• খেরোর খাতা

  • কাদামাটির হাফলাইফ ২৫

    Emanul Haque লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৫ অক্টোবর ২০২১ | ২৫৬ বার পঠিত | রেটিং ২ (১ জন)
  • #কাদামাটির_হাফলাইফ ২৫
    তামিলরা এলেন আমাদের গ্রামে নয় আনুষ্ঠানিকতা মানলে পাশের গ্রামে।  কিন্তু আমাদের ছোটোবেলায় ভোটের দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোতে এক গ্রামই ভাবা হতো। উদগড়া বলতেন খুব কম মানুষই। বলতেন, দখিনপাড়া। ১৯৭৮ র লোকসংস্কৃতি নিয়ে খুব চর্চা শুরু হল সুধী প্রধানের নেতৃত্বে। উনি সেহারাবাজারে এলেনও লোকসংস্কৃতি উৎসবে। এলেন এবং জয় করলেন। লোক গান লোক কথা লোকসঙ্গীত নিয়ে ধূম পড়ে গেল। আমার আগের দিদি কাটোয়ার লোকসংস্কৃতি গবেষক আয়ুব হোসেনের মেয়ে হয়ে যত রাজ্যের মুসলিম বিয়ের গান সংগ্রহ করতে লাগলো। এগুলো যে সংরক্ষণ ও সংগ্রহের বিষয় এই ধারণাই ছিল না।
    অনেকে জানেন কি না জানি না, একান্ত নিরক্ষর মানুষেরা কী চমৎকার গান সেই মুহূর্তে বেঁধে গেয়ে ফেলতে পারেন। একটি গান মনে আছে, যেটি বর্ধমানের বিধানচন্দ্র রায় ডাক্তার শৈলেন মুখোপাধ্যায়ের প্রেমজ দ্বিতীয় বিবাহ নিয়ে। এক মহিলা ডাক্তার দেখাতে এসে নার্সিংহোমে ভর্তি হোন। সত্তর দশকে। দুজনের দুজনকে ভালো লেগে যায়। থেকে যান তিনি। পরে আমার সঙ্গে আলাপও হয়। খুব ভালো মহিলা।
    তাঁর সম্পর্কে গান:
    ছি ছি হাসিনা 
    লজ্জাও হয় না 
    মুসলমানের মেয়ে গো।
    ডাক্তার দেখাতে গিয়ে
     ফেললে করে বিয়ে
    কী তোমায় বলি, বলো না।
     
    এই গান বোঝাচ্ছে হিন্দু মুসলমান বিয়ে মানতে পারছে না মুসলিম নারী মন।
     
    আবার এই প্রেমকে স্বীকৃতি দিয়ে গানও ছিল--
     
    হাসিনার হাতে তালের পাখা
    ডাক্তারবাবুর মুখে হাসি গো
    হাসিনা যাচ্ছে পাখি শিকারে
    ডাক্তারবাবুর হাতে বন্দুক গো।
     
    রকমফেরও ছিল,
     
    হাসিনা গেছে মন শিকারে
    ডাক্তারের কাছে বন্দুক গো।
     
    বন্দুক শব্দে হাসির হল্লা উঠতো। তখন বুঝতে পারতাম না, বন্দুকে হাসি কেন হবে, ভয় পাওয়ার কথা তো।
     
    আরো কিছু শোনা যেতো
     
    হলুদ মাখা গা তোমার
    হলুদ লেপা বুক
    ওই না ছুঁয়ে দামাদ মিঞা
    পাবে কতই সুখ।
    'দামাদ' মানে জামাই/স্বামী।
     
    এরপর ফ্যাঁকড়া ধরতো আরেকজন:
     
    ও জামাই মুখ দেখেছো মুখ
    মেয়েকে যেন দিও না কোন দুখ
    প্রথম রাতেই শিকল তুলে করো না তাড়াহুড়ো
    এতদিন তো ছিলেই ভালো দুজনেই আইবুড়ো।
     
    এর সঙ্গে শুরু হল লোকগল্প গালাগাল খিস্তির সংগ্রহ। বাবার এক বন্ধু রফিকুল ইসলাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ধন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন চক্ষণজাদি স্কুলে। আগে সক্রিয়ভাবে কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। ১৯৭৮ এই ছেড়ে দিয়েছেন। সমর্থক। পি এইচ ডি করলেন বাংলা লোককথার সংগ্রহের ওপর। তাতে আমার বাবা ও বাবাদের যৌথ বন্ধু নজির হোসেনের ভূমিকা ছিল ভালোই। রফিকুল চাচা আমরা বলতাম খোস্তার চাচা-- দু ভাই মোক্তার আর খোস্তার। মোক্তার হোসেন আমার সম্পর্কে মেজো মেসোমশাই। ইংরেজিতে সুপণ্ডিত। পেশায় ইংরেজির শিক্ষক। মুক্তোর মতো হাতের লেখা। আগে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম সংগঠক। এখন অনুকূল ঠাকুরের প্রিয় শিষ্য। ঋত্বিক। দীক্ষাও দেন। এ-রাজ্য সে-রাজ্য দীক্ষা ও ভাষণ দিয়ে বেড়ান অনুকূল ঠাকুরের সৎসঙ্গ আশ্রমের পক্ষে। আমার বাবা ছিলেন ঈর্ষাশূন্য মানুষ। রফিকুল ইসলাম ডক্টরেট পেয়েছেন না বাবা-- বোঝা গেল না। সবাইকে এই খবর দিয়ে বেড়ালেন। রীতিমতো ভোজসভা বসে গেল। বাবার আরেক বন্ধু নজির হোসেন খুব গুণী ও গোছালো মানুষ। তাঁর হাতের লেখা যেন বিদ্যাসাগরের প্রথম ভাগ। তাঁর একটু কষ্ট হল। প্রথাগত বিদ্যায় ওই চাচা ও বাবা রফিকুল চাচার   পথে নেই। 
    ওই চাচাও উঠে পড়ে লাগলেন। লোক গান কথা ছড়া গল্প গালাগালির বিপুল সংগ্রহ করলেন। সে-গুলো ছাপার মুখ দেখলো না, এটাই বেদনার। আমি চেষ্টা করেছি। কিন্তু হয় নি। প্রকাশক সমস্যা নয়। সমস্যা অন্য কিছু। 
    এ-ছাড়া আরেকটা কাজ শুরু হল উদ্যমে। গ্রাম নাম চর্চা। উদগড়া নাকি আসলে উদয় গড়। উদয় নামে রাজার রাজধানী;  সেই কথাও বাতাসে একটু ভাসলো। একটা পুকুরের পাড়ের উঁচু পাড়কে কেল্লা বলে লোকমুখে প্রচার হলো। উৎসাহীরা রাতের আঁধারে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করলো। মাটির তলায় সোনা দানা হীরে জহরত যদি মেলে। একটা মাটির ইটও মিলল না।
     
     আমাদের বাড়ির সামনে এক নিতান্তই শান্ত শিষ্ট ভদ্রলোক এসে রোজ রাতে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করলেন।
    প্রথম দিন ভাবা হলো চোর ডাকাত এসেছে। এতো রাতে আওয়াজ।
    টর্চ নিয়ে বেরোনো হলো।
    দেখা গেল স- চাচা মাটি খুঁড়ছে কোদাল দিয়ে।
    কী ব্যাপার ভাই? এতো রাতে। বাবা জিজ্ঞেস করলেন। 
    ভাই আমি স্বপ্ন দেখেছি, এখানে নবাবি আমলের মোহর ঘড়া ভর্তি করে মাটির তলায় আছে।
    সেইটা উদ্ধার করছি। পেলে তোমাকেও কিছু দেবো।
    বাবা হাসলেন। মনে কষ্ট না দিয়ে বললেন, ভাই, শুধু শুধু কষ্ট করছে।
    আরে ন্না, তুমি জানো না, তোমাদের পূর্বপুরুষ তো সব খুব ধনী লোক। বর্গীর হাঙ্গামার সময় লুকিয়ে রেখেছিল।    যে রেখেছিল, সে হঠাৎ মরে যায়। আমাকে সেদিন স্বপ্ন দেখিয়ে বলল, এনাম তো ভালো মানুষ। পার্টি ফার্টি ক্লাব ফুটবল যাত্রা করে সম্পত্তি উড়িয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। ওকে বললে লাভ নেই। বিশ্বাস করবে না। তাছাড়া দান ধ্যান করে উড়িয়ে দেবে। তুমি পেলে ওর বউকে দেবে তিন ঘড়া। এক ঘড়া ষোলাআনাকে আর তিনঘড়া তুমি নেবে। মোট সাতঘড়া আছে ভাই।
    বলেই সংযোজন:
    ভোরের স্বপ্ন, হেসো নি, মিথ্যা হয় না। পরপর তিনদিন দেখেছি। 
    তা খোঁড়াখুঁড়ি করে গর্ত হলো ঢের, লাভ হলো কিছু ভাঙা পোড়ামাটির কলসী। সোনার ঘড়া এলো না।
     
    কেউ তুলে নিয়েছে ভাই।
    একজনকে বলেছিলাম, তার কাণ্ড হবে, কপাল চাপড়ায় স চাচা।
     
    গ্রামের নাম  শেষ পর্যন্ত সুকুমার সেন মেনে রায় হলো, আউশাড়া উদগড়া এগুলো দ্রাবিড় যুগের গ্রাম। শেষে 'ড়া' থাকলে দ্রাবিড়।
    তো সেই উদগড়ায় এলো তামিল বাহিনী।
    গভীর নলকূপ বসবে।
    বড়ো বড়ো ট্রাক ঢুকতে লাগলো মাটির রাস্তা মাড়িয়ে। কখনো কখনো আটকেও গেল। কিন্তু গ্রামে সার্কাস এলে যেমন হয়, তেমনি মেলা বসে গেল, কোন দোকানপাট ছাড়াই। বড়ো বড়ো লোহার পাইপ নামছে। তারপর একদিন কাজ শুরু হলো। প্রথমে ঘোলা জল তারপর বিচিত্র বর্ণের মাটি। মাটির কতো রঙ আর স্তর তার একটা ধারণা ছিল নলকূপ বসানোর অভিজ্ঞতায়। কিন্তু এ এক অন্য অভিজ্ঞতা।
    তামিলরা আমাদের এক বর্ণ ভাষা বোঝে না। আমরাও। তবু কথা চলতে লাগলো। ছেলেদের উৎসাহ তামিল গাল শেখা।
    পুরুষাঙ্গ নারী অঙ্গ ইত্যাদির সন্ধান। কে কী শিখলো জানি না, তবে তামিলরা বুঝলো একটি বাঁ.. বলতেই হয় প্রতি কথায়।
    এবং বে।
    চল বে।
    ছাড় না বে।
     
    আর কথাও শিখলো পুরুষাঙ্গের প্রতিশব্দ-- অ্যান্টা।
    এই অ্যান্টা একটি নেতিবাচক শব্দ বোঝাতে যথেষ্ট।
    অ্যান্টা হবে।
    মানে কিছুই হবে না।
     
    ১০.০৭.২০২১
     
    @emanul Haque ইমানুল হক

     

  • বিভাগ : অন্যান্য | ০৫ অক্টোবর ২০২১ | ২৫৬ বার পঠিত | রেটিং ২ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 2601:84:4600:5410:7475:c72d:3da8:c474 | ০৫ অক্টোবর ২০২১ ১৯:৫৭499137
  • পছন্দের সিরিজ। ভাল লাগছে 
  • Emanul Haque | ০৬ অক্টোবর ২০২১ ১৬:৪৭499184
  • ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন