বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

হেইল হিন্দি

শিবাংশু দে

বছর দুয়েক আগে, যখন প্রথম মোকাম কলকাতায় থাকতে এসেছিলুম। একদিন সন্ধেবেলা রাসবিহারি থেকে সতীশ মুখার্জি রোড ধরে যাচ্ছিলুম কালীঘাট পার্ক। টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। যেতে যেতে দেখলুম রাস্তার দুপাশে যতো লোকজন, সব আমার দেশোয়ালি ভাই। মিনিট পনেরো-কুড়ি হেঁটে যাওয়ার পথে শুদ্ধ হিন্দি-ভোজপুরি ছাড়া আর ভাষার বার্তালাপ কানে এলোনা। এই অঞ্চলটি এককালে ছিলো দক্ষিণ কলকাতার আগমার্কা বাঙালিদের কেল্লা।

বছর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ পিছিয়ে একটা স্মৃতি আবার মনে পড়ে গেলো। কিশোরকালে কলকাতায় এলে বঙ্গবাসী বা হিন্দ টাইপ টকিজে একটাকা চারানার টিকিটে বচ্চনসাহেবের নতুন দাঁত কিড়িমিড়ি ফিলিম দেখতে যেতুম। ছবি চলাকালীন সঙ্গী স্থানীয় বন্ধুদের জন্য বাংলায় সলিম-জাভেদের সংলাপ অনুবাদ করার পুণ্যকর্ম এখনও স্মৃতিতে অমলিন। উর্দুবহুল, সিটি-উচ্ছল সেই সব সংলাপের প্রতি বাঙালি কিশোরদের আকুল আবেগ চোখে পড়ার মতো ব্যাপার ছিলো। তার সঙ্গে ছিলো তুমুল হিন্দি-উর্দু সন্নিবিষ্ট বোম্বাই গানার প্রতি আকর্ষণ। বহু বন্ধুদের দেখতুম নিহিত কাব্যটি একবর্ণ না বুঝেও গানগুলি গাইতে চেষ্টা করছে। একজন বুঝতে চেয়েছিলো 'সোখিয়োঁ মেঁ ঘোলা জায় ফুলোঁ কা শবাব / উসমেঁ ফির মিলায়ে জায়ে থোড়িসি শরাব/ হোগা উঁ জো নশা জো ত্যইয়ার/ উওহ প্যার হ্যাঁয়', পদার্থটি শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়? বন্ধুনী যদি শেষ পর্যন্ত মানে জিগ্যেস করে তবে একেবারে ব্ল্যাংক যাওয়া উচিত নয়।

ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী,"Hindi or English is used in official purposes such as parliamentary proceedings, judiciary, communications between the Central Government and a State Government." (Constitutional Provisions: Official Language Related Part-17 of The Constitution Of India". Department of Official Language, Government of India.)
এছাড়াও নানা সরকারি কাজকর্মে হিন্দি ভাষা ব্যবহার করা হয়। ভারতে মোট বাইশটি সরকারি ভাষা সংবিধানস্বীকৃত। কোনও 'রাষ্ট্রভাষা' নেই। হিন্দি পরিভাষা অনুযায়ী এই ভাষাটিকে 'রাজভাষা' বলা হয়। সংবিধানের ৩৪৩ তফসিলে 'রাষ্ট্রভাষা'র প্রস্তাবিত অংশটি 'রাজভাষা অধিনিয়ম-১৯৬৩' অনুযায়ী বাতিল করা হয়েছিলো। 

প্রতিটি রাজ্য নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী ভাষা ব্যবহার করতে পারেন। যেকোনও এদেশীয় ভাষা নির্দিষ্ট সংখ্যক জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে জনগণনায় স্বীকৃতি পেলেই সরকারি ভাষার মর্যাদা পেতে পারে। 'হিন্দিভাষা' বিষয়ে এদেশের অহিন্দিভাষী জনতার কয়েকটি ধারণা রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটিকে পূর্বাগ্রহ বলা যেতে পারে। হিন্দিভাষার প্রতি বৈরিতার প্রবণতাটি ভাষাগত আনুগত্য থেকে আসেনা। এটি একান্তভাবে রাজনীতিকেন্দ্রিক। বিভিন্ন রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র, ভাষা আনুগত্যের আবেগটি নিজস্ব হীন প্রয়োজনে ব্যবহার করে।

প্রথমত, 'হিন্দি' একটি ভাষাবিশেষ নয়। এটি একটি সংস্কৃতি। উত্তর ও মধ্যভারতের বিশাল এলাকা এই সংস্কৃতির অঙ্গ। পঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল,জম্মু, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, গুজরাট, মহারাষ্ট্র এর অন্তর্ভুক্ত। এই সমস্ত প্রান্তেরই অসংখ্য নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি স্বীকৃত সরকারি ভাষা। কিন্তু যোগাযোগ রক্ষাকারী ভাষা হিসেবে এই সমস্ত জায়গায় হিন্দির  কোনও বিকল্প নেই। হিন্দিবলয়ের কেন্দ্র হিসেবে যদি উত্তরপ্রদেশ ও বিহারকে নেওয়া যায় তবে দেখা যাবে এই দুটি রাজ্যেও বহু নিজস্ব ভাষা আছে। বিহারে ভোজপুরি (দুরকম, গঙ্গার উত্তর ও দক্ষিণে), মগহি, মৈথিলি, অঙ্গিকা প্রধান। উত্তরপ্রদেশে ভোজপুরি, অবধি,বুন্দেলখণ্ডি, পহাড়ি ইত্যাদি। একইভাবে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের হিন্দি, হরিয়ানভি, পূর্বি পঞ্জাবি (মনে রাখতে হবে পশ্চিম পঞ্জাব থেকে যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের ভাষা আলাদা ছিলো)। কোনও হিন্দিভাষীই বাড়িতে খড়িবোলি বা সরকারি হিন্দিভাষায় কথা বলেননা। কিন্তু এঁরা সবাই প্রয়োজন অনুসারে হিন্দিভাষাকেই 'মাতৃভাষা' হিসেবে ঘোষণা করেন। এইজন্য সামগ্রিকভাবে প্রায় বিয়াল্লিশ শতাংশ ভারতীয় হিন্দিভাষী হিসেবে নথিভুক্ত হয়ে যান। এই বিপুল দেশেও সংখ্যাটিকে ব্রুট্যাল মেজরিটি বলা যেতে পারে। 

চিনেও অবস্থাটি প্রায় একরকম। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে মান্দারিন স্বীকৃতি পেলেও সমস্যাটি অতো সরল নয়। "... The varieties of Chinese are usually described by native speakers as dialects of a single Chinese language, but linguists note that they are as diverse as a language family. The internal diversity of Chinese has been likened to that of the Romance languages, but may be even more varied. There are between 7 and 13 main regional groups of Chinese (depending on classification scheme), of which the most spoken by far is Mandarin (about 960 million, e.g. Southwestern Mandarin), followed by Wu (80 million, e.g. Shanghainese), Min (70 million, e.g. Southern Min), Yue (60 million, e.g. Cantonese), etc. Most of these groups are mutually unintelligible, and even dialect groups within Min Chinese may not be mutually intelligible. Some, however, like Xiang and certain Southwest Mandarin dialects, may share common terms and a certain degree of intelligibility. All varieties of Chinese are tonal and analytic."

প্রশ্ন হচ্ছে, হিন্দিই কেন? তা কি নেহরু বা রাজেন্দ্রপ্রসাদের মাতৃভাষা ছিলো, তাই? না গান্ধিজি অহিন্দিভাষী হয়েও সারাজীবন হিন্দিতেই কথাবার্তা চালিয়ে গেলেন তার প্রভাব রয়ে গিয়েছিলো। প্রথম নেহরু মন্ত্রীসভায় মওলানা আজাদ বা রফি আহমদ কিদওয়াই উর্দুভাষী ছিলেন। অহিন্দিভাষী নেতাদের মধ্যে গুজরাতি ও মরাঠি নেতারা, যেমন সর্দার প্যাটেল, বাবাসাহেব আম্বেদকর, সি ডি দেশমুখ, এন ভি গ্যাডগিল, বি ভি কেসকর প্রমুখ অবশ্য হিন্দিকে মেনে নিয়েছিলেন।  কিন্তু মনে রাখতে হবে রাজাগোপালাচারি, রাধাকৃষ্ণন, গোপালস্বামী আয়েঙ্গার, কামরাজ, শ্যামাপ্রসাদ  বা বিধানচন্দ্র কেউই হিন্দিভাষী ছিলেন না। তাঁদের সর্বভারতীয় ভাবমূর্তিও ছিলো। তাঁদের মধ্যে যেকোনও একজনই নেহরুকে চ্যালেঞ্জ জানানোর হিম্মত রাখতেন। তাঁরা কি হিন্দি রাজনীতির ভবিষ্যত আগ্রাসনের প্রতি সতর্ক ছিলেন না? না তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন লোকপ্রিয় ভাষামাধ্যম হিসেবে হিন্দিই আমাদের ভবিতব্য। যদিও নেহরু বেঁচে থাকতেই রাজভাষা অধিনিয়ম ১৯৬৩ গৃহীত হয়ে গিয়েছিলো। 

তুর্কি বা ইংরেজ আমলে হিন্দিভাষার  সরকারি প্রভাব ছিলোনা। তাই হিন্দি নিয়ে কংগ্রেসের কাছে কোনও লেগেসির চাপ ছিলো, তাও বলা যায়না। কিন্তু বৃহত্তর ভারতীয় ব্যবস্থায় হিন্দির জায়গাটা কেউই অস্বীকার করতে পারেননি। সুভাষচন্দ্র থেকে সুনীতিকুমার জনসংযোগের জন্য হিন্দির শরণাপন্ন হতে দ্বিধা করতেন না। সংসদ, সেনাবাহিনী থেকে ফিলমি দুনিয়া, সর্বত্র হিন্দিভাষার কার্যকারিতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেননি। হিন্দি সিনেমা, যা কলকাতায় শুরু হয়ে বম্বে পৌঁছেছিলো, যার কুশীলবদের মধ্যে বৃহৎ অংশ অহিন্দিভাষী, সেখানেও ভারতবর্ষ বলতে উত্তরাপথ, অর্থাৎ লাহোর থেকে বনারস পর্যন্ত যে ভূভাগ, তাকেই ভারতীয় জীবনের মূলস্রোত হিসেবে প্রচার করা হতো। 'বঙ্গালি' বা 'মদ্রাসি' সংস্কৃতির উপস্থিতি ছিলো কমিক রিলিফ হিসেবে। গোয়ার মাতাল বা মরাঠি পাণ্ডু হাওলদারের কপালেও একই গতি লেখা থাকতো।  সারা ভারতের আপামর জনতা কিন্তু তার মধ্যে প্রশ্নহীন তৃপ্তির সন্ধানও খুঁজে পেয়েছে। ভারতীয় জনপ্রিয় সিনেমার বাজার তৈরি করতে নেহরু রাজ কাপুরের 'সোস্যালিজম' বা দেব আনন্দের ম্যাটিনি আইডল ভাবমূর্তিকে সোভিয়েত ব্লকের দেশে রফতানি করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। বাণিজ্যিক সাফল্য  এসেছিলো কিছু। তবে বিদেশী দুনিয়ায় 'হিন্দি'ই যে ভারতীয় ভাষাবিনিময়ের মূলস্রোত সে ধারণাটি সারা বিশ্বে দৃঢ়মূল হয়ে গিয়েছিলো। বম্বের ছবিশিল্প তো চিরকালই একান্তভাবেই মুনাফামুখী ব্যক্তিগত বাণিজ্য। সেখানে তো কোনও রাজনৈতিক চাপ ছিলোনা।  কেন এই শিল্পে নিবেশকারীরা শুধু হিন্দি ছবিতেই টাকা ঢালতেন? প্রাথমিকভাবে পার্সিরা এই ব্যবসা করলেও পরবর্তীকালে কিছু বাঙালি ধনাঢ্য ব্যক্তিও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। শেষে তো পঞ্জাবি নিবেশকারীদেরই রমরমা। হিন্দিভাষী ছবির বাজারের সঙ্গে অন্য কোনও ভাষাই পাল্লা দিতে পারেনি। তামিল-তেলুগু ছবির নিজস্ব দর্শক ছিলো এবং এখনও আছে। কিন্তু তাঁরা নিজস্ব ভূগোল অতিক্রম করেননি। হিন্দি ছবির বিশ্বস্ত অনুগামী হয়েই থেকে গেছেন। হিন্দিভাষা নিজের গোলপোস্ট ক্রমশ বাড়িয়েই চলেছে। তাদের শক্তির উৎস কোথায় তা নিয়ে আমরা বিশেষ উৎসাহী ছিলুম না। এখনও নই।  সামরিক বাহিনীতে আগে থেকেই  হিন্দির গভীর প্রভাব ছিলো। ক্রমে তা অপ্রতিরোধ্য হয়ে যায়। হিন্দি হেজেমনি এদেশের জনজীবনে একদিনে বা গুটিকয় রাজনীতিকের ব্যক্তিগত উদ্যমে বেড়ে ওঠেনি। তার একটা সমাজতাত্ত্বিক প্রস্তুতি ছিলো।

স্বাধীনতার পর দক্ষিণভারতে, মূলত তামিলভাষী অঞ্চলে হিন্দি নিয়ে বাড়াবাড়ি করার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হতে দেখা গিয়েছে। এই প্রতিরোধ সম্পূর্ণত ভাষাভিত্তিক আবেগ নয়। জাতিভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিবাদ। এই টানাপড়েনের বয়স দুহাজার বছরের বেশি। তামিলভাষার বয়স পুরাণযুগের সংস্কৃতের থেকেও অনেক পুরোনো। হিন্দি তো নেহাত অর্বাচীন ভাষা। মাঝেমাঝেই নানা স্তরের উসকানিতে ছোটোখাটো আগুন জ্বলে ওঠে। 'নিজভূমে' আধিপত্যের লড়াইতে আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার তামিল তাগিদ। উগ্র তামিল জাতিবাদ, যেটা শ্রীলংকার তামিলদের মধ্যে দেখা যায়, তামিলনাড়ুর প্রান্তিক, কৌম জনতার মধ্যে তার প্রকোপ কম। তামিলনাড়ুর শহর অঞ্চলে অটোচালক বা ছোটো ব্যবসায়ী স্তরের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ধরনের হিন্দিবৈরিতা দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে সেটা তেমন প্রকট নয়। হিন্দি নিয়ে দক্ষিণের বাকি তিনটি রাজ্যের অবস্থান আপোসমূলক। না খোঁচালে ঝামেলা হয়না। বিশেষত অন্ধ্র, তেলেঙ্গানায় নিজামের রাজত্বের সূত্রে হিন্দির সঙ্গে একটা বোঝাপড়া বেশ প্রত্যক্ষ।

১৯২৫ সালের বিজয়াদশমীতে পাঁচজন মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ একটি সভা করেন। তাঁদের 'অনুপ্রেরণা' ছিলেন আরেক মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ বিনায়ক সাভারকর। সাভারকরের লেখা 'হিন্দুত্ব' রচনাটির আদর্শে একটি সমিতি গঠিত হয়। নাম রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। পুলিশের খাতায় লেখা ছিলো এঁরা হিন্দু মহাসভার অ্যাকশন উইং। আর এস এসের চুরানব্বই বছরের ইতিহাসে সাতজন 'সরসঙ্ঘচালক' বা সুপ্রিমো এসেছেন। একমাত্র রাজেন্দ্র সিং ছাড়া বাকিরা সবাই ব্রাহ্মণ। তার মধ্যে কে এস সুদর্শন ব্যতিরেকে তালিকাটির পাঁচজনই মহারাষ্ট্রীয় চিৎপাবণ বা দেশস্থ ব্রাহ্মণ। ভাবধারার দিক দিয়ে অত্যন্ত গোঁড়া ও জঙ্গি মানসিকতার 'হিন্দু'। অবশ্য সুদর্শন জন্মগতভাবে কন্নডিগা সংকেতি ব্রাহ্মণ হলেও তিনি আজীবন রায়পুর-জবলপুরের লোক। অনেক ভাষা জানলেও হিন্দিতেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন।

 'ভারতবর্ষ' নামক বিশ্বের জটিলতম, বহুমাত্রিক, অতিবিস্তীর্ণ প্রপঞ্চটিকে অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত কর্মী ও প্রচারকদের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার এলেম এইসব অন্ধ, একমাত্রিক 'তাত্ত্বিক'দের ছিলোনা। সাভারকরের বইয়ে ভারতবর্ষ, ভারতীয়তা, ধর্ম, সমাজতত্ত্ব ইত্যাদি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে 'হিন্দুত্ব' নামে একটি এক্স ফ্যাক্টরকে কল্পনা করা হয়েছিলো। এই 'এক্স'টি কোনও 'ধর্ম' নয়, নিছক সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির উৎস 'বৈদিক' যুগ থেকে প্রচলিত ঋষিমুনিদের তপোধন্য পবিত্র চিন্তাধারা। যাকে আটশো বছরের তুর্কি অত্যাচার বিকৃত করেছে, কিন্তু বিনাশ করতে পারেনি। তাঁর কাছে ইংরেজরা ছিলো কাছের লোক। তিনি বিশ্বাস  করতেন শুধুমাত্র ইংরেজরাই এদেশকে তুর্কিপ্রভাবমুক্ত করতে পারবে। তাই তাদের কাছে মুচলেকা দিয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন তাঁর দুশমন মুসলমানেরা। ইংরেজরা যদি তাঁদের সামলে দেয় তবে তিনি এদেশে ইংরেজ বিতাড়নের আন্দোলনে যোগ দেবেন না। 

'হিন্দুত্ব' নামক একটি বিমূর্ত, ভিত্তিহীন কল্পনাকে সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার মধ্যে নিয়ে আসতে তাঁর 'অনুপ্রেরণা’য় আর এস এস একটি  মডেল অ্যাকশন প্ল্যান প্রবর্তন করে । যার তিনটি বিন্দু, হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান। এই মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণদের চিন্তাধারা আপাতভাবে লোকমান্য টিলকের অনুসারী হলেও মূল  শিকড়টি ছিলো আরও কিছুদিন আগের ইতিহাসে। তাঁরা নিজেদের ভারতবর্ষের শেষ হিন্দু নৃপতি পেশোয়াদের উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনা করতেন। বাকি বিষয়গুলি নিয়ে মতবৈচিত্র্য থাকলেও মুসলিমবিরোধিতার প্রশ্নে তাঁরা ছিলেন তুমুলমাত্রায় সংহত। সত্যিকথা বলতে আজকেও ঐ সংস্থাটির প্রকৃত ভিত্তি প্রশ্নহীন মুসলিমবিরোধিতার মাটিতে দৃঢ়প্রোথিত। 

এঁদের কথিত 'হিন্দি', 'হিন্দু' ও 'হিন্দুস্তানে'র পরিভাষা এবং ব্যাখ্যা একান্তভাবে তাঁদের নিজস্ব। আমাদের আবহমানকালের সাংস্কৃতিক বা সারস্বত ঐতিহ্যে তাদের খুঁজে পাওয়া যাবেনা। এঁরা অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন সলাফি-ওয়াহাবি এবং য়ুরোপের বিভিন্ন ভূমিগত জাতিসত্ত্বাজাত আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি থেকে। অন্য দুটি বিন্দু নিয়ে এখানে আলোচনা করছি না। কিন্তু তাঁদের ধারণাজাত 'হিন্দি'ভাষা ছিলো উর্দুভাষার অপর মেরু। আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদ ও হিন্দিভাষাকে সমার্থক করে তোলার প্রয়োগটি আর এস এসের একটি প্রধান সাফল্য ও দাঁড়াবার জায়গা। যদিও পঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে উর্দু অসংখ্য হিন্দুর মাতৃভাষা ছিলো, কিন্তু এঁদের বিচারে তা মুসলমানদের ভাষা।  ঘটনা হলো বিশ্বের  দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনতার দেশে খুব কম সংখ্যক মুসলমানই উর্দুভাষা ঠিকঠাক জানেন। উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হয়ে যেতে বিখ্যাত লেখক ইসমত চুঘতাই গভীর দুঃখে বলেছিলেন এই সিদ্ধান্ত উর্দুভাষার গৌরবের অবসান ঘটাবে। কারণ ভারতে আর কেউ উর্দু পড়বে-লিখবে না। আসলে ভারতবর্ষীয় সভ্যতার পরিভাষাকে অতি সরলীকৃত করতে গিয়ে এঁরা এযাবৎ প্রকৃত, স্বীকৃত ইতিহাসের চূড়ান্ত অপব্যাখ্যা করে এসেছেন। আমাদের জাতীয় জীবনে বলপ্রয়োগ করে 'হিন্দি' ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রথাটি এঁদেরই মস্তিষ্কপ্রসূত। অন্য রাজনৈতিক দলগুলি, বিশেষত কংগ্রেস, এই ঘোলা জলেই মাছ ধরতে চেয়েছে এতোকাল ধরে। অথচ এটাও ঘটনা, নিজের শক্তিতেই হিন্দি এদেশে বিস্তীর্ণ ভূভাগের স্বীকৃত ভাষা। উপনিবেশ বিস্তার করার জন্য যে আত্মবিশ্বাস ও শক্তির প্রয়োজন হয়, এই মুহূর্তে হিন্দি ছাড়া আর কোনও ভারতীয় ভাষার নেই। কোনও রকম সরকারি সনদ ছাড়াই হিন্দিভাষা এদেশে সাম্রাজ্যবিস্তার করবে, এটা দেওয়ালের লিখন। তামিলনাড়ুর বুঁদির কেল্লা কতোদিন তাকে প্রতিহত করতে পারবে তা দৈবজ্ঞরাই বলতে পারেন।   

দীর্ঘকাল ধরে দেখে আসছি 'হিন্দি চাপিয়ে' দেওয়া নিয়ে এদেশের কেন্দ্রীয় সরকার কুমিরডাঙ্গা খেলে আসছে। রাজনৈতিক দলমতনির্বিশেষে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে মাঝেমধ্যেই এক একটা  বিবৃতি আসে। এটা  আসলে জল মাপার একটা খেলা। সরকারি নিহিত স্বার্থরা 'কুমির তোর জলে এসেছি' বলে কিছুক্ষণ লাফালাফি করেন। 'কুমির'টি জেগে উঠে নড়াচড়া করলেই আবার পুনর্মূষিকো ভব। নতুন শিক্ষামন্ত্রী, যিনি আবার শ্রীলংকার কোনও ইস্ট জর্জিয়া থেকে 'ডাকটর' হয়েছেন এবং সঙ্গে 'কবি', সেই খেলাটিই খেললেন এবং আবার ডাঙ্গায় ফিরে এলেন। বহুসংখ্যকের ক্ষমতার কাছে প্রশ্নহীন সমর্পণ বা বিবেক বন্ধক রেখে ভোটমেশিন ভেঙে ফেলে জিতে আসার প্রয়োজন এই মুহূর্তে হিন্দিভাষার নেই। ভাষা হিসেবে তার কোনও তাড়াও নেই। কিন্তু রাজনীতিকদের রয়েছে। এই সব অন্যায্য প্রস্তাব সে জন্যই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।  'কুমির' হিসেবে তামিলদের ভূমিকা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কারণ যেমন আগেই লিখেছি, তাঁরা দুহাজার বছর ধরে 'দাগানো' আর্যেতর। কিন্তু বঙ্গভাষীদের অবস্থানটি প্রকৃত অর্থে করুণ। 

প্রতিবেশী বাংলাদেশে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের সূচনাকাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে তার সঙ্গে তুলনায় যাবার একটি  প্রবণতা বারবার দেখা যায়। পূর্ববাংলার উর্দু বনাম বাংলার লড়াইয়ের সঙ্গে এই বঙ্গের অবস্থাটি সমান্তরাল নয়। ওখানে লড়াইটি দ্বিমাত্রিক ছিলো, এখানে বহুমাত্রিক।  যাঁরা সামগ্রিকভাবে অবস্থার সঙ্গে ওয়াকিফহাল, তাঁরা অবশ্যই এ জাতীয় মেঠো তক্কে যাননা। এদেশে মেরুকরণটি বাংলা বনাম উর্দু বা ইসলামাবাদ বনাম ঢাকা নয়। এ ধরনের সরলরৈখিক সমাধান এদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে বেমানান। কোনও  মাপদণ্ডেই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বস্তুস্থিতি মেলেনা।

এদেশীয় বাঙালিদের একটি প্রধান যুক্তি, হিন্দিভাষা বাংলার মতো 'উন্নত' নয়। দ্বিতীয়ত বাংলাসাহিত্য হিন্দিসাহিত্যের থেকে অনেক উন্নত। তৃতীয়ত বাংলাসংস্কৃতির উৎকর্ষের সঙ্গে গোবলয়ের হিন্দিসংস্কৃতির কোনও তুলনাই চলেনা। অতএব বঙ্গভূমিতে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন চলতে দেওয়া হবেনা।  এ প্রসঙ্গে বলি, যাঁদের আধুনিক হিন্দিভাষায় এলেম আছে বা বিষয়টি ভালোভাবে জানেন তাঁরা হিন্দিভাষার ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে সচেতন। ভাষার গুণমান বিচার করা একটি বিপুল সন্দর্ভ। বিশেষত বাংলা ও হিন্দির মতো দুটি উন্নত, পরিণত ভাষার মধ্যে যদি তুলনাটি এসে যায়। যাঁরা হিন্দিভাষায় স্বচ্ছন্দ ন'ন, তাঁদের কাছে 'পুলিশ কৈসে স্ত্রীলিঙ্গো হোতা হ্যায়' যুক্তিতে বাংলার স্টেটাস অনেক উন্নত বোধ হয়। উড়ে-মেড়ো-খোট্টার চিরন্তন ত্রিভুজের বাইরেও বাঙালির সহজাত 'ভাষাবৈরিতা' কিন্তু প্রচ্ছন্ন থাকেনা। সিংভূম, মানভূম, ধলভূম, মল্লভূম, বীরভূমের মানুষের কথিত বাংলার প্রতি নদে-শান্তিপুরী ভাষার ধ্বজাধারীরা বিশেষ প্রশ্রয়শীল নন। ত্রিপুরা ছাড়া একমাত্র ঝাড়খণ্ড রাজ্যেই প্রচুর বঙ্গভাষী আছেন। বাংলা সেখানে সরকারিভাবে স্বীকৃত এবং বহু মানুষের মাতৃভাষা। কিন্তু সেখানে ভূমিজাত মেধাবী বাঙালিদের মধ্যে কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা হেজেমনির প্রতি অভিযোগ আছে।

দ্বিতীয়ত, হিন্দি ও বাংলা সাহিত্যের মধ্যে তুলনার প্রসঙ্গ। নিজে দেখেছি, আমার আগের তো বটেই, এমন কি আমার প্রজন্মেরও বহু নিষ্ঠাবান ও সৃজনশীল হিন্দিভাষী পাঠকের বইয়ের আলমারিতে বাংলা বইয়ের উজ্জ্বল উপস্থিতি রয়েছে। বাংলাসাহিত্য প্রসঙ্গে তাঁরা শ্রদ্ধাবান। কিন্তু এখনও কোনও নিবেদিত বাঙালি পাঠকের আলমারিতে হিন্দি বই রয়েছে দেখিনি। বাঙালিদের মধ্যে যাঁরা বিশেষ সচেতন, তাঁদের মননেও মুনসি প্রেমচন্দের পর হিন্দি সাহিত্যে কী কী বিকাশ হয়েছে সে বিষয়ে ধারণা নেই। সাহিত্যকৃতির মান অনুযায়ী আধুনিক হিন্দিভাষার অবস্থান নিয়ে কোনও ধারণাই নেই বাঙালি পাঠকদের। সব থেকে মজার কথা, যাঁরা বাংলাসাহিত্যের 'গৌরব' নিয়ে অতি সরব তাঁরা বাংলাসাহিত্যের হালহকিকত কতোটুকু জানেন তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ রয়েছে। কিছুদিন আগেই আমার এক স্নেহাস্পদ আইআইটির নবীন অধ্যাপক জানালেন তাঁদের কাফেতে দুই অধ্যাপকের মধ্যে বাংলা কবিতা নিয়ে 'গভীর' আলোচনা চলছিলো। তিনি পাশের টেবিলে নীরবে শুনছিলেন তাঁদের বার্তালাপ।  কিঞ্চিৎ রোমাঞ্চিত বিস্ময়ে। আইআইটির গরিমাময় কারিগরিবিদ্যার অধ্যাপকরা তাহলে এখনও বাংলা কবিতায় রুচিশীল? এই না হলে বাঙালি?  তবে রোমাঞ্চটি ছিলো ক্ষণস্থায়ী। হঠাৎ একজন বললেন 'আকাশের গায়ে নাকি টকটক গন্ধ' জাতীয় বৈপ্লবিক লাইন শুধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ই লিখতে পারেন। অন্যজনও সহমত হলেন তাঁর সঙ্গে।  

সত্যিকথা বলতে কী, 'সাহিত্য', বাংলা বা হিন্দি নির্বিশেষে, কজন পড়ে? এদেশের জনসংখ্যার বিচারে যেকোনও ভাষাতেই 'সাহিত্যপড়ুয়া'র সংখ্যা কতো? এই পড়ুয়ার দল কি ভাষা হেজেমনির মতো একটা ব্যাপক রাজনৈতিক 'ষড়যন্ত্রে'র মোকাবিলা করতে পারেন? মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। এই মুহূর্তের 'বাংলা সংস্কৃতি'র উৎকর্ষ বিষয়েও উৎফুল্ল হবার কারণ এই অধম খুঁজে পায়না। নানাকারণে জনসংস্কৃতিতে নিম্নমেধার বোলবালা যে কী পর্যায়ে পৌঁছেছে সেটা নিয়ে আমার আলোচনা না করলেও চলে। হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতি বাংলার তুলনায় কতটা পিছিয়ে আছে সে বিষয়ে জঙ্গি, অস্মিতাবাদী বঙ্গভাষীরাই ভালো জানেন। তাঁদের ভালো হোক।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, যেকোনও ভাষাই প্রাধান্য পায় তার ব্যবহারকারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক সম্মানের  মাপে। যেসব ভাষার অনুগামীরা অর্থনৈতিকভাবে উজ্জ্বল, তাঁদের ব্যবহৃত ভাষাও সমানুপাতিক মর্যাদা পায়। বঙ্গভাষীরা যদি এদেশের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন, তবে বাংলাভাষাই এদেশের সরকারি ভাষা হতো। ইংরেজদের বাণিজ্যিক সাফল্যের সূত্রেই তাদের ভাষা পৃথিবীর প্রধান ভাষা হতে পেরেছিলো। ব্রিটেনের সূর্য অস্ত গেলে স্যামচাচা ইংরেজির ধামাটি ধরে ফেলে। ঐ ভাষার সারাদিনই সূর্যোদয়। গত চার-পাঁচ বছর ধরে যে আটদশজন গুজরাতপুত্র সর্বক্ষেত্রে ভারতবর্ষকে নিয়ন্ত্রণ করছেন তাঁরা হিন্দির পক্ষে নিজেদের তাসগুলি খেলে দিয়েছেন। কাজের কথার জন্য ইংরেজি তো আছেই। যেকোনও বুদ্ধিমান ব্যক্তিই ওটা শিখে নেবেন। বাকি দুটো একেবারেই অতিরিক্ত। তাদের ব্যবহার করা হবে ভোটভিত্তিক জুয়াখেলার আসরে। যখন যেটা চলবে, সেটাকে নিয়ে আসর গরম হবে। বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্র বা সুকান্ত ভোটযুদ্ধের বোড়ে। ভাষা বা সাহিত্যের সঙ্গে তাঁদের সংযোগ আজকের গণিতে গৌণ হয়ে গেছে।

যেসব বাঙালিরা হিন্দি আগ্রাসন নিয়ে উদ্বিগ্ন, প্রতিবাদমুখর, তাঁরা নিজেদের ঘরের দিকে বোধ হয় বিশেষ তাকিয়ে দেখেননা। রাজনৈতিক চাপ কিন্তু সাংস্কৃতিক বেনোজলের তুলনায় নিতান্ত তাৎপর্যহীন। আমরা প্রবাসী বাঙালি। মাত্র দু বছর হলো আমি পশ্চিমবঙ্গের মূল ভূখণ্ডে থাকতে এসেছি। পুরো জীবনটাই সারা দেশের নানাপ্রান্তে কাটিয়েছি। সরকারি কর্মচারী হবার সুবাদে সর্বত্র মাটির কাছাকাছি থেকে কাজ করার সুযোগ ছিলো। গত দুবছর ধরে দেখছি এই বঙ্গে হিন্দিভাষার প্রকোপ কীভাবে আমাদের জীবনযাত্রার প্রতিস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের পারিবারিক বা সামাজিক উৎসব অনুষ্ঠানে যে শৈলীতে কথা হয় বা যে সব নাচাগানা, তার সঙ্গে গুড়গাঁওয়া বা পাটনার কোনও প্রভেদ নেই। পরবর্তী প্রজন্মের কথা তো ছেড়েই দিলুম, এমন কি আমাদের প্রজন্মেরও খুব কম কলকাতার বাঙালিকে গ্রহণযোগ্য বাংলায় কথা বলতে শুনি। 'সাহিত্যটাহিত্য' তো  দূর রজনীর স্বপন।

আমরা বাইরে বিরাট বাঙালি। ভিতরে হিন্দিভাষা নীরবে সিঁধ কেটে চলেছে। নিজের জোরেই কাটছে। আমরা মেলা-খেলা-শনিপুজোয় মত্ত। আমাদের কোনও আয়না নেই। নেই পায়ের তলায় জমি। শুধু অক্ষমের নালিশ আছে । আর আছে হেরে যাওয়ার অজুহাত। বখতিয়ার খিলজি থেকে রবার্ট ক্লাইভ থেকে দিল্লি দরবার থেকে হিন্দিভাষা, সবাই আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছে। ষড়যন্ত্র করেছে। অসম্মান করেছে। এই সান্ত্বনাটিই আমাদের অন্তিম অর্জন। আমাদের শেষ ডুমুরপাতা।



775 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 17 -- 36
Avatar: S

Re: হেইল হিন্দি

তথাগত রায়ের টুইট গুলো দেখেছেন? লোকটা সুস্থ আছেন তো?
Avatar: রঞ্জন

Re: হেইল হিন্দি

@এলসিএম,
আশা করি আমার তৈরি 'রাষ্ট্রভাষা'/'রাজভাষা' কনফিউশন যোগ্য লোক শিবাংশুর তথ্যসমৃদ্ধ বর্ণনায় দূর হয়েছে। ওই রাজভাষা অধিনিয়মের সালটা --১৯৬৩-- আমিও জানতাম না । কিন্তু ফি-বছর সেপ্টেম্বর মাসে রাজভাষা পাখওয়াড়া (পক্ষ) বা দিবস পালনের সময় (বাধ্যতামূলক) আমার এবং স্টেট ব্যাংকে দেখতাম সার্কুলার/ ফ্লেক্স সবজায়গায় রাষ্ট্রভাষার বদলে 'রাজভাষা' লেখা হচ্ছে। তাৎপর্য হল ব্যবহারিক হিন্দিভাষায় সরকারি কাজকম্ম হল 'রাজকাজ'। আর হিন্দি হল সরকারি কাজকম্মের ভাষা।
Avatar: de

Re: হেইল হিন্দি

সুস্থ কোনদিন ছিলেন কি আদৌ?
উত্তর ভারতীয়দের আগ্রাসন সর্বত্র চোখে পড়ে - সাংস্কৃতিক আগ্রাসন তো ছেড়েই দিলাম - একবার কোন সংস্থার উঁচু পদে উত্তর ভারতীয়েরা ঢুকলে নীচের দিকের রিক্রুটমেন্টে পুরোপুরিই উত্তর ভারতীয় রাখার চেষ্টা শুরু হয়। এনারা অবিশ্যি দক্ষিণ ভারতীয়দের সম্বন্ধে একই রকম বলে থাকেন, তবুও আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় উত্তর ভারতীয়েরা অনেক বেশী সিলেক্টিভ এইসব ব্যাপারে। আমাকে দূর্ভাগ্যবশতঃ উত্তরভারতীয় মেজরিটিওয়ালা কিছু ইন্টার্ভিউ বোর্ডে মেম্বার হয়ে বসতে হয়, গত কয়েক বছর ধরে - সেই সব বোর্ডে শুধুই উত্তর-ভারতীয়দের সিলেক্ট করা হয়। আমার একার দেওয়া মার্কসে সিলেকশন আটকায় না। আর বাঙালীদের ব্যাপারে তো একেবারে নৈব নৈব চ। বাঙালীদের প্রবল ভয় পায় এই কমিউনিটি -

ভাষার আগ্রাসন কেন্দ্রীয় সরকারী ক্ষেত্রে অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ইন্সেন্টিভ দেওয়া হয় হিন্দীকে কমিউনিকেশনের মাধ্যম বানাতে। নানা রকম প্রোগ্রাম, প্রতিযোগিতা সারা বছর ধরে চলতে থাকে। সবই হিন্দী ভাষায়।

হিন্দীর থেকে উর্দু শুনতে অনেক বেশী ভালো, এই ভাষাটাকে প্রোমোট করলেও কিছু বলার থাকতো না।

অন্য ভাষা-ভাষীদের খুব কম জনেরই পরের প্রজন্ম নিজেদের ভাষা পড়তে-লিখতে পারে। এটা সর্বত্র সত্যি। তামিল-মালয়ালামরা তবুও চেষ্টা চালাচ্ছে, কতোদিন পারবে বলা মুশকিল -
Avatar: S

Re: হেইল হিন্দি

আমরা যারা হিন্দি গানগুলো শুনে মুগ্ধ হয়েছি বা এখনো হই, সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আসলে সেই গানগুলোতে উর্দু আলফাজের জন্য। লোকে যে বলে আগের হিন্দি গানগুলো শ্রুতিমধুর ছিলো তার কারণ উর্দুর ব্যবহার অনেক বেশি ছিলো।

আমি হিন্দির আগ্রাসন নিয়ে অতো চিন্তিত নই। কারণ স্বয়ং হিন্দি হার্টল্যান্ডেই ইংরেজির সামনে হিন্দি ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। উর্দুকে বাদ দিয়ে হিন্দির কালচার খুবেকটা বলিষ্ঠ নয় অন্য অনেক আন্চলিক ভাষার তুলনায়, ফলে আন্চলিক ভাষার সমতুল্য হতে হিন্দির অনেক সময় লাগবে, আদৌ যদি কোনওদিনও হতে পারে। এমনিতেই উর্দুকে সড়িয়ে দিয়ে সংস্কৃত আর এদিক ওদিক থেকে ধার নিয়ে একটা জগাখিচুড়িতে পরিনত হয়েছে ভাষাটা। দুদিন পরে দক্ষিনের বা বাংলার ছেলেমেয়েরা ভালো হিন্দি বলে-লিখে একটু এগোলেই দেখবেন এদের আর হিন্দি-হিন্দি খেলতে ভালো লাগবেনা। তাই এখন কয়েকদিন লাফাতে দিন, দুদিন পরে নিজেরাই ক্লান্ত হয়ে যাবে।
Avatar: রঞ্জন

Re: হেইল হিন্দি

এস,
কাগজপত্তরে যাই হোক, বেশির ভাগ লোক যে হিন্দি বলে সেটা তৎসমশব্দবহুল খড়িবোলি নয় , বরং উর্দু আলফাজ মেশানো হিন্দুস্তানি। পরীক্ষা বলি না , বলি ইমতিহান, পরিণাম না নতীজা, ক্রুদ্ধ না হয়ে গুসসা হই, প্রেম না করে বলি প্যার করতা হুঁ। দৃষ্টি নয় নজর, সন্দেশ নয় খবর। অবশ্য অনেক আঞ্চলিক শব্দও জায়গা করে নিচ্ছে।
ফলে ব্যাপারটা খুব একমাত্রিক নয় ।
একটা বড় কারণ অর্বাচীন ভাষা হয়েও আজ হিন্দি সাহিত্যের যে সম্পদ তার কাছে কোন আঞ্চলিক ভাষা ( ভোজপুরি, মৈথিলি, বুন্দেলখন্ডি, ছত্তিশগড়ি আদি) দাঁড়াতে পারে না ।
হিন্দি অনুবাদ খুব সমৃদ্ধ।
বাংলা থেকে অনুবাদ খালি বংকিম-শরৎ-রবীন্দ্রনাথে থেমে থাকে নি । সত্তরের দশকে কলেজ লাইব্রেরিতে দেখেছি মানিক-তারাশংকর-সমরেশ-আশাপূর্ণা-মহাশ্বেতা থেকে অনুবাদ।
ইদানীং রবিশংকর বলের দোজখনামাও অনুদিত হয়েছে।
অথচ হিন্দি থেকে বাংলায় ? প্রেমচন্দের পর ? বামপন্থী রুচির আনুকূল্যে রাহুল সাংকৃত্যায়ন, কৃষণ চন্দর, মুলকরাজ আনন্দ পর্যন্ত। তারপর?
আমি কয়েক বছর আগে গুরুর পাতায় 'কুরু কুরু স্বাহা' পুরোটা এবং রাগ দরবারীর ৩৬টার মধ্যে দশটা চ্যাপটার অনুবাদ করেছিলাম। আমার অক্ষমতা সত্ত্বেও সেরেফ ন্যারেটিভের বিষয় কৌলীন্যে তা পাঠকদের ভালো লেগেছিল।
একজনের নাম বলি ঃ
গজানন মাধব 'মুক্তিবোধ'।
এই কমিউনিস্ট লেখকের স্থান হিন্দি সাহিত্যে বাংলায় গদ্যে মানিক বন্দো, কবিতায় বিষ্ণু দে'র সঙ্গে তুলনীয়।
নন্দনতত্ত্বের প্রশ্নে পি সি জোশীকে খোলাচিঠি ইনিও লিখেছিলেন ( যেমন বাংলায় ঋত্বিক ঘটক)। কলেজে পড়াতেন, আর্থিক কষ্টে ভুগে অকালে মারা যান। এ'র কবিতা 'সতহ সে উঠতা হুয়া আদমী' নিয়ে মণি কৌল সিনেমা বানিয়েছেন। জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়েছেন।
অনেক ইউনিতে আজ এঁর নামে চেয়ার রয়েছে। অথচ বাংলায় কোন অনুবাদ/পরিচিতি নেই ।
Avatar: Ekak

Re: হেইল হিন্দি

গুরুর পাতায় হিন্দি সাহিত্য নিয়ে কথা উটলেই তো হ্যা হ্যা হ্যা হ্যা রব ভেসে ওঠে। বেশ কয়েকবারের অভিগ্যতা।
Avatar: রঞ্জন

Re: হেইল হিন্দি

ঃ)))
Avatar: রঞ্জন

Re: হেইল হিন্দি

একক,
বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্যের বিবর্তনের ধারা এবং ঐতিহ্য আলাদা হওয়াই স্বাভাবিক। হিন্দির মূল ভুখন্ডে বঙ্গের মতন দেশভাগের বা নকশাল আন্দোলনের মৌষল পর্বের অভিজ্ঞতা নেই , অথচ পাঞ্জাবের আছে । ফলে পাঞ্জাবী মূলের দুই লেখক যেমন যশপাল ('দাদা কমরেড' উপন্যাসের জন্যে খ্যাতি) এবং অমৃতা প্রীতম হিন্দিতে দেশভাগের উপর উপন্যাস লিখে গেছেন। অমৃতা প্রীতমের 'এক চিনি ফেরিওয়ালা' নিয়ে মৃণাল সেন বানিয়েছেন 'নীল আকাশের নীচে'। নীলকন্ঠ সেনগুপ্ত আশির দশকে প্রেমচন্দের 'কফন' গল্পটি নিয়ে চমৎকার নাটক করেছিলেন--'দানসাগর'।
মুজতবা আলি লিখেছিলেন যে ফরাসী সাহিত্যে ইংরেজের মত শেক্সপীয়র নামক এভারেস্ট নেই । কিন্তু মলিয়ের রাসিন বালজাক মপাসাঁ আদি বেশ কিছু কাঞ্চনজঙ্ঘা নন্দাদেবী আছে ।
একইভাবে রবীন্দ্রনাথের মতন কেউ নেই হিন্দি সাহিত্যে, কিন্তু ------।
Avatar: Ishan

Re: হেইল হিন্দি

শিবাংশুদা, মনে হয় আমি বোঝাতে পারিনি।

আপনি লিখেছেন, "কিন্তু এঁরা সবাই প্রয়োজন অনুসারে হিন্দিভাষাকেই 'মাতৃভাষা' হিসেবে ঘোষণা করেন", এখানে মাতৃভাষা শব্দটি প্রয়োগে আপনার কোনো ভুল হয়নি। ওমুক লোকের ভাষা বলতে তো আমরা মাতৃভাষাই বুঝি। এবং সেন্সাসে লেখাই আছে এতজন লোকের ভাষা হল হিন্দি।

সমস্যাটা হল এইটা লেখায়, যে, এই লোকগুলি নিজেরাই নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে হিন্দিকে ঘোষণা করেন। সেইটা হয়না। ওটা রাষ্ট্রযন্ত্রের কারবার। ভোজপুরি বা মাগধীকে মাতৃভাষা হিসেবে রেকর্ড ঠিকই করা হয় (যদিনা সেখানেও কোনো গোলমাল থাকে), কিন্তু তারপর হিসেবের খাতায় ওগুলিকে হিন্দি বানিয়ে দেওয়া হয়। এই পলিসি এবং রাজনীতির সামনে ব্যক্তি মানুষের কিছু করার নেই।
Avatar: রঞ্জন

Re: হেইল হিন্দি

ঈশান,
নব্বই দশকের কথা । তখন বাংলার উত্তর পশ্চিম কেন্দ্র থেকে বিজপি প্রার্থী হয়ে দাঁড়াতেন এবং পরে বোধহয় রাজ্যপাল হয়েছিলেন-- বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী। আমার পরিচিত এক সাংবাদিক কয়েক দশকের সেন্সাস ঘেঁটে একটা ব্যাপারে সন্দেহ হওয়ায় ওঁর সঙ্গে আলোচনা করতে যান।
যা বেরিয়ে এল বেশ কিছু ভোজপুরি এবং সমান দরের ভাষাভাষি মানুষ নিজেদের মাতৃভাষা হিন্দি লিখিয়েছিলেন এই ভেবে যে রাষ্ট্রভাষার আশ্রয়ে গেলে কুলীন হওয়া যাবে, এবং কিছু সুবিধে পাওয়া যাবে। স্যাংস্কৃটাইজেশন?
সম্ভবতঃ এক দশক পরে মোহমুক্তি ঘটায় আবার তারা সগর্বে নিজেদের আসল মাতৃভাষার পরিচয়ে ফিরে এলেন।
তাই সেন্সাসে মাঝখানে ভোজপুরি এবং সেইরকম কিছু ভাষাভাষীর সংখ্যা তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে কমে বার বেড়ে গেছল।
Avatar: S

Re: হেইল হিন্দি

ভোজপুরি এবং মৈথিলীদের অনেকে এখনো নিজের মাতৃভাষা হিন্দি ছাড়া অন্য কিছু স্বীকারই করতে চায়্না। পাহাড়িরাও না। ঐ অন্চলের কেউই নয়। কজন মারোয়ারিকে নিজের ভাষায় কথা বলতে দেখেছেন? হিন্দু পান্জাবিরাও হিন্দিকে প্রায় নিজের ভাষায় পরিণত করে ফেলেছে। এগুলো সবই নিজেকে ভারতের মেজরিটি মেইনস্ট্রিমের অংশে পরিণত করার চেস্টা।

বহুদিন আগের একটা ঘটনা মনে আসলো। মুম্বাই থেকে ট্রেনে করে ব্যাঙ্গালোর ফিরছি। আমার সাথে একজন মারাঠি মহিলা তার পুঁচকে একটা ছেলেকে নিয়ে উঠেছেন। আমি সেই বাচ্চাটাকে আদর করে হিন্দিতে কিছু জিগ্যেস করলেও সে কিছু উত্তর দিচ্ছেনা। তখন তার মা তাকে বলছেন তাড়াতাড়ি হিন্দি শিখে ফেলতে।
Avatar: শিবাংশু

Re: হেইল হিন্দি

অনেকে আলোচনা করেছেন। জ্ঞানবুদ্ধিমত আমার কথা কিছু লিখি,

@de,
"ভাষার আগ্রাসন কেন্দ্রীয় সরকারী ক্ষেত্রে অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ইন্সেন্টিভ দেওয়া হয় হিন্দীকে কমিউনিকেশনের মাধ্যম বানাতে। নানা রকম প্রোগ্রাম, প্রতিযোগিতা সারা বছর ধরে চলতে থাকে। সবই হিন্দী ভাষায়।

হিন্দীর থেকে উর্দু শুনতে অনেক বেশী ভালো, এই ভাষাটাকে প্রোমোট করলেও কিছু বলার থাকতো না।

অন্য ভাষা-ভাষীদের খুব কম জনেরই পরের প্রজন্ম নিজেদের ভাষা পড়তে-লিখতে পারে। এটা সর্বত্র সত্যি। তামিল-মালয়ালামরা তবুও চেষ্টা চালাচ্ছে, কতোদিন পারবে বলা মুশকিল -"

কেন্দ্রীয় সরকার শুধু যে হিন্দিভাষাকে ধীরে ধীরে সইয়ে দেবার সচেতন প্রয়াসই করে, তা নয়। উত্তরভারতের বা আর্যাবর্তের জীবনধারা বা সংস্কৃতিটিকেও ভারতীয় যাপনের মূলস্রোত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সক্রিয় উদ্যমও নেওয়া হয়।

'হিন্দি থেকে উর্দু শুনতে অনেক বেশী ভালো' এই যুক্তিটি দিয়ে বোধ হয় কিছু প্রতিষ্ঠা করা যায়না। উর্দু কেন নয়, তার কারণ আমি লিখেছি। আর আমার সর্বভারতীয় অবাংলাভাষী বন্ধুদের কাছে শুনি বাংলা এদেশের সব চেয়ে শ্রুতিমধুর ভাষা।

পরের প্রজন্ম কোন ভাষা গ্রহণ করবে এ বিষয়ে সারা ভারতের সর্বভাষাভাষী বর্তমান প্রজন্ম উদ্বিগ্ন ও উৎসুক। শুধু আমরা নই।

@S,

'আমি হিন্দির আগ্রাসন নিয়ে অতো চিন্তিত নই। কারণ স্বয়ং হিন্দি হার্টল্যান্ডেই ইংরেজির সামনে হিন্দি ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে।'

'হিন্দির আগ্রাসন' ব্যাপারটা যতোটা সরকারি প্রাথমিকতা, হিন্দিভাষীরা কিন্তু ততোটা জঙ্গি নন। কারণ, প্রয়োজন পড়েনা। হিন্দির সর্বভারতীয় গ্রহণযোগ্যতা নিয়মমাফিক মসৃণভাবেই কার্যকরী হয়ে যাচ্ছে। যেমন ধরুন, কলকাতা শহরে কোনও হিন্দিভাষী যদি তাঁর ভাষায় অন্য কোনও ভাষার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন তখন তার উত্তরে হিন্দিভাষা ব্যবহারের প্রয়াসটি এখন যথাসম্ভব বেড়ে গেছে। ঠিক যেমন আমার নিজের দেশে যদি কোনও শাদা চামড়ার সাহেব দুর্বোধ্য ইংরেজিতে আমায় কিছু প্রশ্ন করেন তখন আমি ঠিকঠাক ইংরেজি জানি বা নাই জানি 'আই গো আপ, ইউ গো ডাউন' করে কিছু একটা ইংরেজি বলেই ফেলি। না হলে প্রেস্টিজ বাঁচেনা। হিন্দির ক্ষেত্রে আমার আগের প্রজন্মে সচরাচর বাংলাতেই উত্তরটা আসতো। আমার পরের প্রজন্মে হিন্দি ছাড়া অন্য কোনও ভাষাই আর ব্যবহার করা হবেনা। ওটাই দস্তুর হয়ে যাবে। এখনই রাস্তাঘাটে নবীন প্রজন্মের বাঙালিদের যেভাবে অপ্রয়োজনে হিন্দিতে কথা বলার প্রবণতা দেখতে পাই, এটাই দেওয়াললিখন।

'উর্দুকে বাদ দিয়ে হিন্দির কালচার খুবেকটা বলিষ্ঠ নয় অন্য অনেক আন্চলিক ভাষার তুলনায়, ফলে আন্চলিক ভাষার সমতুল্য হতে হিন্দির অনেক সময় লাগবে, আদৌ যদি কোনওদিনও হতে পারে।'

এই উক্তিটি, যাকে বাংলায় বলে সুইপিং রিমার্ক। হয়তো আপনার ব্যক্তিগত মত। এর উত্তরে আমিও একটু ব্যক্তিগত হবার স্বাধীনতা নিচ্ছি। হিন্দিভাষাটি আমি মাতৃভাষার মতো জানি এবং এককালে উর্দু কিছু শিখেছিলুম জামিয়া মিলিয়া থেকে। নাস্তালিক লিপির ব্যবহার অনভ্যাসে ভুলে গেছি। কিন্তু নাগরি-অক্ষরে কিঞ্চিৎ উর্দুচর্চা এখনও করার চেষ্টা করি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আপনাকে অনুরোধ করবো এই বিষয়ে আপনার ধারণাটি পুনর্বিচার করতে।

'দুদিন পরে দক্ষিনের বা বাংলার ছেলেমেয়েরা ভালো হিন্দি বলে-লিখে একটু এগোলেই দেখবেন এদের আর হিন্দি-হিন্দি খেলতে ভালো লাগবেনা। তাই এখন কয়েকদিন লাফাতে দিন, দুদিন পরে নিজেরাই ক্লান্ত হয়ে যাবে।'

যাঁরা সরকারে ক্ষমতাসীন এবং হিন্দি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, তাঁরা কিন্তু খুব সিরিয়স খেলোয়াড়। 'দুদিন' নয়। এখনও পর্যন্ত এই খেলার বয়স সত্তর বছর। তাঁদের সচেতন প্রয়াস মন্দীভূত হওয়া তো দূরস্থান ক্রমশ তাতে জোয়ার আসছে। বিশেষত 'দেশপ্রেমী' সরকারের প্রত্যক্ষ উদ্যমে।

@রঞ্জন,
আপনি আমার থেকে অনেক বেশি সক্রিয়ভাবে হিন্দি সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। আমি তো পাঠক হিসেবেই রয়ে গেছি। কারণ অনুবাদকর্মটি ঠিক আমার চায়ের কাপ নয়। মাঝে মাঝে চমকে দেওয়া কিছু হিন্দিসাহিত্যের সৃষ্টি পড়ে খুব ইচ্ছে হয়েছে বাংলা পাঠকদের কাছে তার কিছু ছোঁয়া এনে দিই। কিন্তু ওটা আমার খেলার মাঠ নয় এমত বিশ্বাসে নিবৃত্ত থেকে গেছি। প্রধান বাংলা সাহিত্যিকদের মধ্যে একমাত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেই দেখেছি বিষয়টি নিয়ে বহুবার লেখালেখি করতে। তাঁর সঙ্গে আমার এ নিয়ে কথাও হয়েছিলো একবার। বিষয়টির প্রতি তাঁকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেও দেখেছিলুম। বিভিন্ন পুস্তকমেলায় এনবিটির বিপণীতে আমি জানতে চাই অনুদিত বইগুলি বিষয়ে মানুষের আগ্রহ কেমন? খুব ইতিবাচক উত্তর পাইনা। আসলে মূল ভাষাটির সৃষ্টি যেভাবে আমাদের ডুবিয়ে দিতে পারে, অনুবাদ তা পারেনা অবশ্যই। ছোটোবেলায় বাংলা অনুবাদে প্রথম 'রেণু'র 'ম্যয়লা আঁচল' পড়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলুম। কিন্তু পরে মূল লেখাটি পড়ার পর বুঝতে পারলুম পিটুলিগোলার রূপকটির ভিত্তি কী?

@একক,
আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের তফাত শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের ছায়া অঞ্চলটির উত্তরাধিকার। হিন্দি ভাষা বা সাহিত্যের শক্তি রয়েছে তার অন্য সব ভাষার শ্রেষ্ঠ লক্ষণগুলিকে গোগ্রাসে আত্মস্থ করার মধ্যে। ছাত্রবয়সে দেখতুম আমার হিন্দিভাষী বন্ধুরা কিছুতেই মানতে চাইতো না শরৎচন্দ্র বা বিমল মিত্র আসলে বাংলা লেখক। শরৎচন্দ্র প্রেমচন্দেরই কোনও তুতোভাই হবেন এমন বিশ্বাস সাধারণ হিন্দি পাঠকদের মধ্যে বহুলপ্রচলিত। 'হ্যা হ্যা' ব্যাপারটা আজকের নয়। স্বয়ং শরৎচন্দ্র 'নতুনদা' নামে একটি চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন এই প্রবণতাটিকে চিহ্নিত করতে।

@Ishan,

'সমস্যাটা হল এইটা লেখায়, যে, এই লোকগুলি নিজেরাই নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে হিন্দিকে ঘোষণা করেন। সেইটা হয়না। ওটা রাষ্ট্রযন্ত্রের কারবার। ভোজপুরি বা মাগধীকে মাতৃভাষা হিসেবে রেকর্ড ঠিকই করা হয় (যদিনা সেখানেও কোনো গোলমাল থাকে), কিন্তু তারপর হিসেবের খাতায় ওগুলিকে হিন্দি বানিয়ে দেওয়া হয়। এই পলিসি এবং রাজনীতির সামনে ব্যক্তি মানুষের কিছু করার নেই।'

প্রকৃত মাতৃভাষা কী আর তা কী রেকর্ড করা হয় তা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা একটু বলি।

অবিভক্ত বিহারে 'বিহার বাঙালি সমিতি' নামে একটি প্রাচীন প্রতিষ্ঠান ছিলো। এখন ঝাড়খণ্ড হয়ে যাবার পর তা দুভাগ হয়ে গেছে। পারিবারিকসূত্রে ও ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের সঙ্গে আমি ছাত্রজীবন থেকেই জড়িত ছিলুম। কয়েকটি সীমান্ত এলাকা, যেমন সিংভূম-মেদিনীপুর, দুমকা-সিউড়ি,সাহেবগঞ্জ-মালদা, পুর্নিয়া-রায়গঞ্জ ইত্যাদি জায়গায় প্রচুর বঙ্গভাষী মানুষ থাকতেন। এখনও থাকেন। পাটনা-রাঁচি-জামশেদপুর তো ছেড়েই দিচ্ছি। এসব জায়গায় প্রচুর বাংলামাধ্যম ইশকুল ছিলো তখন। এখনও কিছু রয়েছে। প্রতি বছর অভিযোগ আসতো বাংলায় পাঠ্যপুস্তক ছাপা হচ্ছেনা এবং বাংলাভাষী শিক্ষকদের পদগুলি হিন্দিভাষী শিক্ষকদের দিয়ে পূর্ণ করা হচ্ছে। তখন আমরা খোঁজখবর নিয়ে দেখি গণনাকর্মীরা সচরাচর রাজ্যসরকারের কর্মচারী হয়ে থাকেন। তাঁরা সকলেই হিন্দিভাষী। পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের সময়, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে, তাঁরা হিন্দিতেই বার্তালাপ করতেন এবং সিদ্ধান্ত নিতেন যাঁরা এতো ভালো হিন্দি বলতে পারেন, তাঁরা সবাই হিন্দিভাষী। সীমান্ত এলাকার বাঙালিরা সবাই হিন্দিটা ভালো'ই জানেন। এছাড়া গণনাকর্মীদের উপর 'অলিখিত' নির্দেশও থাকতো অনুকূল সংখ্যা যেন বলবৎ থাকে। ফলে নাগরিকদের অজান্তেই বস্তুস্থিতির ভোল পাল্টে যেতো। বাংলাভাষী যখন নেইই, তখন আর বাংলা পাঠ্যপুস্তক বা শিক্ষকের কী প্রয়োজন?

এই ব্যাপারটা কিন্তু ভোজপুরি বা মৈথিলিভাষীদের মধ্যে নেই। ভোজপুরি ভাষীরা যতো'ই নিজেদের পৃথক ভাষার প্রতি আনুগত্য জানান না কেন, তাঁরা সর্বৈবভাবে নিজেদের হিন্দিসংস্কৃতির কোরগ্রুপ মনে করেন। মৈথিলিরা নানা ঐতিহাসিক কারণে নিজেদের এককালে পৃথক ভাবতেন। মৈথিলি ভাষার লিপি, অর্থাৎ কৈথি, ছিলো বাংলার যমজ ভাই।কিন্তু কালক্রমে ললিতনারায়ণ মিশ্র এবং ভাই জগন্নাথ মিশ্র পাটলিপুত্র দখল করার পর রাজনৈতিকভাবে মৈথিলিরাও দ্বারবঙ্গের মোহ কাটিয়ে দ্বারবিহার হয়ে যান। 'নিজেদের' ভাষা হিসেবে এই জনগোষ্ঠী হিন্দি ছাড়া আর কিছু স্বীকারই করেননা। সে নিজেদের মধ্যে তাঁরা যে ভাষাতেই কথা বলুন না কেন। রাষ্ট্রযন্ত্র এক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনা। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যসাধন হয়েই যায়।


Avatar: Ishan

Re: হেইল হিন্দি

এটা হতেই পারে। সেটা নিয়ে বলা দরকার। কারণ মাতৃভাষা কী এই নিয়ে জনগণনার নীতিতে ডিটেলে বলা আছে।
Avatar: S

Re: হেইল হিন্দি

@শিবাংশু, আমার কিছু জবাবও থাকলো। সবই ব্যক্তিগত মতামত।

"প্রয়োজন পড়েনা। হিন্দির সর্বভারতীয় গ্রহণযোগ্যতা নিয়মমাফিক মসৃণভাবেই কার্যকরী হয়ে যাচ্ছে।"
আমার ধারনা অর্থনীতি যত এগোবে ইংরেজি তত জাঁকিয়ে বসবে। সেই নিয়ে হিন্দিভাষীরাও খুব চিন্তিত। এখনই হিন্দি+ইংরেজি মিলিয়ে মিশিয়ে বলা শুরু হয়েছে। হিন্দি সিনেমার নামই ইংরেজিতে রাখা হচ্ছে। বড় শহরে উচ্চবিত্তের পরের প্রজন্ম এখনই বাড়িতে ইংরেজিতেই কথপোকথন চালায়। ফলে হিন্দিরও টিঁকে থাকা খুব মুশকিল। এই ব্যাপারটা চীনেও ঘটেছে।

'আই গো আপ, ইউ গো ডাউন'
বেশিরভাগ লোকও ওরকমই হিন্দি বলবে। লাস্টে একটা হ্যায় লাগিয়ে দেবে।

"এই উক্তিটি, যাকে বাংলায় বলে সুইপিং রিমার্ক। হয়তো আপনার ব্যক্তিগত মত।"
আমি বহু হিন্দি ভাষী (বা বলা ভালো হিন্দি বলতে পারে) জনগনের সঙ্গে মিশেছি। তারা কখনও কেউ নিজেদের সাহিত্য নিয়ে কোনও কথা বলেনি। কিন্তু বাংলা সাহিত্য নিয়ে তাদের খুব উৎসাহ দেখেছি। ফেলুদার ইংরেজি বই কিনে পড়ছে। যখন বললাম যে বাংলাটা শিখে নিলে তো আরো মজা পাবি, সে কথাটা মেনে নিলো। হ্যাঁ, একেবারেই ব্যক্তিগত অবজারভেশন।

"এখনও পর্যন্ত এই খেলার বয়স সত্তর বছর।"
৭০ বছরেও হলোনা। আর কি হবে? আর এই খেলা তো অ্যাঙ্গলোরা কয়েকশ বছর ধরে ইংরেজী নিয়ে খেললো। এখন যখন দেখে ইন্ডিয়া, চীনের একটা বিশাল অংশ তাদের ভাষা বলেই সারা দুনিয়াতে কাজ করছে, তখন অ্যাকসেন্ট, ডিকশান ইত্যাদি হাবিজাবি নিয়ে কাঁদতে বসেছে। গ্লোবালাইজেশন নিয়েও একই অবস্থা। ভেবেছিলো এই খেলায় চিরকাল ওরাই জিতবে, আর আমরা হারবো। একদিন আমরাও যে খেলাটা শিখে ফেলবো, সেটাই বোঝেনি।

হিন্দি আগ্রাসনের বিরোধিতা জরুরী। কিন্তু যাদের দ্বারা ফাঁকা জায়্গায় দুটো বোমা ফেলা হয়্না, তারা দেশের সকলকে হিন্দি শেখাবে? তাছাড়া মোদির ক্যাবিনেটের সিংহভাগ (মোদি-শাহ ইনক্লুডেড) অহিন্দিভাষী। তারা হিন্দিটা ভালো বলতে পারে, এটা ঘটনা।
Avatar: শিবাংশু

Re: হেইল হিন্দি

@Ishan,

'এটা হতেই পারে। সেটা নিয়ে বলা দরকার।'

অন্য জায়গার কথা বলতে পারিনা, তবে আমার শৈশব থেকে বিহারে দেখেছি বাংলাভাষীদের উপর হিন্দি 'চাপিয়ে দেওয়া' নিয়ে আমার বাবার আগের প্রজন্ম থেকেই মানুষ সচেতন ছিলেন। সভাসমিতি, জনসংযোগ, মন্ত্রীসান্ত্রী, গণমাধ্যম সর্বত্রই ব্যাপারটা নিয়ে যথাসম্ভব মানুষকে সরব হতে দেখেছি। কিন্তু যাঁরা সক্রিয় হলে কোনও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হতে পারে, মানে সেই রাজনৈতিক ক্ষমতাধারীরা মৌখিক আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত সব প্রতিবাদের গল্প স্নেহভরে কার্পেটের নীচে চালান করে দিতেন। আর কীভাবে মানুষ বলতে পারে এই ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়? কী করতে পারে। আধ শতক ধরে যুদ্ধটা কাছ থেকে দেখেছি।

এই ব্যর্থতার কারণটাও আমরা জানি। যে আপওয়র্ডলি মোবাইল মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ব্যাপারটার নেতৃত্ব দিতো, তারা নিজেদের সন্তানদের জন্য ইংরেজি মিশনারি ইশকুলের স্বাচ্ছন্দ্যে নির্ভর ছিলো। ভাড়াটে সৈন্যদের দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায়না।

@S,
'হিন্দি আগ্রাসনের বিরোধিতা জরুরী'

পূর্ণত সহমত। কিন্তু কে করবে? কী করবে?
Avatar: S

Re: হেইল হিন্দি

আমার মনে হচ্ছে এগুলো অন্য কিছু থেকে চোখ সড়ানোর একটা প্লয় মাত্র। অর্থনীতি।
Avatar: রঞ্জন

Re: হেইল হিন্দি

এস,
"আমার মনে হচ্ছে এগুলো অন্য কিছু থেকে চোখ সড়ানোর একটা প্লয় মাত্র। অর্থনীতি।'"
--- উঁহু, শুধু অর্থনীতি হলে লড়াইটা সহজ হত । এরা অনেক বড় এজেন্ডা নিয়ে এগোচ্ছে।
হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান।
সাভারকর ১৯২৩ সালেই ওঁর হিন্দুত্ব থিসিসে স্পষ্ট করেছেন যে হিন্দু একটি স্বতন্ত্র 'নেশন'। তার রয়েছে নির্দিষ্ট বাসভূমি অর্থাৎ 'পিতৃভূ' বা ফাদারল্যান্ড এবং সেটাই' 'পূণ্যভু' বা হোলিল্যান্ড। ঘটনাচক্রে যাদের পিতৃভু এবং পূণ্যভূ এক, তাদের আনুগত্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয় না । হিন্দু।
ক্রিশ্চিয়ান বা মুসলমানদের ( ভারতবাসী এবং দেশপ্রেমিক হলেও) পিতৃভু (ভারত) এবং পূণ্যভু ( মক্কা বা রোম) আলাদা। ফলে ডিভাইডেড আনুগত্য এবং দেশের জন্যে বিপদ।
এই যথেষ্ট নয় , চাই কমন ভাষা--আদিতে সংস্কৃত, বর্তমানে তার প্রতিনিধি খড়িবোলি হিন্দি! ( সাভারকর এবং গোলওয়াল্কর যা বলেছেন)।
এটা নইয়ে আলাদা করে লিখব-- মনুস্মৃতি মিলিয়ে। কী দিনকাল আসছে তার কিছু আন্দাজ পাবেন। আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া , ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি --এসব আউট অফ ডেট হয়ে যাচ্ছে। ভারতের ন্যারেটিভ বদলে যাচ্ছে।
Avatar: S

Re: হেইল হিন্দি

ব্যাপারটা অতো সোজা নয়। মুসলমানদের গায়ে হাত পড়লে মিডল ইস্টের তেল আমদানি করতে বেগ পেতে হবে। ক্রিস্চানদের স্বার্থে হাত পড়লে আম্রিগা থেকে ইয়োরোপ নড়ে চড়ে বসবে। এই নিয়ে ওবামা শেষ ইন্ডিয়া ট্যুরের শেষ দিন মোদি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে গেছিলো। আর চীনও ভারতের ডেমোক্র্যাসি নিয়ে হাসাহাসি শুরু করবে। মোদি রিডিকিউল্ড হবে দুনিয়া জুড়ে। লোকে অলরেডি মোদি আর তার ভক্তবৃন্দদের ভালই চিনে ফেলেছে।
Avatar: de

Re: হেইল হিন্দি

হিন্দুদের হোলিল্যান্ড তো অজস্র - মানে ওই ভ্যাটিক্যান বা মক্কা বা জেরুসালেম বলে একটা তো কিছু নেই - তাহলে?
Avatar: রঞ্জন

Re: হেইল হিন্দি

@দে,
সাভারকর যখন লিখেছিলেন ১৯২৩ শে, তখন সিন্ধুনদ এবং তার অববাহিকা সব ভারতের মধ্যেই ছিল। তাই ওঁর যুক্তি হল বেদে সপ্তসিন্ধু আছে , প্রাকৃতে সেটাই স থেকে হ উচ্চারণে হিন্দু হল। এবং জেন্দা আবেস্তা ও পারশিয়ান সাহিত্যে হিন্দ হিন্দু উল্লেখ আছে । কাজেই সিন্ধু নদের এপারে আর্যরা এসে যা স্থাপন করলেন তাই সিন্ধু সভ্যতা। এবং সিন্ধুর এপার থেকে দক্ষিণে শ্রীলংকা পর্যন্ত সব হিন্দুস্থান। এবং সমস্ত পুণ্য তীর্থ ও স্থান এই বিশাল এলাকায় আছে । অতুএব গোটাটাই পূণ্যভূমি।
এজন্যেই আজও সঙ্ঘের ম্যাপে আফগানিস্থান শ্রীলংকা এবং ব্রহ্মদেশ সব গেরুয়া দেখানো হয় । স্বপ্ন দেখায় একদিন গোটাটাই পুনরুদ্ধার হয়ে হিন্দুস্থান হবে।
মজার ব্যাপার হল সাভারকর মানেন আর্যরা বাঈরে ঠেকে এসেছে। কিন্তু বর্তমান সংঘ পরিবার বলে আর্যরা এখান থেকে বাঈরে গেছে। শুধু মুসলমান ও ইংরেজ বহিরাগত।

যাকগে, টই বেলাইন করবো না ।
মনুস্মৃতির মূল কথা গুলো নিয়ে শ্লোক কোট করে আলাদা টই করা যাবে খন।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 17 -- 36


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন