বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

দ্রোহ-প্রেম-১

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

"ফিরভি ইঁয়াদ আ গ্যয়ে, তো কেয়া করে! খুদকো ডাঁটে কেয়া? ইঁয়াদকো রুখ দে কেয়া?"

বলতে বলতে জল গড়িয়ে পড়ছিল ওঁর তুবড়ে যাওয়া গাল বেয়ে। গালের খাঁজে এসে ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে যাচ্ছিল সে নিম্নগামী নুন জলের স্রোত। চিবুক ছুঁয়ে সে জল পড়ে যাওয়ার আগেই তার উপর পশমের আস্তিন বুলিয়ে নিচ্ছিলেন মানুষটা। স্বজনের স্মৃতিতে বৃদ্ধ চোখে ভরে আসা মুক্তোজল, বড় দামী। ফেলা যায় না যে!

তিনি মহম্মদ আতাউল্লা। তুরতুকের বাসিন্দা। ভারতের শেষ গ্রাম হিসেবে পরিচিত কাশ্মীরের এই তুরতুক। কয়েক কিলোমিটার দূরেই পাকিস্তান সীমান্ত। এই তুরতুক গ্রামের মানুষেরা এখনও নিজেদের পরিচয় দেন বাল্টিস্তানি বলে। বছর কয়েক আগে বাল্টিস্তানই নাম ছিল এই প্রদেশের। আর দেশের নাম ছিল পাকিস্তান। তার পরে এল সেই চরম অস্থির বছরটা, ১৯৭১। মানচিত্রের সঙ্গেই ছারখার হয়ে গেল শতশত জীবন, পরিবার, সম্পর্ক, ভালবাসা। সীমান্তকে দিব্যি রেখে ভাগ হয়ে গেল জমিন। কিন্তু মানুষগুলোর ভাগ হওয়া তো জমিনের মতো সহজ নয়! সে যে কঠিন, বড় কঠিন!

সেই কঠিনেরই শিকার হয়ে 'ভারতীয়' বনে গেলেন বাল্টিস্তানি আতাউল্লাজি। আজ থেকে বছর পঞ্চাশ আগে, বয়স তখন ২০। তখন রক্তে ফুটছে দেশপ্রেম। ভেবেছিলেন, যে করেই হোক ফিরে পাবেনই নিজের জায়গায়। ভেবেছিলেন, প্রিয়জনদের কাছে যাবেনই ফিরে! ভেবেছিলেন যুদ্ধের ক্ষমতা বুঝি ভালবাসার চেয়ে বেশি!

বোকা ছেলে!

বোকামির ঘোর কাটতে ঘুরে গেল অনেক বছর, অনেএএএক...। বোঝা গেল, যাওয়া হয়তো হবে, কিন্তু ফেরা হবে না আর। শেখা হল, ফিরব বললে ফেলা যায় নাকি? কোন এক অভিমানে যাওয়াও হয়নি তাঁর। আসলে যে চিরতরে ফিরতে চায়, সাময়িক যাওয়ার লোভে তাকে বাঁধা যায় না। যে অতল সমুদ্রে মুক্তি খুঁজেছে, সাজানো ঝিলে তার তীব্র অনীহা। যে অনন্ত মুক্তি চেয়েছে, সে কখনও ক্ষণিকের ছুটি চায়নি!

কিন্তু অভিমান এক দিকে, কৃতজ্ঞতা অন্য দিকে। খানদানি বাল্টিস্তানি মুসলিম তিনি! সারা দুনিয়া ভুলে যাবেন, কিন্তু মেহেরবানি ভুলবেন না। "এই যে এই দেশের হাওয়া, জল, মাটি-- বাঁচিয়ে রেখেছে তো আমায়! এরা কিন্তু আমায় সব হারানোর ব্যথা বুঝতে দেয়নি! এরাই আমার দেশ ছুঁয়ে আছে, এদের ছুঁয়ে আমি বেঁচে আছি! এই এতটা বয়স পর্যন্ত সুস্থ আছি, সহি-সালামত আছি। এদের আমি কেমন করে ভুলব! কেমন করে অস্বীকার করব, আমি চাই কি না চাই এই দেশ আমায় আপন করে নিয়েছে! ও দেশকে মা মানতাম। এ দেশও তো আমায় মায়ের মতোই স্নেহে-মায়ায়-মমতায় মুড়ে দিল। আমার অভিমান ভুলিয়ে দিল। দিল তো!"-- বলতে বলতে কেঁপে ওঠেন বৃদ্ধ।

সে কাঁপুনিতে ধরা পড়ে যায় বিমাতৃকা এক দেশকে জাপটে ধরে ভালবেসে ফেলার আকুতি। তাতে কোনও খাদ নেই। তাতে নেই কোনও ভান। ভালবাসার ভান হয়তো করা যায়। কিন্তু বেঁচে থাকার ভান করা যায় কি? বৃদ্ধের শিরায় শিরায় যে এ দেশের বেঁচে থাকার ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা ধরা পড়ে যায় প্রতি নিঃশ্বাসে।

এক সময়ে ঝড়ের শব্দ স্তিমিত হয়ে আসে, ফুটে ওঠে এক চোরা আতঙ্ক। আজ কোন এক অজানা হাওয়ায় বার্তা রটেছে, তাঁর ভালবাসা ঝুটা! এ দেশের জল-হাওয়ায় বেঁচে বুকে করে পাকিস্তান নিয়ে বাঁচছেন তিনি! পাকিস্তানের পতাকায় খুবানির সুঘ্রাণ খুঁজছেন! সীমান্তের ওপারে খুঁজছেন মুক্তি! আজ়াদি!

"না!"-- তীব্র চিৎকার করে ওঠেন বৃদ্ধ আতাউল্লা। এ চিৎকারে যতটা বিদ্রোহ আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে যন্ত্রণা। যন্ত্রণা, সেই ছোটবেলায় গলির মুখে ফেলে আসা ক্রিকেট খেলার স্মৃতির। যন্ত্রণা, এক ঠোঙা থেকে জিলিপি ভাগ করে খাওয়ার প্রিয়তম বন্ধুকে হারিয়ে ফেলার স্মৃতির। যন্ত্রণা, সব ভাইবোনেরা মিলে ইদের মেলায় নাগরদোলনা চড়তে যাওয়ার স্মৃতির। যন্ত্রণা কৈশোরের প্রথম প্রেমিকার চোখের কাজলটুকুর স্মৃতির!

"বিশ্বাস করো, আমি নেমকহারাম নই! মাঝেমাঝে বেইমানি করে শুধু এই স্মৃতিরা! ওরা অবুঝ। ওরা শৈশব খোঁজে। ওরা বন্ধু খোঁজে। ওরা আত্মীয় খোঁজে।"-- যে খোঁজের শেষে কান্না ছাড়া কিচ্ছু নেই, সেই খোঁজেই উতল হয় বৃদ্ধের আবছা স্মৃতিরা। আর তখনই, জল গড়িয়ে পড়ে ওঁর তুবড়ে যাওয়া গাল বেয়ে। গালের খাঁজে এসে ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে যায় সে নিম্নগামী নুন জলের স্রোত।

ভাঙা গলায় বৃদ্ধ বলেন, "ফিরভি ইঁয়াদ আ গ্যয়ে, তো কেয়া করে! খুদকো ডাঁটে কেয়া? ইঁয়াদকো রুখ দে কেয়া?"

সত্যিই তো, সব কিছু ছেড়ে এ দেশে এসে যাঁরা বছরের পর বছর ধরে আপন করে নিলেন অন্য দেশ, আপন হলেন সময়ের স্রোতে... তাঁদের কি একটু কষ্ট পাওয়ারও অধিকার নেই ছেড়ে আসাটুকুর জন্য? অধিকার নেই স্মৃতিচারণ করার? ছোটবেলার স্কুলের মাঠে উড়তে দেখা পতাকার সবুজটুকু যদি আজ বৃদ্ধ চোখের কার্নিশে খানিক চলকে ওঠেই বা, তাতেই কি পর হয়ে যায় গোটা মানুষটা? দেশ মানে কি? কেবল পতাকা? কেবল সীমানা এত সহজ? জল-হাওয়া-মাটি-মানুষের ঊর্ধ্বে কেবল মানচিত্রটুকুই সত্যি বুঝি?

চিরন্তন এ প্রশ্ন বুকে করে ফিরতি পথ ধরি। আরও এক বার ঝালিয়ে নিই, যন্ত্রণার কথামালা। পিছু ডাকেন বৃদ্ধ। শিরাওঠা ধবধবে হাত বাড়িয়ে বলেন, "নিজের দেশকে ভালবাসলেই পালিকা দেশের শত্রু হয় না মানুষ। দেশ এত ঠুনকো নয়, দ্রোহ এত সহজ নয়! তার চেয়ে সহজ ভালবাসা!"

আতাউল্লার বাড়িটা এখন তুরতুকের মিউজিয়াম। ১০০ টাকার টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। এক টুকরো বাল্টিস্তান ধরে রেখেছেন, সেই বাড়িতে বা মিউজিয়ামে। পুরনো বাসন, পোশাক, উনুন, লাঙল, দোলনা... আরও কত কী!

ছায়া ছায়া অন্ধকার ঘরগুলোয় বৃদ্ধ রাজার মতো ঘুরে বেড়ান আতাউল্লা। হাত বোলান বাসনগুলোর গায়ে, ঝেড়ে দেন পোশাকগুলো। মুছে নেন চোখ।

একই সঙ্গে দীর্ঘশ্বাসের ক্ষয় আর স্মৃতিদের সঞ্চয়... আগে বড় দেখিনি।



(চলবে)



619 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ ধারাবাহিক  বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: Suman

Re: দ্রোহ-প্রেম-১

পরের পর্বেরঅপেক্ষায় রইলাম
Avatar: aranya

Re: দ্রোহ-প্রেম-১

বাঃ
Avatar: তন্বী হালদার

Re: দ্রোহ-প্রেম-১

অসাধারণ লেখা। জ্ঞান হ ওয়ার পর থেকে যে জায়গার জল আলো বাতাস মানুষের সান্নিধ্যে বড়ো হয় তাই তার দেশ। আমি ও যেমন ভুলতে পারিনা বসিরহাট ইছামতি নদীকে
Avatar: মারিয়া

Re: দ্রোহ-প্রেম-১

সেই!
শুধু দৃশ্যমান চোখের জল টুকুই মুছে ফেলা যায়... আর বাকি!!??


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন