এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • গোপাল ভাঁড় আর বীরবলের আলাপ

    Sukdeb Chatterjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৫ জুন ২০২৪ | ২২২ বার পঠিত
  • গোপাল ভাঁড় আর বীরবলের আলাপ
    শুকদেব চট্টোপাধ্যায়

    স্বর্গের নন্দন কাননে বসে গোপাল মুগ্ধ হয়ে চারিদিকের শোভা দেখছিল। এখানে মানুষ, প্রকৃতি, সবই সুন্দর। চারিদিকে আনন্দের হাওয়া বইছে। শোক দুঃখের কোন বালাই নেই। অবশ্য একেবারে নেই বললে ভুল হবে। কিছু কিছু সময় একটু আছে। অনেককাল কাটাবার পর কারো যখন পৃথিবীতে যাওয়ার, মানে পুনর্জন্মের অর্ডার আসে, তখন একটু মন খারাপের ব্যাপার হয়।

    এখানে মানুষ আছে কিন্তু ভিড় নেই। একে অপরের সাথে খুব বিনয়ের সঙ্গে কথা বলছে, ধৈর্য ধরে অন্যের কথা শুনছে। ঝগড়া নেই, মারামারি নেই। খুব ভালোলাগার একটা পরিবেশ। হবে নাই বা কেন! বেছে বেছে পুণ্যবান মানুষগুলোকেই তো এখানে জায়গা দেওয়া হয়। গোপাল শুধু প্রকৃতিই নয়, মানুষজনও দেখছিল। একজন দুজন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ চোখ গেল পাগড়ি পরা একটা লোকের দিকে। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে আপন মনে হাঁটছে। মুখটা বড় চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু কোথায় দেখেছে তা ঠাউর করতে পারছে না। গোপালের কৌতূহল চিরকালই একটু বেশি। চেনা লাগছে অথচ চিনতে পারছে না, এমন অবস্থায় লোকটাকে চলে যেতে দেওয়া যায় না। মরণের পরে ওপরে চলে গেলে ভাষাটা কোন সমস্যা হয় না। তুমি যে ভাষাতেই কথা বল না কেন, অপরজন ঠিক বুঝতে পারবে। গোপাল এগিয়ে গিয়ে কিন্তু কিন্তু করে লোকটাকে বলল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব কত্তা?”
    প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক মিষ্টি হেসে সম্মতি জানালেন।
    -- আপনার মুখটা খুব চেনা লাগছে কিন্তু আপনি কে তা কিছুতেই মাথায় আসছে না। দয়া করে যদি আপনার পরিচয়টা দেন।
    -- আমার নাম মহেশ দাস। এবার চেনা গেল।
    -- না কত্তা। এই নামের কাউকে আমি চিনি না।
    -- ওটা আমার বাবা মায়ের দেওয়া নাম। লোকে আমায় চেনে বীরবল নামে।
    গোপাল আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলল — আপনিই বাদশাহ আকবরের দরবারের আবুল ফজল, ফৈজি, তানসেন, টোডরমলদের মত বিখ্যাত নবরত্নের এক রত্ন, বীরবল! আপনার দর্শন পেলাম, কি সৌভাগ্য আমার। আমাদের রাজ দরবারের মুখে আপনার একটা বড় তৈল চিত্র ছিল। প্রতিদিন আপনাকে প্রণাম করে রাজসভায় ঢুকতাম। ছবির মুখটা মনে গেঁথে গিয়েছিল। আঁকা ছবি তো একেবারে এক হয় না, তাই চিনতে একটু অসুবিধে হচ্ছিল।
    -- আপনিও রাজসভায় ছিলেন! কোন রাজার সভায়?
    -- দয়া করে আমায় আপনি বলবেন না, লজ্জা করে। আমি আপনার থেকে প্রায় দুশ বছরের ছোট। আমি ছিলাম মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায়। আপনার সম্রাট আকবরের মত বিরাট কোন রাজসভা নয়। কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন বাংলার এক রাজা।
    -- কৃষ্ণচন্দ্র বাংলার কোথাকার রাজা ছিলেন?
    -- আজ্ঞে উনি বাংলার নদীয়ার রাজা ছিলেন। ওনার নামেই একসময় জায়গাটার নাম হয়েছে কৃষ্ণনগর।
    -- তা আপনি মানে তুমি সেখানে কি করতে?
    -- তেমন কিছু নয়। আমার কথাবার্তায় খুশি হয়ে মহারাজ তাঁর রাজসভায় আমাকে ঠাঁই দিয়েছিলেন। কাজ ছিল লোকের মনোরঞ্জন করা। ঐ কাজ করতে করতে একসময় আমার নামের সাথে চিপটে গেল ‘ভাঁড়’ শব্দটা। ছিলাম গোপাল চন্দ্র প্রামাণিক, হয়ে গেলাম গোপাল ভাঁড়।
    -- আমিও তো এই কাজই করতাম। সম্রাট আর তাঁর পারিষদদের মনোরঞ্জন করাই ছিল আমার কাজ।
    -- কিসে আর কিসে, সোনা আর সীসে। কোথায় আপনি আর কোথায় আমি। আপনি কত পণ্ডিত মানুষ। সংস্কৃত, ফার্সি, হিন্দি, কত ভাষায় আপনার জ্ঞান। আপনি একজন কবি, গায়ক এমনকি সেনাপতিও। আমি তো লেখাপড়া করার সুযোগই পাইনি। ছোটবেলায় বাবা মারা গেল। আমাদের দুই ভাইকে একা ফেলে মাও চলে গেল সতী হতে। শিশুকালেই অনাথ হয়ে গেলাম। এক গরিব মহিলার আশ্রয়ে বড় হলাম। যতটুকু যা শিখেছি তা মানুষের সাথে মিশে। কোন স্কুলের বিদ্যে আমার নেই।
    -- তুমি দেখে শিখেছ, ঠেকে শিখেছ। এটা প্রত্যক্ষ জ্ঞান, এই জ্ঞানে কোন ভেজাল নেই। আমাদের শাস্ত্র মতে এটাই সেরা জ্ঞান। তুমিই আসল জ্ঞানী। তুমি অন্যদের থেকে আলাদা, তাই মহারাজ তোমায় তাঁর রাজসভায় জায়গা দিয়েছিলেন। তোমাদের রাজসভায় নিশ্চই আরো জ্ঞানী মানুষ ছিলেন।
    -- আজ্ঞে তা ছিলেন। সেই সময়ের বিখ্যাত কবি ভারতচন্দ্র, গদাধর তর্কালঙ্কার, রাজবৈদ্য আয়ুর্বেদাচার্য গোবিন্দরাম, কৃষ্ণানন্দ বাচস্পতিদের মত পণ্ডিত মানুষেরা ছিলেন। আর ছিলেন সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন। এনাদের সান্নিধ্যে আমার জীবন ধন্য হয়েছিল।
    -- বাঃ, উত্তম। আচ্ছা একটা কথা আমার মাথায় আসছে না। তুমি তো বহুকাল হল পৃথিবীর খেলা সাঙ্গ করে ওপরে চলে এসেছ কিন্তু তাও তোমার সাথে আগে কখনো দেখা হয়নি কেন!
    -- কি করে দেখা হবে কত্তা? আমি তো স্বর্গে থাকি না।
    -- সেকি! তোমার মত গুণী মানুষের এখানে জায়গা হয়নি! এমন তো হওয়ার কথা নয়।
    -- আজ্ঞে সে অনেক গল্প। পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে ওপরে আসার পর চিত্রগুপ্ত বহুক্ষণ ইন্টারভিউ নিলেন। পৃথিবীতে আমার কাজকর্মের ফাইলপত্র সব উল্টেপাল্টে দেখে অনেকক্ষণ গালে হাত দিয়ে চুপ করে বসে রইলেন। ওনাকে চিন্তা করতে দেখে আমিও চিন্তায় পড়ে গেলাম। কপালে কি আছে কে জানে! হঠাৎ গালের থেকে হাত নামিয়ে বিচিত্রগুপ্তের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এই রকম কেস কটা হল?”
    বিচিত্রগুপ্ত খাতা পত্র ঘেঁটে বললেন, “আজ্ঞে তা প্রায় শত খানেক হবে।”
    আমি থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম — আমাকে নিয়ে কি কোন সমস্যা হয়েছে স্যার?
    চিত্রগুপ্ত গম্ভীর হয়ে বললেন — তা একটু হয়েছে বৈকি। তুমি একা নয়, তোমার মত আরো শতখানেক কেস রয়েছে।
    -- আমার কেসটা কি তা যদি একটু খুলে বলেন। এমনিতেই চিন্তার শেষ নেই। পট করে বিনা নোটিশে আমাকে তুলে আনলেন। বউ বাচ্চাদের কথা মনে পড়লেই মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
    --তোমার মানে তোমাদের মত কয়েক জনের কেস একটু জটিল। তোমার এমনিতে রেকর্ড খারাপ নয়। যে জিনিসের পৃথিবীতে আকাল, সেই আনন্দ তুমি মানুষের মধ্যে বিলিয়েছ। স্বর্গের টিকিট তোমার বাঁধা ছিল। কিন্তু মজা মস্করা, ভাঁড়ামোর মাঝে কিছু অকাজ করে ফেলেছ, ওতেই স্বর্গে প্রবেশ আটকে যাচ্ছে। আবার তোমার পুণ্যবলে নরকেও পাঠান যাবে না। আমরা তোমাদের কেসগুলো ওপর মহলে জানিয়েছি। যতদিন না ভগবান বিষ্ণুর দফতর থেকে কোন অর্ডার আসে ততদিন এই চত্বরেই থাক।

    তারপর একদিন জানান হল যে আমাদের মত লোকেদের স্বর্গ আর নরকের মাঝামাঝি একটা জায়গায় রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। নতুন এই উপনিবেশের নাম দেওয়া হয়েছে নর্গ। না নরক না স্বর্গ। স্বর্গে ঢোকার একটা গেট পাশ দিয়েছে। তবে তা থাকার জন্য নয়, দিনের দিনে ঘুরে ফিরে আসতে হবে।
    -- আচ্ছা গোপাল, তুমি কি অকাজ করেছ তা চিত্রগুপ্তের কাছে জানতে চাইলে না কেন?
    -- আমার অকাজ আমার থেকে ভাল আর কে জানবে! তবু ওনার কাছে জানতে চেয়েছিলাম। উনি তিনটে নমুনা দিয়ে জানালেন যে ওইরকম আরো বেশ কিছু ঘটনা আছে।
    -- অসুবিধে না থাকলে একটু বলবে, কি সেই কাজ যা তোমায় স্বর্গে আসতে দেয়নি। বড় জানতে ইচ্ছে করছে।
    -- আপনাকে জানাতে কোন অসুবিধে নেই কত্তা, আমরা তো একই লাইনের লোক।

    একবার এক আলুর গুদামে আগুন লেগেছিল। আমি তখন তার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। আধপোড়া আলুগুলো গড়িয়ে বাইরে চলে এসেছিল। আমার তখন খুব খিদে পেয়েছে। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। আমি তখন একটা মুদির দোকান থেকে একটু নুন চেয়ে এনে তৃপ্তি করে বেশ কটা আধপোড়া আলু খেলাম। খাওয়া শেষে একটু এগোতে দেখি রাস্তার ধারে একজন মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। জিজ্ঞেস করে জানলাম যে উনি সেই গুদামের মালিক। ওনার চারটে আলুর গুদামের একটা পুড়ে শেষ হয়ে গেল। আমি শোকার্ত মানুষটাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আপনার অন্য গুদামগুলোয় আগুন লাগলে একটু খবর দেবেন, আলুপোড়া খেতে আসব।”
    চিত্রগুপ্ত বললেন, “তুমি এক শোকার্ত মানুষকে সান্ত্বনা না দিয়ে মানসিক আঘাত দিয়েছ।”

    আর একটাও আলুর কেস। একবার হাটে যাচ্ছিলাম আলু কিনতে। রাস্তায় এক বন্ধুর সাথে দেখা হল। বন্ধুটা মিচকে বদমায়েশ। আমি আলু কিনতে যাচ্ছি শুনে বলল, “তুই যদি হাট থেকে বিনা পয়সায় আলু কিনে আনতে পারিস তাহলে আমি দশ টাকা দেব।” দশ টাকার লোভটা সংবরণ করতে পারলাম না। বন্ধুর প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। শীতের সময়, আলুর যোগান প্রচুর, ফলে দামও কম। দু এক জায়গায় দরদাম করে জানলাম যে পাঁচ সের আলু কিনলে পাঁচটা আলু ফাউ পাওয়া যাবে। আমি তখন আলুওয়ালাদের ঝুড়ি থেকে পাঁচটা করে আলু তুলে ব্যাগে ভরে নিলাম। সকলে আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, “আজ কেবল ফাউটা নিলাম, সামনের হাটে এসে প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ সের করে আলু নিয়ে যাব।”
    দোকানদারেরা ভালমত কিছু বোঝার আগেই ওখান থেকে কেটে পড়ি। আমার বন্ধুটি কষ্ট হলেও আমায় দশ টাকা দিয়েছিল।
    বলা শেষ হলে চিত্রগুপ্ত বিধান দিলেন, “এটা এক ধরণের প্রতারণা।”

    শেষেরটিতে কোন আলু নেই।
    ছোটবেলায় যখন কোন বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে যেতাম, বুড়োরা আমাকে খুব ক্ষেপাত। তারা আমাকে দেখলেই বলত, “কিরে, তোরটা কবে খাব?”
    আমার মাথায় রাগটা জমেছিল। একদিন শ্রাদ্ধ এক বাড়িতে গিয়ে ঐ বুড়োদের একজনকে বলেছিলাম, “কিগো, তোমারটা কবে খাব?”
    চিত্রগুপ্ত বললেন, “গুরুজনকে অসম্মান করেছ । এই রকম কিছু ছোটখাট কুকর্মের জন্য তোমার স্বর্গে যাওয়াটা হয়েও হল না।”

    সবটা শোনার পর বীরবল স্মিত হেসে বলল — এমন কাজ তো স্বইচ্ছায় বা অনেক সময় অন্যের চাপে পড়ে আমিও কিছু করেছি।
    গোপালের বীরবলের কুকর্ম শোনার বড় ইচ্ছে। কিন্তু সরাসরি জিজ্ঞেস করতে সংকোচ হচ্ছে। কথার মারপ্যাঁচে গোপাল অতি পটু।
    খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল — আপনার মত মানুষ কোন খারাপ কাজ করতেই পারে না।
    বীরবলও চতুর মানুষ, গোপালের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে অসুবিধে হল না।
    -- তুমি ঘটনাগুলো শুনতে আগ্রহী, তাইত! ঠিক আছে আমি দুটো ঘটনার কথা বলছি।

    বাদশাহ আকবরের ছেলে সেলিমের সাথে মন্ত্রীর ছেলের খুব বন্ধুত্ব ছিল। তারা সব সময় একসাথে থাকত, ঘোরাঘুরি করত, গল্প করত। একেবারে হরিহর আত্মা। বাদশাহ ওদের দুজনের এই ভাব খুব একটা পছন্দ করতেন না। একদিন আমায় ডেকে বললেন — বীরবল, সেলিমের সাথে আমার মন্ত্রীর ছেলের এত মেলামেশা আমার ভালো লাগছে না। তুমি এমন একটা কিছু কর যাতে ওদের এই বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়।
    আমি বাদশাহকে আশ্বস্ত করে বললাম — আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন জাঁহাপনা, আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করছি।
    এরপর একদিন দুই বন্ধু যখন গল্প করছে আমি সেলিমের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফুসফুস করে কথা বলার ভান করলাম। তারপর মুখটা সরিয়ে এনে বললাম, “যা বললাম তা যেন কাউকে জানিও না।”
    ওতেই কাজ হল। আমি ওখান থেকে চলে এসে আড়ালে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী পুত্রকে বলতে শুনলাম — উনি কি বলে গেলেন সেলিম?
    সেলিম বলল — কিছুই না। উনি কানের কাছে মুখ এনে শুধু ফুসফুস করলেন।
    -- কিছু না বললে উনি যাওয়ার সময় বলবেন কেন যে “কাউকে জানিও না”?
    সেলিম অনেক ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করল কিন্তু মন্ত্রী পুত্র বিশ্বাস করল না। সেইদিনেই ওদের বন্ধুত্বের শেষ, আর কখনো ওদের একসাথে দেখা যায় নি।

    আর একদিনের কথা। সেদিন বাদশাহ খুব খোশ মেজাজে ছিলেন। আমার কাছে নানা সময় নানা ধরণের লোক নানা কাজে আসত। তাদের কিছু স্বার্থ ছিল, আমারও কিছু স্বার্থ ছিল। এই স্বার্থের লেনদেনে কখনো সখনো একটু গন্ডগোল করে ফেলতাম। এইসব গণ্ডগোল করে যাতে বিপদে না পড়ি তার জন্য সুযোগ বুঝে বাদশাহকে বললাম, “জাঁহাপনা, আপনার কাছে একটা ভিক্ষা চাই।”
    বাদশাহ বললেন, “ভণিতা না করে কি চাই তা বল।”
    বললাম — আমি যদি কোনদিন দোষ করি, আমার মনোনীত বিচারকেরা যেন আমার বিচার করেন।
    সম্রাট আগুপিছু না ভেবেই বলে দিলেন, “বেশ তাই হবে।”
    এর কিছুদিন বাদেই পাকেচক্রে একটা অন্যায় কাজ করে ফেললাম।
    বাদশাহ আমাকে ভালোবাসতেন কিন্তু এক্ষেত্রে শাস্তি না দিলেই নয়। বুঝতে পারলাম যে আমায় বেশ কিছু অর্থদণ্ড দিতে হবে। বাদশাহকে তাঁর আশ্বাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললাম - অন্যায় করেছি বিচার অবশ্যই হবে। কিন্তু জাঁহাপনা বিচারক ঠিক করব আমি। এই আশ্বাস আপনি আমায় দিয়েছিলেন।
    -- ঠিক আছে, কথা যখন দিয়ে ফেলেছি তখন তাই হবে। তুমিই পাঁচজন বিচারক ঠিক কর, তবে বিচার যেন ঠিকঠাক হয়।
    -- তাহলে হুজুর গ্রাম থেকে পাঁচজন গরিব লোককে ডেকে পাঠান, তারা আমার বিচার করবে।
    বাদশাহ আশ্চর্য হয়ে বললেন — তার মানে? সম্ভ্রান্ত বিচারক তুমি চাও না?
    বললাম, “হুজুর, গরিবরাও মানুষ, সম্ভ্রান্তরাও মানুষ। ওপরওয়ালার কাছে কেউ ছোট নয়, কেউ বড় নয়। দিন না তাদের বিচার করতে হুজুর।”
    এরপর বাদশাহ গ্রাম থেকে পাঁচজন বয়স্ক গরিব মানুষকে আনা হল। বাদশাহ তাদের মামলাটা ভাল করে বুঝিয়ে দিয়ে বললে, “ভালো করে বিচার করবে যাতে তোমাদের সুনাম হয়।”
    তারা একসাথে বসে আমার অপরাধ আর তার কি সাজা হওয়া উচিৎ তা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করল। একজন বলল, “এই অপরাধের দেড়শো টাকা সাজা হওয়া উচিৎ।” আর একজন আপত্তি জানিয়ে বলল, “দেড়শ টাকা দিতে হলে বীরবল মরে যাবে। ও এত টাকা পাবে কোথায়? বৌ বাচ্চা নিয়ে পথে বসবে।” একজন বৃদ্ধ তাকে সমর্থন জানিয়ে বলল, “ওটা পঁচাত্তর টাকা করা হোক।” শেষ পর্যন্ত আমার পঞ্চাশ টাকা অর্থদণ্ড স্থির হল। বিচারকরা সকলেই ছিল খুব গরিব, ওদের কাছে পঞ্চাশ টাকাই অনেক টাকা। ওরা বাদশাহকে ঐ টাকাটাও মকুব করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল।
    বাদশাহ আমার চাতুরি বুঝতে পারলেও এটা জেনে খুশি হলেন যে আমি মানুষের মনের খবর রাখি।

    একটা জিনিস আমি বুঝতে পারছি না যে তোমার আর আমার কুকাজের ধরণ প্রায় এক হওয়া সত্ত্বেও আমার তো স্বর্গে আসতে কোন অসুবিধে হয়নি। তোমার বেলায় এত চেকিং হচ্ছে কেন?
    গোপাল একগাল হেসে বলল, “এ জিনিস তো কত্তা চিরকাল হয়ে এসেছে। মানী লোকের বিচার আর আমার মত সাধারণ লোকের বিচার এক দাঁড়িপাল্লায় হয় না কত্তা।”
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Guru | 2409:4060:2116:6ec8:141e:d83d:4ee8:a7e9 | ০৫ জুন ২০২৪ ১৩:৩৭532714
  • খাসা লেখা হয়েছে l সাধু সাধু l
  • অসিতবরণ বিশ্বাস | 2409:4061:2c9b:d023::d349:bf09 | ০৫ জুন ২০২৪ ১৪:০৯532715
  • গল্পগুলো আগে শোনা, বীরবলের ২য়টা অবশ্য নতুন, তবে পরিবেশনা চমৎকার।বলার কায়দাটাও ভালো।
    ভালো লাগলো।
  • | ০৬ জুন ২০২৪ ১৩:৫৮532784
  • দিব্বি গপ্প। smiley
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন