বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

একলা বৈশাখ

শঙ্খ কর ভৌমিক

অনেক টালবাহানার পর সেবার ছপ্পড় ফাড়কে একটা ছুটি পেয়ে গেলাম । হিসেব করে দেখলাম যেদিন কলকাতা গিয়ে পৌঁছব, সেদিনটা আবার পয়লা বৈশাখ পড়ছে । শুধু তাই নয়, কলকাতায় একদিন কাটানো ও যাবে । প্রায় এক বছর পর এক দিনের ছুটি পেয়ে আমাদের ফূর্তি দেখে কে?

আমরা বলতে আমি আর বীরেন- আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট । আমাকে বলা হয়েছে বীরেনের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব বজায় রাখতে, কিন্তু সেটা খুব একটা হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে আমাদের এই চাকরিতে অল্প সময়ের নোটিশে হঠাৎ করে এদিক ওদিক চলে যেতে হয় । কোন সার্ভেয়ারের সঙ্গে কোন অ্যাসিস্ট্যান্ট যাবে সেটা একন্তভাবেই মনিবের মর্জিনির্ভর । যে কোন কারণেই হোক, গত দু বছর ধরে যেখানেই সার্ভে করতে যাই সেখানেই বীরেনকে আমার সঙ্গে পাঠানো হয় । এই করতে করতে দূরত্বটা অনেকটাই ঘুচে গেছে। সুতরাং বীরেন আমায় রেঁধেবেড়ে খাওয়ায়, বিছানা পেতে দেয় , ঘোর শীতকালে পাশের গ্রাম থেকে মহুয়া এনে দেয়, আর রান্না করতে করতে পাড়ার বৌদিদের গল্প বলে । ওর একটা প্রিয় গল্প হচ্ছে ওদের পাশের বাড়ির ভাড়াটের বাচ্চার "লাল' দিয়ে বাক্য রচনার গল্প (বুলবুলি পাখির পেছন লাল)। বীরেন আর আমার মাইনের পার্থক্য মাত্র চারশো টাকার হলে কি হবে? একখানা ইঞ্জিনিয়ারিংএর ডিগ্রী আছে বলে আমাকে কোম্পানীর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সমতুল্য ভক্তিছেদ্দা করে থাকে।

এছাড়া বীরেনের কাজের মধ্যে পড়ে সার্ভের যন্ত্রপাতি বয়ে নিয়ে যাওয়া, আমার দরকারমত ফিল্ডবুক বা লেভেলবুক এগিয়ে দেওয়া, থিওডোলাইট লেভেল করে দেওয়া (গত এক বছরের চেষ্টায় শিখে উঠতে পারে নি, কখনো পারবে বলে মনে হয় না)

এই জায়গাটার নাম রেওয়াড়ি, দিল্লি জয়পুর হাইওয়ের ওপর। দিল্লি থেকে ঘন্টা দেড়েকের রাস্তা। জয়পুর থেকে দিল্লি যাবার পথে হাইওয়ের ওপর বাওয়াল চওক বলে একটা জায়গা থেকে বাঁ দিকে বাঁক নিতে হয়। তারপর জালিয়াবাস, ছুরিয়াবাস, করণাবাস, বিদাবাস, মাঢ়াবাস এইরকম নামের সব গ্রাম পেরিয়ে রেওয়াড়ি । আমার থাকার জায়গাটা কিন্তু গ্রাম নয়, দিব্যি মাঝারি শহর । সিনেমা হল, পার্ক, সুপারমার্কেট, এমনকি সাইবারকাফে পর্যন্ত আছে । আমার পাড়ার নাম মডেল টাউন, আমাদের বাড়িওয়ালা আধা সামরিক বাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কমান্ড্যান্ট বি এস যাদব । মাঝে মাঝে বিকেলের দিকে আমাদের ডেকে বলেন, "ওহে, তোমরা সন্ধ্যেয় বাজারের দিকে গেলে আমার জন্য একটা ম্যাকডাওয়েলসের বোতল এনো। এই নাও পয়সা ।' বোতল নিয়ে ফেরার পর বাড়িওয়ালার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে একটু খেজুরে গল্প হয় । ৭১ এর যুদ্ধের সময় উনি নাকি আগরতলায় পোস্টেড ছিলেন। শত্রুর লোভে গোয়েন্দাগিরি করতে আসা এগার বছরের দুই ভাই বোনকে কি করে জ্যান্ত পুঁতে দিয়েছিলেন সেই গল্প বলতে বলতে খিক খিক করে হাসেন। ঘরে ফিরে আমি আর বীরেন এই কাহিনীর সত্যাসত্য বিশ্লেষণ করি আর এই পৈশাচিক অমানবিকতায় শিহরিত হই। বাড়িওয়ালার গিন্নিকে আমরা আন্টি বলে ডাকি (বীরেনের অবদান), মহিলাটি তাঁর বরের চেয়ে অনেক বেশি বয়স্ক দেখতে, সারাদিন উঠোন ঝাঁট দেন আর চোখাচুখি হলে দুর্বোধ্য ভাষায় ধমকে ওঠেন।

বাড়িওয়ালার নাতিটি অবশ্য বেশ- স্থানীয় কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে পড়ে, মাঝে মাঝে আমার কাছে পড়া বুঝতে আসে, নানা গল্প করে। ওর মা নেই, বাবা সেনাবাহিনীতে- বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকেন।

এই সব এলাকায় আগে কখনো থাকি নি কিন্তু জায়গাটা ভাল লেগে গেছে। শহর থেকে একটু বাইরে এলেই যে দিকে দু চোখ যায় সর্ষেক্ষেত। শহরের রাস্তা দিয়ে টুংটাং ঘন্টা বাজিয়ে উট হেঁটে যায় । গরুগুলো অসম্ভব স্বাস্থ্যবান- প্রায় দেড় মানুষ উঁচু । অসাধারন খেতে রেউড়ি (তিলের নাড়ুর মত) পাওয়া যায়। কলকাতা শহরে ঘুরতে আসা গ্রামের লোকজনের চোখে যেমন একটা অপ্রস্তুত ভাব দেখা যায় এখানে তেমন নয়। গ্রাম থেকে ট্রাক্টর বোঝাই করে সব শহরে আসে, দাপটের সঙ্গে কেনাকাটা করে ফিরে যায়। বাড়ির কার্নিশে যখন ময়ূর এসে বসে, আমাদের বাঙালী চোখে অপূর্ব সুন্দর মনে হয় ।

কাজের জায়গাটা আরো সুন্দর । কে ভাবতে পেরেছিল, দিল্লির এত কাছে ঝাঁকে ঝাঁকে নীলগাই দেখতে পাব? এখন অবশ্য প্রোজেক্টের কাজে অনেক লোকজন আর যন্ত্রপাতি এসে গেছে - নীলগাইদের আর দেখা যায় না । তবে বুনো খরগোশ আর ময়ূরের অভাব নেই । দুপুরের খাবার সময় আমরা ঘন্টাখানেক ছুটি পাই, তখন বুনো খরগোশ তাড়া করে সময় কাটাই মাঝে মাঝে।

সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ি । বাওয়াল চওকের কাছে একটা দোকানে পুরি সবজি আর চা, কখনো কখনো লাড্ডু খেয়ে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির সামনে রাখা চৌকিতে বসে পুলিশদের সঙ্গে একটু কুশল বিনিময় করতে করতে হুঁকো খাই আর হিন্দি খবরের কাগজ পড়ি । বীরেন একবর্ণ হিন্দী পড়তে না পারলেও পড়ার ভান করে । একদিন বীরেন অসাবধানে খবরের কাগজে জল ফেলে দেওয়াতে পুলিশ চৌকির সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্কের অবসান ঘটে ।

কাজের সূত্রে গ্রামের পথে পায়ে হেঁটে ঘুরতে হয় । স্থানীয় কিছু লোককে অস্থায়ী ভাবে কাজে নেওয়া হয়েছে। তারাও সঙ্গে থাকে। খাটুনির কাজ । রাস্তায় কৌতূহলী লোকজন নানা প্রশ্ন করে । অনেকে মনে করে আমরা কিছু বিক্রি করতে এসেছি । কিছু মাতব্বর গোছের লোক দাবী জানায় তাদের গ্রামে কাজ করতে গেলে স্থানীয় বেকার যুবকদের কাজে নিতে হবে । কেউ কেউ নিশ্চিন্ত হতে চায় যে আমরা পাকিস্তান থেকে গোয়েন্দাগিরি করতে আসি নি।

গ্রাম্য পথের ধারে ধারে সর্ষেক্ষেতের ফাঁকেফাঁকে পাথরে বাঁধানো কুয়োর ধারে বা পরিত্যক্ত মন্দিরের চাতালে বসে একটু জিরিয়ে নিই। গাছের ডালে লটকানো "রঙ্গিলা', "মস্তানা' ইত্যাদি নামের "মসালেদার দেশি শরাব' এর বিজ্ঞাপন । একদিন পথের ধারে বসে আছি, একটি লোক এক হাতে "রঙ্গিলা'র বোতল অন্য হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেলবার ধরে টলমল করতে করতে আমাদের কাছে এগিয়ে এল । এসে বলল "লে, পকড়' । বীরেনের হাতে সাইকেলটা ধরিয়ে দিয়ে একচুমুকে বোতল শেষ করে পরনের লুঙ্গি সম্পূর্ন খুলে আবার পড়ল। তারপর সাইকেলের অস্তিত্ব সম্পূর্ন ভুলে গিয়ে গান গাইতে গাইতে হাঁটা লাগাল। আমরাও কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর সাইকেলটা গাছের গয়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে হাঁটা লাগালাম।

এইরকমভাবে দিন কাটতে কাটতে কলকাতার মায়া প্রায় কেটেই গিয়েছিল । "কতদিন বাড়ি যাই না' ধরনের কথাবার্তা বলা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় অপ্রত্যাশিত ছুটির খবর যেন আমাদের মগজের কোন এক লুকনো খুপরির দরজায় টোকা দিয়ে বলল "অবনী, বাড়ি আছো?'

আর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে পড়ে গেল যে আমরা এখনো বাড়ি আছি। বীরেনের মনে পড়ে গেল পাড়ার বৌদিদের, আমার মনে পড়ে গেল বাঘাযতীন মোড়ের অষ্টপ্রহর খোলা থাকা চায়ের দোকান আর আমার শোবার ঘরের তাকে রাখা মহীনের ঘোড়াগুলির ক্যাসেট ।

বীরেন বলল "ওস্তাদ,' (এই নামেই সম্বোধন করত) "এই পয়লা বৈশাখটাকে ১লা বৈশাখ বলে কেন? সেদিন কি সবার খুব একলা লাগে?'

খেজুরে কথাবার্তা বলার জন্য বীরেনের কুখ্যাতি ছিল। গম্ভীর মুখে বললাম "তোমার একলা লাগছে বুঝি?'

বীরেন একটু লজ্জিত হয়ে বলল "না না, এতদিন পর কলকাতা যাচ্ছি, একলা লগবে কেন?'

যাই হোক, যেদিন রাতে ট্রেনে চাপব, সেদিন সকালে মালিকের ভাই বিশ্বজিৎদা রেওয়াড়ি এসে হাজির । দেখেই আমি আর বীরেন মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম, মনের মধ্যে কেমন যেন কু ডাক দিল । শুনলাম উনি কাজকর্মের হালচাল জানতে এসেছেন, একদিন কাটিয়ে আমাদের সঙ্গেই কলকাতা ফিরবেন ।

যথাসময়ে ট্রেনে চেপে বসলাম। দেখলাম কামরায় বেশিরভাগ যাত্রীই বাঙালী, পয়লা বৈশাখ কলকাতা পৌঁছনো হবে বলে সবার মধ্যে একটা আনন্দের আবহ । কিছুক্ষণের মধ্যে বগির সব যাত্রীদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল । চক্রবর্তীদা নামে এক সদ্যপরিচিত সহযাত্রী বাউল গান ধরলেন, বাকিরা হাততালি দিতে লাগল। কোথা থেকে যেন একঠোঙা লাড্ডু চলে এল, হাতে হাতে ঘুরতে লাগল।

একসময় লক্ষ্য করলাম, বিশ্বজিৎদা মোবাইলে কথা বলছেন, "ধানবাদ', "রাত বারোটা' গোছের কথাবার্তা কানে এল। আমি আর বীরেন পরস্পরকে কনুইএর গুঁতো মারতে থাকলাম।

রাত এগারোটা। বিশ্বজিৎদার ডাকে তন্দ্রা ভাঙ্গল , "শোনো, কাল থেকে আমরা ধানবাদে একটা সাইট চালু করছি। যে সার্ভেয়ার ওখানে কজ করার কথা ছিল সে কোম্পানী ছেড়ে দিয়েছে । কিন্তু কাল থেকেই কাজ শুরু করতে হবে । এক কাজ করো, ভোর চারটেয় তোমরা দুজন ধানবাদ নেমে যাও। ছুটিটা সামনের মাসে নিও ।

************************************************************

অতএব পয়লা বৈশাখের ভোরবেলায় আমরা দুই মূর্তিমান ধানবাদ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দুটি লাল সুতোর বিড়ি ধরালাম।

তারপর সমস্বরে বললাম "একলা বৈশাখ'





১৫ই এপ্রিল, ২০১০

119 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: r2h

Re: একলা বৈশাখ

এটা তুলি। বৈশাখ কয়েকদিনের পুরনো হলো যদিও, তবে একলাপনা প্রাত্যহিক।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন