• খেরোর খাতা

  • কাদামাটির হাফলাইফ ২০

    Emanul Haque লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২১ বার পঠিত
  • #কাদামাটির_হাফলাইফ ২০
    ছোটোবেলায় পাঠ্য বইয়ে গান্ধী সম্পর্কে যত ভালো ভালো কথাই লেখা থাক, গান্ধী মোটামুটি সবার কাছে গাল খেতেন। শুধু 'হিন্দু' সম্প্রদায়ের মানুষ নন, 'মুসলমান'রাও গান্ধীকে দেশভাগের জন্য দায়ী করে গালাগাল দিতেন। মোদ্দা বক্তব্য, উনি চাইলে দেশভাগ ঠেকাতে পারতেন। করেন নি। মৌনীবাবা হয়ে বসে রইলেন। না হলে মুসলমানদের এতো দুর্দশা হতো না। রাজ করতো। পরে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের 'ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম', সহ অন্যান্য বই পড়ে বুঝেছি, এটা ঠেকানো কঠিন ছিল। কংগ্রেস মুসলিম লিগ হিন্দু মহাসভা -- সবাই নানা হিসাব কষছিল। ক্ষমতার হিসেব। নেতারা অনেকেই  কে কোন পদে যেতে পারবেন, কী পাবেন, এই হিসেবে ব্যস্ত ছিলেন।
    ফাটল ভিতরে, বাইরে চুনকাম বা মেরামত করলেও ফাটল দেখা না গেলেও ফাটল বুজতো না।
    গান্ধীর সঠিক মূল্যায়ন আজো হয় নি। গান্ধী ভারতকে অনেকটাই বুঝেছিলেন। তাঁর মতো নেতা আর আসবে কি?
    গান্ধী ও তাঁর ভাবশিষ্য নেহেরু ভারতকে কতটা এগিয়ে দিয়েছিলেন, আজ তাকে পিছনের দিকে ঠেলে গান্ধীর হত্যাকারীদের সমর্থকদের নৃশংস রাজত্ব তা বুঝিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। 
    তবে, গান্ধী যে সপ্রশংস গালাগাল সেটা বাবার উদ্দেশে প্রয়োগ দেখে বুঝতাম। পার্টির লোকজন বলতো, গান্ধীবাদী কমিউনিস্ট। বামপন্থী শব্দটা তখন কমিউনিস্টের বলা যোগ্য বিকল্প হয়ে ওঠে নি।
    বাবা মারধোরে বিশ্বাস করতেন না। তবে সেটা রাজনীতি এবং গ্রাম্য বিবাদ বা বিচারে।
    কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অহিংস থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভবত সম্ভব ছিল না। চড় চাপাটি ভালোই জুটতো।
    তবে, আমি একটু শরীরী ভাষা বোঝায় অতি অল্প বয়সেই পারঙ্গম হয়ে উঠেছিলাম, বাবার চোয়াল শক্ত হচ্ছে দেখলেই, দে ছুট। লিকপিকে পায়ে সীমান্ত পার।
    একবার নাকি বাজারের দু টাকা হারিয়ে ফেলে মারের ভয়ে ভূত প্রেতের আড্ডাখানা বলে পরিচিত কলাপুকুরের পাড়ে এক গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে কাদা হয়ে শুয়েছিলাম। দাদা খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসে ঘুমন্ত অবস্থায়।
    এ আমার শোনা কথা। মনে নেই। তবে তিন বছর বয়সের একটা ঘটনা স্পষ্ট মনে আছে। ১৯৬৯। যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে পার্টির লোকেরা ১০০ কিলোমিটার লংমার্চ করে কলকাতা গেছেন। বাবাও। হাতে সবার লাঠি। কারো হাতে টাঙ্গি। আদি বাসিন্দা কমরেডদের সঙ্গে তীর ধনুক। পথে বাধা এলে লড়াই করেই এগোবেন, এই মনোভাব।
    এ-কালে আজকাল আর এস এসের মিছিলে যেমন তরবারি বন্দুক পিস্তল দেখছেন, সে-কালে ছিল কমিউনিস্টদের লাঠি টাঙ্গি তীর ধনুক।আর ধামসা ।
    তবে তফাৎ আছে।
    অকারণ দাঙ্গা মারপিট বানাতো না, লুটপাট করতো না, ধর্মের বা জাতের নামে ভয় ছড়াতো না।   জোতদার আর তাঁদের দল কংগ্রেসের আক্রমণ ঠেকানোর প্রস্তুতি ছিল ওটা।
    বাবা তো কলকাতা অভিযানে। সে-রাতেই আমাদের বাড়ির এক গোলা ধান চুরি হয়ে গেল। চোরদের বড়োরা দেখলেন। মুখে গামছা বাঁধা। কিন্তু গ্রামের লোকজন আসপাশের লোকজনদের মোটামুটি অল্প বিস্তর চেনেন। বুঝলেন সবই। কিন্তু কিছু বলার উপায় নাই।
    আমাদের পূর্বপুরুষদের আমলের একটা শখের বৈঠকখানা ছিল ২০ ইঞ্চি চওড়া দেওয়াল।
    বালিমাটি আর পাটের মিশেলে তৈরি। দেওয়াল ছিল সিমেন্টের চেয়েও মসৃণ। লালুপ্রসাদ যাদব বর্ণিত, হেমা মালিনীর গালের মতোই পেলব।
     শোনা কথা, ডিমের লালা দিয়ে পালিশ করা। পরে স্থাপত্যবিদ্যার বইয়ে এর সমর্থন মিলেছে।
    কাঠের কড়িবর্গায় ছিল সুদৃশ্য কারুকাজ।
    বৈঠকখানায় খড়ের চাল। সে চালেও বেতের কাজ।   সেই বৈঠকখানায় পরদিন বিচার বসল। যাঁরা চুরির পরিকল্পক তাঁরাই বিচারক। ধানের গোলা থেকে নমুনা ধান নিয়ে তাঁদের বিচারে দোষী চোরদের বাড়ি অভিযানে চললেন।
    বাড়ির মেজো ছেলে হওয়ার সুবিধা অসুবিধা দুই ই আছে। অসুবিধা বাড়তি  সমাদর  নাই। তার উপরে বাকিরা মায়ের মতো না হলেও ফর্সা্। আমি কালো। আমাকে 'কাল্টা' বলেও ডাকা হতো।
    মনোযোগ কম।‌ ফলে স্বাধীনতা বেশি। আর আমার মতো সব বাচ্চারাই ঘুরতে ভালোবাসে।
    তা আমিও ওদের পিছু নিলাম।
    আমাদের বাড়িতে তখন তপশিলি জাতির মানুষ দুইভাই কাজ করতেন। আমাদের সবার প্রিয় তাঁরা। তদন্তকারী দল গেলো সেখানে। হম্বিতম্বা হল। তারপর তাদের ঘর খুলে দেখা গেল, ধানের কোন বস্তা নাই। সেখানে কিছু আমাদের বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া ধান ছিটিয়ে প্রমাণ করা হলো, ওরাই চোর।
    মারধোর হলো বিচারে।
    তাঁরা যতো বলেন, আমরা চুরি করি নি। ততো মার।
    ওঁরা কাঁদছেন আর বলছেন, ওই বাড়িতে আমরা কী করে চুরি করবো? ওঁরা আমাদের বাড়ির ছেলের মতো ভালবাসে। আমরাও ভালোবাসি।
    তখন শ্রদ্ধা কথার চল হয় নি গ্রামে।
    ভালোবাসাই ছিল বড়ো মাপকাঠি।
    এতে মার কমলো না।
    বাড়লো।
    এই দুই ভাই আমার খুব প্রিয় ছিল। চমৎকার জমিয়ে গল্প বলতেন। আমাকে একটু প্রশ্রয়ও দিতো। লুকিয়ে বিড়ি জোগাতাম।
    আমার কান্না এলো মার দেখে। কিন্তু লোকে বলে, ছোটো। ছোটোরাও বোঝে। ভালোই বোঝেন।
    আমি চুপচাপ দেখলাম। বুঝলাম, এখানে শব্দ করে কাঁদা নিষেধ।
    পরে রাতের অন্ধকারে ওই দুই ভাই আমাদের বাড়িতে এসে, মায়ের পা ধরে কী কান্না।
    ভাবি, বিশ্বাস করো চুরি করি নি আমরা। তোমাদের বাড়িতে চুরি করতে পারি বলো!
    মা বললেন, সব জানি রে। কারা চুরি করে কোথায় ধান বেচেছে, তাও জানি। কিন্তু এখন বলা বিপদ।
    তোদের ভাই আসুক।
     
    ওই ভাইয়েরা আর কাজ করতে চান নি, আমাদের বাড়িতে, বলেন, এবার যদি কাজ করি বলেছে, ডাকাতির কেস দিয়ে দেবে।
    আসলে, আমাদের বাড়িতে যাতে কেউ কাজ না করে, রাতে পাহারা না দেয় এবং আর্থিক সংকটে পড়ি, সেটাই ছিল লক্ষ্য।
    বাবা ফিরে এসে সব শুনলেন।
    কাউকে কিছুই বললেন না।
    মাঝে মাঝে দার্শনিক হয়ে যেতেন, বললেন, মনে করো ওগুলো মরাইয়ে ছিল না।
    ২ অক্টোবর ২০২০
  • ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২১ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 2600:1001:b00b:73db:4cf1:e1de:f814:538b | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৫:৫৫498673
  • baa:
  • বন মানুষ | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৩:৪৪498687
  • ভাল লাগল 
  • Emanul Haque | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৮:৪১498710
  • ধন্যবাদ
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন