এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা  সমাজ

  • এক চিকিৎসকের মৃত্যু

    দীপ
    আলোচনা | সমাজ | ০২ জুলাই ২০২৪ | ২৩৭ বার পঠিত
  • (প্রথমেই বলে নিচ্ছি ডা. অনির্বাণ দত্তকে আমি চিনতাম না। তাঁর সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় ছিলোনা। লেখাটি লিখেছেন তাঁর সহকর্মী ডা. শেখর দত্ত। লেখাটি পড়ে সবার সঙ্গে ভাগ করে নিলাম।)
    ----------------------------------------------------------

    এক ডক্টর কি মওত

    ডাঃ অনির্বাণ ম'রে গেলেন।
    "মারা গেছেন বা প্রয়াত হয়েছেন" - বললাম না।

    সম্ভবত দুহাজার আঠার হবে। ব্যারাকপুরে থাকা গ্রুপ থিয়েটার কর্মী শুভঙ্করকে কলকাতায় একদল রাজনৈতিক হুলিগান মারলো, শারীরিক নির্যাতন করলো। বহরমপুরের নাট্য সংগঠনগুলি একযোগে প্রতিবাদে সামিল হোলো রবীন্দ্র সদনের সামনে। অন্যতম প্রধান প্রতিবাদী বক্তা ডাঃ অনির্বাণ দত্ত। আকর্ষণীয় চেহারা, বেশ লম্বা, ফর্সা, ঝাঁকড়া কোকড়ানো চুল। বেশ স্পষ্ট সরাসরি বক্তব্যে প্রতিবাদ জানালো।

    সেইদিনই আমার প্রথম পরিচয় অনির্বাণের সাথে।
    গায়ক লিরিসিস্ট কম্পজার গণ সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিবাদী মানুষ ডাক্তার অনির্বাণ আজ অকস্মাৎ চলে গেলো সবাইকে হতবাক করে দিয়ে। মাত্রই বছর ছয়েকের সম্পর্ক। আমার কাছে যেনো কয়েক যুগের।

    এই অনির্বাণের সাথে ক্রমে ক্রমে পরিচয়টা অনেক গভীরে ঢুকে গেল নতুনতর সম্পর্কে। আমার সাথেই থাকতেও শুরু করলো একসময়। আমার ক্যান্সার ধরাপরার পর মেডিকেল সেন্টারের দায়িত্বও অনির্বাণই নিয়ে নিলো।

    অনির্বাণের দেশের বাড়ি সাগরদিঘীর বংশিয়া গ্রামে। প্রচুর জমিজমা। একমাত্র ছেলে। বাবা মা দুজনেই প্রয়াত। সাগরদীঘি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের সেরা ছাত্র ছিলো। ওখান থেকে বেলুর রামকৃষ্ণ মিশন, তারপরে নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস। কলকাতা থেকে প্যাথলজিতে এমডি।

    তখন অনির্বাণের বৌ কলকাতায় মেডিকেল কলেজে পোস্টেড, আন্দুলে থাকে ওদের বছর আড়াই এর ছেলে অস্মিককে নিয়ে। অনির্বাণ প্রায়ই যায় ছেলেকে দেখতে। ছেলেই ওর প্রাণমন ধ্যান। কিন্তু বউয়ের সাথে ডিভোর্স প্রসিডিংস চলছে তখন।

    এই হলো অনির্বাণের জীবন।

    তো - এই জীবন তো আরও কতোই আছে। অনেকেরই মা বাবা মারা গেছেন।
    প্রাণচঞ্চল অনির্বাণ অনেক ভুলভাল নিয়েও একটা সৎ উচ্ছল প্রতিবাদী সংস্কৃতি মনষ্ক যুবক - যে মাতৃ-পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত, একটু বেশীই অস্থির।
    আমিও তাই একটু বেশীই দুর্বল হয়ে পড়লাম অনির্বাণের প্রতি।

    অনির্বাণ গানে ভুবন ভরিয়ে দিতে চায়। সেই কবেকার ফ্রান্সের কৃষক বিদ্রোহের গান - "বেলা চাও" .... ওর নিজের মতো করে লিখে সারারাত ধরে আমার একতলায় বসে বসে সুর দিয়ে গানটা বেঁধে ফেললো। গাইলোও বহরমপুরে কালেক্টরেটের সামনের কৃষকদের অবস্থানে।

    এই হোলো অনির্বাণ। ঘটনার ঘনঘটায় পূর্ণ ওর স্বল্পস্থায়ী জীবন।

    কতই বা বয়েস হবে। বোধহয় বছর সাঁইত্রিশ। মাঝেমাঝেই অনির্বাণ আমাকে ও আমার বছর দশেকের ছেলেকে নিয়ে অজানায় এলোমেলো রাস্তায় পারি দিত ওর গাড়িটা নিয়ে। হাজারো গল্প, প্রায়ই তর্ক বিভিন্ন বিষয়ে। কখনও বা রাগারাগিও। আমাকে বয়কট করে ছেলের সাথে আগডুমবাগডুম গল্প জুড়ে দিত।
    কিছুতেই আমাকে ছাড়তে চাইতো না। মারলে বকলেও অতবড় ছেলে - জড়িয়ে থাকতো।

    ওর সাথে একদিন প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সাথে ফোনে পরিচয় করাতে কি উচ্ছাস। দুজনেই দুজনকে ফোনেই গান শুনিয়ে দিলো কয়েকটা।

    যখন আমার সাথে বাড়ীতেই থাকতো, সকালে তাড়া দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে আমি বাজারে গেলে, ফিরে দেখি রান্নায় নেমে পড়েছে। কোথায় আমি তাড়া দিচ্ছি ব্রেকফাস্ট করে মেডিকেলে যেতে।

    একদিন পিঠের মরশুমে অনির্বাণ সূর্যসেনায় সব্বাইকে পিঠে খাওয়ালো। সে দিন সূর্য সেনার মেয়েদের সবার কি আনন্দ। ওরা পাটিসাপটা বানাচ্ছে। অনির্বাণের ইচ্ছে কটা পিঠে চুড়ি করে খায়।
    সূর্যসেনার বাৎসরিক বনভোজনেও অংশ নিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে নির্মল সরকারের বাড়ীও যেতো।

    গায়ক লিরিসিস্ট কম্পোজার একজন এমডি ডাক্তার, সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষক, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চেতনা সম্পন্ন ডাঃ অনির্বাণ একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না।
    ডাঃ অনির্বাণের এই মৃত্যুও স্বাভাবিক সাধারণ ছিলনা।
    ডাঃ অনির্বাণের আগের বিয়েটা টেকে নি। সেই বিয়ের এখন সাত বছর বয়েসের ছেলে অস্মিত ছিলো অনির্বাণের হৃদয়ের মণি। বারবার ছুটে আন্দুলে যেতো ছেলেকে দেখতে।

    সম্প্রতি অনির্বাণ একটি ফিল্ম প্রডিউস করবে বলেও প্ল্যান করছিল শুনলাম অনির্বাণের প্রিয় ও অগ্রজ নাট্য ব্যক্তিত্ব শুভংকরের কাছে। পরিচালক কমলেশ চৌধুরী ও অতি প্রিয় নাট্যকার শুভঙ্করও এই প্ল্যানে ছিল বলে জানলাম।

    প্রতি বছর পয়লা জুলাই অনির্বাণের উদ্যোগেই বঙ্গীয় চিকিৎসালয়ে ডক্টরস ডে পালিত হয়। গতবার হয়নি। এবার বঙ্গীয় চিকিৎসালয়ে একটা পানশালা (বিভিন্ন রকমের চা কফি সরবৎ ও স্ন্যাকস কাউন্টার) খুলতে অনির্বাণ আসবে ওর প্রিয় গিটারটা নিয়ে গান শোনাতে। কথা রাখলোনা অনির্বাণ।

    অনির্বাণ এখন থাকতো ওর সদ্য বিয়ে হওয়া শ্বশুর বাড়ীতে। বিয়ের পার্টি হোলো এই বছরের ভ্যালেন্টাইন্স ডের দিন। অল্প বয়সের স্ত্রীও সদ্য ডাক্তার। একটা ফ্ল্যাট বুক করে শীঘ্রই চলে যাবার কথা।

    শ্বশুর বাড়ী সূত্রে জানা গেলো - রাতে বমি হয়েছিল বিছানায়। বমি করতে করতে বিছানা থেকে মেঝেতে নেমে নেমে পড়ে। বৌ খাটে। সকালে দেখা যায় মুখ দিয়ে গ্যাজলা বেরুচ্ছে। নিথর দেহ। নিজের কাজের জায়গা মেডিকেল কলেজে না নিয়ে কাছের একটি নার্সিংহোমে নিয়ে গেলে জানায় অনেক আগেই মারা গেছে।

    মৃত ফর্সা অনির্বাণের মুখটা অদ্ভুত ভাবে কালো, আঙুলগুলি নীলচে হয়ে গেছে। উপস্থিত ওর কলিগ দুজন টিচিং ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন - পোস্ট মর্টেম হবে না?
    না, হয় নি পোস্টমর্টেম!

    মৃত্যু বাড়ীর প্রাঙ্গণে প্রমোটার ও তাদের স্টাফদের অতি তৎপরতা ও তাড়াহুড়ো।
    দ্রুত শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলো। কর্মস্থল মেডিক্যাল কলেজে কেনো নেয়া হোলোনা জানিনা। অনির্বাণের দেশের বাড়ী সাগরদীঘির লোকজনেরা রওয়ানা দিয়েও দেখা পেলনা তাদের প্রিয় বিশুকে। হ্যাঁ, ওই নামেই ডাকতো ওর দেশের গ্রামের সবাই। একটা ফ্রী ক্লিনিক খুলেছিল ওখানে।
    অসম্ভব দ্রুততায় প্রতাপশালী প্রোমোটার বাহিনীর তৎপরতায় অতি দ্রুত সৎকার হয়ে গেল অনির্বাণের দেহ।

    প্রশ্ন কি ওঠেনা - অ্যাতো তৎপরতা কেনো? কর্মস্থল মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজের সহকর্মী ডাক্তার অসংখ্য ছাত্রছাত্রী এদেরকে শেষ দ্যাখা দেখতে বঞ্চিত কেন করা হলো?
    কেনো পোস্টমর্টেম করার বিরুদ্ধে দাঁড়ালো শ্বশুরবাড়ির লোকজন? এই সব প্রশ্ন রহস্যই থেকে গেলো।

    অতি অল্প সময়ের মধ্যেই অনির্বাণ শ্মশানে রওয়ানা দিলো। অতি তৎপরতায় চুল্লীতেও ঢুকে গেল।
    অনির্বাণকে বিদায় জানাতে পারছিনা। ও ফিরে ফিরে আসবেই আমার কাছে।

    কি বলবে আমাকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অনির্বাণ ?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • দীপ | 2402:3a80:196c:3470:778:5634:1232:5476 | ০২ জুলাই ২০২৪ ১৬:৪৫743315
  • মূল লেখাটির লিঙ্ক।
  • Ranjan Roy | ০৩ জুলাই ২০২৪ ২২:৩১743320
  • একটি সামান্য তথ্যগত ভুল।
     'বেলা চাও' গানট ফরাসি কৃষক বিদ্রোহের নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালির অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট সংগ্রামের পার্টিজানদের গান। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন