বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

“আয়ুষ্মান ভারত” – ভারতীয় জনতা কি আয়ুষ্মান হবে?

জয়ন্ত ভট্টাচার্য

কথার আগে কথা

এবারের বাজেট (২০১৯) ভারত রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ধারণার দিক থেকে একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। রীতিমতো মনোযোগ দাবী করে। বিভিন্ন সম্ভাবনা সুপ্ত হয়ে আছে। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য নিয়ে যৎসামান্য এবং টুকরোটাকরা যতটুকু আলোচনা হয়েছে সেসব নিয়ে আমি আমার ধারণায় বিচার করবো, বিশ্লেষণে যাবো। পাঠকেরা সহমত হতে পারেন, ধারণার ভিন্নতা পোষণ করতে পারেন, অন্য কোন দৃষ্টিকোণ থেকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এবং ভাবনার সূত্রপাত করতে পারেন। সবগুলোই স্বাগত, কাম্যও বটে।

আরেকটি কথা। যেহেতু এ সংক্রান্ত আলোচনার সমস্ত আকর প্রবন্ধ, পুস্তক এবং সোর্স মেটেরিয়াল ইংরেজি থেকে আহরিত, এজন্য আমার অভিপ্রেত না হলেও কিছু উদ্ধৃতি ইংরেজিতে থাকতে পারে। সেগুলো পাঠকেরা নিশ্চয়ই নিজেদের মতো করে মানিয়ে নেবেন।

এবারের বাজেটের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ভাবনা শুধু বাজেটের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থেকে অনুধাবন করা যাবেনা। এর এক সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারাপথ আছে, ইতিহাস আছে, আছে প্রচ্ছন্ন এবং প্রকাশ্য vector তথা গতিমুখ। এসবকিছুই থাকবে আলোচনার মাঝে। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কিভাবে নতুন শিক্ষাক্রম তৈরি হচ্ছে, সে শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যের বোধ এবং এর উপযোগী চিকিৎসক গড়ে তোলার উপাদান ও সক্রিয়তা থাকছে কিনা। আমাদের বোঝাপড়ার জগতে আন্তর্জাতিক স্তরে জনতার স্বাস্থ্য নিয়ে কিভাবে আলোচনা চলছে, অনুসারী কার্যক্রম কিভাবে  গৃহীত হচ্ছে এগুলো সম্বন্ধে একটি প্রাথমিক ধারণাও জরুরী। বিপরীত দিকে সেরকমই জরুরী আন্তর্জাতিক কর্পোরেট পুঁজি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে দেশের বাজার, কিভাবে আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা USAIDS-এর মতো হাঙ্গর-সদৃশ আন্তর্জাতিক পুঁজির চালিকাশক্তি এবং নিয়ন্ত্রকেরা একটি দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে structural adjustment programme (SAP) করতে বাধ্য করে যার পরিণতিতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্ষত-বিক্ষত হয়। অথচ যেকোন দেশের, বিশেষ করে কম সম্পদশালী দেশের, প্রয়োজন প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা। SAP-র প্রাণঘাতী, ভয়াবহ পরিণতির সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হল আফ্রিকার হতভাগ্য ৩টি দেশ – গিনি, সিয়েরা লিওন, লাইবেরিয়া – যাদেরকে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিক থেকে আইএমএফ-এর চাপে MRI, PET Scanner ধরনের অতি-উচ্চ প্রযুক্তি কিনতে হয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিনিময়ে। এরপরে যখন এবোলার মতো মারণান্তক রোগ আক্রমণ করেছে তখন বহু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সামান্য গ্লাভস বা মাস্কও ছিলোনা। অর্থাৎ এগুলো কেনার মতো পয়সাও ছিলোনা দেশগুলোর হাতে। এই বিশেষ সমস্যাকে নিয়ে প্রচুর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল, Lancet, মায় New England Journal of Medicine (NEJM)-এর মতো পত্রিকায়। প্রকাশিত হয়েছে বহুসংখ্যক পুস্তকে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকে নিয়ে আলোচনা যদি আপাতত মূলতুবিও রাখি তাহলেও মনে রাখতে হবে সামাজিভাবে স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল স্বাস্থ্যের সাম্যতা (equity)। ইক্যুইটির ধারণাকে ব্রেভম্যান এবং গ্রাসকিন সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে – ““the absence of systematic disparities in health (or in the major social determinants of health) between groups with different levels of underlying social advantage/ disadvantage—that is, wealth, power, or prestige.” (P. Braveman, S. Gruskin, “Defining equity in health”, Journal of Epidemiology and Community Health, 57 (2003): 254-258) টিমোথি ইভান্স, মার্গারেট হোয়াইটহেড এবং অন্যান্যদের সম্পাদিত Challenging Inequities in Health: From Ethics to Action (Oxford University Press, 2001) গ্রন্থে ইভান্স বলছেন – “[e]quity entailing universal access to basic [has been] replaced by [the] so-called Health Sector Reform under pressure from World Bank and IMF. HSR was perceived by them as priority selling of privatization and decentralization.”

এখানে উল্লেখ করার মতো তথ্য হল হেলথ কেয়ার ইনডাস্ট্রি ২০২০ সালে ১১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যবসা করবে। ২০১৫ সালে এর একাংশের পরিমাণ ছিল ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার, ২০১৭-তে এর পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার। এর অর্থ পৃথিবীব্যাপী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার যেখানে ৩.৬%, হেলথ কেয়ার ইনডাস্ট্রি-র একাংশের বৃদ্ধির হার তার দ্বিগুণেরও বেশি। ভারতের ১৩২ কোটি মানুষের অতি লোভনীয় বাজারের প্রলোভন কি করে এড়াবে আন্তর্জাতিক কর্পোরেট পুঁজি? সেজন্য equity-র মসৃণ আড়ালে বাণিজ্য কাজ করবে। কিভাবে? সেটাই পর্যালোচনা করার। ইক্যুইটি, ইন্সিউরেন্স, সকলের জন্য স্বাস্থ্য, সকলের জন্য স্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যত্ন নিয়ে পুনরজ্জীবিত করার মতো অতি প্রয়োজনীয় প্রেক্ষিতসমূহকে মাথায় রেখে ২০১৯-এর স্বাস্থ্য বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু করা যায়। 

শুরুর কথা

এবারেরে বাজেটে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন স্বাস্থ্য নিয়ে প্রায় কোন উল্লেখই করেননি। কেবলমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে স্বাস্থ্যবান সমাজের কথা উল্লেখ করেছেন, উল্লেখ করেছেন আয়ুষ্মান ভারতের কথা বা যাকে আরও ব্যাখ্যা করে বললে আয়ুষ্মান ভারত–প্রধান মন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা বা AB-PMJAY বলা হচ্ছে (আমরা এরপরে এ প্রবন্ধে আয়ুষ্মান ভারত বা AB-PMJAY বলে উল্লেখ করবো)। উল্লেখ করেছেন সুপুষ্ট শিশু এবং মায়েদের কথা। New England Journal of Medicine (NEJM)-এ ২৩ মে, ২০১৯, সংখ্যায় “Getting Coverage Right for 500 Million Indians” শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের বক্তব্য অনুযায়ী ভারতে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যে সংস্কার করা হয়েছে তার দুটি স্তম্ভ – (১) দরিদ্রতম (আগেকার অবস্থা যাই থাকুকনা কেন) ৫০ কোটি ভারতবাসীর জন্য স্বাস্থ্য বীমা যার পরিমাণ প্রতিটি পরিবারের জন্য প্রতিবছর ৭,০০০ ডলার বা ৫০০,০০০ টাকা, (২) যেসব সুযোগ-সুবিধে বর্তমানে রয়েছে সেসবের রূপান্তর ঘটিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যের জন্য পুনর্বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যার নতুন পোষাকি নাম হচ্ছে “Health and Wellness Centers” (HWC) তথা স্বাস্থ্য ও সুস্থতার কেন্দ্র। ১,৫০,০০০ HWC খোলা হবে ভারত জুড়ে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য যেসব সাবসেন্টার বা SC ছিলো সেগুলোকে HWC-র স্তরে উন্নীত করা হবে।

আমাদের নজরে থাকবে দুটি বিষয় – প্রথম, স্বাস্থ্যবিমার বা বিমার প্রসঙ্গ, এবং দ্বিতীয়, Health and Wellness Centers এরকম একটা নামের অনুষঙ্গেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, চকচকে ঝকঝকে একেকটা কেন্দ্র যেখানে বিশেষ করে হাসিমুখে মা এবং শিশুরা হেসে খেলে বেড়াচ্ছে। [প্রসঙ্গত, মজাদার হলেও উল্লেখযোগ্য যে বাস্তবিকই এই একইনামে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলে। গ্লোবাল ওয়েলনেস ইন্সটিটিউট নামে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংস্থা রয়েছে যার ২০১৭ সালে বাণিজ্যের পরিমাণ ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার – “Wellness Now a $4.2 Trillion Global Industry – with 12.8% Growth from 2015-2017”।]

NEJM-এর এ প্রবন্ধেই বলা হয়েছে – “Historically, primary care has been underfunded and disconnected from secondary and tertiary care; weak primary care has made it difficult to effectively reduce unnecessary, high hospital costs.” (ঐতিহাসিকভাবে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যের যত্ন/পরিষেবা টাকার অভাবে ধুঁকছে এবং সেকেন্ডারি আর টারশিয়ারি পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছে; দুর্বল প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ফলে হাসপাতালের অপ্রয়োজনীয় এবং অত্যধিক খরচ কার্যকরীভাবে কমানো প্রায় অসম্ভব।) বলা হয়েছে যে এই সংস্কার কেবলমাত্র তখন সফল হতে পারে যখন (১) প্রকৃত অর্থে, বাস্তবে অর্থনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া হবে, (২) স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং অন্যান্য সহকারী শক্তিকে যথেষ্ট পরিমাণে সরবরাহ করা যাবে, (৩) স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে যুক্ত করা যাবে, এবং (৪) স্বাস্থ্যপরিষেবা দেওয়ার মানকে গুণগতভাবে বাড়ানো যাবে। প্রবন্ধের শেষে অবশ্য সতর্ক বার্তা উচ্চারণ করা হয়েছে – “A high-profile failure, however, will set this movement back. India has the formula to succeed, and we believe the emphases outlined here can help India show the world that health care for all is eminently possible, even in the most complex of circumstances.” (উচ্চপর্যায়ের ব্যর্থতা সমগ্র গতিশীলতাকে বিপরীতদিকে ঘুরিয়ে দেবে। ভারতের কাছে সাফল্যের সূত্র আছে, এবং আমরা বিশ্বাস করি এখানে যেসব জায়গায় জোর দেবার কথা বলা হয়েছে সেগুলো পৃথিবীকে দেখাতে পারে সকলের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবা বাস্তবে সম্ভব, এমনকি সবচেয়ে জটিল অবস্থাতেও।)

আন্তর্জাতিকভাবে আজ এটা গবেষক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং জনসাধারণের একাংশের কাছেও যথেষ্ট স্পষ্ট যে ভারত কেন যেকোন দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সে দেশের জনতার স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপরে নির্ভর করে। অমর্ত্য সেন তাঁর দুটি প্রধান গ্রন্থে – Commodities and Capabilities (1985) এবং Development as Freedom (1999) – দেখিয়েছেন যে আয়ের ক্ষেত্রে আপেক্ষিক ভিন্নতা (difference) সামর্থ্যের ক্ষেত্রে চরম (absolute) ভিন্নতায় অনুদিত হয় (translated)। সেনের যুক্তি অনুযায়ী, যে যুক্তি আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীতও বটে, সামর্থ্য বা capabilities গভীরভাবে প্রভাবিত হয় ব্যক্তির স্বাস্থ্যর অবস্থা দিয়ে। এসব বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে কানাডার স্বাস্থ্য মন্ত্রী মার্ক লালদেঁ ১৯৮১ সালে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করলেন – A New Perspective on the Health of Canadians. এই রিপোর্টে আলমা-আটার সনদ, মার্মটের মতো ব্যক্তিত্বদের বিচার-বিশ্লেষণ এবং অমর্ত্য সেনের মতো অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবকিছুই একীভূত করে নেওয়া হল। মোদ্দা কথা হচ্ছে বিশ্বের সর্বত্র স্বাস্থ্যের এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার বিষয়টি নিয়ে জীবন্তভাবে চর্চা চলছে। হয়তো বা ভারতই খানিকটা ব্যতিক্রম হয়ে রয়েছে এখন অব্দি। American Journal of Public Health-এর মতো পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে এরকম মতামত – “১৯৮১ সালে হু এবং ইউনিসেফের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছিলো যে প্রাইভেট মেডিক্যাল ব্যবস্থা থেকে জন্ম নেয় ফাঁপানো মেডিক্যাল খরচের জন্ম বহর, বিদেশী ওষুধের জন্য বাড়াবাড়ি রকমের খরচ, এবং নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মেডিক্যাল শিক্ষা আর প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরে। এগুলো সবকটাই আলমা-আটার উদ্দীপনার সরাসরিভাবে বিরোধী।” (Elizabeth Fee and Theodore Brown, “A Return to the Social Justice Spirit of Alma-Ata”, APJH 105, 6 (2015): 1096-1097) ২০০৮ সালের হু-র রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিলো – Primary Health Care: Now More Than Ever. গতবছর (২০১৮) হু-র বর্ষীয়ান ব্যক্তিত্বদের তরফে (The Elders) যেমন নেলসন ম্যান্ডেলা, কোফি আন্নান, বান কি মুন প্রভৃতি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে – Universal Health Coverage (UHC) in India: A call for greater political commitment and public financing.

মাত্র কদিন আগে, ২০১৯-এর মার্চ মাসের শেষের দিকে, PAHO (Pan American Health Organization, 2019)-র রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে “Universal Health in the 21 st Century” 40 Years of Alma-Ata – Report of the High-Level Commission” শিরোনামে। সে রিপোর্টে মিশেল ব্যাচেলেট জেরিয়া (United Nations High Commissioner for Human Rights) জানাচ্ছেন যে স্বাস্থ্যের সুরক্ষার দায়িত্ব নেওয়া রাষ্ট্রের একটি প্রাথমিক ও স্বাভাবিক কর্তব্য এবং “তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব হল মানবাধিকারকে রক্ষা করা যার স্বাস্থ্যের অধিকার অন্তর্ভুক্ত।” ঐ রিপোর্টেই বলা হচ্ছে যে স্বাস্থ্য এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে আলমা-আটায় গৃহীত সংজ্ঞা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা-কে “as a political strategy”-র মতো বোঝাপড়ার জায়গায় নিয়ে এসেছে। ফলে স্বাস্থ্যের মতো এমন একটি বিষয় যে ভারতের রাজনৈতিক ইস্তাহারে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থান পাবে এটা অস্বাভাবিক নয়, এতদিন স্থান পায়নি সেটা অস্বাভাবিক।

এখানে সবার মনে পড়বে রুডলফ ভির্কো (Rudolf Virchow)-র বিখ্যাত উক্তি – “মেডিসিন একটি সমাজ বিজ্ঞান, রাজনীতি মেডিসিনের প্রসারিত চেহারা ছাড়া আর কিছুই নয়।” PAHO-র রিপোর্টে প্রাঞ্জল ভাষায় বলা হলো – “এটা জোর দিয়ে বলতে হবে যে আমাদের সামাজিক অসাম্য শুধুমাত্র আয়ের অসাম্য বোঝায় না, বোঝায় অর্থনৈতিক ও উৎপাদনশীলতার পথে প্রবেশাধিকার না থাকা এবং অসংখ্য বৈষম্যকে, যেমন – আর্থসামাজিক, লিঙ্গ-নির্ভর, জাতি-জাত সংক্রান্ত, সীমা সংক্রান্ত এবং পরিবেশের অভিঘাত।”

বর্তমান সময়ে জনস্বাস্থ্যের দুনিয়ায় অতি মান্য গবেষক স্যার মাইকেল মার্মট ল্যান্সেট-এ প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ “Universal health coverage and social determinants of health”-এ বলছেন – “আলমা-আটায় এটা স্বীকৃতি পেয়েছিল যে জনসাধারণের স্বাস্থ্য বা population health-এর উন্নতির জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছাড়াও আরও কিছু প্রয়োজন।” (ল্যান্সেট ৩৮২, অক্টোবর ১২, ২১০৩, পৃঃ ১২৭৭-১২৭৮) মার্মটের ভাষায় – “হেলথ কেয়ার জনস্বাস্থ্যের কেবলমাত্র একটি নির্ধারক বিষয়। অন্যান্য উপাদানগুলো যেমন সামাজিক সুরক্ষা, ভালো চাকরি এবং জীবনের প্রথম বছরগুলোতে যত্ন নেওয়া ইত্যাদিকে ভুললে চলবে না, অথচ এগুলোকে বারংবার ভুলে যাওয়া হয়।” সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে পড়ে মব লিঞ্চিং-এ ইচ্ছেমতো মেরে ফেলা নয়, ভ্রূণহত্যা নয় কিংবা খাপ পঞ্চায়েত নয়। মার্মট আমাদের নজরে আনেন – “ যদি স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য পরিষেবাকে সার্বজনীন মানবাধিকার করে তুলতে হয় তাহলে আমাদের বুঝতে হবে কি অন্যায্যভাবে রয়েছে স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য সহায়তা পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা।” অর্থাৎ, স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রসঙ্গ ২০১৩ সালে এসেও সার্বজনীন মানবাধিকারের বিষয় বলে বিবেচিত হবার জোরালো দাবী জানাচ্ছে। এপ্রিলের ১৮ তারিখে (২০১৯) প্রকাশিত WHO থেকে প্রকাশিত Public Health and Environment e-News-এ বলা হচ্ছে – “বিশ্ব জুড়ে স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে প্রতি চারটির মধ্যে একটির ক্ষেত্রে জল সরবরাহের বুনিয়াদি ব্যবস্থাই নেই।” কোন কর্পোরেট সংস্থা বা ইন্সিউরেন্স কোম্পানি মেটাবে এই সমস্যা? রাষ্ট্রকেই তো নিতে হবে এর দায়িত্ব।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করার মতো, আমাদের নিকটবর্তী ক্ষুদ্র প্রতিবেশী রাষ্ট্র থাইল্যান্ডের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের পরিমাণ হু-র হিসেব অনুযায়ী জিডিপি-র ৪.১%, ভারতে যেখানে এর পরিমাণ ১%-এর আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। মনে রাখতে হবে আমাদের নির্বাচিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে থাইল্যান্ড একটা দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। এমনকি ২০১৪ সাল থেকে ওখানে চলছে সামরিক শাসন। তা সত্বেও ওখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। (দ্রষ্টব্যঃ “Health systems developments in Thailand: a solid platform for successful implementation of universal health coverage”, Lancet, January 31, 2018, pp: 1-17) থাইল্যান্ডের সাধারণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিপুলভাবে হাসপাতাল নির্ভর। এতটাই যে থাইল্যান্ড, ভারত প্রভৃতি দেশে কম মূল্যে ভালো চিকিৎসার সুবিধে পাবার জন্য “মেডিক্যাল টুরিজম” বলে একটি নতুন শব্দবন্ধই তৈরি হয়ে গেছে। এসব সত্বেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব এবং সুযোগ যথেষ্ট জোরালোভাবে রয়েছে। থাইল্যান্ডের মূল্যায়ন করতে গিয়ে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত “Learning from Thailand’s health reforms” প্রবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছে – “Thailand combined the introduction of universal access to subsidised health care with a radical shift in funding away from urban hospitals to primary care.” আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল থাইল্যান্ডে বৌদ্ধ সংঘ এবং সংগঠনগুলোকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার সফল রূপায়নের জন্য গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগানো হয়েছে। এবং এসমস্ত কিছু করতে এদের ঢাক পিটিয়ে “আয়ুষ্মান থাইল্যান্ড” বা সেরকম কোন প্রোগ্রাম ঘোষণা করতে হয়নি। রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দায়িত্ব এবং কাজ হিসেবেই এগুলোকে গ্রহণ এবং বাস্তবায়িত করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি গবেষণালব্ধ তথ্য বলে ইন্সিউরেন্সের আওতায় থাকা মানুষের সংখ্যা বা অংশের সাথে যাদেরকে “catastrophic health expenditure”-এর জন্য দারিদ্র্য সীমার নীচে তলিয়ে যেতে হয় (যে সংখ্যা ভারতের ক্ষেত্রে ৬৩ লক্ষ বা ইংল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার প্রায় সমান) – এ দুটির মাঝে সামান্য সংযোগ আছে। (দ্রষ্টব্যঃ Alan Wagstaff et al, “Progress on catastrophic health spending in 133 countries: a retrospective observational study”, Lancet, December 13, 2017, pp. 1-11. এ বিষয়ে বর্তমান প্রবন্ধকারের Journal of Family Medicine and Primary Care-এ এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত “Primary care is the key to health for all” প্রবন্ধটিও দ্রষ্টব্য। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হল – “Mortality due to low-quality health systems in the universal health coverage era: a systematic analysis of amenable deaths in 137 countries” – (প্রকাশিত হয়েছিল ল্যান্সেট, সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৮, সংখ্যায়।) ল্যান্সেটের প্রবন্ধে তথ্য পর্যালোচনা করে দেখানো হয়েছে চিনে ৯০% মানুষের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা বা health coverage দেওয়া আছে ইন্সিউরেন্সের মাধ্যমে, কিন্তু সেখানে catastrophic health expenditure-এর শিকার জনসংখ্যার ১৮%। আবার ভারতে মাত্র ২০% মানুষের health coverage থাকা সত্ত্বেও catastrophic health expenditure-এর শিকার জনসংখ্যার ১৭%। ফলে ভারতে এবারের বাজেটে গৃহীত এবং প্রবলভাবে প্রচারিত আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প যে শেষ অব্দি catastrophic health expenditure লক্ষ্যণীয়ভাবে কমাতে পারবে সেকথা এখনই বলা যাচ্ছেনা। আরেকটা নজর করার বিষয় হল ভারতে স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক পরিবেশ ও সংস্থানের বিপুল তারতম্য। কোথাও কোথাও স্বাস্থ্য সূচকগুলো দক্ষিণ ইউরোপ, এমনকি আমেরিকার সাথে তুলনীয়। আবার কোথাও কোথাও স্বাস্থ্য সূচকগুলো অব-সাহারা বা sub-Saharan দেশগুলোর সাথে একাসনে বসে। 

আয়ুষ্মান ভারত এবং Health and Wellness Centers (HWC)

বিধিসম্মত সতর্কীকরণঃ সুকুমার রায়ের গল্পে নাম বিভ্রাট নিয়ে যে বিপুল গোলযোগ দেখা গিয়েছিল আয়ুষ্মান ভারত এবং Health and Wellness Centers (HWC)-এর ক্ষেত্রে সেরকম কিছু হবেনা তো? AB-PMJAY শব্দটি শুনতে শুনতে মানুষ হয়তো বিস্মৃতই হয়ে গেলো যে প্রকৃতপক্ষে এটা একটা ইন্সিউরেন্স বা স্বাস্থ্য বীমা। রাষ্ট্র কোন এক মুহূর্তে হাত গুটিয়ে নিলে এখানে পৃথিবীর ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়ী ইন্সিউরেন্স কোম্পানীগুলো ঢুকে পড়বে। আর সেটার অভিজ্ঞতা কেমন হতে পারে তা আমেরিকার অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করবো আমাদের আলোচনায়।

HWC শব্দটির দ্যতনায় “দ্যাখো কেমন বাড়ছি আমি!”-র মতো হরলিকস বা কমপ্লানের হৃষ্টপুষ্ট বাচ্চার ছবি চোখে ভেসে উঠলেও প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা-র মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং একান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়টি সামাজিক স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবেনা তো? এক ধরনের historical and social amnesia তৈরি হবেনা তো? আশঙ্কা কিন্তু থেকে যাচ্ছে। HWC-তে কি কি পাওয়া যাবে? PLoS-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র বলছে – এতে থাকবে যত্ন নেবার প্রথম বিন্দু (point of care), যোগ ব্যায়ামের জন্য ঘর, ফিজিওথেরাপি এবং গ্রুপ মিটিং-এর ব্যবস্থা, সম্পূর্ণ প্রাইভেসি রক্ষা করে রোগী দেখার ঘর, বিনামূল্যে রোগনির্ণয় কেন্দ্র এবং ফার্মেসি, টেলিমেডিসিনের সুবিধে এবং ৩০+ রোগীর জন্য অপেক্ষা করার ঘর। এখানে চোখের এবং নাক-কান-গলার চিকিৎসা হবে, মুখের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া হবে, মানসিক রোগীদের দেখা হবে, দেখা হবে বৃদ্ধদের, “palliative health emergency medical services”-এর ব্যবস্থা, সংক্রামক এবং অ-সংক্রামক রোগের চিকিৎসা এবং বহির্বিভাগে রোগী দেখার ব্যবস্থা। এছাড়াও থাকবে electronic health records with the support of a robust IT systems. (Harsh Bakshi et al, “Ayushman Bharat Initiative (2018): What We Stand to Gain or Lose!” PLoS, April-June, 2018, pp. 63-66) শুনে মনে হচ্ছেনা কোন পাঁচতারা কর্পোরেট হাসপাতালে ঢুকে পড়েছি? এত সুবিধে কিউবা কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো কিংবা ইংল্যান্ডের NHS-এও আছে কিনা সন্দেহ! কিন্তু আপাতত দুটি অস্বস্তি থেকে গেল – (১) টিবি (বিশেষ করে মাল্টি ড্রাগ রেজিসট্যান্ট তথা MDR-TB বা ম্যালেরিয়া বা সাপের কামড়ের মতো অসুস্থতার  ক্ষেত্রে কি করা হবে? (২) টীকাকরণ কর্মসূচী বা পালস-পোলিও প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে ব্যয়বরাদ্দ যা ২০১৮-১৯-এ ছিলো ৭,৪১১.৪০ কোটি টাকা থেকে কমে ২০১৯-২০-এ হয়েছে ৬,৭৫৮.৪৬ কোটি টাকা সে ব্যাপারে কি করা হবে? আপাতত কোন উত্তর নেই।

AB-PMJAY-এর (যা আসলে একটি আদর্শ ইন্সিউরেন্স স্কিম) জন্য এবারের বাজেট বরাদ্দ হয়েছে ৬,৪০০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ সালে এর জন্য বরাদ্দ ছিলো ২,৪০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, AB-PMJAY-এর ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দের উল্লম্ফন হয়েছে ১৫৪.৭৮%। অন্তর্বর্তী বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ব্য্যবরাদ্দ ৫২,৮০০ কোটি টাকা থেকে মূল বাজেটে বেড়ে হয়েছে ৬২,৬৫৯.১২ কোটি টাকা। AB-PMJAY-কে বলা হচ্ছে flagship focus. কিন্তু বিজনেস ইন্সাইডার পত্রিকার বিশ্লেষণ অনুযায়ী – জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন বা National Health Mission-এর জন্য (NHM শুরু হয়েছিলো ২০০৫ সালে) ব্যায়বরাদ্দ কমেছে ২.১%। NHM হচ্ছে ভারতের প্রাথমিক স্বাস্থ্যের জন্য সর্ববৃহৎ infrastructure program. মান্য জার্নাল PLoS-এ একটি প্রবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছে – Few details have emerged as to how the interrelated issues of governance, monitoring, and accountability will be managed under the scheme to progress India towards successful implementation of AB-PMJAY and ultimately UHC. (Blake J. Angell et al, “The Ayushman Bharat Pradhana Mantri Jan Arogya Yojana and the path to universal health coverage in India: Overcoming the challenges of stewardship and governance”, PLoS, March 7, 2019, pp. 1-6)

EPW পত্রিকায় একটি প্রবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছে যে ৬৪,০০০ কোটি টাকা আমাদের সংখ্যা গরিষ্ঠ দরিদ্র ভারতবাসীর কাছে বিপুল পরিমাণ মনে হলেও প্রতিটি পরিবারের জন্য এর প্রিমিয়ামের বরাদ্দ দাঁড়াবে ৬৪০ টাকায়, যা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট কম বললেও কম বলা হয়। উদাহরণ দিয়ে দেখানো হয়েছে, ছত্তিসগড়ে Chief Minister Health Insurance Scheme-এ AB-PMJAY-এর ৫,০০,০০০ টাকার এক-দশমাংশ অর্থাৎ ৫,০০০ টাকা cover (বীমার ফলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা) করা হয়। কিন্তু প্রিমিয়ামের পরিমাণ ১,১০০ টাকা। (অভয় শুক্লা, “Public Health Systems and Privatised Agendas”, EPW, April 27, 2019, pp. 14-16) Institute of Economic Growth-এর গবেষকেরা দেখিয়েছেন AB-PMJAY-কে পরিপূর্ণভাবে কাজ করতে হলে প্রিমিয়ামের পরিমাণ বেড়ে ২,৪০০ টাকা হতে হবে। এবং যদি “জনতার ইন্সিউরেন্স” পূর্ণত আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে হয় তাহলে শুধুমাত্র AB-PMJAY কেন্দ্রের স্বাস্থ্য বাজেটের ৭৫% থেকে ১০০% গিলে নেবে। আমাদের বাস্তববোধ কি বলে? এটা কি আদৌ হওয়া সম্ভব? নাকি “স্বাস্থ্য আমার মৌলিক অধিকার” বা health with equity – এই শ্লোগান থেকে ইন্সিররেন্সের ধারণা জনমানসে গ্রাহ্য করে তোলার সাথে সাথে প্রাইভেট ইন্সিউরেন্সের দিকে রাষ্ট্রীয় যাত্রা শুরু হল? আমাদের ভেবে দেখতে হবে আরও অনেক গভীরে গিয়ে।

AB-PMJAY স্কিম ভারতের জনসংখ্যার ৪০%-এর কমসংখ্যক মানুষকে cover করে, ৬০% মানুষকে পথের ধারে পড়ে থাকে। অভয় শুক্লার মন্তব্য – “It only covers certain kinds of inpatient care, but does not cover outpatient and other types of healthcare spending, which amount to nearly 70% of out-of-pocket healthcare expenditure (NHSRC 2016). This scheme focuses not on promoting comprehensive health, but only on selected operations and hospitalisations, with the strong likelihood of unnecessary procedures being done.”

আরেকটি গবেষণাপত্রে মন্তব্য করা হয়েছে – এর ফলে catastrophic health expenditure-এর ক্ষেত্রে চোখে পড়ার মতো কোন পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয়না। কারণ “ Only 2.8% of hospitalizations among the insured received cashless services compared to 1.5% among those without insurance. We also find that 70% of those with government insurance and 79.4% without insurance spent more than Rs 1000 .” (Alok Ranjan et al, “Effectiveness of Government Strategies for Financial Protection against Costs of Hospitalization Care in India”, BMC Public Health, April 16, 2018, pp. 501-512) সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার এবং চিকিৎসাকর্মীর বিপুল জোগান কে দেবে? সেরকম কোন সংস্থান আমাদের স্বাস্থ্য বাজেটে নেই। ফলে এরকম অনুমান করা বোধহয় অসঙ্গত হবেনা যে এতে প্রাইভেট ও কর্পোরেট হাসপাতাল এবং প্রাইভেট ইন্সিউরেন্স কোম্পানিগুলোর আখেরে লাভ হবে। গণতান্ত্রিক আবহে স্বাস্থ্যের যে গণতন্ত্র থাকে যাকে আমরা সকলের জন্য স্বাস্থ্য বা UHC বলতে পারি সেটা দুমড়েমুচড়ে থাকবে। অভয় শুক্লার মন্তব্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ – “constricting funds for major programmes such as the NHM and RCH (Reproductive and Child Health) leading to under-resourcing of public systems, with negative implications for low-income populations; promoting profiteering by the private sector in both healthcare and pharmaceuticals, by refusing to implement regulations which are essential to protect public goods; and diverting

already scarce public resources towards private entities through a health insurance scheme that is of doubtful benefit to health of communities ”। 

প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে দু-চার কথা

প্রায় ১০০ বছর আগে ১৯৩৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং-এ Rural Hygiene-এর ওপরে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স হয়েছিলো লীগ অব নেশনস-এর নেতৃত্বে। ১০০-র বেশি দেশের প্রতিনিধি এতে অংশগ্রহণ করেছিলো। গ্রামীণ স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছনতা, জনতার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলা, স্যানিটেশন, স্যানিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পুষ্টি – এগুলো ছিলো এ সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয়। এর ৪১ বছর পরে ১৯৭৮ সালে প্রাথমিক স্বাস্থ্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে হল আলমা-আটা সম্মেলন।

১৯৭৮-এর আলমা-আটা সনদের ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল – পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য মানের স্বাস্থ্য ২০০০ সালের মধ্যে অর্জিত হতে পারে, যদি পৃথিবীর সম্পদকে পরিপূর্ণ চেহারায় আরো ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়। এ সম্পদের এক বড়ো অংশ এখন ব্যয় করা হয় সমরসম্ভার গড়ে তুলতে এবং যুদ্ধের জন্য। আন্তরিকভাবে স্বাধীনতা, শান্তি, দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়া ( d é tente ) এবং নিরস্ত্রীকরণের নীতি প্রণয়ন অতিরিক্ত সম্পদ উৎপাদনের রাস্তা উন্মুক্ত করবে। এ সম্পদসম্ভারকে ব্যবহার করা সম্ভব আর করা উচিৎও শান্তির লক্ষ্যে এবং বিশেষ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য, যার মধ্যে একটি আবশ্যিক অংশ হিসেবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এর অংশ দিতে হবে।”

মূল কথা, পৃথিবীর দূরতম প্রান্তের স্বাস্থ্যের সুযোগহীন মানুষটির জন্যও প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সুরক্ষিত করতে হবে এবং এজন্য স্বাধীনতা, শান্তি, দ্বিপাক্ষিক আলাপ-আলোচনা এবং নিরস্ত্রীকরণের নীতি গ্রহণ করতে হবে যার মধ্য দিয়ে একটি দেশের সুষম বিকাশের জন্য আরো বেশি মানবসম্পদ সৃষ্টি হতে পারে। এবার বর্তমান যুদ্ধোন্মত্ততার পরিস্থিতিতে কিভাবে তৈরি হবে মানব সম্পদ? কিভাবে নির্মিত হবে স্থানীয় সম্পদ, পারস্পরিক বিশ্বাস, যূথ চেতনার উপর ভিত্তি করে জনস্বাস্থ্যের চেহারা? জনস্বাস্থ্যের চেহারা তো কোন প্রাতিষ্ঠানিক কিছু নয়, বড়ো বড়ো বিল্ডিং-ও নয়, নয় হোমরা চোমরা কেউকেটা আমলা এবং কর্তাদের দল। এখানে প্রয়োজন একেবারে প্রান্তিক স্তরে জনতার অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যের বনিয়াদ তৈরি করা। আলমা-আটা সনদের ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল – “প্রতিটি ব্যক্তির অধিকার এবং দায়িত্ব রয়েছে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে নিজেদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা পরিষেবার (health care) পরিকল্পনা তৈরিতে এবং একে কার্যকরী করার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করার।” এখানে জোর পড়লো সমাজের একেবারে  তলার দিকে থাকা মানুষগুলোর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের ওপরে – কেবলমাত্র দর্শক হয়ে থাকা নয়। আমাদের এখানে স্বাস্থ্যের যে ধারণা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিরাজমান তা প্রধানত ভার্টিকাল – পিরামিডের গঠনের মতো। ওপরে সব মাথাভারী প্রশাসনিক কর্তারা বসে রয়েছে, তাদের ভার বহন করছে নীচের তলার সম্পদহীন, অধিকারহীন (entitlement), সম্বলহীন প্রায় ৯০ কোটি বা তার বেশি ভারতবাসী। কিভাবে CPHC-র বার্তা পৌঁছুবে এদের কাছে? উত্তর নেই। ইস্তাহার নিশ্চুপ। এখানে স্মরণে রাখবো, প্রাক-স্বাধীনতা যুগে ১৯৪৩ সালে স্যার জোসেফ ভোরের নেতৃত্বে স্বাধীন ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বরূপ কি হবে এ ব্যাপারে একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছিল। এ কমিটি ভোর কমিটি নামেই সমধিক পরিচিত। ১৯৪৬ সালে ভোর কমিটি এর রিপোর্ট পেশ করে। সেখানে ভোর CPHC-র অনুমোদন ছিল, অনুমোদন ছিল হরাইজন্টাল অর্থাৎ জনগনের সমগ্র অংশ ও এর বিভিন্নতাকে মাথায় রেখে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিকল্পনা তৈরি করার। কিন্তু সেটাকে জন্ম মুহূর্তেই প্রায় ঠাণ্ডা ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর পরিবর্তে ভারত গ্রহণ করেছিলো রোগ-কেন্দ্রিক selective primary health care-এর প্রোগ্রাম, যা চরিত্রের দিক থেকে ভার্টিকাল।

১৯৪৩ সালে স্যার জোসেফ ভোরের নেতৃত্বে Health Survey & Development Committee তৈরি করা হয় যা ভোর কমিটি বলে অধিক পরিচিত। এতে সমস্ত প্রশাসনিক স্তরে preventive and curative services গ্রহণ করার কথা সুপারিশ করা হয়। এর জন্য শিক্ষাক্রমে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপরে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। একথাও বলা হয় প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২ জন ডাক্তার, ১ জন নার্স, ৪ জন পাব্লিক হেলথ নার্স, মোট ৬ জন প্রশিক্ষিত ধাত্রী, ২ জন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর, ২ জন স্বাস্থ্য সহকারী, ১ জন ফার্মাসিস্ট এবং ১৫ জন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী থাকবে। এখানে জোর দিয়ে বলতে হবে আমরা সুপারিশগুলো একবার তলিয়ে ভাবি। প্রায় জন্মলগ্নেই একে মর্গে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।

এর পরিবর্তে ভারতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তিনটি অঙ্গ হয়ে উঠেছে সুপারস্পেশালিটি, ভাঙ্গাচোরা জনস্বাস্থ্য প্রোগ্রাম এবং হাতুরেপনা। ভারতের নাগরিকদের (citizens) জন্য একান্ত প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, আধুনিক মেট্রোপলিটান ভারতের “বিশ্বনাগরিক”-দের (netizens) জন্য দরকার পাঁচ-সাততারা স্বাস্থ্য পরিষেবা বিক্রয় কেন্দ্র। কিভাবে ঘুচবে এ দুয়ের মধ্যেকার যোজন দূরত্ব?

১৯৫০-৭০-র দশক জুড়ে বিশ্বরাজনীতিতে দ্বিমেরু বিশ্বের জীবন্ত উপস্থিতি ছিল। প্রবল পরাক্রান্ত, আগ্রাসী ও মুক্ত পুঁজি এবং সাম্রাজ্যবাদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মতো ভিন্ন একটি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব – সমাজতান্ত্রিক বলে যার উপস্থিতি ছিল জনমানসে। দ্বিমেরু বিশ্বের উপস্থিতির জন্য রাজনৈতিক এবং সামাজিক একটি পরিসর তৈরি হয়েছিল যাকে বলতে পারি “তৃতীয় পরিসর”। বিশ্বের মানুষের স্বাভাবিক আশা-আকাঞ্খা এবং দাবী নিয়ে দর কষাকষির ক্ষমতা বেশি ছিল। পরবর্তীতে একমেরু বিশ্বের উদ্ভব এসবকিছুকে পরিপূর্ণভাবে বিনষ্ট করে দেয় – আজকের ভারত এর একটি প্রোজ্জ্বলন্ত উদাহরণ। এ সময়েই পৃথিবী জুড়ে শ্লোগান উঠেছিল – স্বাস্থ্য আমার অধিকার।

অল্পকথায়, জনস্বাস্থ্যের কিংবা জনতার স্বাস্থ্যের দর্শন একটি বহুল পরিমাণে ভিন্ন অবস্থান। এটা কোন একক ব্যক্তিকে পণ্য হিসেবে বিক্রী করা চকমকে মোড়কে মোড়া “finished product” স্বাস্থ্য পরিষেবা বা “হোল বডি চেক আপ” নয়, মেডিক্যাল শিক্ষার বুদবুদের বাজার নয় (New England Journal of Medicine বা NEJM-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ থেকে ধার করা) বা এখানে কোন লুকনো শিক্ষাক্রমও নেই। প্রসঙ্গত, NEJM-এ সেপ্টেম্বর ২৯, ২০০৫-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে – “Learning from the Dying” – মন্তব্য করা হয়েছিল – “দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান সময়ে যে মেডিসিন শেখানো হয় এর একটি “লুকনো পাঠ্যসূচী” (hidden curriculum) রয়েছে, বিশেষ করে ত্বরায় শেষ করা, রোগ-কেন্দ্রিক, নৈর্ব্যক্তিক, চাপের মধ্যে যেকোন কাজ দ্রুত, সময়ে সেরে ফেলতেই হবে এরকম আবহাওয়ার রোগীকে চেনার বছরগুলো ছাত্রদের (high-throughput clinical years), এখনো পর্যন্ত ফ্যাকাল্টি সদস্যদের সর্বশ্রেষ্ঠ আকাঙ্খা এবং রোগীদের এবং পরিবারের সর্বোচ্চ স্বার্থের হানি ঘটিয়েই চলে। পাঠকেরা বিচার করুন, তর্কযোগ্যভাবে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মেডিক্যাল শিক্ষার জগৎ আমেরিকায় ২০০৫ সালে এরকম সংকটের জন্ম হচ্ছে যা এখন বেড়েছে বই কমেনি। কোথায় যাত্রা করবে নৈর্ব্যক্তিক চিকিৎসার তরণী কর্পোরেট সমুদ্র বেয়ে? মানুষ তো এখানে কেবলমাত্র একটি সংখ্যা বা অবজেক্ট মাত্র। এরকম এক বার্তাই অতুল গাওয়ান্ডের লেখায় ফুটে ওঠে – “ইভান ইলিচের (তলস্তয়ের বিখ্যাত গল্প “ইভান ইলিচের মৃত্যু”-র কথা বলা হয়েছে) উনবিংশ আদিম ডাক্তারদের তুলনায় আমরা খুব সামান্য ভালো করেছি – প্রকৃত অর্থে আরো খারাপ, যদি চিকিৎসার নামে নতুন ধরনের শারীরিক অত্যাচার যা রোগীর দেহে এঁকে চলি তাতে প্রশ্ন জাগে আদিম কে।” (অতুল গাওয়ান্ডে, Being Mortal, পৃঃ ৬)

জনস্বাস্থ্যের কিংবা জনতার স্বাস্থ্যের দর্শনে কোন “লুকনো শিক্ষাক্রম” থাকেনা। এখানে সবকিছুই অবারিত খোলা এবং পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ। নিজের নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, দৈনন্দিন জীবন-চর্যা এবং সর্বোপরি পড়শি-চেতনা ধরে আছে ভারতের মতো আরো বহু দেশের অসমসত্ত্ব বিপুল জনসমষ্টিকে। এখানে টিবির মতো নিঃশব্দে মারণান্তক রোগের বাস, কৃমিতে ক্ষয়াটে চেহারার সমাহার, এখানেই থাকে আন্তর্জাতিক জগতে আলোচিত “tropical neglected diseases” – যার জন্য ব্যয়বরাদ্দ কিছু নয় বললেও বেশি বলা হয়। এই বিশেষ অবস্থান বুঝতে না পারলে মেডিক্যাল কলেজের প্রশিক্ষণ শেষ করা মাত্র জনস্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী চিকিৎসক হয়ে ওঠা যায় না। মুক্ত বাজারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শন, বিশেষ করে এর উপজাত social psyche তথা সামাজিক মানসিকতা, একদিকে clinical health (ব্যক্তিগতস্তরে চিকিৎসা) ও public health (জনস্বাস্থ্য); অন্যদিকে, health তথা স্বাস্থ্য এবং হেল্‌থ কেয়ার-এর মধ্যেকার প্রভেদ মুছে দিতে বদ্ধ পরিকর। আরও বেশি সংখ্যক প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ তৈরির ঢালাও অনুমতি, মুক্ত বাজারের অর্থনীতির নিয়ম মেনে উচ্চ মূল্যে মেডিক্যাল শিক্ষার কেনাবেচা – কোনওটাই CPHC-র উপযোগী চিকিৎসক তৈরি করবেনা।

জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাব্লিক হেলথের বিশেষজ্ঞ গবেষক লেইয়ু শি তাঁর “The Impact of Primary Care: A Focused Review” প্রবন্ধের শুরুতেই জানাচ্ছেন – “Primary care serves as the cornerstone for building a strong healthcare system that ensures positive health outcomes and health equity.” (Scientifica, Volume 2012, 1-22)

আমাদের মেডিক্যাল শিক্ষাক্রম কি এর উপযুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে? কিংবা ভবিষ্যৎ কোন পরিকল্পনা রয়েছে এভাবে মেডিক্যাল শিক্ষা ও তার উপযুক্ত মেডিক্যাল শিক্ষাক্রম তৈরি করার? দুটোরই স্পষ্ট উত্তর হচ্ছে – না।

স্বাস্থ্যে ইন্সিউরেন্সের ছোট্ট ইতিকথা

১৯৬০ সালে প্রকাশিত হল ফ্রেডেরিখ হায়েকের লেখা অতি বিখ্যাত গ্রন্থ The Constitution of Liberty (২০১১ সালে শিকাগো ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে পুনঃপ্রকাশিত)। এ গ্রন্থে তিনি রাষ্ট্রের তরফে দেওয়া বিনামূল্যের স্বাস্থ্যের সুযোগ-সুবিধে এবং পরিষেবাকে সরাসরি আক্রমণ করলেন। এমনকি ব্রিটেনের সফল National Health Service (NHS)-ও বাদ গেলোনা। তাঁর কথায় – “বেভেরিজ স্কিম এবং সমগ্র ব্রিটিশ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের বাস্তবের সাথে কোন সম্পর্ক নেই।” (পৃঃ ৪২২) তাঁর যুক্তি অনুযায়ী – “বিনা মূল্যে চিকিৎসাপ্রদান দুটি মৌলিক ভুলের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে।” (পৃঃ ৪২১) তাহলে এ থেকে উত্তরণের উপায় কি? উপায় স্বাস্থ্যকে বোঝার এবং দেখাশোনার দায়িত্ব মুক্ত বাজারের হাতে তুলে দেওয়া – “এনিয়ে কোন সংশয় নেই যে স্বাস্থ্য-ইন্সিউরেন্সের বৃদ্ধি খুবই আকাঙ্খিত।” ((পৃঃ ৪২১)

এর তিনবছর পরে ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হল কেনেথ অ্যারো-র সমধিক বিখ্যাত গবেষণা প্রবন্ধ – “Uncertainty and the Welfare Economics of Medical Care”। এখানেও ভিন্ন যুক্তিতে মুক্ত বাজারের হাতে চিকিৎসাকে প্রায় পূর্ণত ছেড়ে দেবার কথা অত্যন্ত জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হল – বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য মিলবেনা, চাই ইন্সিউরেন্স।

১৯৪০-এর দশক থেকেই শুরু হয়ে গেছে কাঞ্চন মূল্যে স্বাস্থ্যকে নির্ধারণ করার প্রক্রিয়া। এ প্রসঙ্গে একটি নির্ভরযোগ্য ভালো নিবন্ধ হল হার্বার্ট ক্লারম্যান-এর “Health Economics and Health Economics Research” (Milbank Memorial Fund Quarterly – Health and Society 57, 3 (1979): 371-379)। ক্লারম্যান বলছেন ১৯৬০-এর দশকে স্বাস্থ্যের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং ইন্সিউরেন্স সংক্রান্ত বিষয়ে সবচেয়ে আগ্রহী ছিলো ফোর্ড ফাউন্ডেশন। এনিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের খরচ বহন করেছিলো তারা এবং জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটি একে স্পনসর করেছিলো। (পৃঃ ৩৭৫)

বর্তমান সময়ে আমেরিকান ইন্সিউরেন্স বিশ্বব্যাপী আগ্রাসন এবং মুনাফার তথনিষ্ঠ, বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ রয়েছে যে গ্রন্থগুলিতে সেগুলো – (১) Beatrix Hoffman – The Wages of Sickness: The Politics of Health Insurance in Progressive America, (২) Wendell Potter – Deadly Spin, (৩) Elisabeth Rosenthal – An American Sickness, (৪) Vance Packard – The Hidden Pressures. এছাড়াও John Perkins-এর The New Confessions of an Economic Hitman: How America Really Took Over the World পুস্তকটিও গুরুত্বপূর্ণ।

আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছিলো ১৯৬০-৭০-৮০-র দশক জুড়ে। ১৯৭৬-এর সেপ্টেম্বর মাসে আলমা-আটা কনফারেন্সে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংক্রান্ত বিখ্যাত সনদ গৃহীত হবার পরে আন্তর্জাতিক পুঁজির দুনিয়ায় স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ নিয়ে কৌতুক করে বললে “গেল গেল রব” পড়ে গিয়েছিল। কারণ? (১) জনসাধারণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারিত হবে, (২) স্বাস্থ্যের বিকাশ সম্ভব অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে এবং এর দায়িত্ব রাষ্ট্রের, (৩) যুদ্ধে ব্যয়বরাদ্দ কমিয়ে স্বাস্থ্যে এবং জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে রাষ্ট্রের তরফে খরচা বাড়াতে হবে, (৪) স্বাস্থ্য একটি সার্বজনীন, মৌলিক মানবাধিকার, (৫) এতদিন অব্দি জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত যেসব প্রোগ্রাম গৃহীত হয়েছে যেমন ডিডিটি দিয়ে ম্যালেরিয়া নিধন (আদৌ যা সফল হয়নি, সফল হয়নি পোলিও নির্মূল করার প্রোগ্রামও) ইত্যাদি সবগুলোই ছিল ভার্টিকাল প্রোগ্রাম অর্থাৎ ভেক্টর তথা রোগ-কেন্দ্রিক, (৬) জনস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন হরাইজন্টাল বা সর্বাত্মক প্রোগ্রাম, এবং, সর্বোপরি, (৭) রাষ্ট্র জনসাধারণের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিলে প্রাইভেট ইন্সিউরেন্সের আর কোন ভূমিকা থাকেনা। 

এরকম একটা আবহাওয়া যদি বিশ্বব্যাপী জন্ম নেয় তাহলে পৃথিবীর অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক এবং শাসক কর্পোরেটরা যাবে কোথায়? ওদের কোষাগার তো শূণ্য হয়ে যাবে! বেশি দিন সময় নেয়নি ওরা। ১৯৭৯-র এপ্রিল মাসে রকফেলার ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট জন নোলস ইতালির বেলাজিও-তে “Health and Population in Development”  নামে একটি কনফারেন্স সংগঠিত করলেন। এখানে যেসব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছিল সেগুলোর নির্যাস হিসেবে J A Walsh এবং K S Warren-এর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হল NEJM-এ (“Selective Primary Health Care: An Interim Strategy for Disease Control in Developing Countries”, NEJM 301, 18 (1979): 967-974)।

এখানে Interim Strategy বলা হলেও শেষ অব্দি এটাই চূড়ান্ত স্ট্র্যাটেজি হয়ে গেল। জনস্বাস্থ্য আবার ফিরতে শুরু করলো ভার্টিকাল প্রোগ্রামের দিকে। শুরু হল প্রাইভেট ইন্সিউরেন্স, স্বাস্থ্যের পরিবর্তে স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং মুক্ত বাজারে স্বাস্থ্যের উপকরণকে তুলে দিয়ে রাষ্ট্রের ক্রমাগত হাত গুটিয়ে নেওয়া। “স্বাস্থ্য আমার অধিকার” – এই দাবী বদলে গেলো ব্যক্তির স্বাস্থ্যের জন্য দামী স্বাস্থ্য পরিষেবা পাবার জন্য আদেখলাপনায়। মেডিক্যাল পভার্টি ট্র্যাপ-এর মতো শব্দবন্ধ তৈরি হলো – বছরে ইংল্যান্ডের জনসংখ্যার প্রায় সমান (সাড়ে ৬ কোটি মানুষ) জনসংখ্যা তলিয়ে যেতে থাকলো দারিদ্র্যের অতলে।  

মেডিক্যাল শিক্ষাসংস্কার – ভারতের জনতার স্বাস্থ্যের উপযোগী?

এর সাথে আরো বিপজ্জনক বার্তা বহন করে নিয়ে আসছে মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া-র নতুন মেডিক্যাল শিক্ষক্রমের জন্য সুপারিশ। ৩৫ বছর পরে মেডিক্যাল শিক্ষাক্রম পরিবর্তিত হতে চলেছে। এই সুপারিশে family practitioner কিংবা primary care physician জাতীয় কোন শব্দই নেই। এমবিবিএস পাশ করা general practitioner-রা কেবলমাত্র স্পেশালিস্টদের অনুসারী, পুরনো দিনের কম্পাউন্ডার গোছের, হয়ে থাকবে। এ বিষয়ে রমন কুমার একটি ভাবনাযোগ্য সম্পাদকীয় লিখেছেন “The tyranny of the Medical Council of India’s new (2019) MBBS curriculum: Abolition of the academic discipline of family physicians and general practitioners from the medical education system of India” শিরোনামে (Journal of Family Medicine and Primary Care 8, 2 (2019): 323-325)।

তিন খণ্ডে ৮৯০ পাতা জুড়ে লেখা মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার এই বিশাল সুপারিশপত্রে মোট ২৯৩৯টি দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে শিক্ষারত এমবিবিএস ছাত্রছাত্রীদের জন্য। কিন্তু এত সুপারিশের মাঝে একবারের জন্যও “General Practice”, “Family Medicine” বা “Family Physician” গোত্রের অতি-পরিচিত শব্দগুলো নেই। রমন কুমার মন্তব্য করছেন – “এমবিবিএস শিক্ষাক্রম থেকে ফ্যামিলি মেডিসিন বা জেনেরাল প্র্যাকটিসের মতো শিক্ষণীয় শাখাগুলোর অনুপস্থিতি কোন অসাবধানতা-প্রসূত নয়, ভেবেচিন্তে পাঠ্যসূচী থেকে দূর করে দেওয়া হয়েছে।” পরবর্তীতে তিনি আরও কড়া ভাষায় বলছেন – “স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে ফ্যামিলি ফিজিসিয়ান এবং সাধারণ প্র্যাকটিশনারদের দূরে রাখার অর্থ কমিউনিটি বা সাধারণ মানুষের সমাজ থেকে দামী টারশিয়ারি কেয়ার হাসপাতালগুলোতে রোগীর প্রবাহ অর্গলমুক্ত করা। সমগ্র পৃথিবী জুড়েই ফ্যামিলি মেডিসিন এবং জেনারাল প্রাকটিস মেডিসিনের স্বাধীন শাখা, এমনকি বিশেষ শাখাও। প্রস্তাবিত নতুন শিক্ষাক্রম না মেটাবে স্বাস্থ্য নিয়ে জাতীয়স্তরে জনসাধারণের আকাঙ্খা, না পূরণ করবে ভারত সরকারের মেডিক্যাল শিক্ষা নিয়ে নীতিসমূহ। যদি কার্যকরী হয় তাহলে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্য তা দুর্যোগপূর্ণ হয়ে উঠবে।” রমন খুব খোলাখুলি নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন – “The new MBBS curriculum deserves to be outright rejected for the inherent fallacies – আভ্যন্তরীন ভ্রান্ততার জন্য নতুন এমবিবিএস শিক্ষাক্রমকে এখুনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা উচিৎ।” 

খোদ আমেরিকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপযুক্ত চিকিৎসক নেই বলে হাহাকার পড়ে যাচ্ছে। NEJM-এ প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে – “Transforming Primary Care – We Get What We Pay for” (NEJM 374, 24 (2016): 2390-92)। ঐ প্রবন্ধে বলা হচ্ছে – “প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা হল একটি কার্যকরী স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি … প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার যত্নশীল চিকিৎসকেরা, রোগীরা এবং সাধারণ চিকিৎসকেরা নিজেদের মধ্যেকার বহমান মানবিক সম্পর্ককে মূল্য দেয়, যে সম্পর্কগুলো বহু বছর ধরে বেঁচে থাকে।” বেভেরলি ঊ “Primary Care – The Best Job in Medicine?” প্রবন্ধে জানাচ্ছেন – “বর্তমান প্রবণতাকে উল্টোমুখে নিয়ে যাবার জরুরী আবশ্যিকতা রয়েছে। যদিও প্রাথমিক স্বাস্থ্য নিয়ে মেডিসিনের শাখায় ছাত্রদের লাইন ক্রমশ ছোট হচ্ছে, কিন্তু প্রাথমিক স্বাস্থ্যের সুবিধে পাবার জন্য রোগীদের লাইন প্রতিটি দিন দীর্ঘতর হচ্ছে।” (NEJM 355, 9 (2006): 864-866) NEJM-র আরেকটি প্রবন্ধে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে – “মেডিক্যাল স্কুলগুলোর শিক্ষাক্রমে কেবলমাত্র রোগ এবং ডায়াগনোসিসের পরিবর্তে জোর দেওয়া উচিৎ ভারসাম্য (homeostasis) এবং স্বাস্থ্যের ওপরে … রোগ প্রতিরোধ হল ক্রনিক অসুখের ক্রমবর্ধমান মহামারিকে খর্ব করার একমাত্র পথ।” (“From Sick Care to Health Care – Reengineering Prevention into the U.S. System”, September 6, 2012, pp: 889-891)

ভারতের মতো দেশে এরকম বিপুলভাবে বিষম এক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক আবহে যেখানে মুক্ত বাজারের হাতে সমর্পিত হচ্ছে স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যখন এমন নতুন সিলেবাস তৈরির প্রস্তাব আসছে খোদ মেডিক্যাল কাউন্সিলের তরফে যেখানে ফ্যামিলি মেডিসিন, সাধারণ (বিশেষজ্ঞ নয়) প্র্যাক্টিশনার কিংবা ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান বা পারিবারিক চিকিৎসক ইত্যাদি শব্দের নামোচ্চারণও করা হয়না, যেখানে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার পরিবর্তে ইন্সিউরেন্সের হাঙ্গর সদৃশ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রবেশ করে, সেখানে CPHC কার্যকরী হবে কিভাবে? ভারতবর্ষের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের কাছে আজ এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

শেষ কথা

NEJM-এ Dead Man Walking শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিলো ২০১৩ সালে। সেখানে প্রবন্ধ লেখক এক হতদরিদ্র আমেরিকানের ইন্সিউরেন্স এবং আর্থিক সামর্থ্য না থাকার জন্য সমগ্র দেহে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়া আর এ কারণে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির চিকিৎসা করতে গিয়ে বড়ো মর্মন্তুদ এক প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রবন্ধ লেখক – “We find it terribly and tragically inhumane that Mr. Davis and tens of thousands of other citizens of this wealthy country will die this year for lack of insurance.”

এরকম কোন পরিণতি কি অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য? কারণ সরকারি সুরক্ষার যে সমস্ত রক্ষা কবচ ছিলো সেগুলো একে একে ভেঙ্গে দেওয়া হচ্ছে। প্রধান উদাহরণ ESI Scheme.

Do We Care-এর সুপরিচিত বিশেষজ্ঞ লেখিকা সুজাতা রাও বলেন – Money was available to conduct a heart surgery, a cochlear implant, or C-section but not for essential medicines and basic diagnostics, preventive education, rehabilitative care, nursing for the elderly, school health and adolescent care, or for addressing the direct causal factors of communicable and non-communicable diseases, or treatment of injuries, fevers, snake bites – conditions that were critically important for the poor.” (pp. 24-25)



163 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন