• খেরোর খাতা

  • কাদামাটির হাফলাইফ ১৮

    Emanul Haque লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১০০ বার পঠিত
  • #কাদামাটির_হাফলাইফ ১৮
    'কচু' শব্দটি কেন জানি না, বাঙালি সমাজে খুব একটা শ্রদ্ধেয় ছিল না। কচু শাক পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের মানুষ সেভাবে খেতেন না। কচুর লতি বা মানকচু খাওয়ার চল ১৯৭৮ এর পর শুরু হয়।
    কচু খেগে যা।
    কচু হবে। ( মানে কিছু হবে না। ইতিবাচক অর্থে নেতিবাচক বোঝানোর আদর্শ উদাহরণ এটি)।
    দূর কচুপোড়া।
    এইসব শব্দবন্ধে কচু ঘিরে সামাজিক সাংস্কৃতিক মানসিক অবস্থান বোঝা যায়।
    কিন্তু কচু খেতে দিব্য। বুঝে কিনতে পারলে।‌ আমি এ-বিষয়ে একটু নিজের পিঠ চাপড়াতে পারি।
    যাবতীয় কচু চেনায়। শুয়োরের মাংসও চিনি। শুধু ইলিশ ভালো বুঝি না। মৃগেল মাছ চিনি জব্বর।
    কচুর গায়ে হাত দিয়ে ঘষলে ছাল উঠলে বুঝবেন, এ কচু গলা কুটকুটের নয়।
    কচুর মূলে কিন্তু গলা কুটকুটের সম্ভাবনা। সেটা টক হিসেবে ব্যবহার হতো। তেঁতুল গাছের অভাব ছিল না। তেঁতুলের টক।
    আর বর্ধমানের মানুষ সবেতেই টক খায়।
    মাছের টক তো রীতিমতো প্রসিদ্ধ।
    কচু দিয়ে মুসুর ডালে বেরেস্তা ফোড়ন অসাধারণ।
    কচু দিয়ে মাংসও জবাবহীন।
    একাদশ-দ্বাদশে পড়ার সময় আমি কমলসায়রের একটি বাড়িতে থাকতাম। সেখানে কচু দিয়ে ইলিশ রান্না করতো‌।
    আমি মিষ্টি জলের রুই কাতলা মৃগেল মাছের দেশের লোক, ইলিশের সঙ্গে কচু মানতে পারতাম না প্রথম প্রথম। মনে হতো, ইলিশের জাত গেল।
    কিন্তু পরে অসাধারণ লাগতে লাগলো। রান্নার গুণে।
    তা গ্রামের মানুষ কচু নিয়ে যেতেন। পনেরো পয়সা কেজি। কেউ পয়সা দিয়ে যেতেন, কেউ বাকিতে।
    আমি তাগাদায় যেতাম মায়ের ঠেলায়।
    ফলে গ্রামের বহু বাড়ি আমার ছোটোবয়সে চেনা হয়ে গেল।
    পরে যোগ হলো ধান ভানার পয়সাও। কত করে কেজি ছিল মনে নেই।
    ২৪.০৯.২০২০
    আজ বহুকাল পর শ্রদ্ধেয় শিশির দত্তের সঙ্গে কথা হল। তাঁর সম্পর্কে পরে বিস্তারিত বলবো। ছাত্রদের সমাজসেবা ও সংস্কৃতির কাজে যুক্ত করার ক্ষমতাসম্পন্ন শিক্ষক খুব কম দেখা যায়। শিশির দত্তের রাষ্ট্রপতি পুরস্কার না পাওয়া বেদনাদায়ক।
    শিশির বাবু এখন বর্ধমান শহরে থাকেন। স্যারের বাড়ি ছিল কৈয়ড় গ্রামে। সেহারা থেকে পশ্চিমে। সেহারার উত্তর দিকে কয়েক কিলোমিটার গেলে সিপ্টা বলে একটা বর্ধিষ্ণু গ্রাম। বিশাল এক দিঘি আছে। স্যার বলছিলেন, সিপ্টার দিঘিতে প্রচুর মাছ হতো। মাছ ধরলে ৬/৭ কেজি ওজনের বড়ো বড়ো মাছ পাওয়া যেতো। মালিকরা বিক্রি করতে সংকোচ বোধ করতেন। আমিও গ্রামে থাকতে মধ্যবিত্ত  কাউকে মাছ বিক্রি করতে দেখি নি। পরে জেলের কাছে নিজের ভাগের অতিরিক্ত মাছ  জমা রাখার প্রথা চালু হয় ।
    লিখিত নয়। মুখে মুখেই জমা। আর চুনোমাছ বা ছোট মাছ কখনো কখনো মাঝারি মাছ,  মাছ ধরা দেখতে  জড়ো হওয়াদের দিয়ে দেওয়াই ছিল প্রথা। এ-ছাড়া প্রতিবেশী বা গ্রামীণ  কুটুমের ঘরে পাঠানো ছিল স্বাভাবিক। না পাঠালে দুর্নাম রটতো কিপটে বলে।
    লাউ কুমড়ো পেয়ারা এ-সব তো পাঠানো নিত্য ঘটনা।
    তা, সিপ্টার বাবুরা কুইন্টাল কুইন্টাল মাছ কী করবেন-- বিলি করে দিতেন। লোকেরও ফ্রিজ নেই।‌ ভাবতেও পারতেন না মানুষ এ-সব। সত্তর দশকে। পাওয়া মাছ লোকে বড় বড় সিমেন্টের ডাব্বা করে প্রচুর তেঁতুলের টক মিশিয়ে মাটির  তলায় পুঁতে রাখতো।
    আশপাশের এলাকার মানুষের বাড়িতে হঠাৎ কুটুম এলে লোকে কিনে আনতো। ধুয়ে রান্না করতো।
    #

    আমাদের গ্রামেও দুটি বড়ো পুকুর ছিল। লৈপুকুর বা নৈপুকুর ( নয়া পুকুর!) তাতে বছরে সম্ভবত একবার মাছ ধরা হতো।‌কারণ বড়ো পুকুরে জাল দিয়ে মাছ ধরা কঠিন। কুইন্টাল দুই তিন মাছ হতো। আমাদের আগে চার আনা ভাগ ছিলো। বাবা বেচে দিয়েছেন। রাজনীতি দিদিদের বিয়ে ইত্যাদি কারণে। ওই পুকুরের মাছও খুব বড়ো বড়ো হতো। গোরুর গাড়ি করে ভাগ আনতে হতো। তা কয়েকজনের প্রায় নিজেদের বা দু ঘর মিলে একটা পুকুর থাকতো । সেই সব পুকুরে মাছ ধরার পর পাতি  ( বাঁশে বোনা ছোট ঝুড়ি) করে মাছ ভাজা খাওয়া হতো। ওটাই টিফিন। মাছভাজা দিয়ে মুড়ি খাওয়ার চলও ছিল। এছাড়া লেবু ছোট পেঁয়াজ লেবু লঙ্কা দিয়ে মাছ মাখা বা মাছের ভর্তা অনবদ্য।

    বর্ধমানে যখন ১৯৮২ তে পড়তে গেলাম একা একটা ঘরে থাকতাম। নিজেই রান্না করতাম। আর সব ছেলেই যা করে আমিও তাই, ডিমের ঝোল বানাতাম প্রায়ই। ডালের ঝামেলা রইল না। দেশি  টমেটো দিয়ে আলু পেঁয়াজ কুচি বিয়ের পাতলা একটু টকটক ঝোল রাতেও গরম করে খাওয়া যেতো। কড়াইয়েই থাকতো।
    ১৯৮৩ তে দাদা আর বৌদি বর্ধমান শহরে ঘরভাড়া নিলো। দাদা তখন এস এফ আইয়ের জেলা সম্পাদক। হোলটাইমার। তিনশো টাকা পায়। আমি ঘর থেকে চাল আলু নিয়ে যাই। পেঁয়াজও। তখন আমাদের গ্রামে আলু পেঁয়াজ ধনে ফুলকপি বাঁধাকপি কুমড়ো কুসুম বীজ চাষের চল ছিল। ছোট পেঁয়াজ। অনেক পাঁশ লাগতো জমিতে। বড়ো করণকস্যি আর যত্নের ব্যাপার। জমিতে জল থাকবে ভরা যুবতীর যৌবনের মতো। আধিক্যহীন। বোঝা যাবে সরসতা, দেখা যাবে না।
    তা, দাদা আমাকে বাজারে পাঠিয়েছে। পইপই করে বলে দিয়েছে, শাক নিবি না। আমি বাজারে গেলেই একাধিক শাকের আঁটি। তখন ৬ পয়সা বান্ডিল। চার আনায় চার আঁটি। আমার দায়িত্ব বাটা না পেলে চারা মাছ কেনা । ২৫০ বা ৩০০ গ্রাম। সর্ষে ঝাল হবে। বৌদি এটা দারুণ করতো।  তিন পিস। সেই মাছ বোধহয় ছয় বা আট টাকা কিলো।‌  রাণীগঞ্জ বাজারে (,!) আমার সেটাই প্রথম হাতেখড়ি। আমি মাছের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েই আছি, দাঁড়িয়েই আছি। বলতেই পারছি না, ২৫০ গ্রাম মাছ দাও।
    তো দেখলাম, অনেকেই কিনছেন ২৫০ গ্রাম। তবু সংকোচ যায় না। মাছ শেষ হয় হয় তখন চোখ বন্ধ করে বললাম, ২৫০ মাছ দাও। দাদার খেয়ে বের হওয়ার কথা। আমি সকাল সাতটায় গিয়ে ফিরলাম সাড়ে ১০ টা পার করে। সাইকেলে ৫ মিনিটের পথ।
    ওখানেই দেখি পমফ্রেট মাছ। ১৫ টাকা কিলো। দাদার খুব প্রিয়। আমার আঁশটে গন্ধ লাগতো। দাদাকে দিয়ে দিতাম।
    এখন পমফ্রেট পছন্দ করি। কিন্তু যা দাম। ছোঁয়া মুশকিল।

    ২৪.০৯.২০২১

  • বিভাগ : অন্যান্য | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১০০ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৬:৪১498648
  • "সেই দিন আর নাই রে নাতি, 
    মুঠো মুঠো ছাতু খাতি!"
     
    লেখা ভাল হচ্ছে
  • Emanul Haque | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৮:৫৮498651
  • ধন্যবাদ
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন