বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

সমুদ্র ও পাঁচজন আমি

সোমনাথ রায়

(১)
    রাতের ঝাউয়ের বন ঘেঁষে বালিয়াড়ির পাদদেশে ধিকধিক বনফায়ার, ওদের পাঁচটা মুখে আগুনের লাল লেগেছিলো- এখন আর পাঁচটা মুখ নেই, বিয়ারের তোবড়ানো ক্যান হাতে গোড়ালি ভেজানো ঢেউয়ে আমি-এ সমুদ্র এমত বেহায়া- তেমনই ওরাও পাঁচজন বন্‌ফায়ারের হা-হা:-- পাঁচ কেন, ওরা চার, দুজোড়া কপোত-কপোতিনী, আমি তো ব্রাত্য ঐ দলে, অথচও লোক চাই, দর্শক; নিজেদের প্রেমগুলো নিয়ে দর্শক না দেখলে ফ্যান্টাসি মেটেনা ওদের। ওরাও সমুদ্রের মত— ঐ সমুদ্র, চাঁদের রিফ্লেকশন জলে ফসফস বলে ভুল হতে থাকে, হাওয়ায় পেট ফাঁপে ছেঁড়া ক্যারিব্যাগ যেন জেলিফিশ— এই সমুদ্র, চাঁদের আলোর পথ করে দেয় মানুষের কাছে, আমার কাছেও— লুনাটিক স্পৃহা সব সেই পথ ধরে হেঁটে গিয়ে অতলে তলিয়ে মরে যায়, মরে, তবু বেঁচে ওঠে তবু এই সমুদ্রের ধারে কাঠের আগুন থেকে হাওয়া বেয়ে ছিটকিয়ে যায় জ্বলন্ত জৈবযৌগ, ব্রেনের পাকগৃহ ঘিরে জৈব রিঅ্যাকশন হয়ে চলে, এসে পড়ে অসহ্য অতীত। এমনই সমুদ্র তার গাঢ় সব দুপুরের বেলাভূমি, স্নানের গোপন আর সেই সব কথা যেগুলো উহ্য রেখে সরে গিয়েছিলো আমার এইখান থেকে, আর কিছু ভাবিনা, আর কোনও স্বপ্ন দেখিনা, আর কোনও কান্না রাখিনি আগুনে— আর তাই সমুদ্র তার ঢেউয়ে ঢেউয়ে, ফ্যানায়, ঝিনুকে শরীরে ছুঁইয়ে দেয় অভুক্ত ফুলের বাগান। ফলের পসরা ছাড়া এ জীবন ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, তাই, বৃষ্টি শুরুর আগে সমুদ্র আমাকে বাড়ি ফেরার বাসে তুলে দেয়।

(২)
এই সমুদ্র ওকে আমার জীবনে জুড়ে দিলো তাই আমি সেদিনের রোদ মনে করে রাত্রিনীল বালির মাঝে ক্যাম্পের আগুন জ্বালালাম। মাথার ওপর দিয়ে চুরি করে স্নান দ্যাখা ঝাউয়েদের দীর্ঘশ্বাস  সব, আগুনের ফুল ওড়ে, ওর মুখে গিয়ে বসে উজ্জ্বল প্রজাপতি হয়ে, দারুণ আদর পেয়ে যায় আমাদের সেই কথাগুলো, বড়ো অনুচ্চারে, না শোনার মত করে আঙুলে আঙুল রেখে বলা। বৃষ্টি ভরা সাগর আমার, কেবল তোমারই নামে এঁকে যাবো প্রবল চুম্বন, প্রবল সমুদ্রস্নান, প্রবালের রঙ মনে পড়ে, মনে পড়ে আঙটিতে ঢুকে থাকা কিচি্‌কচে বালি অহৈতুকী আধুনিক গানে এই সমুদ্রে এক দিন। একদিনে দুখানি অপর আরও কতো কাছাকাছি এসে যায়, তটবর্তী পাঁচিলের পথ ফাঁকা হয় তখনই নিজের মধ্যিখান থেকে সব আমি ডুবে মরে গিয়ে সেই একজন জেগে ওঠে, গভীর রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে আমি তাকে ভেবে প্রণত হলাম।

ওই পেলিক্যান, শূন্য বিকেল জুড়ে
স্নানখেলা দেখে চলো,
তোমারও অতীত মনে পড়ে।
প্রতিটি বিকেল তার অতীতের
নিঃসঙ্গতা মেখে থাকে অবিরাম ঢেউয়ে.
পেলিক্যান, তুমি জানো নাকি
যখন সবাই শুয়ে পড়ে
এই সাগরের তীরে
অথবা, অন্য কোনওখানে
অন্য তটদেশে বা অন্য কোনও
নিস্তরঙ্গতা জুড়ে
পুরানো হাসির স্বর, ভুলে যাওয়া হাস্কি ভয়েস--
অবিরাম একা একা ঢেউদাগ ধরে
পথ হাঁটা— সবই থেকে যায়।
পেলিক্যান, তুমি দ্যাখো, মনে করো
সানরাইজের ভীড়, গুরুভার সূর্যপ্রণাম
আঁচলে যে রঙ লুকিয়েছে
তুমি জানো পেলিক্যান, অন্ততঃ
তোমাকে তো জানতেই হবে
এই সাগরের মতো সেই প্রেমও শরীরিনী
পুরোপুরি রক্তমাংসময়।


(৩)
ঝিরঝিরে বৃষ্টির পথ, কিম্বা ছিটে আসা নুনজল, যার মেমরিতে এখনো কোডেড আছে চোখের গ্রন্থিঘ্রাণ। এই পথ ধরে একবার তোকে পেয়ে গেছি, তাই প্রতিটি পদক্ষেপে শস্যের দানা ছুঁড়ে দিই — এই বৃষ্টিতে সব ফুল ফুটে যায়, এই বালুচরে যেদিকে তাকাস দেখবি হলুদে ফুলে ফুলে এমন স্পষ্ট করে তোর নাম লেখা— আমি ছাড়া কাউকেই ভাববিনা আর। যেমন আমিও। ঐ যে দূরে দ্যাখ তারার মতই জলের প্রান্তে সেই আলোখানি জ্বলছে-নিভছে, ওখানেই নিয়ে যাবো তোকে, চারিদিকে জল আর রাত্রি, কাঠের আগুন— ঝলসানো তেলাপিয়া, পোড়াভাত জাহাজির গুহা। ঐখানে আগুনের লালে তোর মুখে লেখা হয়ে গ্যালো মুক্তির দারুণ সত্তর। ঐ মুখ দেখে যদি সত্যিই পতাকা কোনও ভাবি— সেই নিশানকে ঘুম থেকে তুলে জাহাজের পথ ধরে ধরে সমুদ্রমথনে নিয়ে যাবো। মধুময় এমন রাত্তির, মধুঘেরা মুহূর্তখানি— এমনি দারুণ, এত বড়ো কিছু, শুধুই এরই তরে বাকি সবখানি, বিপ্লব, ঘরেফেরা, আর্তের চাকার কামনা— সব মুছে যায়— কেবল গলার কাছে পিরিত কাঁটাটি বিঁধে থাকে। প্রতি দুঃস্বপ্নেই ভাবি— যদি তুই ফেলে চলে যাস, সে কাঁটা ফিরিয়ে দিতে আমি, অনাগত এক সন্ধ্যায় এই সমুদ্রেরই কাছে নতজানু হবো।

ওহ গাংচিল—
হোটেলের নাম রেখে তটদেশে একঠাঁয়ে আছো
তুমিও তো ভূয়োদ্যাখা মাল
এই বেলাভূমি ঘিরে ওদের শরীর দেখে গ্যাছো।
ঝাউয়ের উলম্ব গুঁড়ি
ভেঙে দেয় গোটা ফ্রেমখানি
প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে তার

আমি-রা বন্দী হতে থাকে—
আর ঠিক সে-মুহূর্ত থেকে
প্রত্যেকখানি আমি ছিটকে সরে যাচ্ছে
অতীতে বা না আসা ভবিষ্যে—
শুধু ঐ দুজনের মাঝে
প্রেম জেগে আছে বলে
প্রেমময় অপার দয়ায়, দ্যাখো গাংচিল, দ্যাখো
আলাদা আলাদা খোপে, তবু,
একসাথে
এইসময়েই ওরা আছে—


(৪)
ভগবান আছেন বটেই, সমুদ্রতীরে এসে একথাই শুধু মনে পড়ে নাহলে এই ঢেউয়ের শীষে প্রথমদিনের গান জেগে থাকে, এমন মধুর নিয়তিতে এনট্রপি বেড়ে চলে চূড়ান্ত মৃত্যুর দিকে, পৃথিবী সূর্যের চারপাশে যেই বিন্দু থেকে শুরু করে অনুরূপ কৌণিক অবস্থানে ফিরে আসে নিয়ত সময় বাদে অপরিবর্তনীয় ক্রিয়াপদ হয়ে সুন্দর জেগে ওঠে— ঝাউবন ছোঁয়া হাওয়া আমাদের তুচ্ছ ছায়ায় সূর্যের স্মৃতি এনে দেয়— ভগবান আছেন বলেও। ভগবান আছেন বলেই, সৃষ্টির বংশগতি অপরিহার্য সেক্সকথা— যখন শরীরে শরীর এসে লাগে, প্রতি চলনেই তার নূতন শিহর জেগে ওঠে— ভগবান আছেন বলেই, পথ ও অজানা থাকে, সময়ও পথের মতই, তবুও অজানা এক বাঁকে হাত ধরে ফেলেছি তোমার। এখন আমাদের মধ্যিখানে প্রতিদিনই সব খেলা সমুদ্রের রঙে— সে সমুদ্র বিভাজিত হয়, পথ কেটে স্মিত হাসেন গুরুদেব— যুগ্মমস্তকে যুক্ত করেন আশিসকণা তাঁর। আর সেই প্রত্যেক ভোরের সমুদ্রে, মঙ্গলঘট হয়ে দিনভানু উদিত হয়েন। সমুদ্ররাত্রি তাঁর বালুকার বিস্ময়খন্ড আমাদের কথা ভেবে রেখে যান। ভোর হবে বলে, এই রাত্রির বুকে আমি, আর সব বন্ধুর মাঝে অদৃশ্য হয়ে যাই, তোমাকেও অদৃশ্য করি। সৃষ্টির শাশ্বতরূপে শুধু এই দৃশ্যমান তটভূমে, ঢেউয়ের উপমা নিয়ে আমি, তুমি, আমরা ম্যাজিক হয়ে যাই।


পেলিক্যান মরে গ্যাছে কাল।
না, কোনও শিকারীর বন্দুক নয়, ভাইরাস নয়,
শুধু এক আচমকা ঢেউয়ের আঘাতে
উহার হৃদয় থেমে গ্যাছে।
পচে ওঠা পাখিশব আমাদের সমুদ্র
আজ রাতে ফিরিয়ে দিয়েছে
তাই, হোটেলের ফলক থেকে বেরিয়ে এসেছে গাংচিল
ঠোঁটে করে বালি নিয়ে যায়
তরঙ্গের অন্তিম দাগটিতে
পেলিক্যানকে সমাহিত করে সে—


  (৫)
এইসব পাব্লিক শালা, কাজ নেই অকুন্ঠ-সময়খানি তাই অপরের ব্লুফিল্ম রচনায় নিবেদিতপ্রাণ-- আর দেখো সারা বছরের ভারে কচ্ছপপিঠ বেঁকে গ্যালো, একটাই সপ্তাহান্ত সাগরসমীপে এসেছিনু। মাছভাজা, বীয়ার আর দুবেলার নুনমাখা চান-- এর মাঝে এই মাল-- এরা অন্যের প্রেমখানি ধরে, ধরে বা বানিয়ে নিয়ে নিজেদের চাহিদামতই আমার গায়েতে ছুঁড়ে মারে— সমুদ্র, বস্‌ আমি তো ব্যাপক ছিলাম, তোমাতে আমাতে, বেশ বোঝাপড়া আর মস্তি বা লুকিয়ে পালানো— আমি তো বলিনা কিছু গোপনে লুকিয়ে যা যা চাই। সেসব সরিয়ে রেখে এই যে আরোপিত প্রণয়খানি, বড়ো দুঃসহ লাগে--বড়ো বেশি গুরুভার বেঁকে যাওয়া কচ্ছপ পিঠে— ঐ শালা চুতিয়ারা বুঝবেনা, শুধু তুমি, আর, এমন বালের রাত নয়, দুপুরের সূর্য যেই জলে ভেজা বালিতে পিছলে ওদের অন্ধকার করে দেবে, পেখমের সাজ খ'সতে খ'সতে পালক-ছাড়িয়ে দেবে সাইরেন স্বরে চিৎকার— তখনই তো শুরু হবে আমাদের আদানপ্রদান। তোমারও কি কম চাপ সোনা— তুমিও যে আমারই মতন— জোয়ারের ক্ষণে তাই জেলেবস্তির কাছে চলে গিয়ে, হোকনা দুপুর, মাল আর মাছভাজা খাবো। সেই ভালো, এইসব ন্যাকাপনা বন্‌ফায়ার আর ততোধিক চোতা মারা পেরেমের মুখে স্নিকারের তলা ছুঁড়ে মারি। দুটোদিনই এবছরে বাঁচার সময়, ঐসব প্রেমট্রেম মুছে দাও গুরু— চোখ মুছে আমি জুতো খোলা খালি পায়ে তোমার শরীরে নেমে যাবো।

ছবি--    সুমেরু মুখোপাধ্যায়

 

 

 
 



224 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ উৎসব ইস্পেশাল ২০১২  গপ্পো 
শেয়ার করুন


Avatar: শুদ্ধ

Re: সমুদ্র ও পাঁচজন আমি

অ-গল্পের সমস্ত কলাকৌশল মিশে আছে। ভাল লাগলো বুনন। তবু মনে হচ্ছিল আরো অনেক দূর যেতে পারে এই গদ্যভাষা। লেখার তাড়াহুড়ো একটু কমলে বোধহয়। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল গদ্য ও কাব্য-র দৃশ্যময়তা যখন আছে তখন এই লেখাটাকে শারীরিক ভাবে আরো একটু ভাঙা প্যারা, ভাঙা লাইনে গদ্য ও পদ্যের একটা আলসে সংমিশ্রণ করে তুললে কেমন হত? এমন গদ্য পড়তে ইচ্ছে করে বেশ। কোথাও একটা কমলকুমারের গন্ধ নাকে এসে লাগে।
Avatar: i

Re: সমুদ্র ও পাঁচজন আমি

অথচ গল্পই ছিল আদতে । 'অ-গল্পের কলা কৌশল ' বড্ড আরোপিত লাগল।
Avatar: তাতিন

Re: সমুদ্র ও পাঁচজন আমি

আমার একটা সমস্যা হয়, কিছুতেই বড় লিখতে পারিনা। বাড়াতে গেলেই মনে হয় অপ্রয়োজনীয় জিনিস এনে ফেলছি।
Avatar: Souva

Re: সমুদ্র ও পাঁচজন আমি

লেখাটার মধ্যে তাড়াহুড়ো রয়েছে। এইপ্রকার ভাষা লেখকের কাছ থেকে বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। এইরূপ টানা শব্দের স্রোত, যা আসলে ইন্টার্নাল মোনোলগের ধাঁচে দৃশ্য, উপমা, অনুষঙ্গ, স্মৃতি এত সবকিছু ধারণ করছে, তা যাতে আরোপিত বাহুল্য বলে মনে না হয়, বরং আচমকা ধাক্কা দ্যায় পাঠকের মগজের সুতোগুলোয়, তার জন্যে প্রয়োজন জ্যামিতিক পরিমিতি, সঠিক তুলাদন্ডে প্রত্যেকটি শব্দকে ওজন করে খরচ করার কার্পণ্য। সেইটের কিছু অভাব আছে বলে মনে হলো। আর কবিতার পংক্তিগুলি, এ কারণেই বোধহয়, মূল লেখার শরীরে ততোখানি অপরিহার্য হয়ে উঠলো না।
Avatar: Hindol

Re: সমুদ্র ও পাঁচজন আমি

KHUB BHALO LEKHA
Avatar: সুরজিত্‍ সেন

Re: সমুদ্র ও পাঁচজন আমি

ভালো লেখা। কিন্তু ভাষা আরো আক্রমণাত্মক হওয়া দরকার।
Avatar: ekak

Re: সমুদ্র ও পাঁচজন আমি

আরেকটু ম্যারিনেট করতে হত । কিছুদিন হাঁড়ি চাপা দিয়ে রেখে বের করে ওক কাস্কিং । ভালো সিঙ্গল মল্ট এর দানা তারাহুরয় কান্ট্রি হয়ে গেল ।
Avatar: sandipan

Re: সমুদ্র ও পাঁচজন আমি

খুব ভালো লেখা। তাড়াহুড়োটুড়ো কিছু মনে হল না, বেশ ভেবে চিন্তে সময় নিয়ে লেখা বলেই মনে হল। জোর করে দুর্বোধ্য করার দরকার নেই। পেলিক্যান ছাড়া অন্য কোনো পাখি হলে আরো ভালো হত।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন