বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ

সায়ন্তন চৌধুরী

তিনি এখন এতই দুর্বল হয়ে পড়েছেন যে জানলার কাঁথে রাখা বিস্কুটের কৌটোটা হাতে নিয়েও প্যাঁচ দেওয়া সবুজ প্লাস্টিকের ঢাকনাটা খুলতে পারলেন না, অথচ এই হাতে রাগের মাথায় একদিন সজোরে টেনে ছিঁড়ে ফেলেছেন একের পর এক পায়রার টুঁটি। তাঁর ছিল চন্ডাল রাগ, যদিও সবাই চিনত তাঁকে একজন দয়ালু কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে। যৌবনের প্রখর টালমাটাল দিনগুলোর ভেতর দিয়ে যখন তিনি হেঁটে যাচ্ছিলেন, দেশভাগের পর মা ও ভাইকে নিয়ে প্রাণ হাতে করে পালিয়ে আসছিলেন এদেশে, ভাই ছিল ছোট, আসার পথেই স্টীমারে মারা গেছিল সে। বোধহয় তখন থেকেই তাঁর বুকের ভেতর জমা হয়েছিল এক অদ্ভুত অন্ধকার, যে অন্ধকার তাঁকে মানবকল্যাণের পথ থেকে, মার্কসের, লেনিনের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখা থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু হয়তো গোপনে রক্তক্ষরণ অব্যাহত ছিল আজীবন। হয়তো সেজন্যেই কাছের মানুষদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলতে তাঁর জুড়ি ছিলনা, আর সেকারণেই কাছের মানুষেরা তাঁর থেকে সরে যায় অনেকখানি দূরে। অথবা তিনিই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন সংসারের ছোটো ছোটো দুঃখ-সুখ মাখা মেঠো ও ঢালু ঘাসপথ থেকে। স্বাধীনতা, যা যেকোনো দেশের জন্যে সবথেকে সুখের, সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি হতে পারত, তার সাথে জুড়ে গেছিল জীবনের ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নগুলো, এইসব মানুষেরা আজন্ম আড়াল করেছিল এই রোদ-রক্ত-হেমন্তের গ্লানি, এদেরই একজন তিনি ছিলেন আসলে।

তাঁর কথা সেভাবে আমার মনে পড়েনা, শুধু একটা তীব্র স্মৃতির পোড়া দাগ রয়ে গেছে। একদিন বিকেলের রোদ পড়ে এসেছে যখন, তিনি বসেছিলেন ঘরের দাওয়ায় আরামকেদারায় গা এলিয়ে; কয়েকজন অনুগামী তাঁর বা বন্ধু অথবা কমরেড, তারা বসেছিল পাশের মোড়ায়। কিছু পায়রা, যারা ঠিক পোষা নয়, কিন্তু তারা আসত তাঁর নিজের হাতে ছড়িয়ে দেওয়া শস্যের দানা খেতে, তাঁর পায়ের কাছে ছড়িয়ে থাকা শস্যের দানা খুঁটে খুঁটে খাচ্ছিল তারা, ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠা রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করেই নিজেদের খেয়ালে বকম বকম আওয়াজ করছিল। হঠাৎ তিনি উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর লম্বা সুঠাম চেহারার ওপর লাল টকটকে মুখখানা দেখাচ্ছিল সুন্দর ও নিষ্ঠুর। হাতের কাছে যে পাখিটাকে পেলেন তিনি, খপ করে ধরলেন তাকে, মুহূর্তে সজোরে টেনে আলাদা করে ফেললেন তার ধড় থেকে মুন্ডুটা আর তারপর প্রাণহীন দুটোখণ্ড ছুঁড়ে ফেললেন উঠোনের একপাশে আস্তাকুঁড়ে। অন্য পায়রাগুলো ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে পালাবার চেষ্টা করছিল, তার আগেই তিনি চেপে ধরলেন আরেকটাকে। তাঁর হাতের ফর্সা তেলোয় লেগেছিল লাল রক্ত। এটাই দাদামশাই সম্পর্কে আমার প্রথম স্মৃতি; সাধারণত মায়ের বাবাকে দাদামশাই বলে ডাকা রেওয়াজ, কেন যেন ঠাকুর্দাকেই দাদামশাই বলে ডাকতে শিখেছিলাম আমি। ভেবে দেখেছি পরে আসলে স্মৃতিটা খানিকটা ভুল বোধহয়, একটা পায়রাকে মেরে ফেলার পর অন্যগুলো কেনই বা থাকবে তাঁর হাতের নাগালে, হয়তো আমি কল্পনা করে নিয়েছি একের পর এক পায়রার মৃত্যুদৃশ্য, স্মৃতি কখনো কখনো ধ্যাবড়া রঙের হয়ে যায় বৈকি।

নিজের সন্তানদের সঙ্গেও তাঁর দূরত্ব তৈরী হয়ে গেছিল ক্রমশ। সন্ধ্যের দিকে যখন ঝিরিঝিরি হাওয়া বইত, তখন তিনি হাঁটতে যেতেন, তাঁর পিছন পিছন যেত একটা নেড়ী কুকুর। মাঝে মাঝে তিনি কুকুরটাকে একটা-দুটো বিস্কুটের প্যাকেট কিনে ছিঁড়ে বিস্কুটগুলো ছুঁড়ে দিতেন। হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে তিনি দাঁড়াতেন বাড়ি থেকে খানিক দূরে পুকুরের ধারে একটা ঢিপির ওপর, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতেন অনেক বাদামী-সোনালি রঙের আলো-আবছায়া কথা। মাথার ওপর নক্ষত্রেরা যখন স্পষ্ট হয়ে উঠত, তিনি বাড়ি ফেরার পথ ধরতেন। তাঁর এরকম একলা সময় কাটানোর অভ্যেস সকলেই জানত, বাড়ি ফিরে থেকে রাতে খাবার আগে পর্যন্ত তিনি খবর শুনতেন রেডিওতে। তাঁর আদ্যিকালের এএম রেডিও কড়কড় করে উঠত, যেসব রাতে ঝড় উঠত বাইরে আর বিকট শব্দে বাজ পড়ত দূরে কোথাও। তিনি ছিলেন কম কথার একজন হৃদয়বান মানুষ, অথচ শুনেছি নিজের ছেলেদের জন্যে তিনি কখনও এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে আনেননি, একটা বাহারী পেনসিল বা চমৎকার জুঁই ফুলের গন্ধওয়ালা ইরেজার পর্যন্ত না। বিশেষত ছোটকা ছিল দারুণ অবাধ্য; বাড়ির অন্য কেউ যেখানে তাঁর সঙ্গে মুখে মুখে তর্ক করতে সাহস পেত না, এমনকি কাজের সূত্রে অল্পচেনা মানুষজন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে শ্রদ্ধা ছাড়া অন্য কোনো ভঙ্গিতে কথা বলত না, সেখানে ছোটকা ছিল বেপরোয়া। অন্যদিকে আমার বাবা ছিল মুখচোরা গোছের। একবার প্রবল বন্যা হওয়ায় এলাকার কিছু মানুষ, স্থানীয় ইস্কুলের ঘরে যাদের জায়গা হয়নি, তারা এসে ওঠে এই বাড়িতে। দাদামশাই ছোটকা ও বাবার পড়ার ঘরটায় তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন। জেদ করে বসে ছোটকা, সে কিছুতেই ছাড়বেনা ঘরটা, ছাড়বেনা কারণ পড়ার অসুবিধে হবে। কিছুক্ষণ পর্যন্ত সহ্য করার পর দাদামশাই তাকে একটা চড় মারেন, বাবা বলেছিল যে পাঁচটা আঙুলের দাগ বসে গেছিল ছোটকার গালে। আসলে কিছুই নয়, হয়ত দাদামশাইয়ের ওপর রাগ থেকেই ওরকম জেদ ধরেছিল ছোটকা।

গত বছরের মার্চ মাস থেকে তিনি আমাদের বাড়ি এসে রয়েছেন, একলাই থাকতেন তিনি তাঁর স্ত্রী মারা যাবার পর। কিন্তু কলতলায় চান করার সময় একদিন তিনি মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। তারপরই তাঁকে নিয়ে আসা হল আমাদের বাড়িতে। তিনি প্রায় শয্যাশায়ী, কাউকে ধরে ধরে বাথরুম যেতে পারেন এই অব্দি। এখন তাঁর দাঁত পড়ে গেছে সব; মাড়ী দিয়েই খাবার চিবোতে হয়, ফলে মাড়ীও শক্ত হয়ে উঠেছে বেশ। বিস্কুট খেতে পারেন তিনি, অনেকক্ষণ ধরে, মুখের ভেতর এপাশ-ওপাশ করে তিনি খান দু-একটা বিস্কুট। জানলা দিয়ে বেশিদূর তাকানোর জো নেই, সামনেই পাঁচিল আর পাঁচিলের ওপাশে অন্য লোকেদের বাড়ি। তবুও আলোর রঙ দেখা যায়, বোঝা যায় ভোরের আলো, সকাল সাতটার রোদ, বেলা এগারোটার রোদ অথবা বিকেল পাঁচটার আলো — আলাদা আলাদা করে এসবই তিনি বুঝতে পারেন। কোনো কোনো রাতে যখন চাঁদ নেমে আসে বেশ কিছুটা নীচে, তার আলো পড়ে বিছানার ওপর। সেইটুকু আলোআঁধারির মধ্যে দেখা যায় বুড়োমানুষটা জেগে আছে, রাতে ঘুম আসেনা তাঁর তেমন, বোধহয় সারাদিন শুয়ে থাকেন বলে বিছানায়।

ছোটকার কথা তাঁর কাছে কেউ তুলিনি আমরা। বস্তুতপক্ষে একটা আশ্চর্য লুকোচুরি খেলা তাঁর সঙ্গে আমরা খেলছিলাম দীর্ঘদিন ধরে। ছোটকা চাকরি করত একটা ব্যাঙ্কে, থাকত দিল্লীর কাছে কোনো এক শহরে। এদিকে আসত হয়তো পুজোর সময় বা বড়দিনের ছুটিতে। দাদামশাইকে জানতে দেওয়া হয়নি কখনই যে আমাদের সাথে ছোটকার যোগাযোগ আছে। কিংবা তিনি জানতেন কিন্তু মুখে কিছু বলেননি কখনো, তাও হতে পারে। দিনগুলো বড়ো তাড়াতাড়ি পালটে যাচ্ছিল। ইস্কুলের দিনগুলো আমার শেষ হয়ে আসছিল, চারদিকে আস্তে আস্তে অভিযোগ বাড়ছিল। শোনা যাচ্ছিল কমিউনিস্টদের সঙ্গে মাটির তেমন যোগাযোগ নেই আর। বাবা বলতেন ঠাট্টা করে গাছ হতে হবে, মাটির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে গাছ হতে হবে কমিউনিস্টদের। দাদামশাইয়ের পরের প্রজন্মের কেউই রাজনীতির কাছাকাছি ছিল না, আমাদের দু'আনি তিন আনির জীবন কখনো এতখানি প্রেরণার রোদ-আলো পায়নি, চেতনার গাঢ় রঙে সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি কখনো যে সে তাড়নায় মানবকল্যাণের কথা ভাবব আমরা। মানবকল্যাণের কথা কখনো ভাবিনি তো, ঠাণ্ডা কুয়াশার ভোরে বুকের কাছে হাত-পা গুটিয়ে কুকুরের মতো মানুষকে মরে যেতে হবে একদিন এতদূর জেনে নিশ্চিন্ত ছিলাম বোধহয়। পাড়ায় শিবুপাগলাকে দেখতাম আসা যাওয়ার পথে তিনখানা টিনের কৌটো সাজিয়ে খেলা করছে। নানা রকম প্যাটার্নে সাজাচ্ছে সে কৌটোগুলো, আবার বারবার ভেঙে দিচ্ছে। আমাদের জীবনের আলগা গ্রন্থিগুলোও ওভাবে নড়াচড়া করছিল। ছোটকার ছেলের সাথে আমার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল। হয়তো বছরে একবার-দুবারই দেখা হত মাত্র, যখন ওরা আসত, চমৎকার সুখী পরিবার একটা, ভালো লাগত অরুণকে আমার। বিশেষত অফসাইডে দেখবার মতো ড্রাইভ মারতে পারত সে, আর আমি প্রায় সব ব্যাপারেই ঢ্যাঁড়স। অনেকখানি দৃঢ় মন তার সেই বয়েসেই গড়ে উঠেছিল, মায়েরা বলত এ ছেলে হয়েছে দাদামশাইয়ের মতো একেবারে। সামনে বলত না, ছোটকার সামনে দাদামশাইয়ের প্রসঙ্গ তুলতে কেমন একটা অস্বস্তি ছিল সকলেরই।

ছোটকার গানের গলা ছিল দারুণ ভালো, বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত গাইত যখন, মনে হত এরকম আর কখনো শুনিনি তো। কাকিমা কোনো একটা ইস্কুলে পড়াত, কাকিমাকে বিয়ে করেছিল ছোটকা, কলেজের প্রেম। দাদামশাই ভয়ংকর আপত্তি করেছিলেন, এসবই আমার শোনা ঘটনা। কোন এক বন্ধুকে তিনি কথা দিয়েছিলেন তার মেয়ের সঙ্গে নিজের ছেলের বিয়ে দেবেন তিনি। আমার কথার দাম আছে, মনে রাখিস তুই কমিউনিস্টদের কথার দাম আছে — বলেছিলেন তিনি ছোটকাকে। আর তখনই মুখ বেঁকিয়ে সবচেয়ে কঠিন আঘাতটা করেছিল ছোটকা, ঘৃণাভরা গলায় কেটে কেটে বলেছিল — চোর হয় কমিউনিস্টরা। মার খেয়েছিল, অতবড় ছেলেকে প্রচণ্ড মেরেছিলেন দাদামশাই, সেই রাতেই ছোটকা পালিয়ে গেছিল বাড়ি থেকে। বেরিয়ে গেছিল এককথায়, সেই রাগী উঠতি বয়সের যুবকের মুখটা আমি যেন আবছা আবছা দেখতে পাই। দশঘরার কাছে আমি একবার একটা নদী দেখেছিলাম, মনে নেই কি নাম। ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম একদিকে নদীটায় দিব্যি টলটলে জল, অন্যদিকে পুকুরের মতো পানা এসে ভিড় করেছে নদীর ওপর। মজে যাওয়া নদীর মতো একটা সম্পর্ক দাদামশাই আর ছোটকার, দুজনেই বয়ে নিয়ে চলেছে এতদিন। দাদামশাইয়ের খবর আমরা পুরোপুরি জানতাম না, তবে আমাদের অনুমান ছিল পার্টির সঙ্গেও তাঁর আর বিশেষ যোগাযোগ ছিল না, ফুরিয়ে আসছিল তাঁর হৃদয়ের স্বাদগুলো, প্রান্তরে হাঁটতে হাঁটতে একটা পুরোনো জাহাজের আলো সঙ্গে নিয়ে তিনি আর কোনো দিশা পাচ্ছিলেন না। তাঁর অন্তরের খবর আমাদের কাছে এসে পৌছায়নি কখনো, তার জন্যে ডাকবিভাগ দায়ী নয়, এরকমই মানুষের মন-মৌলিকতা।

রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ছিল, আনাজপাতির দাম বাড়ছিল, অটোভাড়া বাড়ছিল, চাকরির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। সুমনের পুরোনো গান ভেসে আসছিল, কন্ঠ জোরে ছেড়ে খুব একটা লাভ হচ্ছিল না, কারণ আমরা হেজে গেছি। আমাদের মতো এরকম হাজার হাজার পরিবার যারা দেখেছে কিভাবে ভিড়ের মানুষ ক্রমশ প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে বয়ে নিয়ে যায় উলঙ্গ রাজার পোশাক, আমরাই যারা ঝেড়েমুছে সে পোশাক পরিয়েছি বারবার রাজার গায়ে, সেইসব মানুষেরা ততদিনে হাল ছেড়ে দিয়েছে। আলো আকাশের নীচে যেদিকেই হেঁটে গিয়ে তারা দাঁড়িয়েছে, তারও খানিক আগে এসে পথরোধ করেছে শস্য নয়, মাংস নয়, তাদেরই নিজস্ব ছায়া। বয়েসের তুলনায় অরুণ বড়ো হয়ে গেছিল অনেক, শুনতে পেতাম রাজনীতির সঙ্গে তার যোগাযোগ বাড়ছে, কলেজের দিনগুলো তাকে সময়ের অশনি চিহ্ন ও সংকেতগুলোর মধ্যে সমাচ্ছন্ন করে তুলছিল। মানচিত্রের গায়ে আঁকা দেশ নয়, আমাদের হৃদয়ের গভীরের দেশ পালটে যাচ্ছিল ক্রমশই। মানুষের শ্রম নয়, নিবিড়তা নয়, অন্য কোনো অন্ধকার অনুভূতিকে সম্বল করে দেশের ভেতরে এক দেশ গড়ে উঠছিল, যেখানের জল-আবহাওয়ায় আমার প্রজাতি ক্রমে দানব হয়ে যায়। সেদিন সারাদিন অদ্ভুত ছাইরঙা কাকভেজা বৃষ্টির দিন ছিল সেটা। ছোটকা, ছোটকাকে ঘিরে আমরা ক'জন বসেছিলাম ঘরের ভেতর। আলো এত কম যে পাশের মানুষের মুখও ঝাপসা দেখাচ্ছিল। জানলা দিয়ে চোখে পড়ছিল একফালি উঠোন, উঠোন পেরিয়ে বাড়ির গেটটা; আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটা সিমেন্ট বাঁধানো। কিন্তু তারপর বেশ খানিকটা মাটি, চাপড়া চাপড়া ঘাস। ঘাসগুলোর শেষে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা ফ্যাকাশে হলদে রঙের দেয়াল, নীচের দিকটায় শ্যাওলার ধ্যাবড়া দাগ। দেয়ালটা একটা লেদ কারখানার, বন্ধ হয়ে গেছে ওটা বহুদিন। দেয়ালের গায়ে বিচ্ছিরি ব্যাঁকাট্যারা লাল হরফে অনেক রোদে-জলে চটে যাওয়া 'দীর্ঘজীবী হোক' শব্দদুটো এখনও পড়া যায়, 'বিপ্লব' মুছে গেছে। দু-একটা গরু ঐ দেয়ালের পাশে ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে কখনো মুখ নামিয়ে ঘাস খায়, কখনো কখনো মাথা তুলে জাবর কাটে। বৃষ্টিতে গরুগুলো ভিজছিল সমানে আর তাদের পায়ের কাছে কাদায় ভাঙা ভাঙা আলো হয়ে গেঁথে ছিল ঘোলাটে আকাশ। সমস্তটার ওপর নেমে আসছিল মোটা জলের ধারা, আর রঙগুলো, গাছের রঙ, দেয়ালের রঙ, দূরের বাড়ি ও আকাশের রঙ যেন কাঁপতে কাঁপতে মিশে যাচ্ছিল — অনেকটা লেন্সের মধ্যে দিয়ে দেখার মতন। আমরা কেউ কোনো কথা বলছিলাম না, কারণ কথা বলার মত তেমন কিছুই আর ছিল না। কান্না যতদূর ছিল বুকের ভেতর, সেইসব অবেলার কান্নারা ফুরিয়ে গিয়েছিল সচরাচর, সাতমাস আগে অরুণের মৃত্যুর পরে।

মরা খবরটা এসেছিল উড়ে উড়ে, কিভাবে মানুষ মরে যায় একা একা সে ব্যাপারে সকলেরই ধূসর ধারণা আছে কিছু, তার বেশি জানবার, বোঝবার কোনো প্রবৃত্তি হয়না চেতনার এই পাড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের। তাই কিরকমভাবে তাকে, সেই যুবককে ধাক্কা মেরে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল ট্রেনের কামরার দরজা থেকে, উল্টোদিক থেকে আসা একটা এক্সপ্রেস ট্রেনের চাকার নীচে কিরকম বীভৎস একটা ভোঁতা আওয়াজ করে ফেটে গিয়েছিল খুলিটা আর থেঁতলে গেছিল আলো আলো মুখচোখ, মানুষের অবয়ব, হাড়-গোড়-রক্ত-মাংস-মজ্জা-ঘিলু তালগোল পাকিয়ে পড়ে ছিল লাইনের ওপর, সেই বিবরণ ভুলে যেতে চেয়েছি বারবার। শুধু ছোটকাকে মনে আছে, ওরকম ফ্যাকাশে চেহারা মানুষের দেখিনি কখনও; খবর পেয়ে ওদের বাড়ি গেছিলাম আমরা, দেখেছিলাম রাতে যখন মেল ট্রেনের হুইসেলের শব্দ ভেসে আসে দূর থেকে, অন্ধকারে কিরকম শিউরে ওঠে মানুষের কঙ্কাল। কারা খুন করেছিল সেটা সকলে জানতে পারলেও আর জানা যায়নি কোনোদিনই; কোন্‌ রাজনৈতিক আক্রোশ, কোন্‌ ঘেন্নার প্রতিশ্রুতি সেই যুবকের, এরকম আরো কত মানুষের অভ্যন্তরকে দুমড়ে-মুচড়ে থামিয়ে দিল আমাদের চারপাশে, সেসবের হিসেব আমরাই ভুলে গেছি, তাই বেঁচে আছি। একটা নদীর মতো আমাদের প্রতিদিন এঁকেবেঁকে বয়ে চলা, শক্ত মাটির বাধা কবে আর সইতে পেরেছি, বাঁক নিয়ে ঘুরে গেছি, এড়িয়েছি, ভুলে গেছি হয়তো বা, বেঁচে থাকা সবচেয়ে ভালো ভেবে নিয়ে। দাদামশাইকে জানানো হয়নি এসব কিছুই আর, কি লাভ বিছানায় পড়ে থাকা বুড়োমানুষটাকে জানিয়ে এসব। সাতমাস কেটে গেছে তারপর, বর্ষার শুরুতে একদিন কাকিমা ছোটকাকে সঙ্গে নিয়ে এল আমাদের বাড়িতে। আমরা জানতাম, আগেই সবকথা হয়েছিল ফোনে, শুনেছিলাম ছোটকার আশ্চর্য অসুখের কথা, চুপ করে বসেছিলাম আমরা ঘরের ভেতর ছোটকাকে ঘিরে, সকলেই আমরা বৃষ্টির দিকে তাকিয়েছিলাম।

আমরাই বলেছিলাম ছোটকা কয়েকমাস থেকে যাক আমাদের কাছে, যদি তাতে উপকার হয় কিছু। তাছাড়া কাকিমারও চাকরি ছিল, ভেতরের শোক সামলে প্রতিদিনের কাজ করে যাচ্ছিল মানুষটা। বাইরে বাইরে শক্ত ছিল সে, অন্ততঃ আমাদের সামনে বিহ্বল হয়ে পড়তে দেখিনি তাকে, হয়তো সংসারে দুজনের বিহ্বল হয়ে পড়া চলে না পাশাপাশি, তাই। কিন্তু সেইদিন, ছোটকাকে নিয়ে কাকিমা এল যেদিন সকালে, সেইদিন রাতে ছাদে বসে অনেক কথা বলতে বলতে হঠাৎ-ই দুর্বল হয়ে পড়ল, আমি কাকিমাকে এভাবে কাঁদতে দেখিনি কোনোদিন। আলগা চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল ছাদের আলসেতে, পাঁচিলে, পাঁচিলের ওপারে বোসেদের বাড়ির গায়ে, ওপাশে লেদ কারখানার চাতালে। আমি দেখছিলাম মাথা কুটে কুটে কাঁদছে সে, কেঁপে উঠছে পিঠটা আর দুচোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে হাতের কনুই বেয়ে। আমি শুনছিলাম চুপ করে কথাগুলো, চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিল ছোটকা কিংবা চলে গেছিল সেটা, কাজে যেতনা আর দিনের পর দিন, হারিয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ জীবনের সমস্ত বাস্তবতা থেকে। একটা অন্ধকার কুয়োর মধ্যে নেমে যাচ্ছিল আস্তে আস্তে, সেখানে আর কোনো আলো নেই, এমনকি পাশের মানুষজনের প্রতিও ছোটকার আর কোনো তাপউত্তাপ নেই। কিন্তু পাশের মানুষটা কি করবে? ধরে থাকবে হাতখানা চেপে, দুজনেই পড়ে যাবে কুয়োর ভেতর নাকি হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে নেবে আলো? হয়তো হাতটা তাহলে তাকে ছেড়ে দিতে হবে একসময়, শেষ অব্দি হয়তো আমরা সকলেই ছেড়ে চলে যাব ছোটকাকে এতো অন্ধকার সহ্য করতে না পেরে। নদী যখন শক্ত মাটি পেয়ে খুব বেঁকে চলে যায়, তার বাঁকের মুখদুটো একসময় জুড়ে গিয়ে বয়ে যায় নতুন ধারায়, পুরোনো খাতটা পড়ে থাকে পাশে একটা অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ হয়ে। কোনো কোনো মানুষ হয়তো সেরকমই হ্রদ হয়ে যায় একদিন।

স্মৃতির কথা ভাবছিলাম, বিকেলের ম্লান হলুদ আলোর ভেতর কয়েকটা পায়রার মরে যাওয়ার দৃশ্য গেঁথে আছে আমার মাথায়। আর ছোটকার স্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছে প্রত্যেকদিন, একটু-একটু করে মুছে যাচ্ছিল জীবনের অভিভূত মেঘ-মরীচিকাগুলো। ছোটকা রয়ে গেছিল আমাদের কাছে, কাকিমা অনেক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। যে নিজেই আর ফিরে আসতে চাইছে না নিজের কাছে, তাকে কে ফিরিয়ে আনতে পারে? এইকথা বললে ভুল হবে যে ছোটকা সবকিছু ভুলে যাচ্ছিল, বাস্তবতার সঙ্গে জড়ানো সব স্মৃতি ভুললেও একটা জিনিস তার মাথার মধ্যে ছড়িয়ে রয়ে গেছিল। গানগুলোর একটা লাইনও সে ভোলেনি, বরং মাঝে মাঝে গাইত, কখনো গলা ছেড়ে, কখনো নিজের মনে গুনগুন করে। শুনতে পেতাম তার টুকরো টুকরো রবীন্দ্রসঙ্গীত বাড়ির আনাচে-কানাচে। দাদামশাই পেতেন কিনা জানি না, তাঁর শরীরের অবস্থাও ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল। হাঁপ ধরে যাচ্ছিল বাড়িটায় থাকতে থাকতে, বিকেলের দিকে ছাদে উঠে দাঁড়াতাম, বৃষ্টির কমতি ছিলনা। সারাদিন বৃষ্টির পর ছাদের কাপড় শুকোতে দেবার জংধরা তারগুলোয় অসংখ্য ফোঁটা ফোঁটা উজ্জ্বল জলের বিন্দু লেগেছিল, দুলছিল অল্প অল্প হাওয়ায়। মাঝে মাঝে এলোপাথাড়ি ঠান্ডা হাওয়া বইছিল তখনও, দূরে রাস্তা দিয়ে রিকশাগুলো চলে যাচ্ছিল হর্ন বাজিয়ে, ঝনঝন করে বাসন পড়ল কাদের বাড়ি, মোড়ের মাথায় ফেরিওয়ালা হাঁক দিচ্ছিল। আমার ইচ্ছে করছিল তারগুলো ধরে টান দিই, পলকের মধ্যে ছিটকে ঝরে যাবে জলের ফোঁটাগুলো। তা না করে আমি নীচে গলির দিকে তাকালাম, দেখলাম শিবুপাগলা সাজাচ্ছে তার টিনের কৌটোগুলো, উসকোখুসকো চুল তার, উলিঝুলি গায়ের পোশাক, চোখে উদ্‌ভ্রান্ত দৃষ্টি, কখনো সমদ্বিবাহু, কখনো সমবাহু ত্রিভুজ তৈরী করছে সে, পা গুনে গুনে মেপে নিচ্ছে এক কৌটো থেকে আরেকটার দূরত্ব। তিনটে কৌটোকে সমান দূরত্বে বসাতে পেরে আশ্চর্য খুশি হলো সে, তার সফলতার দিকে তাকিয়েছিলাম, একতলা থেকে মা আমাকে ডাকল। ঘরগুলোর ভেতরে আবছা অন্ধকার ভরে গেছিল, নীচে এসে দেখলাম ছোটকা ছাড়া সবাই জড়ো হয়েছে দাদামশাইয়ের ঘরে, শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রমেই মৃদু হয়ে আসছে তাঁর, চোখদুটো বোজা। একটা পাঁশুটে রঙের বেড়াল এসে নিঃশব্দে বসল জানলার বাইরে পাঁচিলের ওপর। প্রতিবেশী এক মহিলা মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে খুব আস্তে আস্তে বললেন — নিতে এসেছে। এইসময় ছোটকা এসে ঢুকল ঘরে, ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বিছানার কাছে। মা বলল — ঠাকুরপো, একটু জল দাও ওনার মুখে। সেকথায় কান না দিয়ে একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল সে, দাদামশাইয়ের মাথার কাছে বসে আশ্চর্য নীচু গলায় বিষাদী সুর ধরল। মাথার গভীরে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছিল গানের শব্দগুলো, তবু মনে রেখ, যদি দূরে যাই চলে, আমি দেখছিলাম পাঁচিলের ওপর বসা বেড়ালটা তার মোটা লেজটা ঝুলিয়ে দিয়েছে অন্ধকারের গা বেয়ে, দাদামশাই শেষবারের মতো বোধহয় চেতনার রূপোলি কিনার খুঁজে পেলেন, হাতটা তুললেন একটু, ছোটকা ধরল বলিরেখাভর্তি হাতখানা। বাইরে বিকেলের নিভে আসা বেগুনি আলোর ভেতর গলিরাস্তার ওপর শিবুপাগলা সাজাচ্ছিল কৌটোগুলো, হয়তো সে একদিন একটা সমকোণী ত্রিভুজ তৈরী করে ফেলবে, কিন্তু কোনোদিনই খুঁজে পাবে না পিথাগোরাসের উপপাদ্যটা।;



497 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ

এ গল্পটা কেউ বিশেষ পড়ে নি কেন?

কি ঘোর অন্ধকার!

Avatar: সায়ন্তন চৌধুরী

Re: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ

ধন্যবাদ। এইটা আমার প্রথম লেখা কোথাও বেরোলো। পরেরবার আরো ভালো লেখার চেষ্টা করব।
Avatar: Ela

Re: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ

ভাল লাগল সায়ন্তন।

আমি কিন্তু শেষে একটা আলোর রেখাও যেন দেখতে পেলাম। যেন অনেকদিনের গাঢ়, বুকে চেপে রাখা দুঃখের উপরে কেউ হালকা মায়াভরা হাত রেখে গেল।
Avatar: dd

Re: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ

উরেঃ। এ তো দারুন লেখা।

কী অপুর্ব ভাষা।
Avatar: শাক্যজিৎ

Re: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ

খুব ভাল লেখা।
Avatar: খ

Re: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ

গুড স্টাফ, চমৎকার লেখা
Avatar: শিবাংশু

Re: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ

বাহ...
Avatar: Ekak

Re: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ

বেশ ভালো লেখা। লেখকের আরো লেখা পড়তে চাই 🤗
Avatar: সায়ন্তন চৌধুরী

Re: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ

সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। :)


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন