• খেরোর খাতা

  • কাদামাটির হাফলাইফ ২৭

    Emanul Haque লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৬ অক্টোবর ২০২১ | ১৭২ বার পঠিত
    •  
    • #কাদামাটির_হাফলাইফ ২৭  
    • Emanul Haque ইমানুল হক 
    •  
    • তোমার ই পথে পথে বিছায়ে দেব আমার ডালি‌-- এই মনোভাবে আমার গ্রাম পরিভ্রমণ শুরু হল পাঁচ ছ' বছর বয়সে। তার আগে আমার দৌড় ছিল এ-পাড়া সে-পাড়া।  'ডাকঘর' নাটক দেখেছিলাম গ্রামের বিদ্যালয়ে। বড়দা অমল, আমার অকাল প্রয়াতা বলা ভালো পণপ্রথার শিকার হয়ে কার্যত  খুন হওয়া, মেজদি সুধা। 'ডাকঘর'-এ  আমাদের শিশু মনের কথা আছে। (পরে বুঝেছি এটা একটি রাজনৈতিক নাটক)। যাকে দেখি তার মতো হতে ইচ্ছে করে। আইসক্রিমওয়ালা হতে চাওয়া ছিল জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। গরমের দুপুরে এই ছিল স্বপ্ন। তারপর মাথায় চাপল সন্ন্যাসী হওয়ার ইচ্ছা। বিবেকানন্দ ভর করেছিলেন। চার বছর বয়সে এক প্রখর গ্রীষ্মের দুপুরে 'কপালকুণ্ডলা'র কাপালিকের মতো দেখতে এক সন্ন্যাসী আসে। মা দিদিরা ঘুমোচ্ছ। আমি ঘুমের ভান করতাম। যেই দেখতাম ওরা ঘুমিয়েছে আমি পাশবালিশ চাদর চাপা দিয়ে হাওয়া। গরমের দুপুরে চাদর? এটি নিয়ে বলার কিছু নেই, আমার বাবার স্বভাব ছিল কী গ্রীষ্ম কী শীত আপাদমস্তক মাথা চাপা দিয়ে ঘুমানো। তাঁর ছেলের পক্ষে এটা অস্বাভাবিক কি? দেখতেও খানিকটা বাবার মতো। তবে ওই টিকালো তীক্ষ্ণ শরৎচন্দ্রীয় নাক জোটে নি। রঙও কালো। তাই আমাকে কাল্টা বলে ডাকা হতো। আর অন্য ভাইবোনদের মতো সুন্দর নই, স্কুলের পড়াশোনাতেও আগ্রহ নাই, তাই দুপুরে ও রাতে খাওয়ার সময় হাজিরা ছাড়া আর আমার টিকিটি দেখা না গেলেও কারো কিছু যাবে আসবে না।‌ খালি আমার দাদির ছিল আমার প্রতি অসম্ভব টান। কত খাবার বিশেষ করে আলু পোস্ত জামতলায় ঘরের পিছনে নিয়ে গিয়ে খাওয়াতেন, মাকে লুকিয়ে, বলতেন, চাপা স্বরে, কাল্টা তাড়াতাড়ি খেয়ে নে।
    • আমার দাদি অর্থাৎ ঠাকুমা বাবার সৎ মা ছিলেন। কিন্তু সে-কথা তাঁর মৃত্যুর আগে বুঝিনি। ছেলে অন্তপ্রাণ। নিজের সন্তান ছিল না। দুই সৎ ছেলে মেয়েই তাঁর সন্তান। আমার পিসি সায়রাবানুর মতো সুন্দরী। পিসিও আমার বাবার সহোদরা নন।  কিন্তু ভাই বোনে এতো ভাব আমার আর দ্বিতীয়টি চোখে পড়ে নি। বাবা রেগে গেলে ভয়ঙ্করতম। কিন্তু বোনকে একটি কড়া কথাও বলেন নি।
    • আমার মা ও ঠাকুমার সম্পর্ক ছিল খানিকটা ইন্দির ঠাকরুন ও সর্বজয়ার মতো। পুরোপুরি নয়। কারণ ঠাকুমা ছিলেন ধনী। বিরাট সিন্দুকে কিছু সোনাদানা, টাকা ও অন্তত ত্রিশটি মোহর বাবার চোখ এড়িয়ে অবশিষ্ট ছিল। অথবা বাবা চান নি। যদিও সেই মোহর পরে মেলে নি। অন্য একজনের গভ্ভে যায়। পরে বলব সে কথা। আপাতত, সন্ন্যাসীর কথায় ফেরা যাক। সবাই ঘুমোচ্ছে। এদিকে সদর দরজায় সন্ন্যাসী কড়া নাড়ছে। আমাদের শোবার ঘর থেকে সদর দরজা ছিল অন্তত দুশো ফুট দূরে। আমি চাল আলু এনে দিলাম।
    • সন্ন্যাসী আমার মাথায় চিমটা দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, বহুত বড় হবি ব্যাটা। বড়ই তো হতে চাই। দাদার জুতো পরে বলি, দেখো তো বড়ভাই মনে হচ্ছে না!
    • অভিভূত আমি বাটি নামিয়ে ছুটলাম সন্ন্যাসীর পিছু পিছু।
    • তখন দামোদর নদের ওপর সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। এক একটা থাম তৈরি হচ্ছে আর পড়ে যাচ্ছে। চারদিকে কানাঘুষা সাতটা ছেলের রক্ত চায় নদী। নাহলে ব্রিজ হতে দেবে না। ছেলের সন্ধানে গ্রামে গ্রামে নাকি ছেলেধরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাঁধে বিরাট ঝোলা নিয়ে।
    • সন্ন্যাসীর কাঁধেও বিরাট ঝোলা ছিল। আমার খুব ইচ্ছে হল, সন্ন্যাসী আমাকে ঝোলায় পুরে নিক। একটু রক্তই তো নেবে। কতবার কত রক্ত বেরিয়েছে। ঝোপেঝাড়ে পড়ে। লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে।   ভাবখানা মনে, কত ঘুরতে পারবো সন্ন্যাসীর সঙ্গে।
    •  
    •  সন্ন্যাসী আমাকে কিছু বললেন না। আর কারো ঘরে ভিক্ষাও চাইলেন না। চললেন হেঁটে। 
    • আমি চলেছি হ্যামলিনের বাঁশির ইঁদুরের মতো। 
    • গ্রাম ছেড়ে দখিনপাড়ার মাঠে পড়ব এমন সময় একজনের আবির্ভাব।
    • সে গিয়েছিল আমার খোঁজে। 
    • কারণ সকালে আমি আর সে পুকুরের কাদা দিয়ে একটি ধান কল বানিয়ে রোদে শুকাতে দিয়েছি
    •  তাঁর বয়স আমার থেকে বছর ছয় সাতের বড়। দারুণ বাঁশি বাজাতো। বিকেলে সেই কাদামাটির ধান কলে ধান ভানা হবে, আর সন্ধ্যায় সে নিয়ে যাবে খোটেলের পাড়ে। সেখানে হেলানো তাল গাছে শুয়ে বাঁশি নাকি বাজায় সে। আর সাপরা পুকুরে মাথা তুলে মাথা দোলায় তালে তালে।
    • সাপের পাঁচ পা খারাপ কথা। কিন্তু আমাকে কেউ বুঝিয়েছিল,  পাঁচ পা ওয়ালা সাপের মাথায় মণি থাকে। সেই মণি পেলেই পুকুরের তলায় লুকানো প্রাসাদ  দেখা যাবে।
    • কথা ছিল সবাই ঘুমোলে দুজনে বের হবো। সে এসে দেখে আমি নেই। বাকিরা ঘুমোচ্ছে। কোথায় যেতে পারি ভেবে সে খুঁজতে বের হয়েছে। 
    • দুপুরে গ্রাম মনে হতো নিশুতি রাত।
    • বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু লোকে দুপুরে অকাতরে ঘুমাতো। তাই কেউ খেয়াল করে নি আমার যাওয়া। বেশি দূর যাই নি, আমার সঙ্গী হাজির। ছোটোবেলা থেকেই আমার বড়োদের সঙ্গে বেশি বন্ধুত্ব। 
    • সে এসে আমার হাত ধরে টেনে বলল, পাগল নাকি তুই ছেলেধরা লোকটা।
    • নিয়ে গিয়ে বেচে দেবে গরমেনের কাছে ( গভর্নমেন্ট)। পুঁতে দেবে তোকে।
    • এতক্ষণে আমার রোমান্টিকতা গেল। 
    • শুনেই পাঁইপাঁই দৌড়।
    • সন্ন্যাসী কিন্তু বিকারহীন। 
    • ফিরেও তাকালেন না, চলে গেলেন।
    •  ওই রকম মোহ ধরানো সন্ন্যাসী আর দেখি নি। 
    • পরে 'কপালকুণ্ডলা' ছবি দেখে মনে হলো এই সেই।
    • কিন্তু সন্ন্যাসীর দৃষ্টি ভয়ঙ্কর ছিল না। ছিল অতলান্ত দিঘির জলের মতো গভীর।
    • আজও সেই চোখ আমি খুঁজে বেড়াই।
    • কে আনবে এই আহ্বান।
    • যার কোন আহ্বান থাকবে না, অথচ মন্ত্রমুগ্ধের মতো চলে যাবো।
    • তবে এটাই শেষ নয়।
    • আরেকবার ঘটলো কাঁচরাপাড়া স্টেশনে।
    • আমার বয়স তখন পাঁচ। নদিয়ায় মাসির বাড়ি যাচ্ছে আমাদের নিয়ে মা বাবা। তখন তো বাঙালি গ্রামীণ পরিবার দীপুদা হতে শেখে নি। দী-পু-দা মানে দীঘা পুরী দার্জিলিং।
    • মামার বাড়ি পিসি মাসির বাড়িই তাদের দীঘা দার্জিলিং।
    •  
    • ৬.১০.২০২০

     

  • ০৬ অক্টোবর ২০২১ | ১৭২ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন