বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

অনিন্দ্য সেনগুপ্ত

এই বিষয়ে একাধিক লেখা গুরুচন্ডালিতে প্রকাশিত হবার পর, প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাওয়া এই লেখাটি প্রকাশ করা হল। জমে উঠুক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক।

  দিবাকর ব্যানার্জির ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সি!’ অনেকের ভালো লাগেনি, কিন্তু লাগেনি বলে বিরক্ত’ও হচ্ছেন অনেকে, যাদের ভালো লেগেছে। আমার ভালো লাগেনি, আমি এটা ব্যোমকেশ-অবগত বাঙালি বিশুদ্ধবাদী হিসেবে বলছি না। বলছি সিনেমার ও গোয়েন্দা গল্পের ভক্ত হিসেবে। কিন্তু তার আগে অনেকের আপত্তির থেকে নিজেকে একটু তফাতে অবস্থিত করা যাক। ব্যোমকেশের গল্পের একজন একনিষ্ঠ ভক্তের আপন মনের মাধুরি মেশানো ফ্যানফিক্‌শনে আমার আপত্তি নেই – বরং এই ছবিটি দেখতে যাওয়ার সময়ে সেটাই আমি আশা করেছিলাম। আমার চল্লিশের গল্পে ডেথমেটাল ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর নিয়ে কোনো অসুবিধে নেই (আমি কোয়েন্তিন তারান্তিনোর ছবির ভক্ত)। ভারতীয় পিরিয়ড ফিল্মের সাথে জাপানি ইয়াকুজা ছবির জঁর-মিশ্রনে আপত্তি নেই, এই ধরণের পরীক্ষা আমাকে আমোদ দেয়। ইতিহাসের কল্পিত সংস্করণে আমার আপত্তি নেই – তারান্তিনোর ‘ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ড্‌স’-এর শেষে হিটলার সমেত তাবৎ নাৎসীবাহিনী একটি সিনেমা হলে ইহুদীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায়, এটি আমার অন্যতম প্রিয় ছবি। 

কিন্তু ইতিহাস (এবং সিনেমার ইতিহাস) সম্পর্কে অনবগত বা উদাসীন হলেই দিবাকরের এই ছবিটির মত দায়সারা ব্যাপার হয় – তাই ১৯৪৩-র প্রেক্ষাপটে এই ছবিটিতে বিশ্বযুদ্ধ আছে কিন্তু ধর্মতলায় আমেরিকান জি আই নেই, ‘জয় বাংলা’ নামে একটি রাজনৈতিক দল আছে কিন্তু ভারত ছাড়ো আন্দোলনের কোনো অভিঘাত নেই, গান্ধিজি আছেন নেতাজী নেই, বোসপুকুরে খুন হয় কিন্তু অভুক্ত লাশেদের মন্বন্তর নেই, গ্রামপতনের শব্দ নেই, গাঙে মরা নেই তাই গঙ্গায় নায়িকা সাতার কাটতে ঝাঁপ দেন অনায়াসে। ঐতিহাসিক প্রামাণ্যতার প্রশ্ন বাদ দিলেও ব্যোমকেশ-অজিত-সত্যবতীর মধ্যে কোনো রসায়ন নেই; রহস্য সন্ধানে মেথড নেই তার বদলে সাংবাদিকতার ন্যায় তথ্য উন্মোচন আছে; সন্দেহভাজনের তালিকা একটি গোয়েন্দা গল্পে ভীষণ ছোটো কারণ মূল চরিত্রের বাইরে অন্য চরিত্রদের সময়ই দেওয়া হয়নি যে তারা ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠবে; একটি রহস্য কাহিনীতে প্লটের গভীরতাহীনতা আছে যা অন্তত গোয়েন্দা গল্পের শতাধিক বছরের ইতিহাসের পর মেনে নেওয়া যায়না। প্লট জটিল নয় অথচ আখ্যান জটিল; সম্পাদনার সময়ে এমন অনেক শট আসে যা আসার কথা নয় (বিরতির আগে দ্রুত মন্তাজে ব্যোমকেশের আলোকপাতের মুহূর্তে কয়েকটি শট আসলে ক্লাইম্যাক্সের); শহর দেখানোর সময়ে অযথা ফোকাসের অগভীরতা যার ফলে মনে হয় হয়তো অদূরেই ২০১৪-র কলকাতা তাই এই ধোঁয়াসা – অভিজ্ঞতাটি উপভোগ্য হয়নি। কিন্তু এইসব নিয়ে কথা বলার জন্য এই লেখার অবতারণা নয়। আমি শুধু একটি বিশেষ সূত্র নিয়ে কথা বলবো।

ব্যোমকেশ প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে ফিল্ম নোয়া্র (film noir) প্রসঙ্গটা বারবার আসছে। দিবাকরই এনেছেন, বলেছেন তিনি একটি ‘বেঙ্গলি নোয়া’-র রচনা করতে চান ব্যোমকেশ ও সমসাময়িক পাল্প ফিকশন অবলম্বনে। আমার এই প্রসঙ্গেই কেন বিশেষ অসুবিধে আছে, সেটা গুছিয়ে বলা যাক। তার জন্য একটু ইতিহাস বলতে হবে, অপ্রাসঙ্গিক হবে না আশা করি।

ফিল্ম নোয়া জিনিসটা একধরণের জঁর বা গোত্র নাকি একধরণের স্টাইল বা শৈলী সেটি নিয়ে ধন্দ আছে, দুইয়ের দিকেই যুক্তির পাল্লা ভারি। জঁর হলে তার একটি বিশেষ জগত তৈরি হয় – চরিত্র, প্রেক্ষাপট, আখ্যানভঙ্গী, গল্পের উপাদান নিয়ে; আর শৈলী হলে সেটা যে কোনো ধরণের গল্পেই ব্যবহার করা যায়। বস্তুত, ফিল্ম নোয়ার যাত্রাটি ভীষণ বিচিত্র, সেটি নিয়ে সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করছি।

১৯৪০ ও ’৫০-এর দশকের হলিউডে যে বিশেষ এক গোত্রের ছবি তৈরি হচ্ছে তা নিয়ে সেইসব ছবির নির্মাতারাও ততটা সচেতন ছিলেন না। ফরাসি চলচ্চিত্রামোদী লেখকেরা এই গোত্রটিকে রীতিমত আবিষ্কার করেন পঞ্চাশের দশকে (যে জন্যে একটি আমেরিকান জঁরের নাম ফরাসি), সেটাও হয়েছিল একটি বিচিত্র পরিস্থিতির ফলে – বিশ্বযুদ্ধ মধ্যবর্তী সময়ে জার্মান অধিকৃত প্যারিসে আমেরিকান ছবির প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল যা যুদ্ধের পরে উঠে যাওয়ায় এতদিনের না-দেখানো আমেরিকান ছবি প্রায় প্লাবনের মত প্যারিসের হলগুলি ভরিয়ে দেয় যুদ্ধের পর। এতে এক বিচিত্র পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল – পার্শ্ববর্তী দুটি হলে যে দুটি আমেরিকান ছবি চলছে তাদের মধ্যে ফারাক হয়তো দশ বছরের। এছাড়া সিনেমাথেক ফ্রঁসে ও তার কর্ণধার অঁরি লাংলোয়া তো আছেনই, যিনি শুধু অর্ধশতকের ছবির যত্নশীল সংগ্রাহক ও টীকাকারই ছিলেন তাই’ই নয়, তিনি সাধারণ দর্শকদের নামমাত্র মূল্যে ছবিগুলি দেখতেও দিতেন। ফলে এই সময়েই ফরাসি সিনেফিলদের সুযোগ হল প্রায় দেড় দশকের আমেরিকান ছবি পাশাপাশি দেখে ফেলার এবং সেখান থেকে কিছু প্যাটার্ণ লক্ষ্য করার। মূলত অস্তিত্ববাদী ও সুররিয়ালিস্টরা একধরণের আমেরিকান ছবি লক্ষ্য করলেন যেগুলি আঁধারাকীর্ণ, ধোঁয়াটে নাগরিক অস্তিত্ব এবং অবদমিত হিংসা ও যৌনতার একটি প্রকাশ। কালো/অন্ধকার ছবি – ফিল্ম নোয়া – তারা নাম দিলেন। এই নামকরণের সাথে একটি উপন্যাসকেন্দ্রিক স্ক্যান্ডালের যোগ আছে – সেটি উহ্য রেখে বলা যায় যে এই ফিল্ম নোয়ার পূর্বসূরী হল ‘রোমান নোয়া’ বা অন্ধকারাচ্ছন্ন উপন্যাস। 

যাই হোক, এই বিশেষ ছবিগুলির নির্মাতারা – পরিচালক ও আলোকচিত্রী মূলত – দেখা গেল বেশিরভাগই ইউরোপীয়, যারা যুদ্ধের সময়ে হলিউডে প্রায় শরনার্থী হয়েছিলেন, এবং তাদের অনেকেই হয় ইহুদি, নয় বামপন্থী। তাদের তিক্ত, নিরাশাবাদী, ইউরোপীয় চোখ দিয়েই তারা আমেরিকাকে দেখতে থাকলেন। আশ্চর্য ব্যাপার, অনেকক্ষেত্রে জার্মান এক্সপ্রেশনিজমের অ-বাস্তবোচিত শৈলী হলিউডের বাস্তববাদী ছবির সাথে যুক্ত হল। এছাড়া ফরাসি কাব্যিক বাস্তববাদের একধরণের প্রভাব পড়লো এইসব ছবিতে। জন্ম হল ফিল্ম নোয়ার – যে জন্মের কথা তার জনকেরাও সচেতনভাবে জানতেন না।

কিন্তু কোন ধরণের গল্প কেন্দ্র করে এই ছবিগুলি বানানো হল? এখানেই ব্যোমকেশের প্রসঙ্গ খাটে বেশি, দেখা গেল যে একটি বিশেষ ধরণের গোয়েন্দা গল্প কেন্দ্র করে ছবিগুলি বানানো হচ্ছে। এই গোয়েন্দা গল্পগুলি আদ্যন্ত আমেরিকান – এবং কোনান ডয়েল বা আগাথা ক্রিস্টির উপন্যাসের সাথে তার মিল যতটা অমিল ঢের বেশি। এই ব্যাপারটা বুঝলেই বোঝা যায় কেন ব্যোমকেশের সাথে নোয়ার প্রসঙ্গ আসে বা আসেনা।

ব্রিটিশ মডেলের গোয়েন্দা গল্পের কেন্দ্রে যে ধরণের চরিত্র থাকেন – শ্রেষ্ঠ উদাহরণ অবশ্যই শার্লক হোম্‌স বা আমাদের ফেলুদা – তিনি পাশ্চাত্ত্যের ব্যক্তিসাতন্ত্রবাদের পরাকাষ্ঠা ধরে নেওয়া যায় – তীক্ষ্মবুদ্ধিসম্পন্ন, আবেগহীন, যুক্তিবাদী একজন মানুষ, মগজাস্ত্রই যার প্রধান আয়ুধ। তিনি আসেন – এইটে জরুরি, তিনি এমন একটি স্থানে, অঞ্চলে, পরিবারে আসেন যেখানে তিনি আগন্তুক – দ্যাখেন, জয় করেন। ইতিমধ্যে একটি অপরাধ ঘটেছে বা রহস্যের উদ্গম হয়েছে, যার সাথে সংশ্লিষ্ট চরিত্রগুলিকে হাফ-ব্লাইন্ড বলা যায়, গোয়েন্দা সেখানে শুধুই প্রখর দৃষ্টিশক্তিতে বলীয়ান নন, তিনি যৌক্তিকভাবে, নিরাসক্তভাবে দেখতে জানেন – তাই সত্য তার কাছে ধরা দেয়।

এ আমাদের চেনা মডেল – ফেলুদা বা ব্যোমকেশ এই মডেলেই পড়েন। কিন্তু আমেরিকান ধারায় একটি নতুন নায়ক দেখা গেল। এই নায়ক হয় প্রাক্তন পুলিশ নয় যুদ্ধফেরত প্রাক্তন সৈনিক। হোম্‌সের মত অ্যাডভেঞ্চার ও বুদ্ধির অভিযানের উত্তেজনা তার নেই ততটা। তার পেশা গোয়েন্দাগিরি – শখের গোয়েন্দা তিনি নন, নিজের পেশার প্রেমে সে পড়ে নেই। তাকে ভাড়া করা যায় বিভিন্ন কাজে, অনেক ক্ষেত্রেই কেসের ব্যাপারে তার চয়েস থাকেনা জীবিকা বাঁচিয়ে রাখার জন্যে। পুলিসের সাথে তার সম্পর্ক গোলমেলে, যদি পুলিশের চক্ষুশূল বেশি হয়ে ওঠা হয় লাইসেন্স হারানোর ভয় থাকে। ড্যাশিয়েল হ্যামেটের স্যাম স্পেড বা রেমন্ড শ্যান্ডলারের ফিলিপ মার্লো এই ধরণের চরিত্র। এই গোয়েন্দা একাকী, তিক্ত, বিষন্ন একটি চরিত্র – একটি পতিত সমাজে টিকে থাকা নাইটের মত এই নায়ক অন্ধকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় – মার সে যতটা দিতে জানে যুদ্ধের অভিজ্ঞতাই হয়তো তাকে মার খেয়ে টিকে থাকতে শিখিয়েছে বেশি।

এই নায়কের চারণক্ষেত্র – এখানেই ব্রিটিশ মডেলের থেকে প্রধান তারতম্য – প্রধানত মেট্রোপলিটান শহর। এমন একটি শহর যার অলিগলি হাতের তালুর রেখার মত চেনা এই নায়কের, অথচ যা বৃহত্তর ইতিহাসের টানে পালটে অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে। খানিকটা মিল পাওয়া যেতে পারে সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্ধী’-র সিদ্ধার্থের সাথে। এই ধরণের গোয়েন্দা গল্পে বেশিরভাগ সময়েই এই চেনা শহরের দুঃস্বপ্নের নগরী হয়ে ওঠার সাথে যুঝতে থাকে, সেই শহর থেকে নায়কের বিযুক্তির আখ্যান পাই আমরা। অনেক ক্ষেত্রেই নায়ক দ্যাখেন যে হয়তো সামান্য একটি ব্ল্যাকমেলের কেস থেকে বা পরকীয়ার গল্প থেকে এক শহর জোড়া দুর্নীতি, অপরাধচক্র, অভিসন্ধির জালে সে জড়িয়ে পড়ছে; পরতের পর পরত রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে যেখানে – আবার একটি পার্থক্য – সব চরিত্রই তার থেকে হয়তো বেশি জানে, তার না জানাটাই হয়ে ওঠে প্রধান রহস্য। এবং অনেক ক্ষেত্রেই এই নাগরিক ভুলভুলাইয়ার যক্ষের মত আসে এক নারী – ফরাসিরা নাম দিলেন ফাম ফাতাল (femme fatale) – এমন এক কুহকিনী যে যেন এই কপট শহরেরই প্রতিমূর্তি। এইবার যে ঘটনাটি অনেক ক্ষেত্রে ঘটে তা ব্রিটিশ মডেলের গোয়েন্দার ক্ষেত্রে ঘটবে না কখনো – নায়ক প্রেমে বা যৌনসম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এই নারীর সাথে। শেষে শহরের কুহকের সমাধান না ঘটুক, এই নারীর রহস্যের উন্মোচন তাকে করতেই হয়, এই নারী ও রহস্যের পাকচক্র থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য।

বিপন্ন পৌরুষ, কুহকিনী নারীর স্বকীয়তা এবং পরিবর্তমান অধঃপতিত নগর – এই তিনটি এই ধরণের গল্পের প্রধান উপাদান, সেখানে গোয়েন্দার বিজয়াখ্যানের চাইতে তার সারভাইভালের গল্প, ক্ষতবিক্ষত হলেও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেঁচে ফেরার গল্পই প্রধান হয়ে ওঠে। নায়কের এই অস্তিত্ত্ববাদী অভিজ্ঞতায় ইন্ট্রোস্পেকশন জরুরি বলেই আরেকটি প্রধান পার্থক্য রচিত হয় ব্রিটিশ মডেল থেকে – যা আগের মডেলে অসম্ভব – আমেরিকান গল্পগুলি অনেকসময়েই এই সহকারীহীন একাকী নায়কের প্রথমপুরুষে রচিত, যেহেতু আত্মকথন সেখানে জরুরি। এটা ফেলুদা, হোম্‌স বা ব্যোমকেশে টেকনিকালি অসম্ভব প্রায়, কারণ তাহলে গোয়েন্দার বিশ্লেষণের হদিশ আমরা শেষ দৃশ্যের অনেক আগে থেকেই পেতে আরম্ভ করবো। আমেরিকান গল্পগুলিতে ক্রমবর্ধনাম ধোঁয়াসা, নায়কের নিষ্পৃহতার অসম্ভাব্যতা, তার আবেগের বল্গাহীন প্রকোপ যেহেতু বেশি জরুরি ফার্স্ট পার্সন ন্যারেশন তাতে যায় ভালো। ফিল্ম নোয়া এই প্রতিটি উপাদানের পুংখানুপুঙ্খ সিনেমাটিক রূপ দেবে – ক্লান্ত পুরুষকন্ঠের ভয়েস ওভার (যা অনেকক্ষেত্রে গল্পের নিষ্পত্তি হওয়ার পর ফিরে দেখা), আলো-আঁধারির নাগরিকতা (যা বিপন্নতা ও নৈতিক ধূসরতার রঙ), ফ্ল্যাশ-ব্যাক (কারণ তা ব্যক্তিচরিত্রের মনস্তত্ত্বের দিকে ইঙ্গিত দেয়), একরৈখিক আখ্যানের পরিহার, লাইটিং-য়ের মাধ্যমে চরিত্রকে প্রেক্ষাপটের চাইতে কম বা সমান গুরুত্ব দেওয়া (কারণ চরিত্রের নিস্তার নেই, সে তাই’ই শহর যেভাবে তাকে রচিত করবে), এমন যৌনসম্পর্কের গল্প বলা যা বিবাহে প্রতিষ্ঠিত হবেই না, ভায়োলেন্স যা অবদমিত কিন্তু মাথাচাড়া দিলে ভয়ংকর, তা পরাজয়ের সম্মুখে জিত যতটা, ততটা দুষ্টের দমনের শীর্ষক নয়।

ষাটের দশকে অদ্ভূতভাবে নোয়া চলে যায় পিছনের দিকে। ১৯৫৮-র ‘টাচ্‌অব ইভিল’-কে নোয়ার প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি ধরে নেওয়া যায় – যেখানে ভিলেন আর কেই বা হতে পারে, দোর্দন্ডপ্রতাপ গোয়েন্দা ছাড়া? নোয়ার নায়কের অন্ধকারে পতনের যে সম্ভাবনা ছিলই – দুদশক ধরে নায়কের দড়ির উপর দিয়ে হাঁটার পর – তার গল্প বলেন অরসন ওয়েল্‌স। বোঝা যায় যে নোয়ার অবতলে আসলে – ম্যাককার্থিবাদের প্রেক্ষিতে – ক্যাপিটালিজমের একটি সুপ্ত সমালোচনা চলছিল – লোভ, স্বার্থ, নাগরিক দূর্নীতি, রাজনৈতিক ও নৈতিক স্খলনের এই গল্পগুলিতে একটি কেস্‌সল্ভ করে গোয়েন্দা status quo আনতে পারেন না, বরং এই অপরাজিত অন্ধকারই তার অভিজ্ঞতায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

যুদ্ধপরবর্তী বিষন্নতা, পারিবারীক কাঠামোয় ঘূণ ধরে যাওয়া এই আমেরিকার অবতলের গল্প শীতল যুদ্ধের শুরুতে যেমন পরিপক্ক হয়েছিল, সেভাবেই ষাটের যুববিদ্রোহ, কাউন্টার-কালচারের অবসান হওয়ার সময়ে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের প্রতি সন্দেহে, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় দূর্নীতির উন্মোচনে এবং সার্বিক শীতযুদ্ধকালীন প্যারানোইয়ার উত্থানে নোয়া আবার ফিরে এলো ষাটের শেষে ও সত্তরে।

কিন্তু এবার একটা বড় পার্থক্য দেখা গেল। পরিচালকরা এখন তরুণ – অনেকক্ষেত্রেই তারা স্টুডিওর শিক্ষানবিশি থেকে শুরু না করে ফিল্ম স্কুলের ছাত্র। পঞ্চাশের ফরাসি তাত্ত্বিকদের লেখা তারা পড়ে ফেলেছেন, দেখে ফেলেছেন সেই সিনেফিলিয়ার ফলশ্রুত ফরাসি নবতরঙ্গের ছবিকে – যেখানে নোয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এই পরিচালকেরা ফিল্ম নোয়ার ধরণধারণ নিয়ে হয়ে উঠলেন অতিসচেতন, যা প্রথম অধ্যায়ের পরিচালকরা – অর্থাৎ নোয়ার পিতারা – ছিলেন না। অর্থাৎ এবার নোয়া সচেতনভাবে একটি জঁর হয়ে উঠলো। আরেকটি বড় পার্থক্য – সাদা-কালোর যুগ চলে গেছে। সেই অবিস্মরণীয় নোয়া সিনেমাটোগ্রাফি এবার করতে হবে রঙে। দ্বিতীয় পার্থক্য – ভায়োলেন্স ও যৌনতা নিয়ে আগের কড়া সেন্সরশীপ’ও আলগা হয়ে গেছে। মেথড অ্যাক্টিংয়ের ফলে পালটে গেছে নায়কের বিগত পার্সোনা। নৈতিক স্খলন, নারীর যৌন আগ্রাসন ও পৌরুষের বিপন্নতা এখন নতুন অভিনয়ের রীতিতে নিউরোসিসের রঙে রাঙিয়ে নেওয়া সম্ভব। এবার তৈরি হবে ‘নিও-নোয়া’ – যার অন্যতম চূড়ান্ত ক্রিস্টোফার নোলানের ‘মেমেন্টো’-য় – যেখানে গোয়েন্দা নিজের অপরাধেরই তদন্ত করে এবং অদৃশ্য করে সমস্ত সূত্র, নিজেকে নির্মাণ ও বিনির্মাণের গল্পের লুপে ঘূর্ণায়মান একটি নিষ্পত্তিহীন গল্পে।

১৯৮০-র দশকের পর থেকে দেখা যায় – বিশ্বায়নের পর সারা বিশ্বে মেট্রোপলিটান জীবন প্রায় এক ধাঁচের হয়ে যাওয়ার পর – নোয়া সারা পৃথিবীর ছবিতেই প্রায় একধরণের গ্লোবাল শৈলী বা গোত্র হয়ে উঠেছে। এই বিচিত্র ইতিহাস সম্পর্কে অবগত থাকলে আরেকটি জিনিসও এড়িয়ে যাওয়া যায় – সেটা হল ফিল্ম নোয়া এবং গ্যাংস্টার জঁরের মধ্যে গুলিয়ে ফেলা, যা অনেকেই অহরহ করেন। দিবাকর ব্যানার্জির ছবিটিতে যে জঁরটি আসে তা হল গ্যাংস্টার – নোয়া নয়। 

ব্যোমকেশ থেকে বাঙালির নোয়া হয়? হতে পারে, কারণ প্রেক্ষাপট প্রায় এক। শরদিন্দুতে অনুগত হলে হয়? না, কারণ ব্যোমকেশ আমেরিকান মডেলটির গোয়েন্দা নন, আদ্যন্ত ব্রিটিশ মডেলটির ধাঁচে সে তৈরি – এক কথায় শার্লক হোম্‌সের বা লর্ড পিটার উইমসির মডেলে। তার সাথে শহরের সম্পর্ক মার্কিন গোয়েন্দার মত নয়, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার দুঃসহ ভার, তিক্ততা, বিষণ্ণতার ভার তার নেই, সে নিরাসক্তই থাকে। নারীদের সাথে বা বাস্তবের জটিলতার সাথে সে জড়িয়ে পড়েনা, নির্মোহ থাকতে পারে। নায়ক চরিত্রে দিবাকর যে পার্থক্যটা করে একটি অবশ্যম্ভাবী বাঙালি নোয়ার যে জন্ম দিতে পারতেন, তা পারেননি। লাভের মধ্যে ফিল্ম নোয়া বা নিও-নোয়া একটি আলগা কসমেটিক্‌স হয়ে রয়েছে মাত্র – সেই শৈলীর বিশ্ববীক্ষাটি গেছে হারিয়ে। এই বিশ্ববীক্ষাটিই নোয়ার আসল সম্পদ, আলগা শৈলী নয়। লাভের মধ্যে একধরণের চলচ্চিত্রীয় অজ্ঞতার শিকার হচ্ছি আমরা।

দিবাকরের ব্যোমকেশ নোয়ার নায়ক নয়। স্বস্তিকার চরিত্রটি ফাম ফাতালের অসমাপ্ত ও অপটু স্কেচ মাত্র। শরদিন্দুর খলচরিত্রচিত্রায়নে যে ধূসর জটিলতা থাকতো – যার সাথে নোয়ারিশ কল্পনার সাযুজ্য আছে – এই ছবির অবাস্তব অপ্রাপ্তমনস্ক ভিলেনিতে তা ক্যারিকেচারে পর্যবসিত হয়েছ। নোয়া কখনোই উচ্চমনস্ক শিল্প নয়, শরদিন্দুও নন। কিন্তু জনপ্রিয় সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও নোয়া ও শরদিন্দুর ব্যোমকেশে প্রাপ্তমনস্কতা আছে, নেহাতই স্বপনকুমারের মত কিশোরবেলার ফ্যান্টাসি নয় তা। চৈনিক ড্রাগ মাফিয়ার মধ্যে যে পাল্প ছেলেমানুষি আছে, তার সাথে ব্যোমকেশকে না জড়ালেই ভালো হত। বস্তুত এই ছবির ভিলেনের সাথে মোগাম্বোর মিল বেশি, ব্যোমকেশের সাথে মিস্টার ইন্ডিয়ার।

এই প্রসঙ্গে বলি – জনৈক ব্লগার বলেছেন যে এখনকার গোয়েন্দার মুশকিল হল গ্রহণযোগ্য হতে গেলে একটি পরিবারের বা পাড়ার রহস্য সমাধান করলে হয়না, দেশের, জাতির বা বিশ্বের উদ্ধার করতে হয়। কপিরাইটমুক্ত শার্লক হোম্‌স নিয়ে কিছু অধুনান্তিক কল্পনার ফল এটা। দিবাকরকেও তাই করতে হয় – পূর্ব এশিয় গব্বর সিং রচনা করতে হয় তাকে ব্যোমকেশের প্রতিপক্ষে। একটু যদি পিছন ফিরে তাকাই, তাহলে ১৯৪০-য়ের দশক হল এমন একটা সময় যখন বাঙালি যে শুধুমাত্র একটি ভিন্ন মডেলের আধুনিকতার সাথে ধাক্কা খাচ্ছে এই সময়ে তাই’ই নয়, বৃহত্তর রাজনীতিতেই তার ভূমিকা সংকুচিত হতে হতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নেতাজীর অন্তর্ধান এবং অন্তরাল থেকে বিপজ্জনক রণকৌশল, বামপন্থীদের স্বাধীনতা ও সংগ্রাম নিয়ে মৌলিকভাবে ভিন্ন অবস্থান, যুদ্ধ, মন্বন্তর, আশু দাঙ্গা ও দেশভাগ – এই সময়টা বাঙালির রাজনৈতিক অসহায়তা ও বিমূঢ়তার সাক্ষ্য বহন করে। আজকের ফ্যান্টাসিতে ব্যোমকেশ তখন দেশোদ্ধার করলেন! অজিত তাকে বললো – “তুমি তো কলকাতাকে বাঁচালে!” যখন কার্যত কলকাতা ভঙ্গুর হয়ে উঠছে – মানিক, কল্লোল গোষ্ঠী ও জীবনানন্দের লেখা যেই ভাঙনের সাক্ষ্য বহন করবে। এই ফ্যান্টাসি খানিকটা ইতিহাসের ক্ষতে ব্যান্ডেজের মত – ক্ষত ঢেকে দিলেও সেখানেই যে ক্ষত আছে তার দিকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন হল এই ফ্যান্টাসি এখন রচনা করতে হচ্ছে কেন, সেটাই বা কিসের সিম্পটম।

 



476 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ আলোচনা  বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: পরিচয়

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

প্রচুর ভাবনার খোরাক দিয়ে গেলে। এবং অনেক বিশদে লিখেছ। আমাদের বারে তুমি ওয়েস্টার্ন পড়িয়েছিলে, নোয়া নয়। ভালই হল, এতে তোমার নোয়া সম্পর্কে চিন্তাভাবনাও খুঁজে পাওয়া গেল। আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় দিবাকর পূর্ব এশীয় উপাদানের উপরে একটু বেশি জোর দিয়েছেন, এবং সেটাই ছবিটাকে কিছু স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। তবে পূর্ব এশিয়ার ছবি শুধুই মিকে, রাতানারুয়াং, ওয়াং কার ওয়াই (দ্য গ্র্যান্ডমাস্টারের প্রেক্ষাপট ভাবো, আর এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখ) বা ফিফথ জেনারেশন চাইনিজ ছবি নয়, এর বাইরেও সিনেমা আছে, যে বিষয় সম্পর্কে আমাদের ফিল্মমেকাররা উদাসীন।
Avatar: Tim

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

আবারো যথারীতি ভাবনার খোরাক পেলাম এবং Noir সম্পর্কে যে জিনিসগুলো হয় আগে পড়া হয়নি বা ভুলে গেছিলাম সেগুলো লেখক মনে করিয়ে দিলেন। ভালো লাগলো, ধন্যবাদ।
তবে এর সঙ্গে আরেকটা কৌতূহলও হচ্ছে। টেকনিকালি সিনেমাটা একটি বিশেষ সংজ্ঞায় পুরোপুরি উত্তীর্ণ কিনা সেটা কি তার সার্থকতায় বিচার্য হতে পারে? স্বস্তিকার চরিত্রটি বা ভায়োলেন্সের প্রকাশ বা নয়ার গোত্রটির প্রতি বিশ্বস্ততা এক্ষেত্রে কতটা প্রাসঙ্গিক? ব্যোমকেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গোলমালগুলো এবং সে সম্পর্কে আপত্তি আমি বুঝি। বা গল্পের শৈথিল্য। কিন্তু সিনেমার ক্লাসিফিকেশন সংক্রান্ত আলোচনায় একটি বিশেষ খোপে ছবিটিকে ফিট না করাতে পারার অস্বস্তি/আপত্তি বরং আমায় ছবিটি সম্পর্কে আরো উৎসহিত করে, গবেষণার কথা ভাবায়।
Avatar: সুরজিত সেন

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

এই লেখাটি আগে পড়িনি। চমত্কার লেখা। পরিচয়ের কল্যাণে পড়তে পারলাম। তবে সত্যজিতের 'চিড়িয়াখানা'
ছাড়া বাকি বাংলা ব্যোমকেশ ফিল্মগুলো এতো খারাপ যে সে তুলনায় দিবাকর ইতিহাসের সব শর্ত পূরণ না করলেও অন্তত বসে দেখা যায় এরকম একটা সিনেমা করেছে। তবে এটাও মনে হয়, সিনেমা তো সাহিত্যের হুবহু অডিও - ভিস্যুয়াল ফর্ম নয়। একটা বলিউড মেনস্ট্রিম ফিল্ম মেকারের কাছ থেকে এর থেকে আর কীইই বা আশা করা যায়।
Avatar: সে

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

Film noir (/fɪlm nwɑr/; French pronunciation: ​[film nwaʁ])
নোয়া নয়।
Avatar: I

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

আমার মত গোলা লোক লেখাটি পড়ে যার পর নাই খুশী হল। অসম্ভব সহজ করে একটি ফিল্ম ক্লাস নিয়েছেন লেখক, এবং এই তরতরে সহজপাঠ্যতার পেছনে তাঁর তরিবত স্বচ্ছন্দে লুকিয়ে রেখেছেন। ফলতঃ আমার এই ধারণাই আরো সার-জল পেল যে, যিনি বিষয়টি ভালো বোঝেন, তিনি, শুধু তিনিই জলের মত করে পাঁচ পাব্লিককে সেটা বোঝাতেও পারেন। জার্গনের ইঁট-পাথর তাঁর দরকার পড়ে না।
Avatar: amitabha kar

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

লেখকের শেষ বাক্যটি ভয়ংকর রকমের অর্থপূর্ণ। প্রাঞ্জল ভাষায় এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের অবগত করানোর জন্য অনিন্দ্যকে আন্তরিক কুর্নিশ।
Avatar: Anindya Sengupta

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

আমি ছবিটির সার্থকতা বিচার করতে চাইনি একদমই। আমার কাছে ছবিটি সফল নয়, কিন্তু বহু জায়গায় দিবাকর ব্যানার্জী এই ছবিটির মাধ্যমে যে 'বেঙ্গলী নোয়া'-র সূত্রপাত করার কথা ভাবছেন সেটি আমার কাছে কৌতুহলোদ্দীপক লাগছে, কারণ আমি মনে করি যে কলকাতায় চল্লিশের দশকের প্রেক্ষিতে এই কল্পনাটা অসম্ভব নয়।
মূলধারার ছবিতে, বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রির কর্পোরেটাইজেশনের একটা স্তরের পর, জঁর অত্যন্ত জরুরী জিনিস হয়ে ওঠে - প্রোডাকশনের যুক্তিতেই। ছবিগুলি জঁরকেন্দ্রিক জগতটাকেই নির্মাণ করতে করতে, তারপর তার সাথে খেলতে খেলতে, ছাড়িয়ে গিয়ে, অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে নানান কাজ হতে পারে। যেমন ধরুন 'সত্যা'-র পর থেকে হিন্দি গ্যাংস্টার ছবি যে স্বকীয়তা পায় তার পরিচিতি না থাকলে 'মকবুল' বা 'জনি গদ্দার' বোঝা যায়না, অথবা সত্যজিতের 'কাপুরুষ' বা মৃণাল সেনের 'আকাশকুসুম' একমাত্র বাংলা রোমান্টিক ছবির গোত্রের সচেতনতার নিরিখেই অর্থবহ হয়ে ওঠে, সিঙ্গুলার টেক্সট না হয়ে।
কিন্তু সেটা একমাত্র সম্ভব একটি জঁর প্রতিষ্ঠিত থাকলে। জঁরভুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে একতি ছবির রেজিস্ট্যান্স বা চ্যালেঞ্জ তৈরি করাটা কিন্তু একটি জঁরের সূত্রপাতের সময়ে একটি ছবি কিছুতেই করতে পারবেনা।
এই ছবির আলোচনাতেও নোয়া সিনেমাটোগ্রাফির আলোচনা এসেছে বারবার, পরিচয়ের লেখাতেও আত্র উল্লেখ আছে। অতএব শৈলীটিও একটি ইতিহাসের বোঝা নিয়েই আসে - সেটা এড়িয়ে গিয়ে ছবিটা পড়াই যাবে না, দেখা গেলেও। তাই ব্যাপারটা খতিয়ে দেখা।
Avatar: su

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

অনেক দিন আগে একটা ওড়িয়া গান পপুলার হয়েছিল ।। 'নোয়া নোয়া " মনে পরে গেল :)
https://www.youtube.com/watch?v=0akH1CewjWs

Avatar: su

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

সরি খিল্লি করা তা উচিত হয় নি।। লেখা টা পরে ঋদ্ধ হয়েছি ।। কিন্তু "noir " এর নোয়া র নৌকায় ওঠা টা পছন্দ হয়নি।।
Avatar: Tim

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

অনিন্দ্যবাবু,
হ্যাঁ আমি পরে দেখলাম বেঙ্গলী নয়্যারের সূত্রপাত সংক্রান্ত কথাটা। লেখার সময় খেয়াল ছিলোনা। শৈলীর কথাটা যা বললেন, সেইটাই মূল প্রশ্ন ছিলো আমার। যে, যদি নয়্যারের দরকারী চিহ্নগুলো একটি সিনেমা অর্জন না করে, তাহলে কী হবে। দ্বিতীয় প্যারা এবং উদাহরণগুলোর পরে বুঝতে সুবিধে হলো। ধন্যবাদ। আরো এরকম সিনেমার পাঠের অপেক্ষায় থাকবো।
Avatar: su

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

@অ্যাডমিন উপরে গানের লিংক টি ডিলিট করুন প্লিয়াসে।
Avatar: গোলা বাংগালী

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

লেখককে ধন্যবাদ। গোলা বাংগালীও কিছু ভাববার সাহস পাচ্ছে। আরো লিখুন।
Avatar: Anindya Sengupta

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

Noir শব্দটির উচ্চারণ কি হবে তাই নিয়ে দ্বিধাহীন হতে google translate খুলুন। বাঁদিকের খোপে টাইপ করুন Black, ডানদিকের খোপটিকে 'French' করে দিন। Noir ভেসে উঠবে, এইবার ডানদিকে ওপরেই একটি স্পিকার আইকন আছে - ক্লিক করুন, নিশ্চিত হওয়া যাবে।
Avatar: Anindya Sengupta

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

'নয়্যার' অনেকক্ষেত্রেই মার্কিনিরা বলেন - তারা বেশিরভাগ সময়েই অন্য ভাষাভাষিরা কিভাবে নিজেদের শব্দ উচ্চারণ করে তাতে বিশেষ পাত্তা দেননা। বা অশিক্ষে থেকে বলেন, বা পারেননা বলে বলেন :)
Avatar:  Dirichlet

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

ফরাসীরা ভারি কোমল তারা আর উচ্চারণ করেন কি?
Avatar: PM

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

বাজারে চলতি খবর অনুযায়ী সাধারনত শেষে e না থাকলে ফরাসীতে লাস্ট কনসোনেন্ট উচ্চারন হয় না। ব্যতিক্রম f,r,l,c র ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে শেষে e না থাকলেও শেষ কনসোনেন্ট উরুশ্চারন হয় (বেশীর্ভাগ ক্ষেত্রে) বলে লোকে দাবী করে।

তবে এক্ষেত্রে r এর উরুশ্চারন বাংলা "র" এর মতো নয় মোটেই। এই স্বরধ্বনী বাংলায় নেই বলেই খবরে প্রকাশ। ফোনেটিকালি বাংলা 'খ' এর উচ্চারন বরং এই ফরাসী r এর উচ্চারনের কিছুটা কাছাকাছি । ফরাসী শিখতে গিয়ে বাঙালীর জিভ, এই "r" এই প্রথম ধাক্কা খায়----প্রাচীন অরন্যের প্রবাদ

অনিন্দবাবুর লেখা পড়ে অনেক কিছু জানলাম। তবে বৌএর সাথে সপ্তাহান্তে হিন্দি সিনিমা দেখতে হলে এতো কিছু জানতে হবে!!!! আমার মতো গন্ড মূর্খের কাছে কেলো-ই বটে ঃ)
Avatar: Shree Shambo

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

অসম্ভব ভাল লাগল। আমাদের মত মানুষের জন্য জরুরী ক্লাস। এত সহজভাবে লিখেছেন... । তবে শেষের লাইনটা নিয়ে একটা খুকখুকানি থেকে গেল- " প্রশ্ন হল এই ফ্যান্টাসি এখন রচনা করতে হচ্ছে কেন, সেটাই বা কিসের সিম্পটম"। আমার তো মনে হয়- সিম্পটম-ফিম্পটম নয়, এটা একটা কায়দা ছাড়া কিছু নয়। ওই Guy Ritchie' র দেশী ভার্সন হবার চেষ্টা। অনেক সময় আমরা অনুপ্রানিত হয়ে কবিতা-টবিতা লিখে ফেলি- অনেকটা সেই রকম। ইয়াশ রাজ আবার পয়সা ঢেলেছে ! সাধারণের মধ্যে অসাধারণ হবার চেষ্টা করলেই ল্যাটা চুকায়। দিবাকর সে রাস্তায় যান নি। ফলে অসাধারণের মাঝে সাধারণ হয়েছেন।
যাইহোক, আপনার পরবর্তী লেখার আশায় রইলাম। আবার বলছি- বড্ড উপকারী লেখা।
Avatar: র

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

অনিন্দ্য বাবু অসাধারণ লিখেছেন। ছবির জ্যঁর সম্বন্ধে অজ্ঞান অবস্থাতেই দিব্যি অ্যামেরিকান নয়্যার দেখে রোংটা খাড়া করেছি। দিবাকরের 'বাক্সি' সম্বন্ধীয় মাত্র দুটি ব্যাপারই আমাকে চিন্তিত করেছে... এক, বাক্সি ও অজিত/ সত্যবতীর সম্পর্কে রসায়নহীনতা। দুই, বাঙালি গোয়েন্দাসুলভ দীর্ঘসূত্রী চিন্তাশীলতা ত্যাগ করে বাক্সি এমন কুইক উইটেড ও অকপট হতে গেলেন কেন।
Avatar: ranjan roy

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

অকুন্ঠ ধন্যবাদ। এরকম ফিল্ম ক্লাস আরো হোক।
Avatar: Manoj Bhattacharya

Re: দিবাকরের ব্যোমকেশ, ফিল্ম নোয়া এবং শৈলীর ভ্রান্তি

শজারুর গালিচা !

একটি হিন্দুস্থানী গল্প –

এক রাজার মাথায় দুটো সিং ছিল ।- চুল আর পাগড়ীর মধ্যে লুকোনো থাকত । কেউ জানত না । চুল কাটার সময় যে নাপিতরা কাটত – তাদের নাকি পরে কেউ দেখতেই পেত না । - কিভাবে এক নাপিত দিব্যি-টিব্যি করে ছাড় পেয়ে গেছিল । কিন্তু এদিকে নাপিতের তো পেট ফুলে যাচ্ছে – এমন আজব খবরটা কাউকে বলতে না পেরে । - অগত্যা সে গভীর বনে গিয়ে একটা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে – রাজাজীকা দো শিং হায় – বলতে লাগল । বলতে বলতে যখন ওর পেটটা একটু হাল্কা হল – তখন সে ফিরে গেল জনপদে ।
পরে কাঠুরিয়া গাছ কেটে নিয়ে গেল । সেই গাছের কাঠ দিয়ে তবলা-ঢাক ইত্যাদি হয় । কিছুদিনের মধ্যেই সেই গাছের কাঠ দিয়ে ঢাক তৈরি হল । ঢাকি ঢাক নিয়ে রাজসভায় বাজাতে গেল । আর ঢাক বেজে উঠল – রাজাজীকি দো শিং হায়! সবাই শুনতে পেল রাজার দুটো শিং আছে ।

সিরিয়াল সংযোজন –
দুর্যোধন রাগের চোটে মা গান্ধারীর কাছে গিয়ে জানতে চাইল – ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির কেন তাকে অজ-পুত্র বলেছে ! – গান্ধারী আর কিকরে ! সত্যবাদিনী বলেই দিলেন তার বৈধব্য কাটাতে কুরুর আগে একটা ছাগলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল । - ব্যস ! রাগের চোটে গান্ধারের রাজা রাজপুত্রদের ধরে কারাগারে নিক্ষেপ করা হল । শুরু হয়ে গেল শকুনীর চক্রান্ত – কি করে কুরু বংশের ধ্বংস হয় !

কেন এই কাঁদুনি –
শৈবাল মিত্রর শজারুর কাঁটা দেখতে গিয়ে বিমোহিত হয়ে গেলাম ধৃতিমানকে শারলক হোমস ও প্রদীপ মুখোপাধ্যায়কে ওয়াটসন ভুমিকায় দেখে । আমার মনে হল – এটাই ঠিক । শারলকের আত্মম্ভরি ভাব ধৃতিমানই ফোটাতে পেরেছে ।
সবে ভালো লাগতে শুরু করেছে – অমনি কোথা থেকে নন্দিনী চিৎকার করে উঠল – রাজা দোর খোল। কি পরিষ্কার উচ্চারণ ! - এ কী – ভুল সিনেমাতে ঢুকলাম নাকি ! এ তো রক্তকরবী ! – মনে হল কঙ্কনাকে দিয়ে নন্দিনী সাজাবার এক অপর্ণা-পরিকল্পনা ! হ্যাঁ – ওর নামও দেখেছি চিত্রনাট্য সহায়তায় !
স্বীকার করতেই হয় কঙ্কনার আমি ভীষণ ভক্ত । কিন্তু আমি আবার শরদিন্দুরও ভক্ত যে ! – পরিচালকের জন্যে লেখককে হত্যা আমার পছন্দ নয় ! শৈবাল মিত্র তো নিজেই একটা স্বনির্ভর সিনেমা বানাতে পারতেন। নাম দিতেন – শজারুর গালচে ! একেবারে বাংলা সিরিয়াল মার্কা সিনেমা করে কি লাভ হল !
কোথা থেকে এসে গেল – একদিকে স্টোনম্যান স্টাইল হত্যা – অন্যদিকে জোডিয়াক তদন্ত – আরেক দিকে এসে গেল শ্লিপ ওয়াকিং স্টাইল ! একটা লজিকাল উপন্যাসের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হল – রক্তকরবীর নাটকীয়তা ! অথচ সিরিয়ালের ব্যোমকেশ-সিরিজ কিন্তু এত নিকৃষ্ট মানের নয় !
রাজাজীকা দো শিং – প্রেম এবং শ্লিপ ওয়াকিং !

মনোজ ভট্টাচার্য



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন