বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার বা সবার জন্য স্বাস্থ্য এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপন

অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইনের পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে গণদর্পণ আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় ড. পুণ্যব্রত গুণের বক্তব্য

সবার জন্য স্বাস্থ্য মানে দেশের সমস্ত নাগরিক তাদের প্রয়োজন মতো অত্যাবশ্যক স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলো পাবেন, তার প্রয়োজনের উপর পরিষেবা পাওয়া নির্ভর করবে, তার খরচ করার ক্ষমতার ওপর নয়। সবাই সমান মানের পরিষেবা পাবেন। সমস্ত নাগরিকের স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব হবে দেশের সরকারের, নাগরিকদের কাছ থেকে নেওয়া করের টাকায় সে এই কাজ করবে।

পৃথিবীর অনেক দেশে সরকার নাগরিকের স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব নিলেও আমাদের দেশে তেমনটা নয়। 2010 সালে তৎকালীন যোজনা কমিশন সবার জন্য স্বাস্থ্যের লক্ষ্যে এক উচ্চস্তরীয় বিশেষজ্ঞ দল তৈরি করে, এই দলের কাজ ছিল সরকার কিভাবে সমস্ত নাগরিকের স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব নিতে পারে সেই সম্পর্কে সুপারিশ করা।

ডা শ্রীনাথ রেড্ডির নেতৃত্বাধীন এই বিশেষজ্ঞ দল হিসেব করে দেখায় সরকার যদি জিডিপির 2.5 শতাংশ 2017 এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে খরচ করে এবং 3 শতাংশ 2022 এর মধ্যে খরচ করে তাহলে সরকারি পরিকাঠামো এমন ভাবে গড়ে তোলা সম্ভব যা দিয়ে নাগরিকের প্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যক প্রাথমিক স্তরের পরিষেবা, দ্বিতীয় স্তরের পরিষেবা এবং তৃতীয় স্তরের পরিষেবা দেওয়া যায়। তাদের সুপারিশ ছিল কোন ক্ষেত্রে সরকারি পরিকাঠামো যদি তৈরি না থাকে তাহলে বেসরকারি হাসপাতালের কাছ থেকে পরিষেবা কেনা যেতে পারে, তবে বর্তমানের মত সেই পরিষেবা ব্যক্তি রোগী কিনবেন না, কিনবে সরকার নিয়োজিত এক স্বায়ত্তশাসিত কমিটি। রোগীকে খরচ করতে হবে না।

উচ্চস্তরীয় বিশেষজ্ঞ দল তাদের সুপারিশ পেশ করেছিল 2011 সালে। তখন ইউপিএ সরকার। 2012 র যোজনা কমিশনের প্ল্যান ডকুমেন্টে সে সুপারিশের কোন ছাপ দেখা যায়নি। তারপরে এল এনডিএ সরকার 2014 সালে। এসেই স্বাস্থ্য খাতে সরকারি খরচ কমিয়ে দিল। 2017 র জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিতে জিডিপির 2.5 শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে সরকারের খরচ করার কথা বলা হলেও, যোজনা কমিশনের স্থলাভিষিক্ত নীতি আয়োগ এর বিরুদ্ধে। স্বাস্থ্য খাতে সরকারি খরচ এখন জিডিপির 1% এর কাছাকাছি। 2018 এ সরকার আয়ুষ্মান ভারত নামে এক নতুন যোজনা এনেছে, যাতে কেবল দ্বিতীয় এবং অন্তিম স্তরের হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসার খরচ পাওয়া যাবে। অথচ আমরা জানি আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য যে খরচ হয় তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হয় আউটডোর চিকিৎসায়, ডাক্তার দেখাতে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে, ওষুধ কিনতে। আয়ুষ্মান ভারত এর খরচ দেয় না।

এবার অঙ্গ প্রতিস্থাপনের বিষয়ে আসি। সবচেয়ে পুরনো কর্নিয়া প্রতিস্থাপন। তারপর কিডনি প্রতিস্থাপন। গত বছর থেকে হৃদয় প্রতিস্থাপন হচ্ছে আমাদের রাজ্যে। খরচ কি রকম?

বেসরকারি হাসপাতালে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করতে খরচ হয় 14 হাজার থেকে 17 হাজার টাকা মত। তারপর কোন খরচ নেই।

কিডনি প্রতিস্থাপন করতে বেসরকারি হাসপাতালে খরচ প্রায় 4 লাখ টাকা। শরীর যাতে সে কিডনিকে রিজেক্ট না করে তাই কিছু ওষুধ খেতে হয়, প্রথম তিন মাস প্রায় কুড়ি হাজার টাকা করে খরচ, তারপর সারা জীবন ওষুধ খেতে হয় মাসে প্রায় 10000 টাকার।

হৃদয় প্রতিস্থাপন করতে মেডিকেল কলেজে খরচ হয়েছে মোটামুটি সাড়ে 8 লাখ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে সাড়ে 14 লাখ থেকে 15 লাখ টাকা। এরপর সারা জীবন 8 থেকে 12 হাজার টাকার ওষুধ খেতে হবে সারা জীবন।

সরকার যদি এই খরচের দায়িত্ব না নেয়, তাহলে উচ্চবিত্ত ছাড়া আর কারোর প্রতিস্থাপনের সুবিধা নেওয়া সম্ভব কি?

আরেকটা দিক আছে। হৃদয় প্রতিস্থাপন করা হয় ডায়ালেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথিতে। উচ্চ রক্তচাপ এর বিরুদ্ধে পাম্প করতে করতে হৃদয় আয়তনে বাড়ে কিন্তু তার কর্ম ক্ষমতা কমতে কমতে অকেজো হয়ে যায়। যদি এমনটা হত যে 18 বছরের বেশি বয়সী প্রত্যেক নাগরিকের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া ছাড়া রক্তচাপ পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং উচ্চ রক্তচাপ হলে তার চিকিৎসা করা হচ্ছে তাহলে খরচ কেমন হতো? উচ্চ রক্তচাপের বহুল ব্যবহৃত ওষুধ এমলোডিপিন সামান্য দামের, সরকার আরো কম দামে পেতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা ঠিকঠাক হলে হৃদয় প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন নিশ্চিত ভাবে কমে যাবে।

কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় কিডনির কর্মক্ষমতা কমে গেলে। প্রধান কারণ ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি। বছরে একবার নাগরিকের ব্লাড সুগার পরীক্ষা করে বেশি পেলে যদি ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয় তাহলে কিডনি খারাপ আটকানো যায়। ডায়াবেটিস এর চিকিৎসায় প্রথমে ব্যবহৃত ওষুধ মেটফর্মিন বেশ কম দামের।

ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার বা সবার জন্য স্বাস্থ্য এই ব্যবস্থা থাকলে মানুষের রোগগুলোর চিকিৎসা যথাযথ হতে পারে। তাহলে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন কমে।

যেটা বলতে চাইছি তা হল ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার প্রয়োজন অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন কমানোর জন্য, আর যাদের অঙ্গ প্রতিস্থাপন করতে হবে তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্যও।

অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য সচেতনতা কর্মসূচির সঙ্গে সবার জন্য স্বাস্থ্যের দাবিতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচিকেও যুক্ত করা উচিত। জনসাধারণ একমাত্র জনসাধারণ ই সরকারের ওপর চাপ দিয়ে তাকে বাধ্য করতে পারে স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব নিতে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা তাই বলে।



57 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন