বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • ওইখানে যেও নাকো তুমি (রহস্য উপন্যাস)ঃ পর্ব ১৩

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০১ আগস্ট ২০২২ | ৩৯৮ বার পঠিত | রেটিং ৪.৮ (৪ জন)

  • “হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু”
    সৌরভ
    কাফিলা রওনা দিয়েছে। বেশ একটা পিকনিক পিকনিক ভাব। আমাদের দুটো গাড়িতে চার চার ভাগ করে আমরা আট জন। ফেরার সময় দন্তেওয়াড়ার কাছের সলওয়া জুড়ুম ক্যাম্পে যে অ্যাডভান্স টিম গেছে সেই দুটো ছেলে আমাদের সঙ্গে ফিরবে।
    দুটো বড় সেভেন সীটার গাড়ি,তবেরা এবং ইনোভা, ভাড়া  নেওয়া হয়েছে। আমাদের সবার একটা করে ব্যাগ অথবা ছোট স্যুটকেস আছে, পুষিয়ে যাবে। আটজনের মধ্যে যে পাঁচজন মেয়ে রয়েছে তাদের তিনজন আমার সঙ্গে যাচ্ছে, বাকি দু’জন আর দুটো ছেলে পেছনেরটায়। ন’টার গাড়ির কাফিলায় আগে রয়েছে ডায়রেক্টর জেনারেলের গাড়ি, তাতে লালবাতি লাগানো। কিন্তু তার পাঁচশ মিটার আগে চলছে খোলা হুড জিপসী গাড়িতে দশজন কম্যান্ডো হাতে সেমি অটোম্যাটিক। এগুলিকেই কি কালাশনিকভ বলে? ঠিক জানি না।
    একই ভাবে ওনার পেছনে চলছে ওইরকম আরেকটি সশস্ত্র বাহিনীর জীপ। ওদের সবার পরনে জাঙ্গল ফ্যাটিগ, মাথায় হেলমেট।
    আমি কোসলে স্যারের ইন্সট্রাকশন মেনে আমাদের গাড়ি দুটো আরও পিছিয়ে অ্যাডিশনাল কলেক্টর, শিক্ষা বিভাগ এবং সহকারিতা বিভাগের তিনটে গাড়ির পেছনে ঢুকিয়ে দিলাম। আমাদের পেছনে বাকি চারটে গাড়ি, বিভিন্ন এনজিওদের।
    আমার মাথায় একটাই চিন্তা , সোনালী মিশ্র এখানে কী করছে?
    আমরা দন্তেওয়াড়ায় যাচ্ছি। দেখা যাচ্ছে ও সেখানের ব্লক কো-অর্ডিনেটর। স্যার বলেছেন ও এবং লোকেশ নাকি বিক্রমের স্লিপিং সেলের মেম্বার। তাহলে দন্তেওয়াড়ায় কোন গোলমাল পাকানোর তালে আছে নাকি? সেখানে আমার আসল কাজটা কী হবে?  স্যারের থেকে কোন নির্দেশ আসেনি তো।
    আচ্ছা, ও আমাকে যে চিনবে এতে আশ্চর্য্যের কিছু নেই। বিলাসপুরে দু’বার ওদের বাড়ি গেছি, কলেজে গেছি। মুখোমুখি কথা হয়েছে। তাহলে ওর মনেও প্রশ্ন উঠবে যে আমি এখানে কী করছি?
    যদি সুকমা বীজাপুর এলাকায় বিক্রম লুকিয়ে থাকে তাহলে  আমি আসায় ওরা সতর্ক হবে। বুঝতে চাইবে আমরা ওর এদিকে আসার খবর জেনে গেছি কিনা। আমাদের প্ল্যানটা কী। আর দন্তেওয়াড়া পৌঁছলেই আমাদের সেন্টারের আটজনকে ওর নির্দেশ মত চলতে হবে।
    এসব ভেবেই পেটের ভেতর গুরগুর করছে। ওখানে আমাকে যদি জিজ্ঞেস করে প্রাইভেট সিকিউরিটির লোক বিলাসপুর ছেড়ে এখানে কী রাজকাজ করতে এসেছে তখন কী জবাব দেব?
    ধ্যাৎ, স্যার যা বলেছেন সেটাই চালিয়ে যাব। বলব আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এটা আলাদা চাকরি।
    কিন্তু সোনালী অত্যন্ত চালাক। ও কি বিশ্বাস করবে? বলা মুশকিল।
    ওকে বিশ্বাস করাতে হবে। নইলে আমার মুশকিল। লাইফ রিস্ক হতে পারে। কিস্টাইয়া ও লোকেশ বিদ্রোহীর পরিণতি মনে পড়ছে। ওরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর। স্বাভাবিক ভাবেই আমার লাইসেন্সওয়ালা পিস্তলও স্যারের অফিসে রেখে দেওয়া হয়েছে।
    কোসলে স্যার আমাকে এ কোথায় ফাঁসিয়ে দিল? এই শেষ, ভালয় ভালয় বিলাসপুরে ফিরতে পারলে আমি আর এ লাইনে থাকব না। এর চেয়ে বাবার চাঁদশী দাওয়াখানায় কম্পাউণ্ডারি করা ভাল ছিল।
    হঠাৎ চিন্তার সূত্র ছিঁড়ে গেল একটা গানের সুরে।
    কনভয় রায়পুর শহর থেকে বেরিয়ে মানা ক্যাম্প ছাড়িয়ে  ন্যাশনাল হাইওয়ে নম্বর ৩০ ধরে অন্ততঃ চল্লিশ কিলোমিটার চলে এসেছে। আমি বসেছি ড্রাইভারের পাশে। আর পেছনে বসে গুজগুজ ফুসফুস হি-হি করতে থাকা মেয়ে তিনটি গান ধরেছে, সাক্ষরতা অভিযানের গান।
    “পড়না লিখনা শিখো,
    ও হিম্মতকরনেবালো।
    পড়না লিখনা শিখো,
    ও ভুখ সে মরনেবালো”।
    গানটা মন্দ নয়। ওদের গলা চড়ছে। খানিকক্ষণ পরে গান থামিয়ে শবনম বলে মেয়েটি বলে উঠল—সৌরভ স্যার, আপনি গাইছেন না কেন?
    --আমি ? আমি কী করে? গানটা জানি না তো! আর আমি বড্ড বেসুরো। আপনারাই গান।
    --লিটারেসি আন্দোলনে কাজ করতে এসেছেন আর এই গানগুলো জানেন না? আচ্ছা, একটা বই আছে, তাতে ২৭টা গান। রায়পুরে ফিরে এক কপি আপনাকে ইস্যু করে দেব। এটা কে লিখেছে জানেন? সফদর হাশমি, কয়েক দশক আগে গুণ্ডার আক্রমণে শহীদ হয়েছেন।
    --উনি কে? জানি না তো।
    --কী লোক আপনি! সফদরের নাম শোনেন নি? আচ্ছা, রায়পুরে ফিরে আপনাকে ভাল করে রগড়াবো।
    আমাকে রেহাই দিয়ে ওরা আর একটা গান ধরলঃ
    “লে মশাল চল পড়ে হ্যায় লোগ মেরে গাঁও কে,
    অব অন্ধেরা জীত লেঙ্গে লোগ মেরে গাঁও কে’।
    “মশাল হাতে নামল পথে  ওরা আমার গাঁয়ের লোক,
    ওরা এবার মানবে না হার, আঁধার যতই ভয়াল হোক”।
    আমি মন দিয়ে গানটা শুনছি দেখে সেই মেয়েটা ফের বলে উঠল—এটা কে লিখেছে জানেন? বল্লী সিং চিমা, পাঞ্জাবের নামকরা লোককবি। এর নামও শোনেন নি?  ধুর, আপনি কিস্যু জানেন না।
    অন্য একটি মেয়ে বলে ওঠে—ওর কথায় কিছু মনে করবেন না স্যার। ও একটু বাচাল।
    -আরে আমরা তিনটে মেয়ে আর আপনি একজন পুরুষ। কথাটথা না বলে অমন গোমড়ামুখো হয়ে থাকলে কয়েকশ’ কিলোমিটার যাত্রা খুব বোরিং হবে না? এখন আমরা অফিসে নেই। একটু মন খুলে কথাবার্তা হো-হল্লা করব না?
    আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ ঝটকা দিয়ে আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। কী ব্যাপার?
    নেমে দেখি গোটা কনভয় দাঁড়িয়ে পড়েছে। বেশ কিছু হেলমেট ও আর্মড ফোর্সের ইউনিফর্ম পরা লোকজন আমাদের কাফিলাকে ঘিরে ধরেছে। সামনে লোহার ফ্রেমে তারের জাল লাগানো  ‘সড়ক অবরোধক’ লাগিয়ে রাস্তা জ্যাম করা। সূর্য প্রায় ডুবে যাচ্ছে। ব্যারিয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে বিরাট পুলিশ ফোর্স । ওরা আমাদের গাড়ির কাগজপত্র এবং ডিকি চেক করছে।
    এমন সময় একটা চিৎকার চেঁচামেচি কানে এল। এগিয়ে গিয়ে দেখি ডিজি সাহেবের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সিকিউরিটি ফোর্সের কাঁধে তিন স্টার সিনিয়র অফিসারটি  জোর গলায় ধমকাচ্ছেন ডিজির সহায়ককে।
    উনি বলছেন ডিজির গাড়ির মাথার লালবাতি নামিয়ে ফেলতে  এবং সেটা ওদের আউটপোস্টে জমা রেখে যেতে। ফেরার দিন ফেরত দেওয়া হবে। এতে আপ্ত সহায়কের বিষম আপত্তি। বসের সম্মানহানি হবে না?
    এবার কড়া ধমক এল।
    --যা বলছি তাই করুন। নইলে গোটা কাফিলা রায়পুরে ফেরত যান। এটা কি দিল্লির জনপথ? এখানে অঘোষিত যুদ্ধ চলছে। অসতর্ক হলে জান চলে যাবে। ওরা লালবাতি দেখলে হাই র‍্যাঙ্কিং পুলিশ অফিসার ধরে নিয়ে প্রথমেই গুলি চালিয়ে দেয়, বুঝলেন?
    ওটা খুলে আপনাদের লিটারেসি ক্যাম্পেনের লিফলেট ও স্টিকার আরও বেশি বেশি করে সামনের উইন্ডশিল্ডগুলোতে লাগান। শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক আছে দেখলে ওরা সরকারি গাড়িতে হামলা করে না।
    ডিজি ইশারায় সহায়ককে বললেন লালবাতি নামিয়ে নিতে।
    আমি রাস্তার ধারের প্ল্যাকার্ড দেখে বুঝলাম এটা চারামা, মানে এখনও আরও দেড়শ’ কিলোমিটার পথ বাকি।
    এই ঘটনার পর থেকে সবার প্রগলভতা বন্ধ। হঠাৎ করে অন্ধকার নেমে গেছে। ন্যাশনাল হাইওয়ে নাম্বার ৩৬ একটি চমৎকার পাকা এবং চওড়া রাজপথ। উত্তরাখণ্ডের সিতারগঞ্জ থেকে এর শুরু। গেছে ইউপি, এম পি এবং ছত্তিশগড়ের বস্তার পেরিয়ে তেলেঙ্গানার বেজওয়াড়ার ভদ্রাচলম অব্দি।
    সব ড্রাইভারেরা  ভয় পেয়েছে। গাড়িগুলো ছুটছে আশি থেকে নব্বইয়ের স্পীডে। শাঁ শাঁ করে পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে গাছ, খালি মাঠ, ধানের ক্ষেত। মাঝে মাঝে কয়েকটা কুঁড়েঘর ।  কদাচিৎ কোন  জনপদের কাছাকাছি এলে স্ট্রিট লাইট চোখে পড়ে, নইলে গাঢ় অন্ধকার।
    তবে এটুকু বুঝতে পারছি এটা সমতল এলাকা, কোন জঙ্গল বা পাহাড়ি পথ নয়। এখানে মাওবাদী গেরিলারা থাকে? কী করে  থাকে তা খোদায় জানে।
    এসব ভাবতে না ভাবতেই এল একটা পাহাড়ি সর্পিল পথ ; গাড়ি ধীরে ধীরে ফার্স্ট গিয়ার লাগিয়ে গোঁ গোঁ করে উঁচুতে চড়তে লাগল। হেডলাইটের আলোয় দেখতে পাচ্ছি—রাস্তার  দু’পাশে বড় বড় বোল্ডার, ঠিক শোলে বা চায়না গেট সিনেমার মত। জায়গাটার নাম কেশকাল ঘাঁটি, বা কেশকাল টিলা। এবার সত্যি ভয় ভয় করছে। শুনশান এলাকা, গাড়ির স্পীড পাঁচ কিলোমিটার। বোল্ডারগুলোর পেছনে লুকিয়ে থাকা গেরিলারা যদি হামলা করে?
    আচ্ছা, তেমন হলে সোনালি কি আমাদের বাঁচাবে না? আমি তো অফিশিয়ালি পুলিশ বিভাগের নই। কিন্তু ওকে এবং ওর মাকে বাঁচাতে আমরা সুপারিশ করে সিকিউরিটি গার্ড লাগিয়েছিলাম। মেয়েটা কি এতটা অকৃতজ্ঞ হবে?
    কেশকাল ঘাঁটি পেরিয়ে যাবার পর ফের সমতল রাস্তা। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ির গতি এখন  ৯০ থেকে ১০০। দেড় ঘন্টায় এসে গেল আলো ঝলমল জগদলপুর।  দেখে মনে হল বিলাসপুরের মতই বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, দোকানপাট। তবে শহরের প্রধান চৌক বা স্কোয়্যারে একটা উঁচু বেদীর উপর শিশুকাঠে তৈরি মারিয়া আদিবাসী দম্পতির বিশাল মূর্তি। পুরুষটি মাদল বাজাচ্ছে, মেয়েটির কোমরের বাঁকে নাচের চটুল ভঙ্গিমা।  টের পেলাম যেন অন্য এক অজানা দুনিয়ায় এসে পড়েছি।
     সরকারি লোকজন গেল সার্কিট হাউসে। আমরা এবং অন্য এনজিওর দল সেখানে জলটল খেয়ে যে যার আগে থেকে বুক করা হোটেলে চলে গেলাম। আগামী কাল সকাল নটা নাগাদ সার্কিট হাউসে হাজির হতে হবে।
    সোনালী আমাদের জন্যে একটা পাতি হোটেলে পাঁচটা রুম বুক করেছে।
    দোতলার দুটো কামরায় পাঁচ জন মেয়ে, বারান্দার আরেক মাথায় দুটো কামরায় চারজন ছেলে। তিনতলায় একটা কামরা একা আমার জন্যে ।
    আমার অস্বস্তি লাগছে।
    বললাম—তুমি কোথায় শোবে সোনালী?  মানে, সব ঘরের বাঁটোয়ারা তো শুনলাম, তোমারটা বাদে।
    তুমি বলে ফেললাম! কিন্তু এখন আর সরি বলার কোন মানে হয় না।
    --আমি কোন একটা কামরায় দুটো মেয়ের সঙ্গে ভাগ করে থাকব।
    --শোন, এটা ঠিক হল না। তোমাকে নিয়ে ছ’জন মেয়ে। তোমরা আমার কামরাটা  নাও। একেকটা ঘরে দু’জন করে থাক। আমি ছেলেদের কোন একটা কামরায় গেস্ট হিসেবে একটা স্লীপওয়েল গদি আনিয়ে মাটিতে পেতে নেব। দোতলায় সাপের ভয় নেই।
    --সে তো বুঝলাম, কিন্তু একটা কামরায় একা থাকতে ভয় করছে মনে হয়। কিসের ভয়? ভূতের ?
    --না, পেত্নীর।
    দুজনেই হেসে উঠলাম। কিন্তু এটা কি বললাম!
    তারপর বুঝিয়ে বললাম—নতুন জায়গা, অজানা পরিবেশ। মাওবাদী এলাকায় আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের এক বড় আমলার কনভয়ে শামিল হয়ে এখানে এসেছি, সতর্ক থাকা ভাল। উনি তো সার্কিট হাউসের দোতলায় জেড সিকিউরিটি নিয়ে আছেন, কিন্তু আমরা?
    আসল কথা হল,  সোনালীকে আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না।
    সোনালী অনেক সহজ হয়ে এসেছে। একটু কর্তৃত্বের সুরে  বলল— রায়পুরে আপনার কথা শুনব। কিন্তু এখানে আপনাকে আমার কথা মেনে চলতে হবে। আপনি নতুন। আপনার ভালর জন্যেই বলছি। ভয় কিসের? দরজা বন্ধ করে শোবেন। আপনার বিছানার পাশে ইন্টারকমে ৯ ডায়াল করলে নীচে রিসেপশন এবং হোটেল সিকিউরিটির কাছে কল যাবে। আর আমার মোবাইল নাম্বারটাও রেখে নিন।
     হল? এবার আমাকে একটা কল করুন। ওকে, আপনার নম্বরটাও সেভ করে নিলাম।

    জগদলপুর শহরের আশেপাশে অনেক গাছপালা কাটা হলেও এখনও অক্টোবর মাসে শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে । রাত্তিরে চাদর গায়ে দিতে হয়। আমার অস্বস্তি যায় নি। তাই ঘুমটা গাঢ় হল না।
    কত রাত জানি না। ঘুমটা ভেঙে গেল। ব্যালকনিতে পায়ের শব্দ। কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে। শব্দটা এগিয়ে গেল। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে জানলাটা সামান্য ফাঁক করে একপাশে সরে গেলাম। আবার পায়ের শব্দ, এসে আমার দরজার কাছে থামল। কয়েক সেকেন্ড, তারপর এগিয়ে গেল। আবার ফিরে এল।
    দরজায় টোকা দিচ্ছে কেউ। ওরা কারা? একজন নাকি একাধিক? দরজাটা মজবুত, ওপরে -নীচে ডাবল ছিটকিনি। না, আমি কিছুতেই দরজা খুলব না। সাবধানের মার নেই।
    কেউ গিয়ে এবার জানলায় টোকা দিচ্ছে। আগেই সামান্য খুলে ভেজিয়ে দিয়েছিলাম। কেউ চাপ দিল। জানলার একটা কপাট খুলে গেল। একটা ছায়ামূর্তি জানলায় দাঁড়িয়ে। একটা ফিসফিসানি স্বরঃ
    -দরজা খুলুন। সৌরভ, বাইরে আসুন। কথা আছে।
    --কে? কে আপনি?
    --আমি সোনালী। দরজা খুলে খোলা ব্যালকনিতে আসুন। অন্য কিছু ভাববেন না, কিছু কথা ছিল।
    --কথা? এত রাতে? কাল সকালে বললে হয় না?
    --না, কাল ভীড়ের মাঝে বলা যাবে না। বাইরে আসুন।
    --আপনার সঙ্গে আর কে রয়েছে?
    একটা খিলখিল হাসির শব্দ।
    --ধুস্‌ কী সব ভাবছেন? আমি একা, আর কেউ কেন থাকবে?
    কী  যেন ছিল ওই হাসির আওয়াজে, আমার ভয় কেটে গেল।
    দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ব্যালকনির প্যারাপিটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সোনালী, আমার দিকে এক কাত হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। শরীরী ভঙ্গিমায় যেন একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে!
    আমি বেরিয়ে এসে প্যারাপিটে কনুই রেখে দাঁড়াই। ওর আর আমার মাঝে অন্ততঃ পাঁচ ফুটের দূরত্ব রেখে।
    লম্বা ব্যালকনি একদম ফাঁকা। সব কামরার দরজা বন্ধ।
    আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকি, কিছু বলি না। কী কথা , ব্যাঙের মাথা -সেটা ওই খোলসা করুক।
    ও যেন  আমার চিন্তাটা ধরতে পেরেছে।
    --ভাববেন না, সবাই ঘুমুচ্ছে। আর আমাদের দলের সবাইয়ের ঘর তো এর নীচের তলায়।
    --যদি আপনার রুমের কারও ঘুম ভেঙে যায় আর আপনার বেড খালি দেখতে পায়?
    --ভাববে বাইরের কমন ওয়াশ রুমে গেছি। তাছাড়া সবাই জানে যে আমি বস্তারে চার মাস ধরে আছি। আমার হেড কোয়ার্টার দন্তেওয়াড়ায়। এক অর্থে আমি লোক্যাল।
    --ঠিক আছে, এবার আপনার আর্জেন্ট কথাটি বলুন।
    সোনালী আমার দিকে দু’পা এগিয়ে আসে। আমি নড়ি না, কিন্তু সতর্ক হই।
    --মিঃ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিটেকটিভ স্যার, আপনি এখানে কী করছেন?
    --মানে?
    --বিলাসপুর থেকে পাঁচশ কিলোমিটার দূরে আপনার কোন তদন্ত চলছে? আর এই অ্যাডাল্ট এডুকেশনের নকল সাধুবাবা ভড়ং কেন?
    আমার দুম করে রাগ চড়ে গেল।
    --আপনার এসব জেনে কী লাভ? কেন বলব?
    --জানা দরকার। আমার জানা দরকার আপনার সেফটির জন্যে এবং আমার কাজের সুবিধের জন্যে।
    --আপনার কী কাজ? তাতে আমি কোন বাড়া ভাতে ছাই দিচ্ছি? আর আমার কিসের বিপদ?
    সোনালী উত্তর না দিয়ে সামনের একটু ফিকে হয়ে আসা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আচমকা আমার দিকে ফেরেঃ
    --এটা হার্ডকোর মাওবাদী এলাকা। আপনি প্রাইভেট গোয়েন্দা হলেও পুলিশ বিভাগের সঙ্গে আপনাদের দহরম মহরম আছে। এটা শিক্ষা বিভাগের প্রোগ্রাম। ওরা বাধা দেবে না। কিন্তু শিক্ষার আড়ে পুলিশ ওদের এলাকায় ঢুকলে ওরা সন্দেহের চোখে দেখে এবং অনেক ক্ষেত্রে  খোচর ভেবে মেরে ফেলে।
    --না, আমি গোয়েন্দা হয়ে আসি নি। ওই চাকরি আমি কয়েক মাস আগে ছেড়ে দিয়েছি।
    --সেকী, আপনিই তো আমার সাথী লোকেশ বিদ্রোহী হত্যার কেসটা দেখছিলেন। সেসব আধখ্যাঁচড়া অবস্থায় ছেড়ে দিলেন?
    --না, আমি ওই কথিত মার্ডার কেসে কিছুই করতে পারি নি। ইন ফ্যাক্ট, ওই কেসটা এবং আপনি নিজে, আমার চাকরি খোয়ানোর মূল কারণ।
    --তার মানে আপনি ছাড়েন নি, ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বেশ, তার জন্যে আমি কেন দায়ী হব? বুঝলাম না।
    --শুনুন,  একটা  কারণ, ওই কেসে কোন প্রগ্রেস হয় নি। দ্বিতীয় কারণ, এদিকে আপনি আপনার মাকে অমরাবতীতে ফিল্ড স্টাডির গল্প শুনিয়ে বস্তারে চাকরি করছেন। ওদিকে আমি বিলাসপুরে সেই গল্পটাকে সত্যি ধরে নিয়ে রিপোর্ট করেছিলেম। কিন্তু পুলিশের বড়কর্তারা জেনে গেছেন ওই গল্পটা ভুয়ো।  তাই আমাকে অপমান করে বিদেয় করে দেওয়া হয়েছে।
    --আপনারা পারেন বটে। আমি তো নাম ভাঁড়াই নি। নিজের নামে অ্যাডাল্ট এডুকেশনের সরকারি প্রোজেক্টে কাজ করছি--একটু চেষ্টা করলেই আপনারা আমার হদিস পেতেন। আমি কি কোন ক্রাইম করেছি নাকি, যে লুকিয়ে নাম ভাঁড়িয়ে থাকব?
    মাকে যদি বলতাম মাওবাদী বেল্টে চাকরি পেয়েছি, তাহলে মা কান্নাকাটি করত, কিছুতেই ছাড়ত না।
    -বুঝলাম; কিন্তু আমিও তো মাওবাদী বেল্টে জেনে বুঝে আসি নি।
    আগের  কাজটার থেকে তাড়িয়ে দেবার পর দু’মাস আগে রায়পুর সহরে রিসোর্স সেন্টারের ডকুমেন্টেশন এবং রিসার্চ উইংয়ে কাজ পেয়েছিলাম। ওরা যে আমাকে হঠাৎ এই প্রোগ্রামে সোজা মাওবাদী জোনে পাঠাবেন সেটা আমি কি করে তিন মাস আগে থেকে জানতে পারব?
    আমি তো নেহাত এলেবেলে।  এবার হল? বিশ্বাস করলেন?
    --হ্যাঁ, আমি আপনাকে বিশ্বাস করি।  এবার মাওবাদীরা বিশ্বাস করলে হয়।
    --ওরা আমার ব্যাপারে এতসব জানবে কী করে?
    --সে আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি সেফ।
    --আপনি  কী করে গ্যারান্টি দিচ্ছেন, আপনি কি মাওবাদী?
    --না, কিন্তু কিছু যোগাযোগ আছে।
    --কেন?
    --এখানে গ্রামে কাজ করতে গেলে ওদের অনুমতি ছাড়া করা যায় না, তাই। অনেক সরকারি বিভাগকেও এই সমঝোতা করে টিকে থাকতে হয়।
    --আপনার কাজটা কী?
    --গ্রামে পিছিয়ে থাকা লোকজনের বিশেষ করে দলিত, আদিবাসী ও মহিলাদের ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করা।
    --কীভাবে? ওদের হাতে বন্দুক তুলে দিয়ে?
    --না, আমি বন্দুকের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।
    --তাহলে ?
    --শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে ওদের চোখ খুলে দিয়ে।
    --ওরে বাবা! সেই জ্ঞানাঞ্জন শলাকা দিয়ে? এসব করার জন্যে তো সরকারের শিক্ষাবিভাগ রয়েছে। আপনি আর নতুন কী করছেন?
    --যাদের সারা জীবনে অক্ষর পরিচয় হয়নি? যারা জন্মের পর থেকেই সামান্য দুটো পয়সায়, বলতে গেলে পেটভাতায় , সারাদিন খাটছে তাদের কে পড়াবে? তাদের কথা কে ভাবে?
    আমি কথা ঘোরাই। জানতে চাই লোকেশ বিদ্রোহীকে কে বা কারা মারল? তার কতটুকু সোনালী  জানে?
    ও গম্ভীর হয়ে যায়। একটু পরে মাথা নাড়ে, হ্যাঁ জানে। কিন্তু বলবে না।
    --আচ্ছা, এটুকু বলুন, লোকেশকে কেন মরতে হল?
    --ও বড্ড প্রশ্ন করত। সেগুলো সবার ভাল লাগেনি?
    --কীরকম প্রশ্ন?
    --দেখুন, ভোর চারটে বাজে। কাল সারাদিন ঠাসা প্রোগ্রাম। ফেরার আগে আবার কথা হবে’খন। সকাল সাতটায় উঠে পড়বেন, নইলে আমি এসে ডেকে দেব। আর হ্যাঁ, চোখ কান একটু খোলা রাখবেন।
                                                                                                                         (চলবে)

     
  • ধারাবাহিক | ০১ আগস্ট ২০২২ | ৩৯৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • স্বাতী রায় | 117.194.35.137 | ০১ আগস্ট ২০২২ ১২:১২510650
  • পড়লাম। টান টান।  আবার অপেক্ষা পরের পর্বের।  
  • shu | 103.232.241.147 | ০১ আগস্ট ২০২২ ১৬:৩০510660
  • আপনার অন্য লেখাগুলো ভালো লাগে বলে অনেক দিন বাদে ফিকশন পড়তে শুরু করেছি -- বলা বাহুল্য হলেও বলি -- দারুন লাগছে! অপেক্ষায় থাকি কবে আপডেট আসবে। বা.দ্য.ও., হাইওয়ে নম্বরটা কি ৩০ হবে? 
  • গোপা মুখোপাধ্যায় | 2405:201:8011:a010:3d44:842a:9a7a:cb60 | ০১ আগস্ট ২০২২ ২০:২০510663
  • অপেক্ষা করে থাকি
  • Kishore Ghosal | ০১ আগস্ট ২০২২ ২০:৪৬510664
  • আরো বেশি চিন্তায় ফেলে দিলেন, সোনালী এত ফ্রেণ্ডলি হয়ে উঠছে কেন? জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে, পরের পর্বের জন্যে।  
  • Ranjan Roy | ০১ আগস্ট ২০২২ ২২:৩১510666
  • @shu 
              হ্যাঁ, ন্যাশনাল হাইওয়ে নম্বর ৩০। লেখা উচিত ছিল। জুড়ে দেব।
  • রুখসানা কাজল | 103.217.111.20 | ০১ আগস্ট ২০২২ ২৩:৫১510671
  • পড়ছি। তবে বিরতি দিয়ে অনেকগুলো পর্ব  একসঙ্গে পড়ব।  
  • বিপ্লব রহমান | ০৪ আগস্ট ২০২২ ০৮:২৮510722
  • সোনালী চরিত্রটি বেশ বলিষ্ঠ ও কৌতুহল উদ্দীপক। রহস্যের ঘনঘটা... 
     
    তারপর? 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ প্রতিক্রিয়া দিন