• খেরোর খাতা

  • কাদামাটির হাফলাইফ ১৭

    Emanul Haque লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২৬ বার পঠিত
  • #কাদামাটির_হাফলাইফ ১৭
    জরুরি অবস্থার সময়ে অনেক নতুন কিছু দেখি। বহু লোক আজ যাই বলুন, সে-সময় বলতেন ইমার্জেন্সি ভালো হয়েছে। ভালো বলতে লোকে, সময়ে ট্রেন চলছে, স্কুল কলেজ হচ্ছে--এইসব বলতো । সে-সময় মিলিটারি শাসনের পক্ষেও খুব কথা শোনা যেতো। সেহারা স্কুলের দেওয়ালে ট্রেন থেকে লেখা কয়েকটি   কথা চোখে পড়তো।
    এক।। বাবানাম কেবলম।। আনন্দমার্গ জিন্দাবাদ।
    দুই ।। দিয়েছি তো এক নদী রক্ত/
    হোক না পথের বাধা প্রস্তর শক্ত।
    বোধহয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে।
    তলায় লেখা --শিক্ষা বাঁচাও কমিটি। শিক্ষাকে কারা কেন বাঁচাবে বুঝতাম না।
    তবে শিক্ষা বাঁচাও কমিটির পর বন্ধনীতে ( মহাজাতি সদন) লেখা থাকতো।
    মহাজাতি সদন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠিত এ-টুকু জ্ঞান ছিল। তাই ভাবতাম, সুভাষচন্দ্র বসুর এঁরা কেউ হবেন।
    আর এর কারণও ছিল বর্ধমান যাওয়ার পথে দেখেছিলাম, কড়া চাবুক। কড়া চাবুক।
    নেতাজী আবার আসছেন।
    নেতাজী আসবেন--এটা সে-সময় বহু লোক বিশ্বাস করতো এবং গান্ধী ও নেহেরুকে গাল দিতো।
    তিন।। একটা সূর্য এঁকে তাঁর তলায় লেখা-- এশিয়ার মুক্তিসূর্য ইন্দিরা গান্ধী যুগ যুগ জিও।
    হাতের লেখা সুন্দর ছিল মনে আছে। ট্রেন থেকে দেখা যেতো।
    সেহারাবাজার স্কুলের শিক্ষকদের অনেককেই নামে চিনতাম। দাদার বন্ধুদের আলোচনায়। দাদার সহপাঠী ছিলেন বাসুদেব পণ্ডিত। তপশিলি জাতির মানুষ। দাদার সঙ্গে গলায় গলায় বন্ধুত্ব। একসঙ্গে যেতো স্কুলে। শান্ত ধীর স্থির। প্রধান শিক্ষক পদে কাজে করে অবসর নিয়েছেন। সেহারাবাজার স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা খুব ছোটোবেলায় শুনেছি। ছোটোমামার সঙ্গে দাদা শিশু অবস্থায় একবার স্কুলে বেড়াতে গেলে তিনি নাকি দত্তক নিতে চেয়েছিলেন। নিঃসন্তান কালীসাধক স্কুল অন্ত প্রাণ মানুষ। তিনি হাঁটতে বের হলে, স্কুলে পিন পড়ারও শব্দ পাওয়া যেতো না।  শুধু জুতোর  ঠকঠক আওয়াজ। তাঁর বিষয়ে আরো পরে লিখতে হবে। ভবানীবাবুর কথা আগেই বলেছি, যাঁর প্রভাবে সব সময় বাংলা বলা ও এক ধরনের পোশাক পরা আমার। প্রিয়নাথ নন্দীও এক আশ্চর্য মানুষ। তাঁর কথাও লিখেছি। শিশির দত্ত নামে জনপ্রিয় এক শিক্ষকের কথা শুনেছি বাড়িতে, তাঁকে ছুরি মেরেছিল গুন্ডারা। ছাত্রকে বাঁচাতে গিয়ে সম্ভবত ছুরি খেয়েছিলেন স্কুলেই। আমার ক্যুইজ বিতর্ক তাৎক্ষণিকে পরে পরিচিতি লাভের তাঁর হাতেই শুরু। পরে আলাদা করে লিখতেই হবে এই সদা সমাজব্রতী মানুষের কথা।
    #
    আজ লিখতে চাই ছোটোবেলার কথা। ট্রেনের কথা। ট্রেনে তখন টিকিট ছিল ন্যূনতম ৩০ পয়সা। সেহারা যাওয়ার সময় টিকিট কাটা হতো। ফেরার সময় নয়। স্টেশন মাস্টারকে ১০ পয়সা দিতে হতো। কোনোদিন চেকিং থাকলে বলে দিতেন, বাবারা আজ চেকিং। সবাই টিকিট কাটবি। বিনা টিকিটে ধরা পড়ে আমার স্টেশনের সম্মান নষ্ট করিস নি বাবু। উত্তমকুমারের মতো দেখতে। সদা ফিটফাট। তখন 'অমানুষ'  খ্যাত শক্তি সামন্তের গ্রাম আমাদের থানার বোগড়া গ্রামের  মানুষ। শক্তি সামন্তের নিজের ভাইপো। সবাই বলতো, মাস্টারমশাই, সিনেমা না করে, এখানে পড়ে আছেন? সিনেমায় নামলে নাম করতেন।
    বলতেন, গিয়েছিলুম। মন টিকলো না।  এখানে থাকলে মনে হয় নিজের গাঁয়েই আছি। তাঁর জন্মভূমি বোগড়া গোপীনাথপুর স্টেশন থেকে খুব দূরে ছিল না। সাইকেলে যাওয়া আসা করা যেতো। ইমার্জেন্সির সময় খুব টিকিট বিক্রি হতো। পরে তেমন নয়। কিন্তু মাস্টারমশাই সারাদিন খাতায় কী সব লিখতেন। স্টেশন মাস্টারমশাইকে, কেউ  পয়সা না দিলে, চেঁচাতেন, দাঁড়া পরের দিন আয়। দেখছি তোকে।
    আশপাশের সবাইকে নামে চিনতেন। পাঁচখানা গ্রামের লোক ব্যবহার করতেন এই স্টেশন। আউশাড়া,উদ্গড়া (রসপুকুর), নূরপুর, গোপীনাথপুর, আর বুড়ুল। গোপীনাথপুরের পরের স্টেশন সেহারাবাজার। জংশন। সেখানে একটা রেস্টুরেন্ট ছিল। পাশেই ছিল বাস স্ট্যাণ্ড। ওখান থেকে দিনে একবার বাস ছাড়তো। ৯-৩৫ এ সম্ভবত। বর্ধমানে অফিস যাওয়ার বাস। লোকে নেমেই হুড়মুড় করে ছুটতো।
    সেহারাতে টিকিট পরীক্ষার  ছিল কড়াকড়ি। পেছন এবং সামনেও লোক থাকতো। পালানোর পথ নেই।  দিনে চারটি ট্রেন। দুটি আপ। দুটি ডাউন। গোপীনাথপুরের সময় ছিল সকাল ৯-২৫ আর বিকেল ৩-৩০। এই ট্রেন দেখে চারপাশের কৃষকরা জমি খেতে কাজ শেষ করতেন। দূর থেকে ধোঁয়া উড়িয়ে যাওয়া দেখতে দারুণ লাগতো। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর অক্টোবরে। মেঘমুক্ত আকাশ। কল্পনায় দেখতে পেতাম দার্জিলিং । আকাশের পেঁজা তুলো ছিল সাদা বরফ কল্পনার বিকল্প।
    কিন্তু যাওয়া দূরকল্পনা।
    সেই জন্য ভ্রমণকাহিনি গিলতাম।
    কল্পনায় ফায়ারপ্লেস, কাঠের ঘর, ঝুরো বরফ বাস করতো।
    #
    সেপ্টেম্বর -অক্টোবরে গ্রামে আকাল দেখা দিতো। আজ যা বড়োলোকদের খাবার--ওটস, সেই জাও, খেতো গরিব মানুষ। খুদের ভাত। পোশাকি নাম ছিল #ভুরভুরি। একটু হলুদ নুন তেজপাতা দিয়ে ভাঙা চাল বা কুলের  ভুরভুরি মধ্যবিত্ত বাড়িতেও হতো।
    বেলা ১০ টার খাবার হিসেবে।
    গ্রামে কিন্তু পাঁচ বার ভরপেট খাওয়া।
    সকালে চা মুড়ি,  বেলা ১০টায় ভুলভুরি বা পান্তাভাত  বা জলভাত গরমের দিনে। দুপুরে মধ্যাহ্নভোজন।
    বিকেলে মুড়ি ইত্যাদি। রাতে ভাত ।
    গরিবেরা ভাদ্র আশ্বিন কার্তিকে অনেকেই অনাহারে অর্ধাহারে  থাকতেন। সম্পন্ন দয়ালু বাড়িগুলিতে বসে থাকতো সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দল। আমাদের বাড়িতেও ১৫-২০ জন আসতেন। একদিন দুদিন অন্তর। কাজের সন্ধানে অথবা চাল গম আটার খোঁজে। ১৯৭৪-এ প্রথম লক আউট শব্দ শুনি। গ্রামের সুদর্শন পুরষের আকাল ছিল না। তবে উদ্গড়ার শেখপাড়ার জিয়াউর ভাইদের ভাইবোনের রূপ ছিল দেখার মতো। জিয়াউর ভাই শান্ত মানুষ, দুধে আলতার রং। শৌখিন মানুষ। মা বাবা দুজনেই পরম রূপবান। সম্ভ্রান্ত চেহারা।
    কলকাতায় বেঙ্গল পটারিতে মাস মাইনের চাকরি করতেন। গ্রামে এলে জুতো পরে গ্রামে ঘুরতেন। গ্রামে পুরুষ মানুষের খালি গায়ে ঘোরাই ছিল দস্তুর। জিয়াউরভাই জামা পরেন।
    শোনা গেল, জিয়াউর ভাই লক আউটের শিকার।
    জিয়াউর ভাই বসে থাকতেন। চাইতে পারতেন না। চুপচাপ ভাদ্রের রোদ উপেক্ষা করে বসে থাকতেন।
    সবাই কিছু নিয়ে চলে গেলে আমার মা তাঁকে আলাদা করে দিতেন।
    তা শীতকালে যে আলু ৫ পয়সাও দাম নয় ভাদ্র আশ্বিনে কার্তিকে তা ২০ -২৫ পয়সা হতো। বেগুন ৫০ পয়সা। টমেটো তখন সারা বছর মিলতো না। বাঁধাকপি ফুলকপিও।
    লালশাক পুনকো/ নটেশাক শাক মিলতো সারা বছর। বর্ষার পর শুষনি শাক। কিন্তু গ্রামের মানুষ শাক কিনতেন না। লাউ কুমড়ো এবং উচ্ছেও। বাড়ির উঠোন লাগোয়া শাকবাড়িতে হতো।
    তবে লোকে কচু কিনতো। জরুরি অবস্থার দুর্দিনে আমাদের চাষ বন্ধের সময় আমাদের খামারের গায়ে গোয়ালের পিছনে কচু গাছ লাগানো হয়। টগরভাই আর কাজ করতেন লালু কাকা। লালু কাকা জন্মসূত্রে আদিবাসী।
    কচু কিনে নিয়ে যেতো মানুষ। নিজেরাই তুলে নিতো কেউ কেউ। মনে পড়ছে, একজন খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন। সদাশয়  সৎ মানুষ। এসেই হাঁক পাড়তেন মায়ের উদ্দেশে, কই গো ভাবি কোদালটা দাও।
    ২৩.০৯.২০২০

     

  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২৬ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন