বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

ওয়াক্কাস মীর, অদিতি ফাল্গুনী, কল্লোল

ওয়াক্কাস মীর

আমার জীবনের একটি হতাশার কারণ হল বেশির ভাগ লোকেই যেন বড্ড বেশি নাইভ। হ্যাঁ। আমার কথা পড়ে তো মনে হবেই যে আমি খুব অহংকারি, আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে, আমি খুবই চটে আছি। মালালা ইউসুফজাইএর উপর গুলি চালানোর ঘটনা নিয়ে তহ্‌রিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) যে জঘন্য ভুমিকায় নেমেছে সেটা তাদের পক্ষেও একটা চরম অবস্থান।

টিটিপি এটাই যে প্রথম শিশুদের উপর হামলা করল, তা তো নয়, ওরা শিশু সেনাদের মানব বোমা হিসেবে ব্যবহার করে, ছবি তোলে যখন এই অপ্রাপ্তবয়স্করা বন্দীদের মাথা কেটে ফেলে। ওরা স্কুল উড়িয়ে দেয়। এদের প্রতিনিধিরা শহরে আতঙ্ক ছড়ায় ও জেনেশুনেই শিশু সমেত নিরপরাধদের খুন করে। ওদের যুক্তিটাও সেই একই রকমের - ওরা আমাদের জীবন যাত্রাকে ঘৃণা করে ও চায় পাকিস্তানের বর্তমান অস্তিত্বকে ধ্বংস করে দিতে। সুতরাং এই যে ইমরান খান সব আতঙ্কবাদী কাজের জন্য আমেরিকাকে ও তাদের ড্রোনকে দায়ী করে রাখেন এটাও এক অতিসরলীকৃত যুক্তি।

ড্রোন হামলার জন্যই যে টিটিপি হাতে অস্ত্র ধরেছে সেটা একেবারে মিথ্যা। ড্রোন নেহাৎই একটি অজুহাত। টিটিপি যে শান্তিকামী লশ্‌কর আর উপজাতির নেতাদের খুন করে চলেছে সেগুলির সাথে ড্রোন হামলার কোনো সম্পর্ক নেই - মালালার উপর আক্রমণেও নেই।

এই কথা আমি আগেও বলেছি এবং ভবিষ্যতেও বলব, যদি ড্রোন আক্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় তাহলেও টিটিপি তাদের এই হামলাবাজী বন্ধ করবে না। অতএব যারা দাবি করছেন যে আগে ড্রোনের হামলাকে নিন্দা করা হোক তারপরে টিটিপির সমালোচনা করা উচিৎ, কী আর বলব, সেটাকে নিছক একটি কিম্ভূত প্রলাপ ছাড়া আর কিছু বলতে পারছি না। এ ছাড়াও আরেকটা বিরাট তফাৎ আছে, সেটা হচ্ছে যুদ্ধপরিস্থিতিতে ইচ্ছার বিরুদ্ধেও অসামরিক লোকের মৃত্যু আর পুরো পরিকল্পনা করে অসামরিক মানুষকে টার্গেট করে খুন করা। প্রথমটির উদাহরণ হচ্ছে ড্রোন আর দ্বিতীয়টির হচ্ছে টিটিপির হামলা। এটা তো আমেরিকার যুদ্ধ নয়। এটা আমাদের যুদ্ধ যখন দেখি একটি গোষ্ঠী বা দল চাইছে আমাদের রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে, চাইছে আমাদের সন্তানদের খুন করতে - তখন আমাদেরকেই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। যারা ভেবে থাকেন একটি রাষ্ট্র কখনই কারুর প্রাণ নেবে না তাদের বোধহয় উচিৎ হবে চোখ আর কান ঢেকে বসে থাকা। এটা পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধ আর সেই যুদ্ধ আমাদেরই লড়তে হবে।

তো ইমরান খানের জগতে এই টিটিপি হচ্ছে একটি ভুল বোঝার শিকার একটি কিশোরের দল মাত্র। যেটা খান বোঝেন না যে এই ড্রোন বিরোধিতার ব্যাপারে খানের সমর্থনের কোনো দরকারই টিটিপির নেই। ধর্মের নামে এই হিংসা আসলে ক্ষমতার জন্য লড়াই। পুরো ইতিহাস জুড়ে এই ঘটনাপ্রবাহ ঘটে এসেছে আর কোনোদিনই ড্রোন থাকল কি না তাতে কিছু এসে যায় নি। ড্রোনে একটি আলাদা গল্প - যেটা টিটিপি চায় আমরা চাঁদমারি করি- কিন্তু তাদের নিজেদের এই নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই। টিটিপির সাথে বোঝাপড়ার চেষ্টা আগে কয়েকবার করা হয়েছিলো, আদৌ কোনো লাভ হয় নি। আর এর জন্য আমাদের শুধু SWAT অঞ্চলটিকে দেখলেই হবে। আর যারা ভাবছেন আলাপ আলোচনা করা দরকার তারা কী আশা করছেন রাষ্ট্রের কাছ থেকে? যারা ঐ টিটিপি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকবে সেই মানুষদের কী হবে? আমরা আমাদের দায় দায়িত্ব সব ঝেড়ে ফেলে দেব? আর টিটিপিকে বলব যে তারা মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেবে বা প্রকাশ্য চকে চাবকাবে? আর তারা কি ভেবেছেন যে টিটিপি এর থেকে কম কিছু চাইবে?

আসলে খান ও তাঁর সমর্থকেরা যেটা বলতে চাইছেন যে কোনো দল যদি বেশ একটা বড়সড় সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলে আর রাষ্ট্রকে আক্রমণ করে; আর মানুষদের খুন করতে শুরু করে তো তাদেরকে মারা চলবে না, বরং তাদের সাথে আলোচনায় বসতে হবে। এই যুক্তিটা চললে দুনিয়ার সব কটি সন্ত্রাসবাদী দলই খুশির পার্টি দেবে।এই টিটিপির লোকেরা সাধারন অপরাধী নয়, এরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে আর এদেরকে আমাদের সেই চোখেই দেখতে হবে।

বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপানো বেশ কয়েকটা লেখা আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে যেখানে প্রবন্ধকারেরা এই হিংসার জন্য ইসলাম ধর্মকেই দুষেছেন। বলেছেন ইসলাম ধর্ম কখনো শোধন করা হয় নি এবং টিটিপি তারই ফলাফল। আমি এই লেখকদের শ্রদ্ধা করি কিন্তু তাদের মতামতকে নয়। এটা ধর্মের ব্যাপার নয় - এটা পুরোটাই ক্ষমতা দখলের রাজনীতি। ধর্ম এখানে একটি অজুহাত মাত্র। যদি এই লোকগুলি নিরীশ্বরবাদী হতো তাহলেও এই হিংসার ঘটনা ঘটতো। এই সব হিংসার জন্য শুধু ধর্মকেই দায়ী করতে গিয়ে তারা ভুলে যাচ্ছেন যে মানুষকে নিজের দখলে আনতে হলে সব ইডিওলজিকেই হিংসার পথ ধরতে হয়েছে, অবশ্যই ধর্ম তার থেকে বাদ নেই। এটা শুধু কোনো ধর্মের দোষ নয়।নিশ্চয়ই এটা নিয়ে তর্ক ও আলোচনার সুযোগ রয়েছে কিন্তু শুধু ধর্মকে কাঠগড়ায় চাপালে মূল কারণটাকে আমরা বাদ দিয়ে ফেলব। বিশেষত; যখন আমাদের বোঝাতে হবে পাকিস্তানের আম জনতাকে যে এটা আমাদের এক যুদ্ধ। যেটা পরিষ্কার করে বলতে হবে যে টিটিপি যা করছে তা ধর্ম নয়, এটা ধর্মের বিকৃতি। আরো যেটা বোঝানো জরুরি যে টিটিপি এখন ধর্মকে ব্যবহার করছে, কেন না সেটা এখন তাদের পক্ষে সুবিধাজনক। যাঁরা ধর্মকেই হিংসার মূল বলে ভাবেন তাঁদেরকে অনুরোধ করব, তাঁরা যেন Noah Feldman আরেকবার ঝালিয়ে নেন। উনি দেখিয়েছেন এখনো পর্যন্ত সব থেকে বেশি সুইসাইড বম্বার ঘটেছে শ্রীলঙ্কার এলটিটিই আমলে - এবং তারা আদৌ কোনো ধর্মীয় দল ছিলেন না। ধর্ম এবং ড্রোন, এদের আলাদা আলাদা ব্যবহার একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এদের সাথে টিটিপির অত্যাচারের কোনওই সম্পর্ক নেই। এদের সাথে আলোচনায় বসা মানে এদের এলাকার সন্ত্রস্ত মানুষদেরকে ত্যাগ করা। সেই যুক্তিই বহাল থাকছে - এই যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ। ইতিমধ্যেই আমাদের চৌকাঠ ডিঙিয়ে এসেছে এই লড়াই- আর দেরি করা সম্ভব নয়।

অনুবা্দদ ঃ দীপ্তেন


অদিতি ফাল্গুনী

আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে সম্প্রতি আমাকে ই-মেইলে নিম্নোক্ত শিরোনাম সম্বলিত “তোমরা কি আমার নাম জানতে যদি আমি মার্কিনী বোমা (উড়োজাহাজ বা নৌপথে) হামলায় মারা যেতাম?” মালালা ইউসুফজাইয়ের যে ছবি রাহনুমা পাঠিয়েছেন তা’ আমাকে নতুন করে গোটা বিষয়টা নিয়ে ভাবাচ্ছে। মালালাকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা মিডিয়া ও জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরিসরে মানবাধিকার কর্মীদের শোক ও ক্ষোভ প্রকাশের পেছনে কতটুকু পাশ্চাত্য শ্বেত কূটনীতি, কতটুকু মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের জন্য তালিবান তথা উগ্রপন্থী ইসলামী গোষ্ঠিগুলোর বিরুদ্ধে মালালার কথা তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার বৈশ্বিক মিত্রদের ‘কুম্ভীরাশ্রু’ সেসব প্রশ্ন যুক্তিসঙ্গতভাবেই উত্থাপিত হচ্ছে। কিন্তু তারপরও আপনার ই-মেইল আমার ভেতরের অস্বস্তি বা খটকা পুরোপুরি কাটাতে পারছে না। একটি কাঁটা কোথাও বিঁধে আছে যা সরানো যাচ্ছে না। কারণ মার্কিনী রাজনীতি, তেল নিয়ে পশ্চিমের লোভ এসব কিছুই কি সত্যিই এক নিরপরাধ কিশোরীর স্কুলে যেতে চাওয়ার জন্য গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে বৈধতা দিতে পারে? আজ পাকিস্তানের স্বাত উপত্যকায় তালিবানী শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যে ৫০,০০০ কিশোরীর স্কুলে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তালিবানী উগ্রপন্থীরা যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে কিশোরী মালালা, লিখেছে ব্লগে আর জানিয়েছে মেয়েদের শিক্ষার জন্য উদাত্ত আহ্বান ... তার গুলিবিদ্ধ হওয়াটা কি এত সহজেই ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা’র নামে ‘জায়েজ’ হতে পারে? হ্যাঁ, নিউ আমেরিকা ফাউন্ডেশনের দেওয়া তথ্য অনুসারেই ২০১২ পর্যন্ত ৩৩৪টি মার্কিনী ড্রোন আক্রমণে এপর্যন্ত ৩১৯১ জন মারা গেছেন। অন্য একটি সূত্র (ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিসম) বলছে সংখ্যাটির মধ্যে ১৭৬ জন শিশু/কিশোর ও ৪৭৪ থেকে ৮৮৪ জন সাধারণ মানুষ রয়েছে। মালালা এই ১৭৬ জন শিশু কিশোরের ভেতর পড়লে আমরা হয়তো তার নাম জানতাম না (সূ ত্রঃ গুরুচন্ডালি কলিকাল)। কিন্তু কথা হচ্ছে মালালা বা মালালার মত যে অসংখ্য কিশোরীর পৃথিবীর তালিবান শাসিত অঞ্চলগুলোয় কৈশোরে পা রাখতে না রাখতে পড়াশুনা বন্ধ রেখে পরিবারের পছন্দে অনেক সময় অনেক বয়স্ক পুরুষের কয়েকজন স্ত্রীর একজন হতে হয় (একক স্ত্রী হতে পারলে ভাগ্যই), কৈশোরেই ক্রমাগত গর্ভধারণ, রান্না-বান্না, গৃহ পরিচর্যা আর বড়জোর বোরখার নিচে থেকে নামাজ-রোজা ছাড়া আর কোন কিছু করারই কোন অধিকার বা সুযোগ থাকে না, সেই ‘জীবন’টাই বা কেমন ‘জীবন?’ কঠোর শরিয়া শাসিত পৃথিবীর সেই অঞ্চলগুলোয় একজন নারী কোন পুরুষ অভিভাবক ছাড়া কখনো কোথাও বের হতে পারে না, সন্তান সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের অধিকার নেই তথা অনিয়ন্ত্রিত এবং ঘন ঘন গর্ভধারণের মাধ্যমে বয়স না হতেই যৌবন ফুরিয়ে যাওয়া এবং স্বামীর তখন তরুণতর স্ত্রী গ্রহণ, শিক্ষা-দীক্ষা, বিনোদন, তথ্য-প্রযুক্তি সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পুরুষের জীবনভর নিষ্ক্রিয় যৌন সেবাদাসী হবার ও পরবর্তী প্রজন্মের তালিবান বা সশস্ত্র জঙ্গী উৎপাদনের জন্য ক্রমাগত গর্ভধারণের এই জীবন পার করার চেয়ে মৃত্যুও কি ভাল নয়? সম্ভবত অমন একটি জীবন চায়নি বলেই মালালা কথা বলেছিল। প্রতিবাদ করেছিল। নারীর জন্য কথা বলা, শিক্ষা সহ পাবলিক যে কোন পরিসরে সম অংশগ্রহণের সুযোগ চাওয়া সব সময়ই অপরাধ। জোয়ান অব আর্ককে ডাইনী হিসেবে পুড়তে হয়েছিল খ্রিষ্টানদের হাতে। খনার জিহ্বা কর্তিত হয়েছিল। আজ মালালার মাথায় গুলি লাগলে আমরা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের কূট-কৌশলের অঙ্ক মিলাতে বসি!

আজ তাই যে ১৭৬ জন নিরপরাধ কিশোর কিশোরী পশ্চিমা ড্রোন অভিযানে মারা গেছে, তাদের সবার স্মৃতির প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েই বলছি পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন সময়পর্বে, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে দেখা গেছে যে লক্ষ লক্ষ নিপীড়িত মানুষের ভেতর একজনই হঠাৎ একটি সংগ্রাম বা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে ২০০৪ সালে ‘র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন’ নামে যে এলিট পুলিশ ফোর্স গঠিত হয়েছে, বিগত বিএনপি সরকার যাদের সন্ত্রাস দমনের নামে সংবিধান বহির্ভূত বা বিচার বহির্ভূত ভাবে বেসামরিক নাগরিকদের যেকোন সময় তুলে নিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ হত্যার ক্ষমতা দিয়েছে এবং তুলনামূলক ভাবে ‘লিবারেল’ আওয়ামি লীগ সরকারও ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর অদ্যাবধি র‌্যাবের বিলুপ্তির লক্ষ্যে কোন আইন প্রণয়নের চেষ্টা করেনি, সেই র‌্যাবের হাতে ২০০৪ থেকে অদ্যাবধি ৭০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হলেও গত বছর যখন বিনা দোষে ষোল বছরের এক দরিদ্র কিশোর র‌্যাবের গুলিতে পঙ্গু হয়ে পা হারায়, বাংলাদেশের সব মানুষ ক্রসফায়ারে ঐ ৭০০ নিহত মানুষের নাম মনে না রেখে লিমনের নামে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ মুখর হয়েছে। লিমন হয়ে উঠেছে আমাদের দেশে বিচার-বহির্ভূত পুলিশী হত্যা ও নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনের প্রতীক।

হ্যাঁ, আমরা জানি এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররাই আফগানিস্থানে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রী শাসন উচ্ছেদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে তালিবান জঙ্গিদের অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে, সোভিয়েত শাসন উচ্ছেদে প্রাণান্ত করেছে। এবং সত্যিই আফগানিস্থান বা ইরাকে স্কুল থাকা না থাকায় মার্কিনীদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু এই আসা না আসার অজুহাত তুলে স্কুলে যেতে চাওয়া কিশোরীর মাথায় গুলি করার তালিবানী পন্থাও বৈধতা বা ন্যায্যতা পেতে পারে না। ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনায় কার্ল মার্ক্স একদিকে এই সাম্রাজ্যবাদ কী পরিমাণ ক্ষতি করবে গোটা ভারত উপমহাদেশের, কী অবিশ্বাস্য পরিমাণ সম্পদ লুন্ঠন করবে, ভেঙ্গে ফেলবে সহস্রাব্দের পুরণো গ্রামীণ উৎপাদন অবকাঠামো সেসব বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেও খুশি হয়েছেন এই আশাবাদে যে ব্রিটিশ উপনিবেশের ফলে শিল্প বিপ্লবের যে অভিঘাত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে হলেও আছড়ে পড়বে, হাজার বছরের যে অনড়-অচল-জড়-অক্ষয় হিন্দু সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর যে নিগড় ভেঙ্গে যাবে, তা’ একদিক থেকে আবার ভারতীয়দের শতাব্দীর নানা নিগড় থেকে মুক্তি দেবে। ভারতের গ্রাম ভিত্তিক যে সনাতনী উৎপাদিকা পদ্ধতি (তাঁতী ঘরে বসে তাঁত বুনছে বা দিনের শেষে কৃষক ক্ষেত থেকে ধানের আঁটি নিয়ে ফিরছে) মুসলিম শাসনের মুখেও বদলায় নি, ছোট ছোট গ্রাম ভিত্তিক মানুষের মোটামুটি নিরাপদ, উদ্ভিদসুলভ এবং ক্ষুদ্র গন্ডিবদ্ধ জীবনই প্রাচ্যের সব স্বৈরাচারকে চ্যালেঞ্জবিহীন কর্তৃত্ব করতে দিয়েছে। টিঁকিয়ে রেখেছে জাত-পাত। ধর্ম হয়ে উঠেছে এমনি প্রকৃতি পূজারী যে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ গরু বা হনুমানকে পুজো করেছে। ব্রিটিশের বাষ্পচালিত তাঁত কল আর ইঞ্জিন ভারতের ক্ষুদে তাঁতী আর কৃষকদের নিঃস্ব করে, ছোট ছোট গ্রামভিত্তিক স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতির ভিত্তি নড়িয়ে দিয়ে এশিয়ার একমাত্র সামাজিক বিপ্লবকে সম্ভব করে তুলবে বলে তিনি আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন। মার্ক্সের ভবিষ্যদ্বাণী খুব বিফলে যায়নি। বৃটিশ উপনিবেশের মন্দত্বের যেমন শেষ নেই, আবার তার ভাল দিকও কি কিছুই থাকেনি? সমাজের উপরি কাঠামোগত দিকের বদল হিসেবে দেখলে ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিঙ্কের উদ্যোগে সতীদাহ বিরোধী আইন পাশ থেকে শুরু করে রাজা রামমোহন রায় বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরদের মত যুগান্তকারী সমাজ সংস্কারকদের আবির্ভাব, নারী শিক্ষার প্রসার, ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন তথা সমগ্র ভারত উপমহাদেশের মননগত পরিসরে যে বিপুল আন্দোলনের সূচনা হয়, তা’ উপনিবেশের সাথে সরাসরি সঙ্ঘর্ষ ও মিথষ্ক্রিয়ার ফলাফল। পরবর্তী সময়ে বাঙালি হিন্দু (বিশেষতঃ উচ্চ বর্ণের হিন্দু) সমাজের দেখাদেখি অ-বাঙালি ভারতীয় অন্যান্য সম্প্রদায় এবং বাঙালি মুসলিম সমাজেও কিছু পরিবর্তন ঘটে। তিরিশের দশকে ঢাকায় কাজি মোতাহার হোসেন, ‘শিখা’ গোষ্ঠির আন্দোলনের মুখপাত্র কাজি আব্দুল ওয়াদুদ বা বাঙালি মুসলিম নারী শিক্ষা ও জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন মুসলিম সমাজের নানা অচলায়তন ভাঙ্গার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। 

আজ পশ্চিমের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের লড়াইয়ের ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে আমাদের খুবই সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা যেন এমন কোন মধ্যযুগীয় ব্যবস্থার অনুমোদনের পক্ষে না দাঁড়াই যা দু’জন নারীর সাক্ষ্যের মূল্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের মূল্য হিসেবে বিবেচনা করে। যে ব্যবস্থা আজো একজন পুরুষের চারজন নারীকে একইসাথে বিয়ে করে ঘর করার অনুমোদন দেয়। যে ব্যবস্থায় চুরি করলে হাত কেটে ফেলা বা বিবাহ বহির্ভূত নর-নারীর শারীরীক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করার মধ্যযুগীয় ফতোয়া দেয়। যে ব্যবস্থার একশো ভাগ অনুসারীরা সিভিল আদালত না মেনে শরিয়া শাসন প্রবর্তন করতে চায়। যে ব্যবস্থা ‘গণতন্ত্রকে’ কুফরি বা কাফেরদের উদ্ভাবিত শাসন ব্যবস্থা বলে বাতিল করে, কোরান ব্যতীত অন্য ধর্মগ্রন্থের অনুসারীদের ‘অবিশ্বাসী’ বলে ঘোষণা করে এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে কাফেরদের ‘জিজিয়া’ কর দিয়ে থাকার কথা বাতলে দেয়। যে মধ্যযুগীয় জীবন বিধানে কাফেরদের সাথে যুদ্ধে বিধর্মীদের নারীকে ‘গণিমতে মাল’ (ওয়্যার বুটি বা লুণ্ঠনের দ্রব্য হিসেবে) সৈন্যদের ভেতর ভাগ করে নেওয়াটা জায়েজ বলে স্বীকৃতি রয়েছে। এমনকি ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে তদানীন্তন পূর্ব বাংলা (আজকের বাংলাদেশ)-র মৌলানা বা আলেম শ্রেণী ফতোয়া দিয়েছিলেন যে শুধু বাঙালি হিন্দু নারীই নয়, মুক্তিযুদ্ধ/আওয়ামি লীগ/বামপন্থী মতাদর্শ বা পাকিস্তান বিরোধী মুসলিমদের নারীকেও ধর্ষণ করা জায়েজ। পাকিস্তানী সেনাদের হাতে ধর্ষিত হলে হিন্দু থেকে বিপুল সংখ্যায় ধর্মান্তরিত বাঙালি মুসলিমের ভেতর আজো যে প্রাচীন বিশ্বাস-সংস্কৃতি-লোকাচারের অবশিষ্ট রয়েছে, তা’ ধুয়ে মুছে ‘পাক মুসলিম’ বা সাচ্চা, পবিত্র মুসলিম প্রজন্ম জন্ম নেবে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে দুই লক্ষ বাঙালি নারীর গণধর্ষণের পেছনে এটাই ছিল তীব্র বাস্তবতা! যে ধর্ম একশ’ ভাগ মেনে চললে গান শোনা, ছবি আঁকা, ক্যামেরা-কম্পিউটার-ইন্টারনেট ব্যবহার করা, নারী-পুরুষ সহশিক্ষা বা একই জায়গায় কাজ করা ‘হারাম’ হয়ে যায়। ঈশ্বরকে বা অদৃষ্টকে ধন্যবাদ যে মানুষই সেই নিয়ত সৃজনশীল ও নিয়ত বিকাশমান প্রাণী যাকে কোন মনু, মোহাম্মদ, ভ্যাটিক্যান সিটির পোপ বা কোন রাজনৈতিক ভাবাদর্শই একশ’ ভাগ অনুশাসনের দাস করে তুলতে পারে নি। কাজেই এমনকি ইরান বা সৌদি আরবের মত দেশেও মেয়েরা বোরখা পরলেও হিজাব ঢাকা চেহারার ছবিও ক্যামেরায় তোলে, মসজিদে আজানে মাইক্রোফোন ব্যবহৃত হয়, ইসলাম ধর্ম প্রচারে জাকির নায়েকের আস্ত একটি টিভি চ্যানেল দরকার হয়। একশ’ ভাগ সহি বা সাচ্চা ইসলাম মানতে গেলে কিন্তু জাকির নায়েক টেলিভিশন দেখা বা ধর্ম প্রচারের কাজে ব্যবহার কোনটিই করতে পারেন না। যে ধর্ম নারীকে আপাদমস্তক বোরখায় মুড়ে রেখে তাকে শুধুই একজন পুরুষের চার স্ত্রীর একজন হবার ও যত বার গর্ভধারণ করা যায় ততবার গর্ভধারণ করার অনুমতি দেয়। ঠিক এইভাবে ও এই ভাষায় লিখতে গিয়ে আমি তীব্র বেদনা ও গ্লানি বোধ করছি এজন্য যে বাংলাদেশ নামের যে রাষ্ট্রে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সেখানকার অধিকাংশ মুসলিমই ত’ এমন কট্টর বা চরমপন্থী নন। আমাদের দেশে আজো শরিয়া আইন না, বৃটিশের প্রবর্তিত পেনাল কোড, সিভিল কোড প্রভৃতিই বহাল আছে। ১৯৮২-৯০ সাল অবধি স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে কত মুসলিম তরুণ রক্ত দিল! কত মুসলিম ছেলে মেয়ে সেখানে গান গায়, নাচে, ছবি আঁকে, সিনেমা-থিয়েটার করে, বামপন্থী ভাবাদর্শে আন্দোলিত হয়। বাংলাদেশে যেমন সাম্প্রদায়িকতা আছে, তেমনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি, পয়লা বৈশাখ, ছাব্বিশে মার্চ (স্বাধীনতা দিবস) বা ষোলই ডিসেম্বর (বিজয় দিবস)-এর মত বেশ কিছু অসাম্প্রদায়িক, সামাজিক উৎসবও আছে। বাংলাদেশ আফগানিস্থান বা পাকিস্তান নয় এবং তা’ যেন না হয় বা না হতে পারে সেই আকুলতা থেকেই এই লেখা! মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যে ‘র‌্যাডিক্যাল’ বা ‘পলিটিক্যাল’ ইসলামের উত্থান হয়েছে বা হচ্ছে তা’ শুধুই পেছনের দিকে যাত্রা। ফিলিস্তিনে মার্কিনী-ইসরায়েল অক্ষশক্তির দশকের পর দশক আগ্রাসন, আরব দুনিয়ার পেট্রোডলার নির্ভর ‘ভোগী অথচ ধার্মিক’ ও অগণতান্ত্রিক বাদশাহ গোষ্ঠির সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনন্ত প্রেম আজকের আরব তারুণ্যকে ক্ষুব্ধ করতেই পারে। এবং বিস্মিত হবার কিছু নেই যখন ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতনের পর ইসলাম ধর্মীয় পুনর্জাগরণই মধ্যপ্রাচ্য-পাকিস্তান-ইরান-আফগানিস্থানে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আদর্শিক শূন্যগহ্বরের স্থান দখল করে। কিন্তু এর সামগ্রিক ফলাফল কি আরব তথা সামগ্রিক মুসলিম বিশ্বের জন্যই কোন শুভ বার্তা দেয়? আজ ঢাকার শাহবাগে বসে আমাদের যে নারী বন্ধুরা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার জায়গা থেকেই মালালাকে নিয়ে বিশ্বব্যপী প্রচারে বিব্রত বোধ করছেন, এর পেছনে পশ্চিমের ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’র অঙ্কের হিসাব কষছেন, তাদের বিনয়ের সাথেই জানাতে চাই যে মালালার অবস্থা আর আপনার বা আমার অবস্থা এক নয়। এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের হাজার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এখানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে একজন নারী পিতার ন্যূনতম আর্থিক সঙ্গতি ও নিজের পড়াশোনার ইচ্ছা থাকলে মোটামুটি স্বল্প ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়তে পারে, বোরখা না পরলেও চলে বা নগরাঞ্চলে চাইলে সে জিন্স পরেও ঘোরাফেরা করতে পারে, সরকারি-বেসরকারি যে কোন চাকরি করতে পারে (দিন দিন অবিবাহিত কিন্তু চাকরিরত, স্বাবলম্বী মেয়েদের সংখ্যা বাড়ছে), সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং পুরুষ বন্ধুদের সাথে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা বিষয়ে আলাপ-আড্ডা-বিতর্কে অংশ নিতে পারে, অনেকে ইচ্ছা করলে ধূমপানও করতে পারে।          
    
দুর্ভাগ্যজনকভাবে পশ্চিমের সাথে আজ ‘ইসলামে’র (আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের সাথে) যে লড়াই হচ্ছে, তা’ মূলতঃ ‘ইহজাগতিকতা’ বা ‘বস্তুবাদ/সেক্যুলারিজমে’র সাথে ধর্মীয় গোঁড়ামির লড়াই। এই লড়াই ত’ পশ্চিম বা আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে খ্রিষ্টানরা নিজেদের ভেতর আরো কয়েক শতাব্দী আগেই লড়ে এসেছে। মধ্যযুগের যে ইউরোপে চার্চ লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ নারীকে ডাইনি বলে পুড়িয়েছে (যে কলঙ্কতিলক থেকে রক্ষা পাননি স্বয়ং ‘জোয়ান অব আর্ক’), চার্চের যে ইনকুইজিশনে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন গ্যালিলিও, ক্যাথলিক খ্রিষ্টান ধর্মের সেই হাজার অনাচার থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে মার্টিন লুথার কিং প্রবর্তন করেছেন প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম। রেনেসাঁ যুগের কবি-শিল্পী-লেখকেরা খ্রিষ্ট ধর্মকেই আঁকড়ে না থেকে ফিরে গেছেন গ্রেকো-রোমানিক পৌত্তলিক ঐতিহ্যের কাছে। মেয়েরা অধিকার আদায়ের আন্দোলনে, নারী শিক্ষা ও ভোটাধিকারের প্রশ্নে রাস্তায় নেমেছে। রেনেসাঁ যুগের কালোপাহাড়ি সব কাজ ছাড়া আজকের পশ্চিম তথা সমগ্র মানব সভ্যতার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই বিস্ময়কর সব অর্জন কখনোই সম্ভব হত না। একই লড়াই হয়েছে চীনে ও জাপানে এবং কিছুটা হলেও ভারতে। ভারতে ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের সময় হিন্দু কলেজের ছাত্ররা গরুর মাংসের হাড় কালিঘাট মন্দিরে ছুঁড়ে মেরেছেন। প্রবর্তিত হয়েছিল একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্ম আন্দোলন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পে কলেজে ছাত্ররা কালি প্রতিমাকে ‘ব্ল্যাক, নেকেড, সাঁওতাল উমেন’ বলছেন। এতে করে সালমান রুশদির মত তারাশঙ্করের মাথার উপর কোন হুলিয়া জারি হয়নি। এবছরের শুরুতে ঢাকায় তরুণ বামপন্থী কর্মী আহমেদ জাভেদ রণি আয়োজিত একটি সেমিনারে পশ্চিমবঙ্গের কিছু মার্ক্সিস্ট নেতা ও তাত্ত্বিক এসে যখন কথাপ্রসঙ্গে বক্তৃতায় উল্লেখ করছিলেন যে কালি প্রতিমায় লাথি মেরে তাদের পার্টির সদস্যপদ পেতে হয়েছে, তখন সত্যিই আমি শিহরিত হয়েছি। মনে আছে কৈশোরে ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘দেব-দেবী নিয়ে রঙ্গরস’ নামে ধারাবাহিক লেখা পড়েছি। পাশাপাশি ২০০৭-এ বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা ‘দৈনিক প্রথম আলো’র প্রতি সোমবারের রম্য পত্রিকা ‘আলপিনে’ ষোল বছরের এক কিশোর কার্টুনিস্ট আরিফের আঁকা কার্টুন ও সাথে প্রকাশিত একটি কৌতুক (যেটি পরে অনুসন্ধানে দেখা গেছে জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের পত্রিকাতেও এমন কৌতুক বহু আগেই ছাপা হয়েছে) ‘মোহাম্মদ বিড়াল’ মুদ্রণের দরুণ শুক্রবারের নামাজের পর বায়তুল মুকাররম থেকে হাজার হাজার মুসল্লী মিছিল বের করেন, কিশোর কার্টুনিস্ট একবছর জেলখানায় অন্যান্য কয়েদিদের হাতে প্রবলভাবে শারিরীক-মানসিক ভাবে নির্যাতিত হয়, ‘আলপিনে’র বিভাগীয় সম্পাদক সুমন্ত আসলাম চাকুরিচ্যুত হন এবং কমিউনিস্ট পার্টি অফ বাংলাদেশ (সিপিবি)-এর দীর্ঘদিনের তাত্ত্বিক ও সিপিবির সাপ্তাহিক ‘একতা’ পত্রিকার দীর্ঘদিনের সম্পাদক ও পরবর্তী সময়ে ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’ ও ‘দৈনিক প্রথম আলো’র মত দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দুই দৈনিকের সম্পাদক মতিয়ুর রহমানকে প্রকাশ্য দিবালোকে বায়তুল মোকাররমের খতিবের হাত ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়। কী ছিল সেই কার্টুনে? মাদ্রাসার হুজুর জনৈক ছাত্রকে বলছে, ‘তোমার নাম কী?’ ছাত্র বলছে, ‘আমার নাম আবুল।’ হুজুর রেগে গিয়ে বলছে, ‘মুসলমানের ছেলেকে নাম বলার সময় বলতে হয় মোহাম্মদ আবুল।’ এরপর হুজুর ছাত্রকে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার কোলের বিড়ালটার নাম কী?’ দুষ্টু ছাত্র উত্তর করল, ‘মোহাম্মদ বিড়াল।’ কিশোর মনের নির্দোষ দুষ্টুমি ছাড়া এই কৌতুকে বিশেষ কিছুই আর ছিল না। ‘প্রথম আলো’র বিরুদ্ধে যখন পরিকল্পিত ভাবে মৌলবাদীরা রাস্তায় নামলো এই কার্টুন ছাপা হবার অপরাধে, তখন বাংলাদেশের কিছু ব্লগে ইসলামী ছাত্র শিবিরের বহু পুরনো পত্রিকার কপি স্ক্যান করে দেখা গেল সেখানে বহু আগেই ঠিক একই ধরনের কার্টুন ছাপা হয়েছে। মাদ্রাসার হুজুর জনৈক ছাত্রকে নাম বলার সময় ‘করিম'কে মোহাম্মদ করিম বলতে বলা হয় বলার পর ছাত্রের হাতে ধরা লাউ (কদু)-এর নাম কী জিজ্ঞাসা করায় ছাত্র বলছে, ‘মোহাম্মদ কদু।’ মনে আছে সেসময় আমার বাসা ধানমন্ডি থেকে গুলশানে সিএনজি করে যাওয়ার সময় সিএনজিঅলা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আপা, প্রথম আলো পত্রিকা ইসলামের বিরুদ্ধে কী করছে?’ আমি শান্ত ভাবে কৌতুকটা বললে স্বল্পশিক্ষিত সেই সিএনজিঅলা হেসে ফেলে বলেছিল, ‘এইটা ত’ দুষ্টুমি। এইটা নিয়া হুজুররা রাস্তায় নামছে? দূর, জিনিষ-পত্রের যা দাম বাড়তাছে! কতদিন একটা ইলিশ মাছ কিনবার পারি না! আর আকামের জিনিষ নিয়া রাস্তায় মিছিল!’ ঐ সিএনজিঅলাও ধর্মবিশ্বাসী মুসলিম। তবে, ধর্ম নিয়ে ফায়দা লোটার মনোভাব হয়তো স্বল্পশিক্ষিত বলেই তার ছিল না বা নেই। মুশকিলের বিষয় হচ্ছে যে ঐ স্বল্পশিক্ষিত সিএনজিঅলা যে বিষয়টি ‘দুষ্টুমি’ বলে বুঝতে পেরেছিলেন, আমার এক বামপন্থী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, থিয়েটার ও সিনেমার অভিনেত্রী, সুদর্শনা বান্ধবী উত্তেজিত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি জানান যে এই গোটা কার্টুনের বিষয়টি ‘পশ্চিমের সুগভীর ষড়যন্ত্র।’ কাজেই গেল শুক্রবার তিনি বায়তুল মোকাররম থেকে বের হওয়া হুজুরদের মিছিলে যোগ দিয়েছেন। প্রায় একঘন্টা ধরে মোবাইলে পয়সা খরচ করে তিনি ‘পশ্চিমের ষড়যন্ত্র’ নিয়ে ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ করছিলেন আর আমি নির্বাক, স্তব্ধ দর্শক হয়ে সব শুনছিলাম। সবটাই কি সত্যিই ‘পশ্চিমের ষড়যন্ত্র’? কেন পৃথিবীর অন্য সব ধর্মাবলম্বীদের যাবতীয় পবিত্র শহরেই মুসলিমরা ভ্রমণ করতে পারে? কিন্তু কেন ঐতিহাসিক আগ্রহ থেকেই ‘মক্কা’ নগরী ও কাবা গৃহ দেখার বিপুল কৌতূহল থাকা সত্ত্বেও ‘অমুসলিম’ আমার পক্ষে কখনোই ‘মক্কা’য় পা রাখা সম্ভব নয়? কেন ইরানে আজ আদি অধিবাসী অগ্নি উপাসকরাই নির্যাতিত, কণ্ঠরুদ্ধ আর বিতাড়িত? কেন পশ্চিমের ইমিগ্রেশন ল’য়ের এত কড়াকড়ি সত্ত্বেও ফ্রান্স-জার্মানি-আমেরিকা সহ সর্বত্রই মুসলিম অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়ছে? পাশাপাশি বিশ্বের যেকোন মুসলিম রাষ্ট্রেই সংখ্যালঘু অন্য কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনসংখ্যাই দিন দিন কমতে থাকে? আমার বড় দুই বোন উচ্চশিক্ষার্থে ব্রিটেন থেকে ফিরে খুব বিস্ময় নিয়ে বলেছিল যে ব্রিটিশ সরকারের ‘বাক স্বাধীনতা’র এমনি বহর যে ব্রিটিশ টেলিভিশনে পাকিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসী মুসলিম নেতারা বলেন, ‘আমরা এই দেশকে খেয়ে-দেয়ে, টয়লেটের মত ব্যবহার করব।’ ১৯৯৪ সালের একটি হিসাব থেকে দেখা যায় প্রতি বছর ৭০০ বৃটিশ নারী অভিবাসী মুসলিম পুরুষদের বিয়ে করে ধর্মান্তরিত হয়। পাশাপাশি কোন পাকিস্তানী বা বাংলাদেশি মুসলিম নারী বৃটিশ ছেলের প্রেমে পড়লেও পাকিস্তানীরা করে ‘অনার কিলিং’ আর বাংলাদেশিরা মেয়েটাকে দেশের বাড়ি ফিরিয়ে এনে চাচাত-মামাত-ফুপাত ভাইয়ের সাথে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়। লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত ব্রিকলেনে শ্বেতাঙ্গ, বৃটিশ নারীরা যেকোন পোশাকে এখন হাঁটার কথা ভাবতে পারেন না। পশ্চিমা সমাজে বাবা মায়ের ঘন ঘন বিয়ে বিচ্ছেদের কারণে অনেক অসহায় শ্বেতাঙ্গ কিশোরী-তরুণী নিরাপদ জীবনের কথা ভেবে কোন মুসলিম অভিবাসী তরুণকে বিয়ে করে যেই না ধর্মান্তরিত হন, ছেলেটি অনেক ক্ষেত্রেই নাগরিকত্ব পাবার পর দেশ থেকে ‘ভাল মেয়ে’ বিয়ে করে এসে ‘অনাচারী, শ্বেতাঙ্গ তরুণী’কে তালাক দেন। ইতোমধ্যে ঐ শ্বেতাঙ্গ তরুণী গর্ভবতী হয়ে পড়লে তার সন্তানরা হাসপাতালে মুসলিম নামেই নিবন্ধিত হন যদিও বাদ বাকি জীবনটা একাকী মা অথবা বৃদ্ধ মাতামহ-মাতামহীকেই ঐ সন্তানকে প্রতিপালন করতে হয়! পার্শ্ববর্তী ভারতে আন্তঃসম্প্রদায় বিয়ের ক্ষেত্রে অভিন্ন দেওয়ানী আইন চালু থাকলেও বাংলাদেশে এমন বিয়েতে সংখ্যালঘু তরুণ বা তরুণীকেই নিজ বিশ্বাস বিসর্জন দিতে হয়। সারা পৃথিবীর ‘অবিশ্বাসী’রা ‘বিশ্বাসীদে’র সাথে এই একতরফা ভদ্রতা ও নিজের অধিকার ছাড় ঠিক কতদিন ধরে দিয়ে চলবে? এই প্রশ্নটি নিজেকেই নিজে করা কি আজ মুসলিম সমাজের জন্যই খুব জরুরি নয়? হ্যাঁ, প্রশ্ন কিন্তু উঠছে। খোদ মুসলিম সমাজেই উঠছে। কাজি নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া, সালমান রুশদি, ওরহান পামুক বা তসলিমা নাসরীনরা এসব প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অধিকাংশের অবস্থানই তাদের মুসলিম সমাজে খুব সুখের হয়নি। ব্যক্তিগত ভাবে অনেক হতাশার ভেতরেও আমি আশা হারাই না যখন দেখি ফেসবুকে বাংলাদেশের প্রচুর মুসলিম তরুণ-তরুণী আজ ধর্ম নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন, কালোপাহাড়ি সব চিন্তা-ভাবনার ঝড় তুলছেন নানা পেজ ও ব্লগে (এমন কিছু পেজের লিঙ্ক দিলাম -যঃঃঢ়ং://িি.িভধপবনড়ড়শ.পড়স/#!/ঊৎৎড়ৎওহছঁৎধহঅহফঅহধষুংরং; যঃঃঢ়ং://িি.িভধপবনড়ড়শ.পড়স/#!/ইঝঐগ৭১, যঃঃঢ়ং://িি.িভধপবনড়ড়শ.পড়স/#!/ঢ়ধমবং/ওৎধহরধহ-ধঃযবরংঃধমহড়ংঃরপ-সড়াবসবহঃ/২৪৪৯৭০৩৮৮৯১৭৩২২)।

দুঃখিত, হয়তো অনেকটাই প্রসঙ্গান্তরে চলে গেছি বা যাচ্ছি। আজ বাংলাদেশে অনেক বামপন্থী বা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীর ভেতর যখন দেখছি যে পশ্চিমকে বিরোধিতার নামে পারলে মালালাকে অস্বীকার করে, তাদের প্রতি আমার একটাই বক্তব্যঃ দুইশো-আড়াইশো  বছর আগে ভারত উপমহাদেশে বৃটিশ উপনিবেশের যাবতীয় ক্ষতিকর ও নেতিবাচক প্রভাব মনশ্চক্ষে দেখেও যেমন কার্ল মার্ক্স পুরনো আর ঘুণে পচে যাওয়া সহস্রাব্দের ভারতীয় সমাজে এক ভাঙ্গনই আশা করেছেন নতুন গড়ে ওঠার আশায়, আজকের পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের, এই নব্য উপনিবেশবাদের হাজারটা ক্ষতিকর দিক অনুমান করে নিয়েও চোদ্দশ বছর আগের মানচিত্রে পৃথিবীকে যারা ফিরিয়ে নিতে চাইছে, সেই চুরির জন্য হাত কাটা, ব্যভিচারে পাথর ছোঁড়া আর দুই নারীর সাক্ষ্য সমান এক পুরুষের সাক্ষ্যের পৃথিবী ভাঙাটা আগে বেশি জরুরি।


কল্লোল

আমি ঠিক জানি না কেন মালালাকে নিয়ে গণমাধ্যমের হৈচৈ-কে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিতেই, তালিবানী কুকর্মগুলিকে জায়েজ বলার দোষারোপ শুরু হয়ে যায়।

মানে, কী? আবু ঘ্রাইব নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না? এবং প্রশ্ন তুললে তালিবানী নৃশংসতাকে মান্যতা দেওয়া হবে? কোল্যাটারাল ড্যমেজের নামে নির্বিচারে সাধারন মানুষকে হত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললে মালালার ঘটনাকে মান্যতা দেওয়া হবে?

এতো সহজ সব কিছু? এতোই সহজ?
 
অথচ এঁরা জানেন যে তালিবানদের তৈরী করেছে কারা। তারপরেও অনায়সে বলতে পারেন তালিবান আর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে বাছতে বললে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদকেই বাছবেন। আসলে, গায়ে আঁচ না লাগলে অনেক কিছুই বলা যায়। একটু অন্য রকম করে প্রশ্নটাকে রাখি? একজন মানুষকে যদি বাছতে বলা হয় কার দ্বারা ধর্ষিত হতে পছন্দ করবেন - একজন তালিবানের হাতে, না একজন মার্কিনী সেনার হাতে? কী উত্তর দেবেন?

আমরা কি প্রতিবারই প্রশ্নটাকে ঘৃণার সাথে ফিরিয়ে দেবো না এই বলে যে, কারুর হাতেই নয়। আমি কারুর হাতেই নিজেকে ধর্ষিত হতে দিতে চাই না। আসলে এই ধরনের প্রশ্নগুলোই একধরনের চালাকি, যা আমাদের গেলানো হয়েছে "লজিক"এর নামে। ভোট দিতে গেলে একটা না একটা চোরকেই বাছতে হবে। কাউকেই পছন্দ নয় এরকম কোন খোপ থাকবেই না। অথচ প্রভুরা যখন এমতাবস্থায় পড়েন তখন, মতামত জানানো থেকে বিরত থাকলাম - অনায়সে বলতে পারেন, সংসদ থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জ সব জায়গায়ই।


আর এরপরেই ব্যাতিক্রমহীনভাবে সাম্রাজ্যবাদের "ভালো" দিকগুলি উঠে আসবে। উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ঠিক একই যুক্তি উঠে আসে, এবং কুমীরছানা দেখানোর মতো উঠে আসে সতীদাহ রদ, বিধবা বিবাহ, স্ত্রী শিক্ষা ইত্যাদির জয়গান। সতীদাহ রদ বা বিধবা বিবাহ বা স্ত্রীশিক্ষার ফল সামান্য কটা শহরেই আটকে থেকেছে। তাতে খাপ পঞ্চায়েতের রমরমা কমে নি, মালালা আজও ঘটে, আজও ধর্ষককে বিয়ে করতে বাধ্য হন ধর্ষিতা, ডাইনি বলে হত্যা আজও ঘটে চলে। আজও মাছের মুড়োটা ছেলের পাতেই যায়। কী? না, রেনেসাঁ হয়েছে!!!

তর্কটা আরও চললে এরপর আসবে প্রযুক্তির কথা, তারপর চিকিৎসা বিজ্ঞানের কথা - যা আমাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুরা আমাদের দয়া করে দিয়েছেন।

খুব চেনা ছক, খুবই চেনা ছক।

কারা যেন কালীমূর্তিতে লাথি মেরে পার্টির সদস্য পদ পেয়েছেন। সেই মূর্খের দলের হাতেই তসলিমা "ঝেঁটিয়ে বিদায়" হন মোল্লা-মৌলভীদের তোয়াজ করতে। ছোট জাতের রাঁধুনীর হাতের রান্না খেতে অস্বীকার করে মিড-ডে মিলের পংক্তিতে, অবোধ শিশুরা।
 
আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার নামে যেন মধ্যযুগ ফিরিয়ে না আনা হয়। উল্টো আশঙ্কাটা মাথায় আছে তো?
 
আমরা আর কবে বলবো, তোমাদের দেওয়া বিকল্প্গুলির মুখে লাথি মারি। আমাদের মতো করে বাঁচার রাস্তা আমরাই বেছে নেবো। তোমাদের বেছে দেওয়া পছন্দগুলিকে আমরা ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করছি।
 
আর তা না হলে আসুন আবেদন করি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের কাছে - এসো সৌদি আরবকে গুঁড়িয়ে দাও, সেখানে সকলের সম অধিকার কায়েম হোক। এসো, দখল করো পাকিস্তান ও মায়নামারকে। চূর্ণ করো চীনকে। সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র স্থাপিত হোক।  ভারত দখল করে দলিত ও মেয়েদের উপর অবিচার বন্ধ করো।

হিম্মত থাকলে করে দেখাক পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ।

 



192 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ অপার বাংলা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১২  বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: সুশান্ত

Re: মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

দারুণ! কল্লোল। সঠিক ! "আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার নামে যেন মধ্যযুগ ফিরিয়ে না আনা হয়। উল্টো আশঙ্কাটা মাথায় আছে তো?

আমরা আর কবে বলবো, তোমাদের দেওয়া বিকল্প্গুলির মুখে লাথি মারি। আমাদের মতো করে বাঁচার রাস্তা আমরাই বেছে নেবো। তোমাদের বেছে দেওয়া পছন্দগুলিকে আমরা ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করছি।

আর তা না হলে আসুন আবেদন করি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের কাছে - এসো সৌদি আরবকে গুঁড়িয়ে দাও, সেখানে সকলের সম অধিকার কায়েম হোক। এসো, দখল করো পাকিস্তান ও মায়নামারকে। চূর্ণ করো চীনকে। সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র স্থাপিত হোক। ভারত দখল করে দলিত ও মেয়েদের উপর অবিচার বন্ধ করো।

হিম্মত থাকলে করে দেখাক পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ।

"
Avatar: কল্লোল

Re: মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

ওয়ক্কাস মীরের লেখা পড়ে কেমন যেন মনে হলো, ছায়ার সঙ্গে কুস্তি করে গাত্রে হলো ব্যথা।
কোন এক ইমরান খানের মালালা ঘটনার প্রতিক্রিয়ার জবাব দিচ্ছেন, সেটা বোঝা গেলো। সেই ইমরান খানের (আমাদের ক্রিকেট ইম্মি নাকি?) বক্তব্য না জানা থাকায় ভালো মন্দ কিছু মতামত দেওয়া বেশ কঠিন।
তবু, আলাদা করে ওনার কিছু মত নিয়ে বলার আছে।
টিটিপি একটা সন্ত্রাসবাদী দল। তাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি মৌলবাদী ইসলাম। তাদের কাজ কম্মো অতীব নিন্দাজনক। কেন? কারন তারা মনে করে ইসলামের যে ব্যাখ্যায় টিটিপি বিশ্বাস রাখে, তার সাথে যারা একমত নয় তারা ইসলামের শত্রু। তাদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই।
অন্যদিকে আমেরিকা মনে করে যারা আমেরিকার ব্যাখ্যা মতো গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, তারা আমেরিকার শত্রু। তাদের ধ্বংস করাই আমেরিকার মহান কর্তব্য। তাই ইরাক, তাই আফগানিস্তান, তাই ড্রোন হামলা। তাতে "অনিচ্ছকৃতভাবে" বেশ কিছু নিরপরাধ মানুষ মারা গেলেই বা কি ক্ষতি।
টিটিপিও শত্রুকে চিহ্নিত করে তার ওপর হামলা চালায়। তাতেও "অনিচ্ছকৃতভাবে" আশে পাশের কিছু মানুষ মারা যান, আহত হন। তাতেও বা কি আসে যায়।
উনি বলছেন টিটিপি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তাই তাদের সাথে আলোচনার মানে হয় না। বরং তাদের বিরুদ্ধে "যুদ্ধ" করাটাই শ্রেয়। একই তো যুক্তি ছিলো ভুট্টো-ইয়াহিয়াদের বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে। তাই নয় কি?
মীর সায়েব, একবার ভাবুন, কাদের স্বরে-সুরে কথা কইছেন?
মালালা নিয়ে যারা আঁসুর বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন, সেই পশ্চিমের ক্ষমতাধারীরা, তাদের কুকিত্তিগুলো ভুলে গেলে চলবে?
আমরা কি দুই শয়তানেরই বিরোধীতা করতে পারিনা? এক শয়তানের নিন্দা করলে অন্যটির পাশে দাঁড়াতেই হবে!! এই বাধ্যতা কেন?
Avatar: শুদ্ধ

Re: মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

মীর সাহেবদের সমস্যা হল সমস্যাটাই এঁরা ভাল করে বোঝেন না। খুব অগভীর কিছু চা দোকানি মার্কা যুক্তি তর্ক দিয়ে চলতে থাকেন। এই যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এবং হিংসাই ক্ষমতা দখলের পথ বলে টিটিপি-র বিরুদ্ধে শুধু যুদ্ধের ডাক দিচ্ছেন তিনি ভুলে যাচ্ছেন যে পাকিস্তান রাষ্ট্রটাও হিংসার মাধ্যমে দখল করা। তিনি ভুলে যাচ্ছেন হাজারো তথাকথিত হিন্দুকে তাড়িয়ে, উৎখাত করে, ধর্ষণ ও হত্যা করেই পাকিস্তান জন্মেছে। ভুলে যাচ্ছেন এমন করেই রাষ্ট্ররা জন্মায়। এখানে এদেশেও তাই হয়েছে। মুসলমানদের উপরে এখানেও হয়েছে অত্যাচার। হচ্ছেও নানা সময়ে। তাহলে কোন যুক্তিতে পাকিস্তানের অস্ত্র ধরাটা বৈধ?

সমস্যাটা হচ্ছে মালালা একটি দৃষ্টিভঙ্গীর নাম যা অদিতি ফাল্গুনির লেখার মতই একটি স্বত্ত্বাগত স্বীকৃতি ও অধিকারের দাবীদার। সেই দাবীটা ন্যায্য কি অন্যায্য আগে দেখা দরকার। তাকে ন্যায্য হওয়া সত্ত্বেও আমার শত্রু স্বীকৃতি দিয়েছে বলে আমি অস্বীকার করবো, এই ধরণের যুক্তি প্রবাহের মধ্যে গাঁটত্ব থাকতে পারে, যুক্তি না। মালালা-র দাবী পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে সঠিক, যে কোনো সময়েই। কথা হচ্ছে তাহলে পশ্চিমা সাম্রাজ্যকে কি কিছুই বলার নেই? আজ্ঞ বলার আছে। ইতিহাস দেখায় যে সে নিজের নিজের ভূখন্ডে সমস্ত অধিকারকে দলন করে বিদেশে সে সব নেই কেন এ নিয়ে জিকির তোলে। এবং এতে সে লজ্জাও বোধ করে না। কেন না তার বিশ্বাস, আমাদের বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মতনই, যে একটা মিথ্যে একটানা অনেকদিন বলে গেলে সেটা অন্তত জনমনে সত্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তা সত্যিই হয় না। আমরা অনেকেই ভুলি না গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা ঠিক কবে ও কোথায় গণতন্ত্রকে গলা টিপে মেরেছে, কবে কোথায় গণতন্ত্রের বিরোধী শিবিরের সঙ্গে সন্ধি করেছে নিজের ধান্দায়। আমরা সে কথাগুলো বলতেই থাকি। বলতে থাকবোও।

ওয়াক্কাস মীর গুলিয়ে বসেছেন গোটা বিষয়টা। আশু শত্রু যেহেতু তালিবান সুতরাং তিনি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের ল্যাজ ধরে ঝুলে পড়েছেন। এতে করে লাভ কিছুই নেই। যদি কাল তালিবান আমেরিকার স্বার্থগুলো মেনে নেয় তাহলে ড্রোন বাড়ি ফিরে যাবে আর তালিবান পাকিস্তান ও আফঘানিস্তান শাসন করবে। যাকে বলে আমে-দুধে মিশে যাবে আর মীরেরা আঁটির মতন গড়াগড়ি খাবেন। ইমরান খান কি বললেন তা নিয়ে না ভেবে এই সম্ভাবনা যা অতি সম্ভব তার দিকে তাকালে ভাল হয়। একটা কথা এঁরা ভুলে যাচ্ছেন পশ্চিমা দুনিয়ায় শাসককূলের তালিবানদের মত প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে একটি ধর্মীয় অ্যজেন্ডা আছে। আজ অব্দি কোনো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নাস্তিক বলে শুনেছেন নাকি? ঠিক এ দেশের নেতাদের মতন তাঁরা তাঁদের গীর্জায় মাথা ঠুকেই আসেন। এখনো আমেরিকার প্রদেশগুলোতে সমকামীতার অধিকার স্বীকৃত নয়। গর্ভপাত অনেক জায়গাতেই বেআইনী। আত্মহত্যার অধিকারও নেই। অর্থাৎ আমার শরীর আমার, এটা স্বীকৃত ভাবনা না। আরে মশাই ডারুইন এখন অব্দি ভাল করে পাঠ্য নয় যে দেশে সেখানে প্যান্ট শার্ট পড়া তালিবানেরা দেশ চালায় বোঝা যায় না কি?
Avatar: শুদ্ধ

Re: মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

আরো দু একটা কথা লেখা উচিত। মালালাকে কোন জায়গা থেকে সমর্থন করবেন? সমর্থন করতে গিয়ে তালিবানদের অত্যাচার যেমন দেখবেন তেমন এটা কি দেখবেন না যে সাম্রাজ্যবাদী দখলে আমাদের মতন দেশগুলো চলে যাওয়ার ফলে মালালাদের শিক্ষা আদৌ কদ্দূর হবে? মালালা কি শিখবে? তার শিক্ষার কাঠামো তৈরী হয়েছে পুরো উপনিবেশীয়। তার শিক্ষা কেনার ক্ষমতা আছে কি? রাষ্ট্র এখন শিক্ষার নামে এ সব জায়গায় শিক্ষার তামাশা দেয়। সেই শিক্ষা দিয়ে তার কি হবে? পশ্চিম এর থেকে ভিন্ন শিক্ষা দেওয়া হোক চাইলো কি? ডিগ্রী-ডিপ্লোমা কিনে নেওয়ার দেশগুলোতে এখন মালালা-রা কি শিক্ষা পাবে? যে শিক্ষা নিয়ে তার লড়াই সেটা পেতে গেলে সবার আগে চাই প্রকৃত কল্যাণকামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা। ব্যবসায়ীর হাতে শিক্ষা না। সেই ব্যবস্থা শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে তার নাগরিকের জন্য ব্যয় করতে বাধ্য থাকবে। কে করবে?

প্রতিটি রাষ্ট্র এই অঞ্চলে প্রতিবার প্রতিরক্ষা খাতে যে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ায় তা চোখে পড়ছে মীর সাহেবের? স্বাস্থ্য-শিক্ষা নিয়ে কাজ করলেই বা চাষীকে বিদ্যুৎ, সারে ভর্তুকি দিলেই সাম্রাজ্যের চাকররা রে রে করে তেড়ে আসেন। প্রতিরক্ষা খাতে খরচ বেড়ে সেই টাকা আমেরিকা-ফ্রান্স-ব্রিটেন-রাশিয়া বা সুইজারল্যান্ড-এ চলে যেতে দেখলে চোখ বন্ধ করে থাকেন কেন? পশ্চিমের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ চালালে মীর সাহেব যুদ্ধটাও যে আপনাকেই স্পনসর করতে হবে! হ্যাঁ, যুদ্ধের পরে তেল-খনিজ এ সবের দখল ওরা নেবেন, কিন্তু খরচ তো আপনি বা আপনারা বা আমরা দেব! কি ভাবে? আজ্ঞে এই যে বছরে বছরে সহায়তার জন্য পাকিস্তানকে টাকা দিচ্ছে আমেরিকা তা দেখে ভুলবেন না। এটা বিনিয়োগ। ভারতীয় জুজুর ভয় দেখিয়ে সামরিক ক্ষেত্রে আপনাদের অস্ত্র বেচে যত ডলার ওরা করেছে এটা সেই মুনাফার অতি সামান্য অংশ মাত্র। এবং এটাও কিছু না। তালিবান গেলে, আফঘানিস্তান ও পাকিস্তানের শিল্প ও কৃষিক্ষেত্র, ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ক্ষেত্র নিজেদের পোষ্য কোম্পানি দিয়ে দখল করে এটার কয়েক গুণ তুলে নেবে। ইরাক দেখছেন না? এতবছর বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তগুলোতে দেখেননি এ সব? তাহলে কি দেখলেন?

মালালা তারপরে শিক্ষার জন্য কি পাবে? সরকারী খরচে ভাল একটা কলেজ, একটা বিশ্ববিদ্যালয়, একটা সায়েন্স ল্যাব, একটা গ্রন্থাগার, খেলার মাঠ শরীর সুস্থ রাখার জন্য পাবে তো? নাকি তখন মীর সাহেব বলবেন এতো ভর্তুকি তো দেওয়া যাবে না! হ্যাঁ, আমরা শিল্প স্থাপনের জন্য এক টাকায় এক কোটি টাকার জমি দিতে পারি, কেন না লোকের কাজ হবে (যদিও সব শেষে দেখা যাবে কাজ পেয়েছেন একশো লোক, তখন বলা হবে আরে অটোমেশন না হলে পাল্লা দেবে কি করে!), কিন্তু শিক্ষা-স্বাস্থ্যে তো ভর্তুকি দিতে পারি না। তখন কি মীর সাহেব লিখবেন 'মালালাদের বুঝতে হবে...' জাতীয় ভারী বাক্যবন্ধ?

উত্তেজিত হয়ে লোককে নাইভ বলাটা একটা নেহাতই বোকা লিবারাল বুদ্ধিজীবি মার্কা কাজ। তাতে লোকে নাইভ হয় না, নিজের মূর্খামি আর শ্রেণীচরিত্র ফুটে ওঠে। ইমরান খান জাতীয় পাউডার নেতার কথার উত্তরে না, নিজের এ প্রসঙ্গে কিছু বলার থাকলে গ্রাউন্ড রিয়্যালিটিতে দাঁড়িয়ে কথা বলাই ভাল- সেমিনারের পেপার চাটা, স্ট্যাটিস্টিক্যাল বজ্জাতি করা এবং স্পনসর্ড বুদ্ধিজীবি অবস্থানে দাঁড়িয়ে না বলাই ভাল। লোকে বুঝে যাবে আসল চেহারাটা।
Avatar: audity falguni

Re: মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

প্রয় ইপ্সিতা,

কল্লোলের যুক্তিগুলো পড়লাম। কারো নামের প্রেেিত তাকে ‘বাবু’ বা ‘সাহেব’
ডাকা (অর্থাৎ বাংলা বা সংস্কৃত নাম হলে ‘বাবু’ আর আরবি-ফারসি নাম হলে
‘সাহেব’ তকমা দেওয়া) আমার বিবেচনায় কিঞ্চিৎ সা¤প্রদায়িক মনে হয় বিধায়
তাঁকে সোজাসুজি ‘কল্লোল’ নামেই অভিহিত করছি। তা’ সাম্রাজ্যবাদের
‘চাকর’দের এক হাত নিয়েছেন কল্লোল। সাম্রাজ্যবাদের ‘চাকর’ হতে সমস্যা কি?
যদি তা’ আমাকে বিদ্যুৎ, কলকারখানা, আধুনিক শিা, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা
দেয়? আমি ত’ সাম্রাজ্যবাদের ‘চাকর’ হতে আপত্তির কিছু দেখি না ।
সাম্রাজ্যবাদের চাকর না হলে আজো হয় ত’ গোটা ভারত উপমহাদেশে একটা মেয়েও
স্কুলে যেত না, আজো হয়ত ‘গৌরীদান’ চালু থাকত, চালু থাকত সতীদাহ? আজো হয়ত
পোলিওর টিকা পেত না উপমহাদেশের শিশুরা, আজো হয়ত গুটি বসন্ত পৃথিবী থেকে
নির্মূল হওয়ার বদলে বাংলার গ্রামে গ্রামে হিন্দুরা মা শীতলার দয়া আর
মুসলিমরা ওলা বিবির থানে মানত করেই তুষ্ট থাকত। উত্তরাধুনিকরা এই সব
ভা-রি পছন্দ করে! ওদের মতে এতে ‘সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য’ থাকে। আহারে,
বেজন্মা ‘সাদা’ পশ্চিম আমাগো শীতলার দয়া আর ওলা বিবির থানে মানতের বদলে
ইঞ্জেকশন নেওয়া শিখাইলো রে! রেনেসাঁ কত্ত বড় সর্বনাশটা করলো আমাগো!

হ্যাঁ, সামাজিক যে সব অন্যায্যতার প্রশ্নে কল্লোলের ােভ, রাগ বা আবেগ
তাকে কিšত্ত অসম্মান করি না। সত্যিই ত’ আজো উপমহাদেশের গ্রামগুলো ত’
বটেই, শহরেও ল ল মেয়ের বালিকা বয়সেই বিয়ে হচ্ছে, শিা পাচ্ছে না তারা।
শুধু মেয়েরা না। ছেলেরাও পাচ্ছে না। কিšত্ত পাশাপাশি উপমহাদেশের কোটি
কোটি নারী কি শিার আলো পান নি? হ্যাঁ, হয়তো সমাজের তুলনামূলক সুবিধাভোগী
শ্রেণীর নারীরাই শিা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তথা মতায়ণের সুযোগ পাচ্ছেন।
কিšত্ত কিছু ত’ পাচ্ছেন! কবে বিপ্লব আসবে আর সেই অলীক কল্পনার দিন গুনতে
যে কিছু মানুষ সুযোগ পাচ্ছে, তাদের পাওয়াটাও বাদ দিয়ে দিতে হবে এই কি
‘কল্লোলীয়’ যুক্তি? আহারে, মালালা কেমন শিা পাবে তাই নিয়ে কি ভাবনা
কল্লোলের! দুঃখে উনি বাঁচছেন না। বাংলাদেশেরই এক অকাল বয়সে প্রয়াত কবি
আবুল হাসানের একটি বিখ্যাত কবিতা আছে, ‘অতটুকু চায় নি বালিকা, চেয়েছিল
আরো কিছু কম, চেয়েছিল বাবা তার বেদনা বুঝুক, একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!’
আবুল হোসেন বয়:সন্ধিণে কিশোরীর মনে প্রেম চেতনার উন্মেষ নিয়ে কবিতাটি
লিখেছেন। তার কবিতাটি ভেঙ্গে অন্য ভাবে বলা যায় ‘অত কিছু চায়নি মালালা!
চেয়েছিল আরো কিছু কম!’ চোদ্দ বছরের কিশোরী জিন্স, স্কার্ট, হাইহিল পরতে
চায় নি। কৈশোরেই মা-দাদিদের মতো মাথা-কাঁধ ওড়নায় ঢেকে বয়সী নারীর পোশাকে
নিজেকে ঢেকে ফেলতেও ও আপত্তি করেনি। বারবি ডল, চকোলেট, বয়ফ্রেন্ড ত’ দূরে
থাকুক কল্লোল যেমন মালালার খেলার মাঠের কথাও ভেবেছেন বেচারি মেয়েটি তাও
চায় নি! পাকিস্থান ত’ দূরের কথা। তুলনামূলক অনেক বেশি লিবারেল বাংলাদেশী
সমাজেও ধর্মাধর্ম নির্বিশেষে আমরা মেয়েরা আমাদের বারো-তেরো বছর বয়স থেকেই
জেনেছি যে মাঠে আমাদের দৌড়াতে নেই। আমাদের শরীর থেকে ওড়না যেন কখনো
এতটুকু এদিক-ওদিক না হয়! ছোট্ট মেয়েটি একটু পড়তে চেয়েছিল শুধু! সেই তার
মাথায় গুলি করাটাকে বৈধতার সনদপত্র না দিলে ‘কল্লোলীয়’ নববিধান পূর্ণ হবে
কি করে? আচ্ছা, সাম্রাজ্যবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের চাকর-বাকরদের বাদ দিতে
হলে সাম্রাজ্যবাদের ছাপাখানা, টিউব ওয়েল, স্যানিটারি শৌচাগার, বাষ্পীয়
ইঞ্জিন, উড়োজাহাজ, স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট ব্যবহার বা এই ফেসবুকে বিতর্ক
বাদ দিয়ে চলুন না নলখাগড়ার কলম আর ভূর্জ্জপত্রের যুগে ফিরে যাই! অথবা
পাথরেও যুক্তি-তর্ক লেখা যেতে পারে! হাস্যকর!

হ্যাঁ, ভারতে নারী বা দলিতরা অত্যাচারিত। প্রবল ভাবেই অত্যাচারিত। কিšত্ত
বৃটিশের আধুনিক শিা না এলে ভারতে ঐ একজন আম্বেদকরের পওে মাথা তুলে
দাঁড়ানো সম্ভবপর হতো না! গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা না থাকলে
(সাম্রাজ্যবাদেরই বাই-প্রোডাক্ট বটে) মায়াবতী বা লালুপ্রসাদরা দেখা দিতেন
না, কালো-হিস্পানী-মেয়ে মানুষের ভোটে সাদা আমেরিকায় দ্বিতীয়বার জিততেন না
বারাক ওবামা। সংবিধানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল মানুষের
সাম্যের ‘কাগুজে’ হলেও যে নূ্যূণতম স্বীকৃতি তা’ সাম্রাজ্যবাদের কাছ
থেকেই আমাদের শেখা। শুদ্ধর একটি যুক্তিও হাস্যকর মনে হচ্ছে। পাকিস্থান
রাষ্ট্রের জন্ম ‘হিংসা’র মাধ্যমে হয়েছে বলে, কায়েদে আলী মোহাম্মদ জিন্নাহ
হিংসার ভিত্তিতে ‘পাকিস্থান’ গঠন করেছেন বলে আজীবন পাকিস্থানে ‘হিংসা’ই
চালু থাকতে হবে? জিন্নাহর নাতির নাতির প্রজন্মের ওয়াক্কাস মীররা হিংসার
বদলে শান্তি চাইতে পারবেন না? আমার ঠাকুর্দ্দা খুনি ছিলেন বলে আমাকেও
পেশাগত ভাবে খুনিই হতে হবে? দারুণ!

শুদ্ধর একটা যুক্তি পড়ে আরো বিষ্মিত হলাম। খুব অবাক হলাম যে কিকরে তিনি
পাকিস্থান সরকারের বিরুদ্ধে তালিবানদের লড়াই আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে
দু’টোই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই বললেন। কিকরে?? তালিবানরা গোঁড়া শরিয়তি
ইসলামে বিশ্বাস করে। গোঁড়া শরিয়তি ইসলাম মতে মুসলিমরা যে রাষ্ট্রে
সংখ্যাগরিষ্ঠ বা কাফের শাসিত সেটা ‘দারুল হরব’ বা মুসলিমদের বসবাসের
অযোগ্য ও সেখানে কাফেরদের বিরুদ্ধে ইসলামের ‘জিহাদ’ বা ‘ধর্মযুদ্ধ’ ঘোষণা
ত’ করতে হবেই এমনকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রেও যদি পরিপূর্ণ ইসলামী
শাসন ব্যবস্থা চালু না থাকে (যেমন, ব্যভিচারের জন্য পাথর ছুঁড়ে হত্যা,
চুরি করার শা¯িÍ হাত কাটা বা দু’জন নারীর স্ব্যা সমান একজন পুরুষের
স্ব্যা ইত্যাদি ইত্যাদি) তবে সেই দেশের প্রচলিত শাসন ব্যবস্থাও মুসলমান
নামধারী কাফের বা ছদ্মবেশী কাফেরদেরই পরিচালিত শাসন ব্যবস্থা। কাজেই
সেটাও ‘দারুল হরব’ এবং তার বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ পরিচালনা করা ‘সুন্নত’ বা
সাচ্চা, ঈমানদার মুসলমানের অতি অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কাজ। পাকিস্থানে
সামরিক শাসক জিয়াউল হক ‘হুদুদ অর্ডিন্যান্স’ সহ একাধিক নারীবিদ্বেষী,
মধ্যযুগীয় ধর্মীয় আইন পুনঃপ্রবর্তন করলেও সেখানে বৃটিশ প্রবর্তিত দেওয়ানী
(সিভিল) ও ফৌজদারি (ক্রিমিন্যাল) তথা আধুনিক আইনী ব্যবস্থার সাথে সঙ্ঘাত
বাধে। জেনারেল জিয়া যেহেতু তুলনামূলক লিবারেল শাসক ভুট্টোকে ফাঁসিতে
ঝুলিয়ে মতা দখল করেছিলেন, সেহেতু নিজেকে অধিকতর ইসলামী প্রমান করতে
পাকিস্থানের আদালত ব্যবস্থায় ‘শরিয়া বেঞ্চ’ প্রবর্তন করেন তিনি। চুরির
জন্য হাত কাটা, ব্যভিচারের জন্য পাথর ছুঁড়ে হত্যা বা ধর্ষিতা নারীকে
ধর্ষণের স্বপে প্রত্যদর্শী একাধিক পুরুষের স্ব্যা প্রমাণ করতে না পারলে
উল্টো তাকেই কারাগারে পোরা, মুসলিম পুরুষের স্বা্েয মুসলিম নারীকে আদালতে
অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করা বা যেকোন মুসলিমের স্বা্েয যেকোন অমুসলিমকে
আদালতে অভিযুক্ত করা হলেও উল্টোটি না হতে পারা, নবী বা নবীর পরিবার বা
সাহাবাদের বিরুদ্ধে কোন নিন্দার শা¯িÍ মৃতুদণ্ড বা ‘ব্লাসফেমি ল’ সহ নানা
ইসলামী আইন পাকিস্থানের তুলনামূলক যুক্তিবাদী অংশের ভেতর আতঙ্ক তৈরি
করেছিল। তেরো বছরের অন্ধ কিশোরী শাফিয়া বিবি তার মালিকের হাতে ধর্ষিতা
হবার শা¯িÍ হিসেবে উল্টো ‘জিনা অর্ডিন্যান্স’-এর আওতায় কারারুদ্ধ হয়
‘পুরুষকে প্ররোচিত করার অপরাধে।’ এই হল ইসামী আইন! তালিবানরা সেই ইসলামী
আইন বা আল্লার শাসন প্রতিষ্ঠা করতেই খোদ পাকিস্থান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে
যুদ্ধে নেমেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য লড়াই শুরু হয়েছিল শতকরা
৫৫ ভাগ বাঙালীর বিরুদ্ধে ৪৫ ভাগ অবাঙালী (পাঞ্জাবি, পাঠান, বালুচ, সিন্ধি
তবে মুখ্যতঃ পাঞ্জাবি)-র নানাবিধ আধিপত্য অবসান, বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও
ধর্মনিরপেতার ভিত্তিতে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ল্েয। ১৯৭১-এর
রক্তয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধান বাঙালী
জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে সংবিধানের চার মূল
¯Íম্ভ হিসেবে ঘোষণা করে। আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষ সম
অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অনেক সীমাবদ্ধতা সত্তে¡ও বাংলাদেশের মুসলিম নারী
পৃথিবীর আর দশটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের নারীর চেয়ে অনেক বেশি
স্বাধীন। পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে গার্মেন্টস
কারখানার শ্রমিক অথবা ফ্যাশন র্যাম্পে অংশ নেওয়া, এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়
করা...সব কিছুই ত’ করছে বাংলাদেশের ধর্মীয় ভাবে মুসলিম নারীরাই। আজকের
বাংলাদেশ তার সব সীমাবদ্ধতা সত্তে¡ও মুক্তিযুদ্ধেরই ফসল। শুদ্ধ কোন্
বিবেচনায় তার সাথে স্কুল ছাত্রীদের মাথায় গুলি করা তালিবানীদের যুদ্ধকে
এক করছেন তা’ বিবেচনা করা দূরূহ। আজ যদি বিজেপি-শিবসেনা ভারতে রাম রাজ্য
বা মনুর অনুশাসন কায়েম করতে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র
সংগ্রামে নামে, তার সাথে চারু মজুমদারের রাষ্ট্র বিরোধী লড়াইকে কি এক
করবেন শুদ্ধ?

শেষপর্যন্ত একটি কথা না বললেই নয়। কল্লোলের মত ‘অতি বামপন্থী’রাই ইরাণে
ইসলামী বিপ্লবের আগে লিবারেল বুর্জোয়া শাহ রেজা পাহলভিকে সরাতে আর
‘সাম্রাজ্যবাদ’ ঠেকাতে খোমেনীকে সাহায্য করেছিলেন। খোমেনী চমৎকার ভাবে
৬৪,০০০ কমিউনিস্টকে হত্যা করে সেই সাহায্যের দেনা পরিশোধ করেছেন। ঠিক
যেমন বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমানের হত্যাকান্ডের ষঢ়যন্ত্রে জড়িত জেনারেল জিয়াউর রহমানকে পনেরোই
আগস্টের ক্যুয়ের পর খালেদ মোশাররফের মতো মুক্তিযুদ্ধপন্থী সেনা অফিসাররা
যখন পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কারারুদ্ধ করেন, তখন ‘বামপন্থী’ সেনা
অফিসার কর্ণেল তাহের ‘বিপ্লবে’র স্বপ্নে তাড়িত হয়ে ৭ই নভেম্বরের আর একটি
অভ্যুত্থানের মাধ্যমে খালেদ মোশাররফ সহ অন্য মুক্তিযুদ্ধ পন্থী সেনা
অফিসারদের হত্যা করে যে ‘ইসলাম ও পাকিস্থান পন্থী’ জেনারেল জিয়াউর
রহমানকে মতায় বসালেন, সেই জিয়াউর রহমান মতায় বসেই প্রথম যে কাজটি
করেছিলেন তা’ হল ১৯৭১-এর যুদ্ধে একটি পা হারানো ও আরিক অর্থেই
‘প্রাণদাতা’ তাহেরকে জেলখানায় বন্দী করে কোর্টমার্শাল তথা প্রহসনমূলক
বিচারের নামে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কৃতজ্ঞতার ঋৃণ পরিশোধ করেন।

Avatar: শুদ্ধ

Re: মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

Audity Falguni, দয়া করে পোস্ট পড়ে-টড়ে শ্লেষ করবেন। নইলে ব্যাপারটা খুব বোকার মতন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আপনার কি হাস্যকর লাগে আমি জানি না ঠিক, তবে আমার ক্ষেত্রে কেউ যদি না পড়ে কথা বলে তাহলে শুধু হাস্যকরই না বিরক্ত লাগে। মনে হয় বেকার সময় নষ্ট করছি। আর সময় নষ্ট করার মতন নির্বোধ কাজ আর কিছুই হয় বলে মনে হয় না আমার।

১। "শুদ্ধর একটা যুক্তি পড়ে আরো বিষ্মিত হলাম। খুব অবাক হলাম যে কিকরে তিনি
পাকিস্থান সরকারের বিরুদ্ধে তালিবানদের লড়াই আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে
দু’টোই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই বললেন। কিকরে??"

এটা আমার লেখায় কোথায় দেখলেন একটু দয়া করে দেখাবেন।

২। যে কোনো রাষ্ট্র হিংসার মাধ্যমেই ক্ষমতা দখল করে রাখে আর হিংসার মাধ্যমেই তা বজায় রাখে। পুলিশ, মিলিটারি কেউই ফুলের বাগানে কাজ করার জন্য তৈরী না। এই সামান্য সত্যটুকু এত কঠিন মনে হচ্ছে কেন আপনার সেটাও আমি বুঝলাম না। আমিও আপনার মতন হাস্যকর-ফর লিখতে পারতাম। কিন্তু মনে হল যুক্তি দিয়ে কথা বলতে না পারলে আগে বিশেষণ প্রয়োগ করে-টরে কথাকে জোরালো করাটা আপনার একটা তার্কিক বৈশিষ্ট্য বোধহয়। তাই লিখলাম না। এবং লেখা পড়ে আমার বক্তব্য বোঝেননি বুঝলাম। বুঝিয়ে দিচ্ছি (যদিও তাতে কি লাভ জানি না, কেন না যা আমি লিখিনি তা নিয়ে আপনি দীর্ঘ্য একটি প্যারাগ্রাফ যখন লিখে ফেলেছেন তখন এটাও পড়বেন কি না জানা নেই)।

লিখেছিলামঃ "এই যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এবং হিংসাই ক্ষমতা দখলের পথ বলে টিটিপি-র বিরুদ্ধে শুধু যুদ্ধের ডাক দিচ্ছেন তিনি ভুলে যাচ্ছেন যে পাকিস্তান রাষ্ট্রটাও হিংসার মাধ্যমে দখল করা। তিনি ভুলে যাচ্ছেন হাজারো তথাকথিত হিন্দুকে তাড়িয়ে, উৎখাত করে, ধর্ষণ ও হত্যা করেই পাকিস্তান জন্মেছে। ভুলে যাচ্ছেন এমন করেই রাষ্ট্ররা জন্মায়। ...তাহলে কোন যুক্তিতে পাকিস্তানের অস্ত্র ধরাটা বৈধ?"

এর মানে হল রাষ্ট্র নিজেই যখন তৈরী হয় অস্ত্রের মাধ্যমে, তখন সে তার বিরোধীকে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে বলেই অস্ত্র নিয়ে কোপাতে যাওয়াকে বৈধ বলে দাবী করতে পারে না। দুটোর কোনোটাই বৈধ না, এটা ছিল সঙ্গের অর্থ।

শেষে একটা কথা বলি, রূঢ়তা জীবনে কিছু কম দেখিনি, আর রূঢ় চাইলে কম হতেও পারি না। কিন্তু সেটা যে কোনো সিরিয়াস আলোচনার বিরুদ্ধে যায় বলে সচরাচর এড়িয়ে যাই। খামোখা রূঢ়তা দেখালে, বা আপনার পান্ডিত্য দেখাতে গিয়ে আমাকে অপমান করলে হয়তো ফেরত দিতে বাধ্য হব। আমার মতামত বা ভাবনা আপনার সঙ্গে মিললো কি মিললো না সেটা দেখার জন্য প্রথমত আপনাকে আমার লেখাটা পুরো ও সঠিক ভাবে পড়তে হবে। দুই, সেখান থেকে যা মনে হবে সেটা বলবেন যখন তখন রূঢ়তা এড়াতে চাইলে রূঢ়তা নিজে বর্জন করুন।

আপনার ওই সাহেব আর বাবু-র শ্লেষটা বুঝেছি। কিন্তু আপনার সরল অসাম্প্রদায়িকতার বোধে আমি কেন ওই সম্বোধন লিখেছি সেটা বোঝা খুব দুষ্কর হবে মনে হল বলে ব্যাখ্যাই দিলাম না। হ্যাঁ, এটাও রূঢ়তা যাতে আপনি আমাকে অকারণ বাধ্য করেছেন।

Avatar: কল্লোল

Re: মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

অদিতি। আপনি সাম্রাজ্যবাদের চাকর হয়ে থাকতে চান থাকুন। তাতে আমার আর আপত্তি করার কিইবা আছে।
আমার অবস্থান আমি খুব স্পষ্ট করে জানিয়েছি। মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ কারুর চাকর হতেই রাজি নই।
আপনার যুক্তিগুলির কথা আমি তো আমার লেখাতে আগেই লিখেছি। এগুলো খুব চেনা ছক। যখনই মানুষমারা উন্নয়নের বিরোধীতা হয় তখন এই কুমীর ছানাগুলিই দেখানো হয়।
জাপানে রেলগাড়ী আর আধুনিক চিকিৎসা ইত্যাকার "উন্নয়ন" আনতে ইংরাজ বা ফরাসী বা জর্ম্মন সাম্রাজ্যবাদ লাগে নি।
আপনি শুদ্ধের একটি পয়েন্ট এড়িয়ে গেছেন। এই সাম্রাজ্যবাদী বাবারাই বলেন রাস্তা, চিকিৎসা, ইস্কুল - এসব রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। এসবে রাষ্ট্রের পয়সা খচ্চা মহাপাপ। তাদেরই তো সাজে মালালার ইস্কুলে যেতে না পারা নিয়ে টন টন নোনতা পানি বহানো।
Avatar: brcslg

Re: মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

Malala's name being used to raise money in Britain

Islamabad : Several people from the British Pakistani community have begun raising money to "promote education" in the name of Malala Yousufzai, the teenaged rights activist shot by the Taliban and currently undergoing treatment in Britain.

The 15-year-old Malala is being treated at Birmingham's Queen Elizabeth Hospital.

The News International said people have donated money in the girl's name, but that there was little transparency in how these funds are being raised, where the money will be spent and who will oversee the fund-raising as well as the implementation.

Officials from the Pakistan High Commission as well as Queen Elizabeth Hospital told the daily that Malala's family has not authorised any individual or organisation to collect money for setting up any institution by using Malala's name.

"The impression that Malala's family and the High Commission for Pakistan in Britain are supporting any individual or organisation to establish any institution using the name of Malala is incorrect," the high commission said in a statement.

"Those who are using the name of Malala or the High Commission for Pakistan in Britain for setting up any project or collecting donations should refrain from it."

A hospital spokesman told the daily an account has been set up within the main hospital fund to support Malala and it had not extended support to any organisation or individual.

A Pakistani organisation launched an initiative called "Malala Girls School Project", and raised 1,500 pounds. But the organisers of the event had no idea where the school in Pakistan will be built.

Another organisation called Riwayat in London sold tickets for a fashion show in Malala's name. It said funds will be raised for Malala, and many models and designers had been flown in from Pakistan for the event titled Pakistan Fashion Week3 (PFW3).



http://twocircles.net/2012nov16/malalas_name_being_used_raise_money_br
itain.html

Avatar: কল্লোল

Re: মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

অদিতির জবাবটি আর একবার পড়তে গিয়ে একটি মুক্তোর সন্ধান পেলাম। সাম্রাজ্যবাদ নাকি আমাদের সাম্য শিখিয়েছে (যদিও স্বীকার করেছেন ওটা "কাগুজে সাম্য")।
হায় রে, চাকরগিরি করে করে মগজে কার্ফিউ। ইংরাজ এদেশে আসবার কয়েকশত বৎসর আগে কোন এক নিমাই পন্ডিত শ্রীচৈতন্য হয়ে শুদ্রের সাথে, ছোট জাতের মানুষদের সাথে সাথে নামগান করলেন, সে আর কে মনে রাখে। চন্ডিদাস তারও আগে লিখলেন সবার উপরে মানুষ সত্য / তাহার উপরে নাই, সে সব কিছু নয়। নাকি কে জানে বাপু এরা সব গোপনে ইউরোপ ঘুরে এসেছিলো কিন!!
এইযে উপমহাদেশ জুড়ে অসংখ্য সুফি সন্ত, আভিজাত্যের মুখে জুতো মেরে সাম্যের জয়গান গেয়ে গেছেন, সে সব আর চোখে পড়ে না।
আর সাম্রাজ্যবাদীরা সাম্য শেখাতে, ফাস্টো কেলাস কামরায় লিখে রাখতো Dogs and Natives not allowed। ওঃ দারুণ সিক্ষা!!
Avatar: কল্লোল

Re: মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

অদিতি নিজেকে কোথায় নিয়ে যচ্ছেন! আপনি সাম্রাজ্যবাদের জয়গান গাইতে যেসব যুক্তি দিচ্ছেন, সেগুলোই ৩০০ বছর আগে "হোয়াইট ম্যানস বার্ডন" নামে চলতো।
আপনি কিসব "কল্লোলীয় বিধান"এর কথা বলেছেন। আমি তো কোথাও কোন বিধান দেই নাই। আমি তালিবানদের নিন্দা করেছি, আর বলেছি সাম্রাজ্যবাদ আর তালিবানে ফারাক কিছু নাই। একজন ধর্মের নামে বিরোধী স্বর কচুকাটা করে, অন্যজন গণতন্ত্র, সুশাসনের নামে সেটাই করে।
তালিবান বলছে ইস্কুলে যাবার দরকার নেই। সাম্রাজ্যবাদ বলছে - তা কেন? হগ্গলেই ইস্কুলে যাক। তবে কি, মাগনায় তো কিছু দেওয়া যাবে না। ফেলো কড়ি মাখো তেল। আমি কি তোমার পর? যাদের কড়ি নেই তাদের কাছে একই হয়ে দাঁড়ায় দুজনে।
বরং আসেন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতার লাগামটা তালিবানদের হাত থেকে কেড়ে আমরা হাতে নেই। মৌলবাদ বিরোধীতার লাগামটা সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে আমরা ছিনিয়ে নেই।
বিরুদ্ধতার চাবুক ওঠাও হাতে / আমার স্বদেশ লুঠ হয়ে যায় প্রতিদিন প্রতি রাতে।
Avatar: :-)

Re: মালালা বিতর্কঃ ভিন্ন স্বর

সাম্যের প্রশ্নে এবার তো তাহলে ঈশানকে আসতেই হয়। বাংলালাইভের লেখাপত্রের ইউনিকোড ট্রান্সফর্মেশনের কিছু ব্যবস্থা করলে অবশ্য সেসব আমিও এনে দিতে পারি।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন