• খেরোর খাতা

  • কাদামাটির_হাফলাইফ ১২

    Emanul Haque লেখকের গ্রাহক হোন
    ২১ জুলাই ২০২১ | ১৩১ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • #কাদামাটির_হাফলাইফ ১২


    আমার হাতে খড়ি হয়েছিল প্রভাকর মজুমদার ওরফে পটল ঠাকুর ওরফে পটল বামুনের হাতে। তাঁর কাছেই আমাদের ইনফিন ( ইনফ্যান্ট/ প্রাক প্রাথমিক) জীবন। অ আ থেকে নামতা ঘোষা। কাকিমা গোবর ন্যাতা দিয়ে রাখতেন। আমরা নিয়ে যেতাম তালপাতার চাটাই। কেউ আনতো চট। পটলকাকা ছিলেন জুনিয়র হাইস্কুলের পিওন। পূজা আর্চাও করতেন। এ গ্রাম সে গ্রাম। তাঁর ছেলে নিখিল ভাইপো দিলীপও পড়তো আমাদের সঙ্গে। পড়ার বাহানা শেষ হলেই ফুলপুকুরে ধারে আমের সময় আম খেজুরের সময় খেজুর গাছের তলায় ছোটা। একসঙ্গেই খাওয়া। ছোঁয়াছুঁয়ি ঘৃণা কখনও চোখে পড়েনি।


    যতদিন গ্রামে থেকেছি, দশম শ্রেণি পর্যন্ত কোন অষ্টমীতে বাড়িতে খাইনি। নিখিল দিলীপ তাপস জগন্নাথরাও কোন ইদে বাড়িতে খেতো না।


    দুপুর থেকে রাত বন্ধুদের বাড়ি বাড়ি লুচি ছোলার জিরে লঙ্কা সাঁতলানো ডাল নারকেল নাড়ু খেয়ে কাটতো।


    আজও জগন্নাথের মা ও পটলকাকার স্ত্রীর মতো ভালো ছোলার ডাল আমি খাইনি।


    গ্রামে গেলেই বারোয়ারি তলায় যাই। প্রতিটি বাড়ি বাড়ি যাই। মাসিমা কাকিমা দিদিমা মামিমাদের সঙ্গে কথা বলি। কিছুজনের সঙ্গে বাবার সম্পর্কে কথা। কিছু বাড়িতে মায়ের সম্পর্কে সম্বোধন। ওটা আমার মামার বাড়ির পাড়াও।


    পটলকাকিমা গেলেই মনে করান, তোর মনে আছে, তুই শুধু ডাল খেতে চাইতিস। লুচি খেতিস না। বলতিস, এত সুন্দর ডাল বানাও।


    আর বছরভর আমাদের আড্ডার জায়গা ছিল বারোয়ারিতলা। বৃষ্টি এলে শিবমন্দিরের চালের নীচে। বেশিজন হলে একটু দূরে মসজিদের বারান্দায়। মসজিদে প্রথমদিকে একটা রোয়াক ছিল। এখন নেই। শিবমন্দির পাকা হয়েছে। রেলিং দিয়ে ঘেরা। মসজিদেও এখন দরজা। পাঁচিল। 


    গ্রামে তখন উৎসব তো চারটে। দুটো ইদ। রমজানের ইদ আর বকরিদ। রমজানে উৎসাহ কম। বকরিদে বেশি। একটা চৈত্র মাসে শিবের গাজন অন্যটা মাঘমাসে ওলাইচণ্ডী পূজার সময় মেলা।


    সেটাই সবচেয়ে বড়।


    হাতে পয়সা থাকে সবার।


    একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত গ্রামে দুর্গাপূজা দেখি নি। মানুষের আর্থিক সঙ্গতি ছিল না।


    বাজারে গঞ্জে দুর্গা আসতেন।


    গ্রামে শিব আর ওলাইচণ্ডীর রাজত্ব।


    সেই রাজত্বে সবার সমান অংশ ছিল।


    শীতকালে পূজা। স্কুলের পরীক্ষা শেষ। ওলাইচণ্ডীর মূর্তি গড়া শুরু। রাতদিন পড়ে থাকা বারোয়ারি তলায়।


    খড় দিয়ে কাদা মাখা, কাদা তুলে মদনদাকে দেওয়া। মদনদা তখন আমাদের হিরো। ওই কাদা দিয়ে বাঁশের কাঠামোকে বানিয়ে তুলবে দেবী।


    রঙ দেওয়ার আগে আমরাও আবোল তাবোল মূর্তি গড়তাম। মদনদা দয়াপরবশ হয়ে রঙ দিত।


    আমার ছিল সিংহ গড়ার ঝোঁক। বছরের পর বছর এক মূর্তি বানানোর অক্ষম চেষ্টা। মদন চোখটা ঠিক করে দিতো তুলি দিয়ে।


    মদনদা বছরের অন্য সময় জেলে। মাছ ধরে। শীতে তাঁর আলাদা কদর। শিল্পী।


    এ বাড়ি সে বাড়ি থেকে জলখাবার আসতো। 


    বারোয়ারি তলায় সাকুল্যে তখন ১৩ ঘরের বাস। কিন্তু কত নাম। কেউ বলতেন, বেনেপাড়া। দু ঘর পয়সাওয়ালা বেনে। কেউ বলতেন, বামুনপাড়া। সাত ঘর বামুন। একঘর কায়স্থ। কলু/ তেলি তিনঘর। কেউ বলতেন, কাছারিপাড়া। গাঁয়ে একাধিক জমিদার। মাদানগরের দাঁয়েদের জমি ছিল গ্রামে। তাঁদের কাছারিবাড়ি।


    সেখানে নাটক বা যাত্রার রিহার্সাল হতো।


    ছোটদের নাটক গ্রীষ্মে। বড়দের শীতে যাত্রা।


    নাটক রবীন্দ্র ও নজরুলজয়ন্তী ঘিরে। যাত্রা ওলাইচণ্ডী পূজা ও মেলাকেন্দ্রিক। ৮০ শতাংশ অভিনেতা মুসলিম।


    আমাদের খুব প্রিয় ছিলেন রামমামার মা। সবার দিদিমা। অন্নপূর্ণা দত্ত। রসিকা মানুষ। এখন ৯০ এর কাছাকাছি বয়স। খালি গা। গ্রামের আর পাঁচজনের মতোই। বড়লোকের বউ। স্বামী হাইকোর্টের কাজ করতেন। দাদু এবং দিদিমা দুজনেই অমায়িক ভদ্রলোক। 


    দিদিমাকে প্রণাম করলেই গালে হাতে দিয়ে নিজের হাতে চুমু খান। সেটাই আশীর্বাদের ধরন। এক গ্লাস সরবত বা দুধ খেতেই হবে তাঁর বাড়ি গেলে।


    এখনও না গেলে অভিমান করেন।


    দিদিমাকে ভুলে যাচ্ছিস ভাই।


    সবজায়গাতেই ছিল বাবার জোরে খাতির। দিদিমার কাছে আমরা মায়ের ছেলে।


    ১২ বছর বয়সে বউ হয়ে আসেন। চারপাশ নির্জন। গাছপালা ঢাকা। পাশে বাড়ি বলতে আমার নানার বাড়ি। বলা ভালো নানির বাড়ি। আমার নানিও ওই গ্রামের মানুষ। নানি আর দিদিমা সই পাতান। তাঁর শাশুড়িই উদ্যোগ নেন। একা বউ কী করে থাকবে? বিধবা শাশুড়ি। কতদিকে নজর দেবেন।


    দিদিমা বলছিলেন, তোমার নানাই তোমার দাদুকে কলকেতায় নিয়ে গিয়ে কাজে লাগিয়ে দেয়। থাকার জায়গাও ঠিক করে দেয়।


    সে-কথা ভুলে যাওয়া কি মানুষের কাজ?


    আমার মায়ের সইমা রামমামার মা।


    নানির নাম সালমা খাতুন। দিদার নাম অন্নপূর্ণা দত্ত। 


    সমবয়সী দুই সখী। দুজনেই গ্রামের নতুন বৌ।


    #


    আজ মা বাবা নানি কেউ নেই।


    রামমামার মায়ের কাছে শৈশবের গন্ধ পাই।


    #


    আমার মায়ের মৃত্যুর কদিন আগে অসুস্থ হয়ে সেবাকেন্দ্রে ছিলেন। সেবিকা জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কি হিন্দু? 


    কেন?


    না আপনার আমার কাছে জবাফুল চাইছিলেন।


    মা তখন আমাদের চিনতে পারছিলেন না। ছোটবেলার খেলার সাথীদের নামে ডাকছিলেন।


    মা ফিরে গিয়েছিলেন শৈশবে জবাফুল দিয়ে ঠাকুরপুজো খেলার দিনগুলিতে।


    #


    আমরাও তো কতো পুজো পুজো খেলেছি।


    দুভাই বাঁশের কঞ্চি দিয়ে রাম লক্ষ্মণ সেজেছি।


    #


    সেখানে ভয়ের হারামি লক্ষণ ছিল না।


    মনের আরাম ছিল।


    দূর্বাদলশ্যাম রামের প্রসন্ন মুখ।


    আমার বাবা যে রাম সেজে ছিলেন যাত্রায়।


    একবার রাম একবার শম্বুক হত্যার অন্যতম আয়োজক গুপ্তচর দুর্মুখ।


    #


    আমার বাবাকে রামরূপে দেখেছি।


    এ কাদের দেখছি দুর্মুখরূপে।


    ৬ আগস্ট ২০২০


    Emanul Haque ইমানুল হক 


    Emanul Haque II


    আরও পড়ুন
    বাণী - Mousumi Banerjee

  • ২১ জুলাই ২০২১ | ১৩১ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই প্রতিক্রিয়া দিন