বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

lajens daadu

priyaa`Mkaa raay byaanaarjee



"শোন, তোরা কখন বেরোচ্ছিস?'
"মানে, কোথায় যাব!'
"কী আশ্চর্য্য, তুই খবরটা শুনিসনি এখনও?'
"কী খবর?'
"উফ, মামু ফোন করেনি এখনও, বা ফুলদি?'
"টুবাই, এবার কিন্তু আমার ভাল্লাগছে না। বাবা তো অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ, এখন বাড়ি পৌঁছাবার সময় হয়ে গেল, ফোন করবে কী করে? আর ফুলদিও করেনি। কী হয়েছে বলবি দয়া করে?'
"ওহ শিট, তার মানে তুই শুনিসনি এখনও। ফুলদি বোধহয় ফোনে পায়নি তোদের।'
"তোর গলাটা এরকম লাগছে কেন, কী হয়েছে বল প্লিজ।'
"মামীকে ফোনটা দে, একটা খারাপ খবর আছে। আমি তোকে বলতে পারব না, পরে শুনে নিস।'
"না, আমি তোর থেকেই শুনব। বল না, কী খারাপ খবর?'
"লজেন্স দাদুর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।'
"ওমা! কী করে, কখন? তুই সত্যি বলছিস?'
"হ্যাঁ, আজ সকালে হয়েছে, ফুলদি আমাদের বাড়িতে আর মামুকে অফিসে ফোন করেছিল। তোদের করেনি বোধহয়, আজ তোর পরীক্ষা ছিল বলে।'
"অদ্ভুত তো! পরীক্ষা বলে আমাকে এই খবরটা জানাবে না! তুই ইয়ার্কি মারছিস না তো টুবাই?'
"বোকার মত কথা বলিস না পুই। এরকম একটা ব্যাপার নিয়ে আমি ইয়ার্কি মারব?'
টুবাই ঝাঁঝিয়ে উঠতে পিউয়ের বিশ্বাস হল খবরটা তাহলে সত্যি। ও তো কখনও "পুই' সম্বোধন করে মিথ্যা বলে না। টুবাই পিউয়ের একমাত্র পিসতুতো ভাই, ওর সবচেয়ে ভাল বন্ধুও। কিন্তু খবরটা...এ আবার কী হয়ে গেল হঠাৎ? লজেন্স দাদু তো এমনিতে সুস্থই ছিলেন, আচমকা কী হল!
ফোনের ওপার থেকে টুবাইয়ের ডাক শুনে সম্বিৎ ফিরে এল পিউয়ের। মা'কে ডেকে ফোনটা দিয়ে চেয়ারে বসে অস্থির হয়ে ছটফট করতে লাগল। শুনতে শুনতে মা'র মুখটা আস্তে আস্তে গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিল। ফোনটা রেখে মা বলল, "রেডি হয়ে নাও পিউ, বাবা অফিস থেকে ফিরলেই আমারা বেরোব। টুবাইরা আমাদের নিতে আসবে।'
প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে পিউ ভাবছিল অ্যাক্সিডেন্টটা হল কী করে! এখন দাদু কোথায় আছে, কেমন আছে, টুবাই তো এগুলো বলল না কিছুই। মা'কে জিজ্ঞেস করাতে, "গেলেই সব জানতে পারবে,' বলে মুখে কুলুপ আঁটল। আজকেই পিউয়ের ক্লাস ইলেভেনের অ্যানুয়াল পরীক্ষার শেষ দিন ছিল। কোথায় ভেবেছিল এর পর ক'দিন বন্ধুদের সাথে, টুবাইয়ের সাথে ঘুরবে, আড্ডা মারবে, কিন্তু এ কি অঘটন ঘটে গেল। এখন কী হবে, ওরা যাবে, দাদুকে কী অবস্থায় দেখবে, কতদিনে সেরে উঠবে কে জানে। নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পাচ্ছে, আহা রে।
রেডি হতে হতে লজেন্স দাদুর কথাই মনে পড়ছিল পিউয়ের। ওঁর নামকরণটা এরকম হবার কারণ একটাই - ছোটবেলা থেকে আজ অব্দি ওনার সাথে যতবার দেখা হয়েছে, ওদের ভাইবোনেদের উনি নানারকম লজেন্স দিয়েছেন। এটা ওঁর হবিও বলা যেতে পারে। শুধু ওদেরই নয়, যেকোনো বাচ্চার সাথে দেখা হলেই দাদু অন্তত: একটা করে লজেন্স দেবেনই। রাস্তায় বেরোলে ওনার পাঞ্জাবীর পকেটে সবসময় কিছু লজেন্স থাকে, সেগুলো আবার সাধারণ ব্র্যাণ্ডেড লজেন্স নয়, নিউ মার্কেট থেকে কেনা আলাদা রকমের রঙ-বেরঙের জিনিস। প্রতি মাসে একবার করে উনি কলকাতায় আসেন লজেন্স কিনতে। এসে পিউ আর টুবাইয়ের বাড়িও ঘুরে যান। স্বভাবতই ভদ্রলোক বাচ্চাদের খুব প্রিয়, শুধু লজেন্সের জন্যই নয়, দেশ-বিদেশের নানারকম গল্পের জন্যও। এই দাদু সম্পর্কে পিউয়ের মামাদাদু, বাবা'র মামা। বিয়ে করেননি, রেলে চাকরি করতেন। এখন বহুদিন হল অবসর নিয়ে পিউ এর ঠাকুমা আর দুই পিসির কাছেই থাকেন।
টুবাইরা এলে ওরা গাড়ি করে বেরিয়ে পড়ল বসিরহাটের উদ্দেশ্যে। ওখানেই ওদের আদি বাড়ি। গাড়িতে পাশাপাশি বসে পিউ চুপিচুপি জিজ্ঞেস করল, "দাদুর এখন কী অবস্থা রে?' একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টুবাই বলল, "দাদু আর নেই।' অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর পিউ বলল, "কখন হল?'
"আজ সকালেই। তোর পরীক্ষা ছিল বলে'...
"কী হয়েছিল সব বল।'
"কাল সন্ধ্যাবেলা দাদু বেরিয়েছিলেন রোজকার মত আড্ডা মারতে। কিরকম ঝড়-জল হয়েছিল কাল জানিসই তো, ফেরার পথে নাকি তুমুল বৃষ্টিতে রাস্তা ভুল করে বাড়ির পাশের পুকুরটায় গিয়ে পড়েছিলেন। আজ সকালে বডি ভেসে উঠেছে।'
পিউ চুপ করে বসে রইল। একদৃষ্টে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নি:শব্দে কেঁদে গেল অনেকক্ষণ। অন্ধকারে গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে চলল গাড়ি, মাঝে মাঝে দোকানের, বড় টাউনের মোড়ের আলো পিছলে বেরিয়ে যেতে লাগল জানলার ওপারে। এত প্রিয় একজন মানুষের এরকম মর্মান্তিক মৃত্যু কিছুতেই বিশ্বাস করা যায় না। ঘরে সারি সারি কাঁচের বমে অগুণতি লজেন্স সাজানো রয়েছে, অথচ তার মালিক আর এই জগতে নেই।
দেগঙ্গায় প্রচুর জল-কাদার মধ্যে জ্যামে আটকে বাবা পিসেমশাইকে বলল, "শুধু আমি আর তুমি ট্রেনে আসলেই হত না? সবাইকে নিয়ে এসে দেখো কত দেরি হয়ে যাচ্ছে যেতে। ওখানে সব আটকে আছে।' পিসেমশাই বললেন, "আমাদের তো ওখানে অনেক কাজ, এরা না এলে শিখাদের সামলাতো কে?' বাবা বলল, "শিখা আর মীনা ওখানে সারাবছর একাই থাকে অরুণ, মা আর মামাঞ্চর দেখাশোনাও ওরাই করে। আমরা আর ওদের কী সামলাবো?'
রাত্রি সাড়ে ন'টা নাগাদ পৌঁছে ওরা দেখল দাদুর বডি তখনও আসেনি বাড়িতে। অপঘাতে মৃত্যু বলে সদর হাসপাতালের মর্গে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। সারাদিন পরেও এখনও পোস্টমর্টেম হয়নি। বাবা, পিসেমশাই আর টুবাই গেল মর্গে, বডি ছাড়িয়ে আনতে। বাড়ির সবার বিধ্বস্ত অবস্থা - ঠাকুমা পাথরের মত চুপ করে বসে আছেন ঠাকুরঘরে, ফুলদি (পিউয়ের মেজপিসি) একাই দৌড়ঝাঁপ করে বেড়াচ্ছে আর বেচারা মণি (ওর ছোটপিসি) কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির সব কাজ করছে। কাল রাত থেকে দাদু না ফেরায় কারুরই চিন্তায় খাওয়া-ঘুম হয়নি। অত ঝড়-জলে কেউ বেশিদূর যেতেও পারেনি খোঁজ করতে। বাড়ির পাশ দিয়ে গিয়ে দাদু পুকুরে পড়ে গেলেন, অথচ কেউ জানতেও পারল না! অবশ্য বাজ পড়ার আওয়াজে কেউ গলা ফাটিয়ে ডাকলেও কিছু শোনা যায় না এখানে। খবর পেয়ে পাড়ার লোক, আশে পাশের আত্মীয়-স্বজন সবাই ভীড় করে এসেছে বাড়িতে। নিজেদের শোকের সময় এত অবাঞ্ছিত লোক পিউয়ের অসহ্য লাগছিল, কিন্তু কাউকে কিছু বলারও উপায় নেই।
মণির অনেক জোরাজুরিতে একটু ভাতে-ভাত খেয়ে পিউ ঠায় বসে রইল সামনের বারান্দায়। বাবারা বডি নিয়ে ফিরল রাত তিনটে নাগাদ। দুদিন আগেও যাঁর সাথে ফোনে কথা হয়েছে, আজ তাঁর সাদা চাদরে মোড়া নিথর দেহটা দেখে ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল পিউয়ের। এটা ওর জীবনে দেখা প্রথম মৃত্যু নয়। কিন্তু সবচেয়ে দুখ:জনক। ওদের তিন মামাতো-পিসতুতো ভাইবোনের মধ্যে দাদু বোধহয় দিদিভাইকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন, প্রথম নাতনি বলে। ওর আর টুবাইয়ের চেয়ে দশ বছরের বড় দিদিভাই আজ আসতে পারেনি। স্কুলে ছুটি পায়নি পরীক্ষার মরসুমে। তা ছাড়া ওর শাশুড়ি নাকি বলেছে, "শ্রাদ্ধের সময় তো যাইতেই হইব, এখন আর গিয়া কী করুম? আপনারা তো যাচ্ছেনই, আর মামাদাদু বই নিজের দাদু তো নয় যে সব কাজ ফেলে এক্ষুণি...।'
দাহকাজ সারা হতে হতে সকাল হয়ে গেল। শ্মশান থেকে ফিরে স্নান-খাওয়া সেরে নিয়ে টুবাই এসে বসল পিউয়ের পাশে। ওর মুখ দেখেই পিউ বুঝতে পারল যে ওর কিছু বলার আছে। বয়সে এক মাসের ছোটবড় হওয়ার দরুণ ওদের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম টেলিপ্যাথি আছে সেই ছোটবেলা থেকেই। টুবাই একবার জিজ্ঞেসও করেছিল ছোটবেলায়, "মা, আমি আর পিউ কি যমজ?' আর কোথাও বসার জায়গা না পেয়ে দুজনে লজেন্স দাদুর ঘরে গিয়েই বসল। দাদু নানারকম কবিরাজি ওষুধ খেতেন, সেগুলো শিশি করে রাখা থাকত জানলার নীচে কাঁচের আলমারিতে। ধূসর, পুরনো সেই গুঁড়ো ওষুধগুলো দেখে পিউ জিজ্ঞেস করত, "দাদু, তুমি ধুলোবালি খাও কেন?' দেওয়ালে টাঙানো দাদুর যুবক বয়সের একটা ছবি, কী সুন্দর দেখতে ছিলেন। আলনাতে দাদুর কাচা ধুতি-পাঞ্জাবী দেখে পিউয়ের আবার কান্না পেয়ে গেল। দেখল পাশে বসা টুবাইয়ের চোখেও জল।
"জীবনে প্রথমবার আজকে মর্গে গিয়ে আমার ভয়ানক অভিজ্ঞতা হল রে। আর কাউকে বলতেও পারব না।'
"কেন যে তুই যেতে গেলি সাহস করে!'
"গেলাম। এখন বড় হয়ে গেছি তো। সবরকম অভিজ্ঞতা হওয়া দরকার জীবনে। কিন্তু এটা সত্যিই ভয়ঙ্কর।'
"আমায় বলে দে। মন হালকা হয়ে যাবে।'
"গূন-সূঁচ দিয়ে মানুষের চামড়া সেলাই করতে দেখিনি রে কখনও। তাও সেই প্রিয় মানুষটার, যার জলে ভেজা ফুলে ওঠা চেহারা দেখে চিনতেই পারছিলাম না। তুই থাকলে হয়ত বমি করে ফেলতিস। আমি অনেক কষ্টে আটকেছি। হাসপাতালের ডাক্তারদের কাছ থেকে লড়াই করে তাড়াতাড়ি পোস্টমর্টেম করিয়ে বডি বের করে আনা যে কী ঝঞ্ঝাটের ব্যাপার ভাবতেও পারবি না।'
কথাগুলো বলার সময় টুবাইয়ের অভিব্যক্তি দেখছিল পিউ। ছেলেটা যেন এক ঝটকায় অনেকটা বড় হয়ে গেছে, বাইরের দুনিয়ার খোলস-ছাড়ানো রূপটা দেখে। শহরের হাসপাতালেই তাড়াতাড়ি কিছু হয় না, তার ইছামতীর ধারে তাদের সো-কল্‌ড "টাউন'-এর হাসপাতাল! নামেই টাউন, দু'মাইল ভেতরে গেলেই গণ্ডগ্রাম। আর ইছামতীর ওপারে, বাংলাদেশ বর্ডার, পুরো জায়গাটাই চোরাচালানকারীদের ঠেক। কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে কলকাতা নিয়ে যাওয়ার আগেই মারা যায় প্রায়ই।
"তবে জানিস, পোস্টমর্টেমে জানা গেছে দাদুর নাকি মাইল্ড হার্ট-অ্যাটাক হয়েছিল সেদিন রাত্রে।'
"হয়তো বাড়িতে ঢোকার আগেই হয়েছিল, তাই রাস্তা ভুল করে পুকুরে গিয়ে পড়েছিলেন।'
"হয়তো। আসলে কী হয়েছিল কেউই জানতে পারবে না কোনোদিন।'
"পুলিশ কি খুন সন্দেহ করছে নাকি রে?'
"জানিনা। ইনভেস্টিগেট করে দেখবে বলল। তবে আমরা তো জানি, দাদুর কোনো শত্রু থাকতেই পারে না।'
"সত্যিই, অত ভাল লোকের আবার শত্রু হয় নাকি।'
"তোর মনে আছে, দাদু ছোটবেলায় আমাদের সেই বরিশাল সম্মিলনীর পুজোতে নিয়ে যেতেন?'
"হ্যাঁ, তখন ভাবতাম বরিশাল জায়গাটা বাংলাদেশে হলে তার পুজো কলকাতায় হয় কেন।'
"ওখানে সব পুরনো গ্রামের লোকদের দেখলে দাদুর মুখটা কিরকম জ্বলজ্বল করে উঠত না?'
"আর তারপর সারা বছর পুরো কলকাতা ঘুরে তাদের খোঁজখবর রাখতেন। কোন গলিঘুঁজিতে কে থাকে, সেখানেও গিয়ে তাদের দেখে আসতেন।'
"তুই খুব মিস করবি দাদুকে, না রে? আমিও।'
"আর দিদিভাই?'
"কী জানি! বিয়ে-টিয়ে হয়ে গিয়ে ও কিরকম একটা হয়ে গেছে। আর অয়নদাও তো দাদুকে কেন জানিনা খুব একটা পছন্দ করে না।'
"আমি ফুলদিকে বলব, এইসব লজেন্স-ধুলোবালির শিশিগুলোকে এইরকমই সাজিয়ে রাখতে এ ঘরে? এর পর থেকে এখানে এলে অন্তত: সেই পুরনো দাদুর ঘর বলেই মনে হবে।'
"কী লাভ পুই? দাদুকে নিজের মনের ভেতরেই রাখ না। আমরা মনে রাখলেই তো হল।'
আজ দশ বছর পর সেই ঘরে দাঁড়িয়ে তিন ভাই-বোন। বহুদিন পর সবাই মিলে এক জায়গায় হওয়া গেছে। দিদিভাইয়ের বাচ্চা দুটো সারা ঘর জুড়ে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। আলমারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ ছোট মেয়েটা একটা পুরনো শিশি বার করে এনে পিউকে দেখিয়ে বলল, "এটাতে কী আছে মিমি? তোমরা এরকম ধুলোবালি জমিয়ে রাখো কেন বোতলে করে?'
উত্তরে অবাক হয়ে দেখল তিন জনের মুখে হাসি, চোখে জল।


167 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ গপ্পো 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন