• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  শিল্পকলা

  • শিল্পকলার তাত্ত্বিক ভাগাভাগি থেকে দেশভাগের শিল্প

    দেবরাজ গোস্বামী
    ধারাবাহিক | শিল্পকলা | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২৩৫ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৫ জন)
  • দেশভাগ বিষয়টি কোনো রাতারাতি ঘটে যাওয়া আকস্মিক ঘটনা নয়, অনেকদিন ধরেই একটু একটু করে তার প্রেক্ষিত তৈরি করা হয়েছিল – ঠিক সেইরকমই, সেই সময়ের ভারতীয় শিল্পীদের কাজে তার যে প্রতিফলন রয়েছে তাও ঠিক একদিনের ঘটনা নয়। .... আশ্চর্যের ব্যাপার হল, বাংলার নাটক, সাহিত্য, ফটোগ্রাফি এবং চলচ্চিত্রের মধ্যে দেশভাগের বিষয়টির যে জোরালো উপস্থিতি, তা কিন্তু চিত্রকরদের কাজের মধ্যে নেই। দেশ ভাগ হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ বাস্তু হারিয়ে শেষ সম্বল নিয়ে এপার বাংলায় চলে আসছে – এমন দৃশ্য আমরা সমকালীন ফোটোগ্রাফ এবং কিছু পরে নির্মিত চলচ্চিত্রে দেখতে পেলেও খুব কম শিল্পীই এই বিষয় নিয়ে সরাসরি ছবি এঁকেছেন। চিত্রকলা এমনই এক দৃশ্যভাষা, যেখানে কেবলমাত্র চোখে দেখা দৃশ্যের একটা চটজলদি ডকুমেন্টেশন করে দিলেই চলে না, শিল্পীর নিজস্ব ভাবনা, মনন এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণ কাজের অঙ্গ হয়ে যায়। চলচ্চিত্রের মত ন্যারেটিভ মিডিয়াম নয় বলেই, চিত্রকলার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া বেশ জটিল এবং যথেষ্ট ম্যাচিওরিটি দাবি করে। ফলে চিত্রকরদের কাজে আমরা দেশভাগ যতটা পেয়েছি, তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছি তার রাজনৈতিক এবং আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের অনুসন্ধান।
    শিল্পী: সোমনাথ হোড়

    একটা দেশ, একটা জাতি, একটা সংস্কৃতিকে ধর্মের ভিত্তিতে মাঝামাঝি চিরে দু’ভাগ করে ফেললে, মানুষের জীবনের ওপর দিয়ে, মনের ওপর দিয়ে কি ভয়ঙ্কর ঝড় বয়ে যেতে পারে – তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার নেই। সম্ভবত আমাদের প্রজন্মের ভারতীয়দের মধ্যে কেউই সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে সরাসরি যাননি। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ছাপা অক্ষরের তুলনায় গভীর থেকে গভীরতর সেই ক্ষতচিহ্ন আজীবন বহন করেছেন আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের লক্ষ লক্ষ মানুষ। এঁরা সেই ইতিহাসকে আমাদের জন্য ধরে রেখে গিয়েছেন বিভিন্ন মাধ্যমে। এর একটা বড় অংশ যেমন ওরাল হিস্ট্রি, যা এই প্রজন্মের মানুষ শুনেছেন তাঁদের পূর্বসূরিদের কাছে, তেমনই লিখিত ইতিহাস ছাড়াও তা ধরা পড়েছে সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, লোকসঙ্গীত এবং শিল্পকলার বিভিন্ন ধারায়। ভারতীয় শিল্পকলার জগতে দেশভাগের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব ঠিক কতটা – এই বিষয়ে আলাদা করে ভেবে দেখতে গেলে কতগুলি খুব আশ্চর্যজনক ধারণার সন্ধান পাওয়া যায়। এই ধারণাগুলি অবশ্যই বর্তমান লেখকের ব্যক্তিগত পাঠ এবং সর্বজনগ্রাহ্য ইতিহাস নয়। সেই অর্থে শিল্পকলা বিষয়ে সর্বজনগ্রাহ্য ইতিহাস লেখা আদৌ সম্ভব কিনা – এ ব্যাপারেও যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে।


    ছবি – ১: শিবের বুকের ওপর মা কালী

    চল্লিশের দশক যেমন ভারতবর্ষের আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এক গুরুত্বপূর্ণ সময়, ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসেও তার অন্যরকম গুরুত্ব রয়েছে। দেশভাগের শিল্পকলার মূল সূত্রগুলো বুঝতে গেলে প্রথমেই এই বিষয়টা জানা দরকার। ভারতীয় শিল্পকলার কয়েক হাজার বছরের যে ধারাবাহিকতা তার অন্যতম গুণ হল বহিরাগত যেকোনো শিল্পধারাকে তা খুব সহজেই আত্মীকরণ করে মূল স্রোতের মধ্যে মিলিয়ে নিয়েছে। গ্রিক হেলেনিস্টিক শিল্প যেমন ক্লাসিক্যাল ভারতীয় শিল্পের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়ে গান্ধার শিল্পের জন্ম দিয়েছে, তেমনই পারস্য দেশীয় অনুচিত্র এদেশের রাজস্থানি বা পাহাড়ি ছবির সঙ্গে মিশে গিয়ে মুঘল মিনিয়েচারে রূপান্তরিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার ফলে কখনই কিন্তু ভারতীয় শিল্পের বহমান ধারায় কোনো ছেদ পড়েনি। কিন্তু ইংরেজরা এই দেশে আসার পরেই এই ধারাবাহিকতা কোথায় যেন খেই হারিয়ে ফেলল। ভারতীয় ছবি বা ভাস্কর্যের অ্যানাটমি বা মাল্টিপল পার্সপেক্টিভের তুলনায় ইউরোপীয় ছবির অ্যানাটমি এবং পার্সপেক্টিভের ব্যবহার এতটাই আলাদা, যে এই দুই ধারা আগের মত সহজেই মিলে মিশে একাকার হতে পারল না। তাছাড়া রাজনৈতিক ভাবে ইংরেজরা তখন প্রভু আর ভারতীয়রা গোলাম। ফলে ইংরেজরা অতি সহজেই এই ধারণা শিক্ষিত সমাজের মস্তিষ্কে বুনে দিতে সক্ষম হল, যে ইউরোপে যে শিল্প হচ্ছে – সেটাই শিল্পবিচারের একমাত্র মাপকাঠি এবং সেই প্যারামিটারে ভারতীয় শিল্পের মান নিকৃষ্ট। এই ধারণার ফলে অন্তত শিল্পকলার জগতে এমন এক স্থায়ী বাইনারির জন্ম হল, যা এইসময়ে ও রূপভেদে প্রায় একই রকম। পাঠক খেয়াল রাখবেন আমি বলেছি ধারণাটি তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ সমাজের মগজেই বুনে দেওয়া হয়েছিল এবং তারাই এই বিদঘুটে বাইনারির প্রধান শিকার। এর বাইরে সাধারণ জনজীবনের সঙ্গে জুড়ে থাকা শিল্পকলার চর্চা কিন্তু নিজের মত করে ঠিকই পথ খুঁজে নিচ্ছিল এবং এমন এক সমকালীন শিল্পভাষার জন্ম দিচ্ছিল, যা সেই সময়ের তথাকথিত শিল্পী ও শিল্পতাত্ত্বিকদের মগজে ঢোকে নি। ফলে তারা আধুনিক ভারতীয় শিল্প ভাষার খোঁজে পর্বতমালা এবং সিন্ধু অতিক্রমের দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলেও, ঘর থেকে দু’পা ফেলে ঘাসের আগায় থাকা শিশির বিন্দুটি আইডেন্টিফাই করতেই পারেননি। একজন মহান শিল্পী যদি বা আইডেন্টিফাই করেছিলেন, তা তিনি আবার ভুলত্রুটি শোধন করবার চেষ্টা করতে গিয়ে মূল স্পিরিটের সর্বনাশ করে ছাড়লেন।


    ছবি – ২: বাঁ দিকে তিশিয়ানের আঁকা উরবিনোর ভেনাস, ডান দিকে রবিবর্মার ওলিওগ্রাফ ঊষার স্বপ্ন

    বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই গোলমালের সূত্রপাত। অনেক আগে থেকেই ইউরোপের শিল্পীরা ভাগ্য অন্বেষণে ভারতবর্ষে আসতে শুরু করে দিয়েছিলেন। ইউরোপীয় ঘরানায় তাঁদের আঁকা তেলরঙের প্রতিকৃতি, প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবির সঙ্গে দেশীয় রাজারাজড়া, নবাব-বাদশা, নব্যবাবু ও জমিদারের দল বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছেন ততদিনে। অনেকেই বিস্তর পয়সাকড়ি খরচ করে জাহাজ ভরে আসা ইউরোপীয় ছবি এবং মূর্তির থার্ডগ্রেডেড নকল কিনে প্রাসাদ এবং বাগানবাড়ি ভরাতে শুরুও করে দিয়েছেন। পুরনো দিনের বিভিন্ন ভারতীয় কলমের দরবারি শিল্পীদের অনেকেরই হয় চাকরি গেছে, না হয় খুবই দুর্দিন, কারণ প্রভুর দল ততদিনে বিশ্বাস করে ফেলেছেন ইউরোপের শিল্পই শ্রেষ্ঠ শিল্প। জোড়াসাঁকোয় ইংরেজ শিল্পীর ডাক পড়ছে দ্বারকানাথের প্রতিকৃতি আঁকার জন্য। এরই মধ্যে দেশীয় রাজা-গজা-জমিদারের মনের মধ্যে কি যেন এক শুন্যতা। কি যেন নেই। ঘরের দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে ডায়ানা, অ্যাপোলো, জুপিটারের ছবি। বাগানে ফোয়ারার ধারে নগ্ন ভেনাস, কিউপিডের দল তীর-ধনুক নিয়ে ওড়াউড়ি করছে – সবই ইংরেজ প্রভুদের মত, কেবল দেশীয় মনটি ভরতে চায় না। যদিও ততদিনে কোম্পানি স্কুল নামক এক ধারার প্রচলন হয়েছে যেখানে এক দল দিশি-শিল্পী বাজার ধরতে তেলরঙে ইউরোপীয় ধাঁচের নিস্বর্গ দৃশ্যের সামনে অনুচিত্র বা পটচিত্রের মত ফিগারেশনে গোপিনীদের বস্ত্রহরণ, রাধার অভিসার, শিবের বুকের ওপর মা কালী (ছবি – ১) ইত্যাদি এঁকে বিক্রি করছেন। কিন্তু সে সব ছবিতে ইউরোপীয় শিল্পের সফেস্টিকেশন কোথায়? ঠিক এইসময় আবির্ভূত হলেন রাজা রবি বর্মা। ড্রইং-এর দক্ষতায়, তেলরঙ চাপানোর মুন্সিয়ানায়, কম্পোজিশন করবার টেকনিকে যিনি যে কোনো মাস্টার ইউরোপীয় চিত্রকরের সমকক্ষ। এর ফলে যা হওয়ার তাই-ই হল। অচিরেই দেশীয় রাজাগজা এবং ধনী শ্রেণির নয়নের মনি হয়ে উঠলেন রাজা রবি বর্মা। বরোদার মহারাজা ছবি আঁকার আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রাসাদের কম্পাউন্ডের মধ্যেই তৈরি করে দিলেন স্টুডিও। পারিবারিক প্রতিকৃতি ছাড়াও, নানা পৌরাণিক বিষয় এবং দেবদেবীর অনেকগুলি ছবি আঁকার বিরাট বরাত দিলেন শিল্পীকে। অন্য দেশীয় রাজ্যগুলিও পিছিয়ে ছিল না। কিন্তু রবি বর্মা জানতেন, যে তাঁর আঁকা ছবি কেবলমাত্র রাজপ্রাসাদে শোভা পেলেই চলবে না, ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের ঘরেও তাঁকে জায়গা করে নিতে হবে। অতএব বিদেশ থেকে আনালেন লিথো প্রেস এবং চালু করলেন নিজস্ব ছাপাখানা। রবি বর্মা তাঁরই আঁকা নানা মাস্টারপিস ছবির রঙিন, সস্তা, চকচকে ওলিওগ্রাফিক প্রিন্ট ছেপে বিক্রি করতে শুরু করলেন। এইসব ওলিগ্রাফের বিষয়বস্তু ভারতীয় হলেও, কম্পোজিশন অনেক সময়েই বিখ্যাত ইউরোপীয় শিল্পীদের অনুসারী হত (ছবি-২)। কিছুদিনের মধ্যেই সাধারণ মানুষের ঘরের দেওয়ালেও শোভা পেতে শুরু করল এইসব ওলিওগ্রাফ। এতকাল যে চাহিদা পূরণ করে এসেছেন লোকশিল্পী এবং পটুয়ার দল, সেই বাজার তাদের হাতছাড়া হয়ে চলে গেল এমন এক শিল্পীর নিয়ন্ত্রণে, যিনি ইতিমধ্যেই রাজারাজড়ার পৃষ্ঠপোষণে সেলিব্রিটি। এদিকে ইংরেজ প্রভু তাদের সরকারি কাজের জন্য ইউরোপীয় রীতিতে দক্ষ ড্রাফটসম্যান তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন। কলকাতা এবং মাদ্রাজে তৈরি হল সরকারি আর্টস্কুল। সেই আর্ট স্কুল থেকে বেরিয়ে এলেন যামিনী প্রকাশ গাঙ্গুলি, শশী হেস, বামাপদ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে হেমেন মজুমদার, অতুল বসু এবং যামিনী রায়ের মত ইউরোপীয় ধারার দক্ষ চিত্রকরেরা। এদিকে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন ক্রমশই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ব্রিটিশকে দেশ থেকে তাড়ানোর জন্য স্বাধীনতা-সংগ্রামীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বিদেশী দ্রব্য বর্জন করে স্বদেশী ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হতে লাগলেন অসংখ্য মানুষ। এই সময়েই আর্টের জগতে প্রশ্ন উঠল – হাজার বছরের পুরনো ক্লাসিক্যাল ভারতীয় শিল্পকে উপেক্ষা করে ইউরোপীয় শিল্পের অনুকরণে শিল্পচর্চা কতটা যুক্তিযুক্ত। এই ব্যাপারেও মদত দিলেন একজন ইংরেজ, কলকাতা আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ, ই. বি. হ্যাভেল। সঙ্গে রইলেন আর এক দিকপাল শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তৈরি হল বেঙ্গল স্কুল, ইউরোপীয় ধারাকে বর্জন করে প্রাচীন ক্লাসিক্যাল ভারতীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবন হল এই ধারার প্রধান লক্ষ্য। এতকাল পর্যন্ত বহিরাগত বিভিন্ন শিল্প ভারতীয় শিল্পের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়ে এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে প্রায় ডাইলেক্টিকাল পদ্ধতিতে। এই প্রথম দেখা গেল ইউরোপীয় ধারার সমর্থক এবং স্বদেশীপন্থীদের মধ্যে তাত্ত্বিক সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেছে। এই বাইনারি, ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে, আগে দেখা যায় নি। কিন্তু এখানে মনে রাখা দরকার, যে এই সমস্ত কর্মকাণ্ডই ঘটছে একধরণের এলিট সমাজের গণ্ডির ভেতরে। কিন্তু এর বাইরেও অন্য ধরণের শিল্পের অস্তিত্ব ছিল এবং সেই শিল্প ছিল ফুটপাথের এবং বটতলার শিল্প।


    ছবি – ৩: কালীঘাটের পটুয়ার আঁকা গণেশ-জননী

    ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গেই দেশীয় রাজা-বাদশাদের প্রভাব কমতে শুরু করেছিল। এর ফলে যেমন অনেক রাজা-বাদশার রাজ্য গেল, তেমনই অনেকের চাকরি এবং রুজি-রুটিও গেল। যাদের চাকরি গেল, তাদের মধ্যে ছিলেন দক্ষ দরবারি চিত্রকরেরাও। এতকাল ধরে একধরণের নিরাপদ আশ্রয়ে শিল্পচর্চা করা এই শিল্পীরা এবার ভাগ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। ওদিকে দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, মহামারীতে জর্জরিত গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ। অথচ এই গ্রামের গৃহস্থের ঘরে ঘরে পট দেখিয়ে গান গেয়ে অন্নসংস্থান করতে হয় পটুয়াদের। তাদের ছবির মধ্যে রয়েছে এক সহজ সরল গ্রাম্য আখ্যানের সমাহার। সেই ছবিতে হয়তো দরবারি শিল্পীদের সফিস্টিকেশন নেই, কিন্তু উজ্জ্বল রঙ ও জোরালো রেখায় নির্মিত এমন একধরণের ভিস্যুয়াল অ্যাপিল আছে, যাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু দরবারি শিল্পী অথবা গ্রামের পটুয়া – দুই দলের পকেটেই তখন পয়সা নেই, আর হাতে কোনো বাজার নেই, যেখানে তাদের ছবি বিক্রি হবে। এইসময়েই খবর পাওয়া গেল, কলকাতার কালীঘাটের কালী মন্দিরে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। সেইসঙ্গে দূরদূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের দৌলতে বিকিকিনিও হয় ভালই। যাকে বলে এক সম্ভাবনাময় বাজার গড়ে উঠেছে এই কালীক্ষেত্র ঘিরে। অচিরেই দেখা গেল চাকরি খোয়ানো দরবারি শিল্পী এবং গ্রামের পটুয়া দুই দলই ভাগ্যের সন্ধানে এসে হাজির হয়েছেন কালীঘাটের ফুটপাথে। এখন, এই নতুন বাজারের চরিত্রটি বেশ অন্যরকম। গ্রামের পটুয়া দেখল তার ছবির সরল গ্রাম্য চরিত্র এখানে অচল। ছবির মধ্যে একধরণের চাকচিক্য এবং স্মার্টনেস না থাকলে, তা সম্ভাব্য ক্রেতার মন টানে না। এই সফিস্টিকেশন বা স্মার্টনেস বেশ আছে প্রাক্তন দরবারি শিল্পীদের ছবিতে। ওদিকে আবার দরবারি শিল্পীরা দেখল, ফুটপাথে বসে এক পয়সা দু’পয়সায় ছবি বিক্রি করতে হলে, প্রোডাকশন রেট বাড়াতে হবে প্রচুর। দরবারি ঘরানায় সূক্ষ্ম তুলির টানে একটি ছবি আঁকতে একমাস সময় লাগিয়ে দিলে অনাহারে মরতে হবে। বরং গ্রামের পটুয়ারা উজ্জ্বল রং ও জোরালো তুলির টানে অতি দ্রুত যে ছবি করতে পারে, তা এই বাজারের চাহিদা মেটাতে বেশ উপযুক্ত। কিন্তু সমস্যা হল, এমন একটি মধ্যপন্থা দরকার, যেখানে ছবির মধ্যে ভল্যুম তৈরি করে বেশ একটা ত্রিমাত্রিকতার আভাস দেওয়া যাবে, অথচ উজ্জ্বল রঙ ও রেখায় দ্রুত এঁকে ফেলা যাবে একের পর এক ছবি। এই শিল্পীরা খেয়াল করলেন, সাহেব শিল্পীরা জলরঙের ছবিতে রঙ আর জলের খেলায় বেশ সহজেই একধরণের বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারেন। কালীঘাটের শিল্পীরা করলেন কি? পটচিত্রের জোরালো কালো রেখা। মৌলিক রঙের প্রয়োগের সঙ্গে ভেজা তুলির ডগায় রঙ নিয়ে একটানে ভল্যুম তৈরি করবার একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেললেন। দরবারি, পট, স্বচ্ছ জলরঙের প্রয়োগ – সব মিলিয়ে কালীঘাটের ফুটপাথে নিঃশব্দে ঘটে গেল বিশ্ব-শিল্পকলার ইতিহাসে এক বিরাট বিপ্লব। এরই সঙ্গে যুক্ত হল সমকালীন সমাজের নানা ঘটনার বর্ণনা। আর্ট স্কুলের শিল্পীরা যখন হয় ইউরোপীয় ধাঁচের প্রতিকৃতি, নিসর্গচিত্র ইত্যাদি, না হয় ক্লাসিক্যাল ভারতীয় ধাঁচে পৌরাণিক কাহিনীর সচিত্রকরণে ব্যাস্ত, তখন কালীঘাটের ছবিতে বাবু-কালচারের প্রতি ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, রসিকতা, তারকেশ্বরের মহন্তর সঙ্গে এলোকেশির কেচ্ছা নানাভাবে উঠে আসছে বিষয়বস্তু হিসেবে। এমনকি কালীঘাটের পটুয়ার আঁকা ছবিতে পৌরাণিক বিষয়বস্তুও হয়ে উঠছে সমকালীন। গণেশ জননী ছবিতে দেখা যাচ্ছে, কোনো কারণে বেজায় কান্নাকাটি জুড়েছেন শিশু গণেশ। শিব তাকে কোলে নিয়ে হাতের ডুগডুগিটি বাজিয়ে কান্না থামাবার চেষ্টা করতে করতে চলেছেন, আর গণেশকে ভোলানোর চেষ্টা করছেন পিছনে পিছনে হেঁটে চলা পার্বতী (ছবি -৩)। এই ছবি দেখলেই বোঝা যায়, এতে পুরাণ যত না আছে, তার থেকে অনেক বেশি আছে মানুষের কথা। কালীঘাটের ফুটপাথে বসে শিল্পী হয়তো দেখেছিলেন গ্রাম থেকে তীর্থ করতে আসা কোনো পরিবারকে। শিশুটির বায়না এবং কান্না থামাবার দৃশ্য থেকে ইন্সপিরেশন নিয়ে তিনি এঁকে ফেললেন এই আশ্চর্য ছবি। বাজারের মধ্যে বসে, বাজারের কথা মনে রেখে, সমকালীন জনজীবনের গল্প নিয়ে এমন একটি শিল্পভাষা, ভারতবর্ষে তো বটেই, সারা পৃথিবীতেও কোথাও তৈরি হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। এদিকে এলিট আর্ট স্কুলের ইউরোপীয় ঘরানার দক্ষ চিত্রকর যামিনী রায়ের মনে স্বদেশী ভাবনার উদয় হল। তিনি ঠিক করলেন তেলরঙের ইউরোপীয় ধারা ছেড়ে দিশি পদ্ধতিতে বাংলার পট, আলপনা, নকশা ইত্যাদি লৌকিক শিল্পের উপাদান নিয়ে কাজ করবেন। করলেনও তাই। শোনা যায় কালীঘাটের পট থেকেও উপাদান সংগ্রহ করে তিনি এক আধুনিক শিল্পভাষা গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এই জায়গায় একটা বিরাট গোলমাল আছে। কালীঘাটের শিল্প গড়ে উঠেছিল বিশেষ রাজনৈতিক এবং আর্থসামাজিক পরিস্থিতির অনিবার্য রসায়নে। সে ছবির রঙ, রেখা, বিষয়বস্তুর মধ্যে দৈনন্দিন জনজীবনের স্বেদ-রক্তের স্পর্শ পাওয়া যেত। কিন্তু যামিনী রায়ের ছবির পরিশীলিত ঠান্ডা রঙ, পৌরাণিক বিষয়বস্তু এবং সফেস্টিকেটেড কম্পোজিশনের মধ্যে সেই গুণগুলিকে সচেতন ভাবেই বাদ দিয়ে দেওয়া হল। এই ছবি হয়ে উঠল এলিট সমাজের মানুষের ঘরের শোভাবর্ধক বস্তু। এ ছবি দর্শককে কোনো অস্বস্তির মধ্যে ফেলে না। আজকের প্রেক্ষিতে ভাবলে বোঝা যায়, কালীঘাটের পটুয়ারা যামিনী রায়ের মত মূল ধারার শিল্পীদের তুলনায় শিল্পভাষার বিচারে আসলে অনেক এগিয়ে ছিলেন। কালীঘাটের পট হল ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে সোশ্যাল ক্রিটিসিজম এর অগ্রদূত।


    ছবি – ৪: পরিতোষ সেনের ছবি

    এই পর্যন্ত পড়ে পাঠকের হয়তো ধৈর্যচ্যুতি ঘটে গেছে। তাঁরা ভাবছেন দেশভাগের শিল্প নিয়ে লেখার নাম করে, ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে বসেছি। সাফাই দেওয়ার জন্য বলি, দেশভাগ বিষয়টি কোনো রাতারাতি ঘটে যাওয়া আকস্মিক ঘটনা নয়, অনেকদিন ধরেই একটু একটু করে তার প্রেক্ষিত তৈরি করা হয়েছিল – ঠিক সেইরকমই, সেই সময়ের ভারতীয় শিল্পীদের কাজে তার যে প্রতিফলন রয়েছে তাও ঠিক একদিনের ঘটনা নয়। ভারতীয় শিল্পের গতিপ্রকৃতি কিছুটা না জানলে, এ বিষয়ে কিছু ভুল বোঝার অবকাশ থেকেই যায়। আসলে দেশভাগের মূল অভিঘাত ভোগ করতে হয়েছিল বাংলা এবং পাঞ্জাবের মানুষকে। ফলে এই দুই প্রদেশের শিল্পীদের কাজ নিয়ে আলোচনা করবার দরকার আছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, বাংলার নাটক, সাহিত্য, ফটোগ্রাফি এবং চলচ্চিত্রের মধ্যে দেশভাগের বিষয়টির যে জোরালো উপস্থিতি, তা কিন্তু চিত্রকরদের কাজের মধ্যে নেই। দেশ ভাগ হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ বাস্তু হারিয়ে শেষ সম্বল নিয়ে এপার বাংলায় চলে আসছে – এমন দৃশ্য আমরা সমকালীন ফোটোগ্রাফ এবং কিছু পরে নির্মিত চলচ্চিত্রে দেখতে পেলেও খুব কম শিল্পীই এই বিষয় নিয়ে সরাসরি ছবি এঁকেছেন। চিত্রকলা এমনই এক দৃশ্যভাষা, যেখানে কেবলমাত্র চোখে দেখা দৃশ্যের একটা চটজলদি ডকুমেন্টেশন করে দিলেই চলে না, শিল্পীর নিজস্ব ভাবনা, মনন এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণ কাজের অঙ্গ হয়ে যায়। চলচ্চিত্রের মত ন্যারেটিভ মিডিয়াম নয় বলেই, চিত্রকলার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া বেশ জটিল এবং যথেষ্ট ম্যাচিওরিটি দাবি করে। ফলে চিত্রকরদের কাজে আমরা দেশভাগ যতটা পেয়েছি, তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছি তার রাজনৈতিক এবং আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের অনুসন্ধান। তাই সেই সময়ের ছবিতে দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ এবং মানুষের যন্ত্রণার সোচ্চার উপস্থিতি। সেইসব ছবি সহানুভূতি বা করুণার উদ্রেক করবার জন্য আঁকা নয়, বরং লজ্জিত হয়ে আত্মসমালোচনা করা ও প্রতিবাদে সামিল হতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য আঁকা।


    ছবি – ৫: কৃষেণ খান্নার ছবি

    বিংশ শতকের প্রথম বিশ বছরে ইউরোপীয় এবং খাঁটি ভারতীয় শিল্প নিয়ে যে বাইনারি ছিল, চল্লিশের দশকে মডার্ন আর্টের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তা আর এক রকমের চেহারা নেয়। চল্লিশের দশকের শিল্পীরা বিভিন্ন সূত্র ধরে আধুনিক ইউরোপীয় শিল্পকলার সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করে দিয়েছিলেন। পিকাসো, মাতিস, শাগাল, ব্রাঁকুশি, হেনরি মুর প্রমুখ শিল্পীদের কাজ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল তরুণ ভারতীয় শিল্পীদের কাছে। এই আধুনিক শিল্পীদের অনেকেই মনে করতেন, ফর্মের গুরুত্ব কনটেন্টের থেকে বেশি। ফলে ছবির বা ভাস্কর্যের ফর্ম, স্ট্রাকচার, ডাইমেনশন ইত্যাদি নিয়ে নিত্যনতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়ে ওঠে আধুনিক শিল্পের অন্যতম উপজীব্য। বিষয়বস্তু বা ন্যারেশন অনেকটাই ব্যাকফুটে চলে যায়। এদেশের তরুণ আধুনিক শিল্পীরাও এই পথই অনুসরণ করতে শুরু করেন। যদিও মনে রাখা প্রয়োজন, যে কোনো ধারার দিকপাল শিল্পীরা কোনোদিনই কোনো নির্দিষ্ট ছকের মধ্যে বাঁধা পড়েননি। ফলে আধুনিক শিল্পের নেতৃত্বে থাকা পিকাসো, গুয়ের্নিকার মত বিষয়বস্তু নিয়ে ন্যারেটিভ ছবি আঁকতে দ্বিধা করেননি আর অবনীন্দ্রনাথও বেঙ্গল স্কুলের পৌরাণিক বিষয়বস্তুর মধ্যে আটকে না থেকে খুদ্দুর যাত্রার মত সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা বৈপ্লবিক কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হয়েছে মূলত মধ্যমেধার ফলোয়ারদের। চল্লিশের দশকের আধুনিকতাবাদী ভারতীয় এবং বাঙালি শিল্পীদের মধ্যেও আমরা দু’টি ভিন্ন ধারার বিভাজন দেখতে পেলাম। একদল তরুণ শিল্পী ইউরোপীয় আধুনিকতার ফর্ম এবং স্ট্রাকচারের অনুসন্ধানকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরে নিয়ে এমন একধরণের শিল্প নির্মাণে যুক্ত হয়ে পড়লেন, যেখানে বিষয়বস্তু এবং সমকালীন জনজীবনের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার কোনো ছাপ রইল না। সে সময়, তরুণ আধুনিক শিল্পীদের দল ক্যালকাটা গ্রুপের প্রধান শিল্পীদের অনেকেই শিল্প শিক্ষা করতে লন্ডন বা প্যারিসে চলে গেলেন। প্রদোষ দাশগুপ্ত, নীরদ মজুমদার, পরিতোষ সেন প্রমুখ তরুণ শিল্পীর সেই সময়ের কাজে সমকালীন রাজনৈতিক বা আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কোনো প্রতিফলন নেই, অথচ দেশ তখন উত্তাল। পরবর্তীকালে পরিতোষ সেন যখন তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করলেন এবং নিজের কাজের মধ্যে নানা সমকালীন ন্যারেশন সচেতন ভাবে নিয়ে আসতে শুরু করলেন, তখন প্রদোষ দাশগুপ্তের মনে হয়েছিল ‘পরিতোষের এতকালের সাধনা বিফলতার সাগরে নিমজ্জিত হল।’ যদিও এখন আমরা বুঝতে পারি, প্রাথমিক ভাবে পিকাসো থেকে শুরু করলেও অনুসন্ধানী পরিতোষ পরবর্তী কালে আমেরিকান শিল্পী বেন শান, মেক্সিকান শিল্পী রুফিনো তামায়ো প্রমুখের কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হন। এর ফলে চিত্রকর হিসেবে তাঁর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। পরিতোষ সেনের ছোটবেলার অনেকটা সময় অতিবাহিত হয় ঢাকার জিন্দাবাহার লেন নামক গলিতে অবস্থিত পৈতৃক বাড়িতে। এই বিষয়ে স্মৃতিচারণা করে জিন্দাবাহার নামে একটি বইও লিখেছিলেন। দেশভাগের পর সেই বাড়ির স্মৃতি যে তাঁকে কষ্ট দেয়, এই কথা অনেকবার অনেক লেখায় বলেছেন। এ হেন পরিতোষের ছবিতে দেশভাগের পর ট্রেনের কামরায় ঠাসাঠাসি করে ভারতে চলে আসা উদ্বাস্তু মানুষের ছবি দেখা যায় (ছবি -৪)। যদিও তাঁর সমকালীন সতীর্থরা হেনরি মুর ঘরানায় নারীমূর্তি গড়া বা তন্ত্র আর্টের সঙ্গে ফরাসি চিত্রকলার মিশ্রণ ঘটিয়ে এক অদ্ভুত আরোপিত ভারতীয় মডার্ন আর্টের চর্চা করাকেই শ্রেয় বলে মনে মনে করেছেন। এঁদেরই সমসাময়িক পশ্চিম ভারতের অনেক শিল্পীদের কাজে অবিশ্যি দেশভাগের সরাসরি প্রভাব দেখা গেছে। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে দেশভাগের পরে এই দেশে চলে আসা কৃষেণ খান্না (ছবি – ৫), সতীশ গুজরাল(ছবি – ৬), তৈয়ব মেহতা প্রমুখ শিল্পীর কাজের মধ্যে বিষয়বস্তু হিসেবে দেশভাগের কথা এসেছে। যদিও এই শিল্পীরাও ইউরোপীয় আধুনিকতার মূল সূত্রগুলিকে নির্ভর করেই ছবি আঁকছিলেন, কিন্তু সমসাময়িক উত্তাল রাজনীতির উত্তাপ কাজের মধ্যে থেকে বাদ দিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে পারেননি।


    ছবি – ৬: সতীশ গুজরালের ছবি

    বাংলায় এই ইউরোপীয় আধুনিকতার ভারতীয়করণের বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়েছিলেন আর একদল শিল্পী। কিন্তু এঁরা কেবল শিল্পীই ছিলেন না, অনেকেই ছিলেন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। এর ফলে একদিকে যেমন চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাক্রমের প্রতি তাঁদের একধরণের দায়বদ্ধতা ছিল, তেমনই রাজনৈতিক কর্মী হওয়ার সুবাদে কেবলমাত্র চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার নির্লিপ্ত ডকুমেন্টেশন করে যাওয়ার বাইরে নিজস্ব বিচার বিশ্লেষণ দিয়ে তার রাজনৈতিক কারণ অনুসন্ধান করা এবং কাজের মধ্যে দিয়ে তাকে প্রকাশ করবার তাগিদও ছিল। এই শিল্পীদের কেউই শুধুমাত্র দেশভাগ হওয়ার পর উদ্বাস্তু মানুষের মিছিল আঁকেননি, বরং দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, কালোবাজারি, মজুতদারি, কৃষক আন্দলন এমন বহুবিধ রাজনৈতিক বিষয়কে কাজের অঙ্গ করে নিয়েছেন। এইসব শিল্পীদের কাজেও যে আধুনিক ইউরোপীয় শিল্পকলার প্রভাব ছিল না, এমন নয়। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের কাজের জোরালো প্রভাব অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। কিন্তু যেহেতু বিষয়বস্তু এবং ন্যারেশন নিয়ে এই শিল্পীদের কোনো রিজার্ভেশন ছিল না এবং তার সমস্তটাই ছিল সমকালীন জনজীবনের ওপর নির্ভরশীল, ফলে ইউরোপীয় প্রভাবকে ছাপিয়ে একধরণের সমকালীন ভারতীয়ত্ব এঁদের ছবিতে আপনা থেকেই তৈরি হয়ে গেছে, যা বাইরে থেকে আরোপিত বলে মনে হয় না। এই ধারার শিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য, জয়নুল আবেদিন এবং সোমনাথ হোড়। চল্লিশের দশকের অশান্ত রাজনৈতিক বাতাবরণের মধ্যে বসে যামিনী রায় যখন নির্বিকার চিত্তে কৃষ্ণ বলরাম, নৃত্যরত গোপিনী, মাছ মুখে বিড়ালের ছবি এঁকে তাঁর এলিট দেশী এবং বিদেশী সংগ্রাহকদের মনোরঞ্জন করে চলেছেন, সেই একই সময় বাংলার পটচিত্রের দৃশ্যভাষাকে যেন নতুন করে কন্টেক্সচুয়ালাইজ করলেন চিত্তপ্রসাদ। দীর্ঘ টানা টানা চোখের অধিকারিণী, দেবী প্রতিমার মত মুখাবয়বধারিণী যে বাংলার চিরন্তন নারীকে যামিনী রায়ের ছবিতে আমরা কন্টেক্সটবিহীন ভাবে উপস্থাপিত হতে দেখেছি, চিত্তপ্রসাদের সাদা কালো লিনোকাট এবং ড্রয়িং, সেই নারীকেই নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে দিল অধিকারের দাবিতে আন্দোলনরত মজদুরদের মিছিলে, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে (ছবি -৭)। পথের পাঁচালীর অপুর মত দীঘল চোখের কিশোরটিকে আমরা দেখলাম কলকাতার রাস্তায়। কঙ্কালসার চেহারায় সে কাকেদের সঙ্গে লড়াই করে অন্ন খুঁটে খাচ্ছে ডাস্টবিন থেকে। এইসব ভিস্যুয়াল একদিকে যেমন ছবির মধ্যে এক ভারতীয় বাঙালি আইডেন্টিটি তৈরি করে, তেমনই বাংলার চিরাচিরিত সুখ, শান্তি, সৌন্দর্যের মিথকে ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়। চিত্তপ্রসাদের ছবি একদিকে যেমন আম জনতার হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তেমনই এলিট সংগ্রাহকদের ঘর সাজানোর উপকরণ হিসেবে আর্টের যে উপযোগিতা, সেই ধারণাকে সরাসরি আক্রমণ করে। একদিকে যখন বাঙালি আধুনিকতাবাদী শিল্পীদের অনেকেই ফর্মের গুরুত্ব অনুধাবন করে ছবির কনটেন্ট বা ন্যারেটিভকে প্রায় বাতিল বলে গণ্য করছেন, সেইসময় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে চিত্তপ্রসাদ একের পর এক পোস্টার এঁকে চলেছেন। এটা সেই হায়ারার্কির যুগ, যখন তথাকথিত হাই-আর্ট এইসব পোস্টারকে শিল্পপদবাচ্য বলেই মনে করত না। যদিও এইসব কাজ করবার জন্য চিত্তপ্রসাদ একটি ইউরোপের দেশ থেকে আমন্ত্রণ এবং নাগরিকত্ব গ্রহণের প্রস্তাবও পেয়েছিলেন। যাই হোক, তিনি সেই নাগরিকত্ব গ্রহণ করেননি বা দেশ ছেড়ে পাকাপাকি ইউরোপের বাসিন্দা হওয়ার কথা ভাবেননি। আজকের উত্তর আধুনিক শিল্পভাবনায় অবিশ্যি চিত্তপ্রসাদের কাজ অন্য অনেক তথাকথিত মূল ধারার আধুনিকতাবাদী শিল্পীদের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকৃত হয়েছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী এবং মিউজিয়ামের স্থায়ী সংগ্রহে স্থান পেয়েছে।


    ছবি – ৭: চিত্তপ্রসাদের সাদা কালো ড্রইং

    অবিভক্ত ভারতের পূর্ববাংলায় জন্মেছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদিন। কলকাতার আর্ট স্কুলে পড়াশোনা করতে এসেছিলেন। ১৯৪৬-৪৭ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষকে সরাসরি ছবির ভাষায় তাঁর মত বোধহয় আর কেউই ধরতে পারেননি। জয়নুলের ছবিতে কোনো রাজনৈতিক ভাষ্য ছিল না। কাদের চক্রান্তে ইচ্ছাকৃতভাবে এই দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, তাতে কারা কিভাবে লাভবান হচ্ছিল – এই বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে চিত্তপ্রসাদের ছবিতে। কিন্তু তীব্র মানবিক আবেগ এবং সহমর্মিতায় জয়নুল তাঁর কালি-তুলির ড্রয়িঙের মধ্যে দিয়ে যে অভিঘাত তৈরি করতে পেরেছিলেন, তা যেকোনো সংবেদনশীল মনকে বিচলিত হতে বাধ্য করবে। ডাস্টবিন থেকে অন্ন খুঁটে খাওয়া কঙ্কালসার মানুষের সঙ্গে কাক ও কুকুরের সহাবস্থান, ফুটপাথে অনাহারে মৃত মানব শরীরের ওপর কাকেদের জটলা (ছবি-৮) এইধরণের সব ছবিতে কোনোরকম আধুনিকতাবাদী চালিয়াতি বা ভাঁওতা নেই। জোরালো তুলির আঁচড়ে যা ধরা পড়েছে, তা নির্ভেজাল কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এই ছবির আধুনিকতা এর অকপটতায়, সমকালীনতায়, অতিকথনহীন সত্যের উপস্থাপনায়। দেশভাগের পর আবার এই জয়নুল আবেদিনকে ফিরে যেতে হয় পূর্ব পাকিস্তানে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতীয় শিল্পী হিসেবে সম্মান জানানো হয় তাঁকে। বাংলাদেশের জাতীয় শিল্প অ্যাকাডেমি গঠন করবার পিছনেও জয়নুল আবেদিনের বিরাট ভুমিকা ছিল। ১৯২১ সালে অধুনা বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জন্ম হয় শিল্পী সোমনাথ হোড়ের। এই বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ। জয়নুল আবেদিনের মতই, তিনিও কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে পড়াশোনা করতে এসেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েন এবং আর এক বামপন্থী শিল্পী চিত্তপ্রসাদের সংস্পর্শে আসেন। একদিকে যেমন দুর্ভিক্ষ এবং দাঙ্গা এবং হিংসা তাঁর শিল্পী মনকে আলোড়িত করেছিল, তেমনই আবার খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন ১৯৪৬-৪৭ সালের কৃষক আন্দোলনকে। এই আন্দোলনের সঙ্গে তিনি এতটাই নিবিড় ভাবে জড়িত হয়ে পড়েছিলেন, যে সেই সময়ে করা আন্দোলনের ড্রইং, কাঠখোদাই ছবি ইত্যাদি মিলিয়ে তৈরি হয় একটি সংগ্রহ, যা তেভাগার ডায়রি নামে বিখ্যাত। দাঙ্গা এবং দুর্ভিক্ষের স্মৃতি সারা জীবন ধরে বহন করেছিলেন সোমনাথ হোড়। তাঁর করা বিভিন্ন মাধ্যমের ছাপাই ছবি, ভাস্কর্য এবং পেপার-পাল্পের ব্যবহারে করা ‘উন্ডস’ সিরিজের মধ্যে ফিরে ফিরে এসেছে সেই উথালপাথাল সময়ের দুঃস্বপ্নের স্মৃতি। যেটা মনে রাখা দরকার, এই শিল্পীদের কেউই কিন্তু সরাসরি দেশভাগ এবং উদ্বাস্তু মানুষদের ছবি আঁকেননি। আসলে এঁরা কেউই দেশভাগের যন্ত্রণাকে কেবলমাত্র ছবি আঁকার বিষয়বস্তু হিসেবে ব্যবহার করবার কথা ভাবেননি। এঁরা ছিলেন দেশভাগের বিপন্নতার প্রত্যক্ষ শরিক। তাই চিত্তপ্রসাদ, জয়নুল আবেদিন বা সোমনাথ হোড়ের ছবি বা ভাস্কর্য আসলে ওই সময়ের রাজনৈতিক দলিল। তাঁদের ছবি কেবল ডকুমেন্টেশন নয়, বিশ্লেষণ এবং গবেষণার বিষয়বস্তু।


    ছবি – ৭: জয়নুল আবেদিনের কালি-তুলির ড্রয়িং

    আসলে আমি এখানে দেশভাগের ইতিহাস লিখতে বসিনি। সেই কাজ করবার যোগ্যতাও আমার নেই। আমি কেবল খুঁজতে চেষ্টা করেছি ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসের সেই অধ্যায়কে, যেখানে শিল্পচর্চা নানা তত্ত্ব এবং মতামতে বিভাজিত হতে হতে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছে যায়। একটি দেশের ভৌগলিক বিভাজন তাত্ত্বিক লড়াইকে ছাপিয়ে গিয়ে এমন এক শিল্প ভাষার জন্ম দেয়, যা ইতিপূর্বে অর্জন করতে বার বার ব্যর্থ হচ্ছিলেন শিল্পীরা। এই বিভাজন ও তার পূর্ববর্তী পরিস্থিতি একদল শিল্পীর আত্মাকে এমন ভাবে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে, যে তার স্থায়ী প্রভাব পড়ে তাঁদের জীবন ও শিল্পচর্চায়। কিন্তু এই বিভাজনের শিল্পকলাই আবার আধুনিক সমকালীন ভারতীয় শিল্পের দিকনির্দেশ করে দেয়। দেশভাগের সময় ওপার বাংলা থেকে চলে আসা কিশোর যোগেন চৌধুরীর মনে থেকে যাওয়া হিংসা ও দাঙ্গার স্মৃতি এখনও ছবির বিষয়বস্তু হিসেবে ঘুরে ফিরে আসে। দেশভাগের অভিঘাত কয়েক প্রজন্মের শিল্পী এবং ভারতীয় শিল্পকলার সমকালীন দৃশ্যভাষাকে বাস্তবের মাটিতে আছড়ে ফেলে এক ধাক্কায় অনেকখানি সাবালক করে দেয়।

     

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২৩৫ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৫ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • santosh banerjee | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১:৩৩498301
  • পৃথিবীর প্রাচীনতম শিল্প কলা হিসেবে চিত্র কলা পরিচিত।এর ওপর তথ্য ভিত্তিক আলোচনা খুব দরকার ছিল। লেখক বলেছেন সেই কথা। ধন্যবাদ। ধন্যবাদ আরো এই জন্য যে বর্তমান শাসক দলের সঙ্গে ‌‌‌‌‌যখনএকটা অঘোষিত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক যুদ্ধ চলছে, যখন শব্দ বন্ধ করার জন্য এই বর্বর অসভ্য‌‌‌ বিজেপি সরকার বদ্ধপরিকর, তখন তো চিত্র কলাই একমাত্র মাধ্যম হতে পারে আমাদের কাছে অস্ত্র!
  • বিশ্বদীপ | 2402:3a80:ab1:29b:0:48:eaf2:cf01 | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৮:৫১498359
  • খুব ভাল লাগছে। তথ্য সমৃদ্ধ, কিন্তু ভারাক্রান্ত নয়
  • Soumitra Sasmal | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১০:২৭498363
  • বাবু সন্তোষ Animal Farm নাটক কারা বন্ধ করেছিলো? 
    কবি শঙ্খ ঘোষ কে কারা গাল পেড়েছিল? সিপিএম এর থেকে বর্বর আর কেউ আছে? যারা লাইফ হেল করে দেওয়ার কথা বলে। যারা মানুষজনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারে! 
    সিপিএম এর মত অসভ্য সুবিধা বাদী অসভ্য পার্টি ভূভারতে নেই। 
  • Suman Chakraborty | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০০:৩২498643
  • ঝকঝকে গবেষণা ধর্মী লেখা। 
  • বিশ্ব বসু | 150.129.66.103 | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০০:২০498671
  • বেশ্  ভালো ।পরিশ্রমী  গবেষণাধর্মী  লেখা ।
  • santosh banerjee | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৮:৪৪498694
  • শাসমল ভাই, আমি কোন এম, ফলমূল বা তৃশূল বা কঙ বঙ এর সদস্য না। আমি একজন স্বঘোষিত বামপন্থী। এবং আমি তার জন্য গর্বিত। বোধহয় আপনি আমার লেখার অর্থ বোঝেন নি বা আপনার গৈরিক পতন হয়েছে। একটা স্লোগান দিয়ে শেষ করবো, বেশি বাকতাললা পছন্দ হয়না...""এ শতাব্দীর চারটে ভুল, কঙরেস সি পি এম বি জে পি আর... তৃনমূল""" ।সৌজন্যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। আবার "আরবান নকশাল " ভাববেন না। তাহলে আবার ভুল বোঝাবুঝি হয়।
  • নিরমাল্লো | 220.158.144.34 | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২০:৩৭498697
  • ভালো লাগছে। আশা করি আরো খানিক আসবে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন