বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

অন্য ভোট (পর্ব ২) -- টানা রিক্সা ও তাঁহাদের কথা

মৌসুমী বিলকিস

প্রশ্নটা হল

হাতে টানা রিক্সা বন্ধ হওয়ার যাবতীয় আয়োজন পাকা। হয়তো বন্ধ হয়ে চালু হবে ই-রিক্সা। নতুন প্রজন্ম টানা রিক্সা সংক্রান্ত কোনও বিষয়ে আগ্রহী নয়। ভবিষ্যৎ না দেখতে পেলে আগ্রহী হওয়ার কথাও নয়। এই পেশার মানুষদের তাই বয়সও বেড়েছে। মূলত বিহার থেকে আসা যেসব মানুষ এই পেশায় জড়িয়ে এই শহরে কাটিয়ে দিলেন অর্ধেক জীবন তাঁদের ভবিষ্যৎ কী? আরও একটা নির্বাচন এসে গেল। কিন্তু উত্তর কি জানা?

পিছনের গল্প

বিংশ শতকের শুরু। কলকাতায় এলো টানা রিক্সা। অন্তত কিছু ঐতিহাসিক তা-ই মনে করেন। তথ্য বলে ১৯১৯ সালে ইংরেজ শাসক আইন করে হাতে টানা রিক্সা চালানোর অনুমতি দেয়। আইনসিদ্ধ হয় টানা রিক্সা। কম দূরত্বের মধ্যে চলতে থাকে। ১৯৪৭ সালে জহরলাল নেহেরু স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে টানা রিক্সা নিষিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু তা হয়নি। পরে এই রিক্সা ‘অমানবিক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়, যেহেতু মানুষ টেনে নিয়ে যায় মানুষকে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০০৫ সালে নতুন টানা রিক্সার লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করে। কলকাতায় ছ’হাজার বৈধ টানা রিক্সা আছে। অনথিভুক্ত রিক্সার সংখ্যাও কম নয়। রাজ্যের বর্তমান সরকার ছ’হাজার বৈধ টানা রিক্সার পরিবর্তে সম সংখ্যক ই-রিক্সা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। টানা রিক্সাওয়ালাদের পুনর্বাসন দেওয়া হবে বলেও সিদ্ধান্ত নেয়।

তাঁহাদের দিনযাপন

কলেজস্ট্রিট লাগোয়া বস্তিতে ছোট্ট এক ঘর। দশ, বারোজন একসঙ্গে থাকেন। দুটো বাথরুম, অন্যান্য ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে শেয়ার করতে হয়। নানারকম কায়িক শ্রমের সঙ্গে জড়িত এই মানুষেরা। বেশিরভাগ মুটে, মোট বওয়ার কাজে যুক্ত। কেউ কেউ লেবুজল বিক্রি করেন। দু’জন টানা রিক্সা চালান।

ঘরের ভেতরেই মাটির উনুন। ঘুম থেকে উঠেই চলে রান্নার তোড়জোড়। কেউ বাজার যান, কেউ মশলা বাঁটতে বসেন শিল-নোড়ায়। ভাত, ডাল, সব্জি। সপ্তাহে একদিন, রবিবার মাংস। রবিবার কাজে যাওয়ার তাড়া নেই কারও। রান্না করে, খেয়ে, ঘুমিয়ে, গল্পগুজব করে দিন গড়ায়।

ঘরে ইলেকট্রিক নেই। বাড়তি খরচ। বিদ্যুৎ বাতি নিয়েই বা কী হবে? সারাদিনের অমানুষিক পরিশ্রমের পর সন্ধ্যে হলেই ঘুমে ঢলে পড়াই নিয়তি। আলোর প্রয়োজন নেই। আলোর জীবন তাঁদের নয়। প্রবল গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে কেউ কেউ ফুটপাথেই রাত কাটিয়ে দেন।

ফুটপাথের ওপর এক ছোট্ট চাউমিন স্টলে ঘুমান রাজু যাদব (৫০)। এ শহরে রিক্সা চালান পঁচিশ বছর। গয়া জেলার কর্মাভবারি গ্রাম থেকে এসেছেন। একটা পুরনো বাড়ির ছোট্ট রকে বসে কথা শুরু হল

“রিক্সা টানতে কষ্ট হয়?”

প্রশ্ন শুনে রাজু বললেন, “গরমির সুময় কষ্ট্ হোয় তো কী করা যাবে? চারটে মেয়ে, বিয়ে তো দিতে হোবে। গাঁও মে কিছু নাই। কাম নাই, কিছু নাই। চাষের টাইম এলো চাষ কর, গরু দেখ, ঘরে ঘুমাও। আপনা আপনা ক্ষেতি মে কাম। একশ দিন কা কাম ভি নেহি মিলতা। সব বড় বড় লোগ গরীবকে কাম দিবে? বড় লোগ যার বিল্ডিং আছে, সেইকে দিবে। ঝোপড়িমে কুছু দিবে না। রেশন-এশন সব বন্ধ।”

“কেন? নেতারা আসেন না?”

তিনি বেশ উত্তেজিত, “ভোটের সুময় আসবে, ‘আমাকে ভোট দিবে, তুমাকে আমি সব দিব’... এই করে দিব, ওই করে দিব... কিচ্ছু দেয় না। আমার গাঁওয়ের মুখিয়া... ভোটের সুময় সবকো হাত ধরে নমস্কার কোরবে। আগার জিতে গেলে কী হোবে?... আর দেখা পাবে নাই। ঠিক ভোটের টাইম, পাঁচ বোছর পোরে আসবে আবার... আগলি বার মুখিয়া বললো সবকো ঘর মে চাপা কল করে দিবে। সবাই ভোট দিল। চাপা কল হল না। একবছর পর মুখিয়াকো সাথ দেখা। চাপা কল কা বাত পুছা তো বোলা, ‘হামি তো এখানে থাকি না, দিল্লি থাকি’। তো দিল্লি থাকলে হোবে? কিছু তো কোরতে হোবে, গরীব মানুষকো কিছু তো দিতে হোবে। কিছু না হোয়, কাম কা ব্যাওস্থা তো কোরতে হোবে।”

“টানা রিক্সা বন্ধ হয়ে গেলে কী করবেন? ই-রিক্সা চালানো শিখবেন?”

রাজু হতাশ গলায় বললেন, “ইতনা ওমর মে ই-রিক্সা চালানা নেহি হোগা। ক্যা করে? গাঁও মে গিয়ে ক্ষেতিবাড়ি কোরবো। নেহি তো মুটেগিরি করনা পড়েগা।”

পঞ্চাশ বছর কলকাতায় আছেন জগদীশ প্রসাদ যাদব (৬৩)। তিনটি রাজনৈতিক দলের তিন শাসকের আমল দেখেছেন। তিনি রিক্সা মালিক। দশ বারোটা রিক্সা আছে তাঁর। বাবার হাত ধরে এই পেশায় আসেন। বিহারের গয়া জেলায় বাড়ি। মালিক অর্থে সাধারণত যা বোঝায় তিনি ঠিক সেই পর্যায়ে পড়েন না। চালকদের থেকে তাঁর আয় বেশি ঠিকই। কিন্তু তাঁকেও দুবেলা লিট্টি বানাতে হয়। ছোট্ট একটা দোকানও আছে তাঁর। থাকেন কলেজস্ট্রিটের একটি বাড়ির গাড়ি বারান্দায়।

তাঁকে জিজ্ঞাস করা গেল, “টানা রিক্সা বন্ধ হয়ে গেলে কী করবেন?”

তিনি জানালেন, “টানা রিক্সা তুলে দিলে গরীব লোগ বেকার হোয়ে যাবে। কী কোরবে? চোরি ছিনতাই কোরবে? কী কাজ পাবে? সোরকার কিছু দিতে পারবে না। কয় লোগকে নোকরি দিয়েছে? কংগ্রেস সোরকার, সিপিএম সোরকার কিছু করতে পারেনি। এই সোরকার কী কোরবে দেখি। রিক্সা তুলে টোটো দিবে বললো। দিল না... ভোট তো আমার কলকাতায়। ভোট দিই। কিন্তু কিছু তো হোয় না।”

কলেজস্ট্রিটের এক ফুটপাথে থাকেন কয়েকজন টানা রিক্সা চালক। ফুটপাথেই তাঁদের সংসার। ফুটপাথের এক কোণে মাটির তোলা উনুন। ফুটপাথ লাগোয়া বাড়ির প্রবেশ দরজার পাশেই বড় স্টিলের ট্রাঙ্কের মধ্যে তাঁদের যাবতীয় জিনিসপত্র; হাড়িপাতিল থেকে জামাকাপড়। কর্পোরেশনের টাইম কলে স্নান করা, কাপড় কাচা, বাসন ধোয়া। ফুটপাথে দাঁড়িয়েই জামাকাপড় বদলে নেওয়া। ফুটপাথের ওপর টাঙানো দড়িতে শুকোয় তাঁদের পোশাক। পার্ক করা টানা রিক্সায় রোদ এসে পড়েছে। তাতেও শুকোতে দেওয়া কয়েকটা ছোট জামাকাপড়।

মহেশ্বরী প্রসাদ (৪৫) এখানেই থাকেন। সাত বছর কলকাতায় আছেন। গ্রামের মানুষদের সঙ্গে সতেরো/আঠেরো বছর বয়সে শহরে আসেন। প্রথমে মুটেগিরি করতেন। একশ কেজি, আশি কেজির বোঝা বইতেন। শেষে টানা রিক্সা চালানোই পেশা হিসেবে নেন।

নিজের কথা বললেন তিনি, “হামলোগ গরীব আদমি। ইসি সে রোজি রোটি চল রাহা হ্যায়। আপনা মেহনত করতা হ্যায় তো খাতে হ্যায়। মেহনত নেহি করেঙ্গে তো ভুখা রহেঙ্গে। ফুটপাথ মে র‍্যাহতা হুঁ, পানি পড়তা হে তো প্লাস্টিক লাগাকে ব্যাঠতা হুঁ। ব্যাঠকে বিহান হো যাতা। পানি মে রাস্তে ভর যাতা হো তো রক পর ব্যাঠনা পড়তা হ্যায়। ক্যা করে? কষ্ট্ তো করনা পড়তা হ্যায়। চার, পাঁচ আদমি একসাথ ইধার র‍্যাহতা হুঁ। সবলোগ র‍্যাহতা হ্যায় তো খানা ভি ইধার পাকাতা হুঁ। চাওয়াল, সব্জি, রোটি... হপ্তা মে একদিন মাংস, মছলি... দিনভর কাম করকে দেড়, দুশ হোতা। গাঁও মে ক্ষেতিবাড়ি হ্যায়, লেকিন জ্যাদা নেহি। দাদু নে, বাপ নে কিয়া। মেরা তো বালবাচ্চা খিলাতে খিলাতে সব খতম হো যাতা। বিমার পড় গ্যায়া তো মালিক কো পাস রিক্সা ছোড়কে গাঁও চলা যাতা হুঁ। দাওয়াই নেহি, হাসপাতাল যাতা নেহি। পয়সা রহেগা তব তো হাসপাতাল যায়ুঙ্গা?”

এই ফুটপাথের বাসিন্দা সুরেশ প্রসাদ (৫০) স্নান করে জামাকাপড় শুকোতে দিয়ে এসে বসলেন। বললেন, “ভোট হামলোগ দেনে নেহি যা রাহা হ্যায়। ভোট দেগা তো ক্যা? ওহ্ হামকো ঘরোমে বৈঠাকো খিলায়েগা? আরে হামলোগ গরীব আদমি হ্যায়, রিক্সা চালাতে হ্যায়, কামাতে হ্যায়, খাতে হ্যায়... নেতাকো ভোট দেঙ্গে নেতা ক্যা করেগা? প্যায়সা দেগা খানেকে লিয়ে? নেতালোগ হ্যায় আপনে লিয়ে... থোড়াই হামলোগকে লিয়ে কুছ করেগা।”

আর একজনকে পাওয়া গেল, অখিলেশ প্রসাদ (৪৫)। কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়লেন না। সময় নষ্ট করার সময় নেই তাঁর। পার্ক করা রিক্সা টানতে টানতে গলির বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আর একজন চালক রিক্সার সিট খুলে ফুটপাথের ওপর এক চিলতে রকে এলেন। গামছা পেতে সিট মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়লেন। এই তাঁর বিছানা।

সকাল থেকেই চড়া রোদ। মধ্য দুপুরে তাপমাত্রা চড়চড় করে বাড়ছে। ভোটের বাজারও গরম। স্পিকারে স্পিকারে পাড়ায় পাড়ায় ভোট প্রার্থীদের কন্ঠের পারদ চড়ছে। কেবল কেউই জানে না এই মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ।


ছবি: লেখক
অন্যান্য পর্ব

385 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: অন্য ভোট (পর্ব ২) -- টানা রিক্সা ও তাঁহাদের কথা

হুম্ম।
তবে হাতেটানা রিকশা বন্ধ হওয়াই দরকার। বিকল্প জীবিকার জন্য সরকারের তরফে কোন প্রকল্প বা অর্থসাহায্য আছে কিনা জানিনা। থাকলে ভাল হয় আর কি।
Avatar: Rana Sabyasachi

Re: অন্য ভোট (পর্ব ২) -- টানা রিক্সা ও তাঁহাদের কথা

Anno vote porbo 1 abon 2 porlam khub bhalo laglo...


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন