ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • কোথায় তোমার দেশ গো বন্ধু? পর্ব ১৩

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১৫ জানুয়ারি ২০২২ | ৫২০ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • ‘কালোঘোড়া সারারাত ফেলেছে নিঃশ্বাস,
    - সে আমার অন্ধ অভিলাষ’।।

    যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন হয়েছে। সাত-আটজন দলত্যাগীদের নিয়ে অস্থায়ী সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হলেন আরেক আগমার্কা প্রবীণ গান্ধীবাদী প্রফুল্ল ঘোষ আর সাথসংগত করছেন শিক্ষাবিদ হুমায়ুন কবীর, ‘নাউ’ পত্রিকার মালিক। আমরা রোজ মিছিলে যাচ্ছি-নিয়ম করে। আজকের মিছিল বেরিয়েছে নেতাজী নগরের মোড় থেকে। লীড করছেন নিরঞ্জন রায়। বাংলা সিনেমায় ভিলেনের রোল করে নাম করেছেন।

    আমাদের নতুন শ্লোগানঃ ঘোষ কবীরের আসল নাম-বেইমান! শয়তান! সবার রাগ উথলে ওঠে রাজ্যপাল ধরমবীরের কান্ড-কারখানা দেখে। শ্লোগান দিই- ধরমবীর বাংলা ছোড়োঃ আভি ছোড়ো, জলদি ছোড়ো!

    সিপিএমের ভিড়ে আমাদের গ্রুপটা একটু বেয়াড়া। আমাদের শ্লোগান দিচ্ছিঃ যতই চলুক লাঠিগুলি সংগ্রাম চলছে-চলছে, চলবে! আমাদের গ্রুপের অনেকের কাঁধে এয়ারব্যাগ, কোনটার গায়ে লেখা কে এল এম, কোনটা এয়ার ইণ্ডিয়া অন্য কোন বিদেশি এয়ারলাইন্সের নাম। আমি জানি ওই ব্যাগগুলোর ভেতর পেটো আছে।-লাল-সাদা বা লাল-হলুদ। আমরা নিরিমিষ গান্ধীবাদী আন্দোলনে বিশ্বাস করি না। শুধুমুধু অসহযোগ বা ১৪৪ ধারা ভেঙে রাইটার্সের সামনে শান্তভাবে বাসে উঠে পড়ায় কারও এক আঁটিও ছেঁড়া যায় বলে মনে করি না।

    আজ আমরা টালিগঞ্জ থানার সামনে গিয়ে প্রদর্শন করব, ধর্না দেব। কিন্তু কেউ কেউ কিটব্যাগের মাল বের করে পুলিশের উপর টপকাবে। আঠার বছর বয়স কি দুঃসহ! কিন্তু এও জানি আমাকে লালু ও আনাড়ি মনে করা হয়। আমাকে ওই এয়ারব্যাগের একটাও ছুঁতে বা কাঁধে বইতে দেওয়া হবে না।

    অগত্যা আমি ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ি এবং মেয়েদের দলের কাছাকাছি পা মেলাই, নতুন উৎসাহে গলা ফাটিয়ে শ্লোগান লীড করি। নিরঞ্জন রায় ভুরু কোঁচকান। কিন্তু কিছু মেয়ে বেশ উৎসাহিত হয় এবং পাতলা আওয়াজে কোরাসে সাড়া দেয়। আমাকে দেখে চোখ মটকে হেসে ওঠে ঝর্ণাদি। আমার ক্লাস মেট জয়ন্ত’র দিদি, থার্ড ইয়ারে পড়ে। কলেজের সোশ্যালে উৎপল দত্তের ‘মৃত্যুর অতীত’ পথনাটিকায় মায়ের রোল করে প্রাইজ পেয়েছিল।

    একবার ওদের বাড়ির ছাদে একলা পেয়ে আবৃত্তি করেছিলাম—‘বিবর্ণ দিনে কেন এসেছিস ঝর্ণাদি, অন্তঃপুরে উথাল পাথাল মাতাল ঝড়”।

    ঝর্ণাদি ইম্প্রেসড, চশমা মুছে বড় বড় চোখ করে আমায় দেখল। দারুণ তো, তুই লিখেছিস?

    ‘হ্যাঁ’ বলতে পারলাম না। না, আমি না। এ’মাসের নন্দন পত্রিকায় বেরিয়েছে।

    --তাই বল, তোর মত গবেট এরকম সুন্দর লাইন লিখবে? আচ্ছা, হঠাৎ এখন এই কবিতাটা আবৃত্তি করলি যে?

    --ঝর্ণাদি, তোমাকে খুব কবিতা শোনাতে ইচ্ছে করে। মানে, তুমি ভাল নাটক কর, কবিতা বোঝ। সবাই তো এসব বোঝে না।

    ঝর্ণাদি আমার আরও কাছে ঝুঁকে আসে। আমি চোখ সরাই।

    --আচ্ছা, কী রকম কবিতা? আরও দু’একটা শোনা দেখি।

    আমার হাত পা কাঁপে; অনেক দিন ধরে একটা লাইন রিহার্সেল দিয়ে রেখেছি। বলে ফেলি- দেবি, আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর।

    ঝর্ণাদি ছিটকে সরে যায়। তারপর তরতরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে যায়। আমি একা ছাদের কোণে দাঁড়িয়ে কোন অজানা আশংকায় কাঁপতে থাকি। একটু পরে নীচের থেকে আওয়াজ আসে- এই তারু, চা খাবি তো নেমে আয়।

    গলা শুকিয়ে গেছে। ঘামে ভেজা গেঞ্জি। ঘুটঘুটে অন্ধকার , লাইট চলে গেছে। পাখা বন্ধ। উঠে গিয়ে ঢকঢক করে জল খাই। বন্ধ জানলা খুলে দিই। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে, কাছের পুকুর এবং জলভরা মাঠে ব্যাঙের গ্যাঙর গ্যাঙ চলছে অবিরাম।

    চোখের পাতা আবার ভারি হয়ে আসে। বিজলী এসেছে, পাখা ঘুরতে শুরু করেছে। স্বপ্ন নয়, বহুবার দেখা সিনেমা যেন ইন্টারভ্যালের পর দেখছি।

    মিছিল পৌঁছে গেছে ইন্দ্রপুরী স্টুডিওর সামনে। টালিগঞ্জ ফাঁড়ি পৌঁছতে আর একটু বাকি। আমাদের উৎসাহ তুঙ্গে। এখানে রাস্তাটা একটু সরুমত, একটা বাঁক নিয়েছে। কিন্তু এগোতেই আমরা চমকে উঠি। ঢাল হেলমেট সজ্জিত শ’খানেক পুলিশ চার সারি ব্যারিকেড লাগিয়ে রাস্তা অবরোধ করে আমাদের প্রতীক্ষায় রয়েছে। নিরঞ্জন রায় এগিয়ে যান, দু’হাত তুলে শ্লোগান বন্ধ করতে বলেন। তারপর গিয়ে পুলিশ অফিসারের সংগে কথা বলেন।

    ইতিমধ্যে তাঁর নির্দেশে কিছু ভলান্টিয়ার মেয়েদের নিয়ে ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে ঢুকে গেছে।

    মিনিট দশেক তক্কাতক্কি, আমাদের শ্লোগান উচ্চগ্রামে ওঠে-- মানছি না, মানব না। কিন্তু খানিকক্ষণ পরে নিরঞ্জন রায় বলেন—মিছিল এখান থেকে আর এগোবে না। পুলিশ অনুমতি দিয়েছে --দশজনের প্রতিনিধি দল গিয়ে থানাতে প্রতিবাদের স্মারকলিপি দিয়ে আসবে। তাদের অ্যারেস্ট করা হবে না। তারা ফিরে এসে আমাদের সংগে যোগ দিলে আমরা ফিরে যাব। ততক্ষণ এখানে আমাদের শান্তিপূর্ণ প্রদর্শন চলতে থাকবে। আমি কথা দিয়েছি , কোন অপ্রিয় ঘটনা ঘটবেনা। এখানে কাল থেকে ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে। কাজেই কোন ল’ অ্যান্ড অর্ডার সমস্যা ঘটতে দেয়া উচিৎ হবে না।

    আমাদের নিজেদের মধ্যে তক্কাতক্কি বেঁধে যায়। কিন্তু শেষপর্য্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাবে শ্লোগান শুরু হয়। এতক্ষণ আমার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা মলয় ধীরে ধীরে ওর কাঁধের কিটব্যাগের চেন খুলতে শুরু করে। কিন্তু আমার চোখে পরে উল্টোদিকের ফুটপাথে একজন গোর্খা পুলিশ তার বেঁটে খাটো সামনের নলে জালি লাগানো স্বয়ংক্রিয় বন্দুকটির ট্রিগারে আঙুল রেখে একদৃষ্টিতে মলয়কে দেখছে। আমি মলয়ের কাঁধে চাপ দিই। ও আমার চোখের ইশারা খেয়াল করে গোর্খাকে দেখতে পায়। তারপর ধীরে ধীরে কিটব্যাগটি ফুটপাথে খালি জায়গায় নামিয়ে দিয়ে সরে আসে। গোর্খা সৈনিকের হাতের পেশী শিথিল হয়।

    এবার অন্য একটি সিনেমার ট্রেলার চালু হয়।

    উত্তমকুমার একজন ছোট রাজ্যের নবাব। তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছে। আমরা কয়েকজন সেই পরাজিতের দলে। উনি যুদ্ধক্ষেত্রে শিবিরের সামনে একটা সিংহাসনে বসে বিদ্রোহীদের বিচার করছেন। পাশে একটি বিশাল রণহস্তী।

    আমরা চারজন, হাত-পা শেকলে বাঁধা। প্রথমজন উত্তমকুমারের প্রাক্তন সেনাপতি, বিদ্রোহীদলের নেতা। উত্তমকুমার তাঁকে দেখে গম্ভীর হয়ে বললেন—মশানে নিয়ে যাও।

    দ্বিতীয় জনের নাম খোদাবক্স। উত্তম কুমার মুচকি হেসে বললেন—কী ? প্রাণভিক্ষা চাও? একটা সুযোগ?

    বেঁটে মত লোকটা বুক চিতিয়ে বলল –আমি মুসলমান, বেইমান নই।

    উত্তমকুমার—শাবাশ! যাও হাতির পায়ের নীচে।

    বিশাল রণহস্তী পা তুলল, তার সামনে বুকচিতিয়ে এইটুকু খোদাবক্স। একটা চিৎকার, আমি চোখ বুঁজে ফেললাম।

    এবার আমার পালা, হাত-পা কাঁপছে। পাশ থেকে উজির একটা লম্বামত খাতা থেকে পড়ল—তারিণী দত্ত, বিদ্রোহী দলের খাজাঞ্চি ।

    উত্তমকুমার আমাকে দেখে হেসে ফেললেন—বল, কী চাও ? শাস্তি না মাফি?

    --গোস্তাখি মাফ কিয়া জায়ে খোদাবন্দ! আপনার অসীম কৃপা। আমি কাউকে মারিনি, কোন ষড়যন্ত্রে সামিল ছিলাম না। আমাদের প্রধান সেনাপতির আদেশ পালন করেছি মাত্র । নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। আমাকে মাফ করুন। আল্লা অনেক বরকত দেবেন। আমি আপনার খাজাঞ্চি হতে চাই।

    উত্তমকুমার হাসছেন, তাঁর ডালিমের দানার মত দাঁতের পাটি দেখতে পাচ্ছি। বুঝলাম, হাওয়া আমার অনুকূল।

    উত্তমকুমারের মুখে এখনও আলগা হাসির ভাব লেগে রয়েছে। আমার দিকে প্রসন্ন মুখে তাকিয়ে চিবুক তুলে বললেন—বহোৎ খুব! হাতির পায়ের নীচে যাও।

    আজ সকাল থেকে সিরাজুল আমার পেছনে এঁটুলির মত লেগে রয়েছে। ওর কী মতি হয়েছে, কে জানে। বলছে- মাস্টারমশায় আজ ছুটি নিন। আপনাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।

    আমি রাজি হই না। দু’দুটো ঘটনার পর প্রিয়ংবদাকে ঘাঁটানোর সাহস হারিয়ে ফেলেছি। ও যদি আমাকে ফাঁকিবাজ ভাবে! সিরাজুলকে বলি-তোমার প্রেয়সীকে রাজি করাও। আমার ছুটির দরখাস্ত যদি তিনি মঞ্জুর করেন।

    সিরাজুল ভরসা দেয়, --ও অফিসে কথা বলে ভরতকে দিয়ে প্রিয়ংবদাকে একদিনের মত ঘুম পাড়িয়ে দেবে। জলখাবারের পর সিরাজুল আমাকে নিয়ে পেছনের বাগানে যায়। সারারাত বৃষ্টির পর এখন রোদ উঠেছে। পেয়ারা আর শিউলি গাছের পাতায় রোদ্দূর ঝলমল করছে। আকাশে পেঁজা তুলোর মত মেঘ ইতিউতি ভেসে বেড়ায়, এখন কি শরৎকাল? কে জানে?

    হাওয়াই চটি পরে ভেজাঘাসের উপর সাবধানে পা ফেলছি, জলকণা ছিটকে উঠে পাজামার পেছন দিক ভিজিয়ে দিচ্ছে। সিরাজুলের বকবকানি কানে যাচ্ছে না। সবিতা এখন কী করছে? কেমন আছে আমার টুকটুকি ও তার বর? ওরা আমার ঠিকানা জানে না। পুজোয় কোন কিছু পাঠাতে পারবে না।

    সিরাজুল আমার মুখের সামনে হাত নাড়ে। স্যার, কোন দুনিয়ায় আছেন? কোন বেহেশতে হুরীদের সংগে?

    আমি হেসে মাথা নাড়ি। একটা দমকা হাওয়া এল, গাছের ভেজা পাতার সিরসিরানি আমাকে ছুঁয়ে গেল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল—

    "ছিঁড়ে যাওয়া মেঘের থেকে পুকুরে রোদ পড়ে বেঁকে
    লাগায় ঝিলিমিলি।
    বাঁশবাগানের মাথায় মাথায় তেঁতুল গাছের পাতায় পাতায়
    হাসায় খিলিখিলি”।

    --ওরে বাবা! আজ দেখি “মৌসম বড়া বেইমান হ্যায়”। রুখাশুখা তারিণী মাস্টারমশায়কেও কবি বানিয়ে ছাড়ল।

    --আরে রবীন্দ্রনাথ এমনই কবি। ওর হাত এড়িয়ে কে নিস্তার পেয়েছে? এটা জানতে যে শক্তি চাটুজ্জের মত প্রথাভাঙা কবি একবার তাঁর বন্ধুপত্নী, মানে কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের স্ত্রীর সামনে বসে গীতবিতান খুলে একটার পর একটা গান গাইছিলেন?

    --ঈখন ঈ সব বুলছেন! আগে সত্তরের গোড়ায় আপনারা স্কুলে ঢুকে লাইব্রেরিতে রবীন্দ্র রচনাবলী পোড়ান নি?

    চমকে উঠি। এসব ও কোত্থেকে জানে? এসব তো কাউকে বলিনি। প্রিয়ংবদাকেও না।

    হ্যাঁ, সেটা ছিল একটা ঝোড়ো সময়, পাগলামির সময়। কলেজে পড়ি। নির্দেশ এল-- পাড়ায় অ্যাকশন করতে হবে । নাকতলা স্কুলে স্টাফ রুমে ঢুকে কিছু ছেলে মাটিতে ফেলে দিল রবীন্দ্রনাথ ও বিদ্যাসাগর রচনাবলী, আমারই নির্দেশে। আমার একসময়ের শিক্ষকরা হতভম্ব। কেউ কেউ ভয়ে রুমের বাইরে কেটে পড়লেন। কিন্তু দাঁড়িয়ে পড়লেন বিজয় স্যার। আমাকে বললেন—তারিণী, কি করছ ভেবে দেখ। এই বইগুলি তোমার প্রিয়। পরে কিন্তু সারাজীবন পস্তাবে। তুমি রাজি হলে আমি এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে রাজি। ইতিহাস এত সরল রেখায় আঁকা যায় না। কিন্তু এখন তোমরা উত্তেজিত। কাল আবার এস।

    ওনার গলার স্বরে কিছু একটা ছিল । আমি সবাইকে বললাম –তোরা এখন খানপুর স্কুলে যা। আমি এটা দেখছি, এগুলো পুড়িয়ে ঘরে ফিরব।

    তারপর একটা কথা না বলে বইগুলো তুলে ধূলো ঝেড়ে আলমারিতে যত্ন করে গুছিয়ে রেখে এলাম।

    এর ফল হোল দু’রকম। স্কোয়াড থেকে আমাকে বাদ দিয়ে সন্দেহের তালিকায় রাখা হোল। একবছর জেলে থাকার সময় পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাঁধিয়ে আমাকে বেধড়ক ঠ্যাঙানো হোল। কিন্তু নগদ লাভ হোল জেল থেকে বেরোনোর দু’বছর পর।

    বাম সরকারের আমলে বিজয় স্যারের সুপারিশে নাকতলা স্কুলে চাকরি পেলাম। পাগলামির ভূত আগেই ঘাড় থেকে নেমে গেছল। কিন্তু এসব তো সিরাজুলের জানার কথা নয়।

    --কীসব বলছ? আমি মাস্টারমশাই, স্কুলের লাইব্রেরির রচনাবলী পুড়িয়েছি?

    --বালাই ষাট, আপনি কেন পোড়াতে যাবেন! বলছি সেই সময়ের অতিবাম উঁচ্চিংড়ে ছাত্রদের কথা।

    তাই বল! কিন্তু কোথায় কিছু একটা খচখচ করছে। আমায় সতর্ক হতে হবে।

    এবার ঘরে যাওয়া যাক। স্নানটান করে দুটো ভাত খেয়ে ঘুমুব। যদি সিরাজুলের কৃপায় আজ প্রিয়ংবদার হাত থেকে রেহাই পাই তাহলে বিছানায় গড়াব। ঢের হয়েছে।

    কিন্তু সিরাজুল আজ আমার ছুটি পাইয়ে দেওয়ার বদলে কিছু আদায় করেই ছাড়বে। খাওয়ার পর ঠিক গুটিগুটি হাজির আমার ঘরে।

    “কোনমতে মোর সঙ্গে বঞ্চে এক যামিনী”

    মাস্টারমশায়, একটা কথা জিজ্ঞেস করি। আমি হলাম মাঠেঘাটে ঘোরা ফক্কড় টাইপ। কিন্তু আপনি নিয়মমাফিক শুদ্ধ জীবন যাপন করেছেন । পাড়ার এবং ছাত্রদের কাছে মোটামুটি আদর্শ স্কুল মাস্টার, যেমনটি বাংলা সিনেমায় দেখায়। মদের নেশা নেই। মুখ দিয়ে শালাবাঞ্চোৎ বেরোয় না। সিগ্রেটও ছাত্রদের সামনে খেতেন না। একেবারে উনিশ শতকের ভিক্টোরিয়ান প্রুডারির ছাঁচে ফেলে তৈরি।

    তবু একটা প্রশ্ন করতে পারি? মেয়েদের আপনারা কী চোখে দেখেন?

    --প্রশ্ন তো করেই ফেলেছ, কিন্তু হঠাৎ এই জিজ্ঞাসা ? তাও এই নারীবর্জিত আশ্রমে? অবশ্যি প্রিয়ংবদার কথা ধরি নি।

    --এড়িয়ে যাবেন না স্যার। আমি সিরিয়াস।

    --আরে কী জানতে চাইছ সেটাই তো মাথায় ঢুকছে না।

    --কেন? আমার সোজাসাপটা প্রশ্ন—মেয়েদের আপনারা কী চোখে দেখেন? কী মনে করেন?

    --কী আবার? আমার সংসারে দু’জন নারী, আমার স্ত্রী ও মেয়ে। গিন্নিকে কী চোখে দেখি? সে তো কবে কালিদাস বলে গেছেন—‘গৃহিণী সচিবঃ সখী মিথঃ প্রিয়শিষ্যা ললিতে কলাবিধৌঃ’।

    --বুঝলাম, সে আপনার ঘর গোছগাছ করবে, সেক্রেটারি হবে, মন জোগাতে ফষ্টিনষ্টি করবে আবার গান শোনাবে! কিন্তু কালিদাস তো বাঙালী ভদ্রপুরুষদের দেখেননি। আপনি ভারতচন্দ্র পড়েছেন? বিদ্যাসুন্দর?

    --না, স্কুলে কিশলয়ে পাঠ্য ছিল ‘সুন্দরের বর্ধমান দর্শন’ –ওইটুকুই পড়েছি। শুনেছি মূল কাব্যটি ঘোর অশ্লীল, বিদ্যাসাগর বলেছেন। আর তাই পড়ার ইচ্ছে হয়নি।

    --উফ্‌ সেই ভিক্টোরিয়ান ন্যাকামো! তাহলে শুনুনঃ

    “গিয়েছিনু সরোবরে স্নান করিবার তরে
    দেখিয়াছি একজন অপরূপ কামিনী।
    যত চাহে দিব ধন, দিব নানা আভরণ,
    --কোনমতে মোর সঙ্গে বঞ্চে এক যামিনী”। [1]

    এই যে শেষ লাইনটা—এটাই আসল কথা। বাঙালী পুরুষ মেয়েদের কমোডিটি ভাবে, কথায় কথায় ‘মাল’ বলে।

    --তোর আজকে হোল কী বলত? ওরকম অশ্লীল শৃঙ্গাররসের কবিতা সব ভাষাতেই আছে। কিন্তু সেগুলো ব্যতিক্রম। লোকের বাড়ি বেড়াতে গেলে ড্রইংরুম বেডরুম দেখিস, নাকি টয়লেট? বাঙালী ভারতচন্দ্র পড়ে? না রবীন্দ্রনাথে মজে?

    --আমি দুটোই দেখি। তাই ভারতচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ দুজনের লেখাই পড়ি। এবং এই গা্নের কথাগুলো মন দিয়ে শুনুনঃ “বিধি ডাগর আঁখি যদি দিয়েছিল সে কি আমার পানে কভু পড়িবে না” ?

    মূল কথাটা একই, একটি নারীর শরীরকে অধিকার করার ইচ্ছে—এখানে নারীর ইচ্ছে অনিচ্ছের কোন প্রশ্ন নেই। ফারাকটা হোল রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়ান রুচি অনুযায়ী একটু মাখন লাগিয়ে দিয়েছেন।

    --মাথাটা গেছে, তোর মাথাটা একেবারে গেছে। নইলে এসব আলফাল বকছিস! রবীন্দ্র সংগীতের রোম্যান্টিকতার এমন কাদামাখা বিশ্লেষণ!

    --আজ্ঞে এর একটা কথাও আমার মাথা থেকে বেরোয়নি। এসব অর্ধশতাব্দী আগে বলে গেছেন নীরদ সি চৌধুরী। আপনাদের ময়মনসিং জেলার নীরদবাবু।[2]

    --আরে ও একটা বিটলে বুড়ো। ওঁর ভুলভাল ইতিহাসবোধ নিয়ে আমাদের নাকতলা স্কুলের একসময়ের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক সুশোভন সরকারের চমৎকার লেখা আমার কাছে আছে। এখান থেকে বেরোই তারপর তোমায় পড়াব। কিন্তু আজ তোর কী হয়েছে বল তো!

    -আপনার মনে আছে যে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দিল্লির জওহরলাল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে এম এসসি ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র নাজিব আহমেদ বিরোধী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে হাতাহাতির পর হোস্টেল থেকে রাতারাতি গায়েব হয়ে যায়। প্রথমে পুলিশ তারপরে সিবিআই কেউ ওকে খুঁজে পায় নি। তারপর সিবিআই ফাইল বন্ধ করে দেয়। ওর মা ফতিমা নাফিস হাইকোর্টে যায়। [3] একবছর পরে আরো একটা ঘটনা ঘটে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা অ্যাপ খুলে কিছু মুসলিম মহিলার নাম এবং ছবি দিয়ে তাদের নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করে নিলামে তোলা হয়। ছ’মাস কেটে যায়। পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করল না। তারপর নতুন বছরের গোড়ায় ‘বুল্লি বাঈ’ নাম দিয়ে আরও একটা অ্যাপ খুলে প্রায় একশ’ মুসলিম মহিলার ফটো এবং নাম পরিচয় দিয়ে তাদের নিলামে তোলার কথা বলা হয়। পুলিশ কিছু ছেলে এবং একটি মেয়েকে গ্রেফতার করে।[4] কিন্তু আজ অব্দি এর পেছনে কারা তার হদিশ পাওয়া যায় নি।

    --মানছি, এর পেছনে রয়েছে মিসোজিনি এবং ইসলামোফোবিয়া --

    --থামুন তো! ওইসব ইংরেজি নাম দিয়ে ব্র্যান্ডিং করে আপনারা একটু স্বস্তি বোধ করেন। কারণ এতে করে জিনিসটাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। আসল ব্যাপার হোল দুটো। এক, মেয়েরা মাল, তাই তাদের নিলামে বা দাঁড়িপাল্লায় তোলা যায়। আর মুসলিম মেয়েদের শিক্ষা দেওয়া দরকার। ওরা মুখ বন্ধ রাখুক। কৃতজ্ঞ থাকুক তিন-তালাক তুলে দেওয়ার জন্য। বেছে বেছে সেইসব মেয়েদের ছবি লাগানো হয়েছে যারা মুখ খুলেছে—সাংবাদিক, অভিনেত্রী, মানবাধিকার কর্মী এবং –।

    সিরাজুল হাঁফাতে থাকে, একটু জল খায়। তারপর কথা শেষ করে –এবং নিখোঁজ নাজিবের মা ফতিমা নাফিস, যার অপরাধ হারানো ছেলের খোঁজে একের পর এক কোর্টে যাওয়া, সিবি আইয়ের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন করা।

    --মনে পড়ছে। কিন্তু আজ হঠাৎ তোর মাথায় এসব কেন এল?

    --হঠাৎ নয়, একটা ইংরেজি পত্রিকায় এটা নিয়ে লেখা বেরিয়েছে –‘নাজিব কোথায়’? আচ্ছা, আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটালাম, চলি। আমার কথাটা একটু ভেবে দেখবেন।

    নিশ্চয়ই ভাবব। কিন্তু ওর আরেকটা কথাও ভাবার মত। নীরদ সি চৌধুরী প্রসঙ্গে ও যেন বলল “আপনাদের” ময়মনসিং জেলার নীরদবাবু! ময়মনসিংহ জেলার সঙ্গে আমার পিতৃপুরুষের যোগ ও জানল কেমন করে? ও ব্যাটা কি আমার ফাইল দেখেছে? আর এই গভীর গোপন আস্তানায় ইংরেজি পত্রিকা ওর হাতে এল কী করে? ঘুম এল না।

    অহিংসা পরমো ধর্মঃ

    যথারীতি সতীশ ভাউ দীঘের সংগে আমার সেশন চলছে। বেশ ক’টা হয়ে গেল। উনি আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চান যে বামাচার ও দক্ষিণাচারের মধ্যে অমিলের চেয়ে মিল বেশি। ওরা ভাবছেন আমার মনে এখবও যতটুকু শ্যাওলা জমে রয়েছে এভাবে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

    এখন ক’দিন ধরে চলছে আধুনিক সমাজে রাষ্ট্র কেন হিংসাকে তোল্লাই দেয় সে’নিয়ে লম্বাচওড়া বাকতাল্লা।

    উনি আমাকে আঙুল উঁচিয়ে জেরা করতে থাকেন। হিংসাকে মার্ক্স ‘সমাজ পরিবর্তনের ধাত্রী’ বলেছেন কিনা? মাও সে-তুং যে বিপ্লবকে সূচীশিল্প বা ভোজসভার মত না ভেবে একটা নির্মম হিংস্র প্রক্রিয়া বলেছেন-- যার মাধ্যমে একটি শ্রেণী আরেকটিকে শেকড় সুদ্ধ উপড়ে ফেলে—সেটা আমার জানা আছে কিনা। দেখা গেল উনিও আমার মত মাও জে-দং এর জায়গায় সে-তুং বলতে বেশি স্বচ্ছন্দ। দুজনেই বেইজিং না বলে পিকিং বলি।

    আমি ক্লান্ত বোধ করি। মাথায় হানা দেয় সমরেশ বসুর কোন ভুলে যাওয়া উপন্যাসের একটি লাইন—মা গো, কেন যে এতসব কথা!

    এইসব তর্ক বিতর্ক একজীবনে অনেকবার হয়েছে। বিপ্লবের জন্য ভায়োলেন্স অবশ্যম্ভাবী কিনা, সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের হাতিয়ার ফেলে হঠাৎ বুদ্ধদেব হয়ে যাবে কিনা, রাষ্ট্র চন্দনকাঠের মত পাথরে ঘষা খেতে খেতে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে কিনা—এইসব কপচাতে কপচাতে আদ্দেক জীবন কাটিয়ে দিয়েছি। কারও সাতে নেই পাঁচে নেই নির্বিরোধ জীবন কেটে যাচ্ছিল ছোট একটা ডিঙি নৌকোয় লগি মেরে; কেন যে এমন শনির দৃষ্টি পড়ল!

    কারও বাড়া ভাতে ছাই দিইনি, কারো মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাইনি, সুখের চেয়ে স্বস্তি চেয়েছি। কবে যে এদের হাত থেকে রেহাই পাব! একবার এখান থেকে বেরোতে পারলে ছেড়ে দেব কোলকাতা। চলে যাব মেয়ের কাছে। ওদের বাড়ির কোণায় বা ছাদে ছোট্ট একটা ঘর পেলেই হবে। আমি আর সবিতা বাকি জীবন গল্প করে কাটিয়ে দেব। এই দুটো বছরের স্মৃতি একটা দুঃস্বপ্ন হয়েই থাকবে। এর নাম ভুলেও নেব না। এখন কী করে এই লোকটার বকবকানি বন্ধ করা যায়?

    আমি বলি-ভাউ ওসব কূটকচালি ছাড়ুন । ভারতের ঐতিহ্য ভারতের সংস্কৃতির কথা বলুন। আমরা হিংসায় বিশ্বাসী নই। ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ আমাদের আদর্শ। অহিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করার কথা আমাদের ভগবান বুদ্ধ শিখিয়েছেন।

    --আরে ছাড় বুদ্ধদেবের কথা। বৌদ্ধধর্ম খুব একটা টেঁকসই ব্যাপার নয়। ভারতে জন্মেও এখান থেকেই কাটা ঘুড়ির মত ধাঁ হয়ে ভাসতে ভাসতে গিয়ে পড়ল তিব্বত, চিন, জাপান, ব্রহ্মদেশ, শ্যামদেশ ও

    সিংহলে। আমাদের সনাতন ধর্মে রয়েছে ‘অহিংসা পরমোধর্মঃ’। কিন্তু কি জান, গান্ধীজি এবং তাবড় তাবড় নেতারা এই আদ্দেক শ্লোকটা প্রচার করে আজকের ভারতের ব্যাপক ক্ষতি করেছেন। গোটা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা ন্যালাক্যাবলা হয়ে গেছে। যেমন সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করে দেওয়ায় এবং নানা জায়গায় ওই শ্লোকটা গোটা গোটা করে লেখায়।

    আসল শ্লোকটা হচ্ছেঃ ‘অহিংসা পরমোধর্মঃ, ধর্মহিংসা তথৈব চ’।

    অর্থাৎ, অহিংসা পরমো ধর্ম বটে, কিন্তু ধর্মরক্ষার্থে হিংসার আশ্রয় নেওয়া আরও বড় কর্তব্য। কিন্তু আমাদের জাতির জনক শ্লোকের প্রথম অংশটা জোর গলায় প্রচার করেছেন। বাকিটা চেপে গেছেন রাজনৈতিক স্বার্থে।

    --ইউ টু ব্রুটাস! ভাউ শেষে আপনিও? মূল গ্রন্থের সংগে নয়া মিলিয়ে হিন্দুধর্মের পবিত্র গ্রন্থ নিয়ে যে যা খুশি বলে যাবে তা মেনে নেবেন? আবারদশ জায়গায় ওইসব বলে বেড়াবেন? এতে আমাদের শাস্ত্রের অপমান হয় না?

    -- এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন? কী হয়েছে?

    -- হয়েছে আমার মাথা! ওই শ্লোকটি কোন শাস্ত্রে আছে?

    --মহাভারতে, বনপর্বে।

    --কোন প্রসঙ্গে?

    --ধর্মব্যাধ এপিসোড; বিভ্রান্ত কৌশিক মুনিকে জনকের মিথিলা নগরীতে ধর্মব্যাধ শেখাচ্ছেন—ধর্ম কাকে বলে? ধর্মপালন কীভাবে করতে হয়?

    -- ভুল কথা। ওই শ্লোকটি ফেক। হ্যাঁ, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি। বাড়ি গিয়ে মূল সংস্কৃত মহাভারত খুলে মিলিয়ে নেবেন।

    --আচ্ছা? তাহলে আসল শ্লোকটি কী? শুনি একটু!

    --শুনুন, ধর্মব্যাধকে বাজারে বসে মৃগ এবং মহিষের মাংস বিক্রি করতে দেখে কৌশিক মুনি হতভম্ব। জানতে চাইলেন একজন ধার্মিক জ্ঞানী ব্যক্তি হয়ে এই নীচ কাজ কেন ? প্রাণীহত্যা কেন?

    তখন ব্যাধ তাকে বোঝালেন যে উনি নিজে প্রাণীহত্যা করেন না। অন্যের মারা পশু এখানে বিক্রি করেন। কারণ বেদাদি শাস্ত্রমতে দেবতাকে নিবেদন করে মাংস খেলে পাপ হয়না। আর রাজা রন্তিদেব

    রোজ লোককে খাওয়াতে তাঁর রান্নাঘরে দু’হাজার মহিষের মাংস রান্না করাতেন। উনি কিন্তু রাজ্যসুখ, স্বর্গ মোক্ষ এসব চাইতেননা। বরং দুনিয়ার সবার দুঃখ দূর করতে চাইতেন।

    ন ত্বহং কাময়ে রাজ্যং ন স্বর্গং না পুনর্ভব্ম্‌ ।
    কাময়ে দুঃখতাপ্তানাং প্রাণিনামার্তিনাশনম্‌।।

    --ধেত্তেরি, যত ভ্যানর ভ্যানর! অহিংসা নিয়ে মহাভারতের মূল শ্লোকটি কী?

    --অহিংসা পরমো ধর্মঃ তথা হিংসা পরো দমঃ

    অহিংসা পরমং দানম অহিংসা পরমঃ তপঃ।।
    অহিংসা পরমো যজ্ঞঃ তথাহিংসা পরং বলম। [5]

    --হয়েছে, হয়েছে! এবার বাংলা মানেটা বলুন আগড়ম বাগড়ম না আউড়ে।

    --আপনি বলতে দিচ্ছেন কোথায়? এর মানে -অহিংসা ও সত্যবচন সকল প্রাণীরই হিতকর, অহিংসা পরমধর্ম। অহিংসা হোল সর্বোচ্চ ত্যাগ, সর্বোত্তম শক্তি।।

    --তাহলে ওই শ্লোকটি --?

    --ওটা ফেক,কোন নকল বাবাজীর বানানো। সোশ্যাল মিডিয়ায় দশবছর ধরে চলে আসছে।

    --আপনার ভারতের সাধু সন্ন্যাসীদের উপর শ্রদ্ধা নেই?

    খেয়েছে! মহারাষ্ট্রীয়ান সতীশ দীঘের একী তামাশা? ফাঁদে পড়লে চলবে না।

    --কেন থাকবে না? রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম এঁদের আর্তত্রাণে সেবাভাবনায় ঝাঁপিয়ে পড়া কে অস্বীকার করবে? কিন্তু পাশাপাশি নকল বাবাদের দেখুন। আশুমল ওরফে আশারাম বাপু ও তাঁর ছেলে এখন জেলে আছেন । বাবা রাম রহীমেরও একই দশা। দু’জনের কেসেই মার্ডার এবং রেপের চার্জ। কিন্তু ইলেকশন জেতার জন্যে এঁদের আশীর্বাদ নিতে কত বড় বড় নেতা ওঁদের ডেরায় ভীড় জমাতেন তা সবাই জানে।

    ঘড় ঘড় আওয়াজ। তারপর একটা কাশির মত, যেন কারও হিক্কা উঠছে। দরজায় কারও ছায়া। চৌকাঠ থেকে উঁকি দিচ্ছে ভরত মণ্ডল। চৌকাঠ আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রিয়ংবদা ।

    --ভাউ, আপনি আমার সংগে আসুন। সেন্টার থেকে যোশীজি এসেছেন। আপনাকে ডাকছেন, কোথাও নিয়ে যাবেন। জরুরি বৈঠক আছে। ।

    ভাল হোল। এদের সঙ্গ, এদের কথাবার্তা বড় ক্লান্তিকর। বেশিক্ষণ পোষায় না।আমার ঠাকুমা ছোটবেলায় বিরক্ত হলে বাঙাল ভাষায় বকত—মাথার মজক পানি! ‘মগজ’ শব্দটাকে ইচ্ছে করে বিকৃত করে ‘মজক’ বলত ঠাকুমা।

    আমিও উঠে দাঁড়াই, নিজের কামরায় গিয়ে শোব।

    কিন্তু ভরত মণ্ডল ভবি ভোলে না।

    -এত তাড়াতাড়ি কিসের মাস্টার! সারাদিন তো ভাউয়ের সংগে গপ্পগুজব করে কাটালে! আসল কাজ কয় ইউনিট হোল? আমি চললাম, তুমি কিন্তু প্রিয়ংবদাকে হিসেব বুঝিয়ে ১০ ইউনিট কাজ তুলে দিয়ে তবে ছুটি পাবে। মনে রেখ, এটা কিন্তু ধর্মশালা নয়।

    একজন কিচেনের ম্যানেজার! তার মুখে এমন কথা? নিজেকে ভাবেটা কী ? আমার গুরুঠাকুর!

    --দেখ ভরত, বাজে কথা বোল না। এখানে আমি নিজে থেকে আসি নি, তোমরা জবরদস্তি তুলে এনেছ। আর বেশি প্রিয়ংবদা প্রিয়ংবদা কর না। কি করে নেবে তোমার প্রিয়ংবদা? মেরে ফেলতে পারবে না । ওর কেরদানি জানা আছে।

    ভরত তেরছা চোখে আমায় দেখে। কী জান তুমি মাস্টার?

    -- ও কিলার রোবো নয়। তাদের মডেলের সিরিজ নাম্বার আলাদা। ওর মডেল নাম্বার হোল S-309.178, এক পুরনো শস্তা মডেল।

    ভরত মুচকি হেসে ভাউকে বলে—আপনি রুমের বাইরে বেরিয়ে আসুন। আর প্রিয়ংবদাকে বলে—অ্যাটেনশন!

    অবাক কাণ্ড! প্রিয়ংবদা দু’পায়ের গোড়ালিতে ক্লিক শব্দ করে ‘সাবধান’ পোজে দাঁড়িয়ে পড়ে। ভরতের পরের কম্যাণ্ড— নাঊ অ্যাবাউট টার্ন! স্ট্যান্ড অ্যাট ইজ, স্ট্যান্ড ইজি! প্রিয়ংবদা , মাস্টারমশাই তোমার মডেলের সিরিজ ও সিরিয়াল নম্বর দেখবেন। পেছনের প্যানেল একমিনিট খুলে রাখ।

    ঘড় ঘড় শব্দে খুলে যায় প্যানেল।

    আমি এগিয়ে যাই, কাছে গিয়ে ভাল করে দেখব। ভরতের সেয়ানাগিরি ঘুচিয়ে দেব । আমি জানি --ওর সিরিয়াল নম্বর নন-কিলার সিরিজের S-309.178, আমাকে অফিসে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিলেন। অন্ততঃ তিনজন উপস্থিত ছিল সে’সময়; বললে হবে?

    --মাস্টারমশাই, ওর থেকে অন্ততঃ দু’ফুট দূরত্ব রেখে দাঁড়ান। ফন্ট সাইজ বেশ বড়, ওখান থেকেই নম্বরটা পড়ুন—জোরে জোরে।

    ক্রোমিয়াম প্লেটে কালো রঙের হরফে খোদাই করা নম্বর বেশ পড়া যাচ্ছে।

    --K-390.18.

    (চলবে)

    [1] ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, “রসমঞ্জরী”।
    [2] নীরদ চন্দ্র চৌধুরী, “বাঙালী জীবনে রমণী”, আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা।
    [3] দ্য প্রিন্ট, ২৭ জানুয়ারি, ২০২০।
    [4] হিন্দুস্থান টাইমস্‌, ১১ জানুয়ারি, ২০২২।
    [5] মহাভারত; মহাপ্রস্থানিক পর্ব, (ত্রয়োদশ অধ্যায়), ১১৭.৩৭-৩৮।
  • | রেটিং ৪ (১ জন) | বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৫ জানুয়ারি ২০২২ | ৫২০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Emanul Haque | ২২ জানুয়ারি ২০২২ ২১:২৯502986
  • অপেক্ষায় আছি। পরের কিস্তির
  • অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ২৩ জানুয়ারি ২০২২ ০৩:৪১503001
  • অপেক্ষায় আছি, রঞ্জনদা! একসাথে ছোটবেলা আর বুড়োবেলা উভয়কে জুড়ে নিয়ে এমন প্রবল সম্ভাব্য দিনের গল্প - অসাধারণ! 
  • জয় | 82.1.126.236 | ২৩ জানুয়ারি ২০২২ ০৪:৫৩503003
  • @র ঞ্জনদা,
    একটা বড়সড় সাহিত্য পুরষ্কার না পেয়ে থামবেন না, হচ্ছে! সত্যি তেমনটা যেন হয়। তখন যাঁক করে বলতে পারব গুরুতে আমাদের প্রথমে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল!
  • Ranjan Roy | ২৩ জানুয়ারি ২০২২ ২২:৫৮503042
  • আর তিনটে দিন। গুরুগাঁওয়ে ঝড়বৃষ্টি ও ৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা হওয়ায় কেমন আলসেমিতে পেয়ে বসলো। বুড়ো হয়ে গেছি।ঃ)))
     তিনদিনের মাথায় নামিয়ে দেব। মাক্কালী! নইলে আগামী জন্মে কালীঘাটের কুকুর হব।
  • syandi | 45.250.246.131 | ২৪ জানুয়ারি ২০২২ ০১:০২503046
  • জয়,
    আমি অনেকদিন আগেই রঞ্জনদার কোন একটা সিরিজে কমেন্ট করেছিলাম যে রঞ্জনদা যদি লেখালেখিকে পেশা হিসাবে নিতেন তাহলে অনেক নামীদামি  লেখকদের ভাতে টান পড়ে যেত। সিরিয়াসলিই বলছিলাম কথাটা.
  • sch | 45.64.221.248 | ২৫ জানুয়ারি ২০২২ ১৫:১৮503088
  • লেখাটা শেষ হলে দেশের সব ক'টা ভাষায় অনুবাদ করা দরকার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন