বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

উত্থানপর্বের এ কে রায়

অজিত রায়

১৯৭৪। ধানবাদ কোলফিল্ড সমুচয় উত্তাল। একদিকে উঠতি মাফিয়া ডন সুরজদেও সিংয়ের দৌরাত্ম দিন-দুনি-রাত-চৌগুনি হারে বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে কংগ্রেসের মজদুর নেতাদের বেতাহাশা দুর্নীতি, আরেক দিকে জাঁবাজ কমিউনিস্ট লিডার এ কে রায়ের ধুন্ধুমার আন্দোলন, আর আরেক দিকে টুন্ডির অরণ্য এলাকায় জঙ্গী সাঁওতাল নেতা শিবু সোরেনও হাড়কাঁপ ধরিয়ে দিয়েছে ধানবাদের পুলিশ-প্রশাসনের বুকে। বিহার থেকে দিল্লি অব্দি বেজায় শোর-শরাবা।

দিনটা ছিল বেস্পতি। কাকহীন কৃষ্ণ-প্রত্যুষে এক হাতে ছোট্ট বেডিং আর অন্যহাতে মাঝারি সাইজের একটা সুটকেশ নিয়ে ট্রেনের জেনারেল ডাব্বা থেকে ধানবাদ জংশনের দু-নম্বর প্ল্যাটফর্মে পদার্পণ করল একটি জীর্ণ-শীর্ণ যুবক। পরণে করডুরয়ের ধসাপচা প্যান্ট, চেক হাফশার্ট আর হাওয়াই স্লিপার। স্টেশনের বাইরে এসে প্রথমে এক খুরি গরম চা খেলো। ফের একটা লজঝড় রিকশায় চেপে পুলারবাবুকে বলল, ---- 'সার্কিট হাউস চলো।'
ধানবাদের স্টেশন চত্ত্বরের দু-চারটি খাবারের দোকান রাতভর খোলা থাকে, বড় হোটেলগুলো খোলে এই কাকভোরে। ওগুলো এখন কয়লার শাদা ধোঁয়ায় আছন্ন। কুয়াশার ডাবিঙে ভোর ফাটছে। ছোট্ট মফস্বল গোছের নিরিবিলি শহর হীরাপুর। সড়কের দু-ধারে গাছপালাই বেশি, তুলনায় ঘরবাড়ি একেবারেই কম। উঁচু-নিচু টিলার ওপর এক-একটা ছোট্ট ঘুমন্ত কলোনি।
সংক্ষিপ্ত সরু পিচসড়ক মিনিট দশেই শেষ। রিকশা এসে থামল সার্কিট হাউসের নির্জন পোর্টিকোয়। রিকশাওলা বাবুর মালপত্তর নামিয়ে দিতে হাত লাগালে যুবকটি বাধা দিল, 'প্লিজ, আমি নিজেই নিয়ে যেতে পারব। তুমি ভাড়া নাও আর কেটে পড়ো।'
বাগানের ওধার থেকে দারোয়ান ছুটে এলো হাঁ-হাঁ করে ---- 'ইধার কাঁহা ঘুষতা হ্যায়! ই সাহেব লোগকা বংলা হ্যায়।'
'ঠিক আছে, ঠিক আছে। কেয়ারটেকার সাহেব কোথায়? ডাকো ওনাকে।'
দারোয়ান একবার আপাদমস্তক দ্যাখে লোকটাকে, ফের ভেতরে চলে যায়।
---- 'কহিয়ে সাব, কা কাম হ্যায়?' ---- কেয়ারটেকার এসে শোধায়।
---- 'একটা রুম চাই। আমি একজন সরকারি মুলাজিম।'
---- 'সরকারি মুলাজিম তো আমরাও। কিন্তু এই সার্কিট হাউস শুধুমাত্র অফিসারদের জন্য।'
---- 'আমিও একজন অফিসার ভাই। আমার নাম কৃষ্ণবল্লভ সাক্সেনা। এখানকার নতুন ডি এম হয়ে এসেছি। দুদিন পর আসার কথা ছিল, কিন্তু আজই এসে পড়েছি।'
কেয়ারটেকার আর চাপরাশি দুজনেরই মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়। ঝট-ঝট করে দু পা পিছিয়ে গিয়ে ফটাফট সেলাম ঠুকল। সাক্সেনা হেসে জানতে চাইলেন, 'তোমার নাম কী ভাই?' টেকলাল নিজের নাম জানালে, তিনি বললেন, 'দুপুরের পর আমি তোমাদের পুরনো ডি সি সাহেবের সঙ্গে দেখা করব। তার আগে কেউ যেন আমায় ডিস্টার্ব না করে।'
'হুজুর, ডি সি সাহেব তো দু-দিন হলো এ ডি এম সাহেবকে চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছেন। এ ডি এম সাহেবের সঙ্গে দেখা করবেন যদি, গাড়ি আনিয়ে রাখি?'
না, গাড়ি করে নয় ----- লাঞ্চের পর খানিক রেস্ট নিয়ে একটা রিকশা নিয়ে সাক্সেনা হাজির হলেন ডি সি অফিসে। উর্দিধারী পিওনের হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'আমাদের পাড়ার রেশনের দোকানটা কখনো খোলেই না। সাহেবকে নালিশ জানাতে এসেছি।'
পিওন খচে বেগুন, ----- 'রেশনের দোকানে তালা তো সাহেব কী করবে? সাপ্লাই অফিসারকে গিয়ে ধরো।'
'সাপ্লাই ডিপার্টমেন্টে তো কেউ কিছু শুনতেই চাইছে না। বলছে ---'
তখুনি ভেতরে কলিং বেল বেজে উঠলে পিওন ঝটপট গিয়ে ভেতরে ঢুকল। এ ডি এম সাহেব শোধালেন, 'বাইরে এত চেল্লামিল্লি কীসের?'
----- 'হুজুর, আমি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।' বলতে বলতে খোদ সাক্সেনা ভেতরে এসে ঢোকেন এবং চেয়ার টেনে বসে পড়েন।
এ ডি এম সাহেব ভুরু তুলে তাকান, 'কে আপনি? চেয়ারে বসলেন যে বড়!'
----- 'হুজুর, আমি আপনার ওই চেয়ারটায় বসতে এসেছি!'
হাউ রিডিকিউলাস! সাহেব হতবিহ্বল। পিওনের মুখের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকান, 'এসব ন্যালাখ্যাপা ভিকিরি টাইপের লোককে তোমরা ঢুকতে দাও?'
পিওনটি জবাবে গোল, তদুপরি জোড়হস্ত। তখন সাক্সেনাই আগ-বাড়িয়ে খোলসা করেন, 'হুজুর, আমি এসেছি আপনার চার্জ নিতে।'
এবার সাহেবের মাথা সত্যিই বিগড়ে যায়। প্রচণ্ড খচে গিয়ে তিনি লোকটার দিকে তাকিয়ে অগ্নিবর্ষণের মত চেয়ে থাকেন। কিন্তু যখন দেখলেন আগন্তুকের আননে কিঞ্চিৎমাত্র ভীতির বিবরণ নেই, বরং তার শান্ত স্বচ্ছ দৃষ্টির মোকাবিলায় নিজেই সামান্য বিব্রত বোধ করলেন, ---- তখন গলার স্বর দু-পর্দা খাটো করে বললেন, 'ঠিক আছে, আপনি কাল আসুন।'
অর্থাৎ বেস্পতিবার তিনি কারুক্কে ভিক্কে দ্যান না।
সাক্সেনা ফের রিপিট করলেন কথাটা, ---- 'স্যার, বুঝলেন না! আমি কে বি সাক্সেনা। আমি এসেছি আপনার চার্জ নিতে।' ব'লে, হ্যান্ডসেকের জন্য ডান হাতটা এগিয়ে দিলেন।

ধানবাদে এই প্রথম একজন সৎ, নির্ভীক, কর্মঠ এবং দস্তুরমত ডিউটি-পাগলা জেলাশাসক। কে বি সাক্সেনা স্বীয় পদভার গ্রহণ করা মাত্র গডফাদার বি পি সিনহার ডানহাত রাজপুত শিরোমণি সুরজদেও সিংয়ের পেন্ডিং কেসের ফাইলগুলো খুলে বসলেন। ধানবাদ ক্রিমিনাল কোর্টে আই-পি-সি আর আর্মস অ্যাক্টের বেশ কিছু ধারায় খতরনাক মামলা দায়ের ছিল সুরজদেওর খেলাপে। সাক্সেনা আরদালি পাঠিয়ে তাকে ফৌরন সারেন্ডার করার হুকুম দিলেন।
অবশ্য তাঁর আসল মনসুবা ছিল শিবু সোরেনের সঙ্গে মোলাকাত করা। জঙ্গিপনা ঘুচিয়ে তাকে খানিক সুবোধ ও সুধাময় করে তোলা। তারপর কংগ্রেসের জোয়ালটি তার ঘাড়ে তুলে দেওয়া। শিবু বুনো গয়াল, তিনি জানেন, সহজে ঘাড় পেতে দেবে না। কিন্তু সেভাবে ঘাসখড় দেখিয়ে আদর করে ডাকলে, ঘাড় পেতে না দিয়ে তখন সে পারবে না। কিন্তু এ কাজ তো তড়িঘড়িতে হয় না, কিঞ্চিৎ সবুর।
এদিকে ইতিমধ্যে আরেকটা কাণ্ড ঘটেছে। মিস্টার ঘটক নামে একজন সাব-ইন্সপেক্টর তোপচাঁচি থানায় পোস্টেড ছিলেন। আদিবাসীরা তাঁকে গুম করে খুন করে লাশ গাপ করে দিয়েছে। আদিবাসীগুলো এম সি সি, নাকি জে এম এম ক্যাডার সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তবে বিনোদবাবু ওদেরকে শনাক্ত করতে পারেন।
'বিনোদবাবু, সে আবার কে?'
'বিনোদবিহারি মাহাতো। ফরমার কমিউনিস্ট।'
'বেশ।
বেশ। বিনোদবাবুকে ডেকে ক্রস-এগজামিন করুন। উনিও যদি মুখ খুলতে না চান, গ্রেপ্তার করে হাজতে পুরুন। তারপর আমি দেখব।'
'স্যার, বিনোদবাবু বর্তমানে জে এম এমের প্রেসিডেন্ট। তাছাড়া নামকরা অ্যাডভোকেট।'
'সো হোয়াট! মেইনটেন্যান্স অফ ইন্টারনাল অ্যাক্ট আছে কী করতে? জাস্ট ডু ইওর ডিউটি।'
এমন সময় একজন অফিসার ঢুকে সাক্সেনাকে সেলাম ঠুকে জানাল, 'স্যার,রায়সাহাব অনেক্ষণ থেকে আপনার সাথে দেখা করবেন বলে বাইরে ইন্তেজার করছেন।'
'রায়সাহেব কে?'
'সিঁদরির সিটিং এম এল এ, এ কে রায়।'
'আচ্ছা আচ্ছা, উনি? কমিউনিস্ট ট্রেড ইউনিয়নিস্ট? ডাকুন তাঁকে।' বলতে বলতে তিনি স্বয়ং উঠে দাঁড়ালেন, 'আচ্ছা থাকতে দিন, আমিই গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করছি।'
ব'লে, সাক্সেনা হন্তদন্ত পায়ে বাইরে এলেন। দেখলেন বারান্দায় ধোপদুরস্ত পোশাক পরা বেশ কজন লোক এদিক ওদিক বসেছিল, তারা সাহেবকে দেখামাত্র সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়িয়ে সেলাম করল। সাক্সেনা এদিক-ওদিক চোখ ঘোরালেন। চোখে পড়ল, একেবারে কোণের দিকে একটা ভাঙা টিনের চেয়ারে বসে আছে এক তিতিবিরক্ত মানুষ, পেঁয়াজ-তেল মাখা মুড়ি চিবুচ্ছে। পরণে নোংরা কয়লাধূলি পড়া চিক্কুটে পায়জামা আর টায়ারের চপ্পল। চোখে চশমা, চুল উসকো-খুসকো। একমুখ দাড়ি।
সাক্সেনা নিজের চেম্বারে ফিরে এলেন, অফিসারটিকে বললেন, 'রায়সাহেব বোধয় চলে গেছেন।'
অফিসার মুচকি হাসে, 'আপনি ওনাকে চিনতে পারলেন না স্যার? উনি তো সেই থেকে বসে মুড়ি চিবোচ্ছেন!'


অজিত রায়-এর 'হিরণ্যরেতা' উপন্যাসের অংশবিশেষ।



116 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ ধারাবাহিক  বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন