• খেরোর খাতা

  • কাদামাটির হাফলাইফ ১৯

    Emanul Haque লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৯৩ বার পঠিত
  • #কাদামাটির_হাফলাইফ ১৯
     
    #আলুপোড়া ও আলুর ভবিষ্যৎ পোড়া
     
    ভারতের শস্যভাণ্ডার বলা হয় বর্ধমানকে। আবার বর্ধমানের শস্যভাণ্ডার রায়না। একদিকে দামোদর নদ অন্যদিকে নেহরু প্রচলিত দামোদর উপত্যকা নিগমের খালের জলে এই এলাকা সমৃদ্ধ। মাটিও অসাধারণ। কলকাতার লোক যাকে গোবিন্দভোগ চাল বলে চালায় তার আসল নাম খাস চাল। আসলে খোসবু চাল থেকে খোস চাল হয়ে লোক মুখে দাঁড়িয়ে গেছে খাস চাল।  খাস মানে আসল এবং সুগন্ধি। এই খাস ধান দেখতে খুব সুন্দর। শিস দেখতেও দারুণ। আগে খাস ধানের খড়েরও গন্ধ ছাড়তো। এখনো গন্ধ আছে। অল্প। খাস চাল রান্না করলে বেশ খানিকটা দূর থেকে টের পাওয়া যেতো। এই ধান যে সে জমিতে হয় না। অল্পে অভিমানী। বেশি বা কম জল-- চলে না। পরিমিত।
    এই খাস ধান ছিল চাষীদের লাভের এক ঠিকানা। বাকি চাষে লাভ ছিল না। নিজেরা শ্রম দিলে ভিন্ন কথা।
    তবে এলাকায় ধান ছাড়াও আলু পেঁয়াজ গম সর্ষে তিল চাষ হতো দেদার। আর হতো কুমড়ো ও কুসুম বীজ চাষ।
    সব্জিও হতো। শীতকালে ফুলকপি বাঁধাকপি পালং। বিট গাজর করতেন কেউ কেউ শখে। আমার বাবা খেয়ালি মানুষ বার কয়েক বিট গাজর লাগান। রায়গঞ্জ থেকে নিয়ে আসেন বড়ো নরম বেগুনের বীজ। এক পিস বেগুন ভাজা গোটা প্লেট জুড়ে। তা দেখতে লাগতো। বড়দি-কে দেখতে এলে এই বেগুন ভাজা দেওয়া হয়েছিল। আর মনে আছে  গোলাপ জল জাফরান মেশানো দুধের সরবত। বোধহয় তাতে কাজুও ছিল। এটা পরে ছিল জামাই স্পেশাল। মা-কে ঠাট্টা করে বলতাম, তোমার ছেলে না হয়ে জামাই হলে ভালো হতো।
     
    পাটচাষও কিছু চাষী করতেন। ভুট্টা গাজর যব চাষ করতে দেখেছি বাবাকে বার দুয়েক।
    বাবা তো নিজে চাষ করতেন না, মধ্যবিত্ত কৃষক খেতমজুরকে দিয়েই করান। কিন্তু বাঁধা কৃষাণ থাকতো। থাকতো বাগাল। কৃষাণের সঙ্গে ১ মাঘ চুক্তি হতো। সারা বছরের। নির্দিষ্ট টাকা এবং ধানের বিনিময়। এছাড়া লুঙ্গি গামছা জামা এবং অবশ্যই বিড়ির হিসেবও থাকতো।‌ কেউ চাইতো দিনে ১০ টি। কারো বা দাবি একতাড়া। মানে ২৫ টি।
    বংশানুক্রমিক ভাবে এই কৃষাণ প্রথাও দেখেছি। এঁরা ঠিক চাকর নন, বাড়ির একজন। ছোটদের শাসন করার পূর্ণ অধিকার থাকতো। বাড়িতে এদের কদর ছিল।
    তা আমার আলু চাষের প্রতি আগ্রহ ছিল দুটি কারণে। এক, আলু শাক, অপূর্ব খেতে। এতো ভালো শাক আর নেই। একটু সামান্য খ্যসখ্যাসে। সেটাই তার আকর্ষণ।
    মুসুর ডাল দিয়ে আলুশাকে দু থালা ভাত উড়িয়ে দিতে পারতাম। এতো প্রিয় ছিল আমার।
    আর আলু ওঠার সময় আলু পুড়িয়ে নুন দিয়ে খাওয়া।
    প্রত্যেকের জমিতেই ধানের খড় দিয়ে নতুন আলু পোড়ানো হতো। পোড়ালে বাইরেটা একটু শক্ত হতো। নুন দিয়ে খেতে অমৃত লাগতো। গ্যাসে পুড়িয়ে সে-স্বাদ মেলে না।
    আলু পেঁয়াজ সর্ষে গম তিল সব উঠে গেল। কারণ লাভ কম খরচ বেশি।
    আলু ঘরে চার পাঁচ মাসের বেশি রাখা যায় না। পচে যায়। হিমঘর কম। আলুর রাখার বন্ড পেতে হয় দালাল নয় নেতাদের ধরতে হয়।
    বহু হ্যাপা।
    আলু মূলত দু-ধরনের হতো নৈনিতাল আর লাল আলু। লালু ঠিক মিষ্টি নয়, লাল রঙের দেখতে। অপূর্ব স্বাদ ছিল। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে রাম্মাম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছের বাজারে  এই আলু বহুকাল পরে দেখেছিলাম।
    আর ছিল ঠিকরে আলু। মানে ছোটো আলু। এর ডাল হতো অসামান্য। বাড়িতে একে বলতো খাগিনা। একটু আদা জিরে বাটা দিয়ে আলুর ডাল। সঙ্গে জিরে রসুন লঙ্কার ফুটন্ত তেলের ফোড়ন। রায়গঞ্জের কাছে বুনিয়াদপুরে এক চাষি পরিবারের ঘরে বহুদিন পর সে-ডালের স্বাদ পাই।
    খাদেমুল ইসলামের আমন্ত্রণে বক্তৃতা করতে গিয়ে। গাড়িতে যাচ্ছি। দেখি আলু তোলা হচ্ছে। পুরাতন স্মৃতি উস্কে উঠল। নেমে পড়লাম।
     ওঁরা বললেন, খেয়ে যান। টিনের বেড়া দিয়ে ঘর।  স্বল্পবিত্ত মানুষের। দেখলাম, রান্না হচ্ছে। চা বিড়ি সিগারেট মদ খাই না বলে আমার ঘ্রাণশক্তি প্রবল। রান্না থেকে ছোটোবেলার গন্ধ। বললাম, ওটা খেতে পারি। আলুর ডাল।
     কী নাম বলেছিলেন, মনে পড়ছে না।
    এক গ্লাস ভর্তি করে খেয়ে মায়ের অভাব আরেকবার অনুভব করলাম। আমার খাওয়ার তৃপ্তি দেখে আরেক হাতা ঢেলে দিলেন। মুখে তো না না করতেই হল, চক্ষুলজ্জায়, মন কিন্তু ডালে। এবং গালে।
    আচ্ছা, মাকে কি ছেলেদের বয়স বাড়লে নোলার কারণে মনে পড়ে?
     
    নৈনিতাল শৌখিন আলু। বীজের দাম বেশি। আবার বেশি দিন টেকে না। তারপর চন্দ্রমুখীর রাজত্ব কায়েম হল। এর কিছুকাল পরে এলো জ্যোতি আলু। খ্যাসখেসে খেতে। বাবা বললেন, জ্যোতি একটা আলু হলো! এতো গোরুর খাবার।  কিন্তু ফলন বেশি। টেকেও। জ্যোতিরাজ চললো। প্রথম প্রথম ভালো লাগতো না।
    কারণ বাবার দেখাদেখি আমি ছিলাম আলু ভর্তার ভক্ত। বিয়েবাড়ি খেয়ে এসেও আলুভর্তা আর একটা ডিমের পোচ ও ডিমের নুন ভাজা তেল মেখে  একটু সাদাভাত না খেলে এই সে-দিনও মনে হতো, কিছু খাওয়া হয় নি।
    মধুমেহ এই মোহ কিছুটা ঘুচিয়েছে।
     
    এর মাঝে শুরু হলো বোরো চাষ। ১৯৭৮ নাগাদ পাশের গ্রামে হাজির হলো একদল তামিল। এসে তাঁবু গাড়লো।
    হইচই পড়ে গেল চারদিকে।
    কী ব্যাপার?
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৯৩ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন