বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

গ্রেটা এবং আমি

অপরাজিতা সেনগুপ্ত

মিছিল শেষে বাড়ি এলাম এই। পা দুটো ব্যথা করছে, গলা চিরে গেছে, হাততালি দিয়ে দিয়ে হাত দুটো লাল। মা দরজা খুলে দিয়ে একটু কটমট করে তাকাল, কিন্তু আমি হাত পা ধুয়েই রান্নাঘরে ঢুকে চায়ের জল চাপিয়ে দেওয়ায় আর বেশি রাগ দেখাল না। টেবিলের একপাশে বসে মা খাতা দেখছে, আমি মাকে চা দিয়ে নিজের কাপটা নিয়ে অন্যদিকে বসলাম। সারাদিন ফোনটার দিকে তাকাই নি আজ, দুটো একটা ছবি তোলা ছাড়া। ছবিগুলো দেখলাম ভালোই হয়েছে, যদিও তোলার সময় থরথর করে কাঁপছিলাম রাগে। শেয়ার টেয়ার সেরে   গ্রেটা থানবার্গের নতুন স্পিচটা দেখব বলে হেডফোন গুঁজছি কানে, মা একবার মুখ তুলে তাকাল। এটার মানে সবই তো হল, পড়তে কখন বসবে? আমিও চোখ নামিয়ে প্লে করলাম, মাত্র কয়েক মিনিটের স্পিচ, মা মুখ খোলার আগেই হয়ে যাবে। রাগে মুখ চোখ লাল হয়ে গেছে গ্রেটার, এতটাও আগে দেখিনি কখনো। বার বার জিজ্ঞেস করছে, how dare you? লোকে মূর্খের মত হাততালি দিচ্ছে কেন? একটা বাচ্চা মেয়েকে লাগছে সত্যি কথাগুলো বলতে, লজ্জা করে না এদের? ওকে বাহবা না দিয়ে নিজেরা  strike করতে পারে না? আমরা কি করলাম আজ? এই বিরাট একটা শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ালাম না সবাই মিলে? যদিও ফেকবুকের কাকুরা আমাদের যা নয় তাই বলছে! আচ্ছা, দেখছি নাকি গ্রেটাকে নোবেল দেবে! বাঃ, ভাবা যায়, একটা একা ষোলো বছরের মেয়ে!

"আর কতক্ষণ, ওটার দিকে তাকিয়ে?”  হেডফোন না খুলেও বুঝলাম মা এবার চটে যাচ্ছে, তাই চট করে ফোনটা নিয়ে মার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

"এটা দেখেছ?”

"না দেখিনি, কিন্তু আজ কলেজে সবাই আলোচনা করছিল।"  আমি ফ্যাক করে হেসে ফেলি। "তোমাদের কলেজে? পুজোর মুখে শাড়ি গয়নার আলোচনা ফেলে গ্রেটার স্পিচ?”  মা রাগবে না হাসবে ঠিক করতে না পেরে হেসে ফেলল। আমি মনের মধ্যে মুঠি তুলে বললাম Yay!  কিন্তু দেরি করে আসার একটা তো শাস্তি মাকে দিতেই হবে, তাই পেন নামিয়ে রেখে চশমাটা চোখ থেকে খুলে আমাকে বলল, " কই দেখি কি স্পিচ। আর যা, স্নানটা কর। গায়ে যা ঘেমো গন্ধ।"  এই রে। আমিও জানি সেটা, কিন্তু ভাবছিলাম একটু ল্যাদ খাই।

স্নান করে বেড়িয়ে দেখি মা আবার খাতা দেখছে। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে যুক্তিগুলো সাজিয়ে নিচ্ছিলাম। নোবেলের যুক্তিটাই জোরদার মনে হল-- রবীন্দ্রনাথ আর অমর্ত্য সেনের সঙ্গে তুলনা করা যাবে। ওটাই opening line করলাম।

"ওকে নোবেল পীস দেবে, জানো?” 

"সে তো বারাক ওবামাকেও দিয়েছে। তাই বলে কি আমেরিকা যুদ্ধ বন্ধ করেছে নাকি?”

ফুস। গেলাম!

" তাহলে কি বলতে চাও, গ্রেটা ভুল করছে?” 

না, সেটা তো বলিনি। তবে কাউকে নিয়েই এত আপ্লুত হওয়া ভালো নয়।

এইবারে আমি একটু রেগে গেলাম। " হ্যাঁ, আপ্লুত হয়ে কাজ নেই, বাড়ি বসে নিজের কাজ করাই ভালো। যেমন আজ তোমরা সবাই করলে, আমরা মিছিলে মার খাবো বলে হাঁ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম যখন।" 

"কি করব? কাল খাতাগুলো দিতেই হবে। যাদের খাতা, তারাও তোদের মতো, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ইয়ার্কি মারা যায় না। আজ বাদে কাল তোরাও তাই করবি, নিজের কাজ সামলাবি।"

"এটার মানে কি হল?”

 " ছকের মধ্যে থেকে প্রতিবাদ করা নিয়ে চমস্কি একটা কথা বলেন, জানিস নিশ্চয়ই? আজও, এখনও,ইউনিভারসিটি চত্বর হল প্রেশার কুকারের মতো দম ছাড়ার জায়গা। ওই স্পেসটাতে আমরা ছিলাম যখন, আমরাও ফোঁস ফোঁস করেছি, আর তারপর ছকে পড়ে গেছি। আর তোর গ্রেটাও যে ছকের বাইরে তা জানব কি করে? প্রতিবাদ করার জায়গাগুলো সাজিয়ে দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো, আমাদের সময়তেও দিত, তোদেরও তাই। গ্রেটাকে কেউ সাজিয়ে দিচ্ছে না, সেটা বিশ্বাস করার মতো মনের জোর আমার নেই। তোর আছে?”

" ঠিকাছে। খাতাই দেখো।" গোঁত্তা খেয়ে ঘরে ঢুকলাম।কম্পিউটারে খানিক খুটখাট করে ভাবলাম  দেখি উলটোদিকের লোকেরা গ্রেটাকে নিয়ে কি বলছে। Michael Knowles মতো দক্ষিণপন্থী ব্যক্তিগত আক্রমণ না (সারা পৃথিবী জুড়েই এই! গ্রেটাকে বলছে "mentally ill Swedish child”!), কিন্তু UN Peace Council অবধি পৌঁছতে কলকাঠি নাড়ার গল্প আছে কি?  দুটো আর্টিকল দেখলাম,  দুটোতেই দেখছি গ্রেটাকে সাজিয়ে সামনে আনছে We Don't Have Time Foundation, যার মালিক Ingmar Rentzhog। প্রথমটা, The Manufacturing of Greta Thunberg for Consent: The Political Economy of the Non-Profit Industrial Complex, Rentzhogএর পরিচয় দিচ্ছে এইভাবেঃ Rentzhog is the founder of Laika (a prominent Swedish communications consultancy firm providing services to the financial industry, recently acquired by FundByMe). He was appointed as chair of the think tank Global Utmaning (Global Challenge in English) on May 24, 2018 , and serves on the board of FundedByMe . Rentzhog is a member of Al Gore’s Climate Reality Organization Leaders, where he is part of the European Climate Policy Task Force. He received his training in March 2017 by former US Vice President Al Gore in Denver, USA, and again in June 2018, in Berlin. Founded in 2006, Al Gore’s Climate Reality Project is a partner of We Don’t Have Time.

আর্টিকলটা বিরাট, অনেকগুলো অংশে লেখা। চোখ বুলিয়ে মনে হল যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গ্রেটার উত্থানে সাহায্য করছে We Don't Have Time,  যা আপাদমস্তক corporate CEO দের হাতে, এবং যাদের আসল ইচ্ছে একদিকে green capitalism এর স্বপ্ন চালু রাখা, এবং অপরদিকে পৃথিবীর নবীনদের একটি নেটওয়ার্কএর তথ্যের মালিক হয়ে বিরাট এক পুঁজির নিয়ন্ত্রণ হাতের মুঠোতে নিয়ে আসা।

অন্য আর্টিকলটা একটি ফরাসি আর্টিকলের অনুবাদ, নাম Green Capitalism is Using Greta Thunberg। বক্তব্য মোটামুটি একই, এবং শেষের দিকে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে যদিও আবহাওয়া পরিবর্তন নিয়ে গ্রেটার লড়াইটা সমর্থনযোগ্য, যারা গ্রেটার সমর্থক, তাঁরা কিন্তু আসলে green growth এর নামে আরও বিধ্বংসী উন্নয়ন এবং পুঁজিবাদকে দীর্ঘায়িত করার কাণ্ডারি।

যাচ্চলে।  Nothing is sacred any more। এবার খাবার টেবিলে গিয়ে চুপ করে থাকতে পারি, কিন্তু আজ বাদে কাল ধরা পড়বই মার কাছে। মুখ খুলতেই বুঝলাম মাও নিজের ফোন দেখেছে এর মধ্যে। কথা হতে হতে অনেকক্ষণ ধরে যে কথাটা মাথায় ঘুরছিল সেটা বলেই ফেললামঃ "গ্রেটার কি দোষ? ওর ভয়টা তো মিথ্যে না? ও তো তুলছে কথাটা, সবার মাথায় খানিকটা হলেও তো ঢুকছে ব্যাপারটা? আর ওকে আক্রমণ করলে তো মনে হচ্ছে যে ওর ইস্যুটা ভুল।"

"দেখ, সত্যিই আর সময় নেই বোধহয়। আসলে কি জানিস, আমাদের দায়িত্বগুলো আমরা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি। গ্রেটা তো একটা বাচ্চা মেয়ে, কেন ও আমাদের এত আশা আকাঙ্ক্ষার ভার বইতে বাধ্য কেন? কেন ওকে আমাদের হয়ে হিরো হতেই হবে? কেন আদৌ হিরো চাই আমাদের? নিজেরা পাল্টাব না, কিন্তু এরকম  একেকজনকে নিজেদের কাজের দায়ভার চাপিয়ে যে যার  জীবন কাটিয়ে যাব?  আমরা ভেবেছিলাম সুমন চাটুজ্যে ক্রান্তি আনবে। যেই জানতে পারলাম যে সে মানুষ, অমনি তাকে গালমন্দ করলাম, আমার স্বপ্নপূরণ হল না বলে। তুই, আমি চাকরি, insurance, EMI তে আটকে থেকে আটকে দেবো climate change? শুধু রান্নাঘরে বাসন মাজার সময় কল বন্ধ করে?”

"কিন্তু তুমিই তো বল্লে, মিছিলে গিয়ে লাভ নেই, ওই স্পেসগুলোও সাজানো?”

"স্পেস সাজানো হোক, তোরা কি আজ সেজেছিলি? তোদের ইচ্ছেগুলো সাজানো ছিল?”

"কিন্তু পালটাবে কি করে এসব? থামাব কি করে?”

"আমি কি করে বলব, আমি কি তোর মুর্শিদ না মুশকিলআসান? চ ওঠ, গ্রেটার ঠেলায় সন্ধেবেলা চারটে খাতা কম দেখেছি, এখন রাত জাগতে হবে।"

আমিও রাত জাগলাম;  অমিতাভ ঘোষের নতুন বইটা শুরু করেছিলাম কাল, ঘরে ঢুকে সেটা নিয়েই গুটিসুটি হলাম। Hungry Tide -এর sequel এটা, আর সেই থেকে যে ভদ্রলোকের মাথায় climate change  ঢুকেছে, আর বেড়য় নি। ভেনিসে সিন্তা বলছে দীননাথকে,  “Everybody knows what must be done if the world is to continue to be a livable place, if our homes are not to be invaded by the sea...Everybody knows, and yet, we are powerless, even the most powerful among us. We go about our daily business through habit, as though we were in the grip of forces that have overwhelmed our will; we see shocking and monstrous things happening all around us and we avert our eyes; we surrender ourselves willingly to whatever it is that has us in its power..." উঠে বসলাম। রাত দুটো বাজছে। সিন্তা বলে চলেছে... “That is why whatever is happening to you is not 'posession'. Rather I would say that it is a risveglio , a kind of awakening. It may be dangerous of course, but that is because you are waking up to things that you had never imagined or sensed before. You are lucky, Dino— some unknown force has given you a great gift.”

আমিও চাই, দীননাথের মত awakening! মিছিলে হাঁটতে চাই, কল বন্ধ করতে চাই, গ্রেটার স্পিচ দেখতে চাই, ওর সপক্ষে বিপক্ষে যা যেখানে আছে পড়তে চাই, গাছ লাগাতে চাই, বাগান করতে চাই, কেনা কমাতে চাই, ছকগুলো ভাঙতে চাই, চিঠি লিখতে চাই, রাত জাগতে চাই। আমার খোঁড়া শালিকটা রোজ ভোরবেলা বারান্দায় এসে লাফায়, ওকে সঙ্গে নিয়ে, আমার মা আর আমার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ভোর দেখতে চাই!



248 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: রুখসানা কাজল

Re: গ্রেটা এবং আমি

আহা রে ! স্বপ্ন স্বপ্ন আনে। জাগায়। যখন মাটি কাদা পানিতে খাবি খেতে খেতে ডুবতে থাকব কিম্বা দারুণ খরায় পুড়ে মরতে থাকব তখনও সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন ভাসবে মনে। আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন দৌঁড়ুচ্ছে আমাদেরই স্বপ্নের অংশ হয়ে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন