বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

নারী প্রসঙ্গে

সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়

নারী এক

সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশে সনাতন ভারতীয় পদ্ধতিতে "কন্যাদান' এর এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে গেল। "মুখ্যমন্ত্রী কন্যাদান যোজনা' নামক একটি সরকারি প্রকল্পে সম্প্রতি বিয়ে দিয়ে উদ্ধার করা হল ১৫১ জন দু:স্থ মহিলাকে। গত ২৬শে জুন। বেণীর সঙ্গে মাথার মতো, বিয়ে দিয়ে কন্যা উদ্ধার করার পাশাপাশি আরেকটি সামাজিক কর্তব্যও মধ্যপ্রদেশ সরকার পালন করলেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। বিয়ের উপযুক্ত কিনা জানার জন্য, প্রতিটি কন্যার "পরীক্ষা' নেওয়া হল রীতিমতো সরকারি উদ্যোগে। যে-সে পরীক্ষা নয়, প্রতিটি বিবাহেচ্ছুক নারীর "কুমারীত্ব' পরীক্ষা করা হল একদম পাশ-করা স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞদের দিয়ে। খবরে প্রকাশ, যে, জনৈকা পরিক্ষার্থিনী সামান্য ট্যাঁফোঁ করেছিলেন, কিন্তু তাঁকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়, যে, পরীক্ষায় না বসলে বিয়ের আসরে এϾট্রর কোনো প্রশ্নই নেই। ফেল করলে কি হবে, সেটা অবশ্য স্পষ্ট করে বলা হয়নি, কিন্তু ফেল করলে কি হয়, সে তো ক্লাস ফাইভের নাদান বালকও জানে।

আমরা মধ্যপ্রদেশ সরকারের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। পশ্‌চিমী অপসংস্কৃতির প্রভাবের কারণে, ভারতীয় রমনীদের মধ্যে ইদানীং কালে যথেষ্ট পরিমানে সংযম পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। বিয়ের আসরে প্রায়ই গুলতাপ্পি দিয়ে গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে পূর্বব্যবহৃত ইউজড মাল। এই অনাচার রুখতে, আমাদের পক্ষ থেকে দাবী জানানো হচ্ছে, মধ্যপ্রদেশ সরকারের পথ অনুসরণ করে বিয়ের পূর্বে কুমারীত্ব পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হোক। একই সঙ্গে প্রতিটি বিয়েকে আনা হোক ক্রেতা-সুরক্ষা আইনের আওতায়। কোয়ালিটি ক®¾ট্রাল ডিপার্টমেন্টে স্ত্রী শরীর বিশেষজ্ঞদের চাকরি দেওয়া হোক ঢেলে। বাটখারায় জোচ্চুরি করলে জেল হয়, তাজা আলুর বদলে পচা আলু গছালে ব্যবসায়ী খিস্তি খায়, কুমারী মেয়ের বদলে দরকচা মারা মেয়ে গছিয়ে দিলে, কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবেনা কেন?


নারী দুই

পশ্‌চিমী অপসংস্কৃতির খপ্পর থেকে উদ্ধার করে ভারতীয় নারীদের সম্মান রক্ষার কাজে ভারত সরকারও অবশ্য পিছিয়ে নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে একটি খাঁটি ভারতীয় পর্ন টুন সাইটকে ব্লক করা হল এই কদিন আগে। সবিতা ভাবী নামক এই জনপ্রিয় সাইটটিতে অবশ্য আসল মেয়েদের গরম ছবি টাঙানো হতনা। পর্নটুন সাইট, শুনেই বোঝা যাচ্ছে, সাইটটি কার্টুন স্ট্রিপে ভর্তি ছিল। কার্টুনের প্রধান চরিত্র হলেন সনাতন ভারতীয় একজন গৃহবধূ, যার নাম সবিতা ভাবী। এমনিতে মহিলা নরম-সরম বৌ। কিন্তু স্বামীকে ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে তিনি গরম আমসত্ত্বভাজা জাতীয় জিনিস খেয়ে টেয়ে থাকেন। তিনি শাড়ির ফাঁকে শরীর দেখান, বাড়িতে আসা সেলসম্যানকে সিডিউস করেন। পাড়ার ছেলেছোকরাদের সঙ্গে টুপটাপ শুয়ে পড়েন। কলেজের প্রফেসরকে শরীর দিয়ে নম্বর বাগান, সিমলা বেড়াতে গিয়ে এর তার সঙ্গে শরীরে জড়িয়ে পড়েন। ইত্যাদি ইত্যাদি।

এমনিতে আমরা ব্যানের পক্ষে নই, কিন্তু এক্ষেত্রে বলতেই হবে, যে, পেন্টহাউস থেকে প্লেবয়, দুনিয়ার যাবতীয় পর্নো সাইটকে ছেড়ে দিয়ে, সবিতা ভাবী নামক তুলনায় এই প্রায় নিরামিষ, অথচ জঘন্য সাইটটিকে ব্লক করে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার, এক মহৎ কার্য করেছেন। দেশ ও দশের এক বিরাট উপকার করেছেন। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, যে, অ্যাদ্দিন যা হয়েছে হয়েছে, সনাতন ভারতীয় এক গৃহবধূর এই অধ:পতনকে আর বরদাস্ত করা হবে না। কারণ অবোধ ভারতীয় বালক-বালিকাদের কাছে এ এক অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্ত। সাদা মেয়েরা সাইটে সাইটে ন্যাংটো হয়ে নাচবে, নাচুক না, ক্ষতি নেই, সিনেমায় আইটেম গার্লরা বিকিনি পরবে পরুক না, চমৎকার, আর্টের নামে মডেলরা উদোম হয়ে পোজ দিক, কুকুরের কাজ কুকুর করিবে, ঠিকই আছে, কিন্তু তা বলে পাশের বাড়ির লক্ষী মেয়ে বা বৌটির "খারাপ' হয়ে যাওয়া কি শোভা পায়? সমাজের পক্ষে এ এক অনপনীয় কলঙ্ক। টিপিকাল ভারতীয় গৃহবধূ তার ছলচাতুরি, শরীরের কথা, সাদা বাংলায় সোজা করে বলছে, কার্টুন হোক আর যাই হোক, পর্নো ছবিতে মুখ থুড়ি শরীর দেখাচ্ছে, এ এক অকল্পনীয় নোংরামি। সক্কলে জানে, ভারতীয় বৌরা ঘরের লক্ষী, তারা কুমারীবেলায় শিবের লিঙ্গপুজো করে আর বৌ হয়ে সন্ধ্যাকালে তুলসীতলায় ঠাকুরদেবতার নামগান করে। ছবি আঁকতে হলে তুলসীতলায় ধুপধুনোর ছবি আঁকুন, কার্টুন আঁকতে হলে শিবের লিঙ্গের কার্টুন আঁকুন, কিন্তু কার্টুনের নামে সতীলক্ষীদের নিয়ে পর্নো চর্চা, সনাতন ভারতীয় মূল্যবোধ নিয়ে ফাজলামি মারা, বরদাস্ত করা হচ্ছেনা হবেনা।


নারী তিন

নারীদের নিয়ে সভ্যভব্য কার্টুন বলতে কি বোঝায়, তা নিয়ে এর পরেও যদি কোনো কনফিউশন থেকে থাকে, কলকাতা থেকে সদ্য প্রকাশিত টেলিগ্রাফ পত্রিকা দেখলে তা ঘুচে যেতে বাধ্য। ব্যাপারটা অবশ্য সরাসরি ঠিক নারীসম্পর্কিত নয়, একটু কমপ্লিকেটেড। এমনিতেই পশ্‌চিমবঙ্গের উত্তর থেকে দক্ষিণে তুমুল ক্যাওস চলছে। একদিকে বিরোধী বিধায়কদের তাড়া করে ধুতি তুলে দৌড় করানো হচ্ছে, অন্যদিকে বন্‌ধের নামে বিরোধী কর্মীরা যাকে তাকে ধরছে আর পিটছে, আর প্রশাসন নির্বান লাভ করে চুপচাপ ঘরে বসে আছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ডেকে টেকেও কোথাওই কিচ্ছু সামলানো যাচ্ছেনা। খবরের কাগজ থেকে শুরু করে আপামর জনসাধারণ, শাসক বা বিরোধী নির্বিশেষে সকল দলের কর্মীরা সরকারকে খিস্তি মারছেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই অবস্থায় সরকার ও প্রশাসনের এই নির্বিকল্প সমাধির মুখোশ খুলে দিতে টেলিগ্রাফ পত্রিকা একটি অভুতপূর্ব কার্টুন এঁকেছেন, যে ছবিতে প্রশাসনের সমস্ত কর্তাব্যক্তিদের (লক্ষ করুন, একটিও কর্ত্র্রী নেই), শাড়ি পরিয়ে আঁকা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী পরেছেন নীল শাড়ি আর স্বরাষ্ট্রসচিব লাল। রাজ্য পুলিশের ডিজি পরেছেন লালপাড় সাদা, আর মুখ্যসচিবের হাতে কেতের ভ্যানিটি ব্যাগ।

নিন্দুকরা এই ছবির গ্রাফিক্সে এমন কিছু মারকাটারি ব্যাপার খুঁজে না পেলেও, ছবিটি দেখলে শিল্পসৌন্দর্যে নি:সন্দেহে প্রাণ ভরে যায়। আর কনসেপ্টটি তো সন্দেহাতীতভাবেই যুগান্তকারী। এর থেকে আমরা সনাতন ভারতীয় জনসমাজে নারীর স্থান সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারি। বোঝা যায়, যে, রাজকার্য পালন করা, প্রশাসন চালানো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা জাতীয় কঠিন-কঠিন জিনিসগুলি চালাতে গায়ের জোর লাগে। রাজাকে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধু করতে হয়, মন্ত্রীকে পুলিশ ঠ্যাঙাতে হয়, আর পুলিশকে পাবলিক। এইসব কাজের জন্য পুরুষ পেশীর একান্ত প্রয়োজন, তাই মেয়েদের এইসব পুরুষালী ব্যাপারে নাক গলানো ঠিক নয়। মেয়েরা সেজেগুজে জগতের মনোরঞ্জন করবে, শপিং মলে দোকান বাজার করবে, প্রশাসনে নাক না গলিয়ে সংসারের হোম মিনিস্ট্রি সামলাবে, বিপদে-সংকটে প্যাঁপ্যাঁ করে নাকে কাঁদবে; আর পুরুষ শিভালরি দেখাবে, তরোয়াল নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধজয়ে যাবে, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখবে, এই হল সনাতন জগতের নিয়ম। সেকারণে যে নারী যথেষ্ট অবলা বা ন্যাকা নয়, তাকে গেছো মেয়ে বলা হয়, তার পাত্র জোটেনা। আর যে পুরুষ বাইরের জগতের জাতীয় আন্তর্জাতিক কঠিন-কঠিন গুরুদায়িত্ব পালন করতে পারেন না, তিনি পুরুষ নামের অযোগ্য, নারীরও অধম। তাঁকে অঙ্গে শাড়ি ও হাতে চুড়ি পরিয়ে হাতে হাতাখুন্তি ধরিয়ে রান্নাঘরে ছেড়ে দেওয়া উচিত।

নতুন কিছু নয়, এসব আমাদের সনাতন সমাজের চিরপুরাতন ধারণা। যুগে যুগে আমাদের রাজা-রানারা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, আর মেয়েরা ঘরের ভিতর জহরব্রতে। শুধু ইদানীং কালে পশ্‌চিমী অপসংস্কৃতির প্রভাবে সেসব সুপ্রাচীন ঐতিহ্য আমরা ভুলতে বসেছিলাম। মনে করিয়ে দেবার জন্য টেলিগ্রাফকে ধন্যবাদ।


জুলাই ১৯, ২০০৯

140 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ কূটকচালি 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন