বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

খবর্নয়? (২৭শে জুলাই) -- মানবাধিকার কমিশন

খবরোলার প্রতিবেদন

ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বস্তুটি ক্রমশ: সরকারের ধামাধরা মুখপত্রে পরিণত হচ্ছে? সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা দেখে সেরকমই মনে হচ্ছে।


ছত্তিশগড়

ঘটনাটি ছত্তিশগড়ের, যেখানে, দীর্ঘদিন ধরেই মাওবাদীদের সঙ্গে সরকারের ভয়াবহ সংঘর্ষ চলছে। সরাসরি যুদ্ধে এঁটে উঠতে না পেরে সরকারের পক্ষ থেকে নামানো হয়েছে "সালোয়া জুডুম' নামের এক তথাকথিত শান্তি আন্দোলন। এই আন্দোলনের নামে মাওবাদী কুপ্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য সাধারণ আদিবাসীদের বাধ্য করা হচ্ছে, নিজেদের গ্রাম ছেড়ে এসে সরকারি ক্যাম্পে বসবাস করতে। বিশেষ পুলিশ অফিসার (এসপিও) তকমা দিয়ে কমবয়সী যুবকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। ঠেলে দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে, দেওয়া হচ্ছে খুন-জখম-লুণ্ঠনের অবাধ অধিকার।

অভিযোগ দীর্ঘদিনের, যে, এই যা খুশি করে চলার অধিকার,এই হাতে-বন্দুক-পেয়ে যাওয়া যুবার দল, দীর্ঘদিন ধরেই সোৎসাহে প্রয়োগ করে চলেছে অবশিষ্ট জনতার উপরে। নতুন নয়, সালোয়া জুডুম শুরু হবার পর থেকেই এই অভিযোগ চলে আসছে। ভারতের "স্বাধীন সংবাদ সংস্থা' তেহেলকার একটি দল প্রবেশ করেছিল এই অরণ্যের গভীরে, যেখানে সূর্যের আলো, পুলিশ, প্রশাসন, সরকার, কিছুই চট করে ঢুকতে পারেনা। দক্ষিণ বস্তারের এক গহীন কোণে তারা "আবিষ্কার' করে ৬ জন ধর্ষিতা মহিলাকে, যারা সালোয়া জুডুমের লোকজনের হাতে ধর্ষিত। এরা প্রত্যেকেই স্ব ইচ্ছায় তেহেলকাকে ধর্ষণ সংক্রান্ত টেস্টিমনি দিয়েছিলেন। এছাড়াও তেহেলকা এমন একজন পুরুষের সঙ্গেও কথা বলে, যিনি তাঁর বোনকে ধর্ষিত হতে দেখেছিলেন। মেয়েটিকে পরে খুন হওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। এবং তার বাবাকেও খুন করা হয় ঐ সময়েই।

এসব সেই সালোয়া জুডুম শুরু হবার সময়ের ঘটনা। এই সব অভিযোগও নতুন নয়; সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই সমস্ত অভিযোগ স্রোতের মতো আছড়ে পড়েছে নাগরিক ভারতবর্ষের নিয়নালোকিত দেয়ালে, যদিও তার নিশ্‌ছিদ্র বধিরতায় আঁচড়টিও কাটতে পারেনি। নতুন যেটা, সেটা হল, সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট, সালোয়া জুডুম এবং "বিশেষ পুলিশ অফিসার'দের বিরুদ্ধে উঠে আসা এইসব খুন, জখম, লুঠ এবং ধর্ষণের অভিযোগে বিচলিত হয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এই অভিযোগগুলি খতিয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দেন। সেইমতো মানবাধিকার কমিশনের দ্বারা নিয়োজিত একটি প্রতিনিধিদল এলাকাটি সফর করে, এবং একটি "ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট' পেশ করে।

এই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টেমানবাধিকার কমিশন জানিয়েছেন, যে, গোটা বস্তার ঘুরে তাঁরা একটিও ধর্ষণের ঘটনা খুঁজে পাননি। "কিছু নির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করার সময়, তদন্তকারী টিম এমন কোনো ধর্ষণের ঘটনা পাননি, যা, প্রমাণ করা(সাবস্ট্যানশিয়েটেড) গেছে।' বলাবাহুল্য, সালভা জুডুম এবং বিশেষ পুলিশ অফিসারদেরও দেওয়া হয়েছে ক্লিনচিট। ধর্ষণের ঘটনা অবশ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন, কারণ, ধর্ষিতাদের কোনো সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়নি। এমনকি যারা কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দিতে উপস্থিত হয়েছেন তাঁদেরকেও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বিজাপুর জেলায় একটি গ্রামের পাঁচজন মহিলা সাক্ষ্য দিতে এলেও তাঁদের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়নি। পরিবর্তে "ঐ পাঁচটি মেয়ের প্রত্যেকের ব্যাপারটি একজন মহিলা আইপিএস অফিসার ব্যক্তিগতভাবে খতিয়ে দেখেছেন।' কেন? না, এদের বয়ানে নানা অসঙ্গতি ছিল। প্রসঙ্গত: বলে রাখা ভালো, যে, ২০০৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি জানিয়েছেন 'In the Indian setting, refusal to act on the testimony of the victim of sexual assault in the absence of corroboration as a rule is adding insult to injury. A girl or a woman in the tradition- bound non-permissive society of India would be extremely reluctant even to admit that any incident that is likely to reflect on her chastity had ever occurred… (A rape victim’s testimony) does not require corroboration from any other evidence, including the evidence of a doctor' (Supreme Court justices Arijit Pasayat and P Sathasivam, July 2008) । মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিরা এই সোজা ব্যাপারটা জানেননা, ভাবা কঠিন।

কিন্তু এতেই শেষ নয়। কমিশন অসঙ্গতির তালিকার শেষে জানাচ্ছেন, যে, একজন ধর্ষিতাও এই ব্যাপারটি তাদের বাপ-মা পরিবার-পরিজনকে জানায়নি। এমনকি পুলিশকেও জানায়নি। এবং সেটি কমিশনের কাছে অসঙ্গতিপূর্ণ বলেই মনে হয়েছে। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে একটি প্রত্যন্ত আদিবাসী মেয়ে, কেন তার ধর্ষণের কথা ফলাও করে চাউর করেনা, সে কথা, দেখা যাচ্ছে, মানবাধিকার কমিশন জানেন না। যেখানে পুলিশই ধর্ষক, সেখানে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে যাওয়াও যে অনর্থক, তাও মানবাধিকার কমিশনের অগোচরে। অতএব, সুপ্রিম কোর্ট যাই বলে থাকুক না কেন, ছত্তিশগড়ে কোনো ধর্ষণ হয়নি।

http://www.tehelka.com/story_main42.asp?filename=Ne180709coverstory.as
p




বাটলা হাউস

আজ থেকে বছর খানেক আগে, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০০৮ সালে, রাজধানী দিল্লীর বাটলা হাউস "এনকাউন্টার'এ মারা যায় দুজন সন্দেহভাজন "সন্ত্রাসবাদী'। পুলিশের একজন "এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' এমসি শর্মাও মারা যান এই একই অভিযানে। এই নিয়ে তৎকালীন দিল্লী সহ সারা ভারতের মানবাধিকার সংস্থাগুলি হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল সে সময়ে। স্পষ্টত:ই অভিযোগের তীর ছিল পুলিশের বয়ানের নানা রকম অসঙ্গতির দিকে। যেমন, এমন একটি বাড়িতে "এনকাউন্টার' হয়েছিল, যার একটিই প্রবেশপথ। অন্য কোনো জায়গা দিয়ে বেরোনোর উপায় নেই। অথচ, ঘরে থাকা চারজনের মধ্যে থেকে দুজন পালাল, আর দুজন মারা গেল কিকরে সে রহস্যের কোনো সমাধান হয়নি। এছাড়াও মৃতদের শরীরে পাওয়া গিয়েছিল ভোঁতা কোনো জিনিসের আঘাতের দাগ, বুলেটের ঘায়ে যে ক্ষত হতে পারেনা। ১৭ বছর বয়সী মৃত এক "জঙ্গী' সাজিদ এর মাথার উপরে ছিল ৪ টি বুলেটের ক্ষত, বসিয়ে রেখে ঠান্ডা মাথায় উপর থেকে গুলি না করলে যা হওয়া অসম্ভব। অন্য আরেকজন "জঙ্গী' আতিফের খুলির পিছনের চামড়া চেঁছে তুলে নেওয়া হয়েছিল, শুধু "এনকাউন্টার' হলে যা হবার কথা নয়।

এইসব অসঙ্গতির কথা তুলে মানবাধিকার সংগঠনগুলি এই "এনকাউন্টার' এর যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। স্পষ্টত:ই ইঙ্গিত ছিল, যে, এই "এনকাউন্টার'টি আসলে সাজানো। এমনকি এও হতে পারে, যে, পুলিশ নিজের অক্ষমতা ঢাকতে কয়েকজন নিরীহ মুসলিম ছাত্রকে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে মেরেছে, এরকম ইঙ্গিতও ছিল। খোদ রাজধানীতে এ ধরণের ঘটনার সম্ভাবনায় দেশজুড়ে আলোড়ন ওঠে। পি ইউ ডি আর, দিল্লী ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্ট, জামিয়া টিচার্স সলিডারিটি গ্রুপ সহ কয়েকটি সংস্থা পুলিশের বয়ানের অসঙ্গতি গুলির দিকে আঙুল তুলে নিজস্ব রিপোর্ট তৈরি করে। এই রিপোর্ট হাইকোর্টে পেশ হবার পর, কোর্ট জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত করতে নির্দেশ দেয়।

"তদন্ত' করার পর, মানবাধিকার কমিশনের এই সংক্রান্ত রিপোর্টটি প্রকাশিত হল সদ্য, যেখানে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যে, বাটলা হাউসের ঐ ঘটনায় কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন আদৌ হয়নি। "We are clearly of the opinion that having regard to the material placed before us, it cannot be said that there has been any violation of human rights by action of police" ।

বলাবাহুল্য, রিপোর্ট দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা। এক গুচ্ছ মানবাধিকার সংস্থার দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যে, মানবাধিকার কমিশন আদৌ এ ব্যাপারে কোনো তদন্তই করেনি, বরং পুলিশের রিপোর্টগুলির উপরেই ভরসা রেখেছে। আদালতে যে অসঙ্গতি গুলি পেশ করা হয়েছিল, সেগুলি নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করা হয়নি। প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়নি, আদপেই কোনো তদন্তও হয়েছে কিনা সন্দেহ। এমনকি ঘটনার একমাত্র জীবিত সাক্ষী, ঘটনাস্থল থেকে ধরা পড়া সইফ নামের ছেলেটিকেও আদৌ কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। ঐ বিবৃতিতে মানবাধিকার কর্মীরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।

বিষয়টি নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনও আসেনি, কারণ আদালত এখনও রায় দিয়ে দেয়নি। কিন্তু জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো একটি সংস্থা যদি ক্রমশ: পুলিশ ও প্রশাসনের রাবার স্ট্যাম্প হয়ে ওঠে, তাহলে গণতন্ত্রের পক্ষে তা অশনিসংকেত তো বটেই।

http://timesofindia.indiatimes.com/NEWS/City/Delhi/Batla-House-encount
er-NHRCs-clean-chit-to-Delhi-police/articleshow/4807885.cms

http://www.anhadin.net/article84.html

জুলাই ২৭, ২০০৯

120 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ খবর্নয় 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন