বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বাংলাভাষীর তীর্থদর্শন

কলিম খান

শ্রী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "বঙ্গীয় শব্দকোষ' গ্রন্থটিতে "তীর্থ' শব্দের প্রায় ২৫টি মানে পাওয়া যায়। "ছাত্রদের অভিধান' তার থেকে ৮টি কমিয়ে ১৬টি মানে দিয়ে গেছে। কলকাতার "সংসদ বাংলা অভিধান' ও ঢাকার "ব্যবহারিক বাংলা অভিধান' তার থেকে আরও ৯টি বাদ দিয়ে মাত্র ৭টি মানে নিয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিধানে এই সংখ্যা আরও কমেছে এবং শেষমেষ শব্দটির একটিমাত্র মানে দাঁড়িয়েছে ---- "পূণ্যস্থান' বা Holy Place . কেন এরকম ঘটেছে সে অনেক কথা, এবং সে প্রসঙ্গে আমরা পরে যাব। আপাতত আমাদের জানা দরকার "তীর্থ' শব্দের যথার্থ মানে কী? ব্যপারটি কি এরকম যে, "তীর্থ' শব্দের উদ্দিষ্ট ( referent ) আসলে একটি, কিন্তু সেই উদ্দিষ্টকে ডাকা হয় ২৪টি নামে? নাকি "তীর্থ' শব্দটি প্রকৃতই ২৪টি পৃথক বস্তু বা বিষয়কে সনাক্ত করে? যেহেতু "বঙ্গীয় শব্দকোষ' সব অর্থগুলিই দিয়ে গেছে, আমরা সেই অর্থগুলি দেখে বিষয়টি বুঝে নিতে চাইব।

হরিচরণ প্রথমেই জানিয়েছেন "তীর্থ' শব্দটি ঋগ্বেদে "অবতরণপ্রদেশ' অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। এরপর তিনি এক এক করে মোট ২৪টি অর্থ দিয়েছেন। ঋগ্বেদের যুগ থেকে রবীন্দ্রযুগ পর্যন্ত ভারতে যত গ্রন্থ, যত শব্দকোষ বা অভিধান লেখা হয়েছে, সেসব তন্ন তন্ন করে খুঁজে তিনি এই মানেগুলি সরবরাহ করেছেন এবং প্রতিটি সূত্রে অর্থটি তিনি কোথা থেকে পেলেন, তার উৎস উল্লেখ করেছেন; এবং উদাহরণ দিয়ে তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। আমরা এখানে শুধু তাঁর দেওয়া "তীর্থ' শব্দের অর্থগুলিই লিখে যাব। সেগুলি এরকম ----
১। দেবতাদির অধিষ্ঠান বা তপস্যাদি হেতু পবিত্র স্থান, পূণ্যস্থান, সূত্র।
২। নদী প্রভৃতির জলে অবতরণের পথ, জলাবতার, ঘট্ট, ঘাট। ৩। পাত্র, সৎপাত্র ৪। পাবন। ৫। ঋষিজুষ্টাম্বু, ঋষিসেবিতজল। ৬। নদীতরণস্থান, ঘট্ট, খেয়াঘাট। ৭। বিপ্র ৮। পূণ্যকাল। ৯। উপাধ্যায়, গুরু। ১০। শাস্ত্র। ১১। যজ্ঞ। ১২। উপায়। ১৩। আগম। ১৪। দর্শনশাস্ত্র। ১৫। নিদান ( origin ) ১৬। অগ্নি ১৭। যোনি ১৮। নারী - রজ: ১৯। মন্ত্রী ২০। মন্ত্রী প্রভৃতি অষ্টাদশ রাষ্ট্রসম্পদ (মন্ত্রী পুরোহিত যুবরাজ চমুপতি দ্বারপাল অন্তর্ব্বেশিক কারাগারাধিকারী দ্রব্যসঞ্চয়কৃৎ বিনিয়োগ প্রদেষ্টা নগরাধ্যাৎ কার্য্যনির্ম্মাণকৃৎ ধর্ম্মাধ্যাৎ সভাধ্যাৎ দন্ডপাল দুর্গপাল রাষ্ট্রান্তপালক অটবীপালক) ২১। আয়ুত্ত (কর্ম্ম, মন্ত্রী প্রভৃতির কার্য্য) ২২। মন্ত্র, উপদেশ ২৩। রতিস্থান, ক্রীড়াস্থান ২৪। দেবগণ ও পিতৃগণের প্রিয় করতলের ভিন্ন ভিন্ন অংশ।

তার মানে "অবতরণপ্রদেশ' ও ২০ অর্থটিকে একত্রে ধরলে, হরিচরণ আসলে মোট ( ১ + ২৪ +১৭ =) ৪২টি অর্থ দিয়ে গেছেন।

একই "তীর্থ' শব্দের মানে পূণ্যস্থান, ঘাট, রতিস্থান, যোনী, গুরু, শাস্ত্র, মন্ত্রী ... ইত্যাদি .... এসব কথা লিখে গেছেন বঙ্গীয় শব্দকোষ রচয়িতা শ্রী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধুমাত্র তীর্থ শব্দের সূত্রে নয়, অজস্র শব্দের সূত্রে এরকম কূকীর্তি (?) করে গেছেন তিনি। সেই অপরাধে তাঁকে বর্জনীয় বলে মনে করেছিলেন কিছু কিছু আধুনিক বাংলাভাষা বিশেষজ্ঞ। এবং সেই উদ্দেশ্যে তাঁর নামে কেবল কটুকাটব্যই করা হয় নি, তাঁকে অনুসরণ না করতেই নির্দেশ দিয়েছেন বাংলার বহু অধ্যাপক। তাঁরা যদি নিজেদের যদ্দেষিতং তৎপড়িতং, পড়ায়তং' - এর কর্মী অধ্যাপক বলে মনে করেন, তাহলে আমরা তাঁদের দোষ ধরব না (কারণ গবেষণা করে সংশোধন করার কাজ তাঁদের নয়) কিন্তু তাঁদের কেউ যদি নিজেকে বাংলাভাষার বিশেষজ্ঞ বলে দাবী করেন, তাহলেই আমরা তাঁকে জানতে চাইব ---- তীর্থ শব্দের ওরকম অর্থ সরবরাহ করে হরিচরণ যদি ভুল করে থাকেন, আপনি ঠিক করে দিলেন না কেন? তাছাড়া, হরিচরণ কি সত্যিই ভুল করেছিলেন? তিনি তো নিজের মাথা থেকে শব্দের অর্থ সরবরাহ করেন নি, প্রাচীন কোন না কোন গ্রন্থ থেকেই শব্দের ঐ প্রকার অর্থ দিয়ে গেছেন। যাঁরা তীর্থ মানে মন্ত্রী বা রতিস্থান বুঝতেন সেই সব গ্রন্থের উল্লেখ (এক্ষেত্রে যথাক্রমে পঞ্চতন্ত্র ও শ্রীমদ্ভাগবৎ) তো বঙ্গীয় শব্দকোষে করেই গেছেন। তিনি তো কোনকিছু গোপন করে যাননি। তাহলে, সেই গ্রন্থকারেরাও তো সমান দোষী। কী বলেন আধুনিক বাংলাভাষা বিশেষজ্ঞরা?

যাক্‌গে। এখন আমরা কাজের কথায় আসি। আমরা দেখেছি শব্দের অর্থনির্ণয়ের মূলত দুটি রীতি রয়েছে ---- প্রতীকি শব্দার্থবিধি অনুসারে শব্দার্থনির্ণয় ও ক্রিয়াভিত্তিক (বর্ণভিত্তিক) শব্দার্থবিধি অনুসারে শব্দের ভেতর থেকে তার অর্থ নিষ্কাশনপূর্বক শব্দার্থনির্ণয়। প্রাচীনকালে শব্দার্থনির্ণয় করা হত কেবলমাত্র এই ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধির সাহায্যে, অন্য কোন বিধিই তখন ছিল না। সভ্যযুগের সূত্রপাতের ফলে প্রতীকি শব্দার্থবিধির উদ্ভব ঘটে এবং ক্রমে তার ব্যবহার বাড়তে থাকে এবং ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধির ব্যবহার কমতে থাকে। আজকের পৃথিবীতে প্রায় সমস্ত ভাষায় শব্দের অর্থ নির্ণয় করা হয় এই প্রতীকি শব্দার্থবিধির সাহায্যে। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, শব্দার্থনির্ণয়ের আদি ক্রিয়াভিত্তিক রীতিটিই লোকে ভুলে গেছে। একমাত্র ব্যতিক্রম আমাদের বাংলাভাষা। কেননা, বাংলাই একমাত্র ভাষা, যাতে দুরকম রীতির প্রচলন রয়েছে, আজও। বাংলার আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে, এককথায় অ্যাকাডেমি'তে চলছে প্রতীকি শব্দার্থবিধির তুমূল ব্যবহার; আর বাকী সমস্ত ক্ষেত্রে বাংলাভাষীদের সামাজিক, পারিবারিক, ধার্মিক, সাংস্কৃতিক --- প্রভৃতি, এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রগুলিতেও চলছে বহুকাল ক্রমাগত ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধির ব্যবহার। মধ্যযুগে এই বিধিই উন্নীত হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের বিপুল সৃষ্টিতে --- কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকে শুরু করে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের রচিত গ্রন্থ পর্যন্ত বিশাল সাহিত্যভান্ডারে।

বঙ্গ শব্দের একটি অর্থ হল "উভয়বাদী' , যে কিনা বলতে গেলে দইওয়ালা-গোয়ালাদের "বঙ্গী'বাহক (বাঁকবাহক)। সে পুরুষানুক্রমিক উত্তরাধিকার যেমন ছাড়তে পারে না, বয়ে নিয়ে চলে তেমনি নবাবিষ্কারকেও সসম্মানে গ্রহণ করে, বয়ে নিয়ে চলে। বিগত-আগত, অতীত ভবিষ্যৎ, উভয় তবলা ( bungo ) তাকে একইসঙ্গেই বাজতে হয়। এই স্বভাব তার শব্দকোষগুলিতেও থেকে গেছে। সেখানে যত প্রাচীনে যাওয়া যায়, ততই দেখা যায় একটি শব্দের বহু মানে ; আর যত আধুনিক কালের দিকে চলা যায়, ততই সেই ভার কমতে থাকে এবং শেষে একটি শব্দের একটি মাত্র মানে সুনির্দিষ্ট হয়ে প্রতীকি শব্দার্থে পরিণত হয়ে যায়।

তীর্থ শব্দের ক্ষেত্রে যেমন আমরা দেখছি, তার ৪২টি মানে কমতে কমতে মাত্র একটি মানেতে
পরিণত হয়ে গেছে। কিন্তু কীভাবে সেটি হয়েছে বা হতে পেরেছে, ক্রিয়াভিত্তিক শাব্দার্থবিধির সাহায্যে তীর্থ শব্দের প্রকৃত অর্থ জানতে পারলে তবেই সেকথা অনায়াসে বুঝতে পারা যায়। আসুন এখন সে চেষ্টাই করা যাক।

জলধারাকে আমরা বলি, তির-তির করে জল বয়ে যাচ্ছে। সেই জলধারার দুদিকের দুই পাড়কে বলা হয় তীর। আমরা জেনেছি, ত্‌ মানে তরণ, ই-কার মানে গতিশীল থাকা, র মানে রহা বা রক্ষিত হওয়া। সেই সুবাদে (ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধিতে) 'তরণের গতিশীলতা রহে যাহাতে' তাকে তির বলে। সেই তির-কে ধারণ করে যে, তাকে বলা হয় তীর। আমরা জানি, এই ধারা যদি কুল-কুল ধারা হত, তবে এর পাড় দুটিকে বলা হত কুল। (এখানে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ই-কার, ঈ-কার, উ-কার, ঊ-কার - এদের সুস্পষ্ট মানে আছে। এসব না জেনে যাঁরা বানান সংস্কার করার জন্য লাফালাফি করেন, তাঁদের কী বলা যায়!)

সে যাই হোক, তির-তির ধারাকে ধরে রাখে দু-পারের পাড় বা তীর। এই তির থেকে তির-তির ধারায় নামার জন্য কিংবা তির-তির ধারা থেকে তীরে ওঠার জন্য যে স্থানে থামা হয়, সেই স্থানকে বলে তীর্থ। তার মানে তির-তির ধারা থাকলে তবেই তীর থাকে, তীর-এ থামার স্থান বা তীর্থ থাকে; ধারা থেকে ওঠার বা ধারায় নামার ব্যবস্থা থাকে, ঘাট থাকে। তির-তির ধারা না থাকলে তীর্থ থাকে না, থাকতে পারে না। কিন্তু কীসের তির-তির ধারা? কেবল জলের ধারা? কেন? জ্ঞানের ধারা, ধনের ধারা, পণ্যধারা, উপদেশ-নির্দেশের ধারা, আইন-কানুন-শাসন-প্রশাসনের ধারা, ধর্মের ধারা, কর্মের ধারা, করুণাধারা, রীতিরেওয়াজের ধারা, পরম্পরার ধারা, এমনকি বংশধারাও তো হতে পারে?

হতে পারে নয়, হয়। হয় বলেই বাংলাভাষী পূর্বপুরুষেরা সবরকম ধারার পাশেই তীর ও তীর্থকে যথার্থভাবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁরা জ্ঞানধারার ঘাট বা তীর্থকে চিহ্নিত করেছিলেন উপাধ্যায়, গুরু, আগম, দর্শনশাস্ত্র বা শাস্ত্র হিসেবে। এই তীর্থগুলির মাধ্যমে লোকে জ্ঞানধারায় নামতে পারে বলেই এদের তীর্থ বলা হত। অর্থাৎ, এই গুরু, শাস্ত্রাদি তীর্থগুলির মাধ্যমেই লোকে বিশ্বমানবের মনোলোকে প্রবাহিত জ্ঞানধারার স্রোতে নামতে পারত, আজও পারে (এই জ্ঞানধারাস্রোতে নেমে স্নান করে স্নাতক হয়। একই তীর্থের বা গুরুর হাত ধরে যারা এই জ্ঞানধারাস্রোতে নামে, তাদের সেকারণেই বলা হয় সতীর্থ। আর, যাঁরা গ্রন্থ লিখতেন বা জ্ঞানধারার ঘাট নির্ম্মাণ করতেন তাঁদের গ্রন্থকার বা তীর্থঙ্কর বলা হত। যে-কারণে অভিধানাদিতে তীর্থঙ্কর শব্দের মানে লেখা হয় 'গ্রন্থকার'।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে এমন কিছু বাংলাভাষী মানুষ ছিলেন, যাঁরা জ্ঞানধারার বিষয়ে সম্যক অবহিত ইলেন। তাঁদেরই কেউ ইংরেজি bachelor শব্দের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন স্নাতক। তাঁদের অনেকেই যেখান থেকে লেখাপড়া শিখেছিলেন, তার নাম শুনলেই আমাদের অ্যাকাডেমিক-বাংলাজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞ-বাবুরা নাক শিটকান ( সেগুলি ছিল বাঙালির নিজস্ব শিক্ষাকেন্দ্র - টোল চতুষ্পাঠী। এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলি তাদের উত্তম অধিকারী ছাত্রদের 'কাব্যতীর্থ', 'ব্যাকরণতীর্থ', 'পুরাণতীর্থ'... ইত্যাদি উপাধি দিত। কারণ, সেই ছাত্ররা কাব্যধারার, ব্যাকরণধারার, পুরাণধারার ঘাট বা তীর্থ স্বরূপ সক্রিয় হতে পারার যোগ্যতা ধরতেন। স্নাতক ও তীর্থ শব্দ দুটি উপাধিরূপে কতখানি বিজ্ঞানসম্মত, প্রায় অর্থহীন bachelor ও master (Master of Arts/ Science ... ইত্যাদি) শব্দের অর্থের সঙ্গে তুলনা করলেই টের পাওয়া যেতে পারে ( সেই উপাধি-দাতাদের চিন্তা-পদ্ধতির উচ্চতার তুলনা নাই বা করলাম।

অপর দিকে, সমাজের ভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত পণ্যধারাকে আমাদের সেই প্রাচীন পূর্বপুরুষেরা গঙ্গাধারা ( gangway = বণিকপথ) রূপে চিহ্নিত করেছিলেন এবং সেই ধারার ঘাটগুলিকে বা হাটগুলিকে তাঁরা তীর্থ রূপে শনাক্ত করেছিলেন। এইসব তীর্থে বা পণ্যধারার 'অবতরণপ্রদেশ'-এ পণ্যধারার পণ্য ওঠানামা করত। তাই এগুলি ছিল (বিনিময়ভিত্তিক) দানকারী বা 'দেবনকারী' দেবতাদের অধিষ্ঠান ক্ষেত্র। গ্রামবাংলায় এখনও এরকম বাক্য শুনতে পাওয়া যায় - 'গঞ্জের হাটে শহরের পাইকার নেমেছে'। ধারা ও ঘাটের ধারণা যদি না থাকত, 'পাইকার নামা'র কথা বাংলা ভাষায় প্রচলিত হতে পারত না। এই যে পণ্যধারার তীর্থ বা হাট, এখানে পাপ (= 'পালকের পালয়িতা' = উৎপন্ন বা পণ্য) স্খালন করা হয় (পণ্যকে পণ্যধারার স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়), এবং বিনিময়ে পাওয়া যায় 'পুণ্য' বা 'পবিত্রতা-সম্পাদক পদার্থ', যার বিষয়ে কালীপ্রসন্ন সিংহের অনূদিত মহাভারতের অভিমত এই যে, সুবর্ণই ( gold money ) সর্বাপেক্ষা 'অধিক-পবিত্রতাসম্পাদক পদার্থ'।

আমাদের সেই প্রাচীন পূর্বপুরুষেরা রাষ্ট্রীয়-উপদেশ-নির্দেশাদির ধারা বা প্রশাসনিক ধারার ঘাট বা তীর্থ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন কমবেশি আঠারোটি তীর্থকে। হরিচরণ জানাচ্ছেন, সেই তীর্থগুলি হল 'মন্ত্রী পুরোহিত যুবরাজ দ্বারপাল দুর্গপাল... ইত্যাদি' আঠারোটি। প্রশাসনিক ধারার সুবিধা পেতে গেলে এই আঠারোটি ঘাটের বা তীর্থের কোনো একটি তীর্থের শরণাপন্ন হতে হয়। তবে কোন তীর্থে বা ঘাটে সেই কাম্য পুণ্যফল পাওয়া যাবে, তার খবরাখবর ঠিকঠাক জানা চাই। মন্ত্রীর কাছে যাবেন নাকি পুলিশ কমিশনার বা নগরপালের কাছে যাবেন! তবে, অষ্ট-দিকপালদের দুয়ারে দুয়ারে যারা ঘুরেছে, তরা নিশ্চয় কমপক্ষে অষ্টতীর্থের কথা জানে, আটঘাট সবই জানে, চাইলে তাদের শরণাপন্নও হওয়া যেতে পারে।

এ তো গেল শাসনধারার কথা। কিন্তু কর্মধারা? রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন - 'দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায় / অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়' - সেই কর্মধারার ঘাটগুলিকে আমাদের সেই জ্ঞানী পূর্বপুরুষেরা চিহ্নিত করেছিলেন 'কর্মযজ্ঞ' বা 'যজ্ঞ' রূপে। সেকারণেই তীর্থ মানে যজ্ঞও হয়। এ হল আমাদের উৎপাদনের কর্মকান্ডের কথা, যেখানে আমাদের কর্মব্যাপার বা শ্রম মানবসভ্যতার শ্রমধারাস্রোতে প্রবাহিত হওয়ার অবকাশ পায়, প্রয়োজনীয় বস্তুতে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ পায়।

সর্বোপরি মানুষের বংশধারার ঘাট বা তীর্থ হিসাবে তাঁরা চিহ্নিত করেছিলেন পাত্র, সৎপাত্র, যোনি, রতিস্থান, ক্রীড়াস্থান, নারী-রজ: প্রভৃতি মানবপ্রজাতির বংশধারার তীর্থগুলিকে। কাউকে যদি তার আপন বংশধারা প্রবাহিত রাখতে হয়, তবে এই তীর্থগুলিতে যেতে হবে, বংশধারাস্রোতে আপন অবদান রাখতে হবে। সক্ষম নারীপুরুষেরা এই তীর্থগুলি দর্শন না করলে মানুষের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যেত। বলে রাখা যাক, বংশধারা কূল কূল করে প্রবাহিত হয় বলে একে কূলও বলা হয়।

এইসব নানাধরণের তীর্থগুলিকে চিনে রাখতে পারলে, তীর্থের কাক হয়ে আর বসে থাকতে হয় না। সর্বপ্রকার তীর্থ ও সেইসকল তীর্থে যাত্রা করার ও তার থেকে কাম্য পূণ্যফল লাভ করার উপায়গুলিও জানতে পারা যায়।

সবশেষে এখন তাহলে একালের জ্ঞানধারার সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ তীর্থকে চিনে নেওয়া যাক। সেকালে গুরু ও শাস্ত্রগ্রন্থ ছিল জ্ঞানধারার তীর্থ। এই তীর্থ আধুনিক যুগে এসে অজস্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ও অজস্র গ্রন্থে বিকশিত হয়েছে। তাদের মাধ্যমেই জ্ঞাধারা প্রবাহিত হতে পারে। বর্তমানে এই জ্ঞানধারা আরও বিকশিত হয়ে পরিণত হয়েছে অন্তরীক্ষের মহাজ্ঞানধারায়। সেই ধারার তীরে তীরে যে লক্ষ লক্ষ তীর্থ বা ঘাট গড়ে উঠেছে, সেই সমস্ত তীর্থক্ষেত্রের ইন্দ্রজালকে বলা হয় "অন্তর্নাথ' (বা internet )। এই মহাজ্ঞানধারার সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হল, এর লক্ষ লক্ষ ঘাট বা তীর্থ রয়েছে; এবং চাইলে অন্তর্নাথের শরণাপন্ন হওয়া যায় এবং যে যার নিজের নিজের ঘাট বা তীর্থ বানিয়ে নেওয়া যায়, এমনকি চাইলে অন্য তীর্থঙ্করদের তীর্থেও ওঠানামা করে এই ধারাস্রোতে স্নান করে স্নাতক হওয়া যায়, পাপ (অজ্ঞান) স্খালন করে পূণ্য (জ্ঞান) অর্জন করা যায়। এই তীর্থগুলিকে একালের ভাষায় "ওয়েবসাইট' ( website ) বলা হয়। কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর বন্ধুবান্ধবেরা এই মহাজ্ঞানধারায় ওঠানামা করার জন্য তাঁদের নিজস্ব যে ঘাট বা তীর্থক্ষেত্র বানিয়েছেন, তাঁরা সেই তীর্থক্ষেত্রের নাম দিয়েছেন --- www.banglasemantics.net ।

অবশেষে তীর্থ শব্দের মানে কী দাঁড়াল, তার সারসংক্ষেপ করতে হবে। দেখতে হবে ক্রিয়াভিত্তিক শব্দবিধিতে তীর্থ শব্দের মানে কী, প্রতীকি শব্দার্থবিধিতেই বা তার মানে কী দাঁড়াল। ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধিতে শব্দের অর্থ দেওয়া হয় একটি বাক্যের সাহায্যে। সেই বাক্যটি যেন একটি আঙুরথোকা; তার প্রতিটি আঙুরই শব্দের অর্থ। সেই নিয়মে ক্রিয়াভিত্তিক (বর্ণভিত্তিক) শব্দার্থবিধিতে "তীর্থ' শব্দের মানে দাঁড়ায় --- "যেখানে তির থেকে তীরে ওঠানামা করা হয়'। যেহেতু তির-তির ধারা বহুরকমের হয়, তীর্থও বহু রকমের হয়। দৃশ্য অদৃশ্য বহু ধারার বহু তীর্থ দেখেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা, এবং তাঁদের আচার আচরণের মাধ্যমে এবং গ্রন্থাদিতে সেইসব তীর্থের কথা তাঁরা বলে গিয়েছিলেন। শ্রী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সেইসব তীর্থগুলির নাম সংগ্রহ করে মোট ৪২টি তীর্থের উল্লেখ করে গেছেন। এর প্রত্যেকটিই তীর্থ শব্দের উদ্দিষ্ট। তবে বাক্যে ব্যবহারের সময় শব্দটি কোন তীর্থকে বোঝাবে, সেটি নির্ভর করে প্রেক্ষিতের ওপর; "সে' সর্বনামটি কাকে বোঝাবে, তা যেমন প্রেক্ষিতের উপর নির্ভর করে, সেইরকম।

আর প্রতীকি শব্দবিধিতে তীর্থ মানে পূণ্যস্থান। এরকম মানেতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে এইভাবে --- তীর্থ'এর যে ৪২টি অর্থের কথা উপরে বলা হয়েছে, তার থেকে যে অর্থটি লোকমুখে এবং পন্ডিতসমাজে বহু ব্যবহারে স্থির রূপ নিয়ে ফেলেছে, এবং নিজের বাকী সহোদরদের কথা, মায়ের কথা, সবই বিস্মৃত হয়ে গেছে, সেই অর্থটিই প্রতীকি শব্দার্থবিধিতে প্রাপ্ত অর্থ। এক্ষেত্রে যেমন হরিচরণ প্রদত্ত ১। নম্বর অর্থের পূণ্যস্থান বা holy place কথাটি তার বাকী ৪১জন সহোদর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং বলা ভাল, আঙুর তার বোঁটা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুকিয়ে কিসমিস-এ পরিণত হয়ে গেছে, সেটিই প্রতীকি শব্দার্থবিধিতে তীর্থ শব্দের মানে হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। পাশ্চাত্যের ভাষাতাত্ত্বিকরা যে এতদিন আমাদের জ্ঞান দিয়ে আসছিলেন, "শব্দের ভিতরে শব্দের কোন অর্থ নেই, শব্দার্থ মাত্রেই প্রতীকি', দেখা যাচ্ছে তাঁদের সে জ্ঞান ভুয়া। হঠাৎ করে তীর্থ শব্দের মানে "পূণ্যস্থান' হয়ে যায় নি। শত শত বছর ধরে "একই কর্মের পুনরাবৃত্তির নীতি মান্য করে বাংলাভাষী তীর্থ বলতে "পূণ্যস্থান' বুঝেছে, বুঝিয়েছে। এর মধ্যে এসে পড়েছে ইংরেজ। তার হাতে প্রতীকি শব্দবিধি ছাড়া অন্য কিছুই ছিল না এবং তার পক্ষে একটি শব্দের বহু অর্থ অত্যন্ত অস্বস্তিকর ছিল; কারণ সে তার অতীত থেকে বহু আগেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, লাঙ্গুলহারা হয়ে গেছে। সে বাংলার কাছে দাবী করেছে বাংলাও তার লেজ কেটে ফেলুক, বাংলার শব্দগুলিকেও একার্থবাচক করে ফেলা হোক। তার সেই দাবীর চাপে অ্যাকাডেমির পন্ডিতেরা আঙুরথোকার সব আঙুর ফেলতে শুরু করেছেন, ৪২টি অর্থকে কমিয়ে কমিয়ে একটিতে গিয়ে হাজির হয়েছেন। এবং শেষ পর্যন্ত একটিমাত্র আঙুরকেই রেখে দিয়েছেন, যা শুকিয়ে কিসমিস হয়ে গেছে; আদিরূপের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্কই আর দেখতে পাওয়া যায় না। এই প্রক্রিয়ার ফলেই ক্রমে একদিন তীর্থ পরিণত হয়েছে শুধুমাত্র "পূণ্যস্থান'এ। সেকারণেই একালের অভিধানে তীর্থ = পূণ্যস্থান বা holy place লেখা রয়েছে দেখতে পাওয়া যায়। তার মানে আজকের বিশ্বের প্রতিটি ভাষার প্রতিটি শব্দের মূলে রয়েছে একটি আঙুরথোকার গল্প, পাশ্চাত্যের প্রতীকি শব্দার্থবিধির রমরমা সে গল্প ভুলে যেতে সাহায্য করেছে। বাংলাভাষার অভিধান ও শব্দকোষগুলি সেই গল্প ভুলতে চায় নি বলেই তার শব্দার্থ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সে উভয়বাদী না হয়ে পারে নি। ....

সবশেষে জানিয়ে রাখা যাক রবি চক্রবর্ত্তী ও বর্তমান লেখক বাংলাভাষার একটি ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থকোষ প্রণয়নে নিযুক্ত আছেন। তার অ থেকে ন পর্যন্ত প্রথম খন্ডটি এ বছরের জুলাই আগস্ট মাসে প্রকাশ করে ফেলা যাবে বলে মনে হয়। এর একটি সংক্ষিপ্ত সরল সংস্করণও একই সঙ্গে প্রকাশ করার চেষ্টা চলছে।

জুলাই ১২, ২০০৯

225 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন