বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ক্লিশিতে শান্ত দিন (কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি) - পর্ব - ২

হেনরি মিলার :: ভাষান্তর : অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

রাস্তা পেরুতে পেরুতে ও বলল আমার মতো একজনকে পেয়ে ও কতটা খুশি হয়েছে। প্যারিসে ও কাউকেই চেনে না, একাকি মনমরা হয়ে থাকে। যদি আমি তাকে আশেপাশে কোথাও নিয়ে যাই, শহরটা ঘুরে দেখাই? একজন বিদেশি আগন্তুকের পক্ষে এটা খুব মজার হবে এমন কাউকে এই শহরটা ঘুরে দেখানো, যেটা তার নিজের দেশের রাজধানী। আমি কি কখনও অ্যাঁবোয়ায় ১০ গেছি, কিংবা ব্লোআতে ১১ অথবা তুরে ১২ ? হয়তো কোনওদিন আমরা একসাথে বেড়াতে যাব।

আমরা পাশাপাশি হাঁটছি, এটাসেটা গল্প করতে করতে, যতক্ষণ না একটা হোটেলের সামনে এসে পৌঁছলাম যেটা ওর চেনা মনে হল। ‘‘এটা বেশ পরিষ্কার আর আরামের,’’ ও বলল। ‘‘আর একটু ঠান্ডাও। আমরা বিছানায় দুজন দুজনকে গরম করব।’’ 

বলে আমার বাহু চেপে ধরল অনুরাগে।

ঘরটা একটা পাখির বাসার মতোই উষ্ণ। আমি সাবান আর তোয়ালের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম, কাজের লোকটিকে বকশিশ দিলাম এবং দরজা বন্ধ করে দিলাম। টুপি আর ফারের জামাটা খুলে ও জানলার সামনে দাঁড়িয়ে রইল আমাকে জড়িয়ে ধরার জন্য। কী গরম আর সুরোপিত এই শরীর, মাংস! আমি ভেবেছিলাম আমার স্পর্শের নীচে ও অঙ্কুরিত বীজ হয়ে ছড়িয়ে পড়বে প্রবল প্রকাশে। অল্প কিছুক্ষণ বাদেই আমরা জামাকাপড় খুলতে শুরু করলাম।

জুতোর ফিতে খোলার জন্য আমি বিছানার কোণটায় বসলাম। ও দাঁড়িয়েছিল আমার পাশে। নিজেরগুলো খুলছিল। যখন আমি তাকালাম, দেখি পায়ের মোজা ছাড়া আর কিছু নেই সারা গায়ে। ও দাঁড়িয়েই রইল ওখানে, আমার অপেক্ষায়, যাতে আরও মন দিয়ে ওকে দেখি।

আমি উঠে দাঁড়ালাম আর আবার দু’ বাহুতে জড়ালাম ওকে। ওর তরঙ্গক্ষুব্ধ মাংসল ভাঁজে আমার হাত ঘুরতে থাকল। তখনই আলিঙ্গন সরিয়ে, আমাকে এক-হাত দূরত্বে রেখে লজ্জাবনত মুখে জানতে চাইল, আমি কোনওভাবে ঠকে গেলাম কিনা।

‘‘ঠকে গেলাম,’’ ফিরতি প্রশ্নে বললাম ওকে। ‘‘মানে কী এর?’’   

‘‘আমি খুব মোটা, না?’’ বলে, চোখ নামিয়ে নিজের নাভির ওপর রাখল।

‘‘মোটা? কেন, তুমি তো চমৎকার দেখতে। রেনোয়ার ১৩ ছবির মতো।’’

লাল হয়ে গেল শুনে। ‘‘রেনোয়া?’’ আবার জিগ্যেস করল, যেন এই নামটা আগে কখনও শোনেইনি। ‘‘নাহ্‌, তুমি মজা করছ।’’

‘‘আরে, ছাড়ো তো। এসো, তোমার নীচে একটু হাত বোলাই।’’

‘‘দাঁড়াও, আমি টয়লেট করব আগে।’’ জলশৌচের বেসিনের দিকে যেতে যেতে বলে গেল : ‘‘তুমি বিছানায় চলে যাও। ভালো করে গরম করে রাখো, কেমন?’’ 

আমি ঝটপট জামাকাপড় খুলে বাঁড়াটা ধুয়ে নিলাম এবং ঝাঁপিয়ে ঢুকে গেলাম বিছানায় চাদরের ভেতর। বেসিনটা ছিল বিছানার পাশেই। ধোয়াধোয়ি শেষ করে একটা পাতলা, ন্যাতানো তোয়ালে দিয়ে ও মুছতে শুরু করল। আমি সামনে ঝুঁকে ওর যোনিকেশগুলো খামচে ধরতে গেলাম, যেগুলো তখনও অল্প শিশিরসিক্ত। ও ঠেলে আমায় বিছানায় ফেলে দিল, ঝুঁকে এল আমার ওপরে, তারপর গরম আর লাল মুখগহ্বর নিয়ে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওর নিঃসৃত সব রসগুলো পেতে সুড়ুৎ করে একটা আঙুল ঢুকিয়ে দিলাম ভেতরে। তারপর, ওকে আমার ওপর টেনে তুলে আনলাম, আর আমূল পর্যন্ত সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দিলাম ওটা। এ ছিল সেইসব যোনির মধ্যে অন্যতম যেখানে একটা দস্তানা মাপমতো বসে যায়। ওর পেশির দক্ষ সংকোচন আমায় জলদি হাঁপ ধরিয়ে দিচ্ছিল। পুরো সময়টা ও আমার ঘাড়, বগল, কানের লতি চেটে গেল। আমি দু হাতে ওকে ওপর-নীচ করাচ্ছিলাম, আর ওর পেলভিস ধরে ঘোরাচ্ছিলাম গোল গোল। শেষে, একটা গোঙানি ছেড়ে আমার ওপর পূর্ণ ভর রেখে ঢুকে গেল। আমি ওকে ঘুরিয়ে উঠে গেলাম ওর ওপরে, পা দুটো টেনে নিলাম আমার কাঁধে, আর জোরে চালিয়ে গেলাম।           

আমি ভেবেছিলাম আমার এই নির্গমন যেন শেষই হবে না, বাগানের হোসপাইপের মতো যা বেরিয়ে এল একাগ্র ধারায়।

যখন বের করে আনলাম আমার মনে হল, যখন ঢুকিয়েছিলাম তার চেয়ে বেশি খাড়া হয়ে আছে।

‘‘এটা তো দারুণ,’’ বলে, ওটার ওপর হাত রাখল, আঙুল দিয়ে মাপতে থাকল।  

‘‘কীভাবে করতে হয় জানো তো, জানো না?’’

 

আমরা উঠে পড়লাম, ধুয়ে নিলাম এবং হামাগুড়ি দিয়ে বিছানায় ফিরে এলাম আবার। কনুইতে ভর রেখে হেলান দিয়ে শুয়ে আমার একটা হাত ওর শরীরে ওপর-নীচে ঘোরাচ্ছিলাম। ফিরে এসে শোওয়ার পর ওর চোখ জুড়ে ছিল সুখানুভব, এক সর্বাঙ্গীণ আরাম, পা দুটো ছিল ফাঁক করা, অল্প শিরশির করছিল ওর গা। বেশ ক’মিনিট আমরা কোনও কথা বলিনি। আমি ওর জন্য একটা সিগারেট ধরিয়ে ওর মুখে দিলাম, বিছানায় শুয়ে পরিতৃপ্ত চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম সিলিংয়ের দিকে। 

‘‘আমরা কি আরও করতে পারি?’’ কিছুক্ষণ বাদে আমি জিগ্যেস করলাম।

সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ও বলল, ‘‘সেটা তোমার ওপর।’’ তারপর, সিগারেটটা ফেলার জন্য পাশ ফিরল, কাছে এসে, স্থিরদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে, অল্প হাসল, কিন্তু গম্ভীর চিন্তাশীল মুখে, ওর নীচু গলায় শিস দেওয়া স্বরে বলল : ‘‘শোনো, খুব জরুরি একটা জিনিস তোমাকে আমার বলা দরকার।

তোমার কাছে একটা বড় অনুগ্রহ চাইছি...

আমি একটা সমস্যায় পড়েছি, ভীষণই সমস্যায়। যদি বলি, তুমি সাহায্য করবে আমাকে?’’

‘‘নিশ্চয়ই,’’ আমি বললাম, ‘‘কিন্তু কীভাবে?’’  

‘‘টাকা দিয়ে,’’ ও বলল, শান্ত এবং সহজভাবে। ‘‘অনেকগুলো টাকা আমার দরকার... ভীষণ দরকার।

আমি ঠিক বোঝাতে পারব না কেন। বিশ্বাস করো আমায়, করবে?’’

আমি ঝুঁকে চেয়ার থেকে প্যান্টটা টানলাম। টাকাকড়ি আর খুচরো যা ছিল পকেটে, বের করে ওর হাতে দিলাম।

‘‘যা আছে সবটাই দিলাম তোমাকে,’’ আমি বললাম। ‘‘এটুকুই পারি।’’

ওর পাশের নাইট টেবিলে ও টাকাটা রাখল, সেদিকে না তাকিয়েই এবং ঝুঁকে এসে আমার কপালে একটা চুমু খেল, বলল, ‘‘তুমি খুব ভালো।’’ তারপরও ঝুঁকেই রইল আমার ওপর, আমার চোখের দিকে নির্বাক, চাপা কৃতজ্ঞতায় তাকিয়ে, আমার ঠোঁটে চুমু খেল, খুব আবেগপ্রবণভাবে নয়, কিন্তু ধীরে, অনেকটা সময় ধরে, যেন আবেগটা প্রকাশ করার জন্য যা ও শব্দে প্রতিস্থাপন করতে পারছে না, সেটাই তার শরীর দিয়ে প্রকাশ করতে সে বড় নিপুণ।

‘‘এখন আর আমি থাকতে পারব না,’’ বলে, পেছনে বালিশের ওপর শুয়ে পড়ল। ‘‘যেতে হবে।’’

তারপর, অল্প বিরতির পর, বলল, ‘‘কী অদ্ভুত না, কারুর নিজের লোকের চেয়ে অচেনা মানুষই বেশি সদয় হয়। তোমরা আমেরিকানরা খুব দয়ালু, নম্র। তোমাদের কাছ থেকে আমাদের অনেক শেখার আছে।’’   

এটা আমার কাছে বহু পুরনো গান, নিজের ওপরেই কতকটা লজ্জা হচ্ছে আবার একজন উদার আমেরিকান হয়ে দাঁড়াতে। ওকে বোঝালাম যে আমার পকেটে এত টাকা থাকাটা নেহাতই একটা বিরল ব্যাপার। এর উত্তরে ও বলল আমার ব্যবহার নাকি অত্যন্ত চমৎকার। ‘‘একজন ফরাসি পুরুষ হলে লুকিয়ে রাখত,’’ ও বলল। ‘‘শুধুমাত্র মেয়েটার দরকার আছে বলে প্রথম পরিচয়েই একটা মেয়েকে এই টাকাটা সে দিত না। প্রথম দেখাতেই মেয়েটাকে সে বিশ্বাস করত না। ‘এসব গপ্পো আমার ঢের জানা আছে,’ এটাই হয়তো সে বলত।’’

আমি কিছু বললাম না। এটা সত্যি আবার সত্যি নয়ও। জগতে সবরকমের মানুষই রয়েছে, এবং যদিও তখনও অবধি আমি একজনও উদার ফরাসির দেখা পাইনি, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তারা আছে। যদি আমি ওকে বলি আমার নিজের বন্ধুরা, আমার স্বদেশীয়রা কতটা অনুদার ও হয়তো কখনও বিশ্বাসই করবে না আমার কথা। এবং এর সাথে যদি আমি বলি যে, যা আমায় প্রণোদিত করল তা কোনও উদারতা বা মহত্ত্ব নয়, বরং  নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য নিজেকেই করুণা করা (কারণ কেউ আমার কাছে ততটা মহৎ হতে পারে না যতটা আমি নিজের কাছে নিজে), তাহলে ও হয়তো আমাকে একটু পাগলাটেই ভাববে।

ওর গা ঘেঁষে আমি ওপরে উঠে এলাম আর ওর বুকে মাথা ডুবিয়ে দিলাম। নীচে নামতে নামতে চাটতে থাকলাম ওর নাভি। তারপর আরও নীচে, চুমু খেতে লাগলাম ওর একঝোপ ঘন লোমে। ও ধীরে আমার মাথা টেনে ধরল আর আমাকে টেনে নিল ওর ওপরে, জিভ ঢুকিয়ে দিল আমার মুখে। আমার বাঁড়া শক্ত হয়ে গেল মুহূর্তে; মসৃণভাবে ওর ভেতরে ঢুকে গেল ততটাই স্বাভাবিকতায় যেভাবে একটা ইঞ্জিন তার গতি নেয়। এটা সেই লম্বা, দীর্ঘস্থায়ী শক্ত জিনিসটা যা একজন মহিলাকে পাগল করে দিতে পারে। ইচ্ছে করেই ওকে টেনে আনলাম একপাশে, তারপর ওপরে, ওর নীচে, পাশাপাশি, তারপর ওটাকে টেনে আনলাম ধীরে, ওকে আরও অপেক্ষায় রেখে আমার উদ্ধত দাঁড়িয়ে থাকা বাঁড়ার মুখ দিয়ে বোলাতে লাগলাম ওর যোনিদ্বারের ঠোঁট। তারপর সর্বতোভাবেই ওটাকে সরিয়ে এনে দ্রুত ঘোরাতে লাগলাম ওর স্তনে। ও অবাক হয়ে তাকাল ওটার দিকে। বলল, ‘‘তোমার কি বেরিয়ে গেছে?’’ ‘‘না,’’ আমি বললাম। ‘‘আমরা একটু অন্যরকম কিছু করতে যাচ্ছি।’’ ঠিকঠাক এবং সার্বিক পায়ুমৈথুনের জন্য আমি ওকে টেনে বিছানার প্রান্তে জায়গা মতো নিয়ে এলাম। ঊরুসন্ধিতে ভর রেখে ও এল এবং  আমার জন্য ঠিক জায়গায় রেখে, যেন আমন্ত্রণসূচক ভাবে দু পাশে দোলাতে লাগল ওর পাছা। সবলে ওর কোমরের দু পাশে ধরে আমি একেবারে সোজা ভেতরে ঢুকিয়ে দিলাম।

ও ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে ‘‘ওহ্‌, ওহ্‌’’ করছিল, আর উন্মত্ত বন্যতায় পাছা ঘোরাচ্ছিল। একটু হাওয়া লাগাতে আমি আবার বের করে আনলাম ওটা, আর বেশ রগুড়ে মেজাজে ওর পেছনে ঘষতে লাগলাম। ‘‘না, না’’ করে ও অনুনয় করতে থাকল, ‘‘দেরি কোরো না, ঢোকাও ওটা, সোজা ঢুকিয়ে দাও... আর পারছি না।’’  আবার ও জায়গা মতো এল আর আমার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে এবারে আরও ঝুঁকে গেল। ওপরের দিকে এমন ঠেলতে লাগল যেন ঝাড়বাতি ধরার একটা ফাঁদ। মেরুদাঁড়ার মাঝখান থেকে আমি টের পাচ্ছিলাম আবার বেরুবে আমার; হাঁটু দুটো অল্প নীচু করলাম আমি আর আরেকটা খাঁজকাটা গর্তে ঠেলে ঢুকিয়ে দিলাম। তারপর বুম! একটা উড়ন্ত তুবড়ির মতো প্রবল প্রকাশ হল।

একটা ইউরিনালের সামনে রাস্তায় যখন আমরা আলাদা হয়ে গেলাম তখন ডিনারের সময় হয়ে গেছে। ওর সাথে পুনর্সাক্ষাতের নির্দিষ্ট কোনও দিন আমি স্থির করিনি, ওর ঠিকানাও জানতে চাইনি। না বললেও এটা বোঝা যায় যে ওকে পেতে হলে কাফেতেই পাওয়া যাবে। ঠিক যখন আমরা একে অপরকে ছেড়ে যাচ্ছি তখনই হঠাৎ আমার মনে এল যে আমি তো ওর নামটাও জিগ্যেস করিনি। পেছন থেকে ওকে ডাকলাম আর ওর নাম জিগ্যেস করলাম। পুরো নাম হয়, শুধু নামটুকু। ‘‘এন – ওয়াই – এস,’’ ও বলল, একেবারে বানান করে। ‘‘নিস শহরের মতো।’’ বারবার নামটা নিজেকে বলতে বলতে আমি হাঁটতে থাকলাম। কোনও মেয়ের এরকম নাম আমি কখনও শুনিনি। শুনে মনে হয় একটা দামি পাথরের নাম।  

ক্লিশিতে পৌঁছে বুঝতে পারলাম আমি ভয়াবহ ক্ষুধার্ত। ক্লিশি অ্যাভেন্যুতে একটা মাছের রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে দোকানের বাইরে টাঙানো মেনুগুলো দেখছিলাম। মনে হল ক্ল্যাম, লবস্টার, অয়স্টার, স্নেইল, একটা ব্রয়েল্ড ব্লুফিশ, টম্যাটো অমলেট, অ্যাসপারাগাসের একটু পাতলা চমৎকার চাটনি, ভালো চীজ, একটা রুটি, আর এক বোতল ওয়াইন খেলে ভালো হয়। আমি পকেটে হাত দিলাম, কোনও রেস্তোরাঁয় ঢোকার আগে যা আমি সবসময়েই করে থাকি। আর একটা মাত্র স্যু ১৪ খুঁজে পেলাম। ‘‘ধ্যাৎ,’’ নিজেকেই বললাম, ‘‘মেয়েটা আমার জন্য কিছু ফ্রাঙ্ক অন্তত রেখে যেতে পারত।’’    

ঘরে, মিটসেফে কিছু খাবার আছে কিনা দেখতে আমি জোর কদমে হাঁটা দিলাম। ক্লিশিতে আমরা যেখানে থাকতাম, গেট পার হয়ে সেটা মোটামুটি আধ ঘন্টার হাঁটা পথ। কার্ল নিশ্চয়ই এতক্ষণে ডিনার সেরে ফেলেছে, তবু রুটির টুকরো-টাকরা কিছু আর টেবিলে দাঁড় করানো অল্প ওয়াইন হয়তো পেয়ে যাব। আমি জোরে আরও জোরে হাঁটতে থাকলাম, আমার খিদেও বাড়তে থাকল প্রত্যেক কদমে কদমে।

যখন আমি রান্নাঘরে হামলে পড়লাম দেখি যে কার্ল তখনও খায়নি। সবজায়গায় খুঁজলাম আমি, কিন্তু একটু খুদকুঁড়োও পেলাম না। একটা খালি বোতলও কোথাও নেই যেটা দিয়ে আমি কিছু টাকা পেতে পারি। আমি ক্ষেপে গেলাম একেবারে। ছুটে বেরুলাম, ঠিক করলাম ক্লিশির কাছের ছোট রেস্তোরাঁটায়, যেখানে মাঝামাঝেই খাই, ওখানে ধার চাইব। রেস্তোরাঁর ঠিক সামনে পৌঁছে আমি আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। ফিরে এলাম। দুম করে যদি চেনা কারুর সাথে দেখা হয়ে যাবার মতো মিরাকল কিছু ঘটে এই আশায় এদিক সেদিক ঘুরতে লাগলাম। এইভাবে অন্তত একঘন্টা গোঁত্তা মেরেছি, যতক্ষণ না একেবারে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়াটাই মনস্থ করলাম। রাস্তায়, আমার এক রাশিয়ান বন্ধুর কথা মন পড়ল, বুলেভার ছাড়িয়ে এখান থেকে কাছেই থাকে।

ওর সাথে শেষ দেখা হয়েছে তাও বেশ ক বছর হয়ে গেল। এ্যাদ্দিন বাদে গিয়ে কীভাবে টাকা ধার চাওয়া যায়?

তখুনই একটা দারুণ বুদ্ধি এল মাথায় : আমি ঘরে যাব, রেকর্ডগুলো নিয়ে আসব, ওর হাতে দেব। যেন একটা ছোট্ট উপহার। এভাবে করলে, কিছু কথাবার্তা উপক্রমণিকার পর, একটা স্যান্ডউইচ বা একটা কেকের কথা বলাটা সহজ। আমি হাঁটায় জোর লাগালাম, যদিও কুকুরের মতো ক্লান্ত, ঠ্যাং খুঁড়িয়ে চলেছি।  

বাড়ি ফিরে যখন দেখলাম প্রায় মাঝরাত হয়ে গেছে, আমি একেবারে গুঁড়িয়ে গেলাম। এত রাতে খোরাক খুঁজতে আবার বেরুনোর কোনও মানে হয় না। বরং শুয়েই পড়া যাক, আশা করা যাক সকালে কিছু একটা হবে। জামাকাপড় খুলতে খুলতে আরেকটা আইডিয়া এল, এবারে যদিও তেমন দারুণ কিছু নয়, কিন্তু তবু তো... সিঙ্কের কাছে গিয়ে আবর্জনা ফেলার বাক্সটা বের করলাম, ঢাকনাটা সরিয়ে ভেতরে তাকালাম। কয়েকটা হাড়গোড় আর পাঁউরুটির শক্ত দিকগুলো একেবারে নীচে পড়ে আছে। দেখে দেখে শুকনো টুকরোগুলো তুলে আনলাম, গায়ে লেগে থাকা নোংরাগুলো যতটা পারা যায় ঝেরে ট্যাপের জলে একটু ধুয়ে নিলাম। তারপর আস্তে কামড় বসিয়ে প্রত্যেকটা টুকরো থেকে যতটা বেশি করে সম্ভব রুটির অংশগুলো খেলাম। গিলে ফেলতেই একটা হাসি আমার মুখে ছড়িয়ে পড়ল। ক্রমশ সেটা বড় হল, আরও বড়। ভাবলাম, কালকে দোকানে গিয়ে বইগুলো হাফ দামে বেচে দেব। বা তিন ভাগ দামে, বা চার ভাগ। রেকর্ডগুলোও তা-ই করব। কম করে অন্তত দশ ফ্রাঙ্ক আনতে পারব। পেটভরে ভালো একটা ব্রেকফাস্ট হবে, তারপর... হ্যাঁ, তারপর যেকোনও কিছুই হতে পারে। সে না হয় দেখা যাবে। ভরপেট খেয়ে ওঠার মতো আমি আরও একটু হেসে নিলাম। দারুণ এক কৌতুক বোধ করছিলাম এটা ভেবে যে, নিস নিশ্চয়ই একেবারে গলা অবধি খাওয়াদাওয়া সেরেছে আজকে। হয়তো প্রেমিকের সাথেই। এ নিয়ে আমার সন্দেহের কোনও অবকাশই ছিল না যে ওর একজন প্রেমিক আছে। কীভাবে তার খাবার জোটাবে, কীভাবে তাকে কাপড়জামা বা যা সে চায় সেসব কিনে দেবে, নিঃসন্দেহে এটাই নিসের বিরাট সমস্যার জায়গা, তার উভয়-সঙ্কট। সে যাক্‌গে, লাগানোটা খাসা হয়েছে, যদিও আমি নিজেই চুদে গেছি পকেট ফাঁকা করে।

আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, ওর অর্ডার করা চিকেন থেকে লেগে যাওয়া সস মুছতে নিজের টসটসে ঠোঁটের দিকে ও রুমাল নিয়ে আসছে। কীভাবে ওয়াইনের ভেতর ওর স্বাদ ঘুরে বেড়াচ্ছিল দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম আমি। ইশ, যদি আমরা তুরিন যেতে পারতাম! কিন্তু তার জন্য তো প্রচুর টাকার দরকার। অত টাকা আমার কখনও হয়নি। কোনওদিনও না।

তবে একইভাবে, এ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে কোনও ক্ষতি নেই। আরেক গ্লাস জল খেলাম। গ্লাসটা রাখতে গিয়ে কাবার্ডের কোণায় চোখে পড়ল একটুকরো রকফোর্ত। ১৫   রুটির আরও একটা টুকরোও যদি ওখানে থাকত! নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি কোনও জায়গাই খুঁজতে বাকি রাখিনি, নোংরার বাক্সটা আবার খুললাম। ছ্যাতলা পড়া চর্বির থকথকে তরল গাদের ওপরে কয়েকটা হাড়ের টুকরো আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি আরেক টুকরো রুটি চাই এবং ভীষণভাবে চাই। আচ্ছা, পাশের ভাড়াটের ঘর থেকেও তো আমি একটা বড় রুটি পেতে পারি। বাইরের ঘরের দরজা খুলে আমি গোড়ালি উঁচু করে পা টিপে টিপে গেলাম। কবরখানার নিস্তব্ধতা বইছে সেখানে।

একটা দরজায় আমি কান পেতে শুনলাম।

একটা বাচ্চা খুব চাপা স্বরে কাশছে। প্রশ্নই ওঠে না। যদি কেউ জেগেও থাকে তাও সম্ভব না। অন্তত ফ্রান্সে তো নয়।

কে কবে শুনেছে একজন ফরাসি ভদ্রলোক রাতদুপুরে তার প্রতিবেশীর দরজায় টোকা দিচ্ছে, কী না, একটুকরো রুটির জন্য? ‘‘ধুর!’’ গজগজ করতে করতে বললাম, ‘‘শালা নোংরার ডাব্বায় ফেলে দেয়া আমাদের রুটিগুলোর কথা ভেবেই খারাপ লাগছে।’’ রকফোর্তের টুকরোটায় অনেক কষ্টে নিদারুণভাবে আমি কামড় দিলাম। অনেকদিনের পুরনো এটা, টোকে গেছে একেবারে; পেচ্ছাপে ভেজা পলেস্তারার মতো, কামড়াতে গেলেই ঝুরঝুর করে ভেঙে যাচ্ছে। শালা ওই নিস মাগীটা! ঠিকানা জানলে আমি গিয়ে কিছু ফ্রাঙ্ক নিয়ে আসতাম হাত পেতে।

নির্ঘাৎ আমি একেবারে অন্যমনস্ক ছিলাম যে কিছু খুচরো রাখার কথাও মাথায় আসেনি। বেশ্যাকে টাকা দেওয়া মানে নর্দমায় টাকা ফেলে দেওয়ার মতো ব্যাপার। আহারে, তার বিরাট প্রয়োজন! আরও একটা শেমিজ, বা হয়তো রাস্তায় যেতে যেতে দোকানে টাঙানো দেখেছে খাঁটি সিল্কের একজোড়া ফুলমোজা।

নিজের ওপরেই রাগে কাঁপতে থাকলাম। কারণ একটাই, বাড়িতে রুটির একটা বাড়তি টুকরো অবধি নেই।

গাধা! একেবারে গাধা! ঘোরের মধ্যে আমি মল্টেড মিল্ক শেক নিয়ে কথা বলতে শুরু করলাম, আমেরিকায় কী সুন্দর বাড়তি একগ্লাস মল্টেড দুধ সবসময়েই শেকারে অপেক্ষা করে থাকে। টইটম্বুর ওই একটা গ্লাসের জন্য বড় কষ্ট হচ্ছে। আমেরিকায় প্রয়োজনের থেকে বেশিটাই সবসময় থাকে, কম কখনও নয়। জামাটা সরালে আমার পাঁজরের হাড়গুলো আমি টের পাই। অ্যাকর্ডিয়ানের রিডের মতো উঁচু হয়ে আছে। নিস, শালা ওই থলথলে কুত্তীটা নিশ্চয়ই কখনও অপুষ্টিতে ভোগেনি।

আরেকবার দূর ছাই বলে শুয়ে পড়লাম।

এবারে কোনওমতে নিজেকে চাদরমুড়ি দিতে হল যখন আবার আমি হো হো করে হাসতে শুরু করেছি। এইবারের হাসিটা ভয়ঙ্কর ছিল।

আমি এমন হিস্টিরিয়া রুগির মতো হাসছিলাম যে থামতেও পারছিলাম না। যেন হাজারখানা রোমান মোমবাতি এক ঝটকায় নিবে গেল। আমি যা-ই চিন্তা করি না কেন, দুঃখের ঘটনাও মনে করতে চেষ্টা করলাম, এমনকী ভয়ানক কিছুও, হাসি চলতেই থাকল। শুধুমাত্র রুটির একটা ছোট্ট টুকরোর কারণে। ওই একটা শব্দ যা আপনা আপনিই একটু বাদে বাদে ফিরে ফিরে আসছিল আর আমাকে নতুন করে হাসির দমকে ফেলছিল।  

মোটামুটি একঘন্টা মতো শুয়েছি বোধহয়, যখন শব্দ পেলাম কার্ল দরজা খুলছে। ঢুকেই ও সোজা নিজের ঘরে চলে গেল আর দরজা বন্ধ করে দিল। আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল ওকে গিয়ে বলি যে, যাও আমার জন্য একটা স্যান্ডউইচ আর এক বোতল ওয়াইন নিয়ে এসো। তারপরেই মাথায় একটা ভালো বুদ্ধি এল। আমি একটু সকাল সকাল উঠে পড়ব, যখন ও নাক ডেকে ঘুমুবে, তখন চুপ করে ওর পকেট হাতিয়ে নেব। এটা ভাবতে ভাবতেই শুনতে পেলাম কার্ল ওর ঘরের দরজা খুলে বাথরুমে চলে গেল। মুখ চেপে হাসছে আর ফিসফিস করছে — কোনও একটা মেয়ের সাথে, খুব সম্ভব, ফেরার পথে যাকে ও নিয়ে এসছে।

বাথরুম থেকে বেরুলে আমি ডাকলাম ওকে।

‘‘ওহ্‌, তুমি জেগে আছ তাহলে?’’ বেশ উৎফুল্ল হয়ে বলল।

‘‘কী ব্যাপার, শরীর খারাপ নাকি?’’  

আমি ওকে পরিষ্কারভাবেই বললাম, আমার খিদে পেয়েছে, ভয়ঙ্কর খিদে পেয়েছে। ওর কাছে কিছু খুচরো আছে কি?

‘‘পুরো সাফা হয়ে গেছি,’’ ও বলল। খুব আনন্দেই বলল, এটা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারই নয় যেন।

‘‘একটা ফ্রাঙ্কও নেই নাকি?’’ আমি জেদ ধরে রাখলাম।

‘‘আরে ও নিয়ে ভেবো না,’’ খুব জরুরি একটা গোপন খবর বলার মতো করে বিছানার কোণে বসতে বসতে বলল।

‘‘বড় একটা সমস্যায় পড়েছি। আমি একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছি সাথে করে — ঘরবাড়ি নেই মেয়েটার। বছর চোদ্দর বেশি হবে না। আমি জাস্ট একবার শুয়েছি ওর সাথে। তুমি কি শুনছ আমার কথা? মনে তো হয় প্রেগন্যান্ট হবে না।

মেয়েটা ভার্জিন।’’

‘‘মানে, ভার্জিন ছিল,’’ আমি গুঁজে দিলাম।

‘‘শোনো, জো,’’ কথাটাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে গলা নামিয়ে বলল, ‘‘ওর জন্য কিছু করাটা আমাদের কর্তব্য। ওর কোনও থাকার জায়গা নেই... বাড়ি থেকে পালিয়ে এসছে। আমি যখন ওকে খুঁজে পাই, একটা ঘোরের মধ্যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, আধপেটা খাওয়া, কেমন একটা মাথাখারাপ, প্রথমে আমার তা-ই মনে হয়েছিল। তবে তুমি চিন্তা কোরো না। ও একদম ঠিক আছে। মাথাটা খুব শার্প নয়, কিন্তু এমনিতে ভালো। ভালো বাড়ির মেয়ে মনে হয়। তুমি দেখবে... বাচ্চা একেবারে। একটু বড় হলে আমি হয়তো ওকে বিয়ে করে নেব। যাক্‌গে, পয়সাকড়ি কিছুই নেই। যা ছিল সব ওর খাবার কিনতেই খরচা করে ফেলেছি। তোমাকে না খেয়েই শুতে হচ্ছে এটা খুব বাজে হল। তুমি আমাদের সাথে থাকলে ভালো করতে..

আমরা অয়স্টার খেলাম, লবস্টার খেলাম, শ্রিম্প খেলাম। আর একটা দারুণ ওয়াইন। শাবলি... ওহ্‌...’’

‘‘ধুর বাল!’’ আমি চেঁচিয়ে বললাম। ‘‘তোমরা কী কী খেয়ে এসেছ সেসব আমাকে বলতে এসো না। আমি এখানে ভুখা পেটে মরছি।

এখন খাবারের জন্য আমাদের তিন তিনটে পেট, আর একটা টাকা নেই। একটা কানাকড়িও নেই।’’

‘‘টেক ইট ইজি, জো,’’ কার্ল হাসতে হাসতে বলল। ‘‘তুমি তো জানো, আপদ বিপদের জন্য আমি সবসময় পকেটে কিছু ফ্রাঙ্ক রেখে দি।’’ ও পকেটের ভেতরে হাত ডুবিয়ে দিল, আর সেখান থেকে বের করে আনল খুচরোগুলো। কুল্যে দাঁড়াল তিন ফ্রাঙ্ক ষাট সেন্ট। ‘‘এতে তোমার ব্রেকফাস্টটা হয়ে যাবে,’’ ও বলল। ‘‘কাল অন্য আরেকটা দিন।’’    

মেয়েটা এইসময় দরজা দিয়ে মাথা বের করল। কার্ল লাফিয়ে উঠে ওকে নিয়ে এল বিছানার কাছে। ‘‘কোলেৎ,’’ ওকে স্বাগত জানাবার জন্য আমি হাত বাড়াতেই কার্ল বলল। ‘‘তো, কী ভাবনাচিন্তা করলে ওর ব্যাপারে?’’

উত্তর দেবার জন্য আমি সময়টুকু পাবার আগেই, মেয়েটা কার্লের দিকে ঘুরে দাঁড়াল, আর প্রায় যেন আতঙ্কিত মুখে জিগ্যেস করল, আমরা কী ভাষায় কথা বলছি।


ক্রমশঃ
অন্য পর্বগুলি
পরিশিষ্ট

১১. ব্লোআ (Blois) : মধ্য ফ্রান্সের একটি শহর।     

১২. তুর (Tours) : মধ্য-পশ্চিম ফ্রান্সের ল্যোয়া-র নদীর নিম্ন অববাহিকায় অবস্থিত একটি শহর।  

১৩. রেনোয়া : পিয়ের অগুস্ত রেনোয়া (১৮৪১—১৯১৯)। ইম্প্রেশনিস্ট ধারার খ্যাতনামা  ফরাসি শিল্পী। 

১৪ . স্যু (Sou) : পূর্বতন ফরাসি মুদ্রা।    

১৫. রকফোর্ত (Roquefort) : ভেড়ার দুধ দিয়ে তৈরি একপ্রকার নীলরঙের চীজ।  



256 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ ধারাবাহিক  বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন