বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

চিত্র

অভিজিত মজুমদার

একটা হলদে সালোয়ার, দোপাট্টা সবুজ। এই দেখো! ভেবেছ ওটা দোপাট্টা?   তা নয় গো, সে তো কলাপাতা, বৃষ্টি পড়ছে তো তাই ওটা দিয়ে মাথা ঢাকা দিয়েছে, দোপাট্টা কোথায় পাবে। আর আপাদমস্তক যাকে সালোয়ার কামিজ ভাবছ তা হলো পাঞ্জাবী আর পাজামা। কি তফাৎ আছে যে সালোয়ারের সাথে তা বোঝা বড় কঠিন, তবুও তফাৎ আছে, একটা ছেলে, আরেকটা মেয়েরা পরে। সেই পাঞ্জাবীর ঘেরটাকে একটু বড় করলে হয় না? আর পাজামা না হয় কোমর থেকে একটু ফুলিয়ে নেওয়া যাবে খন। 

টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে দুপুরেই বেরোনো যাক, এ সময়ে পথে ঘাটে লোক কম থাকে, বাগানের পথ বেয়ে, কলাবাগান, পেয়ারাবাগান, তারপর রজনীগন্ধার ক্ষেত, পুকুরের ধারের কলাবতি গাছের পাস দিয়ে এসে এই জলের ধারে বসে। "মালিনীর জল বড় স্থির, আয়নার মতো। তাতে গাছের ছায়া,  নীল আকাশের ছায়া, রাঙা মেঘের ছায়া সকলি দেখা যেতো। " আর দেখা যেতো ছোটো ছোটো স্বপ্নের কুটিরের ছায়া। সেই কুটিরে থাকে এক রাজকুমার, যে তার সব সুখ ছেড়ে দিয়ে এসে অরণ্য নিবাসী হয়েছে। সুখ, শান্তির মানে তার কাছে আলাদা আর তাই সে এই শুকনো নদীতীরের এপারে বসে থাকা এই মানুষটির ভালোবাসার কথা বুঝবে। সেদিন এই শুকনো নদীর বুকে, এই পাঁক ভরা বুকে অজস্র পদ্ম ফুটে উঠবে। পদ্মের বনে নৌকা বেয়ে যাবে। জীবনতরী। 

পড়াশুনো হবে কি করে? নিজের দেহের সাথে মনের কোথাও মিলছিলো না। সে ভাবছিলো একরকম আর তার চারপাশের লোকেরা সাজাচ্ছে আরেক রকম। যেন প্রত্যেকদিনই বাড়ির সকলে, পাড়ার সকলে, বন্ধুদের সকলে মিলে তার সাথে অভিনয় করে যাচ্ছে। অথবা সে করছে অভিনয়। কিন্তু একটা পোশাককে তো সত্যি মানতেই হবে। যেটা সকলে মিলে চাপিয়ে দিচ্ছে সেটা ছেলেদের পোশাক, আর যেটা তার ইচ্ছে হলো পরতে সেটা তো মেয়েদের। একটা সময় অভিনয় আর ভালো লাগে না। কিন্তু কে বুঝবে সে কথা, যেটা তার কাছে বাস্তব, সেটাই তো বাকি সকলের কাছে অভিনয়, সঙ সাজা, ভেক ধরা ........... মুখোশ। 

একদিন ঘর থেকে বের করে দিলো বাবা। বললো,

- এরকম ঢপ সেজে একদিন লোকের হাতে মার খেয়ে মরবি।

আবার ঘুরে ফিরে আসে। কটা দিন থাকে, আবার মুখঝামটা খায়, ভাত খায়, লাথি খায়। তারপর আবার বেরোয়। কোথায় যেন একটা সুর বেজে চলেছে সমস্ত মনে শরীরে, নিজেকে নিয়ে মস্ত একটা সুর। নিজের হাত পা, ঘাড় মুখ, ঠোঁট চোখ, বুক পেট  সব জায়গায় যে সুর বেজে চলেছে তা কোথাও মিল খায় না কোনো মানব মানবীর শরীরের সাথে। শুধু যেন একটা আবেশ, একটা শিল্পর মতো সমস্ত দেহ মন অনুরণিত হতে থাকে। শিল্পীর ছোঁয়ায় তাকে সাজিয়ে তুলেছে। সাজিয়ে তুলেছে সেই পদ্মবনের অভিসারের জন্য। 

চিত্র নাম তার। কে বলে চিত্র মেয়েদের মতো সাজে? কেউ কি একবারও ভালো করে দেখেছে ওর দিকে? কেউ কি জানে ঠিকমতো যে মেয়েদের মতো সাজা কাকে বলে? মেয়েদের সাজ বলে কি সত্যিই কিছু আছে? যারা এই ছেলে আর মেয়ের সাজ আলাদা করলো তারা ভেক ধরে নেই? ভেক কি সে একাই ধরে? সেটা কি ভেক আদৌ? প্রতিবার সেই সরোবর বা নদীর ধারে গিয়ে স্বপ্ন দেখে চিত্র। যাবার আগে একটু ভিক্ষে করে পয়সা যোগাড় করে। তারপর ভালো করে সাজে। অন্নের সংস্থান নেই, আর সাজ! কিন্তু এতো সাজ নয়, এ অভিসারও নয়, এতো একটু নিজেকেই নিজে দেখা, একটু নিজের কাছাকাছি আসা, আত্মাকে উপলব্ধি করা। ঠোঁটে রঙ লাগায়, মাথায় সুগন্ধী তেল। পায়ের নখ থেকে, বাহু, গলা, মাথার চুল পর্যন্ত পরিপাটি করে। এমন পরিপাটি তো পাড়ার বৌরাও দেখে নি। চিত্র অপরিচিত, ভিনদেশী হয়ে যায় পুরোপুরি। তারপর ভিনদেশী সেই যুবক অথবা যুবতী মালিনীর স্থির জলে বসে সেই দেশী পদ্মের বনে রাজকুমারের স্বপ্ন দেখে। আর সেইসময় তাকে দেখে, পাড়ার ছেলে, বৌ, জোয়ান, বুড়ো সকলে। এই ভিনদেশী ভাব বড় অচেনা ওদের। মোটেও সহ্য হয় না এই অন্যরকম চিত্র। সে যেন ছলনা করে তাদের দীর্ঘদিনের আগলে রাখা ধন চুরি করে নিতে এসেছে। কি চুরি? হয়তো সেই পদ্মের বন, হয়তো সেই রাজকুমারকে, না হয় সেই নৌকা বা হয়তো গোটা মালিনীটাকেই ...... কেই বা বলতে পারে হয়তো চুরি হয়ে যাবে একটা জগদ্দল বিশ্বাস। 

- কেনো ভেক ধরেছ?

- কেনো আসো এখানে?

- কেনো পয়সা চাও?

- মাগী সাজছো কেনো? 

কোনোটার বা একফোঁটা উত্তর বেরোল মুখ থেকে, কিন্তু বাকি উত্তর তো জানা নেই তার। শুধু একটা মস্ত আবেশ গ্রাস করে রেখেছে তাকে, আর কিছুটা লজ্জা। এ অনন্তকালের লজ্জা, যেগুলিকে সে এতোদিন ওইসব বাগান আর ঘন ফুলের বন দিয়ে আড়াল করে রেখেছিলো। সে আবেশ একটা স্বপ্নের। তার ভেতরেই চিত্র অনন্ত যাওয়া আসা করতে করতে যাবতীয় সব যোগাযোগের ভাষা ভুলে গেছে। ততক্ষনে প্রস্তর উড়ে এসেছে ভিড়ের মধ্যে থেকে, আরো শতেক আঘাত। এই নির্লিপ্ত ভাব নিশ্চই লুকিয়ে যাবার ফন্দি, কি লুকোচ্ছে সে? ভীড় বুঝতে অক্ষম। আরো আঘাত। 

কি লুকোচ্ছে সে? আদৌ কি লুকিয়ে যাচ্ছে। নাকি নিভৃতে লালন করছে এক অনুভূতিকে। যে অনুভূতি শত চেস্টা করলেও এই জাগতিক ভিড়ের লোকগুলোর ধরাছোঁয়ার বাইরে।

ধমণী উন্মুক্ত হয়েছে চিত্রর, মাথার ধমনী, গলার, হাতের, বুকের। লালশোণিত প্লাবিত হয়ে বিপ্লব এনেছে সেই নদীতীরে। চিত্র তুমি এখনো এমন নির্লিপ্ত কেনো? তোমার গলায় চিৎকার নেই, ভীষন কষ্টের কোনো প্রকাশ নেই, সত্যিই তুমি কি নির্বিকার! 

- আমি চিত্র। আমি, আমরা এভাবেই এই সুন্দর মালিনীর তীরে নিজেদের ধমণী উন্মুক্ত করে এই স্নিগ্ধ জলরাশিকে রাঙা করে যাই। এই আশায় যে একদিন এই মূক ভীড়, অসহিষ্ণু ভীড় তাদের সকল আঘাতকে ফিরিয়ে নিয়ে এই পদ্মবনে আমাদের সুখযাপনে এগিয়ে আসবে। এই হৃদয়ের রাঙা তরল আমাদের ভালোবাসার রাজকুমারের পথ সুচারু করবে। আমরা অমলিন। 

আরেকবার দেখা যাচ্ছে,  চিত্র তার রাজকুমারের উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলো। 


নাগরাকাটা হত্যাকাণ্ডের নিরিখে লেখা

169 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: চিত্র

পৃথিবীর নানাপ্রান্তে যেমন চিত্রদের ছিঁড়ে থেঁতলে মেরে ফেলা হচ্ছে তেমনি একটা দুটো আলোর ফুলকিও দেখা যাচ্ছে। কালকেই দেখলাম মহারাষ্ট্রে সোশ্যাল সায়েন্স সিলেবাসে সমপ্রেম ও বিবাহ এবং একক মা'য়েদের কথা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কদিন ধরে ভারত ও পাকিস্তানের দুটো মেয়ের বিয়ে, ও ঝলমলে খুশীমুখ ঘুরে বেড়াচ্ছে নিউজফীডে।

আশা করি একদিন নিশ্চয় আসবে যেদিন চিত্ররা আপন অধিকারেই বেঁচেবর্তে থাকবে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন