ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  ভ্রমণ   যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে

  • উঠলো বাই

    সে
    ভ্রমণ | যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে | ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ | ৩৭৭০ বার পঠিত
  • তখনও গোটা ইয়োরোপে দেশের সংখ্যা এখনকার চেয়ে ডজনখানেক কম, এশিয়ার দেশের সংখ্যাও বেশ কম। ইউরোস্টার রেলপথ তৈরিই হয়ে ওঠেনি, তবে সেটা তৈরি হলে খরচ যেমনই হোক না কেন মানবসভ্যতার ইতিহাসে যে একটা মাইলফলক সৃষ্টি হবে এরকম আলোচনা টুকটাক হয়। ইয়োরোপ তখনও দ্বিধাবিভক্ত এবং দ্বিধাগ্রস্ত।
    সোভিয়েত দেশে তখন স্ট্রাকচারাল পরিবর্তনের কথা পাবলিককে বুঝিয়ে দিয়ে তলে তলে সিস্টেমিক পরিবর্তনের সওদা হচ্ছে, কেও কিচ্ছুটি জানে না। এইরকম একটা টাইমে বয়ফ্রেন্ডের হাতে রেগুলার নিগৃহীত হতে হতে, মধ্য এশিয়ার একটা মরূদ্যান শহরে  আমার মনের মধ্যে হঠাৎ ঘটে গেল সিস্টেমিক পরিবর্তন।
    হাতে তখন আমার মোট দুটো অপশন, হয় পড়ে পড়ে মার খাও, নয়ত পালাও। আমি সেকেন্ডটা চুজ করলাম। গত শতাব্দীর আশির দশকে ভারতীয় মেয়েরা ভীতু হতে শুরু করেছিল (কারন অনেক থাকতে পারে, কিন্তু এটা অবজারভেশন) এবং নো ওয়ান্ডার আমিও সেই দলেই ছিলাম। কথায় কথায় ভয় পাওয়াটা একটা নেশার মতো আচ্ছন্ন করে রাখে। নিজেকে দুর্বল ভাবতে ভাবতে মানসিক ভাবে পরনির্ভরশীলতা গড়ে ওঠে, যেটা প্রথমদিকে আরামদায়ক এবং খানিকটা রোম্যান্টিক হলেও,  কেমন যেন দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার মতো আচ্ছন্ন করে রাখে। এর থেকে মুক্তি পেতে হলে এক ঝটকায় বের হতে হয়, অ্যাটলিস্ট আমাকে বের হতে হয়েছিল এক ঝটকাতেই। সেই প্রসেসটাতে কয়েক ঘন্টার ভেতর ডিসিশন নিয়ে ফেলি যে, বেড়াতে যাবো। একা। এর আগের ছুটিগুলোতে দেশে যেতাম, সেসবে কর্তব্য দায়িত্ববোধ সামাজিকতা সেন্টিমেন্ট এইসব অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে মড়িয়ে একাকার হয় থাকত। এবার সেসব বাহুল্য বাদ দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম একা, সম্পূর্ণ অজানার দিকে। গন্তব্য লন্ডন।
    প্রশ্ন উঠতে পারে, লন্ডন কেন? হোয়াই? বেড়ানোর জায়গা কি আর নেই?
    তা ঠিক নয়,  আশে পাশে অনেক জায়গা ছিল, কিন্তু অনেকটা দূরে যাওয়ার মধ্যে কেমন একটা নিজেকেই পরীক্ষা নেবার ব্যাপার থাকে, যেখানে থাকে শক্ত পরীক্ষায় পাশ করার আনন্দ, ফলে নিজেকেই বেশি নম্বর দেবার প্রবণতা, সম্ভবত নিজের ওপর বিশ্বাস আর ভরসা তৈরি করার জন্যই। 
    আশেপাশে আমাদের হস্টেলে অনেককেই দেখতাম লন্ডন ফেরৎ হয়ে খুব গর্ববোধ করতে, তাই কঠিন টার্গেটটাই সেট করলাম নিজের জন্য।
    প্রথমে হেঁটে, তারপর ট্রলিবাসে, তারপর এরোপ্লেনে চেপে মস্কো পৌঁছে বিশাল সব লাইন টাইনে দাঁড়িয়ে গোটাপাঁচেক দেশের ভিসা নেবার লম্বা প্রসেস অতিক্রম করতেই প্রায় দুসপ্তাহ লেগে গেছল। (এ প্রসঙ্গে আগে লিখেছি "তেহরানের স্বপ্ন" শিরোণামে) । দুটো রাত এবং তিনদিনের জার্নি, কিছুটা জলপথে, অধিকাংশটাই রেলপথে। শুরু হলো যাত্রা দুপুরবেলা। মস্কোর একটা রেলস্টেশন থেকে (বেলোরুস্কি ভাকজাল)।
    দীর্ঘ রেলযাত্রার খুঁটিনাটি এই লেখার প্রতিপাদ্য নয়, প্রাথমিক ঝটকায় ভয়টয় কাটিয়ে দুটো রাত ট্রেনে কাটিয়ে তৃতীয় দিন দুপুরে যখন ফেরিঘাটে ( হুক ভান হলান্ড)  ট্রেন থামল তখন আবার ভয় ভয় অনুভূতিটা ফিরে এলো। বেশ কয়েকঘন্টা পরে ফেরি যখন ভিড়বে ইংল্যান্ডের বন্দরে, তখন যাবোটা কোথায়?
    আমার তো কোনও ঠিকানা নেই।
     
    এটা ভ্রমণকাহিনী নয়। ভ্রমণ করতে গিয়ে বাঙালিদের থেকে সাহায্য পাবার ঘটনা।
    হারউইচে ফেরি থেকে নেমে লাইনে দাঁড়িয়ে ইমিগ্রেশনের ফর্ম ভর্তি করতে গিয়ে মুশকিলে পড়লাম, ঠিকানা লিখতে হবে। লম্বা  লাইন পাশাপাশি দুটো। সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খশখশ করে ফর্ম ফিলাপ করছে। পেন নেই আমার। পাশের লাইনের একজন ছেলের কাছে পেন চাইলাম, ফর্ম ভর্তি করতে গিয়ে তাকে বললাম
    —আমার তো ঠিকানা এখানে কিছু নেই, কী লিখব এখানে?
    সে স্থিরভাবে বলল, তাহলে তুমি যেতে চাচ্ছো কোথায়?
    — লন্ডন।
    — লন্ডনে যেখানে গিয়ে উঠবে সেখানকার ঠিকানা লিখে দাও।
    — সেসব তো এখনও ঠিক নেই...
    ছেলেটা বিরক্ত হয়ে বলল, তাহলে আমি জানি না।
    লাইন সামনের দিকে এগোচ্ছে। ঝপ করে তার ফর্মে সে যা ঠিকানা লিখেছে সেটা দেখে নিয়ে যতটা মনে রাখতে পেরেছি নিজের ফর্মেও সেটা তাড়াতাড়ি লিখে নিয়ে তাকে কলমটা ফেরত দিলাম।
    ইমিগ্রেশন কিছুই সেভাবে খুঁটিয়ে দেখেনি। ফেরিঘাট থেকে ফের ট্রেন, সেখান থেকে লন্ডনের লিভারপুল স্ট্রিট পৌঁছতে পৌঁছতে রাত আটটা সাড়ে আটটা। আমার পিঠব্যাগটা অসম্ভব ভারি, তাতে রয়েছে খাবার, জলের গোটা পাঁচ ছয় বোতল এবং দুসেট সালোয়ার কামিজ। এই অবধিই আমার টিকিট কাটা ছিল। এখন বাসস্থান খুঁজতে হবে। গ্রীষ্মকাল, তাই শীতবস্ত্রের দরকার নেই, কিন্তু সূর্য অস্তমিত। 
    সিনিয়রদের কাছে শুনতাম তাদের লন্ডনে আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব কিছুই নেই, তবু তারা বেড়াতে যেত, যদিও তারা সকলেই পুরুষ। মেয়ে সিনিয়র কেউ ছিল না তাই মেয়েদের অভিজ্ঞতা আমার অজানা।
     
    মস্কোয় যে হোটেলে থেকেছিলাম ভিসা নেবার সময়টায়, সেখানে রোজই নানানজনের সঙ্গে আলাপ হতো। একজন বাংলাদেশি ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। সিনিয়র। আগেও দুবার লন্ডন গেছে। এবার যাবে কম্পিউটার কিনতে। পারসোনাল কম্পিউটার বলে একটা জিনিস বেরিয়েছে যেটা নাকি এমনি ছোটখাট কম্পিউটারের চেয়ে দামে বেশি এবং দেখতে শুনতেও খুব ভাল। মাইক্রোসফট বলে একটা কোম্পানীর অপারেটিং  সিস্টেমে ওটা চলে। লন্ডন কি সিংগাপুর থেকে কিনে এনে সোভিয়েত বাজারে বেচতে পারলে বিরাট লাভ। সবাই কিনতে পারে না, প্রচুর দাম, বেশ ওজনও আছে। 
    আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কম্পিউটার কিনতে কত পাউন্ড লাগে? তাতে সে যে সংখ্যাটা বলেছিল তেমন টাকা আমাকে বেচে ফেললেও পাওয়া যাবে না। তার নিজেরও অত পুঁজি নেই॥ যাদের অনেক পুঁজি আছে তারা এরকম ছেলেদের কিছু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এবং যাতায়াত-খাবারদাবারের খরচ  টরচ দিয়ে কম্পিউটার আনানোর কাজ করে। মাথাপিছু একটা কম্পিউটার আনলে কাস্টমসে ট্যাক্স দিতে হয় না। যারা অন্যের পুঁজি নিয়ে কম্পিউটার আনতে যায় তাদের নাম "পাইলট"। এই সিনিয়র ভাইটিও একজন পাইলট।
    আমার মাথায় প্রশ্ন খেলে গেছল, তাই সরাসরি সেই ছেলেটিকে বলেছিলাম— আমিও পাইলট হতে চাই।
    — আপনি?
    ভুরু কুঁচকে আমার দিকে একটু তাকিয়েই সে আর হাসি চাপতে পারে নি।
    — হাসছেন কেন? 
    — আপনি কী করে পাইলট হবেন?
    — আপনার চেনা কেউ থাকলে তাকে একটু বলুন না, এই ট্রিরে আমিও তার জন্য কম্পিউটার এনে দেব। 
    সে আবারও হাসতে থাকে।
    — কী যে কন আপনি!
    — কেন? এতে হাসির কী আছে? টাকা নিয়ে তো  আর আমি পালাবো না, আমাকে তো ফিরে আসতে হবেই এখানে লেখাপড়া শেষ করতে!
    — মাইয়া মানুষ পাইলট। নাঃ। কেউ রাজি হবে না।
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কৌশিক ঘোষ | ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১৩:৩৩735177
  • পাঠকদের পক্ষ থেকে ধন‍্যবাদ। পরের পর্বগুলোর জন‍্য প্রতীক্ষায়।
  • জয় | 82.1.126.236 | ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১৫:৩৪735178
  • @সে
    বলছিলেন রোমহর্ষক কাহিনী। সত্যি সত্যি রোমহর্ষক। লেখারগুনে তো একেবারে - "টান টান উত্তেজনা!"
    আরো একটা কথা বলেছিলেন- এটা ভ্রমণ কাহিনী নয়। ঠিকই। আরো অনেকটা বেশী কিছু!
    সবাই অধীর অপেক্ষায় থাকলাম।
  • ইন্দ্রাণী | ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১৬:৪৫735179
  • অনেকদিন পরে আপনার লেখা।
    পড়ছি। অপেক্ষায় থাকব।
  • kk | 68.184.245.97 | ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ ২১:৩৪735180
  • এই টইটা খুলে ভালো করলেন। ভাটে তো সব হারিয়ে যায়। আমি গল্পটা মন দিয়ে শুনছি।
  • aranya | 2600:1001:b021:4af7:c03c:780d:b2f6:c50 | ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ ০১:৩৭735181
  • দারুণ 
  • | ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ ০৯:৫৪735183
  • 'তেহেরানের স্বপ্ন' কোথায় পাবো সে? 
    এইটা চলুক, ওইটার লিংক পেলেও ভাল হয়।
     
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:1d7f:b63a:4e6b:89ac | ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৬:৫৫735185
  • https://www.guruchandali.com/comment.php?topic=11663
     
    দ,
    এই লিংকে হয়ত আছে, হয়ত নেই।
    খুঁজতে হবে। খুঁজে না পেলে আবার লিখে দেব।
  • জয় | 82.1.126.236 | ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ ১৬:৪০735215
  • @সে 
    "উঠলো বাই" টইটাকে তুলে আপনাকে আলতো টোকা দিলাম পরের কিস্তির জন্য :)
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:58cd:52ad:cce8:28af | ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ ১৬:৪৬735216
  • লিখছি, লিখছি... :-)))
  • Kausik Gh | ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ ১৮:২১735217
  • জয়ের বক্তব্যকে তো ভোট দিচ্ছিই, তার সঙ্গে দ্বিতীয় পর্বের জন‍্য অনুরোধ টনুরোধ না, রীতিমতো দাবি জানাচ্ছি।
    আজ ছুটি, কাল ছুটি, পরশু, তরশু, চরশু... ছুটিই ছুটি। সারাদিন ধরে করেন কি আপনি ?
  • সে | 194.56.48.108 | ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:০৫735218
  • আলোচনাটা ডেলিকেটলি হ্যান্ডল না করতে পারলে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে যাবে, কোনও লাভ তো হবেই না, ঝগড়ায় পৌঁছে গেলে কেস ফারাক্কা অবধিও গড়াতে পারে। ধরণের পরিস্থিতিতে আমি আগেও পড়েছি। আমাদের দুজনের মাতৃভাষা এক হলেও, দেশ যেমন আলাদা, তেমনি ভাবনা চিন্তার মধ্যেও বেশ তফাৎ আছে।

    পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা মনে যাই ভাবুক, মুখে প্রকাশ করবার সময় অনেক ঢেকেঢুকে বলে। বিশেষ করে মেয়েদের সমান সমান ভাবে কি না, সে ব্যাপারে মুখে খুবই ফরোয়ার্ড। ততদিন অবধি বাংলাদেশিদের যতটা চিনেছিলাম, তারা অনেকটাই চাঁচাছোলা ভাষায় কথা বলে এবং মেয়েদের সমানাধিকার জীবনের সবকটা ক্ষেত্রে দেবার ব্যাপারে অনিশ্চিত। বেশি রেগে গেলে ফারাক্কার জলবণ্টননীতিতে বাংলাদেশের ওপর ইন্ডিয়া কী পরিমান খচরামি করছে, তাদের ঘন ঘন বন্যার জন্য ইন্ডিয়া কতটা দায়ি, সেই সমস্ত অপরাধের বোঝা আমাকে নিজের কাঁধে নিতে হবে। আমি যথেষ্ট টায়ার্ড। ঘুম পাচ্ছে, কিন্তু লোভও রয়েছে, যদি লাস্ট মোমেন্টে পাইলট হয়ে টুপাইস কামাতে পারি, তাই লোকটাকে একটু বাজিয়ে নেবার অভিপ্রায়ে বললাম, বসুন বসুন, আমি এক মিনিটের মধ্যে আসছি।

    ইউনিভার্সিটি হোটেলের বেশ ওপরের তলার প্রকাণ্ড করিডোরের একপ্রান্তে বসবার ব্যবস্থা। সিনিয়র সেই ভাইটি সেখানে বসে রইলেন, আমি দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে এক বোতল মদ দুটি গ্লাস নিয়ে এসে ভালোমানুষের মতো টেবিলের ওপর রাখলাম।

    প্রথম গ্লাসটি খাবার সময় বেশি কথা বলা যায় না। ভোদকা শরীরে প্রবেশ করবার সময় গলায় একটু ধাক্কা তো লাগে, তখন চুপচাপ খেতে হয়। কথা ফোটে একটু পরে। সেসময়ে জানতাম ভোদকা খেলে লোকে মন খুলে গল্প করে।

    কিছুক্ষণ কথা বলার পরে বোঝা গেল, ওনার হাতে তেমন ক্ষমতা নেই যাতে করে আমাকে পাইলট বানানো যায়। উনি নিজেই তো পাইলট, এই বিজনেসের সামান্য একজন বোড়ে, রাজা মন্ত্রী ঘোড়া এমনি নৌকোর লেভেলে হলেও হতো, এক্ষেত্রে ওসব রিকুয়েস্ট করা মানে সময় নষ্ট করা।

    তবে কথা বলবার জন্য লোকটির সঙ্গ মন্দ নয়। মদ যে খেতে পারছি, এবং একা একা লুকিয়ে খেতে হচ্ছে না, সেটাই তো দারুণ একটা ব্যাপার। যে শহরে থাকতাম সেখানে বয়ফ্রেন্ডের শাসনে জীবন ওষ্ঠাগত। আমি সেই লোকটির সঙ্গে আনন্দে গল্প করতে লাগলাম। সেই আলোচনায় আমার বয়ফ্রেন্ডের কথাও উঠল, অল্প নিন্দে মন্দও হলো, এবং আমার বয়ফ্রেন্ড বাংলাদেশি জেনে তিনিও আমাকে কিছুটা হলেও বন্ধুত্বের চোখে দেখলেন, নিজের জীবনের কথাও টুকটাক শেয়ার করে ফেল্লেন।

    সে রাতের আড্ডায় উনি বলেছিলেন যে লন্ডনে গেলে বাংলাদেশিরা অনেকেই বাংলাদেশ সেন্টারে থাকে। আগে থেকে চিঠির মাধ্যমে খবর দিয়ে যেতে হয়, খরচ নগন্য, এবং ঠিকানা পেম্ব্রীজ গার্ডেন্স বলে একটা জায়গায়। উনি বাড়ির নম্বরটা মনে করতে পারেন নি, কখনও বলছেন একুশ নম্বর বাড়ি তো কখনও চব্বিশ নম্বর। তবে বাংলাদেশি ছাড়া ওরা বাইরের দেশের কারোকে থাকতে দেয় না। মেয়েদেরতো থাকার কোনও স্কোপই নেই।

    নেশা চড়লেও আমি ব্যাকগ্রাউন্ডে ভেবে যাচ্ছি থাকার জায়গা একটা লাগবে, জাস্ট রাতটুকুর জন্য। চেষ্টা করলে কি শুধু রাতগুলোর জন্য জায়গা জোগাড় করা যাবে না? এয়ারপোর্ট? রেলস্টেশন? ফুটপাথ?

  • সে | 2001:1711:fa42:f421:58cd:52ad:cce8:28af | ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:৪২735219
  • লিভারপুল রেলস্টেশনের পাশেই আন্ডারগ্রাউন্ড, কোলকাতায় বা সোভিয়েত দেশে যাকে বলা হয় মেট্রো/মেত্রো। আন্ডারগ্রাউন্ডের দিকটায় যেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হালচাল বুঝে নিচ্ছি। একদিকে দেয়ালে পরপর কয়েকটা পাবলিক টেলিফোন। লোকে তাতে একটা কার্ড ঢোকাচ্ছে ফোন করছে চলে যাচ্ছে। 
    টেলিফোনবই ঝুলছে পাশেই। কোথাও একটা ফোন করা দরকার। টেলিফোন বইয়ে ইন্ডিয়ানদের কোনও সংস্থার নম্বর যদি পাই, তাহলে সেখানে ফোন করলে কি তারা হেল্প করবে? কিন্তু সবার আগে কিনতে হবে ঐ কার্ডটা। পাশেই কাউন্টার। পাঁচ পাউন্ড মূলের একটা কার্ড কিনলাম। কতগুলো ফোন করতে হবে জানি না। টেলিফোনের লাইনে মিনিট দুয়েক দাঁড়াতেই আমার পালা এল। ফোনবুক খুলে আমি নম্বর খুঁজছি। ইংরিজি ভাষায় অনভস্থ্য আমার চোখ তাড়াতাড়ি পড়তে পারে না। দু একটা নম্বর পাচ্ছি বটে, কিন্তু সাহস পাচ্ছি না ফোন করবার। এদিকে আমার পেছনে যারা কিউয়ে, তারা অধৈর্য হচ্ছে। ফোনকার্ড ঢুকিয়ে একটা নম্বর ডায়াল করে ফেললাম, কিন্তু কোনও আওয়াজ পাই না।
    আমার পেছনের ভদ্রলোক বুঝে ফেলেছেন যে আমি আনাড়ি। তিনি সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। ফোনকার্ডের ওপরের প্লাস্টিকের কভার তিনিই খুললেন, নম্বর তিনিই ডায়াল করলেন, ফোন বেজে গেল, বেজেই গেল। কেউ ধরল না।
    আমি কার্ড ফেরৎ নিয়ে ক্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি— তুই শালি মাইয়া মানুষ, পুরুষের সমান হতে চেয়েছিস? সাহস তো কম নয় তোর! রাস্তায় থাকবার মত সাহস আছে? 
    এদিকে ঐ ভদ্রলোকটির ফোন কল শেষ, তিনি চলে যাচ্ছেন দেখে মরিয়া হয়ে ভাঙা ইংরিজিতে বললাম , আমি পেমব্রীজ গার্ডেন্স যাব। কেমন করে সেখানে যেতে হয়?
  • জয় | 82.1.126.236 | ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:৫৯735220
  • @সে
    এতো বই হিসেবে পাবলিশ করার মতো মেটিরিয়াল! আর লেখার স্টাইল?! আমি মুখ্যুমানুষ- কিন্তু দারুন লাগছে!
    কথা দিচ্ছি সামনের উইক এন্ডের আগে আর তাগিদা দেব না।
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:58cd:52ad:cce8:28af | ২৬ ডিসেম্বর ২০২১ ০৫:০৮735224
  • সাদা চামড়ার সেই সাহেব ভদ্রলোক একটু দাঁড়ালেন আমার প্রশ্ন শুনে। ঝপ করে পকেট থেকে বের করলেন আন্ডারগ্রাউন্ডের একটা ভাঁজ করা ম্যাপ। সেটা খুলে দ্রুততার সঙ্গে বের করে ফেললেন কীভাবে কোন কোন রুটের আন্ডারগ্রাউন্ড দিয়ে আমি পৌঁছতে পারব গন্তব্যে। প্রথম ট্রেনে উনি আমার সঙ্গেই উঠলেন এবং নিজে নেমে যাবার আগে আমায় বলে দিলেন যে আরও দুটো স্টেশন পরে আমাকে নেমে গিয়ে অন্য ট্রেন ধরে কোথায় নামতে হবে। শুধু এটুকুই নয়, নেমে যাবার মুহূর্তে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেলেন সেই মূল্যবান ম্যাপটিও।
    ওনার নির্দেশ মনে রেখে যখন আমি গন্তব্যে পৌঁছলাম তখন রাত নটার বেশিই বেজে গিয়েছে। আন্ডারগ্রাউন্ডের স্টেশন প্রায় ফাঁকা। বেরোনোর মুখে আন্ডারগ্রাউন্ডের এক কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করলাম পেম্ব্রীজ গার্ডেন্স কি কাছেই? বাংলাদেশ সেন্টার খুঁজছি আমি।
    কর্মচারীটি আমাকে আপাদমস্তক দেখে জিজ্ঞাসা করলেন নিখাদ উর্দুতে — আপ বাংলাদেশি হেঁ?
    বলে কীরে লোকটা? আমার চমকানোর পালা। আমি তো লোকটাকে সাহেব ভেবেছি! হ্যাঁ এখন নজর করলে বোঝা যাচ্ছে বটে তার মাথাভর্তি কুচকুচে কালো চুল, কালো ঘন চওড়া ভুরু এবং কালো গোঁফ। 
    — নো। আই অ্যাম অ্যান ইন্ডিয়ান। 
    — আই সী।
    এরপর টুকটাক দুটো একটা কথা। উনি পাকিস্তানি ব্রিটিশ। আমি বাসস্থান খুঁজছি জেনে বললেন, আপনি যান গিয়ে দেখে আসুন, জায়গা না পেলে আমি তো রয়েইছি। একটু পরেই আমার ডিউটি শেষ হবে। মিনিট পনেরোর মধ্যে ফিরে এলে আমাকে পাবেন। আমি আপনাকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাব।
     
    যাক বাবা, মনে একটু ভরসা পেলাম। জায়গা না পেলেও তেমন চিন্তা নেই, হাতের পাঁচ তো রইলই, দৌড়ে গিয়ে বাড়িটা খুঁজে দেখে নিই, কত নম্বর বাড়ি বলেছিল যেন? কুড়ি নাকি বাইশ? 
    আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বেরিয়ে রাতের লন্ডনের খোলা আকাশের নীচে এই প্রথম পা রাখলাম।
    ওমা! এতো দেখি খুবই সরু রাস্তা। সোভিয়েত দেশের গলিগুলোও এর চেয়ে চওড়া হয়। একটু এগিয়ে পা চালিয়ে ফাঁকা রাস্তায় বাড়িটা খুঁজে বের করতে তিন মিনিটও লাগল না। দরজায় কলিং বেল টিপলাম। পরিস্কার লেখা রয়েছে বাংলাদেশ সেন্টার। একদম সঠিক ঠিকানা। কিন্তু কোনও সাড়া শব্দ নেই। পাশেই একটা জানলা, ভেতরে আলো জ্বলছে। আবারও বেল বাজালাম, কেউ দরজা খোলে না। জানলাটা একটু উঁচুতে, টোয়ের ওপর ভর করে উঁকিঝুঁকি মেরে কিছুটা লাফিয়ে দেখবার চেষ্টা করলাম ঐ ঘরে কেউ আছে কিনা।
    আছে। অন্ততঃ দুজনকে দেখা গেল। বোধহয় ক্যারম খেলছে। জানলা টাইট করে বন্ধ করা, আমি চেঁচালেও শুনতে পাবে না। ভেতরে আলো, বাইরে অন্ধকার, তারা আমাকে দেখতেও পাচ্ছে না। তাহলে কি আমি আবার ফিরে যাব স্টেশনে? পনেরো মিনিট সময় ছিল আমার হাতে। কতটুকু কেটে গেছে জানি না।
    ঐ পাকিস্তানি ভদ্রলোকটি চলে গেলে আমি কিন্তু সত্যিই ঝামেলায় পড়তে চলেছি। দ্রুত রাস্তা পার হয়ে আমি প্রায় দৌড়তে লাগলাম আন্ডারগ্রাউন্ডের দিকে।
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:58cd:52ad:cce8:28af | ২৬ ডিসেম্বর ২০২১ ০৬:৫৬735228
  • স্রেফ অ্যাডভেঞ্চারের ঝোঁকে অমন অপরিকল্পিত ট্যুর ঐ ২৪ বছর বয়সেই সম্ভব। দৌড়তে গিয়ে হাঁফাচ্ছি যেহেতু পিঠের ব্যাগটা খুব ভারি এবং সেই বিকেলে একটু জল খেয়েছিলাম, তেষ্টা পেয়েছে বুঝতে পারছি, দৌড়তে গিয়ে বুঝলাম গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, যদিও তার কতটা তেষ্টায় আর কতটা উত্তেজনায় বলা মুশকিল।
    লোকটার নাম ঠিকানা কিছুই জানি না, চেহারাটা অল্প মনে আছে, তাকে গিয়ে বলি বরং — আপনার বাড়িতে আমায় আজ রাতটুকু থাকতে দিন, কাল সকালে আমি চলে যাব। 
    দৌড়তে দৌড়তে স্টেশনের কাছটায় আসতেই দেখি সেই পাকিস্তানি ভদ্রলোক বাইরে দাঁড়িয়ে। ধড়ে প্রাণ এলো। 
    ওনার মুখে হাসি।
    — অ্যাড্রেস খুঁজে পেলেন না?
    — পেয়েছি। তবে কেউ দরজা খোলে না। হয়ত ওদের অফিস আওয়ার পেরিয়ে গেছে।
    — চলুন আমার সঙ্গে, আবার গিয়ে দেখি। 
    এবার আমরা দুজনে গেলাম সেখানে এবং ভাবতে অবাক লাগে যে বেল টিপবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন মধ্যবয়সী মানুষ, কৌতুহলী চোখে আমাদের দেখে নিয়ে জানতে  চাইলেন কী ব্যাপারে আমাদের আগমন। প্রশ্ন ইংরিজিতে কিন্তু আমি উত্তর দিলাম বাংলায়।
    — প্ল্যান না করেই এসে পড়েছি, রাতটার জন্য থাকার ব্যবস্থা নাই।
    — এখানে তো কেবল স্টুডেন্টদের জন্য অ্যাকোমোডেশন।
    — আমি ও স্টুডেন্ট। আইডেন্টিটি কার্ড আছে, দেখাবো?
    — না না, ওসব দেখিয়ে কী হবে? এখানে বেটাছেলেদের ডর্মিটরি, সেখানে আপনি কী করে শোবেন? অন্য কোনও রুম ফাঁকা নাই।
    — তাহলে কী হবে? আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তাহলে এনার (ঐ পাকিস্তানি ভদ্রলোককে দেখিয়ে) বাড়িতে আজ চলে যাই,  কদিন পরে যদি রুম খালি হয় তাহলে ...
    আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বাংলাদেশ সেন্টারের ভদ্রলোকটি বললেন, এ কে? আপনি চিনেন একে? একে তো চেনা চেনা লাগে।
    — আমি একে চিনি না, মানে রাস্তায় আলাপ হলো।
    — আপনি ভিতরে গিয়ে বসেন।
    ওদের দুজনের মধ্যে ইংরিজিতে বাক্যালাপ হলো, ঐ অ্যাকসেন্ট বোঝা আমার মতো বাংলা মিডিয়ামে পড়া মেয়ের পক্ষে অসম্ভব। তবে বাক্যালাপ যে মধুর হচ্ছিলো না সে ব্যাপারে নিশ্চিত।
    পাকিস্তানি ভদ্রলোকটি আমার উপকার করতে গিয়ে তিরস্কৃত হচ্ছিলেন সেটা বুঝতে বাকি ছিলনা। তাকে বিদায় করে দিয়ে মুরুব্বি ভদ্রলোকটি, যিনি ঐ সেন্টারের ম্যানেজার গোছের কেউ হবেন, বসবার ঘরে এসে আমাকে প্রথমেই খুব বকাবকি করলেন।
    — কোন আক্কেলে আপনি একটা পাকিস্তানির সঙ্গে চলে যাচ্ছিলেন?
    এসব ক্ষেত্রে নীরব থাকতে হয়। নীরব রইলাম।
    — এভাবে হুটহাট করে চলে আসছেন, মাইয়া মানুষ, একটা ব্যবস্থা না করে আসতে হয়? 
    ফের চুপ রইলাম।
    একটা ফোন এলো। কনভারসেশনের অর্ধেক শোনা গেল।
    — স্লামালেকুম কাজী সায়েব।... এখন আসতেছেন? আচ্ছা। ... ফ্লাইট কটায়? .... অবশ্যই যাবে, রেডি আছে তো। ইনশাল্লাহ। ... আচ্ছা একটি মেয়ে এখানে অ্যাকোমোডেশনের জন্য আসছে ... সেইটাই তো সমস্যা... দেখেন আপনার ওখানে যদি... আলহামদুলিল্লাহ তাহলে তো আর কোন কথাই হয় না। আপনি আসেন ট্যাক্সিতে আসছেন তো?
     
    ফোন কল শেষ হলে উনি আমার দিকে ফিরে বললেন আপনার অ্যাকোমোডেশনের জন্য একটা ব্যবস্থা হচ্ছে।
     
    আমি মৃদুস্বরে থ্যাংকিউ বলতে গিয়ে দেখলাম গলা শুকিয়ে কাঠ। মেঝেয় নামিয়ে রাখা পিঠব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে আদি অকৃত্রিম কায়দায় দাঁতের সাহায্যে বোতলের ছিপিটা খুলতে যাব, ম্যানেজার হুংকার দিয়ে উঠলেন— হ্যান্ডস্ আপ!
     
  • হ্যান্ডস্ আপ! | 2600:1002:b007:3209:f5bb:df5c:ce3f:998 | ২৬ ডিসেম্বর ২০২১ ১৭:১৬735231
  • বাপ্পো! 
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:4077:d942:e3d8:637 | ২৭ ডিসেম্বর ২০২১ ০৩:৫৭735232
  • এ তো যাকে বলে গর্জন! চমকে যাবার মতো সিচুয়েশন। বোতলের ছিপি খোলা তো দূরে থাক, হাত থেকে স্লিপ করে সেই গ্যাস ভর্তি মিনারাল ওয়াটারের হাফ লিটারের মোটা কাচের বোতল গাপ্ শব্দ করে পড়ল কাঠের মেঝের ওপর। আড়াই ফুট মতো হাইট থেকে পড়েছিল বলে জিনিসটা বার্স্ট করল না, ভাঙলও না ভাগ্যক্রমে, এবং এঁকেবেঁকে গড়িয়ে কিছুদূর গিয়ে একটু ঘুরে স্থির হলো।
    বিরাট একটা দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল যেটা যিনি হুংকার দিয়েছিলেন তাঁর পক্ষে অনুধাবন করা অসম্ভব। হায় রে, ইনি কেমন করে জানবেন, যে এই স্ট্যান্ডার্ড বোতলেই বিশ্ববিখ্যাত মলোতভ ককটেল বোমা বানানো হয়ে থাকে। সারা সোভিয়েত দেশেই এটা স্ট্যান্ডার্ড হাফ লিটারের বোতল। এই বোতলেই বিক্রি হয় জল, বিয়ার, ভোদকা, যাবতীয় লেমনেড, জুস ইস্তক কী নয়? এ জিনিস একবার ভাঙলে খবর আছে। বিরাট বাঁচা বেঁচে গেলাম। 
    ঐ হুংকার গর্জনের শব্দে ধুপধাপ শব্দ করে পাশের ঘরের ক্যারাম খেলোয়াড়েরাও এসে উপস্থিত। আমি পিটপিট করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, তবে হাত দুটো নীচেই কোলের ওপর নামানো। বোতলাটা এখনও যদি ফেটে যায় সেই আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু আমাকে লোকটা ওরকম ধমকালো কেন?
    লোকটা সন্তর্পনে বোতলের দিকে এগিয়ে গেল। একটু ঝুঁকে দেখল জিনিসটাকে। এবার আমার দিকে ফিরে বলল, ঐ বোতলের মধ্যে কী?
    — জল।
    — কী?
    আমার গলা থেকে প্রথমবার জোরে আওয়াজ বের হয় নি।
    এবার আরেকটু জোরে বললাম — জল!
    — পানি? কাচের বটলে পানি?
    — হ্যাঁ, মিনারেল ওয়াটার।
    — কাচের বটলে পানি! 
    — আপনার পাসপোর্ট দেখান।
    আমি ব্যাগ খুলে পাসপোর্ট খুঁজতে লাগলাম। তিনি এবার আমার ব্যাগের মধ্যে ঝুঁকে পড়লেন। ভেতরে আরও অনেক বোতল দেখা যাচ্ছে। পাসপোর্টটা অনেক ভেতরে ঢুকে নীচে পড়ে গেছে। কয়েকটা বোতল বের করে না নিলে খুঁজতে অসুবিধে হচ্ছে। খেলোয়ারেরাও এগিয়ে এসে ঝুঁকে জায়গাটা অন্ধকার করে দিচ্ছে। খাকি রঙের ক্যানভাসের পিঠব্যাগ থেকে গোটা চারের বোতল বের করে করে পাশাপাশি দাঁড় করে রাখছি আর মাথার ওপরে শুনতে পাচ্ছি হুশহাশ শব্দের উত্তেজনাময় নিঃশ্বাস। 
    পাসপোর্টটা বের হলো। হারউইচের ইমিগ্রেশনেও এতটা ঘাবড়াই নি। সারেন্ডার করার ভঙ্গিমায় পাসপোর্ট তুলে দিলাম ম্যানেজারের হাতে। নেভি ব্লু রঙের পাসপোর্টটির ওপর টুকু দেখেই তিনি প্রতারিত হবার সুরে বললেন — আপনি ইন্ডিয়ান!
     
    কী উত্তর দেব এর আমি? নিজেকে ব্রুটাসের মত লাগল। কাঁচুমাচু হয়ে মরমে মরে যাবার মত অবস্থায় চুপ করে রইলাম। সারা ঘরে স্তব্ধতা।
     
     
  • Amit | 203.47.112.162 | ২৭ ডিসেম্বর ২০২১ ০৯:৩৪735233
  • কিন্তু এতগুলো আখাম্বা সাইজ র জলের বোতল নিয়ে যেতে হয়েছিল কেন ? 
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:f43e:d209:536a:cbdd | ২৭ ডিসেম্বর ২০২১ ১১:৪৩735234
  • ম্যানেজার এবার পাসপোর্ট খুলে একটু দূর থেকেই ফোটো ও মানুষে মেলাচ্ছেন বুঝতে পারছি। অন্য পাতাগুলো চেক করছেন, আমি যুগপৎ ম্যানেজার ও খেলোয়াড়দের দেখছি। তাদের চোখে কৌতুহল, সন্দেহ, ইত্যাদি নানারকমের চাউনি।
    ওদের মধ্যে একজনকে নির্দেশ দিলেন ম্যানেজার — যাও পাসপোর্টটার ফোটোকপি করে আনো।
    সে বাধ্য বালকের মতো পাসপোর্ট নিয়ে ভেতরে কোথাও একটা চলে গেল।
    নীরবতা ভঙ্গ হওয়ায় একটু সাহস পেয়ে আমি টুক করে বোতলটা কুড়িয়ে নিয়েই দ্রুত দাঁত দিয়ে চেপে ছিঁক করে ছিপিটা খুলেই গ্লুক গ্লুক করে কয়েক ঢোক জল খেয়ে নিলাম।
    ম্যানেজার তখন আমাকে "স্টপ স্টপ" বলে থামাতে চাইছেন, কিন্তু নাহ জল আমাকে খেতেই হবে। আগে তো প্রাণে বাঁচি, তারপর এদের সঙ্গে বোঝাপড়া। পাসপোর্ট কপি করতে নিয়ে গেছে, নিক, ফেরৎ আনবেই, এরা থাকার ব্যবস্থা করে দিলে ভালো, নাহলে দেখা যাবে অন্য কোনও উপায় করা যায় কি না।
    — আপনার বটলে ওটা পানি, না অ্যালকোহল?
    — পানি। খেয়ে দেখুন, পানি।
    — কাচের বটলে কেন?
    আমি এই প্রশ্নের মানেই বুঝতে পারলাম না। সীল করা জলের বোতল, তার লেবেলের ওপরেও মিনারাল ওয়াটার লেখা রয়েছে, যদিও ইংরিজিতে নয়, রাশিয়ানে, গন্ধ নেই, সে জিনিসকে খামোখা এরা মদ বলে সন্দেহ করছে কেন? এরা কি পাগোল? একঘর লোকের মধ্যে অচেনা জায়গায় বোতল খুলে ঢকঢক করে নীট মদ খেয়ে নেব এরকম তাগড়া পালোয়ান মনে হচ্ছে নাকি ওদের আমাকে দেখে? দিব্যি সালেয়ার কামিজ পরা রোগা পাতলা নিরীহ চেহারার মেয়ে আমি, হাফ বোতল মদ এক টানে খেয়ে ফেললে তো মাথা ঘুরে পড়ে যাব! মদ সম্পর্কে এদের দেখছি কোনও ধারণাই নেই। আমি প্রশ্নের উত্তর দেবার বদলে আরও খানিকটা জল খেয়ে নিলাম। আ হ! এতক্ষণে তেষ্টাটা মিটল।
    ভেতর থেকে এর মধ্যে একজন একটা কাচের গেলাস এনে দিয়েছে। সে একটু নরম স্বরে বলল — নেন, গ্লাসে ঢেলে খান।
     
    বোতলে অল্প কিছু জল অবশিষ্ট আছে, ওটুকু এখন খাওয়া যাবে না, তবু গ্লাসে ঐ জলটুকু ঢেলে দিলাম। মনে মনে ভাবছি, আমি চলে গেলে ঐ জল পরীক্ষা করে দেখে নিক, ওটা জল না মদ। 
    এবার অন্যরকম জেরা।
    —  আপনাকে তো বাংগালি ভাবছিলাম।
    — বাঙালিই তো।
    — কিন্তু আপনি তো বলেন নাই যে আপনি ইন্ডিয়ান।
    — না, তাতো বলবার সুযোগই পেলাম না।
    — আমরা তো মনে করছি আপনি বাংলাদেশি
    — ওহো। সরি। আমি কিন্তু সেটা বলিনি।
    — সেটা মেনশন করেন নি ... ঠিক আছে...
     
    কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজী সায়েব এসে গেলেন, ট্যাক্সিতে নয় অবশ্য, একজনের  নিজস্ব গাড়িতে। এখান থেকে একজন যাবে কাজী সাহেবকে এয়ারপোর্টে সী অফ করতে। আমারও ওনার বাড়িতেই থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল টেলিফোনে। তারপরে তো জলের বোতল ও পাসপোর্ট কাণ্ড ঘটল।
    কাজী সাহেব আমার দিকে ফিরতেই ম্যানেজার বলে উঠলেন — একটা গ্যাঞ্জাম হৈছে। মেয়েটা ইন্ডিয়ান।
    কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করে নিয়ে কাজী সাহেব বললেন — অসুবিধা নাই।
    তারপর আমার দিকে ফিরে — কয়দিন থাকবেন আপনি?
    — বেশি না, অল্প কদিন, ছুটিতে বেড়াতে এসেছি।
    আমাকে একটু সাইডে নিয়ে গেলেন কাজী সাহেব। 
    — দেখেন, আমি একটু পরে ফ্লাই করছি। কদিন পরে ফিরব। হজ করতে যাচ্ছি। চিন্তা নাই আমার ফ্যামিলির সঙ্গে থাকবেন। আপনাকে ড্রপ করে তারপর এয়ারপোর্ট যাব। 
    — অনেক ধন্যবাদ। আপনাকে যে কী বলে...
    — কিছু না। আল্লাহর রহমতে সব আছে আমার। আপনার কাছে কত পাউন্ড আছে? 
    — আছে, ষাট পঁয়ষট্টি মত হবে। জাহাজে চেঞ্জ করলাম।
    — মাত্র?
    — না না, ডলারও আছে।
    — তাই দেন।
    — কত দেব? একশো দিই? 
    — দেন।
    ব্যস আমার থাকার ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেল লন্ডনে। আর কী চাই? পাসপোর্ট পেয়ে গেলাম। ঐ গাড়িতেই পৌঁছে গেলাম কাজী সায়েবের বাড়ি। কেনসিংটন সাউথ ওয়েস্ট। ঘ্যামা পাড়া। রাস্তার আলোয় সার দেওয়া বনেদি ফ্যাশনের ধবধবে শাদা বাড়ি।
    আমাকে দোতলার অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে দিয়েই ওনারা ছুটলেন হিথরোর দিকে। হজে যাওয়া পুন্যের কাজ, সম্ভবত সেইজন্যই উনি শরণাগতকে ফিরিয়ে দেন নি। সে বিধর্মী এবং বিদেশী জেনেও।
    সুবিশাল অ্যাপার্টমেন্ট। রাত অনেক। আমাকে একটা ঘরে থাকতে দেওয়া হলো। ঘরটা কাজী সাহেবের বড়ো মেয়ে মরিয়মের। আব্বা যতদিন না হজ করে ফেরে, থাকবে পাশের ঘরে মায়ের সঙ্গে। আরও অনেক সন্তান কাজী সায়েবের। ছোট ছোট বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে। বড়ো ছেলে মনিরুল তখনও বাড়ি ফেরে নি।
     
     
  • Kausik Gh | ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১৫:৩৬735239
  • কি ভয়ঙ্কর দুষ্টুমি বুদ্ধি !!
    আমি দু'চারদিন পর পরই প্রিয় লেখা গুলো চেক করি, পরের পর্ব বেরোলো কিনা। শুধু মাথাটা দেখে ছেড়ে দিই। আজ কি মনে হলো মন্তব্যের অংশ পর্যন্ত নামলাম, ওব্বাবা, আপনি এইখানে মন্তব‍্যের মধ‍্যে সব নামিয়ে রেখেছেন !
    বেশ হয়েছে, পাইলট হবার ব‍্যর্থ চেষ্টা, বাংলাদেশ হাইকমিশনে ঢুকতে না দিলে কোথায় থাকবো তার টেনশন, বেশ হয়েছে। 
    জলের বোতলটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেলো না কেন ? বেশ সুন্দর কুচিকুচি কাচ গোটা ছড়িয়ে পড়তো, অশান্তি আরো বাড়তো। এরকম দুষ্টুবুদ্ধির ঐরকমই হওয়া উচিৎ ছিলো।
  • Kausik Gh | ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১৫:৪৩735240
  • **কাচ গোটা ঘরে ছড়িয়ে পড়তো...
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:b08f:3cad:2d90:8ab0 | ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১৮:১১735241
  • সবটাই তো সত্য ঘটনা। বোতল ভাঙে নি। :-)
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:b08f:3cad:2d90:8ab0 | ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১৮:২৪735242
  • আগের পোস্টগুলোয় দুটো জিনিস ভুল লেখা হয়েছে। এখন মনে পড়ায় শুধরে দিচ্ছি।
    ১) আমার সঙ্গে রুকস্যাকে বাইরের পোশাক ছিল দুটো। একসেট সালোয়ার কামিজ ও একসেট শাড়ি-শায়া-ব্লাউজ।
    ২) বড়ো নয়, মেজছেলে মনিরুল।
     
    বাকি লেখা ধীরে ধীরে আসবে।
  • Kausik Gh | ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৭:৫৭735245
  • ধীরে ধীরে আসুক, কিন্তু পর্ব ২, পর্ব ৩, এইভাবে আসুক। পড়তে সুবিধা হয়।
  • জয় | 82.1.126.236 | ৩০ ডিসেম্বর ২০২১ ০৩:১৬735265
  • @কৌশিক
    অ্যাতো বায়না কি ভালো? লুচি চাই। পায়েস চাই। সেটা নলেন গুড়ের হতে হবে। পিঠে শীতের রোদ চাই। রেগুলার লেখা চাই। তাও পর্বে পর্বে?! ঃ)))
    লেখককে কোথায় আপনি তুষিয়ে পুষিয়ে রাখবেন! তা না...
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:c72:40f8:1f40:54a3 | ০৩ জানুয়ারি ২০২২ ০৮:০১735295
  • পরের দিন সকালে ঘুম ভেঙেছে দেরিতে। ঘরে জানলা আছে কিন্তু ভারি পর্দা দিয়ে ঢাকা। সে পর্দা ভেদ করে আলো আসছে বটে, কিন্তু পর্যাপ্ত নয়। খাটটা বড়ো হলেও তার অর্ধেক ভরে আছে ডাঁই করা জিনিসপত্রে। বাকি অর্ধেক আমার শোবার জায়গা। আরও আলমারি দেরাজ ইত্যাদিতে ঘর ভর্তি। ঘুম খুব ভাল হয়েছে।
    প্রথমেই উপলব্ধি হলো যে আমি লন্ডনে! ভাবা যায়?
    প্রায় আঠারো বছর আগে, আমরা দুইবোন তখন খুব ছোট, আমার মায়ের লন্ডনে যাওয়া ঠিক হয়ে গেছল, যদিও শেষে যাওয়া হয় নি। সে সময়ে আমাদের আত্মীয় পরিজনেরা খুব বাধা দিয়েছিল তার বিলেত যাওয়া ঠেকাতে। আমরাও ঐ বয়সে এসব বুঝতাম না, আমাদেরও বোঝানো হয়েছিল — ঐ দ্যাখ মা তোদেরকে ছেড়ে বিলেত চলে যাচ্ছে, মাকে ঠেকা, মাকে যেতে দিস না। আঁকড়ে ধরে রাখ।
    আঁকড়ে ধরে রাখতে হয় নি অবশ্য। পরপর দুজন নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু হলো, মায়েরও আর সময় রইল না গবেষনার কাজ কন্টিনিউ করবার। সে সময়ে আমরা সবাই বেশ খুশি হয়েছিলাম সেই বিলেতযাত্রা বন্ধ হবার জন্য।
    ঘুম থেকে উঠে এসব কথাই ভাবছিলাম শুয়ে শুয়ে।
    সবাই তখন বলত — ওহ কী আহ্লাদ! দুটো কচি কচি বাচ্চাকে ফেলে রেখে বিলেত যাবে! সখ কত।
    আজ আঠারো বছর পরে আমার মন মানসিকতা একশো আশি ডিগ্রী ঘুরে গেছে। হয়ত এমনটা হতেই পারত না, যদি না আমি সোভিয়েত দেশে পড়তে যেতুম, যদি না অল্প বয়সে ঘর ছেড়ে দুনিয়াটাকে দেখতে বেরোতুম। হয়তো আমি আগের মতই রক্ষনশীল থাকতুম। কে জানে!
    ভাবলাম, মাকে খবরটা এক্ষুনি দিলে কেমন হয়? কিন্তু কেমন করে জানাবো? কোলকাতায় তো আমাদের বাড়িতে টেলিফোন নেই। টেলিগ্রাম করব? নাহ, টেলিগ্রাম পেলে লোকে ভয় পায়। তাহলে একটা পোস্টকার্ড পাঠিয়ে দিই বরং। রাণীর ছবিওলা স্ট্যাম্প মারা পোস্টকার্ড। বেশ হবে। মা কার্ড দেখে চমকে উঠবে।
     
    দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন এমন সময় গৃহকর্ত্রী।
    — ঘুম ভাঙল আপনার?
    আমি হাসিমুখে উঠে বসলাম। গৃহকর্ত্রী নিজের পরিচয় দিলেন, আমার নাম মনোয়ারা। আমার স্বামী তো কাল হজ করতে চলে গেছেন।
     ঘরে এবার ঢুকল একটি শিশু। বছর দুয়েক বয়স হবে। 
    — এই আমার ছোট ছেলে। জহির।
    শিশুটি মিষ্টি হেসে দৌড়ে ঘরের বাইরে চলে গেল। তারপর বাইরে থেকে উঁকি মেরে বলল, আম্মা, আম্মা, ফাকিউ!
    মনোয়ারা আমাকে কী যেন একটা বলতে যাচ্ছিলেন,  পেছন ফিরে দরজার দিকে তাকাতেই জহির লুকিয়ে পড়ল। আবার উঁকি মেরে বলল, ফাকিউ, আম্মা ফাকিউ!
    মনোয়ারা হেসে কুটিপাটি। আমাকে বললেন — উহ কী দুষ্টামি যে করে না বাচ্চাটা! গালি দেয়, ইংরাজিতে!
    জহির আবার বলল — ফাকিউ!
    মনোয়ারা কোনোমতে হাসি থামিয়ে বললেন, জহির সরি বলো। সরি বলো।
    আমার দিকে ফিরে হাসতে হাসতে বললেন — খুব দুষ্টামি শিখেছে, ইংরাজিত্ গালি দেয়, বুঝলেন?
     
     
     
  • | ০৩ জানুয়ারি ২০২২ ১০:৪৫735307
  • উফ্ফ! 
    মনোয়ারা বোধহয় ইংরিই জানেন না তেমন তাই না? 
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:c72:40f8:1f40:54a3 | ০৩ জানুয়ারি ২০২২ ১০:৪৯735308
  • হুঁ। লিখছি...
  • সে | 194.56.48.111 | ০৩ জানুয়ারি ২০২২ ১৩:১৮735310
  • সেদিন বাইরে বের হতে হতে একটু বেলা হয়ে গেল। গতরাতে হুশ করে গাড়িতে এসেছি রাস্তাঘাট কিছুই চিনি না, এমনকি এই বাড়ির ঠিকানা অবধি জানি না। তাই অল্প হেঁটে ঘুরে জায়গাটাকে চিনে রাখতে হবে। আর একখানা পোস্ট্কার্ড অবশ্যই ফেলে দিতে হবে ডাকবাক্সে। মনোয়ারা আমাকে চিনিয়ে দেবেন পোস্টঅফিস। কিন্তু উনি আমায় বাইরে বের হতে দিতে চান না, খালি গল্প করতে চান। আমি কি ওঁর সঙ্গে গল্প করব বলে এসেছি নাকি? আমার কাছে প্রত্যেকটা মুহূর্ত দামি। প্রত্যেকটা দিনে আমি যেন শুষে নিতে চাই এই শহরটাকে, কাছকাছির মধ্যে এই দেশটার যা যা আছে দ্রষ্টব্য। যতটা সম্ভব আমার সীমিত সামর্থে, তার এতটুকুও যেন বাদ পড়ে না যায়। অথচ আমি কিন্তু ভালো করে জানিই না কী কী দেখার আছে এই শহরে।
    প্রায় দুপুর হয়ে গেল বের হতে হতে। মনোয়ারা আমাকে পোস্টঅফিস দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলেন ওঁর ছোটমেয়ে মর্জিনাকে ইস্কুল থেকে আনতে। মর্জিনার এই সময়েই ছুটি হয়। সে কিন্ডারগার্টেনে পড়ে। বাড়ির উল্টোফুটেই একটা ইস্কুল দেখেছিলাম, মার্লবরো প্রাইমারি স্কুল, ঐ নামের একটা একটা সিগারেটের ব্র্যান্ড দেখেছি, তবে বানান আলাদা। মর্জিনা সেই ইস্কুলে পড়ে না, তার ইস্কুল একটু দূরে। পথে যেতে যেতে উনি বলছিলেন ওঁর চার ছেলে, দুই মেয়ে। বড়ো ছেলের ইস্কুলের পড়া শেষ, বাকিরা সকলে ইস্কুলে পড়ে। শরিফুল, মনিরুল, নজরুল ও জহিরুল; প্রত্যেকের নামের শেষে ইসলাম।
    আমি সারাটা দিন নানান রাস্তায় ঘুরলাম। সেই ম্যাপখানা খুব কাজে দিচ্ছিল।
    হেঁটে হেঁটে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে পৌঁছে গেছি। পাঁচটা নাগাদ খিদে এবং তেষ্টা ভালোভাবে জানান দিতে লাগল। ক্লান্ত শরীরে যখন ফিরছি, বৃষ্টি নেমেছে ঝিরঝিরিয়ে। ভিজে বেড়ালের মত চুপসোনো চেহারায় যখন ফিরলাম, দেখি বসবার ঘরে গমগমিয়ে আড্ডা বসেছে। রুকস্যাকে কিছু সুখারি (শুকনো টোস্ট বিস্কুট গোছের খাবার) ছিল, বের করতে গিয়ে দেখি বোতলগুলো নই। সবকটা বোতল জলের নয়, কয়েকটার মধ্যে ছিলো রাসবেরির জুস। সেরেছে! এরা কি মদ ভেবে বোতলগুলো ফেলে দিলো নাকি? কিন্তু আমার ব্যাগের ভেতরে তো ছিল বোতলগুলো, ওরা কি আমার ব্যাগ ঘেঁটেছে নাকি?
    অগত্যা আমি রান্নাঘরের দিকে এগোলাম, জল খেতে হবে।
    আমাকে দেখে মনোয়ারা এগিয়ে এলেন - আপনাকে খাবার দিই?
    আমি তাজ্জব বনে গেছি। থাকার সঙ্গে খাওয়াও ইনক্লুডেড নাকি? মুখে কিছু বলছি না। প্রচণ্ড ঝাল কিমার তরকারি এবং ভাত। ঝালের চোটে হেঁচকি উঠতে লাগল। ঘরে এসে ঢুকল মরিয়ম, ক্লাস সেভেনে পরছে সে, তার হাতে ধরা রাসবেরি জুসের বোতল, খানিকটা খেয়েছে, আরও খাচ্ছে। আমাকে দেখে বলল - আই লাইক দিস জুস।
    আমি সবিনয়ে হাসলাম। মনে মনে বললাম, ভালই হলো, তোমরা আমার ব্যাগ ঘেঁটে পছন্দের জিনিস যা নিয়েছো নাও, আমাকে আশ্রয় দিয়েছো, খেতেও দিলে, এমন জানলে আমি আরও কিছু বোতল বয়ে আনতাম।
    বসবার ঘরে ঢুকে দেখি একজন ত্রিশোর্ধ ভদ্রলোকও সেখানে রয়েছেন। কথায় কথায় জানা গেল ইনি এদের আত্মীয় নন, পূর্বপরিচিতও নন, ওঁর পরিচয় - উনি আরেকজন বাঙালি যিনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন এখানে ভাগ্যান্বেষণে। তিনচারমাস কি আরও বেশি সময় ধরে উনি এই অ্যাপার্টমেন্টেই রয়েছেন এদের অতিথি হয়ে, আমার মতো পেয়িং গেস্ট না। ভদ্রলোকের জন্ম হয়েছিল লন্ডনেই, পাকিস্তান আমলে। জন্মসূত্রে ব্রিটিশ পাসপোর্টের অধিকারী, যদিও বিগত ত্রিশ বছর ঢাকাতেই কাটিয়েছেন। ঢাকায় রেখে এসেছেন স্ত্রী ও যমজ কন্যাদের। সঞ্চয় যা ছিলো, সব ফুরিয়েছে, কাজি সায়েবের কাছ থেকে হাতখরচটুকুও নিতে হয়।
    বুঝে উঠতে পারলাম না, কী দরকার ছিলো এরকম রিস্ক নিয়ে মাসের পর মাস বিদেশের মাটিতে পড়ে থাকার!
    পরক্ষণেই মনে হলো, বিদেশ কেন, এটাই তো ওঁর জন্মভূমি, এই দেশেরইতো উনি নাগরিক।
    মনোয়ারা আমার কাছে আবদার করেন, আপনি আমাদের মেয়েদুটোকে একটু বাংলা শিখিয়ে দেন না।
    মনোয়ারা বুঝতেই পারেন না আমি বেড়াতে এসেছি, উনি কেবলই ভাবেন আমি এখানে থেকে যেতে এসেছি। বারবার বুঝিয়ে বললেও একটু পরে ভুলে যান।
    ঐ অতিথি ভদ্রলোকের নাম আকন্দ। কথায় কথায় বললেন উনি ক্যারাটের ব্ল্যাক বেল্ট।
    ক্যারাটে যে মার্শাল আর্ট সেটুকুই জানতাম তখন, বেল্টের রং ব্যাপারে জ্ঞান পুরোপুরি শূন্য।
    মনোয়ারা প্রস্তাব করলেন মিঃ আকন্দকে, আপনারা কাল ঘুরতে যান না, বাচ্চাদের নিয়ে। সম্ভবত পরের দিন ছিল শনিবার।
    আমি তো একপায়ে খাড়া, আনন্দ আর ধরে না। গাইডেড ট্যুর হবে এবার।
    - কে কে যাবে?
    - বড়ো তো যাবে না। নজরুল, মরিয়ম আর মর্জিনাকে নেন। জহির তো একদম ছোটো।
    - মনিরুল যাবে না? ও কোথায়? কখন ফিরল কাল?
    মনোয়ারা চুপ হয়ে থাকেন। মিন মিন করে বলেন - সে অহনো ফেরে নাই।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু প্রতিক্রিয়া দিন