বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

নীলপদ্ম, নাকি হরক্রাক্স

পূবালী দত্ত

“এই দ্যাখ, এমনি করে ক্যাপটা দু আঙ্গুলে ধরে দেয়ালে চট করে ঘষে দে” - চাপা একটা ফট শব্দ -মেয়েটা ভুরু কুঁচকে ধোঁয়ার রেশটা তাকিয়ে তাকিয়ে দ্যাখে। ... চেষ্টা করি? যদি আঙ্গুলে ছ্যাঁকা লাগে? না থাক বাবা ... উল্টে সে মাটিতে ক্যাপের রোলটা ফেলে হাওয়াই চটি দিয়ে পিষে দেয়, বারুদের আওয়াজ টা আরও চেপে গিয়ে কিরম ম্যাদামারা মত শোনায়। মরুক গে যাক! নতুন ক্যাপ বন্দুকটা কিনেছে কি করতে, সেই যদি হাতে-পায়ে করে ফাটাবে? গেলবার সেই যে বাপির সাথে বন্দুক কেনা নিয়ে দারুণ ঝগড়া হল- বলে কি না পুরনোটাতে তেল দিয়ে দিচ্ছি, ওটাই ফাটা! পুজোয় নতুন জামা পরে পুরনো ক্যাপ বন্দুক? এ আবার কেমনধারা কথা! বাপির মনখারাপ করছে বুঝতে পেরেও জেদ করে কথা বলেনি দু-দিন। তারপর তো সেই জ্যেঠু আর বড়দাদার হাত ধরে গিয়ে দোকান থেকে পছন্দ করে নতুন বন্দুক কেনা হল। কিন্তু সে কি আর বাপির সাথে ড্রিমল্যান্ডের দোকানে গিয়ে কেনার মতন হল- “ওই শোলে পিস্তলটা কিনে দাও, না না , ওই ওপরের তারে ঝুলছে সবথেকে লম্বা নলওয়ালা নীল রঙেরটা, আচ্ছা না ওটা থাক...”?

যেমন ধরো, জ্যাম্মা মাঝের দরজায় টোকা দিচ্ছে - “পুটকুরিইইইই? পুটকুরি উঠেছিস? সন্ধিপুজো দেখতে যাবি না?” পুটকুরি ওঠেনি আবার? অ্যালার্ম বাজার আগেই তো জেগে বসে আছে কখন জ্যাম্মা ডাকবে বলে। বাপির গলার ডাক বল কি ঘুমন্ত নাকের ডাক, কোনটাই কি আর এমনি মিঠে মতন হবে? হবে না তো? তবে? পুটকুরি ধড়ফড় করে গিয়ে টুলে উঠে মাঝের দরজার শিকল খুলবে, আস্তে করে। অন্য সময় যেমন ঝনাৎ করে খুলে মজা পায়, তেমনি না। মা বাপি ঘুমচ্ছে তো নাকি? জ্যাম্মা গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেবে গায়ে, কুলুঙ্গিতে রাখা পেতলের ঘটি থেকে। মা দুগগার কাছে পরিষ্কার না হয়ে কি যেতে আছে? এদিকে খালি খালি টনসিলের অসুখ করে জ্যাম্মার আদরের খুকিটার। আলো ফোটেনি তেমন ভোরে চান করলে যদি শরীর খারাপ করে! বাড়ির এই একটা মাত্তর মেয়ে; পুজোর পর লাইন দিয়ে পরপর লক্ষীপুজো, কালীপুজো, ভাইফোঁটায় বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকলে বাড়ি খাঁ খাঁ করবেনা?

তারপর জেঠু সদর দরজায় বাইরে থেকে তালা লাগাবে এক এক করে তিন-চারটে, কে না জানে বাপু সন্ধিপুজোর ভোরেই চোরেদের আনাগোনা, বাড়িতে আড়াইজন লোক কম থাকবে কি না! অন্ধকার গলিরাস্তা, থমথমে সারি সারি বাড়ি, দোকানের ঝাঁপ ফেলা, কুকুরটা স্থির হয়ে তাকিয়ে কি যেন দেখছে! ক্যাঁ-অ্যা-অ্যা-চ!! ছোড়দি বাড়ির গেট খুলল -“ কি গো আলপনা, সন্ধিপুজোয় যাচ্ছ? এই দ্যাখো না কাল পুজোটা কিনতে ভুলে গেছি। কি ঝামেলা বল দেখি? এই ভোরে কি আর ফেলুমোদক খোলা পাব? ও বাবা এ-ও যাচ্ছে? এত ভোরে উঠতে পারলো? ...”। একটু একটু গর্ব হয় কি তার? অন্ধকারের মধ্যে মোড়ের মাথায় প্যান্ডেলটা আলো হয়ে রয়েছে। তেরপলের সাদামাটা প্যান্ডেল, দেখতে তেমন ভালো নয় বটে, কিন্তু দুগগামায়ের মুখখানা একবার দ্যাখো শুধু। টিভিতে কলকাতার অতো ঠাকুর দেখল, এমন ঢলঢল মুখশ্রী ছিল কি আর কারোর!

প্যান্ডেলে সব্বাই ব্যস্ত, পুজোর যোগাড় চলছে, জ্যাম্মা হাত লাগায়। “আমায় দেবে একটা?”- একটা পদ্মফুলের কুঁড়ি ফুটিয়ে ফুল করতে করতেই পুজো শুরু। পুরুতমশাই গম্ভীর হয়ে মন্ত্র পড়েন। ধুনোর ধোঁয়া আর চামরের দোলার ফাঁকে ঠাকুরের মুখটা কেমন আবছা মতন দেখায়। আরতি হয়, একশ প্রদীপ জ্বলে, ঢাকে কাঠি পড়ে, কাঁসর বাজে। ভোরের সাথে সখ্যতা নেই তার, সে ছোট থেকেই রাতজাগা পাখি, কিন্তু এই ভোরটা কেমন যেন বড্ড চেনা, আবার কেমন অন্যরকম। ঢাকের তালে মেয়েটা আলতো আলতো দোলে। গম্ভীর সুরের মন্ত্রগুলো মনের মধ্যে কোন যাদু-কুঠুরিতে গিয়ে ছড়ে টান দেয় -ঠিক তক্ষুনি মেয়েটার আত্মার এইটুকুনি পুঁচকে একটা টুকরো হরক্রাক্স হয়ে ওই ভোরের মধ্যে মিশে যায়। কত বছর পরে হরক্রাক্সটা বের করে হাত বুলিয়ে ধুলো ঝেড়ে কে যেন নেড়েচেড়ে দ্যাখে - এখনো ঠিক তেমনি রয়েছে দেখি যে! খুকি কি বুঝতে পারে? আনমনা খুকি শুনতে পায় কে যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছে- এমনটি আর হবে কি কখনো? সে আবার কি! পরের বারও সন্ধিপুজো ভোরবেলাতেই পড়েছে, জ্যাম্মা বলেছে আমায়। ধুস, কিচ্ছু জানে না!

ভলডেমর্টের সাতটা হরক্রাক্স ছিল, প্রতিটা হরক্রাক্সে একটু করে নিজেকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে রাখা, যাতে কেউ যাদুকাঠির এক মোচড়ে তাকে একেবারে নিকেশ করতে না পারে। বিছানায় বইয়ের ওপর উপুড় হয়ে ঝুঁকে থাকা মেয়েটা সেদিন বোঝে নি যে হরক্রাক্স মন্ত্র পড়ে আলাদা করে তৈরী করতে হয় না। পায়ে পায়ে চলার পথে পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি কত শত হরক্রাক্স আপনি তৈরী হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। জ্যাম্মার হাত ধরে সন্ধিপুজো দেখতে যাওয়া খুকি নাকি অষ্টমীর সকালে একটা একটা করে লুচি ভেজে তোলা কলেজপড়ুয়া - ওরাই তো আমার থেকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া টুকরো গুলো। ঠাকুর গড়ার মতন আমার এই কাঠামোর গায়ে ওদের মাটির মতন লেপে দিলে আমি কি আবার আস্ত গোটা হয়ে যেতে পারবো? দেখি তো এই মিঠে আকাশী টুকরোটা --

ওই যে চলেছে একমাথা কোঁকড়া চুলের মেয়েটা, পরনে বড়মামার দেয়া ফ্রিলওয়ালা জিনসের ফ্রক। শ্রীরামপুরের ভিড় রাস্তায় বাপির আঙ্গুল জড়িয়ে থাকা ছোট্ট হাতটা জামার আস্তিন ধরে টান দেয়, জুলজুলে চোখ দুটো ওই লাল বইয়ের স্টলটায় আটকে। “ বই কিনলে কিন্তু আর সম্রাটে চাউমিন খেতে নিয়ে যাবো না।” - সুট করে ফুটপাথের দিকে তাকিয়ে মেয়েটা বলে-“ একটা বই, প্রেশার কুকার আর গোলাপি আলমারি?” আবদার ঘ্যানঘ্যান কথা কাটাকাটির পর্ব চলে। আট্টুখানিক পর আকাশনীল মলাটে লম্বা নাকের কাঠের পুতুলের ছবিওয়ালা “সোনার চাবি কিম্বা বুরাতিনোর কাণ্ডকারখানা”, প্রেশার কুকার আর গোলাপি আলমারির প্যাকেট এক হাতে, আরেক হাতে ফিশফ্রাইয়ের প্যাকেট ঝুলিয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে মায়ের সাথে গল্প করে - ওটা কে গো? ও খুকি, ক'টা ঠাকুর দেখলি আজ?

টম রিডলের ডায়রির মত ফড়ফড় করে কটা পাতা উল্টে যায়। মফস্বল থেকে ভাড়া করা টাটা সুমো কালো চকচকে রাস্তা ধরে ছুটছে। মেয়েটা গাড়ির জানলায় গাল পেতে হাঁ করে গিলছে সরে সরে যাওয়া টায়ারের দোকান, পেট্রোল পাম্প, লোহালক্কড়ের দোকান। ঝুপ্পুস কাশফুলেদের একটা দল এখানে, আরেকটা দল ওখানে, ওদের পেরিয়ে সাদা ছোপ ছোপ নীল আকাশ। গাড়ি করে কোথাও বেড়াতে গেলে এত মজা হয়! তা-ও তো সেই আলেকালে কপালে শিকে ছেঁড়ে। কেন যে বাপি কোলকাতা যেতে চায় না! রোজ রোজ ইশকুল -শ্রীরামপুর, ঠাকুর দেখা- শ্রীরামপুর, পুজোর ‘মার্কেটিং’ - শ্রীরামপুর - বোর হয়ে যাই বাপু ... (এই মেয়ে, আমিই খালি কিচ্ছু জানি না, না? জানিস না ওটা শপিং, মার্কেটিং নয়? )। এই প্রথম কোলকাতায় ঠাকুর দেখতে যাওয়া, এতদিন টিভিতেই খালি দেখা হয়েছে, নামগুলো পর্যন্ত মুখস্থ - সাউথে বোসপুকুর তালবাগান, শীতলামন্দির, মুদিয়ালি, একডালিয়া, দেশপ্রিয় পার্ক, নর্থে আহিরিটোলা, কলেজ স্কোয়ার, বাগবাজার সার্বজনীন। এবার-ও যাওয়া হত না, নেহাত অনুপকাকু বাপিকে ধরে পড়লো তাই। কাল রাতে এশিয়ান পেইন্টস শারদ সম্মানের র‍্যাঙ্ক করা পুজোগুলো একটা কাগজে টুকে নিয়েছে। অনুপকাকু আবার বলে কি না কি লিস্ট করেছিস দেখি, ওই ঠাকুরগুলো পরপর দেখবো। হি হি, কোলকাতা চেনে না কি ও? লিস্টটা হয়তো এরকম যে এক নম্বরে তালবাগান আর দু নম্বরে তেলেঙ্গাবাগান। কোথায় তাল আর কোথায় তেলেঙ্গা ও কি জানে! ড্রাইভার লিস্ট দেখে দাঁত মিড়মিড় ছাড়া যে আর কিছুই করেনি সেই ভাগ্যি। তবে দাঁত কিড়মিড় করো কি চোখ পাকাও বাপু, শীতলামন্দিরের ভাঁড়ের প্যান্ডেলটা দেখতেই হবে।

কলকাতার সব প্যান্ডেলে মেলা লোকের লাইন, গাড়ি সে-এ-এ-ই কোথায় দাঁড় করিয়ে মাইল খানেক হেঁটে তবে ঠাকুর দেখা - সে কি চাট্টিখানি কথা? আর ভাঁড়ের ঠাকুরের লাইনের তো শেষমাথা অবধি দেখতে পাওয়া গেল না এখনো। রোদে তেষ্টায় চোখমুখ লাল। এমন সময়ে একটা জায়গায় গাড়ি যেতে গিয়ে কি একটা গোলমাল হল, লাইন গ্যালো ছত্রাখান হয়ে। আশেপাশের লোকজন যারা ওদেরই সাথে লাইনের মাথা খুঁজতে চলেছিল, সবাইকার সাথে টুক করে বেলাইনে ঢুকে পড়লো ওরা। ক্রমে ক্রমে সাপের মত লাইনকে হার মানিয়ে ও পৌঁছে গেছিল ওই আশ্চর্য প্যান্ডেলের সিংদরজায়, নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছিল কলকাতার পুজোর জাঁকজমক, তাদের মফস্বলের পুজো যেন সত্যিই একটু ম্যাড়ম্যাড়ে জৌলুষবিহীন। সেই ভালোলাগা কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল সে জানে না, শুধু জানে লাইনে দাঁড়ানো আপাতনিষ্পাপ মেয়েটাকে কেউ কানে কানে পরে বলবে - “কাজটা কিন্তু ঠিক হয়নি মেয়ে তোর; ক্লান্ত গলদঘর্ম বুড়োবুড়ি, তোর চেয়েও অনেক ছোট খোকাখুকু, কে জানে কত মাস পরে দেখা হওয়া প্রেমিক প্রেমিকা, লাইনে সবাই আগে থেকে দাঁড়িয়ে... ?” জোর করে ফিসফিসানিটা চাপা দেয় ও। জৌলুষের রং পালটে কেমন যেন ধূসর হয়ে যেতে থাকে আস্তে আস্তে।

খুকির সেই উজ্বল আকাশী কমলা হলুদ গোলাপি রঙের হরক্রাক্সগুলো পাল্টে পাঁশটে বেগু্নি লাল সবুজ ধূসর হয়ে যাবার সময় বুঝি চলে এলো। “ওই কালো মেরুনটা নামাও দেখি। অষ্টমীতে কালো পরবো? না থাক, তুমি ওই ঢাকাইটা বের করো। হলদে সবুজটা।” আলমারির তাক ফাঁকা হতে চলেছে, মেঝেতে শাড়ির স্তূপ। মায়ের পুজোর নতুন আনকোরা ঢাকাইটা শেষমেশ পছন্দ করেছে কন্যে। মা কি পরবে? ধুর, মায়ের হাজারটা শাড়ি আছে, পরে নেবে কোন একটা। সে নাকি সাজে না, সাজতে ভালবাসে না, সবসময় কেমন এলোঝেলো হয়ে থাকে। সাজতে কি আর ভাললাগে না? লাগে তো! কিন্তু জম্মকুঁড়েদের আয়নার সামনে চেয়ার পেতে সরঞ্জাম নিয়ে বসতেও একটা জুতসই কারণ লাগে যে। অস্টুমির অঞ্জলি দিতে কাল সে যাবে মায়ের সাথে, ঢাকাই পরে। বাড়িতে তাদের দিকে পুজোআচ্চার পাট তেমন নেই, খালি একটা ছোট্ট তাকে শিবঠাকুর আর কালীঠাকুরের বাসা। কিন্তু বছরের এই একটা দিনে মা সকাল সকাল চান করে সুন্দর করে নতুন শাড়িতে সেজে মোড়ের প্যান্ডেলে পুজো দিতে যায়। সঙ্গে সে থাকে মালবাহক হয়ে- হাতের প্যাকেটে ছোট বড় মাঝারি নানা সাইজের বাক্স আর রুমালের খুঁটে প্রণামীর গোল ভারি ভারি দু'টাকার কয়েন বাঁধা । বাক্সর কোনটায় লেবু সন্দেশ, কোনটায় চন্দ্রপুলি, কোনটায় নিখুঁতি, যে যা ভালোবাসে- ঠাকুরের খাওয়া তো ছুতো, কে না জানে মানুষের মধ্যেই ঠাকুরের বাস, বিশেষ করে পেটের মধ্যে। কোনটাতে লেখা মৌদ্গল্য গোত্র, প্রবীর দত্ত, ব্র্যাকেটে বুগানদা, এতে করে পুজো হওয়া বাক্স খুঁজে পেতে সুবিধে হবে, বাপিকে ডাকনামেই সবাই চেনে কি না; কোনটাতে লেখা অজিত মুখার্জী , ভরদ্বাজ গোত্র, মায়ের বাবা - মেয়ের ছেলেবেলার ভালোদাদু। মনটা একটু খচখচ করে, প্যাকেটে তার নিজের যে আলাদা কোন বাক্স নেই!

টনসিলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সকালে উঠে চুল শ্যাম্পু করেছে কন্যে, মেঘবরণ চুল আলগোছে থাকে থাকে কুঁচকে পিঠের মাঝ অব্ধি ছড়িয়ে থাকে, আলগা ক্লিপের মাপসই শাসনে। লোকে বলে- চুলটা তোর একদম ঠাকুরের মতন! দ্রুত হাতে খড়মড়ে ঢাকাইকে জব্দ করেছে, মা-কেও শাড়ি পরিয়ে দিতে হবে কি না। নইলেই মা তো করবে মোটে তিনটে ছ্যাড়াব্যাড়া কুঁচি আর এই চওড়া চওড়া অসমান আঁচলের প্লীট- একটু যত্ন করে শাড়িটা পরলে কত সুন্দর দেখায়! হালকা লুটিয়ে গোড়ালি আর পায়ের পাতা ঢেকে আর আঁচল ছড়িয়ে এক ঢাল খোলা চুলে বড়মণি যেমন। ঠিক ওমনি করে শাড়িটা পরল আজ, চোখের কোলে গাঢ় কাজল, বাঁকা ভুরুর মাঝে ছোট্ট টিপ - পাশের বাড়ির মেয়েটা চেনা চোখেও যেন অচেনা ঠেকে। কে যেন মা-কে শুধায় -“তোমার মেয়ে? কত্ত বড় হয়ে গেছে গো!” পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্র, আড়চোখ আর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি - মেয়ে সত্যিই বড় হল এবার বুঝি।

বাপির সঙ্গে ক্যাপবন্দুক নিয়ে আর ঝগড়া হয়না, বাজি কেনা, রং পিচকিরি কেনা নিয়েও নয়। মাঝে মাঝে কোন কারণ নেই, বাপির খিটখিট - একটু না হয় পড়ার ব্যাচের শেষে গলির মুখে দাঁড়িয়ে দশ মিনিট বেশি আড্ডা ঠাট্টা হাসাহাসি করেছে, ওই গল্প কি আর হাটের মাঝে হয়? তা বলে সে কি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে পুরো? বাপি-ও কি বুড়ো হচ্ছে এবার? বাপির মাথায় কালো চুলের মধ্যে সাদাদের আনাগোনা বেশ বেড়ে গেছে। সেই না দেখে মেয়ে একবার বাপের মাথায় মেহেন্দি লাগিয়ে দিল। হ্যাঁ গা, পুজোর সব সাজ কি তোমাদের মেয়েদের? ছেলে বলে বুঝি শখআহ্লাদ নেই। কিন্তু অচিরেই বাপির সারা মুখে লাল লাল চাকা চাকা বেরোতে শুরু করায় বোঝা গেল - যেখানে যে ছেলেরই আর যা-ই শখ আহ্লাদ থাকুক নে কেন, কালো চুলের আহ্লাদ তার বাপির থাকতে নেই। তবে সেই খিটখিটে বাপিটাও কিছু না বলতেই পুজোয় নিজের থেকে পছন্দ করে তাঁতির বাড়ি থেকে একটা সুন্দর সাদা মেরুন রাজবলহাটের তাঁত কিনে আনল। একেবারে তার নিজের শাড়ি! তা বলে ভেবো না যে মায়ের আলমারিতে সেবার হাত পড়ে নি।

সেবারের মহালয়াতেও সেই কাণ্ডটা ঘটে গেল শেষ অবধি। বছর দুই আগে, ছেলেটা বুঝি একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল তোতন স্যারের ব্যাচের বিজয়ার খাওয়া দাওয়ার দিন। ধুর, ও তোর মনের ভুল, তার ওপর সেদিন স্টাইল করে চশমা-ও তো পরে যাসনি, কি দেখতে কি দেখেছিস! তাছাড়া মায়ের কালোর ওপর তামাটে সুতোর কাজ করা সিল্কটা তো এমনিই ভীষণ চোখ টানে। সত্যিই ভুল? নাকি ঠিক? জানতে পারবে হয়তো কখনো একটা, মা দুগগার নাম নিয়ে প্রশ্নটা তো ভাসিয়েই দিয়েছে হাওয়ায়। এই একটা উত্তরের অপেক্ষা যেন অনন্ত। অন্যবারের পুজোগুলো ঘোড়ার জিনে দম দিয়ে আসে, আর এবারের পুজো যেন গরমের দুপুর। বাপির সাথে পাড়ার ঠাকুর ভাসান দিয়ে এসে মনটা বড্ড খারাপ হয় তার। সেই খুকিবেলাতে যেই না দশমীর বিকেল থেকে ঢাকে কাঠি পড়বে কুড় কুড় কুড়, পুজোর শেষ নতুন জামাটা পরে বাপির হাত ধরে পায়ে পায়ে হাজির হবে সে পাড়ার প্যান্ডেলে। ছেলের দলবল ধরাধরি করে ঠাকুর নামাবে, আর এয়োস্ত্রীরা মায়ের মুখে সন্দেশ আর পায়ে আলতা ছোঁয়াবে। লক্ষ্মী কার্তিক গণেশ সরস্বতী প্যাঁচা ময়ূর ইঁদুর হাঁস, বাপির কোলে চড়ে মা দুগগা তো বটেই, এমনকি অসুর সিংহকে অব্ধি ছুঁয়ে প্রণাম করে সে মনে মনে বলবে -“ পরের বার আর ফাঁকি মারবো না ঠাকুর, এবার আমি ঠিক ফার্স্ট হতে পারবো তো? আর সেই খেলনাটা গো যেটা মেলায় খুব পছন্দ হল ...।” যত্ত ছেলেমানুষি! এবারের বিদায়বেলায় যেন আর বাক্যি সরে না- উত্তরটা যেন পেয়ে যাই মা তাড়াতাড়ি... সে উত্তর যাই হোক না কেন। শেষেরটুকু বলার সময় মনটা কি একটু ভিজে এলো?

ঠাকুর ভাসান দিয়ে এসে কলাপাতায় দাদুর লাল কালির কলম দিয়ে “ ঁ শ্রী শ্রী দুর্গা মাতা সহায়” লেখা আর ছোড়দাদার সাথে কম্পিটিশন যে কে বেশি লাইন দুর্গা সহায় লিখেছে - হ্যাঁ রে ছোড়দাদা, তোর ক্যালাইডোস্কোপেও কি ঘুরে ফিরে আসে এই ছবি গুলো? তারপর সেই লাল সবুজ কলাপাতা ওপরের কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে এসে সবাইকে ঢিপ ঢাপ প্রণাম। হায়, তাকে কেউ প্রণাম করে না, বাড়িতে সে-ই সবথেকে ছোট কি না, যতোই এগারো ক্লাসে পড়ুক। তারপর মিষ্টির কৌটো নিয়ে বাড়ি বাড়ি বিজয়া সারতে বেরনো মা বাপির সাথে। পুঁটকি, সে বছর বছর লম্বায় বেড়ে পিসি জ্যেঠই মাসি পিসি সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেও - সেই পুঁটকির গলা পেলেই সেজদি, যে কিনা আসলে বাপির মাসি হয়, একগাল হেসে বলে উঠবে -“এসে গেছিস? তুই মিষ্টি ভালবাসিস না বলে এই দ্যাখ তোর জন্য সাদা আলুরদম করে রেখেছি।” মেয়েটা পাড়া শহর রাজ্য দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ছুটতে ছুটতে টের পায়না, ছোটার পথে খসে খসে পড়ে চিকমিকে টুকরো গুলো, আর এক এক করে সেজদি-রা তারা হয়ে যায়। কাছে বসিয়ে বাটি ধরে সাদা আলুরদম খাওয়ানোর লোকও কি কমতে কমতে মিলিয়ে যাবে সব একদিন?

অষ্টমীতে পুজোয় নিজের একটা আলাদা নাম লেখা বাক্সর বন্দোবস্ত হয়েছিল শেষ অবধি - বাক্সটাও সেই উত্তরটার অপেক্ষায় ছিল যে! পরের বছর অষ্টমীতে নতুন নাম লেখা সবথেকে বড় সাইজের স্পেশাল বাক্স ঢুকল পুজোর প্যাকেটে। কপালে ফুল ছুঁইয়ে লিপগ্লস ছোঁয়ানো ঠোঁট নড়ে বিড়বিড়- “ভালো রেখো ঠাকুর, ভালো রেখো, দেখো যেন কোনোদিন না ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, কলেজের পরও যেন এক শহরে থাকতে পাই...” -চোখ দুটি তার বোজা, চোখের পাতা আশায় তিরটির করে কাঁপে - প্রথম বারের জন্য নতুন রকম পরশের আশায়। যুগের এপার থেকে এ মেয়ের পানে চেয়ে করুণা হয়, এ মেয়ের কি ভালোর মোহ ছিল? এ মেয়ে কি আর কেউ? - হাজার মাইলের সরলরেখার এপ্রান্ত থেকে কেউ বিড়বিড় করে -“ ভালো রেখো ঠাকুর, ভালো রেখো, দেখো যেন আবার এক শহরে থাকতে পাই...”।

মায়ের কাছে অষ্টমীতে লুচি ঘুগনি, নবমীতে কষা পাঁঠা, দশমীতে নারকেল নাড়ুর বায়না করা মেয়ে সেবার অঞ্জলি দিয়ে ফিরে কোমরে শাড়ির খুঁট গুঁজে আলু কোটে, কড়াইতে ফোড়ন দেয়। মা-কে একদম কিচ্ছুটিতে হাত লাগাতে দেয়না, নিজের হাতে বানিয়েছি বলার যে কি সুখ! কি এত রান্না করিস রে মেয়ে, কে আসবে বাড়িতে? মা বুঝি মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনটা ছাপার লেখার মত পড়তে পারে। খুদে বেলা থেকেই যে বড় মা ন্যাওটা! সিঁড়ির তলায় কড়াইতে চাউমিন ভাজা হচ্ছে - সিঁড়ির তিন নম্বর ধাপ থেকে কচি গলাটা ঠিক বলছে - বাটিতে এখনো তিনটে সেদ্ধ চাউয়ের সুতো লেগে আছে গো! মায়ের পাঁচটা পিঠে গড়া হয়ে গেল, খুদেটা প্রথমটা নিয়ে লড়ে যাচ্ছে, হাত ভর্তি চালগুঁড়ির লেই। এক ডেকচি ময়দা আর ময়েনের তালে অল্প অল্প করে জল দিয়ে দুটো খুদে খুদে মুঠি ধুপধাপ ঘুষি মেরে চলেছে - পুজোর দিনে সকালবেলা লুচি ছাড়া কিরম খালি খালি লাগে, না গো মা?

ঘড়িতে রাত দুটো, কম্পিউটারে কোলকাতার ম্যাপ খোলা, চটি খাতায় ডটপেনে রুট আঁকা চলে, লাল পেনে আঁকা ছোট্ট লাল গুটলিটা বাসস্টপ- লেবেল করা ১২সি। চৌকো ছোট ছোট বাক্সগুলো প্যান্ডেল। এক-দুই-তিন দিয়ে দাগিয়ে রাখা কোনটার পর কোনটা দেখা হবে। শুই এবার, সাতটার বর্ধমান লোকাল ধরতে হবে কাল। চটপট ব্যাকপ্যাকে খাতা পেন জলের বোতল বিস্কুট গুছিয়ে বিছানায় গুটিসুটি। দুজনায় একসাথে প্রথম বার কোলকাতার ঠাকুর দেখা, দ্যাবাদেবি কিস্যু চেনে না এদিকে। ছেলেটা রাস্তাঘাট চেনার ব্যাপারে ক অক্ষর গো মাংস, প্রাণে সাধ অনেক, কিন্তু কোনই প্ল্যানিং নাই। “পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি” গাইতে গাইতে দিব্যি প্রেমিকার হাত ধরে বেরিয়ে সত্যিই পথ হারিয়ে বসে থাকবে। না না, এসব মানুষের ওপর ভরসা করতে আছে কখনো? কুড়িটা প্যান্ডেল প্ল্যানমাফিক কভার করতেই হবে বিকেলের মধ্যে... --- “ সে কি? পাঁচ স্টপেজ আগে নামতে হত? আপনি বলেন নি কেন আগে? আপনাকে যে বললাম রুবি এলে ডেকে দিতে?” গজগজ করতে করতে মেয়ে নামে কোন এক অচেনা স্টপে, পাশের জন নির্বিকার। অতো প্ল্যানিং-এর পর-ও গোড়াতেই এমন বিপর্যয়, তাতেও কারো কোন হেলদোল নেই, সব দায়ই কি আমার- ফুঁসে ওঠা অভিমানের এক ফোঁটা টুপ করে ঝরে পড়ে, ও গালে আরেকফোঁটা প্রস্তুত হচ্ছে - পাষাণেরও এবার দয়া হয়। “ এ কি বোকা মেয়ে কাঁদছিস কেন? এখানেও তো ঠাকুর হয়েছে দেখছি। চল না এগুলো দেখি। তারপর লোক জিজ্ঞেস করে ঠিক রুবি পৌঁছে যাবো, বেশিদূর এসে পড়িনি নিশ্চয়ই। আর চিনতে না পারলে লোক জিজ্ঞেস করে কোন একটা হাওড়ার বাসে উঠে পড়া যাবে। সব জায়গা থেকে হাওড়ার বাস পাওয়া যায়। এই... “ নাক টেনে চোখ মুছে মেয়ে পা বাড়ায়। মনে মনে ভাবে - কাজলটা ঘেঁটে গেল নাকি আবার? হুম, এখানে দেখছি তিনটে প্যান্ডেল হয়েছে। রাজডাঙ্গা নবোদয় পৌঁছতে একটু দেরি হলেও... অমুক অমুক তমুক তমুক মতন চললে তেইশটা ঠাকুর দেখা হবে। মেয়েটার মুখে অল্প হাসি ফোটে, তা দেখে আরেকজনও খানিক স্বস্তি পায়। হাসির পিছনের জটিল হিসেব বোঝা ওই হাঁদার কম্মো নয়। সন্ধের মুখে অল্প খুঁড়িয়ে বাড়ি ফিরে পায়ে গোটা দশেক টসটসে ফোস্কা আবিষ্কার করে হাঁদা ভাবে -এরেই বুঝি লোকে প্রেমের ব্যথা কয়!

পরের বছর আবার সেই চটিখাতার সুযোগ হয় ওদের সাথে পুজোর কলকাতা ঘোরার, কিন্তু সেবার সে ব্যাগের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানঅভিমান খুনসুটি দেখার আর সুযোগ পায়না বেশি। কোনবার যেন ওই চটিখাতা ব্যাগে-ও আর জায়গা পায় না। ভারি অভিমান করে সে - ‘মেয়ে নাকি রাস্তা সব চিনে ফেলেছে। হুঁঃ। আবার যেদিন ভুল জায়গার বাস ধরবে বুঝবে ঠ্যালা! ওই ক্যাবলা ছেলেটাকে তো বটেই, এখন আবার নাকি মা-বাপিকেও সাথে করে নিয়ে যায় আর হাত ধরে ঠাকুর দেখায়। আর কি যে ওই ছাতার মাথা ফোনে ম্যাপ ভরা আছে কে জানে! আমার আর কি? আলমারির একটেরে কোণে পড়ে থাকি। ওই ওরাও যেমন পড়ে থাকে - ওই পাশে পুতুল ঝোলানো চাবির রিং, ওদিকের কোণে শুকিয়ে যাওয়া গোলাপটা, আর তাড়াতাড়া রঙিন চিঠি। সবার এত হাহুতাশ আর সইতে পারি না বাপু। ও মেয়ে, আমাদের জন্যে তোর কি আর একটুও মন কেমন করে না?... ‘

‘বাবু আবার যে কবে আসবি পুজোয়! তুই না এলে কে আর কলকাতা ঘোরাবে বল? আজকাল বেশি হাঁটাহাঁটিও পারি না আর। যেবার তুই আসবি দু-তিনটে ভালো ভালো ঠাকুর দেখে খেয়ে দেয়ে ফিরবো। হ্যাঁ? আগের মত অতোগুলো ঠাকুর দেখা যাবে না। কলকাতার যা জমজমাটি ব্যাপার, দুটো ঠাকুর দেখলেও কিন্তু মজা হয় বেশ।... ‘ হেডফোনে পৃথিবীর ওপার থেকে মায়ের গলা ভেসে আসে। যাব মা গো, ঠিক যাব কোন না কোনদিন, আবার সেই চটিখাতা নিয়ে নতুন করে রাস্তা চিনে নিতে বেরোতে হবে। আজ মহালয়া যে। মনটা বড়ো খারাপ লাগে যে মা গো। সবাই বলে - পুজোয় কিসের মনখারাপ এত? ও ঠিক হয়ে যাবে। সয়ে যাবে, মা? ফেসবুকে নিউজফিড স্ক্রল করতে করতে খুঁজে পাই কে যেন খুব দরদ দিয়ে গাইছে - “যাও যাও গিরি, আনিতে গৌরী, উমা নাকি বড় কেঁদেছে...”



899 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ মোচ্ছব  বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮ 
শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: নীলপদ্ম, নাকি হরক্রাক্স

এ তো সেই পাল্লিন শ্রাবণী পিপির মত লেখা পুপেখুকি! মিত্তি,।মনমেমন করা ---
Avatar: ফুটকি

Re: নীলপদ্ম, নাকি হরক্রাক্স

বাহ রে খুকি, বাহ!
Avatar: dd

Re: নীলপদ্ম, নাকি হরক্রাক্স

বেশ বেশ
Avatar: প্রতিভা

Re: নীলপদ্ম, নাকি হরক্রাক্স

সুন্দর!
Avatar: Tim

Re: নীলপদ্ম, নাকি হরক্রাক্স

হ্যাঁ পাল্লিনের কথাই প্রথম মনে পড়ে পুপের লেখা পড়লে। একে দিয়ে আরো অনেক লেখাতে হবে।
Avatar: hu

Re: নীলপদ্ম, নাকি হরক্রাক্স

ভারী চমৎকার হয়েছে
Avatar: ঋক

Re: নীলপদ্ম, নাকি হরক্রাক্স

বাহ
Avatar: স্বাতী রায়

Re: নীলপদ্ম, নাকি হরক্রাক্স

এই লেখাটা তালেগোলে মিস করে গিয়েছিলাম। আজ পড়লাম। ভাগ্যিস। মন কেমন করা সব স্মৃতি ফিরে এল।
Avatar: তপতী বর্মণ

Re: নীলপদ্ম, নাকি হরক্রাক্স

ভাললাগ। সেই ভাঁড়ের ঠাকুর দেখতে যে আমিও গেছলুম তবে লম্বা লাইন দেখেই ফিরে এসেছি।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন