বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

পুজোর কবিতা

প্রথম পর্ব

পুজোর কবিতা - প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব | তৃতীয় পর্ব


"কবিতার কী ও কেন" বইতে কবিতাপাঠের "প্রয়োজন" সম্পর্কে লিখতে গিয়ে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী উল্লেখ করেছিলেন আসলেই প্রয়োজনহীনতার কথা। বস্তুত, যে সৌন্দর্য্যবোধের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে পাঠক অন্য চোখে এই পৃথিবী দেখতে চান, সেই বোধের অভাবেই যাঁর বর্তমান অবস্থান, তাঁকে এই অভাব পীড়া দেবেনা, দেয়ও না। তবু প্রচুর কবিতা লেখা হয়, বিস্তর বই ছাপা হয়, এবং তার ভগ্নাংশ কেউ কেউ পড়েও থাকেন। এই নিরন্তর চর্চার একমাত্র ভালো দিক হলো, এর থেকে লেখালেখির ক্ষেত্রটি ঊর্বর ও সম্ভাবনাময় থাকে। কাজেই বোঝাই যাচ্ছে কবিতার পাতা সাদা বাংলায় সাদা থাকলে তা আসলে মোটেই সুবিধের ব্যাপার না। অবজ্ঞায় নিভৃতচর্চার গভীরতর কারণ খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই কবিতারই কাছে। আটষট্টি সালের বন্যায় ছাত্র ঠেঙিয়ে ঘোর কাদা ভেঙে ঘরে ফিরতে চাওয়া সেই মাষ্টারমশাইয়ের কথা আমাদের মনে করতে হবে যাঁর -
"কাদার ভিতর থেকে কলম আঁকড়ানো হাত কনুই পর্যন্ত উঠে আছে"। ("আমাদের ছাদে এল", জয় গোস্বামী)

চলে এলো উৎসব সংখ্যা প্রথম পর্বের কবিতা। এই পর্বে লিখেছেন কোয়েলী সরকার, বেবী সাউ, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, সুমন মান্না ও কল্পর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় ।

কোয়েলী সরকার

নিঠুর এ মীনজন্ম শাশ্বত
মেনে নিই; কাচের বোলের মধ্যে
আমি ও শ্রেয়সী খেলা করি।

পাথরের অবয়বে আমি ওকে
খুঁজি, ও আমাকে। আলো পিছলায়
যত সোনালিগমের মতো মসৃণ
পিচ্ছিল ত্বক সরে সরে যায়।

অপ্রাপ্তির মীনজন্ম দৃশ্যত
কুহকরচনা; কাচের বাহির দেখে
শ্রেয়সী ও আমি খেলা করি।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

লৌহজালিক ভেদ করে
গেছে যে তীর
তাকে আমিও ভয় পেয়েছি চিরকাল।

আমাদের তো অভাব ছিল না কোনো দিন
তবু দ্যাখো এত অভাব হলো

তুমি ভাবছ কীভাবে আমাকে
বিশ্বাস দেবে, আর কী ভাবেই বা
বাতাসে বিছিয়ে দেবে পরবর্তী
জীবন... অনিবার্য সেই ঘন বিদ্যুৎ

লৌহজালিক ভেদ করে গেছে
যে তীর, সে বধির
ও বিষাক্ত। তোমার-আমার
মৃত স্বপ্নের বুক থেকে
গড়ানো বিষ-ই জেগে থাকে
আমাদের নিত্য অন্ধতায়

সমস্ত প্রাণঘাতী তীরে।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

মনে আছে একদিন এত লোডশেডিং
অন্ধকারে কুপি জ্বলছে দূরে
মোমবাতির আলোয় আমরা

কি সুখী দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম
অস্থায়ী ছোট একটা বইয়ের দোকানে

আর তুমি ফস করে কিনে দিয়েছিলে
খড়কুটো। তোমার ঝোলাব্যাগে থাকতো
টাটকা আষাঢ়ে মেঘ আর ঝরে পড়া
দু-এক আঁজলা ছাতিমফুল কি রুদ্রপলাশ

যেসব নিমগ্ন রাস্তা দিয়ে এসে
তুমি দাঁড়িয়ে থাকতে ঠিক আমার
বাসে তুলে দিতে আর সকালের গল্প বলতে

ফেরার সেই সব জনাকীর্ণ রাস্তায়
আজ আর কোনো গাছ নেই।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

তাকে আমি হারিয়েছি, নাকি সে আমায়
হারাবে- এমনই বুঝি ছিল অভিপ্রায়!

জিত হলো সীমান্তের, তারই আশেপাশে
ছড়িয়েছি শান্তিফুল, মৃত মোহঘাসে।

তাকে আমি হারিয়েছি তেপান্তর পার
হয়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি আমার

সন্ধ্যালাগা শব্দ হয়ে, গন্ধ হয়ে আসে
বাষ্প হয়ে মিশে থাকে পড়ন্ত আকাশে।


তিনটি কবিতা
বেবী সাউ


ভাসান

যেন কতকাল ক্লান্ত
যেন ভেঙে গেছে পাটাতন

ঘরে ফেরা। কৃষিক্ষেত।

বর্শার ফলকে কারা রেখে গেছে তামাম সিঁদুর

সব এঁয়োতির দল আঁচলে ভরেছে পাথরের চোখ

শ্রাবণের দিনে তারা নদীকে কাঁদাবে

নক্সা

স্রেফ হত্যা চিহ্ন ভেবে
সেইযে ঢুকিয়ে দিলে তারামাছদের কাঁটা

চোখের গুঞ্জন

দু ঘর বাদেই জেগে উঠল রক্তের দাগ
সাদা পর্দা

সমস্ত শহর চেয়ে দেখলো গোধূলি রঙে
সানাই বাজছে চোখে চোখে

অন্ধ

মাথার ওপরে উড়ে যাচ্ছে সাদা সে উড়োজাহাজ

সমস্ত পথের সীমা রেখা সমুদ্রের তীর জেনে
অস্তিত্বের মাপজোক হচ্ছে
আর
আলতো ছোঁয়ায় ভরে ওঠা স্পর্শ
সাদা লাঠি
হেঁটে যাচ্ছে অপেক্ষার দিকে


শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়

১.
তোমার লাগানো গাছে টগর ফুটেছে সাদা
কিছু ফুল মাটিতে ঝরেছে , দুটি পাখি উড়ে যেতে
হা হা কা র রেখে গেলো ঘরে

এইতো সাজানো সব, যেখানে যেরকম থাকে
তবু , এই ছবি, এই ফুল সকলে সমস্বরে বলে
ফিরবেনা ফিরবেনা
কোত্থাও নেই তুমি, কোনোখানে, কোনোদিন আর
তোমার দৃষ্টি টুকু পড়ে আছে ঘরের ভিতর

২.
জানলায় ভোর বেলা রোদ, হাওয়ার ভিতরে মিশে
যখন পিছনে এসে দাঁড়ালে
আমার হাতের বই এলেমেলো পাতা গুলি
এসেছে এসেছে বলে ফর ফর ডানা মেলে উড়েছে

৩.
দুই হাতে তুলে ধরি, জলের উপরে মাথা
একবার ডুবে, ভেসে ওঠে বার বার
আমারি করতলে যেন প্রিয় কর্পূর মিশেছে বাতাসে

৪.
তোমার হাতের ছোঁয়া, হলুদের দাগ
ডানার পরিধি মেলে এখনো রয়েছো ঢেকে
সূর্যের তাপ

আমার সুখের পাশে তোমার হাসিটি
অমলিন রয়ে গেছে শত শত অসুখের তাপে

৫.
তখন এসেছি ফিরে তোমার পায়ের কাছে
দুমিনিট বসে উঠে গেছি মনে মনে ভেবে গেছি
আরো কিছুকাল তোমার পায়ের কাছে
বসে আছি বাকিটা জীবন


তিনটি কবিতা
সুমন মান্না



আঠাশ বছর আগে


এখনও বুকের মধ্যে একা বাইসাইকেল ডানা ঝাপটায়
আঠাশ বছর আগে এক শুনশান ভোরে ছুটেছিল সে
কয়েক কিলোমিটার পৃথিবী অন্তে এক অবাসন দরজায়
আলো ফোটার মুহূর্তটি দেখতে উৎসবমুখর আশ্বিন মাসে।

দেখে, চেয়ারের কয়েকটি ঝাঁক সারারাত শিশির মেখেছে
মণ্ডপে শোয়ান ঢাক পাশে গুটিশুটি ঘুমে কাঁসি কাঁথা গায়ে
ঢাকি নেই। আশিকির গান বাজে, দু’টি নেড়ি ঠাকুর দেখছে
সাইকেল চুপিচুপি থামে, দেখেশুনে অল্প হাঁফায়,। সভয়ে।

যদি প্রশ্ন ছুটে আসে অহেতুক অবেলা আগমন কারণ
যদি কথা জানাজানি হয়, দেখে ফেলে স্বচ্ছ দিঘির তল
সাধারণ লোকে। ঢিল মারে, জল ঘোলা নষ্ট প্রসাধণ
তার কানে কথা পৌঁছয়, ভাববে, রাস্তার ছেলে? খল?

নিরাপদ ছিল সে যাত্রা। তারপর থেকে প্রতিবার পুজোয়
সাইকেলে জং পড়ে। অকারণ ভোরবেলা সে আর চলেনি
মানুষের মতো সে সঠিক পোশাকে জামা জুতো মোজায় —
সপ্তমী বোকামির কথা সে আজ অবধি কাউকে বলেনি।

তাও জানে আড্ডার শেষে চেয়ারেরা মুখোমুখি থাকে সারারাত
বছরে দু’একটি শিউলি সুবাস, বাকি দিন একই ডাল ভাত।


তিনশো একতিরিশ দিন


বছরে দশটি দিন উৎসব আসে
দোল দুর্গোৎসব বর্ষপূর্তি অবকাশে
দিন আষ্টেক থাকে ব্যক্তিগত তারিখ পালন
নেমতন্ন চিঠি বিয়েবাড়ি, নিছক উদযাপন।
বেড়াতেও যাওয়া হয় সমুদ্র পাহাড় বা জঙ্গলে
অন্য শহরে গোটা দশ দিন, নিজেরা অথবা সদলবলে
এর মধ্যে গড়ে দিন পাঁচ ছয়
আকস্মিক ঘটনায় উত্তাল নিজস্ব গোষ্পদ সময়-
ফের ধারাবিবরণী গুলি দেওয়ালে দেওয়ালে
বাকি তিনশো একতিরিশ দিন বাঁচি-

বারান্দায় বসে বসে সিগারেট খাব বলে।


ইচ্ছে


ইচ্ছে যখন কাচের বাসন
থাকছে তোলা আলমারিতে
উৎসব দিন চলছে ঝাড়ন
নেমন্তন্ন এই বাড়িতে।

মাঝে মধ্যেই ভাঙছে বাটি
চিড় ধরা গ্লাস প্লেটের ফাটল
অসবধানীর ইচ্ছে মাটি
খুব প্রিয় কাপ ভাঙা হাতল।

অনিচ্ছেদের বাড়বাড়ন্ত
রোগ ব্যধি ক্ষয় উড়িয়ে দিয়ে
ওদের ইচ্ছে দূরদূরান্ত
থাকবে শুধুই আমায় নিয়ে।


রক্ষক
কল্পর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়

যদি শরীর সম্মতি পায়, তক্ষকের ডাকে জাগে অলস দুপুর
যদি কিশোরীর হৃদয় দৌর্বল্য ,তার পুতুল খেলায় বর বউ বিয়ের মধ্যে
যুগপত জেগে ওঠে ব্যথা ও আরাম
যদি তার করতল স্পর্শ করে অন্ধ গানের স্যার
যদি ভাঙ্গে গান ,শরীরও ভেঙ্গে যায় কিছু
কারাগার অনন্ত বৃষ্টির ভিতর, যদি সে মিলায় দূরে
দূর কোনো দিগন্ত রেখায় ,রক্ষকের মত আমিও পিছনে যাব
অরান্তুদ বিষাদ যাত্রায়


পুজোর কবিতা - প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব | তৃতীয় পর্ব



831 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ কাব্যি  বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮ 
শেয়ার করুন


Avatar: i

Re: পুজোর কবিতা

কবিতা সবই ভালো। বেশ ভালো। ভূমিকাটিও খুবই ভালো লাগল। কল্পর্ষির কেবল একটি ই কবিতা কেন?
Avatar: Anamitra Roy

Re: পুজোর কবিতা

যাহঃ! সবই ভালো ভালো কথা। কোনও রাগ নেই, কোনও অশান্তি নেই কোথাও কবিদের মনে। অশান্তির মতো কিছু যেন আছে, ক্রাইসিসগুলি হবে হয়তো স্থিতাবস্থার ঘেরাটোপে কাটা মধ্যবিত্ত জীবনের। বড় শান্ত, বড়ই সুবোধ লাগলো। মিসিং রাগ, অশান্তি অ্যান্ড আদার ভায়োলেন্ট ইমোশনস উইথ গুরুচন্ডা৯ অ্যান্ড ফর্টিনাইন আদার্স। :D
Avatar: b

Re: পুজোর কবিতা

ইআ ইআ ইআ আই একমত :D,:D


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন