাসপাতাল থেকে পরিষেবা কিনে থাকেন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রটি হল বেসরকারি ডাক্তারবাবুদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস। এর গুরুত্ব এখনও কম নয়, যদিও কর্পোরেট স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান চাপে অনেক ব্যক্তিগত পেশাজীবী চিকিৎসকই বিপন্ন বোধ করছেন। অনেকে বিপদ বুঝে বিভিন্ন কর্পোরেট হাসপাতালে নিজেদের ব্যবসা বিক্রি করে দিয়েছেন এবং বেতন ও কমিশনভুক কর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছেন। এরপরে রয়েছে পাড়ার বা এলাকার ছোট নার্সিংহোম, মাঝারি নার্সিংহোম বা রোগ নির্ণয় কেন্দ্র—যা চিকিৎসক বা চিকিৎসা ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন। বিগত দুই দশকে প্রোমোটার শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশ এইসব কেন্দ্রে উদ্বৃত্ত কালো টাকা লগ্নি করেছেন। এইসব বাদ দিলে বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রধান এবং ক্রমবর্ধমান অংশটি হল কর্পোরেট হাসপাতাল। কলকাতায় মূলত বাইপাসের দুইধারে গত দুই দশক থেকে গজিয়ে ওঠা নানা তিনতারা, চারতারা, পাঁচতারা হাসপাতাল। আগেই বলা হয়েছে নব্বইয়ের দশক থেকেই তদানীন্তন বামফ্রন্ট সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বিপুল সরকারি ভর্তুকিতে (প্রায় বিনামূল্যে জমি, কম শুল্কে জল, বিদ্যুৎ বা অন্য পরিকাঠামো, পাঁচবছর ধরে কর-ছাড় ইত্যাদি) এরা ফুলে ফেঁপে উঠেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রীয় বিমা যোজনা বা রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পেও এদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে জনগণের করের টাকা তুলে দেওয়া হচ্ছে এইসব কর্পোরেট হাসপাতালের হাতে। প্রস্তাবিত ‘মোদীকেয়ার’, যাতে ১০ কোটি পরিবারের ৫০ কোটি মানুষ পরিবার পিছু বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমার সুযোগ পাবেন বলে দাবি, সেই সরকারি অনুদানেরও সিংহভাগও যে গিয়ে ঢুকবে এইসব স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীদের পকেটে তাতে সন্দেহ নেই। কর্পোরেট অপকীর্তি। আজ চিকিৎসকদের উপর রোগী বা পরিজনদের যে ক্রোধ, বিক্ষোভ বা ক্ষেত্রবিশেষে যে আক্রমণ তার অন্যতম প্রধান কারণ হল বেসরকারি চিকিৎসা বিক্রেতা ও কর্পোরেট হাসপাতালগুলির সীমাহীন লালসা, দুর্নীতি এবং দায়িত্বহীনতা। তুচ্ছ কারণে বা অপ্রয়োজনে রোগীদের ভর্তি হতে বাধ্য করা, তাদের ঘাবড়ে দিয়ে অর্থ উপার্জনের জন্য ভীতি প্রদর্শন, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার, ছুতোনাতায় রোগীকে দিনের পর দিন কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র বা ভেন্টিলেটারে চাপিয়ে রাখা, পরিকল্পিত অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রেও নানা প্যাকেজে ভর্তি করে পরে দু- গুণ বা তিন-গুণ বিল করা—এমন কোন অনৈতিক কাজ নেই যা এইসব ব্যবসাকেন্দ্রগুলি করতে না পারে।

দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি যে রক্তকরবীর রাজার মতো অলক্ষ্যে থাকা মালিকেরা সকলেই এইসব রোগী-বিরোধী দুর্নীতির কাজ করিয়ে থাকেন সামনে থাকা চিকিৎসকদের মাধ্যমে, যারা পরিষেবা বিতরক। হাসপাতালগুলিতে তলার স্তরের চিকিৎসকরা অনেক সময় ইচ্ছের বিরুদ্ধেও চাকরি বাঁচাবার জন্য এসব কাজ করতে বাধ্য হন। উপরের স্তরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অনেকেই আবার এইসব দুষ্টচক্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, একথা বললে বোধহয় ভুল হবে না। এদের অনেকেই রোগী দেখার ন্যায্য প্রাপ্য অর্থের ওপর মোটা লভ্যাংশ বা কমিশন পেয়ে থাকেন রোগীকে ভর্তি করা, (এড়ানো সম্ভব এরকম) অস্ত্রোপচার, এবং কতদিন রোগী ভর্তি রইলেন, তার ওপর। হাসপাতালের স্বার্থ এবং বরিষ্ঠ চিকিৎসকদের স্বার্থ এক্ষেত্রে এক হয়ে যায়। বৈদ্যুতিন চ্যানেলে ঘনঘন মুখ দেখানো বেশ কিছু চিকিৎসক হাসপাতালগুলির আংশিক মালিকানা ভোগ করে থাকেন মেডিকেল ডিরেক্টর হিসেবে। কিছুদিন আগে ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ৯১ জন রোগী এবং ২ জন সেবিকার মৃত্যু ঘটেছিল। সে স্মৃতি আজও মলিন হয়ে যায়নি। প্রাথমিক গ্রেপ্তারি এবং মামলা-মোকদ্দমার পর হাসপাতালটির মালিকানার হস্তান্তর ঘটেছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কারও শাস্তি হয়নি। ঐ সময় জানা গিয়েছিল, অতি-প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক ডা. মণি ছেত্রীর নামেই ঐ হাসপাতালের লাইসেন্স, এবং তিনি ঐ হাসপাতালের একজন অংশীদার। ফলে তাঁকে কিছু দিনের জন্য কারাবরণ করতে হয়। এইরকম বহু মেগা-বিশেষজ্ঞ কার্যত কর্পোরেট হাসপাতালগুলির আংশিক মালিকানা ভোগ করেন, যদিও বিষয়টি প্রায়শ গোপনে থাকে। ফলে হাসপাতালের লভ্যাংশ নেব অথচ দুর্নীতির দায়ভাগ নেব না— এ প্রায় দস্যু রত্নাকরের পরিবারের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

মজার কথা, সম্প্রতি দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে রাজ্য সরকার প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্য কমিশনের এক প্রধান ও বরিষ্ঠ চিকিৎসকও একটি মেগা হাসপাতালের আংশিক মালিক। | এই ধরণেরই একজন হৃদ-শল্যবিদ ডাক্তার “পড়তে হয় নাহলে পিছিয়ে পড়তে হয়” শীর্ষক বাজারি পত্রিকার উত্তর সম্পাদকীয়তে দাবী করেছিলেন যে চিকিৎসকদের নিধিরাম বানিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি আরও লিখেছিলেন যে সারা ভারতবর্ষে বড়জোর ২০ শতাংশ ডাক্তার সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করছেন। বাকি ৮০% ডাক্তার প্রাইভেট প্র্যাকটিশ নামক “দিনমজুরি” করছেন। অর্থাৎ তারা হচ্ছেন প্রযুক্তি শ্রমিক। এই যুক্তি সর্বৈব মিথ্যা, কারণ প্রাইভেট প্র্যাকটিসরত চিকিৎসকরা মোটেও শ্রমিক নন। তারা ব্যক্তিগত জ্ঞানের বিক্রেতা এবং চিকিৎসা পরিষেবা পণ্যের বিক্রেতা। এই পণ্যের মুনাফা বা লাভের মালিক তারাই। শ্রমিকরা কেবলমাত্র মালিকের কাছে নিজেদের শ্রম বিক্রি করেন এবং তাদের উদ্বৃত্ত শ্রমের কারণে যে লাভ হয় তা মালিককে ধনী করে। চিকিৎসকরা পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী হিসেবে মালিক শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত। হাসপাতাল, নার্সিংহোম ও রোগনির্ণয় ক্ষেত্রের মালিক-ডাক্তাররা সরাসরি বুর্জোয়া। তাদের শ্রমিক বানিয়ে সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা মালিক শ্রেণীরই আর এক চক্রান্ত। চিকিৎসকদের (সবাই নন) দুর্নীতির বিষয়ে যে তথ্য বর্তমান লেখকের কাছে আছে, তা পুরোপুরি নথিবদ্ধ করলে অষ্টাদশপর্ব মহাভারত না হোক, অন্তত সপ্তকাণ্ড রামায়ণ হতে বাধা নেই। এসব নিয়ে আমার বাবা প্রয়াত ডাঃ পার্থসারথী গুপ্ত, একসময় সংবাদপত্রে নিয়মিত পত্রাঘাত করতেন। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গ মেডিকেল কাউন্সিলের সভাপতি এক প্রখ্যাত চিকিৎসক, যিনি বাবার বিশিষ্ট বন্ধু ও সহপাঠীও ছিলেন, একদিন আমাদের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করেন যে কেন তিনি এসব ময়লা কাপড় প্রকাশ্যে কাচছেন (cleaning dirty linen in public)! বাবা প্রত্যুত্তর দেন, সহপেশাজীবী চিকিৎসকরা কাপড় ময়লা না করলে তা প্রকাশ্যে বা ঘরের ভেতর, কোথাওই কাচার প্রয়োজন হবে না। | সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার উল্লেখ করি। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আমার অনুজ এক চিকিৎসক দীর্ঘদিন বিদেশে কাটিয়ে কিছুদিন আগে দেশে ফিরে আসেন এবং একটি মেগা হাসপাতালে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে যোগদান করেন। তার নামের পিছনে দেশি বিদেশি ডিগ্রীর কোন অভাব নেই। মাস তিনেক পরে ঐ হাসপাতালের প্রধান অ-চিকিৎসা অধিকর্তা তাকে ঘরে ডেকে বলেন যে তাঁর কনভারশন রেট’ সন্তোষজনক নয়, ফলে তাকে আর ঐ হাসপাতালের বহির্বিভাগে বসতে দেওয়া যাবে না। বহু পড়াশুনা করা ঐ চিকিৎসক ইতিপূর্বে তিনটি দেশে কাজ করেছেন কিন্তু কনভারশন রেট’ শব্দগুলির সঙ্গে তিনি পরিচিত নন। তিনি এর অর্থ জিজ্ঞেস করলে জানানো হয়, অন্তত ৬০% আউটডোর রোগীকে বাধ্যতামূলকভাবে হাসপাতালে ভর্তি করতেই হবে এবং তার মধ্যে অধিকাংশ রোগীর প্রয়োজন থাক বা না থাক, অস্ত্রোপচার করতে হবে। শুনেছি, প্রায় সমস্ত কর্পোরেট হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপর এই চাপ দেওয়া হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা তা মেনেও নেন। সরকারি এবং বেসরকারি চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ যে কমিশনজীবী, তা আজ সাধারণ মানুষ বেশ ভালোভাবেই জানেন। প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ উৎকোচের মধ্যে আছে ছোটখাট উপহার থেকে নগদ টাকা, নানা ধরনের গৃহস্থালীর জিনিস, ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি, মহিলা চিকিৎসক বা চিকিৎসকদের স্ত্রীর জন্য গহনা থেকে আরম্ভ করে চিকিৎসা-বিজ্ঞান চর্চার নামে সপরিবারে বিদেশ ভ্রমণ পর্যন্ত। প্রতি সপ্তাহে কোন হোটেলে সেমিনারের নামে আপ্যায়নের কথা বলাই বাহুল্য। এখন আয়কর দপ্তরের কড়াকড়ির জন্য অবশ্য ওষুধ কোম্পানি ও মেগা হাসপাতাল বা অন্যান্য উৎকোচদাতারা কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে কাজ করে থাকেন এবং বহু চিকিৎসকই চেকে প্রোমোশনাল মানি ইত্যাদি নানা নামে অর্থ গ্রহণ করেন। চিকিৎসকেরা ভাবেন, তাদের এই দুর্নীতির কথা আমজনতার অজানা, কিন্তু জনতা জনার্দনের কিছুই অজানা নয়। তারা বাধ্য হয়ে চিকিৎসকের কাছে যান, কিন্তু পিছনে তাঁদের গালিগালাজ করতে, এমনকি লাঞ্ছনা করতেও ছাড়েন না।

বর্তমান নিবন্ধে বারবার বলেছি, সব চিকিৎসক মোটেই কদাচারের সঙ্গে যুক্ত নন। অধিকাংশ চিকিৎসক রোগী দরদী। অনেকেই বিনাপয়সায় বহু রোগী দেখেন, তাদের ওষুধ জোগাড় করে দেন, এমনকি সারারাত রোগীর পাশে জেগে থাকেন, প্রয়োজনে নিজের রক্ত দিয়ে রোগীকে বাঁচান। আমার স্থির বিশ্বাস, এখনো ৮০% চিকিৎসকই তাদের পেশার মর্যাদা উর্দ্ধে তুলে ধরেন। কিন্তু কম- বেশি ২০% চিকিৎসকদের দুর্নীতিতে সমস্ত চিকিৎসকদের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত হচ্ছে এবং সাধারণ জনতার মনে তীব্র বৈরিতার সঞ্চার হচ্ছে, যা কোন কোন জায়গায় চিকিৎসকদের ওপর হামলায় রূপান্তরিত হচ্ছে ; এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যা হয়, প্রকৃত দোষীদের পরিবর্তে বহু ক্ষেত্রেই সৎ, দরদি চিকিৎসকরা আক্রান্ত হচ্ছেন। হিপোক্রিটাসের শপথের সঙ্গে সঙ্গে যতদিন না চিকিৎসককুল নতুন শপথ গ্রহণ করবেন যে তারা ঔষধ কোম্পানি, রোগনির্ণয় কেন্দ্র, মেগা হসপিটাল, ডাক্তারি যন্ত্র প্রস্তুতকারক কোম্পানি প্রভৃতি থেকে কোন উৎকোচ গ্রহণ করবেন না, ও ঐ সব সংস্থাকে খুশি করতে গিয়ে রোগীস্বার্থ বিরোধী কোন কাজ করবেন না, এবং অন্য ডাক্তাররা এসব কাজ করলে তার প্রতিবাদ করবেন, ততদিন পুলিশ কেন, মিলিটারি দিয়েও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়।


চতুর্থ পর্ব : দুর্নীতির খতিয়ান”

  কর্পোরেটের হাতছানিতে পেশাগতভাবে ‘মহাকুলে’ জন্ম মেধাবী চিকিত্সকদের অনেকেই আজ বিভীষণের মত রাঘব দাস’। দিল্লীর ম্যাক্স হাসপাতালে শিশু বা ভ্রূণমৃত্যুকে কেন্দ্র করে এক বিক্ষোভ ও অভিযোগের প্রেক্ষিতে দিল্লীর রাজ্য সরকার ঐ মেগা হাসপাতালের অনুমতিপত্র বাতিল করেন। বিষয়টি আদালতে যায় এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনুমোদন ফিরে পান। এ সবই ঠিক আছে। আইনী বিষয়। কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা হল ম্যাক্স হাসপাতালের পক্ষে দাঁড়িয়ে দিল্লী ডক্টরস্ অ্যাসোসিয়েশনের প্রায় ৮০ হাজার ডাক্তার সরকারকে হুমকি দিলেন যে হাসপাতালের লাইসেন্স ফেরৎ না দিলে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট করবেন। রোগী দেখবেন না। কলকাতারও এক আর্থিক সংস্থা পরিচালিত নামী বেসরকারী হাসপাতালে মুখ্য প্রশাসক ভদ্রমহিলা মৃত রোগীর আত্মীয়দের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং নিজেকে “এলাকার সবচেয়ে বড় মস্তান” হিসাবে দাবি করেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সাথে কোনো বিতণ্ডা হয়নি। অথচ আশপাশের তিনটি কর্পোরেট হাসপাতালের ৪০ জন চিকিৎসক সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে দাবি করলেন ঐ সবচেয়ে বড় মস্তান মহিলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে কোনো আইনী ব্যবস্থা নেওয়া চলবে না। সত্য সেলুকাস! জানতে ইচ্ছা করে এই ধরণের ডাক্তারবাবুরা কি ঐসব ব্যবসাকেন্দ্রে নিজেদের শ্রম বিক্রি করছেন না “ফাউস্ট” এর মতো নিজেদের আত্মাকেও বেচে দিয়েছেন? অথচ এইসব বিরাট বিরাট বেসরকারি হাসপাতালের যেসব অন্তহীন কীর্তিকাহিনী প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে তা ভয়াবহ। এই প্রবন্ধে আগেই বলা হয়েছে যে বর্তমান দুনিয়ায়, যেখানে কারিগরী শিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে, তথ্য প্রযুক্তির ফোলানো বেলুন অনেকটাই চুপসে গেছে, পরিষেবা ক্ষেত্রে দারুণ অনিশ্চয়তা—সেখানে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবসার বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রায় ১৫%। বোফর্স, রাফেল, অগুস্তা হেলিকপ্টার ইত্যাদি অস্ত্র ব্যবসা বাদ দিলে স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসার ব্যবসাতেই বর্তমানে সারা পৃথিবীতে প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশী। সবচেয়ে বড় বহুজাতিকগুলির প্রথম ১০টির মধ্যে ৩টি বা ৪টি ওষুধ কোম্পানী (ফার্মাসিউটিক্যাল হাউস)। এর পাশাপাশি অন্য ক্ষেত্রে লোকসান করা প্রচুর শিল্পপতি বা শিল্প সংস্থা লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন স্বাস্থ্য ব্যবসায়ে। দিল্লীর যে মেগা হসপিটালের কথা আগে বলা হল সেটি আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বীমা কোম্পানী। এদের বিরুদ্ধে নানা তঞ্চকতার অভিযোগ ওঠায় ওদেশে তাদের বহু টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। ভারতবর্ষে স্বাস্থ্য বীমা ব্যবসার পাশাপাশি হাসপাতাল খুলে এরা কিন্তু লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ওষুধ শিল্প, চিকিৎসার যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের শিল্প, চিকিৎসা বা রোগনির্ণয়ে ব্যবহৃত Reagent বা রাসায়নিক উৎপাদন, স্বাস্থ্য বীমার ব্যবসা, মেগা হসপিটাল তৈরী করা, টিকার ব্যবসা, হসপিটাল তৈরীর স্থাপত্যবিদ্যা, স্বাস্থ্যব্যবসা সংক্রান্ত তথ্যপ্রযুক্তি বা software এর ব্যবসা, এইসবেরই যেন জয় জয়কার। স্বাস্থ্য ব্যবসা করার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই মানবিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা প্রভৃতি আপ্তবাক্য এদের কাছে রসিকতার মতো। ফলে ছলেবলে কৌশলে রোগীকে ভর্তি করা, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করা, অপ্রয়োজনে আই. সি. ইউ-তে চালান করা, রোগীর মস্তিষ্কের মৃত্যু হলেও তা ঘোষণা না করে টাকা বাড়াবার জন্য ভেন্টিলেটরে চাপিয়ে রাখা, এইসব ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই এই রাজ্যে এবং দেশে ঘটতে থাকে।

বাইপাসের ধারে অ্যাপোলো হাসপাতালে পথ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সঞ্জয়বাবুর ঘটনা প্রায় সবাই এরই মনে আছে। সঠিক চিকিৎসা না হওয়া, লক্ষ লক্ষ টাকায় বিল ধরানো এবং রোগীকে পরিজনের অনুরোধেও রোগীকে এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠাতে টালবাহানা করা সম্ভবত এইসবের ফলে রোগীর মৃত্যু হয় এবং তীব্র জনরোষের সৃষ্টি হয়। পরে এও প্রকাশ্যে আসে যে ক্ষতিগ্রস্ত যকৃতের চিকিৎসার জন্য একটি পদ্ধতি (Procedure) করা হয়েছে বলে চার লক্ষ টাকা দাবি করা হলেও তা করা হয়নি। এরপর স্বাস্থ্য কমিশন গঠন হয়েছে, ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিসমেন্ট আইন বলবৎ হয়েছে, সব বেসরকারি হাসপাতালকে ডেকে চমকে দেবার’ নাটক দূরদর্শনে দেখে আমজনতা মুগ্ধ হয়েছেন কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে অপচিকিৎসা ও দুর্নীতির অভিযোগ এবং রোগী মৃত্যুর ঘটনা কমেনি। উত্তেজিত জনতার হামলা, ভাঙচুর, গণবিক্ষোভ, চিকিৎসক প্রহারও বেড়েছে সমান তালে। পুলিশ হাসপাতালের দরজায় দরজায় ফ্লেক্স টাঙ্গিয়েছে ‘ডাক্তাররা সমাজবন্ধু’ বলে—কিন্তু কা কস্য পরিবেদনা! বরং এক থানার অধিকর্তা নিজেই একটি বেসরকারি হাসপাতালে একজন ডাক্তারকে প্রহার করেও আইনের ঊর্ধ্বে থেকে গেছেন। চিকিৎসক সংগঠনের প্রতিবাদী মিছিলও নিষ্ফলা হয়েছে। এবছর মে মাসে একটি কর্পোরেট হাসপাতালে পিত্তথলিতে পাথর নিয়ে ভর্তি ১৩ বছরের একটি শিশুর মৃত্যু নিয়ে প্রবল বিক্ষোভ হয়। আমরি হাসপাতালে ভাই-বোন নেহা ও রোহিত জয়সোয়ালের মৃত্যুতেও গণরোষ আছড়ে পড়ে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থানায় পাল্টা ডায়রি করেন। মুকুন্দপুরের আমরি হাসপাতালে ‘অবহেলায়’ অরিত্রি দের মৃত্যু নিয়ে তুমুল সংঘর্ষ হয়। ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালে অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহে গুরুতর অসুস্থ এক রোগীর মৃত্যু হলে পরিজনরা মৃতদেহ নিতে অস্বীকার করেন ও ধর্নায় বসেন। আগস্ট মাসে একটি বেসরকারী হাসপাতালে পারভেজ আলম, সেবক ও ওয়াজেদ আলির মৃত্যু চিকিৎসকদের অবহেলায় বলে অভিযোগ ওঠে। ডিসেম্বরে পিয়ারলেস হাসপাতালে রাধারানী দেবনাথ বলে এক বৃদ্ধার মৃত্যুতে রোগীর পরিজনসহ বহিরাগতরা হামলা ও ভাঙচুর চালায়। চিকিৎসকরা ভয়ে বন্ধ ঘরে তিনঘণ্টা ধরে লুকিয়ে থাকেন প্রহার এড়াতে।

সরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধেও ভুরি ভুরি অভিযোগ উঠেছে ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বিগত সময়ে। গর্ভবতী মহিলাকে হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া ও রাস্তায় প্রসব, রাত্রে খাট থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেয়ে প্রসূতির মৃত্যু, বহুবার নার্স সেবিকাদের ডেকে সাড়া না পেয়ে বাথরুমে যেতে গিয়ে রোগীর মৃত্যু (যা তিনঘন্টা পরে নজরে আসে), বাঙ্গুর হাসপাতালে ব্রেন টিউমারের রোগী (মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার ভোটদাতা) শ্রী শম্ভুনাথ জানার লাঞ্ছনা, ইসিজি করার জন্য তিনঘন্টা ফেলে রাখার পর ঐ বাঙ্গুর হাসপাতালেই (সরকারের অন্যতম মডেল হাসপাতাল) শ্রী অমিত বিশ্বাসের মৃত্যু, নীলরতন সরকার হাসপাতালে রোগীর পরিজন—জুনিয়ার ডাক্তার সংঘর্ষে প্রায় ১০ ঘন্টা জরুরী বিভাগ বন্ধ থাকা, এইসব ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটে চলেছে। সমস্ত রোগীর জন্য নিঃশুল্ক চিকিৎসার ঘোষণা হবার পর বারাসাত হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাফির তারিখ পড়ছে ২০২০ সালে। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মুকুটের মণি এস.এস.কে.এমে সামান্য ই.সি.জির তারিখ দেওয়া হচ্ছে আট মাস পরে। সাগর দত্ত হাসপাতালে বিনাপয়সার এম.আর.আই হয়। অপ্রয়োজনে, রাজনৈতিক সুপারিশ নিয়ে মানুষ এসে এম.আর.আই করিয়ে যাচ্ছেন। ৭ লক্ষ টাকার “ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট’ বিনাপয়সায় দেওয়া হচ্ছে— অথচ অনেক সময়ই সাধারণ ঔষধের সরবরাহ থাকছে না। সরকারি চিকিৎসকদের স্বেচ্ছা অবসরের অধিকার সরকার বেআইনিভাবে কেড়ে নিয়েছেন। অন্যান্য বহু রাজ্যের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বেতনে তাদের কাজ করানো হচ্ছে। বিগত বামফ্রন্ট আমলের মতোই বদলির কোনো নিয়মনীতি বা স্বচ্ছতা নেই। সরকারি আইন অনুসারে অনুমতি নিয়েই স্নাতকোত্তর পড়ার প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ চিকিৎসকদেরও প্রাপ্য সবেতন ছুটি পাওয়ার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে সরকারী স্বাস্থ্য পরিষেবার সারা শরীরে অযত্ন, পরিকল্পনার অভাব, চটকদারী সিদ্ধান্ত (যেমন বর্তমান জেলা ও মহকুমা হাসপাতাল গুলিতে শয্যাসংখ্যা ও পরিকাঠামো না বাড়িয়ে একই জায়গায় Multispeciality হাসপাতাল তৈরী করা এবং চিকিৎসক দিতে না পারা)। দীর্ঘমেয়াদী চিন্তাভাবনা না করে নির্বাচনমুখী কর্মসূচি—এইসবের চিহ্ন ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠছে। এর সুফল পাচ্ছে বেসরকারি ব্যবসাকেন্দ্রগুলি। সরকারি চিকিৎসক হাসপাতালে অস্ত্রোপচার না করে পাশের নার্সিংহোমে করছেন। রাজনৈতিক মদতপুষ্ট ও শাসকদলের ছত্রছায়ায় থাকা দালাল চক্র অসহায় বিভ্রান্ত, আর্ত মানুষকে ভাঙ্গিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল বা রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে। অথবা তথাকথিত নিঃশুল্ক সরকারি পরিষেবাই (স্ট্রেচার থেকে বিছানা) কিনতে হচ্ছে ঘুষ দিয়ে। অবক্ষয়ী পুঁজিবাদে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে দলীয় রাজনৈতিক হস্তাবলেপ, অর্ধশিক্ষিত অশিক্ষিত মানুষের অসহায়তা, গ্রাম মফঃস্বলের ডাক্তারের অভাবে কলকাতামুখী অন্তহীন (স্রাত, বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীদের নীতিহীন মুনাফা সন্ধান পুরো ব্যবস্থাটা আগ্নেয়গিরির চূড়ায় বনভোজন করার মতো পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। সরকারি আমলা, সরকারি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও তার পরিজন: এই তিন পক্ষের মধ্যে, বিপুল অবিশ্বাস এই স্থিতিস্থাপকতাহীন অবচয়ী স্বাস্থ্য পরিষেবার মূল সমস্যা। তাই অল্পবিত্ত মানুষও দক্ষিণে ছোটেন সাধারণ রোগের চিকিৎসা করাতে। তাই মন্ত্রী, আমলারা অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন না। তাই অসুস্থ হয়ে পড়া রাজ্যের ও দেশের মানুষের কাছে এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন। চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতাও ক্রমশঃ বাড়ছে। এই মুহূর্তে প্রায় ৫০০ সরকারি চিকিৎসক চাকরি ছাড়তে উদগ্রীব। সরকার উদ্ধত ও অসহিষ্ণু। সামান্য ফেসবুক পোস্ট বা রসিকতার জন্য দক্ষ চিকিৎসকদের সাসপেন্ড ও বদলি করা হচ্ছে। আগেই বলেছি বার বার বিজ্ঞাপন জারি করে, সরাসরি সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করেও যথেষ্ট সংখ্যক চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের অবস্থা তো আরও করুণ। এর মধ্যেও চলছে দলীয় দুর্নীতি ও ভালো পোস্টিং পাইয়ে দেওয়া। বহু মামলা চলছে আদালতে। শারীরিক অবস্থা বিবেচনা না করেই বা ইচ্ছা অনিচ্ছার মর্যাদা না দিয়েই অবসরের সময় সীমা ৬০ থেকে ৬২ ও তার থেকে ৬৫ করা হয়েছ। এখন শোনা যাচ্ছে তা বেড়ে ৭০ হবে। একজন অধ্যাপক রসিকতা করে বলছিলেন “অ্যাম্বুলেন্সে করে ডিউটিতে আসতে হবে আর স্ট্রেচারে করে রাউন্ড দিতে হবে আমাদের।” রাজ্য সরকারের কর্তাব্যক্তি এবং প্রশাসনকে এটা বুঝতেই হবে যে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং হাসপাতাল, নার্সিংহোম বা ডাক্তারদের চেম্বারে ভাঙচুর ও হামলা চালানো বন্ধ করা তাদের দায়বদ্ধতা। আইন যারা নিজের হাতে প্রতিনিয়ত তুলে নিচ্ছে তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে না পারলে সভ্য সমাজের কাঠামোটাই ভেঙ্গে পড়বে। চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। কোনো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও চিকিৎসক ছাড়া চলতে পারে না। আর ভয় দেখিয়ে বা পিটিয়ে ডাক্তারদের দিয়ে রোগীর চিকিৎসা করানো চূড়ান্ত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই অসম্ভব এবং অকল্পনীয়। (যদিও ১৯৮৩ সালে জুনিয়ার ডাক্তার আন্দোলনের সময় তদানীন্তন কার্যনির্বাহী মুখ্যমন্ত্রী চিকিৎসকদের বেয়নেটের মুখে কাজ করাবার হুমকি দিয়েছিলেন)। এর মধ্যেই শারীরিক লাঞ্ছনা এবং অপমানের ভয়ে অনেক দক্ষ চিকিৎসক ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল অস্ত্রোপচার করা বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেক হাসপাতাল সংকটগ্রস্ত জরুরী রোগী ভর্তি বন্ধ করে দিয়েছে। মরণাপন্ন রোগীদের নিজেদের পয়সায় ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যাম্বুলেন্সে চাপিয়ে কর্পোরেট হাসপাতাল গুলি পাঠিয়ে দিচ্ছে সরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার জন্য। এইসব নৈরাজ্য দূর না করে কেবল হুমকি এবং দণ্ডবিধান করে আর চমকের রাজনীতি করে কেবল সরকারী স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্তর্জলী যাত্ৰাই নিশ্চিত করা হবে। প্রতিবাদ করলে, কবিতা লিখলে, দাবীদাওয়া জানালে বা বিরোধী মতের সমর্থন হলেই সাসপেনশন, কম্পালসারি ওয়েটিং, বদলির ভয় দেখানো—এসব ‘ব্রহ্মাস্ত্রগুলি বহু প্রয়োগে ভোঁতা হয়ে যেতে বাধ্য। রাজনৈতিক মুনাফার জন্য চিকিৎসকদের ‘গণশত্রুতে পরিণত করলে জনতা জনার্দন আরও উত্তেজিত হবেন, আরও পারস্পরিক বিশ্বাস কমবে এবং রোগীদের অবস্থা আরও সঙ্গীণ হবে। স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে দুর্নীতির উৎস যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই এবং পার্টিগুলির পৃষ্ঠপোষকতাতেই চলে, তা কিন্তু অনেকের কাছে আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। নতুন চিকিৎসকদের অধিকাংশেরই সরকারি চাকরিতে অনীহা। তার কিছু কারণ যদি গ্রামে যেতে না চাওয়া, স্নাতকোত্তর প্রবেশিকা পরীক্ষা, কলকাতায় বেসরকারি ক্ষেত্রে সুযোগ অনেক বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি প্রভৃতি হয়—অন্য একটি প্রধান কারণ অবশ্যই নিরাপত্তার অভাব, লাঞ্ছিত হবারও ভয় ও সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা। আবার বলছি, তার পুরো ফায়দা লুঠছে বেসরকারি মেগা হাসপাতাল নার্সিংহোম গুলি। তবে একচেটিয়া পুঁজির ঝড়ে আবার একদম ছোট স্বাস্থ্য ব্যবসা পাততাড়ি গোটাতে বসেছে। সে অন্য আলোচনার বিষয়।

সমস্যাগুলি তুলে ধরলেই অনিবার্যভাবে একটি প্রশ্ন এসে যায়—তাহলে সমাধান কি? করজোড়ে জানাচ্ছি এই জটিল প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই, উত্তর দেবার দায়ও নেই। উত্তরের দায়িত্ব ও সমাধানের দায়িত্ব মূলত সরকারের উপরই বর্তায়। ভালোবেসে না হলেও ভোটের স্বার্থে সরকার এর সমাধান করতে বাধ্য। সদিচ্ছায় যদি সন্দেহ নাও করি (যদিও প্রভূত সন্দেহ আছে), সমাধান করার যোগ্যতা ও দক্ষতা অবশ্যই প্রশ্নাতীত নয়। প্রতীচ্যের মতো আমাদের গণতন্ত্র পূর্ণ বিকশিত নয়। একে বলা হয় “Democracy in making” আমাদের সমাজে তাই এত আলোড়ন, সংঘর্ষ, দ্বন্দ্ব। বিনাপয়সায় ভালো চিকিৎসার আশায় বিপুল জনতা সরকারি হাসপাতালগুলিতে সমাগত। তাদের মধ্যে আকাঙ্খা তৈরী হয়েছে, কিছুটা হলেও অধিকার বোধ জন্মেছে। তাদের পরিষেবা পাওয়া আশা ও দাবীর সৃষ্টি হয়েছে। যারা বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হচ্ছেন তাদের দাবী স্বাভাবিকভাবেই বেশী, কারণ তারা জীবন নিংড়ানো অর্থের বিনিময়ে একটি মহার্ঘ্য পণ্য কিনছেন। সরকার এবং চিকিৎসকরা মানুষের এই মনোভাব সম্পর্কে সংবেদনশীল না হলে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সংঘর্ষ আরও বাড়তে বাধ্য।


অনীক পত্রিকায় চারটি পর্বে এই প্রবন্ধটি, প্রথম প্রকাশিত হয়।
ডা. সিদ্ধার্থ গুপ্ত পেশায় চিকিৎসক। দীর্ঘদিন ধরে গণস্বাস্থ্য আন্দোলন এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত লেখালিখির সঙ্গে যুক্ত।  



185 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন